somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঠাকুর ও আইনস্টায়িন কথোপকথন

২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আলবার্ট আইনস্টায়িন এর দেখা তাদের এক সাধারণ বন্ধু, ডঃ মেন্ডেলের মাধ্যমে। বার্লিনের ক্যাপাথ নামক এক উপশহরে ১৯৩০ সালের ১৪ই জুলাই তাদের মধ্যে এই আলাপচারীতা হয়। সেটা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।

ক্যাপাথ, ১৪ই জুলাই, ১৯৩০

রবীন্দ্রনাথ - আজকেই আমি আলাপ করছিলাম ডঃ মেন্ডেলের সাথে এই নতুন গাণিতিক আবিস্কারসমুহের, যেগুলো আমাদের জানাচ্ছে ঐ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর রাজ্যে সম্ভাবনার খেলা; যার বৈশিষ্ট্যে অস্তিত্বের ঘটনাপ্রবাহ তো সম্পুর্নরুপে পূর্বনির্ধারিত নয়।

আইনস্টায়িন - যেসব তথ্য বিজ্ঞানকে এই মনোভঙ্গির দিকে ধাবিত করার প্রবণতা দেখাচ্ছে সেগুলো কার্যকারণকে একেবারে বিদায় জানাচ্ছে না।

রবীন্দ্রনাথ - সেটা না হতে পারে, তবুও এটা মনে হচ্ছে যেন কার্যকারণের ধারণা ঐ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানগুলোতে অনুপস্থিত, বরং যেন অন্য কোনো শক্তি তাদের নিয়েই গঠন করছে একটি সুবিন্যস্ত মহাবিশ্ব।

আইনস্টায়িন - সুবিন্যস্ততার স্বরূপটা যে কেমন সেটা উচ্চতর পর্যায়ে বোঝার চেষ্টা করে কেউ। সুবিন্যস্ততা আছে কেবল সেখানেই যেখানে বৃহৎ উপাদানগুলো একীভূত হয়ে পরিচালনা করে অস্তিত্ব, কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানগুলোয় তো এই সুবিন্যস্ততা প্রত্যক্ষ করা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ - কাজেই দ্বৈতভাব এই অস্তিত্বের গভীরে বিরাজমান, পরস্পরবিরোধী এই মুক্ত-তারণা আর নির্দেশিত-ইচ্ছা যেগুলো এই অস্তিত্বের উপর কাজ করে এবং উৎপত্তি ঘটায় বস্তুর সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের এক ধারাবাহিকতা।

আইনস্টায়িন - আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু বলবে না যে তারা পরস্পরবিরোধী। মেঘগুলোকে দূর হতে দেখতে এক মনে হলেও কাছাকাছি কিন্তু তাদের উচ্ছৃঙ্খল পানির বিন্দু ছাড়া কিছুই মনে হবে না।

রবীন্দ্রনাথ - ব্যক্তিবিশেষের মনস্তত্ত্বের ভেতর আমি এর অনুরূপ যেন খুঁজে পাই। আমাদের আবেগ এবং মনস্কামনা দুই’ই অবাধ্য, কিন্তু আমাদের স্বভাব এইসব উপাদানসমুহকে বশীভূত করে একটি প্রীতিকর সংমিশ্রণের জন্ম দেয়। পদার্থের ঐ জগতেও কি একই ব্যাপার ঘটে? মৌলের উপাদানসমুহ কি বিদ্রোহীসুলভ, স্বতন্ত্র তাড়ণায় প্রাণবন্ত? এবং পদার্থজগতের কি কোনো বিধিবিধান আছে যা এই উপাদানসমুহের উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাদেরকে সুবিন্যস্তভাবে সংগঠিত করে?

আইনস্টায়িন - মৌলের উপাদানসমুহও কিন্তু গণনাবাচক ক্রম বহির্ভূত নয়; রেডিয়াম এর উপাদানসমুহ সবসময় তাদের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস ধরে রাখবে, এখনও আর অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত, যেটা তারা সবসময় করে আসছে। তাহলে এই দাঁড়ালো যে, মৌলের উপাদানসমুহের মধ্যে গণনাবাচক ক্রম বিদ্যমান।

রবীন্দ্রনাথ - অন্যথায়, অস্তিত্বের ঘটনাপ্রবাহ খুব বেশী উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ত। দৈব ঘটনা এবং স্থিরীকরণ এর এই ক্রমাগত প্রীতিকর সংমিশ্রণই কোনোকিছুকে করে তোলে চিরন্তন আর প্রাণোচ্ছল।

আইনস্টায়িন - আমি বিশ্বাস করি যে যা কিছুই আমরা করি এবং যার জন্যই আমরা বেঁচে থাকি না কেন তাদের প্রত্যেকের পিছনেই রয়েছে কার্যকারণ; যদিও এটা ভাল, যে আমরা এটার ভেতর দিয়ে দেখতে পারি না।

রবীন্দ্রনাথ - মনুষ্যপ্রকৃতিতেও টানাপোড়েনের এই উপকরণটি বিদ্যমান, নগণ্য পরিসীমার ভেতর কিছু মুক্তি আর সেটুকুতেই আমাদের ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি। এটা অনেকটা ভারতীয় সঙ্গীতের মত, যেটা পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মত অতটা দৃঢ়ভাবে প্রোথিত নয়। আমাদের সঙ্গীত রচনাকারীরা একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রদান করেন, যেটা কিনা সুর ও ছন্দের এক সমাহার, এবং এর একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যেই বাদক বাজাতে বাজাতে সুর সৃষ্টি করতে পারেন। তাকে অবশ্য সেই নির্দিষ্ট ছন্দের প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করতে হবে, এবং এই প্রদত্ত নিয়মের অন্তর্গত থেকেই কেবল সে তার সঙ্গীতের অনুভূতিগুলোয় সেই তাৎক্ষনিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে।

(চলবে)

Excerpted from: A Tagore Reader, edited by Amiya Chakravarty.
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৪৭
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×