খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বাংলাদেশের রাজনীতির গুমোট আবহাওয়া কেটে গিয়ে একটি সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। রাজনীতি তার নিজের বৃত্তে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সকলেই আশান্বীত হয়ে উঠেছেন যে, প্রভাবশালী মহল তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়ে সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রভাবহীন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে গত দুই বছরে দেশ যতটুকু পিছিয়েছে তার ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে উঠে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কাজ করবে। এই আশাবাদ এ কারণেই যে, খালেদা জিয়ার মুক্তি অপর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মত আঁতাত ও আপোষের মাধ্যমে হয়নি, বরং তাঁর সন্তানদের উপর অমানবিক নির্যাতন, তাঁর দল ভাঙ্গার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা - ইত্যাদির পরও তাঁর আপোষহীনতার কাছে সরকারকে পরাজিত হতে হয়েছে এবং মূলত: জনরোষের ভয়েই তাকে মুক্তি দিতে হয়েছে।
তবে এই মহলের মনস্তত্ব এবং এক এগারোর দীর্ঘ প্রস্তুতির বিষয়টি বিবেচনা করলে আশান্বিত হবার খুব একটা সুযোগ থাকে না। নিজামউদ্দিন আওলিয়ার মত ডাকাত থেকে দরবেশ হবার ঘটনা খুব কম ঘটে। যে মহলটি দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশী সময় ধরে মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ - ইত্যাদিকে সুকৌশলে এবং সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এক এগারোর পটভূমি তৈরী করেছিল, তারা হঠাৎ করেই রণে ভঙ্গ দিবে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যে নির্বাচন কমিশন এতোদিন ধরে অতি নগ্নভাবে একটি রাজনৈতিক দলকে ভাঙ্গার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে, যে উপদেষ্টাগণ এতোদিন ক্রুর হাসি হেসে রাজনীতিকদের (তাঁদের ভাষায় রাঘব-বোয়াল) শিকারের আনন্দ প্রকাশ করেছেন, তাঁরা কোন এক অদৃশ্য জাদুমন্ত্রবলে নিতান্ত সুবোধ বালকটি হয়ে গেছেন, তা ভাবলে মারাত্মক ভুল হবে। বরং, উত্তপ্ত হয়ে ওঠা জনমতকে কিছুদিনের জন্য ঠান্ডা রেখে এই নিরিবিলি সময়ে তাদের নতুন প্লান আটার সম্ভাবনাই বেশী। ঠিক একবছর আগের পাকিস্তানের রাজনীতির ঘটনা-প্রবাহ সেদিকেই ঈঙ্গিত দেয়।
তারেক ও খালেদার মুক্তিতে আওয়ামীলীগ এবং তার সমর্থক মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবিগণ যেভাবে প্রতিক্রয়া দেখিয়েছেন, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হলে বর্তমানের ভাঙাচুরো বিএনপি ও জামায়াত মিলে আবারও কজনগণের ভোটে জয়ী হয়ে আসতে পারে। কেউ কেউ তো একথাও বলা শুরু করেছেন যে, ১/১১ এর উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় আনা। আশাহত ফেরদৌস কোরেশী বলেছেন প্রয়োজনে আরেকটি তত্বাবধায়ক সরকার আনতে হবে। ফলে, বিএনপির বিজয় ঠেকাতে দেশকে আবারো গভীর সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এ সকল কারনে খালেদাকে সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল দিয়ে।
১. খালেদার সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল দলের অন্তদ্বর্ন্দ্ব মোকাবেলা করে ভাঙ্গাচোরা দলকে পুনগঠিত করা। মুক্তি পেয়েই তার কিছুটা তিনি করেছেন। তবে, এক্ষেত্রে বাকী রয়েছে অনেক বেশী। নির্বাচনের জন্য যে ধরণের দল গোছানো দরকার, তার কিছুই এখনো শুরু হয়নি। ২০০১ এর নির্বাচনের আগে তারেক রহমান সারাদেশ চষে বেড়িয়েছিলেন, ভোটের জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করেছিলেন। এবার একাজটি তিনি করতে পারবেন না। খালেদাকে এই ধরণের এক বা একাধিক নেতা খুজেঁ বের করতে হবে।
২. এক-এগারের পর তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিএনপি নেতা-কর্মীদের উপর একপ্রকার কেয়ামত নেমে আসে। তাদের অধিকাংশকে ঘর বাড়ি ছাড়তে হয়। অনেককে জেলে যেতে হয় এবং সপরিবারে বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের মিকার হতে হয়। সরকারের বিএনপি দমন অভিযান কিছুটা শিথিল হওয়াতে তারা আবার ঘর-বাড়িতে ফিরে আসতে শুরু করেছে। খালেদা জিয়া মুক্ত হওয়ার পর তাদের মধ্যে নতুন মনোবলের সঞ্চার হয়েছে। এখানে একটি প্রতিঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগের সাথে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এক্ষেত্রে সঙ্গত কারনেই আওয়ামী লীগের ভূমিকা হবে নেতিবাচক। আরেকটি এক-একারো সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা দলটির পক্ষে অসম্ভব নয়। খালেদাকে এজন্য আগে ভাগেই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
৩. ভোটের পুরোনো সমীকরণ বিএনপি + জামায়াত >> আওয়ামীলীগ + অন্যান্য এখনো অক্ষুন্ন রয়েছে। তার উপর দলটির গত বছরখানেকের দু:সময়ে জামায়াত যেভাবে তার পাশে এসে দাড়িয়েছে, তাতে সমীকণের প্রথম অংমে আরো বেশী ভার যুক্ত হয়েছে। সরকার এবং বিশেষ মহলের বর্তমানের সুবুদ্ধির উদয়ের পিছনে জামায়াতের একটি অবদান রয়েছে। দলটি বিপদের সময়ে ঝুকি নিয়েও বিএনপির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। যেহেতু তার সাংগঠনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি অক্ষুন্ন ছিল, তাই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করা ক্ষমতাশীনদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এখানেই শেষ নয়। আওয়ামীপন্থী পত্র-পত্রিকাও খবর ছেপেছে যে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা জরুরী অবস্থা শিথিল করার পর সারাদেশে যে সাংগঠনিক সফর করেছেন, সে সব সফরে বিএনপিকে গোছানোর কাজেও তারা তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন।
ফলে, বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর কৌশল আবারো বাস্তবায়ন শুরু হবে এবং বেশ জোরে-সোরে। বস্তুত: গত মাসখানেক ধরে মিডিয়া এক্ষেত্রে বেশী কিছুটা কাজ এগিয়েও নিয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

