১
১৭৮৪ সাল। স্যাথ্যো দ্য ভাঁনসেন্। প্যারিসের পূর্ব তীরের ভাঁনসেন্ নামের এক ছোট শহরের এই পরিত্যক্ত প্রাসাদ। প্রায় এক শতাব্দী পুরানো এই রাজকীয় প্রাসাদের জৌলুস আর নেই। হারিয়ে গেছে প্রায়। তবে এখনও তার কোনে কোনে ঝলসে উঠা সমৃদ্ধতার ছায়া মনে করিয়ে দেয় চতুর্দশ লুই’য়ের আধিপত্য। আর বাহান্ন মিটার উঁচু ঐ মিনারগুলো বুঝি ষষ্ঠ ফিলিপের স্মৃতিচারণেই ব্যতিব্যস্ত। নাহ্! স্যাথ্যো দ্য ভাঁনসেন্ তার জৌলুস হারায়নি এখনো। টিকে আছে। ধারণ করে আছে। ধারণ করে আছে তার দেয়ালে দেয়ালে আটকে থাকা ঐতিহ্য। পাথুরে মেঝের শীতলতায় আত্মম্ভরি উষ্ণতা।
সন্ধ্যার মৃদুমন্দ হাওয়া। সেপ্টেম্বরের ফরাসী আর্দ্রতা আর তার খাঁজে খাঁজে লুটোপুটি খাওয়া ঈষদুষ্ণ ঘ্রাণ। পাথুরে প্রাসাদ ঘিরে জল-পরিখার চাঞ্চল্য। এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
প্রাসাদের ভেতরের ছোট্ট এক আবদ্ধ কামরার উঁচু ছাতের কোনায় লৌহ গরাদ ঘেরা এক চিলতে ফুটো দিয়ে সন্ধ্যার মুক্ত উষ্ণ-আর্দ্র হাওয়ার কিঞ্চিত উচ্ছিটাংশ বুক ভরে টেনে নিলেন এক প্রৌঢ়। চল্লিশোর্ধ শক্ত কঠিন মুখে এক আশ্চর্য নমনীয়তা দৃশ্যমান তার। শিথিল পোড় খাওয়া মুখখানিতে এক অজানা মিলনান্তক রেখা। কেমন শান্ত ধীর স্থির অবয়ব। কুঠুরীর বাইরের দেয়ালে আটকানো মশালে সদ্য জ্বালানো অগ্নিশিখা আর বাইরের অস্তমিত সূর্যের শেষ-কিরণ এক অদ্ভুতুরে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ছোট্ট এই আবদ্ধ কুঠুরীর ভেতর। অশরীরী ছায়ার খেলা। মৃদু কম্পন। যেন এক উন্মাতাল নৃত্য-শিখা। কাঁপছে। কাঁপছে কুঠুরীর ভেতরের ছোট্ট খাটিয়া ঘিরে, খড়কুটোর শুষ্কতা ছুঁয়ে, আর বড় বড় লৌহ গরাদের ধীর-স্থির গম্ভীর প্রতিচ্ছায়ায়।
এ এক বদ্ধ কুঠুরী। এক বন্দী কারাগার।
ঠাণ্ডা পাথুরে দেয়ালে হেলান দিয়ে খাটিয়ার উপর বসে থাকা এক বন্দী চুপচাপ দেখছে এইসব ছায়ার খেলা। চল্লিশোর্ধ এই প্রৌঢ়। সন্ধ্যালগ্নের এই ক্রান্তিকাল ভালোই লাগে তার। সে বেশ উপভোগ করে আসন্ন অন্ধকারের আগমনী বার্তার আবির্ভাবের এই ঘনঘটা। সে প্রতীক্ষায় থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের। সে অপেক্ষায় থাকে কিছুর। হাতের আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রাখা এক গুবরে পোকাকে সে অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ করছে। কিলবিলে ছোট ছোট পা দিয়ে তার খাটিয়ার উপর দিয়ে চলে যাওয়ার সময় সে চেপে ধরেছিলো বেচারা পোকার মৃদু-কঠিন খোলসখানি। ছায়ার খেলা পর্যবেক্ষণরত সেই প্রৌঢ় তারপর থেকেই ক্ষণে ক্ষণে আঙুল দিয়ে চাপ দিচ্ছে পোকাটার ক্ষুদ্র শরীরে। ছেড়ে দিচ্ছে ক্ষণিকের জন্য। আবার চেপে ধরছে। নির্বিকার এক প্রাণী সহ্য করছে এই ব্যাথাতুর খেলা। ছেড়ে দিলে কি পালাবে পোকাটা! ফিরে আসবে কি আবার ঐ ক্রুদ্ধ আঙুলের তলায়!
দূরে কোথাও ঘরঘর শব্দ। শেকলের ঝন্ঝন্ আর মৃদু কোলাহল। করিডোরের শেষ মাথার সদর দরজা খোলা হয়েছে। আলো ছায়ার মাঝেও প্রৌঢ়ের মুখের মৃদু হাসি বেশ স্পষ্টই বোঝা গেলো। এক আকাঙ্ক্ষিত বস্তর আগমনে তার শরীরে উষ্ণ রক্তপ্রবাহ ছল্কে উঠলো কি! নির্বিকার চিত্তে বসে থাকা সেই শান্ত সৌম্য দেহে এতটুকু চাঞ্চল্য দৃশ্যমান হলো না বটে, শুধু তার শক্ত আঙুলের ঐকতান এক নির্দোষ প্রাণীর উপর নির্বিকার অত্যাচার থামায়নি এখনো।
হ্যাঁ, অনেক বছর হয়ে গেলো। প্রায় সাত বছর। মহাকালের গর্ভে এক ছিটেফোঁটার তুল্য না হলেও সসীম মানবজীবনে সাতটি বছর অনেক বছর। স্যাথ্যো দ্য ভাঁনসেন্! সাতটি বছর তোমার এই অতল গহ্বরে আমি দিন কাটিয়েছি! পার করেছি অনেক ব্যাথাতুর রাত! আমাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছো তুমি! আমিও কুড়ে কুড়ে খেয়েছি তোমায়! তুমি আদিম হয়েছো আমার সাথেই! তুমিও উন্মত্ততায় সামিল হয়েছো আমার সাথেই। তুমিও আমার সাথেই পেয়েছো কিছু পরমসুখময় মুহূর্ত। তুমিও আমার সাথেই উপভোগ করেছো কিছু পাশবিক যৌনতা! তুমি চুপচাপ শুনেছো কিছু গগনবিদারী চিৎকার! কিছু ভয়ংকর শীৎকার! তুমি শুধু দর্শক ছিলে! তোমার এই পাথুরে দেয়াল শুধুই এক নীরব সাক্ষী!
আজ মনে পড়ছে। আজ মনে পড়ছে ষোল বছর আগের সেই দিনের কথা। ১৭৬৮। ইষ্টার সানডের দিন ছিলো সেটা। সেই রোজ কে’ল্য! আহ্! চমৎকৃত করেছিলো এই নারী তাকে! আ’কাইতে ওর নিজস্ব প্রাসাদে সেদিন প্রমত্ত হয়ে উঠেছিলো যুবক দোনাসিয়ন! দোনাসিয়ন আলফঁন্স ফ্রাঁন্সোয়া। হ্যাঁ, এটাই তার নাম। উপর্যুপরি দৈহিক অত্যাচারে সে কি ছিন্নভিন্ন করে দিতে চেয়েছিলো রোজ’কে? নাহ্! সে তো শুধু চেয়েছিলো আনন্দের উপরিপাতন! পর্বতসম ব্যাথার অনুভূতির আড়ালেই তো লুকিয়ে থাকে অপরিসীম সুখানুভূতি। রমরমা ভাব। ঐশ্বরিক আনন্দময় অবস্থা। সে কি ভুল চেয়েছিলো? সে কি অতিক্রম করেছিলো নৈতিকতার সীমারেখা? সে কি বিচরণ করছিলো অবাধ স্বেচ্ছাচারিতার সেই ভুবনে যেখানে ন্যায়-অন্যায় শুধুই এক ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। যেখানে নৈতিকতা-অনৈতিকতার মাঝে নেই কোন সীমারেখা। যেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক এই বিরাজমান জগতখানির মতই। এই জগতখানিই যদি অনৈতিকতা ধারণ করে থাকে, তবে সেটা অস্বাভাবিক হয় কিভাবে? মূল্যহীন এই জগতে সবকিছুই উদ্দেশ্যহীন। তীক্ষ্ণ ও গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী মানুষের জন্য এই জগত এক অসাধারণ অলাভজনক, অফলদ আর অনর্থক জায়গা ছাড়া আর কিছুই না। জগতের যাবতীয় মূল্যবোধ, আইন, নৈতিক-অনৈতিক সীমারেখা তাই হাস্যকর! একমাত্র বাস্তব হচ্ছে সুখানুভূতি আর ব্যাথার পারস্পরিক মিথোস্ক্রিয়া! এটাই পরম। এটাই সত্য। আর সুখানুভূতির উৎকর্ষতায় পৌঁছুতে গেলে এক ভয়ংকর নিপীড়ন পন্থার ব্যতিক্রম নেই! আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুখানুভূতির এক অনন্য মাধ্যম এই যৌনতা। হ্যাঁ, সে তো শুধুই দুঃখকে বিনাশ রাখতে চেয়েছিলো। চেয়েছিলো সুখের পর্বতারোহণ। তাহলে রোজ পালিয়ে গেলো কেন! অবাক হয়েছিলো যুবক দোনাসিয়ন।
করিডোরে রমণীয় পায়ের আওয়াজ। আশ্বস্ত হলেন প্রৌঢ়। ছেড়ে দিলেন আঙুলের ভাঁজে ধরে রাখা পোকাটাকে। কৌতূহল নিয়ে তাকালেন। দীর্ঘ অত্যাচারে অতিষ্ঠ বোবা প্রাণী তার সম্বিত ফিরে পায় নি সহসা। সময় নিচ্ছে। সময় নিচ্ছে। অবশেষে কিলবিলে ধীর গতিতে সে এগিয়ে গেলো খাটিয়ার প্রান্তে। পালাচ্ছে। কুটিল হাস্যরেখা প্রৌঢ়ের মুখে। একমাত্র মানবপ্রজাতিই ফিরে আসে ব্যাথার উৎসের দিকে। বার বার। পালিয়ে যায় বটে, তবে আবারও ফিরে আসতে চায়। অনিচ্ছায় বা সদিচ্ছায়। বড় অদ্ভুত এই প্রজাতি!
লৌহ কপাটের ওপাশে এবার এক বাস্তব নারী দেহ। কৌতূহল আর কামভাবে মিশ্র এক সহজ দৃষ্টিতে সেই মহা আকাঙ্ক্ষিত প্রতিমার দিকে আয়ত নয়নে তাকালেন প্রৌঢ়। হ্যাঁ, একমাত্র মানবপ্রজাতিই ফিরে আসে ব্যাথার উৎসের দিকে! বার বার!
পাশেই পরে থাকা চামড়ার ছোট চাবুকটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন তিনি।
২
দোনাসিয়ন আলফঁন্স ফ্রাঁন্সোয়া, মার্কি দ্য স্যড্ (Donatien Alphonse François, Marquis de Sade) এর জন্ম ২রা জুন ১৭৪০। প্যারিসের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেয়া এই ব্যক্তি ছিলেন এক বিপ্লবী এবং লেখক। স্যড্ এর বাবা, কোঁন্ট দ্য স্যড্, ছিলেন ফ্রান্সের এক অভিজাত বংশদ্ভুত ব্যক্তিত্ব যিনি দক্ষিণাঞ্চলের অগাধ সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তার মা’ও ছিলেন প্রিন্সেস দ্য ক্যোন্দ্য এর ব্যক্তিগত সহচরী। এ হেন সম্ভ্রান্ত বংশীয় এই লেখক লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটিকা, রাজনৈতিক নিবন্ধ ইত্যাদি। তার জীবদ্দশায় এইসব সৃষ্টিকর্মের কিছু কিছু তার নামেই প্রকাশিত হয়েছিলো। তবে কিছু কিছু রচনা নামহীনভাবে প্রকাশিত হলেও স্যড্ নিজেই তাদের রচয়িতা নন বলে জানিয়েছেন। তবে স্যড্ এর ব্যাপারে যে বিষয়টি মূল হয়ে ধরা দেবে সেটা হচ্ছে তার যৌন-কামনা উদ্রেককারী সৃষ্টিসমূহ। এই রচনাসমূহ একাধারে দার্শনিক নিবন্ধমূলক যার অশ্লীলতা বা অশ্লীলবৃত্তি এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। হিংস্রতা, অপরাধপ্রবণতা, ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে দুষ্ট তার রচনাসমূহ। পড়তে হয়েছে প্রভূত সমালোচনার মুখে। ছিলেন মানবজীবনে মুক্তি বা স্বাধীনতা চর্চার এক চরমমাত্রার প্রস্তাবক যেখানে নৈতিকতা, ধর্ম, আইন সবকিছুই অপাক্তেয়, অযৌক্তিক, উদ্ভট। তার জীবনযাত্রা প্রণালী ছিলো মুক্ত-স্বাধীন। ফ্রেঞ্চ ভাষায় এইরকম পন্থায় জীবন কাটানো ব্যক্তিত্বদের বলা হচ্ছে লিবাক্তিন (Libertine)। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে এই ফ্রেঞ্চ শব্দটির মানে দাঁড়াতো শুধুই মুক্ত-চিন্তার অধিকারী অথবা free thinker on religion। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে এই শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে এমন কিছু লোকদের দিকেই ইঙ্গিত করা শুরু করলো যাদের জীবনযাত্রা পদ্ধতি অনেকটাই চরিত্রহীন বা অনৈতিক। অসচ্চরিত্র। স্যড্ অবশ্য তার এই লিবাক্তিন জীবনপ্রণালীর জন্য তার বাবা কোঁন্ট দ্য স্যড্ আর চাচা আব্যে জ্যাক্ ফ্রাঁন্সোয়া দ্য স্যড্ এর কাছেই ঋণী, কারণ পিতৃতুল্য এই দুই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের কিঞ্চিত লিবাক্তিন জীবনযাত্রাই হয়তো বালক দোনাসিয়নের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। যাই হোক, দশ বছর বয়স্ক স্যড্ প্যারিসের ল্যুই-লে-গ্রঁ এর জু’সবি (Jesuit) বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন চারটি বছর। বলা হচ্ছে, এই জু’সবিতে থাকাকালীন সময়েই স্যড্ হয়তো চাবুক মারা (whipping) অথবা পায়ুকাম (sodomy) এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন, কারণ বাচ্চাদের নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর জন্য জু’সবির নিত্যনৈমিত্তিক শাস্তির ভেতর পশ্চাতভাগে প্রহার এক উল্লেখযোগ্য বিধান ছিলো। অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসী দার্শনিক জ্যঁ জ্যাক রুস্যো একসময় বলেছিলেন, তার জীবনের প্রথম যৌনকামনা উদ্রেককারী শিহরণ বা রোমাঞ্চ টের পেয়েছিলেন যখন তার অল্পবয়সী গৃহশিক্ষিকা তাকে তার পশ্চাৎভাগেই মৃদু প্রহার করতো। আর স্যড্ এর ক্ষেত্রে, সেই সময়, জু’সবির মত বালক বিদ্যালয়গুলোতে পায়ুকাম ছিলো বহুলপ্রচলিত এক ব্যাপার। তাই ল্যুই-লে-গ্রঁ এর জু’সবি বিদ্যালয়টিই এক বিদ্রোহী মনস্তত্ত্ব গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো বোঝা যাচ্ছে!
জু’সবি ছেড়ে দেয়ার পর স্যড্ মিলিটারী জীবনপ্রক্রমের দিকেই ধাবিত হন। Seven Years' War চলাকালীন সময়ে তিনি ড্রাগন রেজিমেন্টের সেনাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৭৬৩ সালে যুদ্ধফেরত স্যড্ প্যারিসের রঙীনজগতে আত্মপ্রকাশ করলেন। পারিসের থিয়েটার, কেতাদুরস্ত নাট্যশালা, রঙ্গমঞ্চগুলোতে ছিলো তার অবাধ বিচরণ। শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীদের সাথে নিয়মিতই অনুভূতির দোলাচলে দুলতেন। সুদর্শন স্যড্! আর সেটার যথোপযুক্ত সদ্ব্যবহারই তিনি করেছেন। ছেলের এই উড়নচণ্ডী অনৈতিক জীবনের সমাপ্তি টানতে পিতা আরেক উচ্চবংশীয় মন্থ্রাই পরিবারের গ্রঁন্যে পেলাজি মন্থ্রাই’কে পুত্রবধূ করে তুলে আনেন। স্যড্ যদিও ততদিনে এক ধনী ম্যাজিস্ট্রেটের কন্যার সাথে সম্পর্কযুক্ত, তিনি মেনে নিলেন পিতার ইচ্ছা। এই গ্রঁন্যে পেলাজি ছিলেন এক অসামান্য ধৈর্যশীল নারী। স্যড্ এর সাথেই পরবর্তী সাতাশটি বছর তিনি কাটান। সাতাশটি বছর এক লিবাক্তিনের সাথে! অষ্টাদশ শতাব্দীর সত্তর আর আশির দশক এই নারীকে সইতে হয়েছে স্বামীর আদালতের বিচারাধীন প্রক্রিয়া। ঘাত-প্রতিঘাত। যাই হোক, ১৭৬৬ সালেই পোঁ’বন্স (Provence) এর লা’কোষ্ট প্রাসাদে স্যড্ গড়ে তোলেন এক ব্যক্তিগত থিয়েটার। আর তার পরের বছরেই তার পিতার মৃত্য ঘটে।
এই লা’কোষ্ট প্রাসাদেই নিত্য আনাগোনা ছিলো অল্পবয়সী গণিকাদের। স্যড্ বেছে নিলেন কোটনাবৃত্তি! প্রাসাদে নর-নারী ভৃত্যরাও ছিলো। মুক্ত-স্বাধীন জীবন? নৈতিকতা বর্জিত? কে জানে! সব সংজ্ঞা সব জায়গায় খাটে না বোধহয়! তবে এই বারাঙ্গনাদের ভেতর থেকেই এক সময় আপত্তি উঠলো। আপত্তি উঠলো অশোভন আচরণের! আপত্তি উঠলো ভয়ংকর সব পন্থা অবলম্বনের! বিস্তারিত বিবৃতি শোনার পর নিরাপত্তারক্ষীরা তাই স্যড্ কে প্রথমে নির্বাসন দিলো স্যাথ্যো দ্য স্যমিউখ (যেটা তখন এক কারাগার) আর তারপর ১৭৬৮ সালে স্যাথ্যো দ্য লা’কোষ্ট ।
এই ১৭৬৮ সালেরই এক ঈষ্টার সানডেতে আল’জাস (Alsace) থেকে আগত হোজ্ কে’ল্য (Rose Keller) নামক ৩৬ বছরের এক নারী পলায়ন করে স্যাথ্যো দ্য আ’কাই (chateau de Arcueil) থেকে। অভিযোগ তোলে স্যড্ এর বিরুদ্ধে। রোজ গণিকা ছিলো কিনা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয় এখানে, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার অভিযোগের ধরণ। রোজ অভিযোগ আনে যে স্যড্ তাকে তার আ’কাই এর গৃহে বন্দী করে রেখেছিলো আর উপুর্যপুরি শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন করেছিলো। অবতারণা করেছিলো ধর্মদ্রোহিতার আর ভ্রষ্টাচারের। অত্যধিক নির্মমতার মাঝে আনন্দলাভের প্রচেষ্টায় ছিলো। ছিলো ধর্ষকামী। আর তাই সে পলায়নে বাধ্য হয়। স্যড্ কে সম্মুখীন হতে হয় কারাগারের বদ্ধ জীবনে। এর মাঝেই চলেছে তার লেখালেখি আর sadist কর্মকাণ্ড। হ্যাঁ, sadism – এই শব্দটা স্যড্ (Sade) এর নাম থেকেই এসেছে, যার মানে দাঁড়ায় ‘যৌনসঙ্গীকে পীড়ন করে যৌন সুখলাভ’। তার জীবনের প্রায় ৩২টি বছর কেটেছে বিভিন্ন কারাগার ও উন্মাদ-আশ্রমে, যার মধ্যে এগার বছর প্যারিসে (যার দশ বছর আবার বাস্তিলে, আর এক মাস কনসিয়ার্জাভি’তে (Conciergerie), দুই বছর এক দূর্গে, এক বছর মেদ্লেনেট (Madelonnettes), তিন বছর বিসেত্খ (Bicêtre) আর তেরো বছর স্যা’গন্ত্ (Charenton) আশ্রমে। কি অভূতপূর্ব প্রাণশক্তি! এর মাঝেই বিভিন্ন কারাগার থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তবে ১৭৭৭ সালের শেষদিকে, নিজের অসুস্থ মা’কে দেখতে যাওয়ার সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ছলচাতুরীতে ধরা পড়েন তিনি। যদিও তার মা কিছুদিন আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন বটে, তবে অসুস্থ মা’কে দেখতে যাওয়ার এই অভিপ্রায়ে বন্দী স্যড্ পরবর্তী সাতটি বছর কাটান প্যারিসের পূর্ব তীরের ভাঁনসেন্ নামের এক ছোট শহরের স্যাথ্যো দ্য ভাঁনসেন্ নামক এক পরিত্যক্ত প্রাসাদে। ১৮০১ খ্রীষ্টাব্দে স্বয়ং নেপোলিয়ন বোনাপার্ট স্যড্ এর Justine আর Juliette নামক দুটি বইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বইদুটির রচয়িতাকে ধরার জন্য গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। ফলশ্রুতিতে প্রথমে সেন্ট পিলাজি কারাগার এবং তারপর বিসেত্খ (Bicêtre) এর নির্মম দূর্গে তাকে নির্বাসন দেয়া হয়। ১৮০৩ সালে তাকে উন্মাদ (insane) ঘোষণা করা হয় এবং নির্বাসন দেয়া হয় স্যা’গন্ত্ (Charenton) আশ্রমে। এখানেই জনৈক কারারক্ষীর তেরো বছর বয়সী মেয়ে মেদেলিন লুক্লার্ক এর সাথে তিনি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৮১৪ সাল, অর্থাৎ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সম্পর্ক টিকে ছিলো। তার মৃত্যু পরবর্তী কার্যসম্পাদনের জন্য তিনি তার উইলে বলে গিয়েছিলেন যে তার মৃতদেহকে যেন কোন অজুহাতেই খোলা না হয় আর মারা যাওয়ার পরবর্তী দুই দিন যেন তার মৃতদেহকে ছোঁয়া না হয়। কেন? যাই হোক, করোটির পরীক্ষা দ্বারা তার চরিত্র বিশ্লেষণের জন্য (Phrenology) মরদেহ থেকে তার মস্তিষ্ক অবশ্য পরবর্তীতে খুলে নেয়া হয়। অতঃপর তার পুত্র তার সব অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলে যেখানে লা জর্নে দ্য ফ্ল’বেল (Les Journées de Florbelle) নামক এক সংকলন ছিলো বলে ধারণা করা হয়।
Sade এর উল্লেখযোগ্য রচনাসমগ্রের মধ্যে আছে ১৮৮২ সালের Dialogue Between a Priest and a Dying Man, ১৭৮৫ সালের The 120 Days of Sodom, or the School of Licentiousness, ১৭৮৭ সালের Justine, ১৭৯৫ সালের Philosophy in the Bedroom, ১৭৯৭-১৮০১ সালের Juliette, ১৮০০ সালের The Crimes of Love ইত্যাদি।
মোটামুটিভাবে এটাই এক দোনাসিয়ন আলফঁন্স ফ্রাঁন্সোয়া, মার্কি দ্য স্যড্!
৩
এবার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কেন?
কেন এই আচরণ? আর কেনই বা এই ধর্ষকামী অভিপ্রায়?
মানবচরিত এক অমীমাংসিত সত্তা। এটা কি কবিতার মত? এটাকে পুরোপুরিভাবে আদৌ বোঝা যায় কি কখনও?
সিমন দ্য ব্যুভ্ওয়া (Simone de Beauvoir) তার রচনা Must we burn Sade? এ উল্লেখ করছেন যে তিনি স্যড্ এর লেখনীতে খুঁজে পেয়েছেন মুক্তি (freedom ) দর্শনের মৌলিক আলামত, existentialism এর প্রায় দেড়শত বছর আগেই। তার রচনা The Marquis de Sade এ ব্যুভ্ওয়া বলছেন,
‘At first glance, it seems paradoxical that this man who was so self-centered should be given such prominence to theories which deny any significance to individual peculiarities. He asks that we make a great effort to understand the human heart better. He tries to explore its strangest aspects. He cries out, “What an enigma is man!” He boasts, “You know that no one analyzes things as I do”…...’
ব্যুভ্ওয়া আরও বলছেন,
‘It is probably not so easy to be a monster as some people seem to think. Sade, though fascinated by his own personal mystery, was also frightened by it. Instead of expressing himself, he wanted to defend himself. The words he puts into Blamont’s mouth (Blamont - Aline et Valcour উপন্যাসের চরিত্র) are a confession: “I have supported my deviations, I have uprooted, I have destroyed everything in my heart that might have interfered with my pleasure.” The first of these tasks of liberation was, as he repeated countless times, to triumph over remorse ......’
হ্যাঁ, দুঃখকে জয়! ‘Extreme in everything’! একত্মবাদীদের (deist) আপোস মেনে নিতে পারেননি স্যড্।
স্যড্ এর রচনাসমূহে মনস্তাত্তিক কার্যকলাপে যৌনতার প্রেষণা যে এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি সেটাও প্রতিভাত হয়, আর যা কিনা সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের সাইকোএ্যানালাইসিস’এর এক পূর্বসূচক। এক্ষেত্রেও স্যড্ অনন্য। স্যড্ এর প্রেষণা বা প্রবৃত্তি (motive) আবার মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দেয় যে মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা অস্তিত্বহীন, আর এই মনুষ্যজীবন এক উদ্দেশ্যহীন, গন্তব্যহীন, লক্ষ্যহীন যার কোন অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নেই, কোন মানে নাই, কোন স্বকীয়তা নেই। স্যড্ এর এই দর্শন বা কর্মকাণ্ড, বা আমরা এটাকে যাই বলি না কেন, তাই Nihilism এরও এক পূর্বসূচক বলতে চাইলে খুব ভুল হবে কি? বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসেও তাই স্যড্ কে নিয়ে গবেষণা ও তর্ক-বিতর্ক চলেছে। সেখানে অংশ নিয়েছেন রোল্যন্ বার্থ (Roland Barthes), জ্যাঁক দেরিদা (Jacques Derrida) আর মিশেল ফুকো (Michel Foucault) এর মত দার্শনিকরাও। পরাবাস্তববাদে এসেও খুঁজে পাই স্যড্ এর অপরিসীম গুরুত্ব। যে পরাবাস্তববাদ (surrealism) সর্বপ্রকার আইন (rule) থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে সব নিয়ম ভঙ্গ করতে চেয়েছিলো, তারই ইশতিহারে উল্লেখ পাই (Manifesto of Surrealism 1924) - “Sade is surrealist in sadism”। এমনকি স্যড্ এর উপন্যাস Justine এর কিছু অংশও ছাপা হয় ‘লা স্যুরিয়ালিজ্মা ও সার্বিস দ্য লা হ্যভ্লিউসিয়ন’ (Le Surréalisme au service de la revolution) অংশে। স্যড্ কে সম্মান দেখিয়েছেন তাই গিয়োম এ্যাপোলিনেয়া (Guillaume Apollinaire) আর প্যল এ্যাল্ওয়া (Paul Éluard) এর মত পরাবাস্তববাদীরা। মঁ’গ্যে (Man Ray) এর মতন পরাবাস্তব শিল্পীরা স্যড্’কে দেখছেন ‘মুক্তির প্রতীক’ হিসেবে। সালভাদর দালিও তার ১৯৩০ সালের পরাবাস্তব চলচ্চিত্র L'Age d'or এ স্যড্ এর কর্মের সূত্র টেনেছেন। তবে স্যড্ এর কর্মে নারীদের ভূমিকাকে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক এঞ্জেলা কার্টার একটু অন্যভাবেই দেখছেন। স্যড্ এর লেখনীতে নারীরা যদিও কার্যসাধনের হাতিয়ার বলেই বিবেচিত হবে, তবে এঞ্জেলা তার The Sadeian Woman: And the Ideology of Pornography বইয়ে বলছেন যে স্যড্ এক ‘moral pornographer’ যে কিনা নারীদের স্বার্থেই কাজ করছে, creates spaces for women!
যাই হোক, আপাততঃ অন্তত এতটুকুই বলা যায়, Sade presents us with a vivid picture of the man of reason in pursuit of pleasure by means of reason used as a weapon or tool of domination।
শেষ করছি কিঞ্চিত দ্বিধায়। ‘যৌনসঙ্গীকে পীড়ন করে যৌন সুখলাভ’ – এই Sadism এর জনক মার্কি দ্য স্যড্ কি জানতেন প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত মল্লনাগ বাৎস্যায়ন রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের একটি প্রামাণ্য মানব যৌনাচার সংক্রান্ত গ্রন্থের কথা? কামসূত্র! কিছু কিছু ভারতীয় দার্শনিকদের মতানুযায়ী, পুরুষার্থ নামক জীবনের চারটি উদ্দেশ্যের ভেতর ‘কাম বা নান্দনিক ও যৌন আনন্দ লাভ’ একটি পন্থা। অন্য তিনটি হচ্ছে ‘ধর্ম: ধার্মিক জীবন’, ‘অর্থ: আর্থিক সমৃদ্ধি’ আর ‘মোক্ষ: আধ্যাত্মিক মুক্তি’। ধর্ম, অর্থ ও কাম দৈনন্দিন জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু মোক্ষ জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভ। যাই হোক, হাজার বছর আগের এই কামসূত্র গ্রন্থের কিছু স্তবক পাঠ করা যাক,
Kamasutra [২.৭.১৭ – ২.৭.২১]
১৭ - Shrieking is a sound like a bamboo splitting, and
১৮ - Sobbing sounds like a berry falling into water.
১৯ - Always, if a man tries to force his kisses and so forth on her, she moans and does the very same thing back to him.
২০ - When a man in the throes of passion slaps a woman repeatedly, she uses words like “Stop!” or “Let me go!” or “Enough!” or “Mother!” and utters screams mixed with laboured breathing, panting, crying, and groaning. As passion nears its end, he beats her between the legs and on the sides, extremely quickly, until the climax.
২১ - At this, she begins to babble, fast, like a partridge or a goose.
হুম! Sadism এর জনক মার্কি দ্য স্যড্ কি ভাবতেন এই কথাগুলো পড়ে? নাকি মার্কি ঠিক সেই কর্মগুলোই করেছেন যা যুগ-যুগান্তর ধরেই মনুষ্য-প্রজাতির মনোজগতে বিদ্যমান কিন্তু অনুচ্চার্য। অস্পৃশ্য। নিষিদ্ধ। নির্জ্ঞান মনের প্রেষণা? সমাজ-সংস্কৃতির প্রভাবে ‘সভ্য’ ও ‘মার্জিত’ রুচিবোধের পীড়নে জান্তব আদিম সহজপ্রকৃতির আস্ফালন? দোনাসিয়ন আলফঁন্স ফ্রাঁন্সোয়া, মার্কি দ্য স্যড্ এদিক থেকে এক ব্যতিক্রমী হয়তো! তাঁর সেই স্বচ্ছ আদিম সহজপ্রকৃতি কি ছিলো নিশ্চুপ? নিস্তরঙ্গ? প্রশান্ত? তিনি শুধু তার জীবনে উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন বোধ করি!
কী বিচিত্র এই জগত!
________________________________
সংস্করণ প্রকাশিত - জোনাকরোড (২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

