somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাঁদরাতের অংক (গল্প) -- আমিনূল মোহায়মেন

০১ লা অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১১:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.

তীনা ও হামাদা তাদের ঘরে লেখা-পড়া করছিল। লেখা-পড়ার সময় তাদের অন্য সব কিছু নিষেধ। ফোন ধরা যাবে না, নিজেদের মধ্যে কথা-বার্তা বলা যাবে না বা মারামারি করা যাবে না, এমনকি বাথরুমেও যাওয়া যাবে না। বাথরুমে না যাওয়ার আইনটি অবশ্য কয়েকদিন আগে চালু হয়েছে। বাথরুমে যাবার নাম করে হামাদা বাথটবের ভিতর বে-ব্লেড খেলতো জানতে পেরে মা এই আইন জারী করেছেন।

ইন্টারকম বাজলো। তারা দুজন কান খাড়া করে থাকলো। মায়ের গলা শোনা গেল। তিনি ফোন ধরে বললেন, ‘আচ্ছা, পাঠিয়ে দিন।’ কয়েক মিনিটের মধ্যে কলিং বেল বাজলো। দরজা খোলার শব্দ হলো। তারপর আর কিছু শোনা গেল না। দুজন একে অপরের দিকে তাকালো। কি ঘটছে? বাসায় কেউ আসলে তো মায়ের গলা শোনা যাবে। হামাদা সহজে ভয় পায়। সে বললো, ‘আম্মুকে কেউ ধরে নিয়ে গেল নাকি।’ তীনারও যে বিষয়টি মনে হয় নি, তা নয়। কিন্তু সে নিজের ভয়টাকে প্রকাশ করলো না। বললো, ‘দূর গাধা, আম্মুকে ধরে নিয়ে যাবে কি করে। গেটে সিকিউরিটি আঙ্কেলরা আছে না!’ ভয়ে হোক আর কৌতুহলে হোক শেষ পর্যন্ত দুজন আর যার যার পড়ার টেবিলে বসে থাকতে পারলো না। বিড়ালের মত চুপি চুপি পায়ে তাদের ঘরের দরজায় এসে দরজাটা একটু ফাঁক করে উকি দিল। সেখান থেকে ড্রয়িং রুম দেখা যায়। মা সোফায় বসে আছেন। তাকে পিছন থেকে দেখা যাচ্ছে। উল্টো দিকে কেউ হয়তো আছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না। মা উঠে দাড়ালেন। তারা দুজন সড়াৎ করে দরজা থেকে সরে এসে নিজ নিজ টেবিলে বসে পড়লো।

দরজা বন্ধ করার শব্দ হলো। তার পর পরই মা এসে তাদের ঘরে ঢুকলেন। তারা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ার ভান করলো। তীনাকে দেখে মনে হবে সে খুব মনোযোগ দিয়ে বিজ্ঞানের হোমওয়ার্ক করছে। মাকে দেখেই বলতে গেল, ‘আম্মু টমেটো ফল না সবজি?’ কিন্তু তার আগেই মা ঘরের মাঝখানে এসে দাড়িয়েছেন। তার পিছনে তীনার বয়সী একটি মেয়ে। তীনা তাকে দেখে উঠে এগিয়ে গেল। বললো, ‘আরে চামেলি, তুমি কখন এলে?’ মা একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘ তুমি ওকে চেনো নাকি?’ তীনা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মা চলে যেতে যেতে বললেন, ‘ও আমাদের বাসায় এখন থেকে কাজ করবে।’

রাতে মেয়েটিকে তীনার ঘরের মেঝেতে ঘুমাতে দেয়া হলো। সবাই ঘুমিয়ে গেলেও তীনার ঘুম আসলো না। মেয়েটি ঘুমিয়ে গিয়েছিল। তীনা খাট থেকে নেমে তার মশারি উচু করে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো। সে জেগে উঠলে বললো, ‘এই তোমার নাম চামেলি না? আমার ফুপুদের বাসার কাছে কি একটা ফ্যাক্টরী আছে, সেখানে তোমরা থাকতে না? সেখানে একটা স্কুল ছিল, অনেক বড় তার মাঠ, সেখানে তুমি পড়তে না?’

সে বললো, ‘হ্যা।’

‘তুমি তো লেখাপড়া করতে। ঢাকায় কাজ করতে এসেছো কেন?’

সে জানালো যে তার বাবা যে পাটকলে চাকুরী করতেন, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বাবার চাকুরীও নেই। এখন তার কোন উপার্জন নেই। মা কয়েকটি বাসায় কাজ নিয়েছেন। তাতে সংসার চলছে না। চামেলী ভাই-বোনদের মধ্যে বড়। ঢাকায় কাজ করলে সে মাসে হাজার খানেক টাকা পাবে তাই দিয়ে সংসার খরচের কিছুটা হলেও চলবে।

তীনা কিছু না বলে নিজের বিছানায় উঠে এলো। মশারির মধ্যে ঢুকে ঠিকমত চারপাশ গুজে দিল। কিন্তু তার ঘুম আসলো না। বুকের মধ্যে কেমন ভার হয়ে থাকলো। অনেকক্ষণ পর ঘুম আসলেও খুব ভয়ের স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। খুবই খারাপ স্বপ্ন। তার আব্বু আম্মু কেউ নেই। সে তার বন্ধু মায়েশাদের বাসায় বুয়ার কাজ নিয়েছে। মায়েশা স্কুলে যাচ্ছে। সে মায়েশার ব্যাগ নিয়ে তার পিছন পিছন যাচ্ছে। তার গায়ে ময়লা ফ্রক। খালি পায়ে রাস্তার নুড়ি-পাথরে ব্যথা লাগছে। স্কুলের সামনে পৌঁছে দেখলো সব বন্ধুরা গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে। তাকে দেখে সকলে চিৎকার করে উঠলো, ‘এই তীনা, তুমি স্কুলে আসো না কেন?’

২.

সকালে উঠেই স্কুলে চলে যেতে হলো। তীনা তার সব কথাই মায়েশাকে বলে। তবে স্বপ্নের কথাটা সে তাকে বলতে পারলো না। বাসায় এসে আম্মুকে বলতে যাবে তখন দেখলো চামেলি সামনে। তার মনে হলো চামেলির সামনে কথাটা বলা আম্মু পছন্দ করবেন না।

রাতে বাবাকে কথাটি বলতে চাইলো সে। বাবা তখন তার স্টাডী রুমে। তীনা দেখলো আম্মুও সেখানে। আব্বু কম্পিউটারে কি যেন লিখছেন, আর আম্মু তার পিছনে দাড়িয়ে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তারা দুজন এতো সিরিয়াসভাবে কিছু করছেন যে তীনা যে ঘরে ঢুকলো, কেউ ফিরেও তাকালো না। তার মনে হলো, এ সময়ে তার সে ঘরে থাকাটা হয়তো তারা পছন্দ করবেন না। সে মন খারাপ করে চলে এলো।

৩.

প্রতিবার রোজার ঈদে তারা একটু আগে ভাগেই দাদাবাড়ী যায়। তাদের মাইক্রোবাসটি ঠাসা থাকে রঙচঙে শাড়ী ও জামা কাপড়ে। দাদাবাড়ীতে অনেক লোক আসে। তারা বাড়ীর সামনে লাইন দিয়ে দাড়ায়। দাদা নিজ হাতে তাদেরকে শাড়ী, লুঙ্গি, জামা-কাপড় - এসব দেন। অনেক হৈ হুল্লোড় হয়। চাচু ভিডিও করে। তীনা-হামাদা ও অন্যান্য ছোট ছেলেমেয়েদের তখন বাড়ীর বাইরে যাওযা নিষেধ। তারা ব্যালকনী থেকে দাড়িয়ে দেখে।

সেবার ঈদেও সকলে মিলে মাইক্রোবাসে করে তারা দাদাবাড়ীতে রওনা দিল। তীনা দেখলো এবার শাড়ী, জামা-কাপড় এসবের পরিমাণ খুব কম। সে একবার আব্বুকে কারণটা শুনতে যাচ্ছিল। কিন্তু তখন আম্মু জরুরী কি নিয়ে কথা শুরু করলেন। আম্মুর সব বিষয়ই জরুরী। তাই তিনি কথা শুরু করলে বাকী সকলের কথা বলা নিষেধ। তীনার আর কিছু বলা হলো না।

দাদাবাড়ীতে তারা ইফতারের বেশ আগেই পৌঁছে গেল। অন্যবার গিয়ে দেখা যায় লোকে লোকারণ্য। এবার তেমন কেউ নেই। সে দাদুকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘দাদু, কোন লোকজন আসে নি? তোমরা লোকদেরকে জামা-কাপড় দিবে না?’ দাদু বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। সবাই যেন কিছু একটা লুকাতে চাচ্ছে। তীনার খুব কান্না পেলো। এ রকম জানলে সে আসতোই না। সে একা একা বাসায় থাকতে পারতো না বটে, কিন্তু প্রয়োজনে তার বন্ধু মায়েশাদের বাসায় থাকতো। তাদের সাথে ঈদ করতো।

৪.

পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙতে বেশ দেরী হলো। ঘুম ভাঙলেও ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। কি হবে উঠে? কেউ তাকে কিছু বলবে না। সবাই তাকে এড়িয়ে চলবে। সে যেন এ বাড়ির কেউ নয়। কিন্তু বেশীক্ষণ শুয়ে থাকা হলো না। ঘরে কেউ একজন ঢুকলো। তার কপালে হাত রাখলো। আব্বুর হাত। সে চোখ না খুলে পারলো না। আব্বু খুব নরম গলায় বললেন, ‘উঠবে মা, তোমাকে নিয়ে বাইরে যেতে চাচ্ছিলাম।’

সে অভিমান ভুলে উঠে পড়লো। তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়লো।

তাদের মাইক্রোবাসটা যে যায়গাটিতে এসে থামলো সেখানে তীনা আগে কখনও আসেনি। ছোটখাটো বাজারের মত। পুরোপুরি টিন দিয়ে তৈরী কয়েকটা দোকান। সেগুলোর সমানে কাঠের বেঞ্চ পাতা। তারা দুজন মাইক্রোবাস থেকে বের হতেই দোকানগুলোর লোকজন তাদের চারপাশে জড়ো হয়ে গেলো। এক জন বললো, ‘স্যার, আপনাকে যে কি বলে দোয়া করবো। আমরা তো পথে বসতে গিয়েছিলাম। আপনি দোকানগুলো করে দিয়ে আমাদেরকে বাঁচালেন।’

কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা একজন এসে তীনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এই কি আমাদের তীনা মনি? তোমার কথা চামেলী অনেক বলেছে।’

বাবা বললেন, ‘উনি চামেলীর বাবা।’ তীনা তাকে সালাম দিল।

গাড়ীতে উঠে বাবা জানালেন, চামেলীকে আর কারো বাসায় কাজ করতে হবে না। তার বাবাকে একটি দোকান করে দেয়া হয়েছে। সে এখন স্কুলে যাবে। পাটকলে চাকুরী করতো - এ রকম আরো কয়েক জনকেও বাবা দোকান কিনে দিয়েছেন।

তীনার চোখে পানি চলে এসে গেলো। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘আব্বু তুমি খুব ভালো। তোমার নিজের টাকা থেকে লোককে এতোগুলো টাকা দিলে।’

বাবা বললেন, ‘এগুলো আমার টাকা নয় মা। তাদেরই টাকা, আমার কাছে জমা ছিল।’

তীনা অবাক হলো, ‘তুমি কি গরীব লোকদের টাকা নিজের কাছে নিয়ে রাখো?’

বাবা হেসে বললেন, ‘তা হবে কেন, আল্লাহ বলে দিয়েছেন, আমাদের জমানো টাকার শতকরা আড়াই ভাগ গরীবদের। তাই তো আমরা প্রতি বছর হিসাব করে তাদের টাকাটা তাদেরকে দিয়ে দিই।’

৫.

তীনা ও হামাদা বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে। ভালো রেজাল্ট করলে, আধা ঘন্টার মধ্যে খাবার খেতে পারলে, স্কুলের টিফিন ফেরত না আনলে এবং ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করলে মা তাদের দুজনকে পুরস্কার হিসাবে বিভিন্ন পরিমাণে টাকা দেন। তারা দুজনে সে টাকা জমিয়ে রাখে আর মাঝে মাঝে গুনে গুনে দেখে। তীনা দাদাবাড়ীতে ফিরে আসলে তারা দুজন হিসাব করতে বসলো তাদের জমানো টাকায় গরীবের ভাগ কতটুকু। অংকটা বেশ কঠিন, কেননা, স্কুলে তাদেরকে এখনও শতকরা হিসাব শেখানো হয়নি। অন্য সময় হলে স্কুলে না শেখানো অংক তারা কখনোই করতো না। কিন্তু এখন তার উপায় নেই। কেননা, তাদের টাকায় গরীবের ভাগটি ঈদের আগেই তারা দিয়ে দিতে চায়।

উৎসঃ Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১২:০০
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×