ইসলাম ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধিকে কিভাবে নিবে বাংলাদেশ?
ড. আনিসুর রহমান
(উৎসঃ http://www.sonarbangladesh.com)
বর্তমানে বিশ্বের সবখানেই ধর্মের প্রভাব বাড়ছে, তেমনি বাংলাদেশেও বাড়ছে ইসলাম ধর্মের প্রভাব। এদেশে ইসলাম ধর্ম একসময় সমাজের অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে বেশী প্রতিপালিত হলেও বর্তমানে তা সমাজের সকল তলায়ই সমভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। রাজধানীতে এমন মসজিদ পাওয়া যাবে না যেখানে শুক্রবারে জুমার নামাজে মুসল্লীদের উপচে পড়া ভীড় দেখা না যায়। ব্যস্ত রাজপথ, অফিস পাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে নারীদের মধ্যে হিজাবের বিস্তার লক্ষণীয়। ইসলাম ধর্মকে জানার আগ্রহও জনগণের মধ্যে এতো বেড়েছে যে, টিভি চ্যানেলগুলো একটি উল্লেখযোগ্য প্রচারসময় এ উদ্দেশ্যে বরাদ্দ রাখছে। এমনকি শুধুমাত্র ইসলামি বিষয় প্রচারের জন্য পৃথক টিভি চ্যানেল চালু রয়েছে। ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন এবং সমাজের শাসক শ্রেণীর মধ্যে তাদের প্রভাব যে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে তা ২০০৬ এর বাতিলকৃত নির্বাচনের আগে ভালোভাবে বোঝা গিয়েছিল। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা ভাবনার হয়তো প্রয়োজন হতো না যদি বর্তমানের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির কারণে এ বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না হতো। বিষয়টির জটিলতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে হলে নীচের বিষয়গুলোকে বিবেচন করতে হবে:
১. ইসলামের বর্ধিত প্রভাবের কারণে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্র, ইসলামি সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্য ইত্যাদি হিসাবে অভিহিত করা সহজ হচ্ছে। এর উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে সামরিক আগ্রাসন পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অনেকেই মনে করেন, এক-এগারোর পটপরিবর্তন যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ঘটেছিল, তার পিছনে মূল কারণ ছিল বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থিদের জয়-পরাজয় নির্ধারণমূলক অবস্থান। ইসলামের প্রভাব যত বাড়বে, বাংলাদেশকে নিয়ে পাশ্চাত্যের দুশ্চিন্তা ততো বাড়বে এবং তারা এদেশকে অস্থিতিশীল, দুর্বল ও অকার্যকর করতে ততো বেশী চেষ্টা করবে।
২. বাংলাদেশে ইসলামপন্থি হিসাবে পরিচিত প্রায় সকল মহলই একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। জনগণের বৃহদাংশ তাদেরকে এখনো গ্রহণ করে নিতে পারে নি। এই মহলের প্রভাব বৃদ্ধিকে মোকাবেলার জন্য তাদের বিরোধীরা একাত্তরের ইস্যূকে বার বার নিয়ে আসবে যাতে জাতি সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিপতিত হতে পারে। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের ইসলামপন্থি অংশটি নতুন প্লাটফর্ম গঠন করায় বিষয়টি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।
৩. ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বাংলাদেশকে একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যা এক ধরণের শ্রেণী সংঘাতও বটে। বৃটিশদের বিতাড়ণের পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত এদেশের শাসক শ্রেণীটা পুরোটাই ছিল সেকুলার চিন্তা ভাবনার দখলে। স্বয়ং জিন্নাহ ছিলেন সেকুলার চিন্তার অনুসারী। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সিংহভাগ সাম্যবাদী ধ্যান-ধারণার অনুসারী ছিলেন। তাদের অনেকেই ইসলাম ধর্মের প্রচন্ড বিরোধীও ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি অনুধাবন করা সহজ হবে। মাহফুজ আনাম তখন ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটাবন এলাকায় একটি মসজিদ করা হয়েছিল। টিনের চাল, চাটাই এর বেড়া। মাহফুজ আনাম ও আরো কয়েকজন সমমনা ছাত্র মিলে এক রাতের অন্ধকারে সেই মসজিদ তুলে দূরে ফেলে দিয়ে আসেন এবং মসজিদের স্থানটি ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। এই প্রজন্মটিই বর্তমানে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রভাব বৃদ্ধিতে দেশ একটি সংঘাতের মধ্যে নিপতিত হয়েছে।
৪. প্রতিবেশী দেশটির সংকীর্ণ ও আগ্রাসী আচরণ বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের প্রভাব বৃদ্ধির সহায়ক। এদেশের জনগণ ঐতিহাসকভাবেই দেশপ্রেমিক এবং যে কোন ধরণের আগ্রাসনের বিরোধী। পার্শ্ববর্তী দেশটি কখনই বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বমূলক আচরণ করে না। বাংলাদেশের নিকট দেশটির দাবীর অন্ত নেই। অথচ, এদেশেকে কোন ধরণের ছাড় তারা দিনে নারাজ। বাংলাদেশের বাজার দেশটির পণ্যে ভর্তি হয়ে গেছে, অথচ, আমাদের পণ্য সেখানে ঢুকতে চেষ্টা করলেই হাজার রকম বাধা। আমাদের আকাশ দেশটির টিভি চ্যানেলে ছেয়ে গেছে, অথচ, বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল সেখানে দেখা যায় না। প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের নাগরিককে পাখীর মত গুলি করে হত্যা করছে। সিডর পরবর্তীতে দেশটি বাংলাদেশকে কিছু চাল দেয়ার কথা মহা আড়ম্বড়ে ঘোষণা করে, যা আজও পাওয়া যায় নি। এমনকি তারা বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি করতে এদেশে চাল রফতানীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এক পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেও, চালের দাম দফায় দফায় বহুগুণ বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের জনগণ দেশটির এ আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও ধর্মনিরপক্ষে রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবিগণ এ সকল বিষয়ে শুধু যে নীরব থাকে তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা এমন আচরণ করে যে, মনে হয় তারা বাংলাদেশের নয় বরং প্রতিবেশী দেশটির নাগরিক। অপরদিকে ইসলামপন্থি মহল এর বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার। ফলে তারা দেশপ্রেমিক জনগণের একটি অংশের সমর্থন পেয়ে থাকে। ইসলামপন্থিদের দাবী যে তারাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বের সব থেকে বড় রক্ষক - তা জনগণ গ্রহণ করে থাকে। একই কারণে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে দলটির প্রতি সহানুভূতি থাকা অসম্ভব নয়।
৫. বাংলাদেশের ধর্মনিরপক্ষে রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবিগণের অতি নেতিবাচক অবস্থান প্রকারান্তরে জনগণকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে সাহায্য করেছে। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয় এবং যে কোন ধরণের চরমপন্থার বিরোধী। ধর্মনিরপক্ষ শ্রেণীর জঙ্গী ও অসহনশীল মনোভাব সাধারণ জনগণকে তাদের প্রতি ভীত করে তোলে যার ফলে নিবর্বাচনগুলোতে ও জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থিরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়। হয়তো এ কারণেই বাংলাদেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ধর্মনিরপক্ষে শক্তি কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি।
৬. বিগত তিন দশকে প্রচুর বাধা সত্ত্বেও ইসলামপন্থিদের কর্মকান্ড থামিয়ে দেয়া যায় নি। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই ধারার ছাত্র সংগঠনটির প্রভাব লক্ষণীয়। ফলে, এই সময়ে ইসলামপন্থিরা ব্যাপকভাবে সমাজের মুলধারায় নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা, মিডিয়া - সকল ক্ষেত্রেই তারা গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে। সবকিছুকে পিছনে টেনে ধরার প্রবণতাকে বাদ দিয়ে তারা বরং অনেক ক্ষেত্রে চালকের ভূমিকা নিতে পেরেছে।
৭. ইসলামপন্থি প্রধান রাজনৈতিক দলটি অত্যন্ত সংগঠিত এবং তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট বিস্তৃত। তাদের নেতা-কর্মীদের সততা এবং রাজনৈতিক দক্ষতার বিষয়টিও অনেকটাই স্বীকৃত। দলটি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় যথেষ্ট অগ্রসর। এই দলকে দুর্বল করা সহজসাধ্য নয়।
৮. জাতীয়তাবাদীদের সাথে ইসলামপন্থিদের সখ্যতা জিয়াইর রহমানের সময় থেকেই। আদর্শগতভাবেও দুই ধারার সমর্থকেরা অনেকটাই কাছাকাছি। এ কারণে দেখা যায় লেখক, সাংবাদিক, বৃদ্ধিজীবিদের মধ্যে যারাই জাতীয়তাবাদী তারাই আবার ইসলামপন্থিও। এর ব্যতিক্রম খুবই কম। তাদের ভোটার শ্রেণীও অনেকটা এক। ফলে, এদের ঐক্য ঘটলে ধর্মনিরপক্ষে শ্রেণীর জয়ী হবার সম্ভাবনা খুব কম। বিষয়টি সকলেই উপলব্ধি করাতে এই দুই ধারার মধ্যে একটি শক্ত ঐক্য গড়ে উঠেছে যা সহজে বিনষ্ট হবার সম্ভাবনা কম।
৯. মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা দিনকে দিন বেড়ে চলছে। বছরে ৫৬ হাজার কোটি টাকা পাঠাচ্ছে প্রবাসীরা যার সিংহভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলি থেকে। এই অর্থ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌছে যাচ্ছে। ইসলামপন্থিদের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সমর্থন রয়েছে। এদেরকে নিমুল করতে চাইলে উক্ত দেশগুলি বেকে বসতে পারে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, একা সউদী আরব যদি বাংলাদেশী শ্রমিকদেরকে ফেরত পাঠায়, তাহলে এখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। অপরদিকে পশ্চিমাদের প্রতি আরবদের অবিশ্বাস বাড়ার কারণে বাংলাদেশ তাদের অর্থের একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র হতে পারে।
১০. আমেরিকার একটি বদনাম রয়েছে যে, দেশটি মুসলিম বিশ্বে অগণতান্ত্রিক শক্তিকে সহায়তা করে থাকে। ইসলামি গণতন্ত্রের মডেল হিসাবে বাংলাদেশকে তারা দেখতে চাইতে পারে।
১১. পাশ্চাত্যের জনগোষ্ঠীর দীর্ঘকাল লালিত সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী মানসিকতা, যা এতোদিন গণতন্ত্র ও মুক্তবুদ্ধির খোলসে ঢাকা ছিল, তা এখন অনেকটাই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। একটি মিথ্যা অজুহাতে ইরাক দখল, সেখানে ব্যাপক গণহত্যা চালানো, ইরাক দখলের প্রেক্ষিতে আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা - ইত্যাদি সত্ত্বেও উক্ত গণহত্যার নায়ক প্রেসিডেন্ট বুশের ব্যাপক ভোটে পুননির্বাচিত হওয়া ইত্যাদি আমেরিকার জনগণের চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবেরই প্রকাশ। আমাদের দেশে একটি ধারণা প্রচার করা হয় যে, দেশটির জনগণ উদার মনের, সমস্যা শুধু বুশের মধ্যে। বিষয়টি আদৌ তা নয়। এমনকি সে দেশে যেই ক্ষমতায় আসুক, তাকে সাম্প্রদায়িকতার মধ্য থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। ওবামার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে একজন মুসলিম নারী সম্মুখসারিতে বসলে তাকে সরিয়ে পিছনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে কি এ ধরণের দৃশ্য কল্পনা করা যায়? এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, এই সাম্প্রদায়িক দেশটির মন পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণ তাদের নিজ দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি ডেকে আনবে কিনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

