somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অবসান

২০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ২:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ওরা বলে, জীবনের কোন এক ক্ষণে, কোন এক অবিনাশী মুহূর্তে, কোন এক অশনি বাতাসের দোলায়, তোমার হারিয়ে যাওয়া সব দিনগুলো তোমায় আলতো পরশ বুলিয়ে যাবে, শেষবারের মতন।

মাটির চুলার দিন ফুরিয়েছে আজ। লঘুচাপের বায়ুবৎ পদার্থের ইন্ধনে খাদ্যদ্রব্য পাক হয় ঠিকই, কিন্তু এর উপাদানসমূহ মাটির মমতা হারায়। হাড়ির উপরের ব্যতিব্যস্ত বাষ্প মৃত্তিকার স্পর্শ বোঝেনা, ফলে কী এক উচ্চাকাঙ্খায় ওরা ঊর্ধ্বমুখী হয়, অতঃপর সেমিপাকা ঘরের নিচু ছাতের আবদ্ধ কামরায় ছটফট হতাশায় ভোগে পরিশেষে; হয় নৈরাশ্যবাদী। ঠিক এমনই এক দিনে, মধ্যাহ্নের ঠিক আগে, যখন উপজেলার এই অনগ্রসর কিন্তু উন্নয়নশীলতার বিষমবাক্যে পরিপুষ্ট জনপদ কিঞ্চিত ক্লান্তিতে ভোগে, ক্ষণিকের জন্য থেমে যায় সবকিছু, থেমে যায় পাশের ঐ সাইকেলরিক্সা মেরামতের টুঙটাং, পাশের উত্তরণশালা কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় ভোজ্য-আহার্যের হাঁকডাক, গলিপথে শুধু শোনা যায় কোন এক অজানা পথিকের পা টেনে চলা, তখন বদ্ধ ঘরের এই কুটিরে বসে তুমি শুনবে ভাদ্রের হাহাকার, বসন্তের কোকিল কুহক। পৌষের চাদরখানি জড়িয়ে নিতে নিতে তুমি বৃথা অপেক্ষায় থাকো শ্রাবণধারার। কার্তিক আজকাল ভুলে গেছে ধানের গন্ধ, কারণ জৈষ্ঠের তাপদাহে পিষ্ট হয়ে গেছে আষাঢ়। বৈশাখের লু হাওয়া তাই তোমার কর্ণকুহরে ফিসফিসিয়ে বলে যায় কিছু, আর তুমি বুঝে যাও শরতের ফুল তোমার এই নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের সামর্থ্যের বাইরে। তুমি তাই শুধু অপেক্ষায় থাকো সাদামাঠা মধ্যাহ্ন আহারের। তোমার ঘরগৃহস্থালির তত্ত্বাবধায়ক কেউ বসিয়ে গেছে শর্করা ও শ্বেতসার, সাথে থাকতে পারে কিছু আমিষ ও স্নেহ জাতীয় বিলাসিতা।

এক পলকে কাঠের জানালার শার্সির উপর বসে থাকা এক কাকের শব্দহীন বাকবিমুখতা দেখে তোমার মনে পড়ছে ওদের কথা। হ্যাঁ, ওরা অনেক কিছুই বলে। ওরা শব্দ নিয়ে খেলে। বাক্য গঠন করে। ওগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয় অর্থপূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা। ব্যক্ত করে অভিপ্রায়। ব্যাখ্যা করে জীবন। মনন। মানস। অথচ ওরা শুনতে পায়না শব্দদের অট্টহাসি। বিদ্রূপ উপহাস। পার্থিব ধ্বনিসমষ্টির তালে ওরা খেলতে চায় অতীন্দ্রিয় খেলা। ব্যাকরণ দিয়ে বুঝতে চায় প্রকরণ।

নির্বোধ। আত্মতুষ্ট।
ওরা ব্যাখ্যা করে মৃত্যু।
অতঃপর মনোযোগী হয় জীবনের প্রতি।
নির্বোধ। পথভ্রষ্ট।

আজ সকাল হতেই তাই ক্ষণে ক্ষণে যখন ভেসে উঠছিলো কিছু, ভেসে উঠছিলো সাদাকালোরঙিন কিছু অর্থহীন মুহূর্ত, ভেসে উঠছিলো ছোট্ট আঙুল, রাঙা ঠোঁট, চুড়ির শব্দ, বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, তখন তুমি দ্বিধাচিত্তে কলম নাড়াচাড়া করছিলে, ভাবছিলে বন্দী করবে চূড়ান্ত মুহূর্ত। যে লেখা কেউ লিখে যেতে পারেনি। যে লেখা লেখার আগেই থেমে যায় লেখক। যে লেখার নেই কোন সর্বশেষ পূর্ণযতি, বিরামচিহ্ন...

খুব গভীর মগ্ন নিমগ্ন নিবিষ্ট তন্ময়চিত্তে স্থির হলে তুমি বুঝে যাবে অনেককিছু। তোমার বস্তুগত শরীর খোলস পালটাবে, ঝেড়ে ফেলবে অবাঞ্ছিত অনাবশ্যক অস্থিরতা। তুমি শুনবে মাকড়সার হেঁটে যাওয়া শব্দ, দলছাড়া পিঁপড়ের আর্তনাদ। শুনবে হাজারবছর আগের কোন এক শিশুর ক্রন্দন, টের পাবে জননী কোলের উষ্ণতা। কোন এক মরমী পর্দার ফাঁক গলে তুমি দেখবে অনমনীয় প্রোথিত ভবিতব্য, উত্তরকাল। তখন ঘটনাপ্রবাহের এই মর্মবাণী শব্দের ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করতে গেলেই তুমি টের পাবে তোমায় টেনে ধরেছে অদৃশ্য লজ্জিত তন্তু। করুণাপ্রত্যাশী। তোমায় তখন বুঝতে হবে মহাকাল তোমার কাছে সমর্পিত করেছে এক আধিদৈবিক রহস্য। সর্বজনবিদিত মূল্যহীন করতে নেই ওটা। আর তখনই তুমি চুপ হয়ে যাবে, তোমার হাত হতে খসে পড়বে গ্রাফাইট কিংবা কালির দোয়াত। শব্দগুলোকে ছুড়ে ফেলবে তুমি। হয়ে যাবে নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। বলবেনা কোন কথা, শুধু দেখে যাবে, হবে এক নির্লিপ্ত দর্শক। বুঝে যাবে, তোমার দেহসাধনার ত্রুটি সহ্য করে না অচিনপাখী। অন্যথায় মৃদু হাওয়ায় শুধু দুলবে শূন্য খাঁচা।

এখন তুমি স্থির। শান্ত। সুসমাহিত। প্রসন্নচেতা নির্বিকার।
সৌম্য তুমি শুধু অপেক্ষায়।

সময়ের কলরব। বাল্যকালে কোন এক মেঠোপথ দিয়ে সন্ধ্যালগ্নের জোনাকপোকা আর পিতার সাথে হেঁটে যাওয়ার সময় তোমার শুধু মনে পড়ে ছোট্ট তুমি বারবার এসে দাঁড়াতে দীর্ঘকায় মানুষটির সামনে। বাবা...কোলে...কোলে...পা ব্যথা...আর পারি না। মনে পড়ছে, তার মৃদু উষ্ণ হাসি। মনে পড়ছে, তিনি তোমায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন। মনে পড়ছে, তোমার সন্তান। ছোট্ট আঙুল। রাঙা ঠোঁট। এই মুহূর্ত-অনুভূতিগুলোর অস্তিত্ব কোথায় আজ, এই ক্ষণে? তুমি তাই ভাবতে থাকো আর সময়-গুঞ্জরনের ফাঁকে শত-হাজার-কোটি সংখ্যাতীত শব্দ-দৃশ্যাবলী ছাপিয়ে শুনতে পাও এক নিঃশব্দ পদশব্দ।

তোমার ঠোঁটের কোনে মৃদুহাসি, তাকিয়ে থাকো দোয়াত ছলকে পড়া কালির দিকে। তুমি অকৃতজ্ঞ নও। তুমি প্রকাশ করোনি। তুমি চেপে গেছো মায়ার খেলা। তুমি হৈহৈরৈরৈ দেখাওনি বায়স্কোপ।

ভাতের মাড় উপচে পড়ছে।
উন্নয়নশীলতার বিষমবাক্যে পরিপুষ্ট জনপদের মধ্যাহ্ন বিরতি সমাপ্ত। কোন এক শালিকের চোখের ক্ষণিক বিষণ্ণতাকে মৃতের শোকাবহতা ভেবে ভুল কোরো না। বৃষ্টিকে ভেবোনা শোকের ক্রন্দন। তুমি অকৃতজ্ঞ না হলেও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তোমার কাছে ঋণী নয়।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১২:২০
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×