somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ডয়চে ভেলে সেরা বাংলা ব্লগ প্রতিযোগিতা। ইমন জুবায়ের।
বাংলা ব্লগ নিঃসন্দেহে এই প্রগতিশীল আধুনিক যুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। আমরা ঠিক কীভাবে এই প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছি, করছি, কিংবা করবো এটা সময় বলেছে, বলছে, এবং বলবে। নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাপ্রবাহ, ডায়েরী-আলাপ, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যের চর্চা, সামাজিকতা বৃদ্ধি ইত্যাদি ছাড়াও বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার ছায়াপুষ্ট জীবন-দর্শনগুলো আঁকড়ে ধরার, সযত্নে লালন করার প্রচেষ্টার কমতি নেই ব্লগারদের মাঝে। আধুনিক এই যান্ত্রিক সভ্যতায় একদণ্ড থেমে ভাবার মতন অবকাশ, প্রখর রোদের মাঝে এক চিলতে ছায়া খোঁজার, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার তৈরীকৃত খোলসের মাধ্যমে, সাহিত্য-বর্মের সাহায্যে উপেক্ষিত যাপিত জীবনের যাবতীয় কায়-ক্লেশের তীক্ষ্ণ নির্যাতন খোঁচাখুঁচি থেকে বাঁচার জায়গা, ক্ষণিকের তরে শান্ত হওয়ার জায়গা, অন্য কোথাও হারানোর তেপান্তর।

গত দুইবছর ধরে ইমন জুবায়ের এই ব্লগীয় প্রেক্ষাপটে শ্রম দিয়েছেন। বিমূর্ত জ্ঞানগুলো বাংলা ব্লগের ডিজিটাল ছাঁচে তুলে এনেছেন, এবং আনছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার যথোপযুক্ত মূল্যায়ন বোধকরি কষ্টসাপেক্ষ, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অসম্ভব। তবুও ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু মুহূর্ত এবং স্বীকৃতি হয়তো এই অর্থহীন (!) জীবনে এনে দিতে পারে কিছু অর্থপূর্ণ আনন্দ।

দ্য ববস ডয়চে ভেলে ব্লগ প্রতিযোগিতায় বাংলা ভাষার ব্লগ হিসেবে সেরা দশ জনের মধ্যে তাই স্বভাবিকভাবেই রয়েছেন ইমন জুবায়ের । সামহোয়ারইন ব্লগ হতে মনোনিত একমাত্র ব্লগার তিনি। যথার্থভাবেই তাই তাঁকে বলা হচ্ছে writer, songwriter and versatile blogger. This blog examines many issues including history, science, societal topics.

দশ জনের মধ্যে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে সেরা বাংলা ব্লগ। ভোট গ্রহন শেষ হবে এপ্রিলের ১১ তারিখ। ফেসবুক/টুইটারের সহায়তায় সেরা বাংলা ব্লগ নির্বাচনের জন্য ভোট দেয়া যাবে। এই ভোট শুধু একবার নয়, ২৪ঘন্টা পরপর দেয়া যাবে।

ইমন জুবায়েরকে ভোট দেয়ার ওয়েবপেজটির ঠিকানা

http://thebobs.dw-world.de/en/nominations/?cat=14


শুভকামনা, সবাইকে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29352612 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29352612 2011-03-28 13:33:53
ম্রো কথন


গ্রামটিতে আমি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে আছি, অন্তত ওরকম কিছুই একটা হবে হয়তো। নোটবুকটা বন্ধ ছিলো, পেনসিলের শিসটাও ভাঙা ছিলো। আজ একজন ম্রো’র দেয়া ছোরা দিয়ে কাঠের আস্তরণ ফেলে গ্রাফাইট বের করেছি। সাদা কাগজে লিখছি এখন। ভাবছি, আর লিখছি। না ভেবেও দেখছি, শব্দগুলো কাগজে আটকে যাচ্ছে। জীবন থেকে নেয়া কিছু কথা। এখন রাত হয়ে এসেছে অনেক। শীত পড়ছে। ঠাণ্ডা লাগছে। কাপড় জড়িয়ে ধরি। তুষগুলো হাতড়ে হাতড়ে জড়ো করি শরীরের চারপাশে, চাদরের নিচে। ছোট্ট ঘরটিতে অনেক কথা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমি দেখছি ওদের।

পাহাড়গুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গাগুলো কেমন অদ্ভুত কুয়াশায় ছেয়ে আছে। ছোট্ট একটা নদী আছে পাশেই, পাহাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে কেমন এঁকেবেঁকে গেছে। আকাশে চাঁদ লুকোচুরি খেলছে এখন মেঘের আড়ালে। এক পলকে আলোছায়ার এই ভ্যালিতে তাকিয়ে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো হঠাৎ। রাতের ঐ নাচের শব্দ খেলছে মস্তিষ্কে। দ্রিম। দ্রিম। দ্রুম। দ্রুম। ছেলেরা নাচছিলো। মেয়েরা নাচছিলো। ওদের গাল, ঠোঁট, কপাল কেমন লাল রঙে রাঙানো। দ্রিম। দ্রিম। দ্রুম। দ্রুম। রিদমিক। নেশা ধরানো। ওরা সবাই কুমারী। যারা কুমারী, তারাই শুধু নাচতে পারে।

আজ একটু বেশীই খেয়েছি বোধহয়। ওদের মদগুলো, খুব দারুণ। একেকদিন একেকরকম স্বাদ। আজকেরটা খেয়ে প্রথমে বমি করে দিয়েছিলাম। একটু পরে ওটাই বেশী ভালো লাগছিলো। এখন মনে হচ্ছে, একটু কম হলেই ভালো হোতো বোধহয়। চিপরা, লাইম, বুকিত আমায় ডুবিয়েছে আজ।

ঝিমঝিম মস্তিষ্কে হঠাৎ মনে হচ্ছে, সময় ফুরোচ্ছে। মনে হচ্ছে, মুহূর্ত অনুভূতিগুলো ধরে রাখি। মনে হচ্ছে, এতদিন লেখার দরকার ছিলোনা, কিন্তু এখন কোন কারণে দরকার হচ্ছে। সবকিছু না বলে শুধু কিছু কথা নাহয় শব্দে তুলে রাখি। কিন্তু এই ম্রো’দের তো লেখার কোন শব্দ নেই। ওরা তো লিখতে জানেনা। ওরা তো কাব্য করেনা, চেষ্টা করেনা নিজেকে তুলে ধরার, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবার। ওদের শুধু আছে মুখের ভাষা। ওরা গান গায়। প্লং বাজায়। ওরা একসাথে জীবন কাটায়, এখান থেকে ওখানে। ওরা যাযাবর। আদিবাসী এই ম্রো’রা যাযাবর। ওরা আজ এখানে থাকবে, কাল ওখানে। ওরা আনন্দ করে। কাজ করে। সন্তান জন্ম দেয়। ভালোবাসে, পাহাড়, নদী, মাটি, ফসল। এত ছোট, কিন্তু এত অদ্ভুত এই জীবন। আমি কোন শব্দ পাচ্ছিনা জীবন জিনিসটা কতটা অদ্ভুত এটা বোঝাতে।

রাতের এই সময়, কুপি জ্বালানো, আমার এই ছোট্ট ঘর, শুয়ে শুয়ে উপুড় হয়ে লিখছি অর্থহীন। তাকিয়ে আছি কুপির আলোর দিকে। ধীর স্থির। আলোর নিচে আঁধার।

এই ছোট ঘরটাতেই আসার পর থেকে আমায় থাকতে দিয়েছে ওরা। ওদের ঘরগুলো এত ছোট নয় তবে, বেশ বড়। অনেকজন একসাথেই থাকে, আর আমি ওদের ঘরগুলো থেকে একটু দূরে, এই পাহাড়ের চূড়ায়। ওরা আমায় এখনও আগন্তুকই ভাবছে, আলাদা থাকতে দিয়েছে।

মাতামুহুরী পার হয়ে আলিকদম, আর তারপর আমার যাওয়ার কথা ছিলো থানচি। সাংগুর ওপারে। থানচি থেকে বালিপাড়া না তিন্দু যাবো ঠিক করতে করতে পাহাড়ী জঙ্গলের ভেতর হাঁটা শুরু করেছিলাম। ভোর হতে হাঁটার পর দুপুরে ঘুমিয়েছিলাম একটু এক পাহাড়ের উপর, ঘাসের বুকে, গাছের ছায়ায়। ঘুম থেকে ওঠার পর মনে হোলো, আমি হারিয়ে গিয়েছি। হারিয়ে গিয়েছি।

খুব ছোটবেলায়, কোন এক সন্ধ্যায়, আমি আমাদের ছোট্ট বাসার সামনে দিয়ে চলে যাওয়া গলিপথে হারিয়ে গিয়েছিলাম। যে মুহূর্ত থেকে আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে শুরু করছিলাম, যে আমি হারিয়ে যাচ্ছি, আমি পাগলের মতন ছুটছিলাম, আমার চোখ থেকে অদ্ভুতভাবে অনেক পানি পড়ছিলো। আমি অবাক হচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, আমি এত কাঁদছি কেনো? কিন্তু আমার কান্না থামছিলোনা। আমি আমাদের বাসা থেকে মাত্র দুটো বাসা পর গলির এক সামান্য বাঁকে হারিয়ে গিয়েছিলাম, অথচ আমি ভেবেছিলাম, আমি আর কাউকে দেখতে পাবো না কখনও, কাউকে না।

আর এখন, পাহাড়ঘেরা, গহীন গাছগাছালির এক জঙ্গলে আমি যখন বুঝলাম আমি হারিয়ে গেছি, তখন আমি ঠিকই জানতাম, আমি হারানোর জন্যই সারাটা সকাল ধরে হেঁটেছি। আর তাই এক অপার্থিব আনন্দ আমায় ঘিরে ধরলো হঠাৎ। আনমনে গুন্‌গুন্‌ সুর ভাজতে ভাজতে হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলাম একটা। কেউ সাড়া দিলোনা দেখে আমি যারপরনাই আশ্বস্ত হলাম।

আমি নগরে থাকি। নগর মানুষ। আমি দিন আনি, দিন খাই। আমার সবই আছে, কিন্তু কিছুই নেই। আমার কিছুই নেই, কিন্তু সব আছে। আমার চিন্তা নেই। আমি মুক্ত স্বাধীন। আমার কানের পাশে তুমি ফিসফিসিয়ে শুধু একবার বলো...এসো...আর তুমি দেখবে, আমি দাঁড়িয়ে, তোমার দুয়ারে, আমি তোমায় এমনই ভালোবাসি হে প্রকৃতি। আর ভালোবাসি ভড়ংশূন্য মানুষ। আমার পিছুটান নেই। এটা যে নেই, সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপও নেই।

কিন্তু সেদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে, আমার ‘হারিয়ে যাওয়া’র উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়তে শুরু করেছিলো যখন আমি বুঝলাম আমার ভেতরে ‘ভয়’ শব্দটা এখনও বৃষের মতন ঘাড় বেঁকিয়ে বসে আছে। পিচঢালা পথে, ম্যাটিনি শো’তে, কেতাদুরস্ত পরিপাটি সভায় ভয় কোথায়? ভয় কোথায় টিকটিক যান্ত্রিক মানুষের জীবনে? অস্তিত্বহীন হওয়ার থ্রেট কোথায়, শুধু খেটে খাওয়া মানুষ ছাড়া? ওহ্‌, নিজেকে আর নিজ গোত্রের মানুষদের আমি এত ঘৃণা করি কেনো?

কিন্তু ঠিক এই পাহাড়ের নিচেই, নদীর ওপার হতে, একপাশ খোলা, স্বলবসনা এক আদিবাসী মেয়েকে দেখে আমার মানবপ্রজাতির উপর ভালোবাসা উথ্‌লে ওঠেছিলো। আমি জানতাম, ওরা হয়তো মুরং হবে, পাঙ্খো হতে পারে, নাও হতে পারে। দূর হতে সন্ধ্যার হয়ে আসতে থাকা এই জায়গায়, পাহাড়ের উপর আলো দেখে ছুটে আসছিলাম আমি, আর আদিবাসী মেয়েটা এক ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলো। আমি তখন অদ্ভুত ক্লান্ত, আর ক্ষুধার্ত। আমার রোমাঞ্চগুলো তখন জঙ্গলের কোন এক গাছের শাখায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলছে।
কিছুক্ষণ পর আমি নিজেকে আবিষ্কার করি ওদের মাঝে। তারপর ওদের কারও মুখ থেকে যখন আমি ‘ম্রো-চা’ শব্দটা শুনলাম, আমি দ্বিধাচিত্তে এই সিদ্ধান্তেই আসলাম যে এরা ম্রো। অন্যান্য আদিবাসীরা ওদেরকেই ডাকে লেঙটা, বা ল্যাংগাই, অর্থ হচ্ছে, বন্যমানুষ বা আদিম মানুষ। এক আদিবাসী গোষ্ঠী অন্য এক গোষ্ঠীকে ‘আদিম’ বলে ডাকে, ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ আমার কাছে।
ওরা আমায় খাবার দিয়েছিলো।
থাকতে দিয়েছিলো।

আমি এমনিতেই কালো, তাতে এখানে আসার আগে তিনচারদিন রোদে পুড়ে ব্ল্যাকবডি হয়েছি, তাই ওদের মাঝে আমি অপাঙ্‌ক্তেয় হইনি। তারপরও গত তিনসপ্তাহ ধরে দুপুরের রোদ আমার খাদ্য ছিলো, আমি ওদের মতন হতে চেয়েছি, হতে চেয়েছি বাহুল্যবর্জিত একজন।

ওদেরকে গড়নে ছোটখাট মনে হয়নি আমার, বরং মাঝারি, এবং কেউ কেউ দীর্ঘকায় আছে বেশ। মোটামুটি সব আদিবাসী মেয়েদের মতন ম্রো মেয়েরাও খুব কর্মঠ, চোখে পড়েছে আমার। মেয়েদের কাপড় বুনতে বেশী দেখেছি, জুম চাষ করতেও দেখেছি। আর ঘর গৃহস্থালির অন্যসব কাজ তো আছেই। নিজ গ্রামে চলাফেরার সময় মেয়েরা ওয়াঙলাই পড়ে, ছোট কাপড়ের টুকরো। চুল বাঁধে। আমি যদিও শুনেছি ওরা স্তন অনাবৃত রাখে, কিন্তু এখনও দেখিনি তেমন কাউকে, শুধু কিছু বৃদ্ধা ছাড়া। ছেলেদের চুলও বেশ লম্বা দেখেছি, আর কান ফুটো করে রিং পড়তে দেখেছি অনেককেই। আরেকটা ব্যাপার খুব দারুণ লেগেছে যে ছেলেমেয়ে সবাই রঙ দিয়ে শরীর রাঙাতে পছন্দ করে। আর তাদের দাঁত কালো করে রাখে। হাসলে খুব অদ্ভুত দেখা যায়। নদীর পানিতে একদিন ভোরবেলা আমি যখন আমার কিছুদিনের চেষ্টায় কালো করা দাঁতগুলো বের করে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে দেখছিলাম, তখন লিবাচ নামের ছোট্ট এক ম্রো মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলো। আমিও উত্তর দিয়েছিলাম। লিবাচের বাবা-মার সাথেই আমি খেতাম। আর বিকেলে ও আমায় নিয়ে হাঁটতে বের হোতো, সাথে থাকতো বুকিত, পাশের মৌজা থেকে এসেছে আমি আসার এক সপ্তাহ পরেই। আমায় দেখে জিজ্ঞেস করেছিলো...ক্যামন আছে...আমি স্মিত হেসে বলেছিলাম...ভালো।

বুকিত আমায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো বৃদ্ধ থানকু’র সাথে। থানকু আমায় বলেছিলো অনেক কথা। রাতের আহারের পরে, উঠোনে ছোট্ট আগুনের পাশে, কি বিকেলের শান্ত পাহাড়ের ঢালে। অনেক কথা। বুকিত বুঝিয়ে দিতো সেসব কথা। ‘ম্রো-চা’ বলতো নিজেদেরকে ওরা। ‘ম্রো’ মানে মানুষ। আর ‘চা’ হচ্ছে সত্তা। মানব-সত্তা! শোনাতো, ওদের বিশ্বাসের কথা। ওদের ঈশ্বরের কথা। তুরাই, সাংতুং, ওরেংদের কথা। তুরাই, যিনি সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টি করেছেন জগৎ। সাংতুং, এই পাহাড়ের দেবতা। আর ওরেং, দেবী। নদীর দেবী। গত সপ্তাহে আমি ওরেং এর পূজা দেখেছি। অশুভ কোন শক্তিকে বিতাড়নের এই পূজা হয়। আমি হঠাৎ চম্‌কে উঠে ভাবি, এটা কাকে তাড়ানোর জন্য! মাথা নাড়ে বৃদ্ধ। হাসছে। আমার দিকে তাকিয়ে। চম্‌কে উঠি আমি পুনর্বার। বিকেল শেষ হয়ে আসে। লাল সূর্য।

‘আমি’ শব্দটা আমি ভুলে থাকতে চাই। আমি ভালোবাসি এমন এক ‘আমি’ যে চিন্তা করে, কিন্তু বলেনা, আমি চিন্তা করি। কোন এক আদিবাসী গ্রামে সেই আমিকে হারিয়ে, পাহাড়ের চূড়ায় এক গাছের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, সন্ধ্যার অস্তমিত সূর্য দেখতে দেখতে আমি অনুভব করি, আমার ভয়গুলো হারিয়ে গ্যাছে, আমি কেউ নই আর, আমি কিছুই নই। আমি শুধু এক সাধারণ মানব-সত্তা।

ওরা কিছুদিন পরই এই জায়গাটা ছেড়ে যাবে। চলে যাবে আরও পূবে।
কথা হচ্ছিলো, আজ রাতেই, ওরা ডিঙি নৌকায় আমায় ছেড়ে আসবে সাংগুর কোন পাড়ে, যেখান থেকে আমি নাকি পেয়ে যাবো সভ্যতার ঠিকানা।

আজ রাতের এই উৎসব এইসব অদ্ভুত মানব-সত্তারা করেছিলো, কোন এক অশুভ আত্মার বিদায় উপলক্ষে, অকারণ ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলো, হাত ছুঁয়ে বিদায় জানিয়েছিলো। আমি জানি এটাই আমার শেষরাত এক সভ্যতার সূতিকাগারে, এক অসভ্য সময়ের তরে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29300804 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29300804 2011-01-02 17:48:30
পরিস্পন্দন


হাত নিশপিশ, আঙুল কাঁপছে।
ইদানিং হাত কাঁপে অকারণে। ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। ডানহাতটা বেশী। আঙুলগুলো চেপে ধরি, বামহাতের মুঠোয় নিই। টের পাই থেমেছে একটু। একটু পরে ছেড়ে দিই মুঠো, দ্বিধাচিত্তে হতোদ্যম ওরা। থেমে আসে ধীরে।

বামহাতে স্কালপেলটা তুলে নিই। গতকাল কিনেছি ওটা। ফয়েল থেকে ব্লেডটা বের করে লাগিয়েছি। চক্‌চকে স্বচ্ছ। আলতো করে হাত বুলোই ধারালো প্রান্তে। শীতল ঠাণ্ডা। অপেক্ষায় থাকি আবার কখন কেঁপে উঠবে অন্যহাতখানি। টেবিলের উপর ডানতালু রাখি, আর অপেক্ষায় থাকি।

ঘরে আলো খুব কম; শুধু অজপাড়াগাঁয়ের কোন অদেখা রমণীর হাতে বোনা সূক্ষ্ম বেতের ছাঁকনি, কাঠের খোদাই করা টেবিলল্যাম্পের আলো। সন্তান কোলে ঘুমপাড়ানী নারীহাতের ছোঁয়া বেতের ভাঁজেভাঁজে। আমি জানি তার ঘরের কোনে এখনও পড়ে আছে অর্ধসম্পন্ন বেতের কাজগুলো। অসম্পূর্ণ শরীর নিয়ে ওরা চুপচাপ পড়ে থাকে ঘরের কোনে। বেতের ভাঁজেভাঁজে মাটির ঘরে শিশুর জন্মপ্রক্রিয়া, আঁতুড়ঘর থেকে কাঁথা মুড়িয়ে আনা তেল চপ্‌চপে মানুষের কান্নার ইতিহাস। দাওয়ায় বসে বুনতে থাকা, পাশে ঘুমানো সন্তান, লোল পড়ছে, কপালে কালো টিপ, জননী আনমনা হয়, থেমে যায় আঙুল, কেঁপে উঠে। স্তব্ধ হয় বেতের কাজ, ক্ষণিকের তরে। মধ্যবিত্ত টেবিলল্যাম্পটার ঐ সূক্ষ্ম বেতের ছাঁকনির ঠিক কোথায় থেমে গিয়েছিলো ঐ পল্লীরমণীর হাত তা আমি জানি। আলতো করে ছুঁয়ে দিই জায়গাটা। কম্পিত হাতে।

আমার পরিধানে যে সুতোগুলো, ওরা খুব চেনে ভোরের সংঘবদ্ধ পায়েহাঁটা, কর্মঠ কারিগরের নিতম্বে কর্পোরেট চাহনি। আমার চর্ম-সচেতন প্রেয়সীর মাসিক প্রসাধন ব্যয় জোগাতে ওদের খাটতে হয় নিদেনপক্ষে ত্রিশদিন, গাদাগাদি করে থাকতে হয় সর্প-গর্তে, সরীসৃপ লিবিডো পরিতুষ্ট কোরে। আমি মাড়িয়ে চলি মরুভূমির সাদা বালুর মানুষদের ঘামে ভেজা পথ। আমি এক সাধারণ মধ্যবিত্ত। মঙ্গাপীড়িত কৃষকের হাতে তোলা ভাত খেয়ে আমি কিনতে চাই অত্যাধুনিক জার্মান চক্রযান। আমি উত্তেজিত হই রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠান শ্রবণে, এবং নির্বিকার চিত্তে পাতা উল্‌টাই প্রাতরাশ টেবিলে, মাখন মাখাই রুটিতে, সাথে লাগাই কিশোরী ধর্ষণ-রক্ত, পান করি গলিত লাশ। আমি এক সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপরায়ণ মধ্যবিত্ত, আমি ময়দান সরগরম করি মেকি কান্নায়, কৃতজ্ঞতার হুংকার ছাড়ি প্রাচীন উর নগরে জন্মানো ত্রাণকর্তার অকস্মাৎ পশুবলির, অথচ আমার বাসার জানালার ব্যালকনিতে আট্‌কে থাকে সন্তানের গলাকাটা লাশ। আমি সাহিত্যচর্চা করি, এবং এইসব ইস্যু নিয়ে নিত্যনতুন শব্দচয়নে কনসাস ক্লিয়ার করি। আমি এক সাধারণ মধ্যবিত্ত যে নির্বাচিত নারীর যোনীমুখে জীবনের সুখ খোঁজে।

ইদানিং হাত কাঁপে অকারণে। ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। ডানহাতটা বেশী।
শুধু দেখেছি শীতল পাহাড়ী ঝর্ণাজল আর জনমানবহীন সৈকতের বালুর তলে হাতদুটো ঢুকিয়ে রাখলে ওরা কেমন থেমে যায় নিশ্চুপ। দেখেছি, কাঁপা হাতের তালুতে বালু নিয়ে গুন্‌গুন্‌ করলে ওরা কেমন বদলে যায়। নড়েচড়ে ছবি আঁকে বালুরা, নিজেদের সজ্জিত করে প্যারেড স্কোয়াডের সেপাইদের মতন, কী এক অপূর্ব চিত্রকলা, যেন দানার ভেতর জীবন, সুরের ছোঁয়ায় নাচছে। জ্যামিতিক মন ওদের।

জানিনা, ইদানিং কেন হাত কাঁপে। ডানহাতটা বেশী।
উফ্ জানিনা কেন...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29277872 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29277872 2010-11-25 21:12:08
সময়


আমি যখন 'ভবিষ্যৎ' শব্দটি উচ্চারণ করি, প্রথম অক্ষরটি ইতিমধ্যে অতীত হয়ে যায়। - ভিসওয়াভা সিম্বোর্স্কা


খেলাটি বেশ পুরোনো...
একদিন। কোন একদিন। যে দিনটি ঠিক থাকবেনা।
সময়। কোন এক সময়। যে সময়টি অজানা।
স্থান, কোন এক স্থান, যে স্থানে স্থির সময়। ফুলের উপর মৌমাছির স্তব্ধ পাখা, কাঁপছে, থিরথির। লাঙল থেমে আছে, কৃষকের ঘাম মাটিতে পড়ছেনা, কিষাণীর মুখে ফুটে থাকা হাসি। কোন এক মেঠোপথের পাশে রাতের আঁধারে অন্ধকার ক্ষেতের মাঝে হেঁটে যাওয়া অশ্রুতপূর্ব কোন বাঁশীর সুর। থেমে আছে বাতাস, কম্পিত হচ্ছেনা, অথচ শোনা যাচ্ছে মায়াবী সেই সুর। ভোরের আলোয় কৃষ্ণচূড়ার নুয়ে পড়া পাতা থেকে শিশিরফোঁটার শূন্যপতন, আর গাছের পাতার নিস্পৃহতা। এক অজানা নিষাদ, বিষাদের সুর যার কানে বাজে না।

এমনই কিছু মুহূর্ত যখন নিশির ডাকের মত, বাজে কর্ণকুহরে, শিহরণ তোলে, তখন পলকা পদক্ষেপে আনমনে পথে হাঁটা। কানে রেলের ঝম্‌ঝম্‌, মানুষের গুঞ্জন।
ধীর পায়ে উঠলে তুমি, চুপ করে বসে, তোমার কানে অজানা বাঁশীর রাগ, চোখে মহাকালিক মায়াজাল, স্পর্শে ঐশ্বরিক পেলবতা। ট্রেন চলতে শুরু করবে আর তুমি দেখবে স্থান পেরুলে কীভাবে অতিক্রান্ত হয় সময়। দেখবে, শিশুকালের তুমি দাঁড়িয়ে আছো প্ল্যাটফর্মে, হাত নাড়ছো, জানালা ধরে এগুচ্ছো।

কিসে ডুবে আছো তুমি? এ কোন ইন্দ্রজাল? এ কোন সময়?
তোমার স্মৃতি, সেটা তো আদৌ অসীম নয়, হতে পারে খুব বড় একটা সংখ্যা মাত্র, কিন্তু অসীম তো নয়। এই কি করছিস্‌ রে খোকা! মুখে মাটি পুরে দৌড়, মা পিছু পিছু। পিঁপড়ে খাচ্চিস কেনো রে! হ্যাঁ, লাল লাল সেই পিঁপড়ে, মা’র আদুরে হাসি, আদিবাসী কোন নারীর অগোছালো চুল, দূর পাহাড়ের চূড়ার ঐ মন্দির যেখানে একা গান গায় কোন এক পুরোহিত, এসব, আর আরও অনেক কিছু যা তুমি এখানে কখনই বলবেনা, এগুলোই তোমার জীবন, ঘুরে ফিরে এগুলোই তোমায় পরশ বুলায়, হাতছানি দেয়, কখনও হয়তোবা বৃষ্টির ফোঁটায় মিশে যায় লোনাজল। শুধু এগুলোই, অসীম তো নয়; কখনোই।

তুমি তাই ভাবছো, আর তোমার যখন নামার কথা কোন এক স্টপেজে, তুমি নেমে যাবে তার আগেই। তারপর অন্ধকার স্টেশনে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে দেখবে শূন্য রেলকামরায় তখনও বসে আছো তুমি যার নামার কথা পরের স্টপেজে। ট্রেন ছাড়ছে আবার, আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো প্ল্যাটফর্মে, হাত নাড়ছো, আর জানালা ধরে এগুচ্ছো। ফিরে তাকালে এবার। অন্ধকার যাত্রী ছাউনি। স্টেশনমাষ্টারের ঘরে তালা।

তক্ষক ডাকা সেই নিঝুম রাতে, একাকী তোমার কানে এবার নিশির ডাক, ফিস্‌ফিসিয়ে বলছে তোমায় – যে পথে তুমি হেঁটেছো একবার, হাঁটবে বারবার। যে পথে তুমি ফেলে গেছো তোমার পদচিহ্ন, সে পথ তোমায় ফিরিয়ে আনবে, ওর পথের ধুলো আবার তোমার পায়েপায়ে। যে পথে তোমার জন্ম, সে পথেই তোমার পুনরুত্থান, চক্রাকার এই মহাকালে তুমি করছো একই কর্মসাধন; বারবার, বারংবার।

মানুষটা তাই অসম্পূর্ণ। সে সম্পূর্ণ হয়নি। তার কামনাতাড়িত দেহের কোষে কোষে জন্ম নিয়েছে শতবর্ষীয় ঘুণেপোকা। তার ক্লিশেক্লান্ত মানসের একাংশে বসত গেড়েছে উন্মত্ততায় আচ্ছন্ন কিছু পিরানহা। মানুষটা অসম্পূর্ণ। সে সম্পূর্ণ নয়।

পূর্বজন্মের সেই মানুষ আজ পরিপূর্ণ কিঞ্চিত, ত্রুটিপূর্ণ এখনও। জানি মৃত্যুর পর আবার আসবে যে মানুষ, সেও হবে পরিপূর্ণ আরও, ত্রুটিপূর্ণ তখনও। এক অতল সময়ে ডুব দেবে সে, সময়জলের ঝাপটা গায়ে মেখে টুপ্‌টাপ্‌ ঝরাবে বিন্দুবিন্দু জল। মাঝে মাঝে শুধু একাকী নির্জন একলা সময়ে অনতিক্রম্য উত্তরকাল পাশে এসে বসবে তার, আর শিরশিরে পরশে সময়ের ফুটো দিয়ে দেখাবে অলঙ্ঘনীয় নিয়তি।

একটি প্রলেতারিয়েত দোয়েল তাই চুপিচুপি আমার কানে বলেছিলো একদিন – নাথিং স্যাটিসফাইস মি, শুনে রাখ্‌ তুই ঘুণেপোকা, নাথিং। বলেছিলো – অনেকদূরে, অথবা অনেক কাছে; দূর হতে দূরে, কিংবা হৃদয়ের অতলে; অলিন্দের নিভৃত কুঠুরিতে; নিলয়ের অজানা প্রকোষ্ঠে; টগ্‌বগে ধমনীতে, কিংবা ফিরে আসা ক্লান্ত শিরায়; রক্তের কাঁচা ঘ্রাণ, আর কালো গোলাপের না-বলা কথা; এগুলোর মাঝে অতৃপ্তি, পচে যাওয়া তৃপ্তিবোধ তোর। জানতে চেয়েছিলো – আমি যখন বিশ্বাসী ছিলাম রে, বিশ্বাস করতাম প্রত্যূষের প্রথম আলো, বৃক্ষের শাখায় রঙিন পাখিরা গাইতো অর্থবহ সব গান; আমি তো এখনও বিশ্বাসী আছি; অথচ বলতে পারিস্‌ কোথায় সেই আলো, পাখির গান?

দূরে আবার রেলের শব্দ। ফিরে আসছে সেই ট্রেন।
ঝম্‌ঝম্‌। ঝম্‌ঝম্‌।
উঠে দাঁড়ালে তুমি। অথবা তোমার কোন এক প্রতিরূপ। হাত বাড়ালে। উঠবে তুমি, ফিরে যাবে আদিতে।
চমকে গেলে হঠাৎ...
ছাদের উপর দাঁড়িয়ে এক দেবদূত।
সাদা। অথবা কালো।
দেবদূত হাত নাড়ছে...
আর মৃদু হাসছে...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29275892 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29275892 2010-11-22 15:54:21
সন্ধি


নীল প্রজাপতি আর শিশুগন্ধ।
নবজাতকের চামড়ায় আত্মশোধন।
খুব কাছ হতে, বুক ভরে শ্বাস টেনে নেয়া, কোন অশুভ আত্মার
কেঁপে উঠা,
চোখে বিন্দু জল, অকপট স্বীকারোক্তি পাদ্রে...
ও ফিসফিসিয়ে বলেছিলো,
কানের কাছে, উষ্ণলাল, ধীরেধীরে, পেলব ঠোঁটে...
ছেলে
বলেছিলাম...গম্ভীর রাশভারী অচপলতায়...
উঁহু

সবুজ ঘাসের ওপর তাই শুইয়ে রেখেছি এখন; ওর রঙ আর ঘাসের সবুজ। ওর গায়ে লাল জামা, ফিতেগুলো সবুজ। কোলে নিয়ে তিনটে দোল দিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, চুপচাপ নামিয়ে রেখেছি এখন, চুপ করে দেখছি আত্মজা, বিকেলের রোদ, নীল প্রজাপতি উড়ছে, তনয়া আমার, লাল জামা, সবুজ ফিতে। মাথা হেলে পড়ে, আলতো চাপে বুকের পাশে চেপে রাখা, কোলে নিয়ে, একতাল কী একটা...নরম...উষ্ণ...চোখ খুলে পিটপিট, একটু দাঁত, আঙুল চাবানো, দূর্বাঘাস চাবানো এখন ঘুমোচ্ছে; বিকেলের হালকা রোদ, পিঠে ঘাসের ছোঁয়া। আঙুল দিলেই মুঠোবদ্ধ, চেপে ধরে, বাঁধনে কেঁপে উঠে কোন সত্তা, ঢেউ উঠে কোথাও, ঘন নিবিড় সান্দ্র, এটাই স্পর্শ, খুদেমানুষের আলতো চাপে গলে গেলো, গলে গেলো প্রত্যয় কাঠিন্য অকারণ অহেতুক সব, বাকি থাকে অসহায়ত্ব...

...তাই এখন শুয়ে আছি, উপুড় হয়ে, দেখছি আমার সন্তান, মাটির কাছাকাছি, ধীর শ্বাস, পেলব দেহ উঠছে নামছে, আমিও দুলছি, ছন্দে, আনন্দে, অতিপ্রাকৃতিক, নাহ্‌, নিতান্ত সাধারণ আনন্দ, কোন উপমা নয়, শুধু বিশুদ্ধ আনন্দের পরিশুদ্ধতায়; স্বর্গ ছেড়ে এসো দেবদূত, স্বর্গ উজাড় হোক, ভুলে যাও সবকিছু, ভুলে যাও সময়, ভুলে যাও সবকিছু, শুধু মনে রেখো সবুজ বাগানের এক চিলতে রোদের ফাঁকে ইতস্তত উড়ে বেড়ানো এক নীল প্রজাপতি আর এক ছোট্ট আঙুলের স্পর্শ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29275891 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29275891 2010-11-22 15:41:48
ক্রয়যোগ্য


I want you, my love; I want you to help me to bear a child.

সূক্ষ্ম শীতল তৃণভোজী ঘাসের চূড়ায় চিকচিক করছে হুবাল। মাতৃপ্রেমের মূর্ছনায় গায়া, নিশীথ পথের নিচু কুয়াশার মতন ধীরে ধীরে কব্জা করে নিচ্ছে সে স্তেপের প্রান্তর। পাহাড়ের ঢালে ঘুমিয়ে আছে প্রাচীন অশরীরী বালকের দল। কেউ কেউ জেগে উঠেছে, এলোমেলো পায়ে চুপচাপ নেমে আসছে মন্থর এই আঁধার উপত্যকায়; চোখে অকারণ বিষণ্ণতা, পিঠে ইকারুসের ডানা, খসে পড়েছে।

I don’t want you. I want a child.

তীক্ষ্ণ চোখের পেঁচা ডাকছে, চোখদুটো দেখা যাচ্ছেনা, শুধু বোঝা যাচ্ছে ওর তীক্ষ্ণতা। এমন চুপ জলাশয় যেথায় যীশু আবার হেঁটে যাবেন, কাঁপবেনা জল, নিস্তরঙ্গ। তৃতীয় দিনের মাথায় আবার উঠবেন তিনি, জেনে গ্যাছে সবাই, শুধু দ্যাখেনি কেউ সরে যাওয়া প্রস্তর, দেখেছে শুধু অ্যাকিলিসের কচ্ছপ, সে হেঁটে যাচ্ছিলো। আবার আসবেন কি তিনি? জানে টেম্পলার বীর আর তেপান্তরের এক একাকী কালোঘোড়া, নড়ছে না অথচ লেজ নাড়াচ্ছে, খুরে তার ঈশ্বর, মৃত্তিকা ছুঁয়ে দ্যাখেনি।
I love you, you see, but I can’t help it. Let this child be the symbol of our unadulterated affection. Let it be our angelic retention where one day we will reminiscence the fact that we mated with virtuous dignity.

স্বর্গের কোন অপ্সরা, নরকেও বিচরণ; এত পেলব, ছাঁচের সর্বোত্তম গড়ন, অথবা অপরিশুদ্ধ; গালের পাশে ঝল্‌সে গেছে প্রাচীন রোমের পোড়া আগুন, অথবা নশ্বর মানবের তরে দেবতার অগ্নি অপহরণকারী প্রমিথিউসের চুম্বনে, অথবা হয়তো আনমনে আপনমনে, অবচেতনের অদৃশ্য আগুনে।

ভালোবাসি।
এই অবিমিশ্র, সাদামাটা, নিষ্পাপ, অকপট, অনাড়ম্বর শব্দটি আমরা জানি, নির্ভুল।
আর তাই
তোমার প্রত্যাশায় আমি ফিনিক্স, পুড়ে ছাই হবো,
আমৃত্যু।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29264361 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29264361 2010-10-31 10:56:16
Will to Live




একেকদিন তুমি বাসে চাপো। ভারী বাহন, জীবাশ্ম জালানীর অন্তর্দহন, আর ওটার বুক চিরে চলে যাওয়া পেছনের কোষ্ঠবদ্ধ আসন বেছে নাও যেথায় সসীম মহাবিশ্বের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তুমি কিঞ্চিত আশ্বস্ত হতে পারো। তোমার পাশে থাকবে নৈরাজ্যিক-বিশৃঙ্খল আরেকটি নড়বড়ে আসন যা চলার পথের স্পন্দনে-কম্পনে দুলবে, আর তাই হয়তো ওটা ফাঁকাই থাকবে, হবে শূন্যতায় পর্যবসিত, অথবা আশাবাদী-যুক্তিসিদ্ধ কেউ শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পাশে এসে বসবে নির্লিপ্ত-নির্বিকার, আর তাই ত্যাগী এবং কষ্ট-সহিষ্ণু এই মানবচরিতকে তুমি সানন্দে অভিনন্দন জানাবে, আর তার বস্তুগত দেহের উত্তাপ ভাগ করে নিতে নিতে তাকাবে ময়লার আস্তর-পড়া জানালার ভাঙা-কাঁচের ফাঁক দিয়ে, এবং কপাল কুঁচকে ভাববে বিবর্তনের ঠিক কোন পর্যায়ে দোমড়ানো-মোচড়ানো নয়-নম্বর বাসের উৎপত্তি ঘটেছিলো যার বহির্দেশে এস্টেরয়েডের অভিঘাতের কোন স্থান বাকী নেই আজ আদৌ। ভিনদেশী মহাজাগতিক জীবনগুলো এখন শুধু মাছের ঝাঁকা, শাকের আঁটি, মুড়ির টিন আর দাতের ফাঁকে গুল-চাপা মাজন-বিক্রেতার দাঁত কেলানো হাসির রেড-শিফটের দিকেই প্রসারিত। আবার পরক্ষণেই যখন গার্মেন্টস শিল্পের অগ্রগতির প্রতীকীরূপে বাহারি লুঙ্গির দীর্ঘকায় সাজানো স্তুপের সাথে উত্তেজিত প্রজনন অঙ্গের মতন খাড়া, ঋজু এবং দাঁড়িয়ে থাকতে আগ্রহী মানুষগুলো পোয়াতি বাসের বুক চিরে দাঁড়াবে, তুমি তখন সৃষ্টিজগতের ‘সংঘবদ্ধ ঐকতান’ নামক বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারো।

বাসটি যখন চলতে শুরু করবে, তোমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে এক জগত-বায়স্কোপ। তুমি দেখবে কতিপয় দম্পতি, বাচ্চারা চুপ দাঁড়িয়ে। দেখবে মামা হালিম, স’মিলের পাশে পড়ে থাকা কোন জঙ্গলের মৃতগাছ, ব্যবচ্ছেদের অপেক্ষায়। দেখবে হেঁটে যাওয়া তরুণী, পিছে ধাবমান যুবক, দুরাশয়। দেখবে পথশিশু, পলিথিন, ড্রেনের পানি আর লেক্সাসের চামড়া, তৈরি হয়েছে সুইজারল্যাণ্ডের উচ্চস্থানের কতিপয় গাভী হতে যাদের কোন মশা কামড়ায়নি। দেখবে বাজারের থলে হাতে চার সন্তানের বাবা, বিন্দু-ঘামে মেকাপ-নষ্ট দিশাহারা যুবতী। ফুটে উঠবে ফুটপাতের হকার, নায়িকার ছবি, বাসের লাইনে দাঁড়ানো ব্রিফকেসওয়ালা। স্পষ্ট দেখবে মিষ্টির দোকান, গড়িয়ে চলা ভিক্ষুক, দুই কনুইয়ে ছেঁড়া কাপড় যেন চামড়া ছিলে না যায়। হঠাৎ হয়তো দেখতে পাবে ভিড়ের মাঝে এক ভিক্ষু, অন্যমনস্ক, ফুটপাতের স্যাণ্ডেল কিনছে। তারপর দূরের ঐ ভাঙা দালানগুলো, আর ওদের ফাঁক গলে বিকেলের রোদ, তোমার মুখে পড়ছে। তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে, আলতো স্পর্শ, ছোট্ট বালক, শার্টের দুইটা বোতাম নাই, ভাড়া তুলতে এসেছে। তাকে সন্তুষ্ট করে নির্লিপ্ত চিত্তে পুনরায় মুখ ফিরিয়ে জগত-ঘটনাপ্রবাহ দেখতে উদ্যত তুমি হঠাৎ চমকে গেলে কানে এফএম রেডিও ধরা পাশের সহযাত্রীর চিৎকার শুনে...

এইসব কি?
এইসবের মানে কি?



১৮২০ খ্রীষ্টাব্দ।
বার্লিন, জার্মানী।
সকাল ১০:৩২।

শ্রেণীকক্ষের খালি গ্যালারির দিকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের নতুন প্রভাষক আর্থার। ঘনঘন তাকাচ্ছেন কক্ষের পেছনের দেয়ালে ঝোলা ঘড়ির দিকে। পেন্ডুলাম দুলছে। বার্লিনের এই সময়ের তীব্র ঠাণ্ডায় জমে যায়নি ওটা। বুকপকেটে রাখা ছোট্ট ঘড়িটার সাথে আবার সময় মিলিয়ে নিলেন তিনি। এক নজরে পুনরায় দেখে নিলেন শূন্য শ্রেণীকক্ষ, ডেস্কের ওপাশে কৌতূহলী কিংবা অনুসন্ধিৎসু চোখগুলোর অনুপস্থিতি। হঠাৎ বিষণ্ণ হলেন তিনি, শীতলতার অনুভূতি পেলেন। শূন্য কক্ষে একপরশ শীতল বায়ুর ছোঁয়ায় অনুভব করলেন একাকীত্ব। তীক্ষ্ণ নজরে খুঁজতে চাইলেন শীতল-উৎস। ঘাড় উঁচু করে দেখতে পেলেন গ্যালারির ডানদিকের ঐ বড় জানালার ছোট একটা শার্সি খোলা। ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকালেন তিনি, সহসা। মুঠোবদ্ধ। কিঞ্চিত উষ্ণতায় সাময়িক পরিতৃপ্তির ফাঁকে তার নজরে পড়লো শ্রেণীকক্ষের উঁচু ছাত, দৃষ্টি নেমে এলো অতঃপর, স্থির হোলো পাথরের মেঝের দিকে, ধুলো পড়েছে একটু। তাকালেন দূরের পাথুরে দেয়ালে, শক্ত কঠিন ভাবগম্ভীর।
দশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত জার্মানীর এই বিশ্ববিদ্যালয় তার নতুনত্বের ভাব ধরে রেখেছে এখনও।

পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে।
বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের নতুন প্রভাষক আর্থার সোপেনহাওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ লেকচার শুরু হওয়ার কথা ছিলো হিম-শীতল বার্লিনের এই সকাল সাড়ে দশটায়। শূন্য শ্রেণীকক্ষে তিনি এখন শুধু শুনতে পাচ্ছেন করিডোরের গুঞ্জন-কোলাহল, দ্রতগামী পদশব্দ, দৌড়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রী। কিন্তু আর্থার ঠিকই জানেন সেটা তার শ্রেণীকক্ষকে উদ্দেশ্য করে নয়। তার কানে আসছে দূরের হালকা গমগম আওয়াজ। ভ্রূ কুঁচকানো মুখে বিরক্তির রেখা আরও স্পষ্ট হোলো আর্থারের। তিনি জানেন ঠিক এই মুহূর্তেই দালানের অন্য একটি শ্রেণীকক্ষে এক নির্বোধ লেকচার দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্বয়ং মহামতি ফ্রেডরিখ হেগেল। ‘আনাড়ি, গেঁয়ো ভূত!’ – মনে মনে গালি দিলেন তিনি হেগেলকে উদ্দেশ্য করে। আর্থার জানেন তিনি হেরে যাচ্ছেন। পরাজয় অনিবার্য জেনেও ফ্রেডরিকের ক্লাস নেয়ার ঠিক একই সময়ে নিজের ক্লাসের সময়সূচি ঠিক করেছিলেন তিনি, জানিয়েছিলেন উন্মুক্ত দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান।

ধীরে ধীরে হাঁটছেন আর্থার; হাতদুটো পেছনে, মাথা নিচু করে, গভীর মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাস তার, জুতোর খট্‌খট্‌।
‘আনাড়ি, গেঁয়ো ভূত। গল্প শোনাচ্ছে শিশুদের। সব গল্প। ভাববাদী মূঢ়!’

হ্যাঁ, গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রেডরিক হেগেল, ভাববাদী তিনি বটে! জগতটা তার কাছে যেন শুধুই দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। তার কাছে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভাব বা অস্তিত্বের মধ্যে সেই অনন্তকাল ধরেই ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য চলছে। পরম ধারণা (absolute idea), পরম সত্য (absolute truth) কিংবা পরমাত্মা (absolute spirit) বলে যে মেটাফিজিক্যাল ব্যাপারগুলো আছে, তারা স্ববিরোধী, তাদের ডুয়েলিটি আচরণ আছে, আর এর দ্বান্দ্বিক প্রকাশই হোলো বস্তুজগত বা ফেনোফেনন। তাই এই বস্তুজগত শুধুই পরমের একটি রূপায়ণ, বা রিপ্রেজেনটেশান। বস্তুজগত পরমের ইমেজ? – এখানে কি তাই মনে হতে পারেনা রামানুজাচার্য্যের ‘বিশিষ্ট অদ্বৈতবাদের’ কথা? বেদান্তের এই মতবাদে রামানুজাচার্য্য তো বলেছিলেন, ব্রহ্ম এক, অদ্বিতীয়, কিন্তু জীব এক নয়, জীব বহু, প্রতিটি শরীরেই ভিন্ন, আর জীবাত্মা ব্রহ্মার অংশ। বলেছিলেন, জগৎ ব্রহ্মের মায়াশক্তি প্রসূত। মায়া কি? মায়া হচ্ছে ভুলের কারণ, ভ্রম। পরিবর্তনশীল এই জগতে পরম ব্রহ্মের ত্রুটিযুক্ত প্রতিরূপ দর্শনে এই ভ্রমের সৃষ্টি, কারণ জগৎ ব্রহ্মের মায়াশক্তি প্রসূত। এটাই ভুল, ভ্রম, মায়া। তবে শঙ্করাচার্য্যের অদ্বৈতবাদের মতন ‘ব্রহ্ম সত্য, এই বিশ্ব মিথ্যা’- এটা না বলে রামানুজাচার্য্য বলেছিলেন, ‘জগৎ মিথ্যা নয়, জগতের প্রকৃত সত্তা আছে’। আর হেগেল বলছেন, আমাদের মন বা আমাদের জগত সবসময় দ্বন্দ্বের বা বৈপরীত্যের ভেতর আছে কারণ এগুলো সব অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, অসমাপ্ত; কারণ এগুলো সত্যকে আংশিকভাবে জানে, আংশিকভাবে দেখে, আর তাই এর মতামত বা ধারণাও (Judgement) ত্রুটিপূর্ণ।

হ্যাঁ, ত্রুটিপূর্ণ বটে! মাথা নাড়লেন আর্থার, ক্ষণে ক্ষণে তাকাচ্ছেন দরজার দিকে – পরমকে তাহলে পরিপূর্ণভাবে কীভাবে জানা যাবে? আদৌ যাবে কি? পরম সত্যিকারভাবে কী হতে পারে? – পায়চারি করছেন তিনি শূন্য শ্রেণীকক্ষে। মনে করছেন এক গেঁয়ো ভুতের কথা। হ্যাঁ, গেঁয়ো ভুত হেগেলটা বলতে চায় – মনে করো তুমি একটা বড় গির্জের ভেতর ঢুকলে। প্রথমে ঢুকতে যেয়েই তুমি দেখবে সদর দরজা, আর তার পাশের দেয়ালের কিছু অংশ, আরও দেখবে হয়তো দেয়ালে আঁকা ভাস্কর্যের অংশ, অথবা খোদাই করা প্রতিকৃতির কিয়দংশ। এগুলো তোমার কাছে অবিবক্ষিত, রহস্যময়। সোজা কথা হচ্ছে, তুমি পুরো গির্জেটার ক্ষুদ্রাংশ বা অসম্পূর্ণ অংশই (Fragments) দেখছো। এবার তুমি এগিয়ে যাও, আর প্রবেশ করো। হেঁটে যাও। তুমি একটু একটু করে এগুচ্ছো, আর দেখছো। তুমি চলে যাও গির্জেটার নিস্তব্ধ শেষপ্রান্তে, আর তাকিয়ে দেখো পুরো সমগ্র। তুমি ওটাকে এখন দেখছো পরিপূর্ণভাবেই। তুমি এবার খুঁজে পেয়েছো এতক্ষণ ধরে দেখে আসা গির্জের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের অর্থ (Meaning)। বুঝে গেছো ওটার উঁচু ছাত, পাথরের স্তম্ভের মানে। সব যুক্তি ছাপিয়ে তুমি এবার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বুঝে গেছো ওটার অর্থবহতা। এটাই গির্জে, পরিপূর্ণ রূপে, তোমার কাছে উন্মোচিত। মানুষের জীবনটাও তাই। প্রতিদিন আমরা আমাদের এই জগতটাকে আরও একটু বেশী করে বুঝতে শিখি, বুঝতে শিখি ঘটনাপ্রবাহের কারণ, সংযোগ ঘটাই বিভিন্ন কিয়দংশের। তাই এই জগতটা প্রতিদিনই আমাদের জন্য একটু বেশী অস্তিত্বশীল হয়ে উঠে, আরও একটু বাস্তব হয়ে উঠে যেন। আর ঠিক এই যুক্তিতেই গেঁয়ো ভুতটা বলতে চায় যে এমন একটা সময় নিশ্চয়ই আসবে, মানবসভ্যতার পরম সেই সময়, যখন সবকিছুই অঙ্গীভূত হবে, সবকিছুই আত্তীকৃত হবে, সবকিছুই আত্মস্থ হবে। আর তখনই সকল সাবজেক্ট আর অবেজেক্ট মিলে, স্থান (Space) ও কাল (Time) অতিক্রম করে রূপান্তর ঘটবে পরমে। আর তারপর দ্রীঘাংচু! ওহে পরম! the Absolute!

হেগেলের দর্শনকে তাই বলা যায় a philosophy of becoming। একটা অগ্রগতিশীল, প্রগতিশীল, ক্রমবর্ধিষ্ণু ব্যাপার আছে তার দর্শনের মাঝে। grand structure, indeed!

গল্প। সব গল্প। শিশুদের গল্প। ভাববাদী মূঢ়! – জ্বলছেন আর্থার – ওটার শ্রেণীকক্ষ অপরিপক্বদের দ্বারা পূর্ণ হবে না তো কি আমারটা হবে? মানুষ যে শুধু গল্প শুনতে চায়। রূপকথা, পুরাণকথা, ধর্মীয় গ্রন্থ, এত এত গল্প। আর এখন নতুন গল্প শোনাচ্ছে ঐ ভাববাদী মূঢ়!

আর তাই ভাবছেন আর্থার। ভাবছেন অন্য একজনের কথা।
হ্যাঁ, তিনিই বলেছিলেন কথাটা। Ding an sich!
ইমানুয়েল কান্ট। Ding an sich! তিনি তো এটাই বলেছিলেন!
thing-in-itself। Noumenon।
ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার ঊর্ধ্বে। স্বচ্ছন্দ। নির্ভরতামুক্ত। এটাই কি হতে পারে পরম? বস্তুর ভেতরের সেই অজানা?
the Absolute?
কিন্তু এটা কি? এই পরম কি?
মৃদু হাসি দর্শন বিভাগের নব্য প্রভাষক আর্থার সোপেনহাওয়ারের ঠোঁটে, আরও প্রসারিত হোলো সেই হাসি যখন খুট্‌ করে শব্দ হোলো হঠাৎ, আর তিনি মুখ তুলে তাকিয়ে শ্রেণীকক্ষের বামদিকের ওই সদর-দরজা খোলার আওয়াজ পেলেন।
ওহ্‌ গুণমুগ্ধ ছাত্র! অবশেষে এই বুঝি পেলেন তিনি তার শিষ্যদের!
হ্যাঁ, ওরা আসছে, গুটিকয়েক। স্নিগ্ধ অনুভূতি আর্থারের মনে। কিন্তু প্রথমেই শ্রেণীকক্ষের ভেতর কৌতূহলী চোখের শিষ্যটিকে দেখে বিদগ্ধ আর্থারের মুখে একরাশ বিরক্তি ও ক্রোধ ফুটে উঠলো অকস্মাৎ।

একজন নারী? শেষ পর্যন্ত একজন নারী!

নির্লিপ্ত চিত্তে মাথা নেড়ে, যেন অনেকটা অনিচ্ছায় সম্মতি জানিয়ে তিনি আবার ভাবতে বসে গেলেন কিছু, আর কাঁধে বেশ লম্বা এক ঝোলা নিয়ে, অষ্টাদশী এক জার্মান তন্বী শীতল বার্লিনের এক সকালে ঢুকে পড়লো ওভারকোটের পকেটে হাত ঢোকানো দর্শন বিভাগের নতুন চিন্তিত প্রভাষক আর্থার সোপেনহাওয়ারের শ্রেণীকক্ষে, যার পকেট-ঘড়িটিতে তখন সকাল ১০:৪৩; অথচ কেউ দেখতে পারছিলোনা সেটা, ওটা ছিলো বুকপকেটের ভেতর।



বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণীকক্ষে, কোন এক শীতের সকালে, দর্শন বিভাগের নব্য প্রভাষক আর্থার সোপেনহাওয়ার ভাবতে থাকুক কিছু, গ্যালারির এখানে ওখানে না-হয় বসতে থাকুক গুটিকয়েক নিষ্প্রভ বালকবালিকা যারা হয়তো দ্বিধাচিত্তে এসেছে মহামতি হেগেলের গুরুত্বপূর্ণ গল্প শোনা বাদ দিয়ে, আর এই ফাঁকে আমরা না-হয় ঐ শ্রেণীকক্ষের বিষণ্ণ কাঠের টেবিলটার ঐ ছিদ্র গলে চলে যাই সময়ের একটু সম্মুখে, জেনে নিই কিছু, বুঝে নিই তার দর্শনের সংক্ষিপ্তসার, রূপরেখা, যদি সেটা কেউ আদপে ‘দর্শন’ বলতে রাজী থাকে...

শুরুটা হবে স্বয়ং ইমানুয়েল কান্টকে দিয়েই...
ইমানুয়েল কান্ট। জার্মান দার্শনিক। তিনিই বলেছিলেন সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি জাজমেন্টের কথা, সেই সত্যিকার জ্ঞান যা কিনা অভিজ্ঞতালব্ধ নয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফ এ্যানি এক্সপেরিয়েন্স। এটাই বুঝি সেই পরম বা Absolute, যে পরমের খোঁজে যুগযুগান্তরে সচেতন মানব আত্মহারা, দিশাহারা, আর সর্বশেষে বাকহারা। বলেছিলেন, চিন্তা আর যুক্তির সীমাবদ্ধতার কথা। বলেছিলেন যে এই জগতের কোন কিছু যদি আমাদের জন্য বাস্তব হতে হয়, তবে তার স্থান এবং কাল থাকতেই হবে। বলেছিলেন স্থান বা স্পেস ‘আমাদের’ বাইরে (এই ‘আমরা’ এখানে সাবজেক্ট, বা thinking self) অবজেক্টিভ জগতে অস্তিত্বহীন, কিন্তু এই স্পেস নাকি আবার আমাদের চেতনারও একটা অংশ। স্পেস কোন অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, কিন্তু এটা নাকি আবার সকল অভিজ্ঞতার শর্ত। স্পেস ইন্দ্রিয়গোচর বা পদার্থ, বা বস্তু না, স্পেস যুক্তির মাধ্যমে পৌঁছানো কোন ধারণাও না, স্পেস হচ্ছে খাঁটি ইন্টিউসন, বা অন্তর্জ্ঞান, বা সহজজ্ঞান। এই অন্তর্জ্ঞান হলো সরাসরি জ্ঞান, ডিরেক্ট নলেজ, কোন প্রকার যুক্তিবিন্যাস বা যুক্তিপাত ছাড়াই। কান্ট বলছেন, এই স্পেস বা স্থান সম্পর্কিত অন্তর্জ্ঞান একটা এ-প্রায়োরি সিন্থেটিক জাজমেন্টের শর্ত। সময়ের ক্ষেত্রেও তাই, বলছেন ইমানুয়েল। সময় কোন বস্তু না, সবকিছু সময়ের মধ্যেই আছে, নিমজ্জিত, নিমগ্ন। চেতনাও (consciousness) তাই; চেতনার ছোট ছোট অংশ হতে পারে না, কারণ চেতনা অক্ষত, অটুট। বলছেন, বিজ্ঞান আমাদের বস্তজগতের কানেক্টিভিটি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু বস্তুর সত্যিকারের গুণাবলী সম্পর্কে কোন অন্তর্জ্ঞান দিতে পারে না। এগুলোই সীমাবদ্ধতা; বস্তুকে জানার এবং বোঝার সীমাবদ্ধতা, অন্তত কান্টের কথা অনুযায়ী। জার্মান ভাষায় তিনি এই পরম ভাবের নাম দিলেন Ding an sich, বা thing-in-itself, এটাকে Noumenon নামেও আখ্যায়িত করা যায়। যদিও ইমানুয়েল এই Ding an sich কে ‘পরম’ (Absolute) বলতে চাননি হয়তো, কিন্তু সেটা কিই বা হতে পারে যখন তিনি এটাকে আখ্যায়িত করছেন ‘the actual object’ হিসেবে? – যেখানে object তো এপিষ্টেমোলজির সেই শব্দই যা নির্দেশ করে ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু, বা পদার্থ, বা সামগ্রী – তোমার সামনের টেবিল, কফি-কাপ, মাটি, ফুল, নদী, ঘাস, আকাশ, আঁধারে তোমার ভয়, একটা পাথর, তোমার ঘৃণা, ভালোবাসা নামক বস্তু, এইসব সেনসেশন। আর এই সকল অবজেক্টিভ রূপায়নই যদি ব্রহ্মের মায়াশক্তি প্রসূত হয়, তবে এইসব object’এর ‘actual form’ই কি বস্তুর ভেতরের সেই পরম বা Absolute নয়? – যার গুণাগুণগুলো পর্যবেক্ষকের নিয়ন্ত্রনমুক্ত, স্বতন্ত্র, স্বচ্ছন্দ, independent of any observer। স্থূল জ্ঞান নিয়ে আপাততঃ এটাকেই ভ্রূ কুঁচকে হাতের মুঠোয় নিই, ক্ষণিকের তরে, ফেলে দিতে পারি যেকোন সময় যেহেতু ‘নিশ্চিত’ শব্দটার সাথে পরিচিত নই।

যা-হোক, কান্ট পাশাপাশি এটাও বলেছিলেন যে এই পরম বা noumena’এর জগত আমরা কখনও অনুধাবন করতে পারবো না, বুঝতে সক্ষম হবোনা। এটা মানবপ্রজাতির এক চরম এবং অলঙ্ঘনীয় সীমাবদ্ধতা। হুমম...উদাহরণ? আচ্ছা লঘুভাবে যেমন, মহান সক্রেটিস – তাঁকে কি সত্যিকারভাবে জানা যাবে কখনই? কারণ সক্রেটিস তো প্লেটোর দ্বারাই প্রকাশিত, প্লেটোর এক প্রতিরূপ, ‘সত্যিকার’ সক্রেটিস বা ‘পরম’ সক্রেটিস তো আসলেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যেমন, ঈশ্বর বা মহাকাল সম্পর্কিত, যদিও এই শব্দগুলো টেনে আনা অহেতুক নিষ্প্রয়োজন, তারপরও এমন কিছু যদি আদপে থেকেও থাকে, তাকে বস্তুজগতের বোধশক্তি আর পারসেপশনে আবদ্ধ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যাবেনা কখনই। ঠিক এমন একটা জায়গায় এসেই, মেটাফিজিক্যাল ডোমেইনগুলোকে ফিজিক্যাল সীমাবদ্ধতায় ব্যাখ্যা করার অপচেষ্টায় বিংশ শতাব্দীর এক অদ্ভুত মানুষ লুডউইগ উইটগেন্সটাইন তার Tractatus Logico-Philosophicus’এর শেষের সাত নম্বর অনুসিদ্ধান্তে একটাই কথা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, What we cannot speak about we must pass over in silence... নীরবতা, আর চুপ থাকা; যৎসামান্য এই জগতে কারও চিন্তার প্রতিধ্বনি অন্যকোথাও শোনা গেলে এই বিশ্বজগৎ আদৌ উদ্দেশ্যহীন হয়না... Zeitgeist কিছু একটা...অরুন্তুদ!

পরমে ফিরে আসি। thing-in-itself।
কান্টের পর সবাই তাই এই Ding an sich’কে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। যদিও ইমানুয়েল বলে গিয়েছিলেন সীমাবদ্ধতার কথা, বলে গিয়েছিলেন এই thing-in-itself বোঝা সম্ভব নয় কখনও শুদ্ধ-যুক্তি দিয়ে, তথাপি উত্তর পোল্যাণ্ডের বাল্টিক উপকূলের ড্যানজিগ শহরে জন্মানো এক জার্মান দার্শনিক বলে উঠলেন, ‘হুহ! যদি কেউ না জানে এই thing-in-itself কি জিনিস, এই পরম the actual object এর ব্যাপারটা কি, তো সেটা আমি জানি, আর আমিই জানি!’
কী জানেন তিনি! কী বলতে চান তিনি!
The world is stupefied – বলছেন আর্থার, আমি জানি এটা, সত্যিকারভাবেই। জানি আমার অন্তর্জ্ঞান (intuition) দিয়ে, এই অন্তর্জ্ঞান হোলো সরাসরি জ্ঞান, ডিরেক্ট নলেজ, কোন প্রকার যুক্তিবিন্যাস বা যুক্তিপাত ছাড়াই।

ও মন তার উপরে মণিকোঠা
তাতে কিছু না যায় টোটা
সে তো বসিয়ে আছে হয়ে টোটা
সে ঢাকায় বসে দিল্লীর খবর জানে

মানুষ স্বয়ং একটা thinking self হলেও এটা পাশাপাশি একটা বস্তুও বটে – বলছেন আর্থার – আর যেহেতু আমি একটা বস্তু (thing), I must seek my absolute in my intuition, what I am in my essence। বলছেন – আমি জানি, I know that the most elementary and fundamental thing in myself is the ‘will to live’।

কি ছিলো আর্থার সোপেনহাওয়ারের এই will to live?
সোপেনহাওয়ার নিজেই বলেছেন যে তিনি এই শব্দগুলো বেছে নিয়েছেন কারণ এর চেয়ে ভালো কোন শব্দ তিনি খুঁজে পাননি তার ভাবখানি প্রকাশের জন্য, আর তাই এখানে শব্দগুলো ঠিক আক্ষরিক নয়, শব্দগুলো শুধু বেঁচে থাকার ইচ্ছা বোঝায়না, অথবা শুধুই বোঝায়না মানুষ এবং অন্য প্রাণীদের ‘টিকে থাকা’ বা ‘অস্তিত্বমান’ হওয়ার অভিপ্রায়/আকাঙ্ক্ষা, বরং পাশাপাশি শব্দগুলো এটাও বোঝায় একটা সাধারণ পাথরের প্রতিরোধ স্পৃহা (resistance), দৃশ্যমান আলোর অটল/অনড় বিরতিহীনভাবে বজায় থাকা (persistence) ইত্যাদি। তাই ব্যাপারটা অনেকাংশে the will to ‘be’ – ব্যাপারটা আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, ঠিক একইভাবে প্রযোজ্য আমার সামনের ঐ চেয়ারটার জন্য, জানালা দিয়ে তাকিয়ে খুঁজে পাওয়া ঐ গাছটার জন্য, দূরের ঐ পাহাড়টার জন্য। সোপেনহাওয়ার বলছেন এটাই সেই কান্টিয়ান Noumenon, the absolute। বলছেন এই উইল-টু-লিভ শুধুই স্থান এবং কালে অস্তিত্বশীল বা সীমাবদ্ধ নয়, it is beyond time and space, it is within itself and can manifest itself only when it becomes a phenomenon (limited in time and space)। এটা এক একক-সত্তা (single entity)। কিন্তু যখনই এই একক/স্বতন্ত্র সত্তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার আওতায় চলে আসে (passes to the phenomenological world), এটা ভেঙে যায়, বিভাজিত হয়, বৈপরীত্যে দোল খায়, হয় স্বতন্ত্র/ব্যক্তিগতভাবে সুনির্দিষ্ট। সোপেনহাওয়ার এটাকে বলছেন principium individuationis। আবারও কি সেই রামানুজাচার্য্য! বেদান্তের এই মতবাদেও তার কথায় কি এমন সুরই বাজেনি যখন তিনি বলেছিলেন – ব্রহ্ম এক, অদ্বিতীয়, কিন্তু জীব এক নয়, জীব বহু, প্রতিটি শরীরেই ভিন্ন, আর জীবাত্মা ব্রহ্মার অংশ? বলেছিলেন, পরিবর্তনশীল এই জগতে পরম ব্রহ্মের ত্রুটিযুক্ত প্রতিরূপ দর্শনে এই ভ্রমের সৃষ্টি, কারণ জগৎ ব্রহ্মের মায়াশক্তি প্রসূত।
কে জানে!

যাই-হোক, মায়া হোক-না-হোক, এই উইল-টু-লিভের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতায় রূপান্তরে এই জগত পরিণত হয়েছে এক অবিশ্রান্ত অসুস্থতায়, অস্থিরতায়। বিয়োগান্তক/ট্র্যাজিক জগত এটা। ভাবের লেটুস নয়। খাচ্ছো তুমি, মরছে কেউ না-খেয়ে। চালাচ্ছে তোমায় ফুড চেইন। তুমি প্রতিনিয়ত পরিতৃপ্ত/পরিতুষ্ট/চরিতার্থ করছো তোমার উইল-টু-লিভ। চলছো তুমি তোমার আকাঙ্ক্ষায়, কামনায়, বাসনায়, ইচ্ছা-অভিলাষে। আর নিরর্থক, উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন তোমার আকাঙ্ক্ষা, কামনা, বাসনা, ইচ্ছা-অভিলাষ। কোন মানে নেই এই ত্রুটিপূর্ণ উইল-টু-লিভের। ট্র্যাজেডিক জীবন। সিদ্ধার্থ গৌতম দেখেছিলেন এই ট্র্যাজেডি মহানিষ্ক্রমণের আগে। দেখেছিলেন – মৃত্যু, বার্ধক্য, রোগ। উইল-টু-বি এই জগতকে শ্রান্ত/পীড়িত করেছে, করছে, এগুলো থেকে মুক্তি নেই, হবেনা। এটাই পরম বাস্তবতা। রাণীকে বাঁচাতে সৈন্য পিপীলিকার মৃত্যু, দেশকে বাঁচাতে দেশপ্রেমিকের মৃত্যু, আমরা যতই তত্ত্ব দিই ইউসোস্যাল প্রাণী/এ্যাল্ট্রুইজম/ন্যাচারাল সিলেকশন/বিবর্তন/দক্ষতার সাথে জীনের বিস্তার, কিন্তু কী এসবের মানে? we are just rationalizing। পরম ব্যাপার হচ্ছে life is a continuous, culpable malaise। তিনি বলছেন – love and personal happiness cannot exist because the individual is sacrificed for the species...

আর্থার তাই খুব বিরক্ত ছিলেন নারীজাতির উপর, কারণ তারাই জন্ম দিচ্ছে, আর প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই অসুস্থতাকে! নারীবাদী ছিলেননা তিনি মোটেই! তবে তিনিই একসময় বলেছিলেন যে, কোন নারী যদি নিজেকে সাধারণের উপরে টেনে তুলতে পারে; যদি নিজেকে সরিয়ে নেয়, প্রত্যাহার করে সর্বসাধারণ থেকে, তবে সেই নারী সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।
কম্পলিমেন্ট! অথবা অমার্জিত কথাবার্তা!

অমার্জিত মানুষটা আরও বলছেন, Man can never attain individual happiness. Our will to live forces us to consume others or to be consumed by them
বলছেন, Happiness or pleasure is nothing more than the satisfying of a malaise

হুম। এই জটিলাবস্থা বা মানসিক বৈক্লব্য থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি তাহলে?

আত্মহত্যা?
উমম...হয়তো-না। কেন?
কারণ আত্মহত্যার মাধ্যমে নাকি শুধু উইল-টু-লিভকেই সমর্থন করা হয়। আত্মহত্যার মাধ্যমে ঐ মুহূর্তে আমি নাকি এটাই প্রমাণ করছি যে আমার উইল-টু-লিভ পরিতৃপ্ত হয়নি, তুষ্ট হয়নি।
জড়বুদ্ধির যৌক্তিকতা!

তাহলে?
উত্তর হচ্ছে - I kill my will to live within myself
কীভাবে!

ধ্যান!
চিন্তা!
ভাবনা!
কিল ইউর উইল-টু-লিভ!
আত্ম-অস্বীকৃতি আর ধ্যানের মাধ্যমে জীবন কাটাও।
প্রতিভাবান সেই যে জগতটাকে নেয় খেলাচ্ছলে। এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা।

The genius is disinterested.
He has fun with the world.
He perceives its atrocities but delights in its atrocities.
The genius in general is useless in practical life, because he does not seek his personal interest. He is antisocial, but sees the world better because he is objective.

ওরা বলে আর্থার সোপেনহাওয়ার একজন ‘পেসিমিস্ট’। শব্দটা দিয়ে আসলে কিছুই বলা হয়না...
তার জীবনবিমুখী দর্শন জীবন ছুঁয়েছে। অনেক অনেক বছর ধরে যে জীবনকে বোঝার তরে যে দর্শন জীবনের বাইরে ছিলো, জীবনকে বোঝার একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় যে হয়ে উঠেছিলো এতটাই বুদ্ধিবৃত্তিক/উচ্চমার্গীয়, সে যেন হঠাৎ জীবনকে ছুঁয়ে দিয়েছিলো, ছুঁয়ে ফেলেছিলো। শক্ত সরল মৃত্তিকার উপর হাঁটতে চাই, ভাবনার সান্দ্রতায় উড়তে চাইনা, শুধু বুঝতে চাইনা, ধরতে চাই পরম বাস্তবতা, ছুঁতে চাই হাতের তালুতে নিয়ে, আর তারপর ছিন্ন করতে চাই, ধ্বংস করতে চাই কিছু, নিশপিশে আঙুল আমার, স্পর্শ-আকাঙ্ক্ষা – আর্থার ছিলেন কি এমন একজন? তিনি কোন বলিষ্ঠ মতবাদ প্রকাশিত করেননি বটে, আর তাই তার দর্শন সত্যিকার দর্শন নয় হয়তো; যদিও শিল্প/সাহিত্য/চিত্রকলা নিয়ে তার আকর্ষণীয় তত্ত্ব আছে। তার মতবাদগুলো আসলে অনেকটাই সাইকোলজিক্যাল বলা যায়, দর্শন না বলে; কিন্তু দর্শন আসলে কি, বা কি হওয়া উচিত? কোন দার্শনিক তত্ত্বই বেশীদিন টেকেনা, যুগযুগান্তরে কত দার্শনিক মতানৈক্য, দ্বন্দ্বের সমাহারে ব্যতিব্যস্ত মানুষ জ্ঞানের সত্যিকার রূপ কি জানবে কখনও, বা পারবে কি আদৌ? আর এখানেই সোপেনহাওয়ার আর হেগেল নন, কান্টও নন, এখানেই তিনি হয়ে উঠেছেন ‘আর্থার সোপেনহাওয়ার’, নিজস্ব চিন্তাভাবনায়, নিজস্ব দর্শনে, কান্টিয়ান/হেগেলিয়ান মহাবিশ্বের পাশাপাশি তার স্বতন্ত্র সোপেনহাওয়ারিয়ান নক্ষত্র; জ্বলছে এখনও, মিটমিট।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29264359 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29264359 2010-10-31 10:52:35
বন্ধ্য ও নিঃসন্তান নারী : সিলভিয়া প্লাথ


নিঃসন্তান নারী
- সিলভিয়া প্লাথ

জরায়ুর বীজপাত্র কাঁপছে,
বৃক্ষ ছেড়ে আসা
চাঁদ
যেতে পারছে না কোথাও।

আমার দৃশ্যপট এক হস্তহীন রেখা,
যেথায় গুচ্ছগুচ্ছ পথগুলো জট পাকিয়েছে,
জটগুলো আমি নিজেই।

আমি নিজেই এক গোলাপ, যা তুমি অর্জন করো –
এই দেহ
এই গজদন্তবর্ণ

অবিধাতাসুলভ শিশুর আর্তনাদ।
নিজ প্রতিমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে
দর্পণ ঘুরাই আমি, মাকড়সার মত।

উচ্চারণ করি রক্ত ছাড়া আর কিছুইনা –
চেখে দ্যাখো, কালচে লাল!
আর আমার বুনো অরণ্য।

আমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া,
আর এই পাহাড়, আর এই
জ্বলজ্বলে মৃতদের মুখগুলো।


Childless Woman
- Sylvia Plath

The womb
Rattles its pod, the moon
Discharges itself from the tree with nowhere to go.

My landscape is a hand with no lines,
The roads bunched to a knot,
The knot myself,

Myself the rose you achieve---
This body,
This ivory

Ungodly as a child's shriek.
Spiderlike, I spin mirrors,
Loyal to my image,
Uttering nothing but blood---
Taste it, dark red!
And my forest
My funeral,
And this hill and this
Gleaming with the mouths of corpses.





বন্ধ্য নারী
- সিলভিয়া প্লাথ

শূন্য আমি; নগণ্য পদধ্বনিতে আমার প্রতিধ্বনি,
স্তম্ভ, দহলিজ আর বৃত্তাকার কক্ষে সুশোভিত,
মহিমান্বিত, মূর্তিহীন জাদুঘর।
আমার উঠোনে শুধু এক প্রস্রবিত ফোয়ারা – ফুঁসে উঠ্‌ছে,
ঢলে পড়ছে, আত্মতলে,
সন্ন্যাসিনী হৃদয় যার, জগত-অন্ধ। মর্মরপ্রস্তরের পদ্মফুল,
নিঃশ্বাসে সুরভিত বিবর্ণতা।

কল্পনায় আমি সঙ্গ দিই বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের,
সাদাশুভ্র দেবী নাইকের জননী, আর কিছু নিষ্প্রভ চোখের
অ্যাপলোদের মাতা।
মনোযোগ ছিঁড়ে ফেলে মৃতরা আমার, ঘটবেনা কিছুই আর,
কোনকিছুই।
শূন্যগর্ভ চেহারা, মৌনতা আমার সেবিকা।


Barren Woman
- Sylvia Plath

Empty, I echo to the least footfall,
Museum without statues, grand with pillars, porticoes, rotundas.
In my courtyard a fountain leaps and sinks back into itself,
Nun-hearted and blind to the world. Marble lilies
Exhale their pallor like scent.
I imagine myself with a great public,
Mother of a white Nike and several bald-eyed Apollos.
Instead, the dead injure me attentions, and nothing can happen.
Blank-faced and mum* as a nurse.





* প্রশ্ন আছে, mum শব্দটা নিয়ে। Informal term for a mother, হ্যাঁ, ‘মা’ – কিন্তু...মেডুসায় যখন শেষে বলছেন There is nothing between us, জননীকে কালো অধ্যায়ে ছুঁড়ে ফেলেছেন কিঞ্চিত, তখন? আবার, mum – হেমন্তের আর শীতের উদ্যানশোভন ফুল, The flower of a chrysanthemum plant, রঙিন। রঙিন? সিলভিয়া প্লাথ? রঙিন একটা ফুল সেবিকার সঙ্গ দেবে তাকে? প্লাথ আর সামান্য রঙিন নারী হৃদয়? হতেও পারে অবশ্য, বক্রাঘাত, irony। আমি তাকে হেয়/অপমান করলাম না, করতে পারিনা। আর তাই mum – গুপ্ত, মৌন, চুপ থাকা, Secrecy, মনে হয়েছে চলতে পারে এগুলো। মতামত ভিন্ন হতে পারে যে কারও... দেশ এখন স্বাধীন।


And I Am the arrow, The dew that flies Suicidal, at one with the drive Into the red Eye, the cauldron of morning.


কৃতজ্ঞতা - ভ্রাতঃ ফয়সল রাব্বি ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29254457 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29254457 2010-10-14 00:29:00
পোকা


মানুষের খুব কাছে যেওনা, শুনতে পাবে গুঞ্জন, কুঁকড়ে যাবে ঘৃণায়।

মানুষের খুব কাছে যেওনা, শুনতে পাবে ফিসফিস, কিলবিলে চিন্তা।
অথবা হতে পারে মানুষগুলো কোন কথাই বলছেনা, নিঃসাড় ওরা। হতে পারে এগুলো শুধুই তোমার খোদ নিরেট মস্তিষ্কে ওদের বসবাস, মিথ্যে ছায়া। ওখানে তুমি খুঁজে পাবে বাল্যকালের বন্ধু, দূর সম্পর্কের চাচা, আইসক্রিমওয়ালা। খুঁজে পাবে পাশে বসা তন্বী সহযাত্রীর লাজুক হাসি, বইয়ের ফাঁকে মুখ গুঁজে আড়চোখে তাকানো গ্রন্থাগার-নারী। চিনে নেবে কাছের মানুষ, দূরের নৌকার মাঝি, রিমঝিম বৃষ্টির দুপুরে তার বৈঠা, কী ভয়ংকর কৃষ্ণকায় ছিলো সেটা। এগুলো তো তুমিই, তোমার রূপায়ন। ওরা তোমার পরম অচেনা। শর্তাধীন তুমি, তোমার জন্মের সময় কেঁদে উঠা, আর সেদিনের জলবায়ুর আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, মৃত্তিকার ঘ্রাণ। প্রথম গাছের পাতার স্পর্শ, মায়ের উষ্ণ স্তন, জননী-চিন্তা পান করেছো। লাল ইটের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সবুজ শেওলায় পিছলে যাওয়া তুমি, হোঁচট খাওয়া, দাগ যায়নি এখনও। কুঁড়ির মতন ফুটেছো, ধীরে ধীরে, গন্ধ বিলিয়েছো, কিন্তু তার চেয়েও অত্যধিক, তুমি গ্রাস করেছো, নিজের ভেতর টেনে নিয়েছো পারিপার্শ্বিক নির্যাস, পরম রূপ হারিয়েছে সে তোমার কাছে এসে, হারিয়ে গিয়েছে তোমা মাঝে। আর তাই ভিড়ের মাঝে শরীর কেঁপে উঠা ভাবনা ফিসফাসে তোমার যেই ঘৃণা, তুমি আসলে নিজেকেই ঘৃণা করছো, হয়তো।

তারপরও মানুষের খুব কাছে তুমি যেওনা, ওদের চিন্তা শুনতে পারলে তুমি কুঁকড়ে যাবে ঘৃণায়, নিশ্চিত।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29250643 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29250643 2010-10-07 00:29:33
অহং


একদিন, নগ্ন পায়ে ঘাসের বুকে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা, অন্যমনষ্ক। আর তুমি এলে নিঃশব্দে, পায়ে তোমার সূর্যালোক। থমকে দাঁড়ালাম, ইতস্তত, কচি ঘাসের বিগলিত সবুজ, থকথকে, সান্দ্র। চোরাবালি, চোরাঘাস, সূর্যতাপে দগ্ধ। ডানা ছড়িয়ে, স্নিগ্ধ সৌরভে আরও কাছে এলে তুমি। ধীরেধীরে। উত্তাপ ছড়ালে শরীর জুড়ে, পোড়াতে চাইলে সহসা। অতঃপর তাকালে ডাকিনী-মোহিনী, জমকালো সূক্ষ্ম দৃষ্টি তোমার। সরু চোখে খুঁজে বেড়ালে পোড়া দাগ, দগদগে ফোস্কা, নখ দিয়ে ছুঁতে চাইলে অগ্নিক্ষত। তোমার আত্মবিশ্বাস, তুমি পুড়িয়েছো কিছু।

সংশয়াত্মায় চলে যাচ্ছিলে যখন, আমি দেখছিলাম টকটকে লাল সূর্য, অস্ত যাচ্ছিলো তোমার হৃদয়ে, অন্যথায় হতে পারে সেটা প্রত্যূষের নিশান্ত আভা। ওর ফাঁক গলে ক্লান্ত পাখিরা ফিরে যাচ্ছিলো নীড়ে, পাতাবাহারের ঝোপে নিরুদ্বেগ এলিয়ে পড়ছিলো কোন একাকী ঘাসফড়িং, ঝরণার ওপাশ হতে লাফিয়েছিলো কোন সুশান্ত স্যামন। পৃথিবীর অতলে বইছিলো নতজানু তরলধাতু, মেরুর মায়ায় চুম্বকায়িত অরোরা; আর তাই নির্ভুল গতিপথে, শান্ত মনে, ছোট্ট খোপে ফিরতে পেরেছিলো এক স্বর্গীয় সাদা পায়রা, বুকে তার রক্তক্ষত। তুমি দ্রোণাচার্যের অজ্ঞাত শিষ্য। ব্যাধের মতন নির্বিকার, ধনুকের মতন বাঁকানো। দূর হতে তীর ছুঁড়েছো, ফলায় গরল-হলাহল। ঘাড় ঘুরিয়ে যখন বলে গেলে, 'প্রিয়তম, অহং তোমার আঁধার', তোমার পায়ের কাছে, ঘাসের ওখানটায় তখন এক গহবর-কুহর, আর তুমি পেলব পায়ে, আলতো চাপে, পুঁতে গেলে তোমার দীর্ঘশ্বাসের বীজ, আর কিছুটা অভিশাপ। চাপা দিলে অতীত, মৃত্তিকার আর্দ্রতায়; সিক্ত করলে চোখের জলে, শুষ্ক ফোঁটায়।

চলে গেলে যখন, আঁধার ছেয়ে এসেছে। হাতড়ে হাতড়ে এলাম গর্তের কাছে, শরীরে কাঁদামাটি। মুখ ঝুঁকিয়ে দেখে নিলাম অতল ওয়ার্মহোল। ছোট্ট আলেফ। এক লহমায় দেখে নিলাম সময়ের আদি, সময়ের অন্ত, টানা সুতো। সময়টা শুধু তোমার। আমি নিস্পৃহ নিষ্কাম দেবতা দর্শক।

তুমি যদি শুধু আজ থাকতে দেবী, দেখতে অহংবোধের সেই মহীরুহ। ওর ডালপালায় কর্কশ পাখিদের কলকাকলি, নির্দয় চোখের পেঁচা বসে গিলছে নৃশংস। জটাজুট ঝুরি নেমে এসেছে সেই গাছের; জন্ম দিয়েছে নতুন অহং।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29248726 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29248726 2010-10-03 00:06:17
না দেখিবে তারে, পরশিবে না গো


Reading is an activity subsequent to writing – more resigned, more civil, more intellectual. - Jorge Luis Borges


অরণ্যের মায়াই শুধু শেখাননি বিভূতি; বিষণ্ণ দুপুরে নিশ্চিন্দিপুরের ঐ জংলা জায়গার দিকে অপুর নির্লিপ্ত তাকিয়ে থাকা, কী ভাবনা, রাংতার কথা, রেল দেখতে যাওয়া, বাঁশঝাড়ের ভেতর ছুটে আসা দুরন্ত দূর্গা – এগুলো, আরও অনেককিছু, অন্যকিছু, শব্দের আড়ালে, শব্দের ফাঁকে, উপরে, নিচে, বাক্য শেষ হওয়ার পর সাদাশূন্য ঐ খালি জায়গাটার দিকে, দুটো লাইনের মাঝে না-বলা কথা – এইসব, সবকিছু, আনমনে পড়তে থাকার সময় তুমি শুধু এইসবই ভাবছো না প্রিয় পাঠক, তুমি ভাবছো আরও অনেককিছু। তুমি ভাবছো সময়ের কথা, অন্য কিছু, অন্য মাত্রায়, অন্য ব্যাপ্তিতে, ইন্দির ঠাকুরণের চলে যাওয়ার সময় মাড়িয়ে যাওয়া ঘাসের কথা, সর্বজয়ার ব্যাখ্যাতীত সহিষ্ণুতার পাশে পড়ে থাকা ভাঙা হাঁড়ির কথা, বোন হারানো বালকের শৈশবের ক্রান্তিলগ্নে যখন পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন "মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়?"...তুমি কি জান বিভূতি, তুমি কি জানো তুমি বানিয়েছো কী এক স্বপ্নভূবন, বল্লালী-বালাই, আম-আঁটির ভেঁপু, অক্রূর সংবাদে তুমি দেখিয়েছো এক অন্যভুবন, প্রতিটি পাঠক নিজের মতন করে খুঁজে নিয়েছে একজন অপু, একজন দূর্গা, একজন সর্বজয়া, একজন হরিহর! এগুলোই কী ভীষণ বিস্ময়!

তাই যখন উচ্চারিত হয়, ‘অপু’ একবারই তৈরী হতে পারে, বিভূতি বন্ধ করে গেছেন সব পথ, বাংলার কোন এক রোমান্টিক বালককে নিয়ে লেখার সব পথ বিভূতি বন্ধ করে গেছেন – তখন ভাবনা হয়, বাল্য-শৈশবের কোন এক সময় এক ‘অপু’ যার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, সেই ‘অপু’ তো আর একা নয়! সে যে অবতার হয়ে বেঁচে আছে প্রতিটি পাঠকের কাছে। স্ব-চরিত্রে, স্ব-আবিষ্টতায়।

নিজেকে পড়া তাই, পাঠক হিসেবে, যদি তুমি লেখক হও, যদি তুমি কবি হও।
এই জীবন যেমন তোমার লেখার খাতা, তুমি লিখে চলেছো নিরন্তর, সময় পার হচ্ছে, তুমি করছো নিত্য নতুন শব্দচয়ন, তুমি পাতা উলটাচ্ছো, আর লিখে যাচ্ছো। অবিশ্রান্ত, ক্লান্তিহীন। বিমর্ষচিত্তে, কিংবা প্রফুল্লতায়। তুমি লিখেই যাচ্ছো। হ্যাঁ, তুমি তো লিখবেই, কিন্তু আমি শুধু বলবো এই ক্ষণে, চুপচাপ, ফিসফিস, একটু রোসো বন্ধু। তোমার খাতাখানি শেষ হওয়ার আগেই একটু না হয় পড়ে নাও নিজেকে, একজন পাঠক হিসেবে। নয় কোন হিসেব মেলানো, ওটা তো মিলবেনা কভু, শুধু একটু পড়ে নাও পাতা, তোমার পেছনের পাতাগুলো, যখন কাউকে তুমি ফেলে এসেছো নবম পৃষ্ঠায়...


তোমায় আমি ফেলে এসেছি নবম পৃষ্ঠায়, হারিয়ে যাওয়া এক ছেঁড়া মলাটের বই, তবু নির্লজ্জ সরল দোলকের মতন তোমার ফিরেফিরে আসা, মৃদু পায়ে, টিকটিক, আকঁড়ে আছো চোরকাঁটা। আমার ক্ষীণকায় দেহের কোথাও নেই তুমি, নেই তোমার স্পর্শ, শিউরে উঠা ছায়া, কেঁপে উঠা রাতের পাখি। তুমি দুপুরের রোদে পুড়ে যাওয়া রুধির, হিমশীতল রাতের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। তোমায় আমি ফেলে এসেছি আজ বহুদূর, তবু তোমার অকারণ সঙ্গ আমার একান্ত স্বপনে, নিরালায় চুপচাপ তুমি নিঃসঙ্গ জলের প্রতিচ্ছায়ায়। আমিতো ভালোবাসিনা; হ্যাঁ, আমিতো ঘৃণা করি প্রেম, আমিতো লিখিনা সেই মুহূর্ত, অন্তরালে চাপা দেয়া সমাধিতে, তোমার শীতল বুকের উপর আলতোভাবে শুইয়ে, যেভাবে সৈনিকের ফেলে যাওয়া ক্রুশ পরম মমতায় বুকপকেটে রেখে দেয় কোন সহযোদ্ধা; অথচ এই আমিতো করিনি কোন যুদ্ধ তোমার সাথে, তোমার বৈপরীত্যে, আমি ছিলাম নির্লিপ্ত, নিঃসাড়, আর তাই তোমার শবসৎকারে আমি কী ভীষণ উদার, তুমি কি আমায় ধন্যবাদ দেবেনা! সকালের অনুতাপবিদ্ধ শিশিরের মতন আমি ঝরে যাইনা, উদ্বায়ী হইনা, আমি উড়তে পারি না ভাবের সান্দ্রতায়। ডানছাড়া ইউনিকর্ন, নিঃস্বার্থ অথচ একাকী। শুষ্ক মৃত্তিকার উপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রস্তর তুমি ছুঁয়ে দেখোনি কখনও, তুমি ছুঁয়েছো আমায়, কিন্তু বোঝোনি তার শীতলতা, শ্বাসরোধ। তুমি কোথায় শুনেছো কুলকুল বয়ে যাওয়া নদী? অনর্গল নিঃসৃত প্রেমরস? তুমি বিভ্রম, তুমি মোহ। তুমি বিশ্বাস করতে ঐন্দ্রজাল, মায়া; এগুলোই তোমার প্রথাগত আচার; কারণ, পাথরের ঠুনকো দৃঢ়তা তুমি বোঝোনি, প্রিয়তম। পাথরের কান্না তুমি শোনোনি।


আর তারপর তুমি থামতে পারো, ভাবতে পারো, অথবা চুপ করে লিখতে পারো অন্যকিছু, অন্য সুরে, অন্য মাত্রায়, যখন তোমার জীবন বইটা বন্ধ হবে, তুমি স্বস্তি পাবে হয়তো কিছুটা, কারণ তুমি সব করেছো তোমার নিজের মতন করেই...!


And now, the end is near,
And so I face the final curtain.
My friends, I'll say it clear;
I'll state my case of which I'm certain.

I've lived a life that's full -
I've traveled each and every highway.
And more, much more than this,
I did it my way.

Regrets? I've had a few,
But then again, too few to mention.
I did what I had to do
And saw it through without exemption.

I planned each charted course -
Each careful step along the byway,
And more, much more than this,
I did it my way...


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29247334 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29247334 2010-09-30 00:33:56
দুটি পোলিশ কাব্য


মানুষের সাথে কথা না বললে হয়তো বোঝা যায়না সে কতটা বিনয়ী বা লাজুক। কতটা অন্তর্মুখী। ভিসওয়াভা সিম্বোর্স্কা হয়তো তেমনই এক লাজুক পোলিশ কবি, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। নামটা দেখে কবিতা অনুবাদে সাহস হয়নি কিছুদিন, কিন্তু তাঁর সলজ্জ, মৃদু তথাপি তীক্ষ্ণ চাহনি, আর রসাত্মক উইটিনেস বেশ বিমোহিত আচ্ছন্নকারী বটে, আর তাই অবশেষে হার মানা, আর ভাষান্তরে মানুষ বোঝার অপপ্রয়াস!

বলা হচ্ছে, ১৯৪৫ সালে Dziennik Polski নামক দৈনিক কাগজে তাঁর প্রথম কবিতা Szukam słowa ("I seek the word") ছাপা হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর আড়াইশোর বেশি কবিতা নাকি ছাপা হয়নি। লাজুক অন্তর্মুখী এই কবি হয়তো নীরবে এখনও লিখছেন চুপচাপ, কেউ জানছে না! প্রিয় শব্দগুলো রেখে দিয়েছেন নিজের জন্য, কেউ শুনছে না! দ্বিমাত্রিক কবিতার পৃষ্ঠায় তাঁর লেখা শব্দগুলো বেশ অস্তিত্ববাদী ধারণাপুষ্ট, খোঁচা দেয়। যাই হোক, তাঁর কবিতাগুলো অন্যান্য ইউরোপিয়ান ভাষা ছাড়াও এর আগে ভাষান্তর/অনুদিত হয়েছে চাইনিজ, জাপানিজ, হিব্রু আর আরবী ভাষায়। ১৯৯৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।



ভিসওয়াভা সিম্বোর্স্কা (Wislawa Szymborska) (২রা জুলাই, ১৯২৩ – )


সম্ভাবনাগুলো
- ভিসওয়াভা সিম্বোর্স্কা

আমি পছন্দ করি সিনেমা।
পছন্দ করি বেড়াল।
পছন্দ করি ওয়ার্টা নদীর পাশে ওকের ছায়া,
ডিকেন্সের চেয়ে দস্তভয়েস্কি।
মানবতাকে ভালোবাসার চেয়ে মানুষকে ভালো-লাগা
আমার বেশী পছন্দের।
আমার ভালো লাগে সুতো, যখন সূঁচটা আমার হাতের কাছেই।
আমার ভালো লাগে সবুজ।

আমি অপছন্দ করি সবকিছুর জন্যই বিচারবুদ্ধিকে দোষ দেয়া।
পছন্দ করি ব্যতিক্রম।
পছন্দ করি আগেই চলে যাওয়া।
পছন্দ করি ডাক্তারদের সাথে অন্যকিছু নিয়ে কথা বলা।
আমি পছন্দ করি পুরনো দাগানো নকশা।
কবিতা না লিখে হাস্যকর হওয়ার চাইতে
লিখে হাস্যকর হওয়া আমার বেশী পছন্দের।
আমার ভালো লাগে প্রেমের বাৎসরিক আকস্মিকতা,
তার প্রত্যহ উদযাপনে।

আমি পছন্দ করি নীতিবিশারদদের
যারা আমায় কোন প্রতিশ্রুতি দেয়না।
অতিরিক্ত সরল ভালোমানুষির চাইতে হিসেবী ভালোমানুষি
আমার বেশী পছন্দের।
পৃথিবীকে আমি পছন্দ করি বেসামরিক পোষাকে।
পছন্দ করি পরাজিত সাম্রাজ্য, বিজয়ীদের চাইতে।
পছন্দ করি আমার আপত্তি, বিরোধিতা।
শৃঙ্খলাবদ্ধ নরকের চেয়ে বিশৃঙ্খল নরক আমার বেশী পছন্দের।
আমি পছন্দ করি গ্রীম-ভাইদের রূপকথা, খবরের কাগজের প্রথম পাতার চেয়ে।
আমি পছন্দ করি ফুল-ছাড়া পাতা, পাতা-ছাড়া ফুলের চেয়ে।
পছন্দ করি মুক্ত লেজের কুকুর।
আমি পছন্দ করি সাদা চোখ, যেহেতু আমারটা কালো।
পছন্দ করি ডেস্কের ড্রয়ার।

আমি পছন্দ করি আরও অনেককিছু যা আমি উপরে লিখিনি,
অ-তালিকাভুক্ত আরও অনেককিছুর চাইতে।
আমি শূন্যদের পছন্দ করি বন্ধনমুক্ত,
সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো সংখ্যার পিছে নয়।
আমি পছন্দ করি পোকামাকড়দের সময়, নাক্ষত্রিক সময়ের চেয়ে।
পছন্দ করি গাছের গায়ে হাত বুলাতে।
আমি পছন্দ করিনা এমন প্রশ্ন – আর কতক্ষণ, কিংবা কখন।
পছন্দ করি এমনকি এমন সম্ভাবনাতেও যে
অস্তিত্বের আছে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ।

Possibilities
- Wislawa Szymborska

I prefer the cinema.
I prefer cats.
I prefer oak-trees by the Warta.
I prefer Dickens to Dostoyevsky.
I prefer myself liking humans
to myself loving humanity.
I prefer having a thread with a needle close at hand.
I prefer green.

I prefer not claiming that
the intellect should be blamed for everything.
I prefer exceptions.
I prefer leaving before.
I prefer talking to doctors about something else.
I prefer old marked illustrations.
I prefer being laughable because of writing poems
to being laughable because of not writing them.
I prefer odd anniversaries in love life,
to be celebrated every day.

I prefer moralists
who do not promise me anything.
I prefer calculated goodness to goodness that is too gullible.
I prefer the earth in civvy street.
I prefer conquered countries to the conquering ones.
I prefer having my objections.
I prefer the hell of chaos to the hell of order.
I prefer Grimm tales to the first pages of newspapers.
I prefer leaves without flowers to flowers without leaves.
I prefer dogs with their tails unclipped.
I prefer fair eyes since mine are dark.
I prefer drawers.

I prefer many things I have not listed above
to many others unlisted here.
I prefer noughts that are loose
to those queueing for a digit.
I prefer insect time to stellar time.
I prefer touching wood.
I prefer not asking how much longer and when.
I prefer considering even such a possibility
that existence has its reasons.

Translated by Mikołaj Sekrecki





১৬ই মে, ১৯৭৩
- ভিসওয়াভা সিম্বোর্স্কা

সেই তারিখগুলোর একটা,
যেটা আজ একেবারেই অপরিচিত,
অচেনা।

কোথায় যাচ্ছিলাম সেদিন,
কি-ই বা করছিলাম,
জানি না।

কার সাথে দেখা হয়েছিলো,
কি নিয়েই বা কথা বলছিলাম,
কিছুই মনে পড়ছে না।

যদি কোন অপরাধ হোতো সেদিন আশেপাশে,
আমার কোন অজুহাতই কাজে আসতো না,
হয়তো।

সূর্যটা জ্বলেছে গন্‌গন্‌, ক্ষয়েছে,
আমার দিগন্তবৃত্ত পেরিয়ে।
জগতটা ঘুরেছে চক্রাকারে
আমার লেখার-খাতার অগোচরে।

তার চেয়ে বরং ভাবি
এটা ছিলো ক্ষণস্থায়ী মৃত্যু,
যখন আমি বেঁচে ছিলাম
স্মৃতিশূন্য।

প্রেতাত্মা ছিলাম না বটে,
এতকিছুর পরও,
শ্বাস নিচ্ছিলাম দিব্যি, খাচ্ছিলাম,
হাঁটছিলাম।

হয়তো শোনা যাচ্ছিলো, আমার পদধ্বনি।
দরজার হাতলে আমার আঙুল
নিশ্চয়ই রেখে গিয়েছিলো তার ছাপ।

আয়না হয়তো বেঁধে ফেলেছিলো আমার প্রতিবিম্ব।
আমি হয়তো পড়েছিলাম কোন জামা,
হতে পারে এই রঙের, কিংবা অন্যকিছু।
আমায় কেউ দেখেছিলো নিশ্চয়ই।

হয়তো আমি ফিরে পেয়েছিলাম কিছু একটা সেদিন,
হারিয়ে যাওয়া।
হয়তো হারিয়েছিলাম কিছু,
দেরিতে আসা।

সংবেদনশীল অনুভূতিগুলোয় পূর্ণ ছিলাম
আমি।
অথচ সবকিছুই আজ ব্রাকেটের মাঝে
ফোটা ফোটা বিন্দুর মতন।

কোথায় লুকিয়ে ছিলাম,
কোন অজ্ঞাতবাসে?
স্বচক্ষুর সামনে অন্তর্ধান,
কৌশল তো খারাপ নয়।

স্মৃতি ঝাঁকাই।
হয়তো এর শাখাপ্রশাখায় ঘুমিয়ে থাকা
ওগুলো জেগে উঠবে সহসা, পাখা ঝাপটাবে,
কাঁপবে, পতপত।
নাহ্‌।
স্পষ্টতঃই, আমি আশা করছি অত্যধিক।
একটি পূর্ণ মুহূর্ত, নিদেনপক্ষে।

MAY 16, 1973
- Wislawa Szymborska

One of those many dates
that no longer ring a bell.

Where I was going that day,
what I was doing --- I don't know.

Whom I met, what we talked about,
I can't recall.

If a crime had been committed nearby,
I wouldn't have had an alibi.

The sun flared and died
beyond my horizons.
The earth rotated
unnoted in my notebooks.

I'd rather think
that I'd temporarily died
than that I kept on living
and can't remember a thing.

I wasn't a ghost, after all.
I breathed, I ate,
I walked.

My steps were audible,
my fingers surely left
their prints on doorknobs.

Mirrors caught my reflection.
I wore something or other in such-and-such a color.
Somebody must have seen me.

Maybe I found something that day
that had been lost.
Maybe I lost something that turned up late.

I was filled with feelings and sensations.
Now all that's like
a line of dots in parentheses.

Where was I hiding out,
where did I bury myself?
Not a bad trick
to vanish before my own eyes.

I shake my memory.
Maybe something in its brances
that has been asleep for years
will start up with a flutter.
No.
Clearly I'm asking too much.
Nothing less than one whole second.

Translated by unknown




________________________

একটা মেমেন্টো...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29244213 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29244213 2010-09-24 00:13:42
বেড়ালের কান্না




প্রমত্ত পদ্মার ঢেউয়ে কাদামাটির জীবন উথালপাথাল করে। গহন উর্বরা জল। ছোট ছোট ঢেউ, ছোট ছোট ধাক্কা। গলুইয়ের মরিচা না-পড়া টিনের পাত ঝলকায়, চমকায়, পড়ন্ত বিকালের রোদ কেঁপে উঠে। বামে তাকালে পাড় দেখা যায় ওই। দেখা যায় গাছ, নদীর ভাঙন, ঘরবাড়ি, মানুষ।

লৌহজং থানা...আরেকটু সামনে...অই বামে...
ঢেউ আসে পাশ থেকে। নৌকা দুলে। নৌকা ঘুরে। মাঝবয়েসী মাঝি। কাঁচাপাকা চাপদাড়ি। প্রাণবন্ত পদ্মার প্রতিচ্ছায়া।

- আপনে কইত্থন?
- ওইপার...জাজিরা...
- অইখানে থাকেন?
- না
- ও...বেড়াইতে আইছেন?
- হু

সন্ধ্যার আকাশ ঢিমেতালে রঙ ছড়াচ্ছে। সূর্য ডোবা শুরু হলে রূপ বদলায় প্রকৃতি, কালো হওয়ার আগে নিজের সৌন্দর্য তুলে ধরে, লালচে আভা ছড়ায় দিগন্তে। একটু উপরে চারপাশে নীল আকাশ, তাতে ভাসছে সাদা মেঘ, একটু রঙ লেগেছে, তাতে উড়ে যাওয়া কালো কালো দূরের পাখি। ছোট নৌকার গলুইয়ের সমান্তরালে জীবন চলে। মরা গাঙে জোয়ার আসে বৎসরের এই সময়।

- সন্ধ্যা হয়া যাইতেছে...আপনে কি আবার ওইপার যাইবেন?
- জানি না...আপনি কি দাঁড়াবেন?
- খাড়াইবার পারি...আইছেন তো একলাই...যাইবেনও একলা...সমস্যা কি

দাঁড় টানে মাঝি। দুলে দুলে। তাইচি’র মতন ধীরলয়ে, শক্তিমত্তায়, মন্থর গতিময়তায়। বুক ভরে টেনে নেয় বাতাস। ঢেউয়ের ধাক্কা আর দুলে উঠা নৌকায় অদ্ভুত ভারসাম্যতা তার। অস্থিতিশীল পারিপার্শ্বিকতায় অটল অনড় সে, মুখে মৃদু হাসি, ঠোঁটে গুনগুন গান।

ওরে হেএএ...আসবার কালে আসলাম একা,
থাকবার কালে থাকলাম একা,
যাইবার কালেএএ গেলাম একা রেএএ...

সন্ধ্যালগ্নে সূর্যটাও অস্ত গিয়েছে এই ফাঁকে, একা। মাটির গন্ধ খুব কাছে এখন। পাড়ের গুঞ্জন কোলাহল শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারে ছোট ছোট জোনাকপোকার মতন আলো জ্বলে কিছু ঘরে। আরেকটু কাছে আসলে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় সংসার, মুড়ির টিন, বাক্স-পেটরা, আচারের বয়াম। বাড়ির উঠানে শুকাতে দেওয়া কালো কালো শাড়ি।
ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ। বৈঠার আওয়াজ। নদী-গন্ধ মনে।

- লৌহজঙ্গে কার বাড়িত...
- ইসমাইল প্রধান...
- চিনবার পারলাম না...
- প্রাইমারী স্কুলে পড়ান...
- পেরাইমারি ইসকুল?...লম্বা কইরা, কালো?
- না। খাটো।
- নাহ্‌ চিনি না...আফনের কে লাগে...

কাঠের নৌকা ঠেকলো শক্ত মাটিতে।

- ...কেউ না।




সন্ধ্যা হলেই নদীপাড়ের এই নিবিড় চুপচাপ পিছিয়ে পড়া জায়গায় দুটি-পাতা একটি কুড়ি আর তামাকের আশ্রয়ে একত্র হয় জবুথুবু মানুষ। সভ্যতায় দিনের পর রাত্রি ঘনায়, রাত্রি হলেই অন্ধকার আসে, লিয়ন-ফুকোর পেন্ডুলাম এগুলো বুঝেছিলো ঠিকই, শুধু বোঝেনি অন্ধকার হলে আলোর দরকার হয়, আর অসভ্য মানুষের জীবনে পুরোপুরি আলো আসে না। সূর্য নামের মাঝারি নক্ষত্রের অনুপস্থিতিতে ওদের নীরব দোলনকাল কেউ দেখে না। নদীর উদার বাতাস তাই এখানেই আসে তার মুক্তসত্তা নিয়ে, কুপির আলো কাঁপে, আর হারিকেনের স্বচ্ছ আচ্ছাদনের তলায় নির্লিপ্ত অগ্নিশিখা দেখে স্বজাতির উন্মাতাল কম্পন।

- কান্ট?
- জ্বী, ইমানুয়েল কান্ট। অই চা দেরে পরান।
পরান চা ঢালে। গাঢ় লিকার।

- আমি কিন্তু খুব অবাক হইছি আপনে আমার সাথে দেখা করতে আসছেন ঢাকা থেইকা...
- অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি জ্ঞানীগুনী মানুষ। আপনার কথা শুনেছি।
- আমার কথা? কী ভয়ংকর ব্যাপার! কোথায় শুনলেন! কী ভয়ংকর কথা!
- চা নেন।
- আপনি ঢাকায় কি করেন...
- শুভ, আমার নাম শুভ।
- ...আপনি ঢাকায় কি করেন শুভ?
- আলোর তীব্রতা মাপি...
- এ্যাঁ...
- কিছুনা...আপনি বলতেছিলেন কিছু...
- ও হ্যাঁ, হ্যাঁ...কি যেন বলতেছিলাম...
- বলতেছিলেন, ক্রিটিক অফ পিওর রিজন। ইমানুয়েল কান্ট।
- ও হ্যাঁ, কান্ট। জ্ঞানী মানুষ বুঝলেন দাদা। সত্যিকার জ্ঞানী...
- বলেন। শুনতেছি।
- শোনেন তাইলে। জার্মানীর মানুষ...তাদের বুদ্ধি একটু বেশীই। এই মানুষটা যেই জায়গায় জন্মাইছে তার একশত মাইলের বেশী দূরে কখনও যায় নাই...এক্কেরে ঘরকুনা। তো কান্ট...আইচ্ছা, তো উনি এইটাই বলতে চান যে এই দুনিয়ায় আমরা যাই দেখি, যাই জ্ঞানার্জন করি, সবকিছুই মতামতের ভিত্তিতে প্রকাশিত বা বর্ণিত। যেমন, আমি বাঁইচা আছি, কিংবা আমি পরানরে টাকা দিলে সে আমারে চা দিবে, উনি এইটারে বলতেছেন জাজমেন্ট। এই জাজমেন্ট আবার এ্যানালিটিকাল আর সিনথেটিক। এ্যানালিটিকাল বা বিশ্লেষণধর্মী কথাটার মানে হইতেছে আমি একটা গাছরে বুঝতে চাইলে এর সব মূল, কাণ্ড, পাতাসহ উল্লেখযোগ্য উপাদানসমূহরে বুঝলেই চলবে। কিন্তু উনি এইটার ব্যাপারে তৃপ্ত ছিলেন না। উনি বললেন যে এই বিশ্লেষণধর্মী জাজমেন্ট আমাদের মূল জ্ঞানে কিছুই যোগ করে না, কারণ এইটা অই মূল সংজ্ঞার শুধু একটা উপাদানের উপরই জোর দেয়। বুঝলেন কিছু?
- হু, আপনাকে বুঝতে চাইলে আপনার দেহ, মন ও অন্য উপাদানসমূহের ধারণাই প্রকৃত জ্ঞানের বৃদ্ধি ঘটায় না।
- জ্বী, কারণ এতে একটা কনসেপ্ট থেকে আরেকটা কনসেপ্টে পৌঁছানো যায় শুধু, শুধু একটা ধারণা থেকে আরেকটা ধারণায় পৌঁছানো। সত্যিকার জ্ঞান না।
- হুম।
- তারপর উনি বললেন সিন্থেটিক জাজমেন্টের কথা। সংশ্লেষণধর্মী। এইগুলা জগত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়ায়। উনি বললেন, সিন্থেটিক জাজমেন্ট সেইগুলাই যাদের কোন এ-প্রায়োরি নাই। এগুলা পোষ্ট-প্রায়োরি।
- এ-প্রায়োরি?
- উমম...এইটার মানে হইলো অভিজ্ঞতা হইতে মুক্ত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফ এ্যানি এক্সপেরিয়েন্স। তার মানে দাঁড়াইলো, সিন্থেটিক জাজমেন্ট অভিজ্ঞতার উপ্‌ড়ে খাড়ায় থাকে। পানি টগবগ কইরা ফুটে একশত ডিগ্রী তাপমাত্রায়, এইটা আমাদের জ্ঞান বাড়ায়। জগত বুঝতে এই অভিজ্ঞতা লাগে। কিন্তু সমস্যা আছে যে এই পোষ্ট-প্রায়োরি সবসময় ঠিক নাও হইতে পারে। পানি সবসময় একশত ডিগ্রী তাপমাত্রায় নাও ফুটতে পারে। কান্ট জ্ঞানী মানুষ। উনি শুদ্ধতা খুঁজেন। উনি বাস্তবতা ধরতে চান। তাই উনি বুঝতে চাইলেন যে এমন কোন সিন্থেটিক জাজমেন্ট থাকতে পারে কি যেইটা এ-প্রায়োরি? জ্ঞান বাড়াবে কিন্তু পাশাপাশি অভিজ্ঞতা হইতে মুক্ত। যদি এইটা থেকে থাকে, তবে এইটাই সেই জ্ঞান যা কিনা পরম আর সব মানবতার জন্য প্রযোজ্য। তাই সকল কান্টিয়ান দর্শন এই প্রশ্নটার উপরই দাঁড়ায় আছে যে, এ-প্রায়োরি সিন্থেটিক জাজমেন্ট কিভাবে সম্ভব? বুঝলেন কথা...পরান আরো দুই কাপ দে...চিনি কমায় দিস আমারটায়।
- সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি জাজমেন্ট। সায়েন্স তো এটাই ফরমুলেট করে।
- আরে আপনে তো জানেন দিখি এইসব...
- কিছু কিছু।
- মাইনষে কয়, আরে দর্শন পইড়া কি হইবো। আসল কথা হইলো যে দর্শন জানবো কি জানবো না সেই বিষয় না, ব্যাপার হইলো আমাদের দর্শন জানতেই হপে, কোন উপায় নাই। আমাদের চেতনা আমাদের প্রশ্ন জিগায় তো আমরা চুপ থাকবো কেমনে? আমাদের জানতেই হ...
- আপনি কোথায় থাকেন?
- এইতো এইখান থেইকা আধাঘন্টার পথ, আমি তো কইলাম লন যাই...
- না থাক, এখানেই ভালো। নদী দেখি।
- আর নদী। এখন একটু পোয়াতি হইছে। মানুষ ধ্বংস করে সব।
- ধ্বংস করে...
- জ্বী। আমি যখন ছোট আছিলাম, আহা...কী দিনগুলাই না ছিলো। বর্ষায় পানি আসতো। বন্যা হইতো। কাদামাটি। মানুষ কষ্ট পাইতো ঠিকই, কিন্তু ওইগুলার মইধ্যেই কেমন আনন্দ ছিলো...একটু সময় গেলে বানের পানি পরিষ্কার হইতো, কাদার তলানি পড়তো...মাটি হইতো উর্বরা, আর তারপরেই জীবন...আহা ছোট ছোট বোয়াল মাছের পোনা বাইরাইতো কোত্থেইকা...আমরা শুধু দেখতাম, ডিঙ্গি নৌকা নিয়া পিছু পিছু যাইতাম...মনের সুখে কচিকচি পোনারা কেমন আনন্দে ছটফট করতো...আর এখন মানুষের হাত থেইকা এগুলোর রেহাই নাই...আহারে কচি পোনা, কচি জীবন...এগুলা এখন খালি কষ্টে ছটফট করে...
- আপনি বলতেছিলেন...
- ও হ্যাঁ, হ্যাঁ...কি যেন বলতেছিলাম...
- বলতেছিলেন কান্ট। সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি।
- মানুষটার কাজ এতই বড় যে ওইটা কইতে থাকলে পদ্মার পানি শুকায় যাইবো। কোন দর্শনই সারাজীবন টিকা থাকে না, মানুষের মতন, হেহে। তবে হ্যাঁ, উনার বড় ব্যাপার হইলো উনি মানুষরে চিন্তা আর যুক্তির সীমাবদ্ধতা শিখাইছেন। জ্ঞানী মানুষ।
- সীমাবদ্ধতা?
- জ্বী, জানার সীমাবদ্ধতা, চিন্তার সীমাবদ্ধতা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা...পরান আগুনটা ইদিক দে...বিড়িটা ধরাই...আপনে?
- আমি বিড়ি খাই না।

তারপর কি বলতে গেলো লোকটা, যার নাম আমি জানি ইসমাইল প্রধান, কিন্তু আমি শুনতে পেলাম না। মাথাটা হালকা হঠাৎ। খালি খালি লাগছে। বাতাসটা থেমে এসেছে। ফুঁ শব্দ হতেই মুখ তুলে তাকাতে আমার সামনের কাঠের বেঞ্চির উপর বসা পিচ্চি চায়ের দোকানের সামনে বিড়ির ধোঁয়ার আড়ালে হারিকেনের আলোয় যে মুখটা ভেসে উঠলো, সেটা কিঞ্চিত পোড়খাওয়া, মধ্যবয়সী, কাঁচাপাকা দাড়ির একজন। চোখের নিচে হালকা কালচে দাগ, বাম চোখের তলে একটু বেশী। বেটে খাটো, গোলগাল, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। সাদা শার্ট পড়া, হাতার কোনায় ইস্তিরি হয়নি ঠিকমতন।
খুকখুক কাশলেন ইসমাইল প্রধান।

- আপনি কি ক্লান্ত, শুভ?
- না তো। আমি শুনতেছি আপনার কথা। আপনি তো এখানেই আছেন কিছুদিন হোলো।
- জ্বী, তাতো বছরখানেক হবেই...ইসকুলে পড়াই...সবাই চেনে আরকি...হেহে
- নদীর মাঝি আপনাকে চেনে না।
- কি! ও...আমি নদী পাড় হইনা খুব একটা আরকি...
- আমি জিজ্ঞেস করলাম আশরাফ মাষ্টারের বাড়ি যাবো, সে চিনতে পারলো না...
- ও
- পাড়ে এসেও ঐ ওষুধের দোকানে জিজ্ঞেস করলাম, তারাও...
- আরে, এইটা তো হওয়ার কথা না...ঠিক নাম বলছিলেন তো?
- জ্বী, ঠিক নাম বলেছিলাম। ঠিক নাম।
- এইটা তো হওয়ার কথা না...মা ফার্মেসী?
- জ্বী, মা ফার্মেসী।
- এইটা তো হওয়ার কথা না...
- থাক হয়তো ভুল নাম বলেছিলাম
- ভুল নাম...
- আপনি বলছিলেন কান্ট। সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি।
- হুমম। আপনি বলেছিলেন আপনি ঢাকা থেকে আসছেন...
- সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি...কান্ট...
- জ্বী আচ্ছা...খুব আগ্রহ তো আপনার...ঠিক আছে...আইচ্ছা, বলতেছিলাম যে...হুম আইচ্ছা...বলতেছিলাম উনি মানুষরে চিন্তা আর যুক্তির সীমাবদ্ধতা শিখাইছেন।
- বলুন। সীমাবদ্ধতা নিয়ে বলুন।
- এই জগতের কোন কিছুই যদি আমাদের জন্য বাস্তব হইতে হয়, তবে সেইগুলার স্থান এবং কাল থাকতেই হবে। কান্ট বলতেছেন এই স্থান বা স্পেস আমাদের বাইরে, মানে, অবজেক্টিভ জগতে অস্তিত্বহীন, কিন্তু এই স্পেস আবার আমাদের চেতনারও একটা অংশ। স্পেস কোন অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, কিন্তু এইটা সকল অভিজ্ঞতার শর্ত। স্পেস ইন্দ্রিয়গোচর বা পদার্থ বা বস্তু না, স্পেস যুক্তির মাধ্যমে পৌঁছানো কোন ধারনাও না, স্পেস হইতেছে এক্কেবারে খাঁটি ইন্টিউসন, যারে বলে অন্তর্জ্ঞান বা সহজজ্ঞান। এই অন্তর্জ্ঞান হইলো সরাসরি জ্ঞান, ডিরেক্ট নলেজ, কোন প্রকার যুক্তিবিন্যাস বা যুক্তিপাত ছাড়াই।
- কোন যুক্তি ছাড়াই।
- জ্বী, ফলের খোসা ফালায় দিয়া এক্কেবারে ভিতরের শাষটা খাইতে যেমন লাগে, তেমন।
- হুম।
- স্পেস বা স্থান সম্পর্কিত অন্তর্জ্ঞান একটা এ-প্রায়োরি সিন্থেটিক জাজমেন্টের শর্ত। সময়ের ক্ষেত্রেও অই একই ব্যাপার। সময় কোন বস্তু না, সবকিছু সময়ের মধ্যেই আছে। চেতনাও তাই, চেতনার ছোট ছোট অংশ হইতে পারে না, কারণ চেতনা অক্ষত, অটুট। বিজ্ঞান আমাদের বস্তজগতের সংযোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু বস্তুর সত্যিকারের গুণাবলী সম্পর্কে কোন অন্তর্জ্ঞান দিতে পারে না। এইগুলা সীমাবদ্ধতা। বস্তুরে জানার সীমাবদ্ধতা, বোঝার সীমাবদ্ধতা। বস্তুর সত্যিকারের গুণাবলী মাইনষে কোনদিনও জানতে পারবো না। বস্তুজগতে ঢুকলেই সেইটা ফেনোমেনন হয়ে যায়, পিওর রিজন বা শুদ্ধ-যুক্তি দিয়ে তারে যাইবোনা ধরা...আপনেরে খুব সহজ ছোট কইরা বললাম...রাত হইতেছে...আপনে কি ফিরবেন?
- আপনি স্থির হোন।
- ইস্থিরই তো আছি...
- আপনার হাত কাঁপছে, পানি খান।

জায়গাটা চুপচাপ হয়ে পড়েছে এখন। পরান শুধু ধীরে ধীরে রং-চা বানিয়েই যাচ্ছে। কেউ তাকাচ্ছে না। মানুষজন কিছুই শোনেনা আজকাল।
চাঁদটা শুধু মায়াবী লাগছে...

- ভালোবাসা কি একটা সিন্থেটিক এ-প্রায়োরি, জনাব আশরাফ?
- কিহ্‌!
- আশরাফ মাষ্টার, বলুন, ভালোবাসা কি জ্ঞান বাড়ায় কিন্তু পূর্ব-অভিজ্ঞতা মুক্ত?
- বুঝলাম না শুভ...
- ভালোবাসা কি বস্তুর ভেতরের পরম জ্ঞান? অন্তর্জ্ঞান দিয়ে বুঝতে হয়? ফলের খোসা ছাড়ানো শেষ হলে টুপ করে গিলে ফেলা? এটা কি বস্তু জনাব আশরাফ? এটা কোন স্পেসে থাকে জানেন কি?
- কিয়ের মধ্যে কী!
- ভালোবাসার অস্তিত্ব কোথায়, জনাব ইসমাইল প্রধান? এটা কোন চেতনার অংশ?
- আপনে...আপনে...
- নদীর ঐপারে আপনি ইসমাইল প্রধান, এপারে আপনি আশরাফ মাষ্টার, আপনি হয়তো আরও অনেকেই...অসংখ্য স্পেসে আপনার বিচরণ, আপনার এসেন্স আপনি ছড়িয়ে দিয়েছেন, আপনার কোন চেতনায় আপনি আছেন এটা কি আপনি জানেন?
- নদীর ওইপারে...ওইপারে...
- জাজিয়া, তেওটিয়া তারপর আমি এইখানে...লৌহজং...আর আপনি প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টার। আশরাফ মাষ্টার। আপনি সাদা খরগোস সবুজ রঙ করে ঘাসের মধ্যে শুইয়ে রাখেন। ওদের দ্যাখেন। আপনার বাসায় বিড়ালের খাঁচা থাকে। একটা ছেলে বিড়াল, একটা মেয়ে বিড়াল। ওদের জোর করে ধরে আটকে রাখেন খাঁচায়। ওরা মানতে চায়না। সময় যায়। আপনি ওদের দ্যাখেন। এই স্পেসে ওদের অবজার্ভ করেন। আপনি আশায় বুক বাঁধেন। কিছুদিন পর ওরা কাছাকাছি আসে, মুখ ঘসে। ঢুলুঢুলু চোখ ওদের। এই স্পেস ফুড়ে ওদের মাঝ হতে হঠাৎ অন্যকিছুর উৎপত্তি ঘটে। ওরা আলিঙ্গন করে। আর তারপর আপনি ওদের আলাদা করে ফেলেন, দুটো আলাদা খাঁচায় রাখেন, ওরা ছটফট করে জনাব ইসমাইল...আপনি কি ওদের কান্না শুনতে পাননা?
- কেমনে...কেমনে আপনি এতসব...
- গোঁসাইরহাট। শরীয়তপুর।
কেঁপে উঠে বেটে লোকটা। উঠে দাঁড়ায়।

শুভ নামের ছেলেটা কথা বলতে থাকে, আর রাতের আঁধারের ভেতর মাটির পথটা ধরে ছুটে যায় বেটে খাটো এক দার্শনিক।

গোঁসাইরহাট...শরীয়তপুর - বলতে থাকে ছেলেটা, নির্লিপ্ত নির্বিকার চিত্তে - চোদ্দ বছরের এক কিশোরী। চপল, উচ্ছল, প্রাণবন্ত। জায়গাটা কোদালপুর। মেঘনার কাছেই। নদীর মতন বেড়ে উঠছিলো। বিয়ে হয় আপনার সাথে। আমার চাচাই বিয়ে দেয়। চাচাতো বোন আমার। নাহ্‌ শুধু বোনই। শহুরে মানুষ আমি, গ্রামে গেলে দেখা হোতো শুধু। বিয়ের আগে কবে দেখেছি মনে নেই, শুধু মনে আছে ছোটবেলায় ওর গম্ভীর কালো চোখের কথা, মুখ টিপে হাসি। আমায় আম পেড়ে দিতো। আপনার সাথেই ওর বিয়ে হয়। চৌদ্দ বছরের মেয়ে। আপনি ইসমাইল প্রধান। চাউলের আড়তদার। আপনিই সেই ইসমাইল প্রধান যে ছোটবেলায় বোয়াল মাছের পোনার পেছনে ছুটতেন, সাথে থাকতো আপনার ছোট ডিঙি নৌকা। আপনার খুব কষ্ট মানুষ ধ্বংস করে ফেলছে কোমলতা, পেলবতা। আর আপনি ইসমাইল প্রধান যে ঘুরে বেড়ান ছদ্মনামে, আর বিয়ে করেন গ্রামের ছোট ছোট বালিকা। স্বপ্নের জীবনের আশ্বাস দেন ওদের আর তারপর কী ভীষণ কষ্ট দেন ওদের। আপনি বলাৎকারকারী। আপনি ধর্ষণকারী। আপনার চেতনার কোন স্পেসে আপনি বোয়াল মাছের কচি পোনার পেছন ছুটতেন, আর কোন স্পেসেই বা ওদের পিষে ফেলতেন?

শুভ নামের ছেলেটার হাতে ধরা একমাত্র চায়ের পেয়ালায় এখন এক জার্মান দার্শনিক, বোয়ালমাছের পোনা, ধর্ষকামী প্রেতাত্মা, কালো কিশোরীর চোখ, আর কিছু বেড়ালের কান্নার ঘূর্ণিজল।
পেয়ালায় চুমুক দেয় ছেলেটা।



আধঘন্টা পর...
পোয়াতি পদ্মার শব্দ এই জায়গায় আসে না। পথে আসার সময় কিছু জোনাকপোকা সঙ্গ দেয়ায় একাকী মনে হয়নি ছেলেটির। ধীরপায়ে লৌহজঙের প্রাইমারী স্কুল-শিক্ষক আশরাফ মাষ্টারের বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছুতেই পশ্চিমদিকের বাংলাঘরের ভেতর থেকে ছেলেটা শুনতে পায় কিছু ফ্যাসফ্যাসে কথা...

...ভালোবাসা বাঁচাই আমি...ওই পিশাচগুলা ভালোবাসা ধ্বংস করে ফেলার আগেই আমি বাঁচাই ভালোবাসা, চেতনায় মিলায়ে যায় সেই ভালোবাসা, এই জগতের স্পেস পরিপূর্ণ করে দিতে চাই আমি, ভালোবাসায়...

মূল্যহীন কথাগুলোর মাঝে শুধু বিড়ালের কান্নার প্রতিধ্বনি।
ছেলেটার হাতে ঠাণ্ডা শীতল মেটালিক অনুভূতি।
এই জগতটার শুধু কোন অনুভূতি নেই।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29240785 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29240785 2010-09-17 00:22:47
বংশীবাদক দীপক


...বাঁশিই আমার পত্নী, প্রেয়সী... – ওস্তাদ হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া

রাগ-দূর্গার গম্ভীর ঐন্দ্রজালিক টান নয়, চৌরাসিয়া নন, ইনি হচ্ছেন দীপক রাম। কুশলী, বহুমুখী বংশীবাদক। চিরায়ত উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতের পথে চলেন তিনি। সঙ্গীতজ্ঞ। সোলোয়িষ্ট। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৭৫ সালে তার হাতেখরি একাধারে বাঁশি ও তবলায়। ১৯৭৭ সালে ভারতে আসেন। উদ্দেশ্য - শ্রী সূর্যকান্ত, ভারতীয় বাঁশির এক সুদক্ষ কারিগর ও নির্মাতা। পাশাপাশি কিছু সময় কাটালেন পণ্ডিত বিজয় রাঘব রাওয়ের আশ্রমে। তবে স্বপ্ন পূরণ হোলো ১৯৮১ সালে, যখন নিজেকে আবিষ্কার করলেন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার শিষ্য হিসেবে, দীপক যাঁর কাছে এখনও ফিরে যান বারে বারে। ৮১’র ওই সময়েই তিনি তবলা শিখেছেন শ্রী দিশান্ত এর কাছে। সঙ্গীত নিয়ে তাত্ত্বিকজ্ঞান লাভ করেছেন পণ্ডিত রাজারাম শুক্লা’র কাছ হতে।

১৯৯৬ সালে দীপক মাষ্টারস’ ডিগ্রী অর্জন করেন দক্ষিণ আফ্রিকার রোডস বিশ্ববিদ্যালয় হতে। বিষয় ছিলো সঙ্গীত। তার থিসিসের টাইটেল ছিলো - Exploring syncretism between Indian and western music through composition। হ্যাঁ, আর এখানেই তিনি অনন্য। পশ্চিম আর পূবের মিলন ঘটাতে চান তিনি। ভারতীয় সঙ্গীতের প্রাজ্ঞতা আর পশ্চিমা ঐতিহ্য - এই দুইয়ের সংমিশ্রণপুষ্ট দীপক পদার্পণ করলেন জ্যাজ, কোরাল/বৃন্দগীতি, ব্যালে, অর্কেষ্ট্রাতে। গিটার, ওদ, ভায়োলিন, ভায়োলা, চেলোর সাথে ঘটালেন বাঁশির ফিউশন। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাণ্ডদল তাহ-নাহ-নাস (Tananas) সাথেও তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আছেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া – সান্তা ক্রুজে। পড়ান ভারতীয় সঙ্গীত। এছাড়া ডারবান বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ফুল-টাইম হিসেবে কর্মরত ছিলেন চার বছর। ২০০০ সালে তার এ্যালবাম Searching for Satyam নির্বাচিত হয় Best Instrumental Album at the South African Music Awards’এর জন্য। এর আগে ১৯৯৯ সালেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বেষ্ট মেইল আর্টিষ্ট হিসেবে। দীপকের বাঁশির ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যাবে ম্যাট্রিক্স রেভুলেশন, ফাষ্ট এন্ড ফিউরিয়াস, স্টেলথ, মায়া ফিল্মের সাউণ্ডট্র্যাকে।

বুদ্ধা-বার এ্যালবামের ভ্যলিউম-ওয়ান এ আছে তার Kitu, একটু পরে আসেন তিনি, অদ্ভুত বাঁশি নিয়ে। আর ভ্যলিউম-থ্রি (ড্রিমস) – নাইট ইন লেনাসিয়া। তার সর্বশেষ এ্যালবাম সূর্য (surya), যেখানে তিনি কাজ করেছেন তুর্কী গিটারীয় প্রতিভা মেসু ওজগেন (Mesut Ozgen) ' এর সাথে।

দীপক রাম - কিতু
দীপক রাম - নাইট ইন লেনাসিয়া


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29237888 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29237888 2010-09-10 08:15:38
নির্বোধ চিঠি আকাশ,

ঘুমিয়ে পড়েছিলে। জেগে উঠেছো। ফিরে গিয়েছো আবার, আমায় এখানে ফেলে।
দিনটা কেমন গেলো তোমার? তোমার বস্তুজগত, তোমার চর্ম, রক্তমাংসের বাস্তবতা? তোমার আয়তাকার চোখ, যে দুটো পা দিয়ে হাঁটো, তোমার ঘর্মগ্রন্থি, লোম, এই সময়টায় ঘেমে যাচ্ছো খুব, আমি দেখছি। স্যাঁতস্যাঁতে বঙ্গ। মানুষের মনগুলোও তাই। ঘেমে উঠে।

কেমন চলছে তোমার জীবন? দেখ্‌ছি সব। বিবর্তিত হয়েছো বেশ। হোচ্ছো। হবেই-বা না কেনো? সময় পেড়িয়েছো। চামড়া না কুঁচকালেও মন তো কুঁচকিয়েছে। নিজের অজান্তেই বেড়ে উঠেছো। প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। দাদাবাড়ির ঐ ছোট্ট লিচুগাছটাকে তো আর রহস্যময় লাগে না তোমার। ওর ঐ ছোট্ট কচিপাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আঙুল দিয়ে হেঁটে বেড়াও না আর। লাফিয়ে উঠে ডাল ধরতে যাও না তো। ইয়া বড় ঢিল মেরে মগডালের ঐ পাতা ছুঁতে না পারায় কী বিষণ্ণই না ছিলে তুমি। ওখানে গেলেই পুকুরের ওপাশের এই গাছটার কাছে সবার আগে চুপ করে এসে বসতেই হোতো তোমার। গাছটায় একটা অন্ধকার ছিলো। ওর খণ্ড-খণ্ড রূপ নিয়ে বেঁচে ছিলে তুমি, তোমার কাছে তাই ওটা রহস্যই ছিলো। এখন পূর্ণাঙ্গ রূপে ওর ডাল-পাতার সব সীমাবদ্ধতা আর অর্থ বুঝে তোমার কাছে ওটা কেমন পানসে হয়ে গেছে। তুমি গাছটাকে এখন সম্পূর্ণরূপেই দেখছো।
বিবর্তিত হয়েছো। তুমি, আর গাছ।
এটার গন্ধ কি তুমি পাও, বিশুদ্ধ সজ্ঞার?

সূর্য উঠে গেলে তুমি মিশে যাও জগত-উপাদানের সাথে, মানুষের সাথে। সকালের বেসিনে তোমার আঙুল, বোতাম লাগাচ্ছো, জুতোর ফিতে, ব্রেকফাষ্টের টেবিল, তোমার নির্জন কক্ষ। মানুষের সাথে মিশতে হয় তোমার। এটা এড়াতে পারো না তুমি। তোমার ঘরের বাইরে প্রথম মানুষটার সাথে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি তোমার সাথে কথা বলি আকাশ। তোমায় সঙ্গ দিই। তারপর যেই মুহূর্তেই তোমার ল্যারিক্স কেঁপে উঠে, তুমি সহাস্য-বদনে, ছলে, অভিনয়ে, কূটকচালে এগিয়ে যাও সামাজিকতায়, আমি নীরব নিশ্চুপ নিস্তব্ধ।
তুমি চুপ হলে, আমি কথা বলি। তুমি থেমে থাকলে, আমি তোমায় দেখাই মহাকাল।

সজ্ঞানতার সংজ্ঞা চাও তুমি? চেতন হয়ে বুঝতে চাও অচেতন?
আচ্ছা, তোমার মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা? আর্তনাদ নিয়ে ছুটে চলা? জগদ্দল পাথর চাপা বুক, অসহ্য বর্ণনাতীত উদ্বেগ, অনিশ্চয়তাবোধ? কেঁপে কেঁপে নেমে আসা রাতের আঁধার, দ্রুত হাঁটা পথ। পৃথিবীর অনেক রাতের পথ তোমায় ভালোই চেনে। ওরা পরম মমতায় শুষে নিয়েছে তোমার বিষাদ। মনে পড়ে, নদীর সূর্যাস্ত, পাহাড়ের সূর্যোদয়, নিস্তব্ধ ডোবার ঝুম দুপুর? মনে পড়ে তোমার অসুখ? এটা তোমায় ভাবতে শিখিয়েছে। আমাকে নিয়ে। মনে পড়ে ছোট্ট তুমি কোন এক আরোগ্যশালার জানালার পাশে শুয়ে অন্ধকার রাতে দেখতে এক অদ্ভুত নারকেল গাছ। তুমি কি ভুলে গেছো? ভুলে গেছো ওটা পরম মমতায় তোমায় গল্প শোনাতো, তুমি কী আনন্দই না পেতে! রাত হলেই কী দারুণ রঙ গায়ে মাখতো গাছটা। আমি কিন্তু তোমায় চুপচাপ দেখতাম, ওই বাইরে থেকে, নারকেল পাতায় আমার দীর্ঘশ্বাস তুমি শুনতে পাওনি।
এসবকিছুই আমায় বুঝতে চাওয়ার পীড়ন। কেউ মেনে নেয়, কেউ নেয় না।

হ্যাঁ, আমি তোমায় দেখি।
তুমি যখন ঘুমাও, আমি জেগে থাকি।
এই যে আমি দেখছি তুমি ঘুমিয়ে আছো। উপুড় হয়ে। তোমার আঙুল কাঁপছে।
আমি দেখি তোমায় এপাশ থেকে। ছাতের ওই কোন হতে। টেবিলল্যাম্পের আলোর পিছে। তোমার খুব কাছে। তোমার নিঃশ্বাসে। তোমার রক্তে। তোমার স্নায়ুকোষে।
তুমি যখন ঘুমিয়ে, আমার একাংশ তোমায় স্বপ্ন দেখায়। আমি ও আমার ক্ষুদ্রাংশ। অসম্পূর্ণ অংশ। আমি তোমার অংশ ঠিক, কিন্তু আমি তো সবারও অংশ। তুমি নিজে অস্তিত্বশীল হলে আমার অস্তিত্ব মেনে নেবে কি তুমি? তোমার অন্তহীন প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। তুমি আমায় পাবেনা, চেতনা নিয়ে।

আমি তোমার দেহে, তোমার দেহের বাইরে। আমি তোমায় রেখে এক লহমায় ঘুরে আসতে পারি মহাবিশ্ব। আমায় থামাতে পারে না অভিকর্ষ। মঙ্গলকে বায়ে ফেলে বৃহস্পতির ছোট্ট বলয়ের ফাঁক গলে আমি ছুটে যাই দূর নক্ষত্রপুঞ্জে। দেখি কোন এক তারার জন্ম। তারপর কোন এক সুপারনোভার আকস্মিকতা আমায় জানান দেয় তুমি চেতন হচ্ছো। আমি ফিরে আসি। তোমাকে, তোমার এই দেহ, এই শরীর আমি খুব ভালোবাসি।

রাত শেষ হয়ে আসছে। এটা তোমার কাছে লেখা আমার শব্দসমষ্টি। তোমরা যাকে বলো, চিঠি। আরও কিছু বলার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। অতীন্দ্রিয়কে বস্তুজগতে রূপান্তরে অপারগ মহাকাল। তাই শব্দগুলো তার নির্যাস হারালো। আমি স্পষ্ট দেখছি অব্যক্ত রয়ে গেলো এতকিছু।

আমি তোমায় বলছি, চুপ হও। হও শব্দহীন। আমায় বুঝতে জগতে এখনও আছে কিছু বোধিবৃক্ষ।
তোমার সেই গাছ, তোমার অজ্ঞানতায়।

প্রশ্ন জাগছে? আমি কি? আমি কে?
খুব সোজা...
আমি প্রাতিভাসিক গুণাগুণবর্জিত।
তুমি ইন্দ্রিয়গোচর।
আমি নুমেনন।
তুমি ফেনোমেনন।


অম্বর]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29237881 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29237881 2010-09-10 07:44:45
ঘুম


এইখানে এইসব কাজ ছেড়ে, রাতের চাদর খুলে, অদৃশ্য বই-পাতা থেকে মুখ তুলে, নির্জন শহুরে লতা মুঠোবদ্ধ করে নিজেকে টেনে তোলার সময় চোখের পাতায় অতলান্তিক ঘুম, আর জলের তলের হিমশীতল পাথরের নিষ্প্রভতায় অবশ দেহ যখন তৈরি হয় নিদ্রাযাপনের, তখনই ইন্দ্রধনুর বাঁকানো তীরের মতন ছুটে আসে বর্ণালীর একফালি শব্দগুচ্ছ, কী তীক্ষ্ণ সেই সূচালো অগ্র! ঘুমজলের তলে রাক্ষুসে মাছ চকিত জেগে উঠে, ঘন হতে হালকা, হালকা হতে ফুরফুরে বায়ুজল কানের পাশে কেঁপে উঠে, বলে এখনি না। ফিস্‌ফিসে সেই মৃদুস্বর কী এক তাড়ণায় সংকুচিত করে মাংসপেশি, উপলব্ধি করায়; বলে যে ধ্বনিসমষ্টি নেমে আসছে অতর্কিত, তাকে অস্তিত্বে রূপদান করতে হবে শোনো, কারণ ক্ষণিকেই তুমি ভুলে যাবে সমগ্র। ভুলে যাবে মুহূর্ত। তোমার মগজের কোষে লুকোবে ওরা, ফিরে পাবে না জলজ্যান্ত। এই কি মহাকালের অতলে হারাবে ওরা, মূল্যহীন। ভাবনার সান্দ্রতায় অজানা তেপান্তরে ঘোড়া ছুটবে, নিঃশব্দ। দূরে কোন আলো হারাবে ঔজ্জ্বল্য। ফিকে ঘন আকাশে গম্ভীর প্রকৃতি হবে নিস্তব্ধ। এমন মুহূর্তে, নেশাখোর রাতে, চোখের উপর জগতের সব ভিনিয়ার্ড ঢুলুঢুলু, মাটির গোড়ায় শান্ত সমাহিত আত্মা। ঠিক এই সময়গুলোর প্রত্যাশায় কেটে যায় অপ্রত্যাশিত সময়, এই সময়গুলোই বাঁচিয়ে রাখে মানবাত্মা। আলতো শ্বাসে, পেলব ছোঁয়ায়, স্পর্শ মাদকতা, অসংজ্ঞায়িত। সৎ অনুভূতি, অহং বিদীর্ণ। আধখোলা চোখের এই মাতাল তাণ্ডবে, অবচেতনের ফিসফিস, কাঁচা সতেজ ঝিমঝিম রক্ত, হৃদপিণ্ডের অখণ্ড প্রচেষ্টা, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ, ছলকে উঠা স্মৃতির পদচারণায় শোনা যাবে ভোরের পাখির কিচিরমিচির, এক জালের মতন জীবিত-মৃতের সব চেতনার অদ্ভুত সংযোগ। লিখতে না চাইলেও যে বস্তুটি তোমায় দিয়ে লিখিয়ে নিলো অর্থহীন শব্দগুলো, সেটাই নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। জলের তলের ঐ রাক্ষুসে মাছের এত ধীরে ধীরে চোখের পাতা ফেলা, শুধু সম্মোহন। স্বয়ংক্রিয়তায় অবিশ্বাসী তুমি যন্ত্র বিশেষ, থেমে যাচ্ছে অন্তর্দহন, অতঃপর নির্বাক মূর্ছা যাওয়া, আর পায়াভারি চোখের ফাঁক গলে ঝাপসা দেখতে পাওয়া যে অজানা কেউ তোমার খেরোখাতায় মুখ ঝুঁকিয়ে কি লিখছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29236325 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29236325 2010-09-07 01:26:16
অপচেষ্টা


ঘোলা জল। মাছি। সবুজ বাঁশের কঞ্চি হারিয়েছে তার জৌলুস। সবুজগুলোকে খুবলে নিয়েছে বলাৎকারকারী জিহ্বা। উগ্র ওদের আটকে রেখেছে যেসব ধাতব-রজ্জু, মরিচা পড়েছে সেগুলোয়।

এ্যারোমা। ঘ্রাণ। গরীব মানুষের গন্ধ।
যে গন্ধ কাঁপিয়ে তোলে তোমার সুশীল দম্ভ।

জানিনা কেন সাদামাটা যৌগিক বাস্তবতা নিয়ে লিখতে গেলে শিল্পতুলি রঙহীন। জানিনা কেন বর্ণ হারায় ক্যানভাস। জানি না কেন ঘৃণিত হয় অতিরঞ্জন, অতিকথন। শিল্পের উপজীব্য এগুলো নয়। রূপকের ভণিতায় কপট শিল্পী। যে বর্ণনা লিখতে চেয়েছি, যে কথাগুলো বলতে চেয়েছি, সেগুলোর ফরম্যাট, বিন্যাস, রীতি, শৈলীগুলোই যখন গুরুত্ব পায় লেখক মানসে, তখন মানবচরিত নিয়ে পুনর্বার ভাবতে বসি। দেখি, অবাক করছে না কিছুই।

বলতে চেয়েছিলাম খুব সাধারণ কিছু। এতই সাধারণ, যে আমাদের অনন্যসাধারণ মনে তা হয়ে উঠে অসাধারণ। অতঃপর এই অসাধারণত্বের বিভ্রমেই প্রতারণা। উপমায় মতিবিভ্রম। মুক্ত তুমি একদিন লিখতে চেয়েছিলে, ভেবেছিলে বিস্তীর্ণ চারণভূমির কথা। শব্দের এই ল্যাণ্ডস্কেপে তুমি ঈশ্বর। হেঁটে যাবে নিরাকার, আর ডানহাতের আঙুলে আলতো পরশে ছুঁয়ে যাবে গমক্ষেত। তর্জনী উচিয়ে আলতো নীল ছড়াবে, নখ দিয়ে খুঁচিয়ে তুলবে রঙ, ওগুলো হয়ে যাবে সাদা মেঘ। ইচ্ছে হলে ওই দূরে রাখতে পারো হরাইজন। ওটার নাম হতে পারে দিগন্তবৃত্ত বা চক্রবাল। পাহাড়? থাকবেই ওগুলো। সমুদ্র? অপেক্ষায় থাকুক দৃষ্টিসীমা বৃদ্ধির। শস্যকণায় শিশিরবিন্দু। জুম-ইন করে দেখবে কোয়ান্টাম। দুজন রাখাল। ওদের মনের গিজ্‌গিজে কথা। না-জানা ব্যাকুলতা। গরুর খুরের হেঁটে যাওয়া দেখে ভাবান্তর। এগুলো কি ডিটেইল? এগুলো তো দৃশ্যপট। কতটা ডিটেইল তুমি চাও? আমি তোমায় ভরে দেবো দুহাতে। বলতে পারবো সময় শেষের কথা, শুরুর আদ্যোপ্রান্ত। এই ল্যাণ্ডস্কেপ। তোমার কোষ্ঠবদ্ধ কোষ্ঠকাঠিন্যযুক্ত জীবনের এক সালভেশন। মনঃসমীক্ষণ।

আচ্ছা, এভাবেই বলি তাহলে গল্পটা...
যেভাবে বললে এগুলো শোনায় রূপকথা।
রূপকথা শুনে ভয় পেতে নেই। কারণ, এগুলো তো রূপক দ্বারা সজ্জিত কথা। অথবা রূপের কথা। রাজা, রাণী, পরীদের গল্প। কিংবা ডানাওয়ালা ঘোড়া। সৌন্দর্যের জয়। কালো-কুৎসিত রাক্ষসখোক্কসদের ব্যর্থতা। পরাভব।

রূপকথা। দুঃস্বপ্নের ভেজা-বালিশের চিৎকারে জেগে উঠা বাস্তব-শরীর আর নিরেট-শয্যা আঁকড়ে ধরা স্বস্তির মতনই ওরা।

দুঃস্বপ্ন দেখবে? ভয় নেই। ভয় পেয়োনা। এগুলো তো সেই স্বপ্নগুলোই যেখানে অবচেতন ঠিকই অপেক্ষায় থাকে জেগে উঠার। স্বপ্নের ভেতর তাই মিটিমিটিয়ে হাসে মানুষ। জানে, যে দৃশ্যগুলো দেখাচ্ছে মহাকাল, অলীক ওগুলো। বোঝে, জেগে উঠেই এক গ্লাস জলে মিটে যাবে তৃষ্ণা। বাস্তবতার ভয়ে ভেগে যাবে আতঙ্ক।

বলছিলাম...
ঘোলা জল...মাছি...এইরকম কিছু একটা। সবুজ বাঁশের কঞ্চি হারিয়েছে তার জৌলুস টাইপের কথা। আরও বলছিলাম...এ্যারোমা। ঘ্রাণ। গরীব মানুষের গন্ধ।
যে গন্ধ কাঁপিয়ে তোলে তোমার মার্জিত রুচিবোধ আর সুশীল দম্ভ।

প্রাসাদ বিলাসিতা। সুবিশাল ছয়ফুট বাই আটফুট। ঘনবসতিপূর্ণ সাম্রাজ্যের জন্য ওরা দায়ী নয়, অনায়াসে থাকতে পারে চারপাঁচজন প্রজা। সুবিশাল এই সাম্রাজ্যে অদৃশ্য কাঁটাতারে গড়ে তোলা হয়েছে আরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রদেশ, যার এককোনার মেঘাচ্ছন্ন একটির অধিকারিণী এক রাজমাতা আর তাঁর দুই বছরের রাজতনয়। রাজপুত্রোচিত রাজকীয় ভঙ্গিমায় দিনদুপুরে সে সাবলীল ঘুরে বেড়ায় বাদবাকি প্রাপ্তবয়স্ক শূন্য প্রদেশে যখন সম্পদ আহরণে বহির্জগতের উদ্দেশ্যে নির্গত হয় অধিবাসী নেটিভরা। কর-খাজনা আদায়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কিছু সারমেয় পোষে। ওরা ঘুরে বেড়ায় দিনে-দুপুরে, রাতের আঁধারে। নেটিভদের হাড়ে হাড়ে ঘেউঘেউ। মজ্জায় মর্মরধ্বনি।

রূপকথা। রাণী আর সন্তান।
রাজমাতা দিনে আনে। রাতে খায়। খাওয়ায়। রাজপুত্র জেগে থাকে। খেলে। ঘুমায়। চোখেমুখে পক্ষীরাজ মক্ষিকা।

স্বল্পবয়স্ক রাণী। পোয়াতি রেখে ভেগে গেছে রাজা। নির্বাসনে কিংবা অন্য কোথাও যেটা জানা যায়নি। রাজপুত্রের চোখ ফোটার পর বড় হয়েছে এই প্রদেশ সেই প্রদেশ। অচেনা প্রজা। অজানা নগরবাসী। দুর্ভিক্ষ শব্দটা একটু বেশী ভারিক্কি।

ল্যাণ্ডস্কেপ অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। বলছে, এটা তুমি বলতে পারো চাঁচাছোলা। নিষ্ফলা বন্ধ্যা মরুময় জীবনে বীজের জয়গান গাও কেন?

অই তোর পোলায় কতা শিখছে? না। চাইর মাসের ঘরভাড়া বাকি রে তোর... স্মরণে আছে... আমি আর আমার দোস্ত...অই দ্যাখ...মোটরবাইকটা লতুন কিনছে অই...

শকুন যখন ওড়ে, বুঝে যাবে শুধু দেহই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে না।

বলে দেয়া সব গল্প আর কতভাবে বলা যায়?
আবোল-তাবোল, এলেবেলে ট্যাগ নয়। কোন আঁধার রাত্রে জননীর উপর দুটো সারমেয়র একনিষ্ঠ থ্রিসামে কোন শিশুমুখে আধোবোল ফুটে উঠেনা। দুইবছরের প্রজ্ঞা হামাগুড়ি দিয়ে খুপরির বাইরে বেড়িয়ে আসে। ড্রেনের বুকে চাঁদের ছায়া। বুঝে যায় সত্যিকার চন্দ্রালোক আর এতটুকু নিষ্কলঙ্ক নয়।

এই রূপকথাকে এলেবেলে বলার মতন সুশীল তুমি কখনই নও।
ল্যাণ্ডস্কেপ গড়া গেলোনা। মুখ থুবড়ে পড়লো দুই বছরের কোন শিশুর মানস বুঝতে।

গল্পটা তুমি বলতে পারলে না। পারবেও না হয়তো কখনও।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29231003 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29231003 2010-08-28 02:25:51
অবসান


ওরা বলে, জীবনের কোন এক ক্ষণে, কোন এক অবিনাশী মুহূর্তে, কোন এক অশনি বাতাসের দোলায়, তোমার হারিয়ে যাওয়া সব দিনগুলো তোমায় আলতো পরশ বুলিয়ে যাবে, শেষবারের মতন।

মাটির চুলার দিন ফুরিয়েছে আজ। লঘুচাপের বায়ুবৎ পদার্থের ইন্ধনে খাদ্যদ্রব্য পাক হয় ঠিকই, কিন্তু এর উপাদানসমূহ মাটির মমতা হারায়। হাড়ির উপরের ব্যতিব্যস্ত বাষ্প মৃত্তিকার স্পর্শ বোঝেনা, ফলে কী এক উচ্চাকাঙ্খায় ওরা ঊর্ধ্বমুখী হয়, অতঃপর সেমিপাকা ঘরের নিচু ছাতের আবদ্ধ কামরায় ছটফট হতাশায় ভোগে পরিশেষে; হয় নৈরাশ্যবাদী। ঠিক এমনই এক দিনে, মধ্যাহ্নের ঠিক আগে, যখন উপজেলার এই অনগ্রসর কিন্তু উন্নয়নশীলতার বিষমবাক্যে পরিপুষ্ট জনপদ কিঞ্চিত ক্লান্তিতে ভোগে, ক্ষণিকের জন্য থেমে যায় সবকিছু, থেমে যায় পাশের ঐ সাইকেলরিক্সা মেরামতের টুঙটাং, পাশের উত্তরণশালা কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় ভোজ্য-আহার্যের হাঁকডাক, গলিপথে শুধু শোনা যায় কোন এক অজানা পথিকের পা টেনে চলা, তখন বদ্ধ ঘরের এই কুটিরে বসে তুমি শুনবে ভাদ্রের হাহাকার, বসন্তের কোকিল কুহক। পৌষের চাদরখানি জড়িয়ে নিতে নিতে তুমি বৃথা অপেক্ষায় থাকো শ্রাবণধারার। কার্তিক আজকাল ভুলে গেছে ধানের গন্ধ, কারণ জৈষ্ঠের তাপদাহে পিষ্ট হয়ে গেছে আষাঢ়। বৈশাখের লু হাওয়া তাই তোমার কর্ণকুহরে ফিসফিসিয়ে বলে যায় কিছু, আর তুমি বুঝে যাও শরতের ফুল তোমার এই নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের সামর্থ্যের বাইরে। তুমি তাই শুধু অপেক্ষায় থাকো সাদামাঠা মধ্যাহ্ন আহারের। তোমার ঘরগৃহস্থালির তত্ত্বাবধায়ক কেউ বসিয়ে গেছে শর্করা ও শ্বেতসার, সাথে থাকতে পারে কিছু আমিষ ও স্নেহ জাতীয় বিলাসিতা।

এক পলকে কাঠের জানালার শার্সির উপর বসে থাকা এক কাকের শব্দহীন বাকবিমুখতা দেখে তোমার মনে পড়ছে ওদের কথা। হ্যাঁ, ওরা অনেক কিছুই বলে। ওরা শব্দ নিয়ে খেলে। বাক্য গঠন করে। ওগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয় অর্থপূর্ণ স্বেচ্ছাচারিতা। ব্যক্ত করে অভিপ্রায়। ব্যাখ্যা করে জীবন। মনন। মানস। অথচ ওরা শুনতে পায়না শব্দদের অট্টহাসি। বিদ্রূপ উপহাস। পার্থিব ধ্বনিসমষ্টির তালে ওরা খেলতে চায় অতীন্দ্রিয় খেলা। ব্যাকরণ দিয়ে বুঝতে চায় প্রকরণ।

নির্বোধ। আত্মতুষ্ট।
ওরা ব্যাখ্যা করে মৃত্যু।
অতঃপর মনোযোগী হয় জীবনের প্রতি।
নির্বোধ। পথভ্রষ্ট।

আজ সকাল হতেই তাই ক্ষণে ক্ষণে যখন ভেসে উঠছিলো কিছু, ভেসে উঠছিলো সাদাকালোরঙিন কিছু অর্থহীন মুহূর্ত, ভেসে উঠছিলো ছোট্ট আঙুল, রাঙা ঠোঁট, চুড়ির শব্দ, বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ, তখন তুমি দ্বিধাচিত্তে কলম নাড়াচাড়া করছিলে, ভাবছিলে বন্দী করবে চূড়ান্ত মুহূর্ত। যে লেখা কেউ লিখে যেতে পারেনি। যে লেখা লেখার আগেই থেমে যায় লেখক। যে লেখার নেই কোন সর্বশেষ পূর্ণযতি, বিরামচিহ্ন...

খুব গভীর মগ্ন নিমগ্ন নিবিষ্ট তন্ময়চিত্তে স্থির হলে তুমি বুঝে যাবে অনেককিছু। তোমার বস্তুগত শরীর খোলস পালটাবে, ঝেড়ে ফেলবে অবাঞ্ছিত অনাবশ্যক অস্থিরতা। তুমি শুনবে মাকড়সার হেঁটে যাওয়া শব্দ, দলছাড়া পিঁপড়ের আর্তনাদ। শুনবে হাজারবছর আগের কোন এক শিশুর ক্রন্দন, টের পাবে জননী কোলের উষ্ণতা। কোন এক মরমী পর্দার ফাঁক গলে তুমি দেখবে অনমনীয় প্রোথিত ভবিতব্য, উত্তরকাল। তখন ঘটনাপ্রবাহের এই মর্মবাণী শব্দের ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করতে গেলেই তুমি টের পাবে তোমায় টেনে ধরেছে অদৃশ্য লজ্জিত তন্তু। করুণাপ্রত্যাশী। তোমায় তখন বুঝতে হবে মহাকাল তোমার কাছে সমর্পিত করেছে এক আধিদৈবিক রহস্য। সর্বজনবিদিত মূল্যহীন করতে নেই ওটা। আর তখনই তুমি চুপ হয়ে যাবে, তোমার হাত হতে খসে পড়বে গ্রাফাইট কিংবা কালির দোয়াত। শব্দগুলোকে ছুড়ে ফেলবে তুমি। হয়ে যাবে নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। বলবেনা কোন কথা, শুধু দেখে যাবে, হবে এক নির্লিপ্ত দর্শক। বুঝে যাবে, তোমার দেহসাধনার ত্রুটি সহ্য করে না অচিনপাখী। অন্যথায় মৃদু হাওয়ায় শুধু দুলবে শূন্য খাঁচা।

এখন তুমি স্থির। শান্ত। সুসমাহিত। প্রসন্নচেতা নির্বিকার।
সৌম্য তুমি শুধু অপেক্ষায়।

সময়ের কলরব। বাল্যকালে কোন এক মেঠোপথ দিয়ে সন্ধ্যালগ্নের জোনাকপোকা আর পিতার সাথে হেঁটে যাওয়ার সময় তোমার শুধু মনে পড়ে ছোট্ট তুমি বারবার এসে দাঁড়াতে দীর্ঘকায় মানুষটির সামনে। বাবা...কোলে...কোলে...পা ব্যথা...আর পারি না। মনে পড়ছে, তার মৃদু উষ্ণ হাসি। মনে পড়ছে, তিনি তোমায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন। মনে পড়ছে, তোমার সন্তান। ছোট্ট আঙুল। রাঙা ঠোঁট। এই মুহূর্ত-অনুভূতিগুলোর অস্তিত্ব কোথায় আজ, এই ক্ষণে? তুমি তাই ভাবতে থাকো আর সময়-গুঞ্জরনের ফাঁকে শত-হাজার-কোটি সংখ্যাতীত শব্দ-দৃশ্যাবলী ছাপিয়ে শুনতে পাও এক নিঃশব্দ পদশব্দ।

তোমার ঠোঁটের কোনে মৃদুহাসি, তাকিয়ে থাকো দোয়াত ছলকে পড়া কালির দিকে। তুমি অকৃতজ্ঞ নও। তুমি প্রকাশ করোনি। তুমি চেপে গেছো মায়ার খেলা। তুমি হৈহৈরৈরৈ দেখাওনি বায়স্কোপ।

ভাতের মাড় উপচে পড়ছে।
উন্নয়নশীলতার বিষমবাক্যে পরিপুষ্ট জনপদের মধ্যাহ্ন বিরতি সমাপ্ত। কোন এক শালিকের চোখের ক্ষণিক বিষণ্ণতাকে মৃতের শোকাবহতা ভেবে ভুল কোরো না। বৃষ্টিকে ভেবোনা শোকের ক্রন্দন। তুমি অকৃতজ্ঞ না হলেও এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তোমার কাছে ঋণী নয়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29226161 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29226161 2010-08-20 02:56:38
হেরেটিক


দুপুরের রোদ গড়িয়ে যখন বিকেল হোলো, আর সন্ধ্যার কালচে ছায়া যখন ওঁৎ পেতে আছে, সেই মুহূর্তে আমার অহং যদি নিজেকে পয়গম্বর বলে ভাবে, তখন সকালের রোদ প্রশ্ন তুলতেই পারে যে ভোরের আলোয় তুমি কোথায় ছিলে, বা ঊষালগ্নে তুমি কাকে অবদ্ধ করতে এসেছো। আমি বলবো, কাউকে নয়। তোমরা সবাই মুক্তই ছিলে।

আমার ভেড়া নেই। নেই চারণভূমি। আমার বক্ষবিদারণ হয়নি। আমার ছিলো না অগ্নিউপাসক কোন পিতা। ক্রুশে আমি উঠবো না জেনে রেখো, পদ্মাকে আমি করবো না বিভাজিত। চন্দ্রনাথে আমি শুনবো না ঈশ্বরের খলহাসি, ঈশ্বর আমায় চেনে না।

শুধু ফিসফিস। শুধু গুঞ্জন। শুধু মর্মর। ঝিরঝির। শনশন।

নয় কোন মানবীয় গুণাবলী। আমি দেবো না কোন গ্রন্থ। শব্দের আড়ালে আমি লুকোবো না কোন মেটাফর। আমি মানুষরূপী অসুখের জন্য নই। মনুষ্যপ্রকৃতি আমার ঊর্ধ্বে। মৃতদের ঈশ্বর আমায় পাঠায়নি।

তবে কেন কর্ণকুহরে অশ্মীভূত নৈসর্গিক প্রস্তরের মর্মপীড়া? অনাড়ম্বর পাথরকুচির বেদনাহত জলফোঁটার আর্তনাদ? বিষাদগ্রস্থ কোন বৃক্ষের ছায়ায় গুমরে উঠা সেই কান্নার প্রতিধ্বনি কে শুনবে? আলতো পরশে কে সান্ত্বনা দেবে অনুরণিত লোহিতকণিকা? কীভাবে হবে প্রোটনের নাজাতপ্রাপ্তি? কে বুঝবে নিউট্রিনোর নির্লিপ্ততা?

ব্যতান্ত্রিক। রাফেজি। খারেজি।
উৎপথগামী আমি এক জড়বস্তুর পয়গম্বর। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29218530 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29218530 2010-08-09 15:26:03
আবিষ্টতা


আবিষ্টতা

অতিকায় অরণ্য; সুবিশাল গির্জের মতন তুমি আমাতে আতঙ্ক ছড়াও,
প্রত্যাখ্যাত অভিশপ্ত আত্মায় গর্জে উঠো অর্গান-ধ্বনিতে,
সঙ্কীর্ণ গির্জে-পথের চিরন্তন শোকাবহতায় ধ্বনিত হয় যে মৃত্যু-ঝংকার,
তোমার দ্য-প্রোফানদ্যিস স্তবে যে শুনি তারই অনুরণন।

আমি তোমায় ঘৃণা করি, হে উন্মুক্ত জলরাশি!
তোমার আবদ্ধ সীমাবদ্ধতা, তোমার কোলাহল,
চিত্তবিক্ষোভ,
আমার আত্মপ্রকৃতি খুঁজে পায় ওদের,
খুঁজে পায় তার অন্তরাত্মায়;
পরাজিত মানুষের তিক্ত অট্টহাসি,
ফোঁপানো যন্ত্রণা, অপমান অবমাননা –
সব শুনতে পাই,
আমি সব শুনতে পাই
তোমার অতিকায় হাস্যধ্বনিতে।

তুমি কীভাবে আমায় সন্তুষ্টি দেবে হে রাত্রি! যামিনী!
যখন তোমার থাকবে না ওই তারাগুলো!
নক্ষত্রলোকের সেই ভাষা, কে বোঝে তা!
এক আমি ছাড়া!
কে খোঁজে শূন্যতা? তমসাচ্ছন্ন অন্ধকার?
নিরাভরণ নগ্নতা!
এক আমি ছাড়া!

তবে এই আঁধার অন্ধকারাচ্ছন্নতা –
এক চাঁদোয়াই বটে,
যেথায় বেঁচে থাকে
শত সহস্র অস্তিত্বশীল সত্তা,
আমার চোখ হতেই আবির্ভূত যারা,
সুপরিচিত অন্তরঙ্গ মুখভঙ্গি যাদের,
যারা আজ অন্তর্হিত।
বিলুপ্ত।





Obsession

- Charles Baudelaire

Great woods, you frighten me like cathedrals;
You roar like the organ; and in our cursed hearts,
Rooms of endless mourning where old death-rattles sound,
Respond the echoes of your De profundis.

I hate you, Ocean! your bounding and your tumult,
My mind finds them within itself; that bitter laugh
Of the vanquished man, full of sobs and insults,
I hear it in the immense laughter of the sea.

How I would like you, Night! without those stars
Whose light speaks a language I know!
For I seek emptiness, darkness, and nudity!

But the darkness is itself a canvas
Upon which live, springing from my eyes by thousands,
Beings with understanding looks, who have vanished.

Translated by William Aggeler, The Flowers of Evil





De profundis - ওল্ড টেষ্টামেন্টের ১৫০ টি কবিতা আর অনুতাপ বা প্রায়শ্চিত্ত সংক্রান্ত স্তুতিগান নিয়ে রচিত Book of Psalm। De profundis হচ্ছে Psalm 130।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29215931 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29215931 2010-08-05 23:26:13
নিরাক


দ্বন্দ্ব

হঠাৎ বৃষ্টি।
হ্যাঁ, টুপটাপ।
কাদা দেখে চলো।
ঠিকাছে।
জুতো জোড়া নতুন।
হুম, দু’মাস আগের...
খুলে নিয়ে হাতে নাও বরং।
খালি পা?
এখন তো খুলতেই হবে...
ওদের সাথে না গিয়ে বরং ওদিকটা দিয়ে চলো।
বলছো?
যথেষ্ট লোক আছে ওখানে...
হ্যাঁ, তোমার না থাকলেও চলবে...
ঘাসগুলো সুন্দর।
সবুজ বটে...
হাঁটতে আরাম লাগছে...
খারাপ লাগছে না...
মানুষজন খুব একটা তাকায়না আজকাল...
ব্যস্ত সবাই
অন্য কিছু...
নাহ্‌, এগুলো দেখে অভ্যস্ত।
পাশের বাচ্চাটা শুধু...
হ্যাঁ, মনোযোগ দিয়ে দেখছে...
মোবাইল সাইলেন্ট করেছো?
দেখছি...
রোদের থেকে বৃষ্টি ভালো,
বেশী না হলেই হয়...
বাসায় কে কি করছে?
আপাতত এখানেই থাকো...
আসার সময় কুকুরটা ডাকছিলো অনেক
বিষণ্ণ মুরগীগুলো...
কবুতরগুলো উড়েনি আজ...
বিড়ালটাকে দেখিনি...
কাকাতুয়ার খাঁচাটা খালি...
তুমিই খুলে দিয়েছো।
গোরস্থানের এদিকটায় আসা হয়নি কখনও...
নতুন হয়েছে, জায়গা বাড়িয়েছে
ইট বিছিয়েছে, পথ করেছে
দুপাশের ছোট ছোট গাছগুলো...
দেখছি, বেশ লাগছে...
বাবা’রটা ওইদিকে...
পাশাপাশি নিতে পারলে না...
চেষ্টা করেছি...
আগেই রেখে দেয়া উচিত ছিলো...
কাকগুলো উড়ে গেলো...
মেঘগুলো কেমন কালো হয়ে এসেছে...
উহ
কি
আরেকটু আস্তে নামাতে পারতো...
আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে...
আমি গেলে ওদের...
উচিত ছিলো...
পারিনি...
চাইলেও পারবে না এখন...
পাটিটা মোড়ানো হচ্ছেনা...
বাঁশগুলো...
আরেকটু সুন্দর করে দিতো...
একটা কোনা বাঁকা হয়ে আছে...
বৃষ্টি জোরে হচ্ছে এখন...
তাড়াতাড়ি...
ওরা তোমায় ডাকছে...
ডাকছে...
কি করবে...
যেতে হবে...
মাটির দলা...
ঝাপসা হচ্ছে...
ওটা বৃষ্টি, তুমি নও


প্রস্তাবনা

কামারপাড়ায় কামাররা থাকেনা আজকাল। হাপরের শো শো শব্দ কোমল করে না কোন ধাতু। হাতুড়ীর আঘাতে অনমনীয় জীবন তাই তার রূপ বদলায় না। গলনাঙ্কের নিচে তাই আঁটসাঁট জীবন। বেঁচে থাকে মানুষ। ওরা তরল হয় না। বর্ষা-জল ওদের হৃদয়-রন্ধ্রে অন্তর্হিত। ফলশ্রুতিতে আজ অতি প্রত্যূষে চৌধুরীবাড়ির অন্দরমহল থেকে যখন মাতম উঠলো, কামারপাড়ার মানুষের হৃদয়ে কোন অজানা হাপর শব্দ করেনি। কামারপাড়ার মানুষেরা দৃঢ়। ওদের সহসা কোন ভাবান্তর হয়না।

অথচ এই প্রয়োগপ্রবণ মানুষেরা যখন তাত্ত্বিকভাবে হাতুড়ীর আঘাতে জর্জরিত হওয়ার সম্ভাবনাপুষ্ট সন্তানটিকে জননীর শবদেহের খাটিয়া হতে কিঞ্চিত দূরবর্তী অঞ্চলে বিচরণ করতে দেখছিলো, সহসা নানাবিধ কানাঘুষায় কিঞ্চিত সরগরম হয়ে উঠেছিলো পাড়াটি। যেমন, বাপের উপর বইসা খাইছে, অখন বুইড়া মা’টারেও মারছে...হারাটা জীবন কামাই নাই ধামাই নাই...খালি পইপই...দ্যাশগেরামে সম্পত্তি আর বাড়াইলো না...শিক্কিত্‌ হইয়া অশিক্ষিতের লাহান...একমাত্র পুলা...আহারে অত্ত বড় সম্পত্তি...অখন বংশে বাত্তি দিবো কেঠায়...আন্ধার হইয়া থাকবো অখন বাইতটা...লানত পড়বো...আহারে নানী বহুত ভালা আছিল্‌ ইত্যাদি ইত্যাদি।

কামারপাড়ায় জন্ম হওয়ায় মায়ের শরীর খারাপ শুনে তড়িঘড়ি করে ছুটে আসতে পারেনি ছেলেটি। তিনদিন আগে খবর পেলেও আজ সকালে স্টেশন হতে বাড়িতে এসে মায়ের মৃতদেহ দেখে আস্তে আস্তে কোথায় চলে গিয়েছিলো সে। দারোয়ান রহিম মিয়ার কাছ থেকে বাগানের মালি আবদুল হাই জানতে পারে দোতলার বারান্দার এককোনে অনেকক্ষণ ধরেই বসে ছিলো ছেলেটি। নির্লিপ্তভাবে পায়চারি করেছে কিছুক্ষণ। ফেলে যাওয়া মস্ত বাড়িটার আলো-আঁধারি করিডোর দিয়ে হেঁটেছে। আদর করেছে মা’র কুকুরটাকে; বিড়ালটাকে খুঁজে পায়নি। বাড়িটায় অনেক হাসমুরগী। গরু-ছাগল। মা পশুপাখী খুব পছন্দ করতো। এই বয়সেও নিয়মিত চিঠি লিখতো মা। সেখানে অনেককথা থাকলেও শুধু একটা কাকাতুয়ার কথাই ঘুরেফিরে আসতো। বাবা, তুই দেখিস নাই পক্ষীটারে...তুই এবার আসলে তোকে দেখাবো...কি সুন্দর কথা বলে রে...তোর নাম শিখাইছি ওরে...সকাল বিকাল তোর নামই নেয় সোনাপক্ষীটা...
আজ সকালে যখন সে কাকাতুয়ার খাঁচার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, সোনাপক্ষীটা কোন কথা বলে নাই।
খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েছিলো ছেলেটি...

তারপর বিকেলের দিকে...
কবরস্থানে বৃষ্টির ভেতর...
ঐ দ্যাখ, দূরে খাড়ায় আছে...অহন তো মায়ের কাছে এট্টু আয়...মাডি কি আমি দিমু – মনে মনে ভাবে রহিম মিয়া। একরাশ বিরক্তি তার চোখেমুখে।
সবাই তাকায় সবুজঘাসে ঢাকা মাটির অই উঁচু ঢিপিটার দিকে।
কামারপাড়ায় জন্ম নেয়া ছেলেটা আনমনে বিড়বিড় করছে...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29213233 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29213233 2010-08-02 03:18:33
নিকটবর্তী


- আব্বা, ওইটা কি?

বৃষ্টিবাদলার দিন। কোলাব্যঙের ডাক। আর মধ্যরাতের তারাভরা আকাশের দিকে ইঙ্গিত করছে ছোট্ট একটা আঙুল।

- ওইটা তারাখসা বাবা।
- তারাখসা কি আব্বা?
- তারাখসা হইতেছে...

গুঞ্জন। কোলাহল। পঙ্গপাল।
ধীরে ধীরে হাঁটছে।
স্তোত্রপাঠ।
আবৃত্তি করছে।
তারাখসা চাপা পড়ে যায় জনসমুদ্রে।

- আইজকা সন্ধ্যার সময় লা-হাওলা পড়ছিলা?
- হ্যাঁ তো! আম্মা পড়ায় দিছে...

স্বর্গীয় শব্দ। ছোট্টআঙুলধারীর মনে আছে, সন্ধ্যার ঠিক আগে, যখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতেছিলো ওদের মফস্বলের কোনায় পড়ে থাকা ছোট্ট এই জংলামতন জায়গার পলস্তারা খসা একতালা ইটের বাসায়, মা’র হাসিহাসি গোলগাল মুখ আর নরম আঙুলগুলো আলতো কোরে ওর ঠোঁটে তুলে দিয়েছিলো কিছু অদ্ভুত শব্দ।

- এইগুলা কি আম্মা...
...আর আম্মার মুখের সেই নরম মিষ্টি হাসি। শীতলপাটির উপর বসে ডগা কামড়ানো পেনসিল দিয়ে খুব পড়াশোনা করেছে আজ ছোট্টআঙুলধারী। গালে হাত দিয়ে সারাদিন ধরেই সে দেখেছে ঘরের কোনার আগুনের পাশে পড়ে থেকে নীলশাড়ি পড়ে মা’র মিঠাই বানানো।

- যা...ওই বাসায় দিয়ে আয়...আমি এখানেই দাড়াই...পারবি না রে ছোটন?
খুব পারবে সে...আশেপাশের দু’একটা বাসা থেকে থালা ভর্তি খাবার আসে। ওগুলো ফিরিয়ে দিতে হয়, সে জানে। ট্রে হালকা লাগছে। ডেকে রাখা কাপড় তুলে একটু দেখে নেয় সে।
চোখ ফিরিয়ে তাকায় পিছনে। মা দরজার একপাশে...চোখে কিসের ছায়া...মা’র মাথার উপর একটা সাদা কবুতর...মা’র গায়ে নীলশাড়ি...
নীল শাড়ি। ‘শাড়িটা আব্বা দিছিল, আম্মাকে, অনেক আগে...’। আম্মা তখন হাসছিলো...নরম মিষ্টি হাসি।

সন্ধ্যার দিকে একটু ঘুমঘুম আর তখনই মায়ের হাতের ছোঁয়ায় মুখে মিষ্টির স্বাদ পেয়েছিলো সে...চোখ খুলে তাকাতেই মা’র সেই হাসি। হাসছে মা...মিষ্টিটায় কী আছে...ছোট্ট আঙুলধারীর কেমন লাগে...চোখ বন্ধ হয়ে যায়...

- আইসো বাবা...জুতা খুলো...ডান’পা আগে দিয়া উঠো...
ছোট্ট আঙুলধারীর কাছে প্রতিটা শব্দের অন্য কোন মানে আছে...
মনে পড়লো, মা ঘরে একা...

- আইজকে অনেক বড় রাইত বাবা...আইজকে তুমি যা চাইবা তাই পাবা, আইজকে পরওয়ারদিগার আমাদের সবচাইতে নিকটে থাইকবে...

সবচেয়ে কাছে! সবচেয়ে!
পিতার দিকে মুখ তুলে হাসে ছোট্টআঙুলধারী এক দেবদূত...সে খুব জানে সে কি চায়...

তারপর...
তারপর রাতভর চোখেমুখে আত্মতৃপ্তি নিয়ে উপাসনালয় হতে নির্গত মানুষরা যখন শান্তপায়ে শীতল-মানসে ঘরমুখো হয়, মোড়ে মোড়ে জটলা পাকায়, টুংটাঙ চা, সামাজিকতা, ভাই কেমন আছেন, আপনার গিন্নির পাঠানো হালুয়া লা-জবাব, দোস্ত সিনেমাটা ফাটাফাটি, তোর নোটটা কালকে পাবি – তখন মেসোস্ফিয়ার-স্ট্রাটোস্ফিয়ারে কোন আলোর ঝলকানি তাদের চোখ এড়িয়ে যায়...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29209580 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29209580 2010-07-28 17:52:07
পরিত্রাণ


পাহাড়ের ঢালে দাঁড়াতেই দুফোঁটা ঘর্মবিন্দু যখন নশ্বর শরীর বেয়ে ঝরে পড়লো, বলীয়ান-সচ্চরিত্র বাতাস মৃত্তিকার শীতল-স্পর্শ হতে তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। বন্ধনমুক্ত বাতাসে উড্ডীয়মান চুল আর পদতলের সিক্ত প্রস্তরের আকস্মিক বিহ্বলতা – যেন দুফোঁটা ঘর্ম জন্ম দেবে প্রমত্ত স্রোতস্বিনী। প্লাবিত করবে অববাহিকা। একমুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে শ্রবণেন্দ্রিয়র সম্প্রসারণে সমতট-গুঞ্জন কর্ণকুহরে অনুরণন তুলতে ব্যর্থ হলেও ভেবোনা এই উচ্চভূমি নিস্তব্ধ। আলোর শব্দ আর মেঘের কাব্য শোনার জন্য শ্রবণশক্তিকে রেহাই দাও কিছুক্ষণ। দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত কোরোনা, বরং লাগাম পড়িয়ে রাখো আস্তাবলে। অম্লজানে পুড়ে যাওয়া নাসারন্ধ্র দিয়ে এবার ধীরে ধীরে টেনে তোলো মানববর্জিত বিশুদ্ধ বায়ু। উদরপূর্তি হলে ছেড়ে দাও যত লোভ দম্ভ কাম ক্রোধ মাৎসর্য পেটুকতা। ওগুলো পড়েই থাকুক ঢালে, ওগুলোর গায়ে জন্মাক অজ্ঞাত কোন আগাছা। কিল্‌বিলে পোকাগুলো হেঁটে যাক ওদের উপর, সবুজ ঘাস ঢেকে দিক ওদের কলুষিত দৃষ্টি।

সমতলের মৃত্তিকায় সময় ধীরগতির, আর তাই উচ্চভূমির এই পাহাড়চূড়ায় উপনীত হবার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পেছনের যত কায়-ক্লেশ পিছু ডাকে। অভিকর্ষজ ত্বরণে ছেড়ে দাও ওদের, ওরা আছড়ে পড়ুক মনের অতলে। খানখান হোক, টুকরো টুকরো হোক, অভিঘাতের খেসারত তোমায় দিতে হবে না। কৈফিয়ত চাইবে না কেউ। নুয়ে থাকা পাহাড়ী লতাগুল্ম পরম স্নেহে পরশ বোলাবে পীড়িত পেশিতন্তু আর যেই মুহূর্তে তোমার আরোহণের প্রয়োজনীয়তা ফুরোবে, তুমি পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। আর তখনই মেঘগুলোকে রাঙা হস্তে ছুঁতে যেয়েই তোমার আঙুলে ভর করবে শূন্যতা।

সময় পেলে প্রশ্ন কোরো পাদদেশের ওই ছোট্ট শিশুকে। দেবদূত তোমায় বলবে, আজ পাহাড়ের ঐ ঢাল বেয়ে উঠে গিয়েছিলো এক আগন্তুক, তার ছোট্ট ঝোলায় মেঘগুলোকে বন্দী করতে। আগন্তুক যখন অন্তর্হিত হয়েছিলো অদৃশ্য কোন স্রোতধারার সাথে, মহাশূন্য হতে বাস্তব-অভিজ্ঞ এক সূর্যদেব মৃদু হেসে বিদায় জানিয়েছিলো তাকে। আগন্তুক ঢাল বেয়ে সমতলে ফিরে এসেছিলো কিনা সেটা না হয় অজানাই থাকুক। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29207602 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29207602 2010-07-26 03:55:29
আর কিছু নয়...
শরতের ফুল যেমন ফলের জন্য ফোটে না, তেমনি তোমার প্রস্ফুটিত দেহ কারও জন্য নয়। মহাকালের উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস যখন তোমার চারপাশে খেলা করে, তুমি তখন মৌনতায় অন্যমনস্ক হও কোন এক গহীন অরণ্যের ভাঙা মন্দিরের সেবিকার মতন। তুমি কি ভেবেছো তুমি সন্ন্যাসিনী! তুমি কি দেখেছো পূর্ণিমা-রাতে অতল জলের জোয়ার? ওই চুল কার জন্য বাঁধো? পৌষের শীতল রাতে যখন দুলকিচালে হেঁটে যাও ভেজা শুকনো পাতার উপর, তোমার নিটোল পায়ে কি আলতা পরায় ঘাসফুল? শিশিরভেজা গোলাপ-কাঁটা কি এগিয়ে যায় তোমায় আলিঙ্গনে? দূরের ঐ জমাট বাঁধা আঁধার কি বোঝে তোমার অস্থির মানস? জেনে রেখো, মহাকাল তোমায় দেখাচ্ছে বিভ্রম। তোমাতে উচ্চারিত হচ্ছে ঐন্দ্রজালিক মন্ত্র, কেননা সন্ন্যাসিনী তুমি জন্মদানে জানাচ্ছো অস্বীকৃতি। নিশির ডাকে সারা দেবে কি তুমি কুহক? এই জগত তোমার জন্য সহজ নয়। দুপুরের রোদে তুমি শকুন দেখো, আর রাতের আঁধারে তোমায় সঙ্গ দেয় লিলুয়া বাতাস। নিজের ভেতর কোন দানব পুষছো? সে কি তোমায় হারাতে বলে ঘূর্ণিজলে? বলে কি, আয় তুই সন্ধ্যা হাওয়ার অপয়া নারী, বংশঝাড়ের সাদা শাড়ি, গুপ্তকক্ষে পাকানো দড়ি...

এক অশুভ আত্মা, বলছি তোমায়...
...বেঁচে যাবে, সঙ্গে। সাহচর্যে। সংসর্গে। আবশ্যক একটি সাক্সেসফুল কোপুলেশন। আর কিছু নয়...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29206785 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29206785 2010-07-25 00:23:25
কিছু-না
ডায়েরী লিখতে চাইনি কখনও। অনেক আগে আমার একটা ডায়েরী ছিলো। ওর পাতাগুলো প্রায়ই পুড়ে যেতো।

নিগৃহীত অনুভূতিগুলোকে কীভাবে পোড়ায়?

বসে থাকতে থাকতে কিছু শব্দ মনে এলো...মনে হয়...কখনো হঠাৎ মনে হয়...

কখনো হঠাৎ মনে হয়; আমি এক আগ্নেয় পাহাড়। শান্তির ছায়া-নিবিড় গুহায় নিদ্রিত সিংহের মতো চোখে আমার বহু দিনের তন্দ্রা। এক বিস্ফোরণ থেকে আর এক বিস্ফোরণের মাঝখানে আমাকে তোমরা বিদ্রুপে বিদ্ধ করেছ বারংবার আমি পাথর; আমি তা সহ্য করেছি। মুখে আমার মৃদু হাসি, বুকে আমার পুঞ্জীভূত ফুটন্ত লাভা...

সুকান্ত। ঊষর নিষ্ফলা বন্ধ্য হওয়ায় কবিদের পংক্তিগুলো অবলম্বন...


বাইরে স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। দরজাটা খুলেই রাখি। হেঁটে আসি করিডোর দিয়ে। সিড়িঘরের কোনায় ছোট একটা বিড়াল। কালো। একটু থেমে আমায় দেখলো। ঘুরে চলে গেলো। আমার কি মনে হোলো। পিছু পিছু নামলাম। বিড়ালটা নেই। উঠোনের আর্দ্র ঘাস। চাঁদের আলো। তারাদের মিটিমিটি। দরজা খুলে বের হতেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। একটু ঠাণ্ডা লাগছে। বাতাসটা থেমে গেলো একটু। দোতলা কাঠের বাড়িটার চারপাশে বেশ কিছু গাছ। আমগাছ আছে। আছে কাঁঠাল, নারিকেল, পেয়ারা। লেবুগাছটা লাগিয়েছিলাম গতবছর। বড় হয়েছে। কিছু ফুলের গাছ ছিলো। অযত্নে মরে গেছে। কাঁটাঝোপগুলো ঘিরে রেখেছে বাড়িটা। সন্ধ্যার পর বিদ্যুত থাকেনা। দিনের বেলা দরকার হয়না। কেরোসিনের লণ্ঠন আছে একটা আমার ঘরে। আরেকটা নিচের খাওয়ার ঘরে। এখন কোনটাই জ্বলছে না। চাঁদ আছে, কৃত্রিমতার প্রয়োজন নেই তাই। এক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে শান্ত অন্ধকার সময়কে বুকভরে টেনে নিয়ে ভেতরে চলে যাওয়ার সময় বিড়ালটা কোথা থেকে ফিরে এলো আবার। অন্ধকারে চোখদুটো জ্বলছে। এই বাসায় তিনটে বিড়াল আছে জানি। ওদের মধ্যে দুটো ছানা। ধবধবে সাদা। আরেকটা সাদাকালো। ওগুলো ঘরেই থাকে প্রায় সময়। এই কালোটা ওদের কেউ? এখনও তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে আছে। আমিও আছি। তারপর আস্তে আস্তে ওটা ঘুরে হারিয়ে গেলো অন্ধকার ঝোপটার আড়ালে। আমার হাতে একটা পেনসিল ছিলো। ঘরে বসে কার ছবি আঁকছিলাম। পেনসিলটা হাতে নিয়ে হেঁটে গেলাম উঠোনের ঝরা পাতার উপর দিয়ে। বিড়ালটা ডানের ঝোপের আড়ালে গেছে। সোজা এসে নিচু গেটটা খুলে রাস্তায় নেমে এলাম। মাটির রাস্তা। এঁকেবেঁকে গেছে। অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু ওটা ধরে বামদিকে একটু এগুলেই ছোট একটা বিল পড়বে। এখন বৃষ্টির সময়। পানি বাড়ছে। খুব ভোরে বিলের মাঝখানে একটা সাদা বক বসে থাকে মাথা নিচু করে। বামদিকে গেছে ওগুলো সব। আর ডানদিকের পথটা ধরে অনেকদূর গেলেও কাউকে পাওয়া যাবেনা। শূন্য পথ। শুধু মাটি। মাটির সাথে কিছুদূর গেছে চারপাশের গাছগুলো। তারপর আর কিছু নেই।
বিড়ালটা ডানদিকে গেছে।

নিচে তাকিয়ে দেখি, খালি পা। মনে পড়লো, দরজাটা খোলা রেখে এসেছি। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29204938 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29204938 2010-07-22 03:26:53
এককোষী বহুকোষী




বহুকোষী প্রাণী হইয়া জন্মগ্রহণ করিবার ফলস্বরূপ বহুবিধ জটিলতার ভিতরে একটি অন্যতম সমস্যা বা ত্রুটি হইতেছে এককোষী অণুজীবদের চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে অস্পষ্টতায় বিরাজন কিংবা তাহাদের এই বলিয়া তাচ্ছিল্যজ্ঞান করা যে ‘আরে উহারা সাহিত্যচর্চা করিলেও তো কখনই রসময়গুপ্ত হইতে পারিবে না’। তবে যাহাই হউক, ইহা তো নিতান্তই সত্য, নতুবা বাস্তবকথন, যে আমাদিগের (এই ক্ষেত্রে ‘আমার’ বলাই উত্তম) উচ্চাকাঙ্খা, উন্নত জীবনের হাতছানি, প্রেম-ভালোবাসার আয়নপ্রবাহ, টেষ্টোষ্টেরন, ফ্রাইড চিকেন, ব্রেষ্ট-ফিডিং, ঈশ্বর বিতর্ক, নবজাতক-ধর্ষণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটনীতি, নাগরিক লাঞ্ছনা, পুঁজিবাদের চোরাস্রোতে সেলাইমেশিন-গবাদিপশু, মূল সমস্যা হইতে যোজন-যোজন দূরবর্তী অঞ্চলে বিচরণপূর্বক ওয়াশিংমেশিনে ধৌতকৃত মস্তিষ্কধারীদের কাষ্ঠদণ্ডের ছড়িসমেত লম্ফঝম্প, প্রশ্নাতীত (!) অবধারণসম্পন্ন এবং প্রভূত বিশ্লেষণী ক্ষমতাসম্পন্ন কুশীলবদের অর্থহীন ল্যারিক্স কাঁপানো, কতিপয় শুভ্রশ্মুশ্রু এবং সাদাজোব্বাধারীদের ‘হক মাওলা’ এবং ললাটে দুর্নীতি-অপকর্মের কৃষ্ণকায় ক্ষতচিহ্ন, পারসোনা’র পারসোনিফিকেশন, এইজ-রিম্যুভাল মাখন, তৈলাক্ত জুতার পালিশ, শরীরচর্চাকেন্দ্রের দৌরাত্ম্য, পুঁজিতান্ত্রিক গ্ল্যামার প্রতিযোগিতা এবং উঁচুনিচু-মেলানিন-কমবেশী বর্ণভেদের ফাঁক গলিয়া ‘সুপারহিউম্যান’ মানবসম্প্রদায়ের সময়ই বা কোথায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককোষী প্রাণীদের বোধ নিয়া ভাবনার অবকাশের।




মানুষ জন্মানোর পরের মুহূর্ত থেকেই যে এককোষী অণুজীবগুলো মানবদেহকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপ্‌টে ধরে; পরিপাকতন্ত্র, শ্বসনতন্ত্র, দন্ত ও চর্মে তাদের আধিপত্য ঘোষণা করে, অতঃপর ধীরে ধীরে এক জটিল সম্প্রদায় গঠন করে এবং মৃত্যু পর্যন্ত সঙ্গ দেয় মানবদেহকে, এগুলোই সেই মহানুভব ব্যাকটিরিয়া (একবচনে ব্যাকটিরিয়াম)। মানবদেহের কোষের তুলনায় প্রায় দশগুন সংখ্যার অধিকারি হলেও এরা নিতান্তই ছোট মানবকোষাকৃতির কাছে। আমাদের চর্মচক্ষুর কাছে ওরা তাই অদৃশ্য। অলক্ষ্য।

ব্যাকটিরিয়া এককোষী, প্রোক্যারিয়ট (prokaryote) অণুজীব (microorganism)। প্রোক্যারিয়ট বলা হচ্ছে কারণ এদের কোন সেল-নিউক্লিয়াস নেই, অথবা নেই কোন ঝিল্লী-আবদ্ধ (membrane-bound) অর্গানেল (organelle) - যদিও এর কিছু কিছু ব্যতিক্রম প্রত্যক্ষ করা যায়। এককোষী হলেও, মানব ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই অণুজীব। ভুলে গেলে চলবে না জীবনের উৎপত্তি এই এককোষী অণুজীবদের মাধ্যমেই হয়েছিলো। এককোষী প্রাণের উৎপত্তি বিবর্তনের আওতাভুক্ত না হলেও বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে চায় তার পরের ধাপগুলো – এককোষী প্রাণের ক্রমিক মেটামরফোসিস। তাই আজ যখন বহুকোষী জটিল দেহযন্ত্রের বিকাশ সাধন হয়েছে, তখন অণুজীবগুলোর প্রাগৈতিহাসিক ভূমিকা উচ্চবোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের কাছে ধরা নাও দিতে পারে। কিন্তু এখন বোধকরি সময় এসেছে ওদের ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণের।

১৬৮৩ সালে লিউয়েন হুক নামক এক ওলন্দাজ বিজ্ঞানী যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে মানবকোষের ফাঁকে ফাঁকে দেখলেন এক সমৃদ্ধ অণুজীব সম্প্রদায় (microbial community), তখন রয়্যাল সোসাইটিকে তিনি এই জানিয়ে লিখলেন, “many very little living animalcules, very prettily a-moving”। মানবদেহে অবস্থানরত এই জীবগুলোর জীবন-ব্যবস্থা বুঝতে তাই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা অণুজীবগুলোকে তাদের নিজস্ব সহজাত বাসভুমি থেকে আলাদা কোরে গবেষণাগারের কালচারডিশে নিয়ে এলেন, যার ফলে যেটা হোলো, তথ্যের ঘাটতি। যাই হোক, নতুন নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অবশেষে এটাই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে ক্ষুদ্র হলেও, এই অণুজীব সম্প্রদায় এক শক্তিশালী রাসায়নিক কারখানা যেটা মৌলিকভাবে মানবদেহের কর্মবৃত্তিকে প্রভাবিত করে। এই সম্প্রদায় এলোমেলো এলোপাতাড়ি নয়, বরং সুসংগঠিত সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী যারা বংশপরম্পরায় আমাদের ভেতর বিরাজ করছে। আমরা সাধারণতঃ জননী এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ হতেই জীবনের প্রথম অণুজীবগুলো পেয়ে থাকি এবং কিছু নির্ধারিত হয় আমাদের জীবনশৈলীর উপর। এগুলোর উপরই নির্ধারিত হয় স্বতন্ত্র মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অণুজীব-সম্প্রদায়ের প্যাটার্ন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরিপাকতন্ত্র এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এইসব অণুজীবগুলো দেহের কোষগুলোকে রাসায়নিক সঙ্কেতের মাধ্যমে উত্তেজিত/আলোড়িত করতে পারে। আবার অনেক ব্যাকটিরিয়্যাল প্রোডাক্ট যেগুলোকে আমরা বিষাক্ত বলে চিহ্নিত করি, সেগুলো নাকি আদৌ তা নয়। এগুলো নাকি শুধুই অণুজীব (microbe) আর গৃহকর্তার (host) মধ্যে আলাপচারিতা। We are in constant communication with our microbes, and the messages are broadcasted throughout the human body। লণ্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের এক উৎসাহী রসায়নবিদ তো এই কথা বলেই ফেললেন যে পেটের নাড়ীভুঁড়ির ভেতরে বসবাসরত এই শক্তিশালী সম্প্রদায় যে শুধু আমাদের খাদ্যদ্রব্য হজম করার ক্ষেত্রেই সাহায্য করে তা নয়, এদের দৌড় নাকি আমাদের মস্তিষ্ক পর্যন্তও – influences subtle workings of our brain chemistry as well! শুধু কি তাই! আমরা কথায় কথায় যে জেনেটিক ডিটারমিনেজম ছুড়ে দিই, সেটাও কিঞ্চিত লঘু হয়ে যাচ্ছে যখন দেখা যাচ্ছে অতিশয় স্থুলতা’র (obesity) কারণ শুধু জিনেটিক নয়, অণুজীবও বটে! কিভাবে? ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা মোটা ইদুরের পরিপাকতন্ত্র থেকে কিছু ব্যাকটিরিয়া যখন স্থানান্তরিত করলেন এক শুঁটকো ইদুরের মধ্যে, দিব্যি ফুলে গেলেন লরেল! হার্ডি তো অবাক! যাই হোক, একই ভাবে, বিজ্ঞানীরা এটাও খেয়াল করলেন দুজন মোটা-চিকন যমজ মানবশিশুর ভেতর অণুজীব সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বিদ্যমান।

ব্যস!! হয়ে গেলো! আমেরিক্যান সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজী’র ১০৮তম সম্মেলনে Margaret McFall-Ngai নামক এক অণুজীববিজ্ঞানী বলে উঠলেন, “Human beings are not really individuals; they’re communities of organisms”! আমরা ওইসব অণুজীবদের আবাসভূমি নই শুধু, ওরা শুধুই আমাদের খাদ্যদ্রব্য পরিপাক করায় না বা রোগসংক্রমণ হতে বাঁচায় না, ওরা-আমরা মিলিয়েই এক যৌথ প্রাণ, আমাদের দেহ ওদের সাথে অভিযোজিত হয়! সুপার-অর্গানিজম! হুম! অনেকটা গায়ার মতন। সবকিছুই এক জটিল সিস্টেমের অংশ। প্রাণ-চাঞ্চল্যে সমৃদ্ধ প্রত্যেকটি সত্তা/অস্তিত্ব এই সিষ্টেমের অন্তর্ভুক্ত। এবং সবকিছুই সম্পর্কযুক্ত এক পুনঃপ্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে!

“আমরা কে?”- এই প্রশ্নের জৈবিক-উত্তর খোঁজার জন্য হিউম্যান জিনোমের দিকে তাকাই এবার। এই প্রজেক্ট যখন ডিএনএ’র তিন বিলিয়ন-বেইস-পেয়ার সিকুয়েন্স বের করে ফেলল, আমরা হয়তো ভাবছিলাম যে এটাই হয়তো মানব-জীবনের নীলনকশা! বেশ কিছুদিন পর অবশ্য এটাই বোঝা গেলো যে এই জিনোম আসলে আমাদের পূর্ণাঙ্গ সত্তার কিয়দংশ মাত্র। এখন নাকি এই কথাও হচ্ছে, যে স্বতন্ত্র মানব-নীলনকশা পূর্নাঙ্গরূপে বুঝতে হলে আমাদের ভেতর বসবাসরত স্বতন্ত্র-অণুজীবগুলোর জিনোমও বিবেচনায় আনতে হবে, অন্যথায় মানবচরিত অধরাই থাকবে।

তাই অণুজীবদের নিয়ে এই নতুন ধারণা গুরুত্বপূর্ণ বটে।
The discovery underscored the fact that life as we know it is built upon microbes, whether we look in the deepest oceans or our own intestines .....

তাই এই প্রশ্ন এখন উঠতেই পারে যে, Are we organisms or living ecosystems?




অণুজীবদের লইয়া কিঞ্চিত জ্ঞান আহরণের পর এই মুহূর্তে শুধু ইহাই জানিতে ইচ্ছা করিতেছে, কোন এক কবি-হত্যাপরিকল্পনার সময় কোন এক পাপাচারীর ব্যাকটিরিয়া কলোনি কি নির্লিপ্ত ছিলো? কোন এক কালে স্বজাতি ধর্ষণের সময় তাহাদের মাইটোকণ্ড্রিয়াল ডিএনএ কি কাঁপিয়া উঠে নাই? অতঃপর দলমতনির্বিশেষে সকল ভাবাদর্শ ভূলুণ্ঠিত করিয়া জগতের সব দলীয়-আদর্শ যখন একীভূত হইয়া যায়, গণতান্ত্রিক ও (অ)গণতান্ত্রিক দলপতিগণ পর্দার আড়ালে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করেন সম্প্রীতি আর ঐক্যের সার্কাসে, নৈতিকতার লেজুড় খুঁজিয়া না পাওয়া সন্তানদিগদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করিতে চান আধিপত্যপরম্পরা, তখন আমজনতার ত্রাহি আর্তনাদ করা ছাড়া আর উপায়ান্তর আছে কি? স্বজাতির মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক কৃষ্টি (ওহ্‌ চিত্তাকর্ষক শব্দমালা) তো থামাইতেই হইবে! প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন আবার কি? উহাদের চিন্তা করিতে দেওয়া যাইবে না! উহারা শুধুই ছুটিবে। উহারা শুধুই দৌড়াইবে। দৌড়াইতে দৌড়াইতেই পরম সুখের উদ্যানে নিক্ষিপ্ত হইবে। থলির বিড়াল বাহির হইয়া আসিতে থাকিলেও এই ঘুণধরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান কুটিল অক্টোপাসের শুড়গুলি গুটাইয়া নিতে বাধ্য করিবে কে?

প্রায় সাড়ে পনের ইঞ্চি পর্দার সামনে মুখগুজিয়া বসিয়া সাতাশিখান বোতামের সহায়তায় ফুঁসিয়া উঠা রক্তকণিকা নির্লিপ্ত করা যাইতে পারে বড়জোর, বহির্জগতের কলুষিত এবং পচিয়া যাওয়া দেহে প্রাণ সঞ্চার করিতে পারেনা কখনই। তাহার পরও নাকি বরষা আসে, নদী ফুলিয়া উঠে, শালিকের চোখের বিষণ্ণতা দেখিয়া পঙ্গু-মানস সাহিত্য করিতে চায়।

এককোষী বহুকোষী মিলিয়া ইহা একটি গুরুচণ্ডালী জগাখিচুড়ী হইয়া গিয়াছে। উপাদেয় না হইলে উদ্‌গিরণ করুন।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29203633 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29203633 2010-07-19 23:52:16
প্রজাপতি


আজ বলবো এক প্রজাপতির কথা। ছোট্ট এক প্রজাপতির গল্প। সেই ছোট্ট প্রজাপতি যে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াতো, উড়ে বেড়াতো। হঠাৎ একদিন কি হোলো, ছোট্ট সেই প্রজাপতিটার খুউব বিয়ে করতে ইচ্ছে হোলো! আর তাই সে খুঁজে বের করতে চাইলো ফুলদের ভেতর সবচেয়ে সুন্দর একজনকে। সে উড়ে বেড়াতে থাকলো আর আড়চোখে দেখতে থাকলো সুন্দর সুন্দর ফুলদের। বৃন্তের ওপর ফুলোগুলো কী শান্ত চুপচাপ হয়েই না বসে আছে; ঠিক বাগ্‌দানের আগে কুমারীরা যেভাবে বসে থাকে। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেলো যে! ওরা যে অনেক! এত্তোগুলো ফুল থেকে তার মনের মতন কাউকে খুঁজে বের করা সত্যিই বেশ মুশকিল, ক্লান্তিকর। সময়ের ব্যাপার। একঘেয়েও বটে! প্রজাপতিটা তাই এত্ত ঝামেলায় যেতে চাইলো না; আর তাই সে উড়ে গেলো ডেইজি ফুলের কাছে। অনেক জ্ঞানী এই ফুল! ফরাসীরা আদর কোরে ওর নাম দিয়েছে মার্গারিট্‌। দূর দেশের ঐ লোকরা এটাও বলে, যে ডেইজি নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পারে! অনেক জ্ঞানী। ও নাকি অনেক জানে! যে মানুষেরা একজন আরেকজনকে খুব ভালবাসে, ওরা কতবারই না ডেইজির একটা একটা পাতা ছিঁড়তো আর চুপিচুপি জিজ্ঞেস করতো অনেক কথা। “ও কি আমায় ভালবাসে?” “কতটুকু?” “অনেক অনেক?” “অল্প একটু?” “একটুও না!” – এরকম কত প্রশ্ন! আমাদের ছোট্ট প্রজাপতিটা এইসব গল্প কিন্তু ঠিকই জানতো। আর তাই সে উড়ে এলো এক মার্গারিটের কাছে। অদ্ভুত সুন্দর এক ডেইজি ফুল। কিন্তু অন্যদের মতন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার সময় সে ডেইজির কোমল পাতাগুলো ছিঁড়লো না মোটেই, বরং ধীরে ধীরে চুমু খেলো ওদের ওপর, কারণ সে এটাই ভাবতো যে দয়া দেখিয়ে, স্নেহ-মমতা-আদর দিয়েই অনেক দূর যাওয়া যায়; ছিঁড়ে ফেলে, নষ্ট বা ধ্বংস করে কখনও নয়।

“প্রিয়তম মার্গারিট্‌ ডেইজি!” বলে উঠলো ছোট্ট প্রজাপতিটা, “সবাই জানে সব ফুলদের ভেতর তুমিই সবচেয়ে জ্ঞানী মহিলা! তুমি কি একটু কষ্ট কোরে আমায় বলবে ওই অতগুলো ফুলদের ভেতর থেকে কাকে আমি আমার সহধর্মিণী বানাবো? কে হবে আমার নববধূ? তুমি কি আমায় বলবে প্রিয় মার্গারিট্‌? তুমি যদি আমায় বলো আমি সাথে সাথে উড়ে যাবো তার কাছে। উড়ে যাবো আমার সেই প্রিয়তমার কাছে, আর চুপচাপ ওকে জানাবো আমার ইচ্ছের কথা।”

প্রশ্নটা কোরে চুপটি দাঁড়ালো ছোট্ট প্রজাপতি। মার্গারিটের উত্তরের অপেক্ষায়...
অবাক ব্যাপার! মার্গারিট্‌ কোন উত্তর দিচ্ছে না কেন? ছোট্ট প্রজাপতিটা অবাক হোলো। দ্বিতীয়বারের মতন প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলো সে ডেইজিটাকে। নাহ্‌। কোন উত্তর নেই। তৃতীয়বার। এবারও কোন উত্তর নেই। মার্গারিট একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। সত্যি অবাক হোলো ছোট্ট প্রজাপতি। সে তো বুঝতে পারেনি নিজের অজান্তেই মার্গারিট্‌টার মনে কষ্ট দিয়েছে সে। ওকে ‘মহিলা’ বলে ডেকেছে! মার্গারিট্‌ তো মহিলা নয় মোটেই! অনেক জ্ঞানী হলে কী হবে, সে তো এখনও একটা ছোট্ট মেয়েই আছে, মহিলা তো নয়! দুটো শব্দ কী এক হতে পারে কখনও! এই যাহ্‌! বোকা প্রজাপতিটা ওটা বুঝতে পারেনি!

ডেইজিটার কাছে থেকে কোন উত্তর না পেয়ে তাই কষ্ট পেলো ছোট্ট প্রজাপতিটা। কিন্তু সে আর অপেক্ষা করলো না। উড়ে গেলো। উড়ে গেলো ওর প্রিয়তমার খোঁজে। ভাবখানা যেন এই যে ‘ডেইজি বলেনি তো কী হয়েছে! আমি নিজেই খুঁজে নেবো!’ ও আবার ফিরে গেলো সেই ফুল-রাজ্যে যেখানে বসন্তের প্রথম বনফুল আর নানান বর্ণের রঙিন ফুলগুলো চারদিক আলো কোরে ফুটে আছে।

‘হুম। ওরা সবাই বেশ সুন্দর বটে!’ মনে মনে ভাবলো প্রজাপতিটা, ‘নিঃসন্দেহে সুন্দর সবাই। কিন্তু...কিন্তু কেমন যেন একটু বেশী নাক উঁচু ভাব। কেতাদুরস্ত। বড্ড পরিপাটি!’ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো প্রজাপতি, ‘নাহ্‌!’

বসন্তের প্রথম ফুলগুলো যখন ওর পছন্দ হোলোনা, কমবয়সী ছেলেদের মতন প্রজাপতিটা এবার আকৃষ্ট হোলো একটু বেশীবয়সী ফুলদের দিকে! সে উড়ে গেলো এ্যানেমনির কাছে, তারার মতন দেখতে এই বনফুল। কিন্তু ওদের দেখে প্রজাপতিটার কেমন খিট্‌খিটে মনে হোলো। ‘যাচ্চলে! দরকার নেই বাবা!’ এবার সুন্দর গন্ধওয়ালা বুনোফুল ভায়োলেট! কিন্তু ওরা কেমন যেন একটু বেশীই আবেগপ্রবণ! ‘ধ্যুত! এত আবেগে কাজ নেই!’ তারপর হলুদ রঙের লেবুফুল। কী সুন্দর গন্ধ ওদের! কিন্তু ওরা দেখতে কেমন ছোটখাট, আর ওদের পরিবারে এত এত লোকজন! ‘উহু! সেটা হচ্ছে না!’ তাহলে কি আপেলফুল? ওরা দেখতে কিছুটা গোলাপের মতন বটে! কিন্তু আজ আছে, কাল নেই। বসন্তের পর ওই যে গ্রীষ্মের ঝোড়ো হাওয়া, তাতেই ওর পাপড়ি ঝরে দফারফা! ‘ওর সাথে বিয়ে হলে কতক্ষণই বা টিকবে?’ এভাবে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত তবে এক সুন্দর মটরফুলকেই প্রজাপতিটার ভালো লাগলো। ‘আহ্‌ মটরফুল! লাল আর সাদার মাঝামাঝি কী অদ্ভুত সাবলীল সুন্দর আর হালকা-পাতলাই না তুমি!’ হুম! এগুলো সেই গৃহপালিত রমণীদের মতন যারা দেখতে এত সুন্দর, অথচ রান্নাঘরে কী দারুণ উপকারী! বাহ্‌! দারুণ! এক ঢিলে দুই পাখি! আনন্দে বেশ কিছুক্ষণ অকারণে ডানা ঝাপটালো ছোট্ট প্রজাপতি! সে খুঁজে পেয়েছে ওর প্রিয়তমাকে অবশেষে! কিন্তু ঠিক যখনই সে মটরফুলটাকে ওর ইচ্ছের কথা জানাবে, গদগদভাব নিয়ে পা ভাঁজ কোরে বসবে ফুলটার সামনে, বলবে ওর মনের কথা, তখনই তার চোখে পড়লো ফুলটার পাশে এক আপাদমস্তক মটরশুঁটি!

“উমম...ওটা কে প্রিয়তম? কে ওটা তোমার পাশে? কে ঐ লম্বাটে পদার্থটি?” সে জিজ্ঞেস করলো।
“ওহ্‌ ওটা! ওটা তো আমার বোন...” উত্তর দিলো মটরফুল।
“ওহ্‌ আচ্ছা! তাই বুঝি! আর তুমিও একদিন ওটার মতোই হবে...” কেঁপে উঠলো বেচারা প্রজাপতি, এক মুহূর্তও দেরী না কোরে উড়ে গেলো সে। পালিয়ে গেলো।

সবুজ মাঠের চারপাশ দিয়ে যে ঝোপঝাড়গুলো বসে ছিলো, প্রজাপতিটা এবার উড়ে গেলো সেইদিকে। হলদে-লাল ফুলগুলো ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে। কিন্তু ওরা সবাই দেখতে একই রকম! লম্বাটে অগভীর রূপ! ফুটে আছে শত শত। ‘হচ্ছে না! হচ্ছে না!’ আনমনে বলে উঠলো প্রজাপতি।
সত্যি এভাবে কিছুই হচ্ছে না!

তারপর বসন্ত পেরিয়ে গেলো। গ্রীষ্ম এসে চলে গেলো। হাঁটিহাঁটি পায়ে শরৎ এলো। কিন্তু ছোট্ট প্রজাপতি কাউকে তার ইচ্ছের কথা বলতে পারলো না। সে কোনভাবেই মনস্থির করতে পারেনি। কিছুই ঠিক মনে হয় না তার কাছে। শরতের ফুলগুলো কেমন জমকালো জামা পড়ে আছে, কিন্তু ওদের তো তারুণ্যের সেই সুগন্ধ নেই। যৌবনের সেই ঝরঝরে ভাব নেই। কিন্তু শরীর বুড়ো হয়ে গেলেও মন তো এখনও সেই সুগন্ধ খোঁজে, যেই সুগন্ধ নেই ডালিয়ায় কিংবা শীত-হেমন্তের উদ্যানশোভন ফুলে। প্রজাপতিটা তাই এবার বুঝতে চাইলো মাটির কাছাকাছি থাকা পুদিনাপাতাকে – সেই পুদিনাপাতা যে কোনদিনও প্রস্ফুটিত হয়নি, যে কখনও ফুল হয়ে ফোটেনি, কিন্তু যার অঙ্গে-অঙ্গে পাতায়-পাতায় ফুলের মতন সৌরভ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে।

“আমি ওকে চাই।” বলে উঠলো ছোট্ট প্রজাপতি, আর সে চুপচাপ জানালো পুদিনাপাতাকে ওর মনের ভেতর এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা কথাগুলোকে।
পুদিনাপাতা চুপচাপ শুনলো প্রজাপতির কথা। তারপর শক্ত হয়ে দাঁড়ালো। কঠিন হয়ে গেলো।
অনেক্ষণ পর সে বলে উঠলো, “বন্ধুত্ব; প্রিয় প্রজাপতি আমার, আর কিছু নয়। আমি বুড়ো হয়ে গেছি, তুমিও তো হারিয়েছো তোমার যৌবন। বিয়ে নয়; আমরা বরং এভাবেই একজন আরেকজনের জন্য বেঁচে থাকতে পারি। এই মুহূর্তে এমন উদ্ভট হাস্যকর কর্ম কি না করলেই নয়!”

ওহ্‌ কী কষ্ট!
তাই শেষ পর্যন্ত এটাই হোলো। ছোট্ট প্রজাপতিটা কাউকে পেলোনা। সে যে অনেক সময় নিয়ে নিয়েছে কাউকে ‘পছন্দ’ করতে! প্রজাপতিটাকে এখন একটা বুড়ো-চিরকুমার হয়েই থাকতে হবে সারাজীবন।

শরতের শেষদিকে একদিন হঠাৎ অনেক ঝড়-বৃষ্টি। ঠাণ্ডা বাতাস। বড় বড় গাছগুলো কেমন ধাক্কা খাচ্ছে একজন আরেকজনের সাথে। ভেঙে যাচ্ছে। শব্দ হচ্ছে অনেক। সত্যি এরকম আবহাওয়ায় উড়ে বেড়ানো মুশকিল বটে। আশ্রয় দরকার। উষ্ণতা দরকার। নিরাপদ উষ্ণতা।
আমাদের ছোট্ট প্রজাপতিটা কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে! মানুষ নামের প্রানীদের ঘরের ভেতরের গরম চুলার পাশে সে বেশ আরামেই আছে। ঠিক গরমকালের মতন, বাইরে মেঘ-ঠাণ্ডা-বৃষ্টি হচ্ছে তো হোক!

‘আমি এখানেই টিকে থাকতে পারি’ ভাবলো ছোট্ট প্রজাপতি, ‘কিন্তু শুধু টিকে থাকাই কি যথেষ্ট? আমি তো মুক্তি চাই, সূর্যের আলো চাই, আর চাই এক ছোট্ট ফুল যে আমার সঙ্গী হয়ে থাকবে। একাকী আমায় সঙ্গ দেবে।’

এই কথাগুলো মনে হতেই বন্দী প্রজাপতি মুক্ত হতে চাইলো। সে উড়ে গেলো জানালার দিকে, আর তখনই মানুষদের ভেতর একজন ওকে দেখতে পেয়ে ধরে ফেললো, আলপিন দিয়ে গেঁথে ফেললো, আর সাজিয়ে রাখলো এক বাক্সের ভেতর যেখানে অনেক আজব-দুর্লভ বস্তুদের দেখতে পেলো ছোট্ট প্রজাপতিটা।

“আমি আবার বন্দী হয়ে গেলাম, বৃন্তের উপর ফুটে থাকা ফুলগুলোর মতই আমি এখন...” বলে উঠলো প্রজাপতিটা, “যদিও এটা খুব মজার বা সুখকর কিছু নয়, কিন্তু আমি ভাবতেই পারি এটা বিয়ে করার মতই কিছু একটা যেখানে আমায় এইরকমই শক্ত অনড় হয়ে থাকতে হোতো” - এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চাইলো ছোট্ট প্রজাপতি!

“ওহে হতভাগা! উহা তো নিতান্তই এক শোচনীয় সান্ত্বনা। করুণা হইতেছে তোমার প্রতি!” – বলে উঠলো ঘরের কোনার টবের উপর জন্মানো এক ছোট্ট গাছ।

“হুম” ভাবছে ছোট্ট প্রজাপতি, “কেউ কি এইসব গাছ-গাছড়াদের বিশ্বাস করতে পারে যারা সারাটা জীবন কাটিয়েছে ঐ দুপেয়ে মানুষদের সাথে?”

(শেষ)

মূল : দ্য বাটারফ্লাই - হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এ্যান্ডারসন (১৮৬১) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29200622 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29200622 2010-07-15 22:34:16
শব্দউপাসক


ঘুণেধরা চৌকির ক্ষয়িষ্ণু পায়ার কাছে এক চুপচাপ আরশোলা। শুঙ্গ দুটি নড়ছে। ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে চুয়ান্ন। পেন্ডুলাম টিকটিক। ঘণ্টাধ্বনি বিকলাঙ্গ। বিগত দুটি প্রহর নিঃশব্দে কেটেছে।

ছেঁড়া পর্দা আর ভাঙ্গা কাঁচের ফাঁক দিয়ে বারোটা ছাপ্পান্ন মিনিটের হাওয়া যখন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো এই শয়নকক্ষে, নোংরা অন্ধকার গলির তলপেট মোচড়ানো ঘ্রাণ তার সঙ্গ দিতে ভোলেনি। ভ্যাপসা গরম আর আর্দ্রতাপুষ্ট ঘর্মগ্রন্থির সাথে নাক সিটকানো গন্ধ এখন ঘরটাতে। নিচু ছাতের কোনে মাকড়সার ঝুল। কাঠের পাটাতনে যান্ত্রিক পাখার ঘড়্‌ঘড়্‌। তিনটি ব্লেড গোনা যাচ্ছে। পাখার ঠিক নিচে ক্যাঁচ্‌ক্যাঁচে চৌকি। চাদর উলট-পালট। কুঁচকে আছে। তার মাঝে এক ঘুমন্ত মানুষ। আর চাদর ছাড়া এক বিক্ষিপ্ত মানুষ। এক কোনে ছোট্ট টেবিল। চেয়ার নেই। টেবিলের উপর চামড়া উঠা হাতব্যাগ আর রোদে পোড়া ঝোলা। পাশেই ছোট আলনা। তাতে ফেলে রাখা পরিধেয় বস্ত্র। ধূসর প্যান্ট। সাদা শার্ট। কালো শাড়ি। আর মেঝেতে পড়ে থাকা নীল ওড়না। চন্দ্রালোক অনুপস্থিত দোতলার এই অন্ধকার খুপড়িতে। পরিবর্তে ষ্ট্রিটল্যাম্পের চল্লিশ পাওয়ারের আলোয় দেয়ালে বসে থাকা সাদা প্রজাপতিটা চুপচাপ দেখে নিলো ধূলিময় মেঝের সস্তা মাদুরের উপর এলেমেলো ছড়ানো অন্তর্বাসগুলোর ফাঁক দিয়ে শুঙ্গ নেড়ে চলে যাওয়া এক কালচে আরশোলা।

দূরে কোথাও রেল-শব্দ। গভীর রাতের নির্জন গলি আর আর্দ্র বিছানা। রাস্তায় দুটো মাতালের গান আর পাশের ঘরগুলোর ফিসফাস। সস্তা পারফিউম উপ্‌চে প্রকট ঘামের গন্ধ। লেপটানো সাদা অভ্রচূর্ণ।

আগন্তুকের গরম লাগছে। চিৎ হয়ে শুয়ে সে তিনটি পাখা গুনছিলো।
এক দুই তিন। এক’টা দুই হয়ে যাচ্ছে। দুই’টা তিন।
আর ঘড়িতে রাত একটা বেজে সাত।

পাশের অবয়বটি কেঁপে উঠলো। স্যাঁতস্যাঁতে গরমে স্বপ্ন দেখছে বুঝি।
নগ্ন হাত। নিরাভরণ গ্রীবা। উন্মুক্ত পৃষ্ঠদেশ। অর্ধনগ্ন পশ্চাদদেশ। এলেমেলো চুলের ফাঁক গলে চল্লিশ পাওয়ারের আলোয় অভিক্ষিপ্ত চোখের কালশিটে আর নাগের ডগার বিন্দু ঘাম। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলছে। নড়ে উঠছে। অগ্রসরমান হস্ত অদৃশ্য দেয়ালে বাঁধা পেয়ে ফিরে এলো। অচেনা অবয়ব স্বপ্ন দেখুক।

স্বপ্ন।
দুই ঘণ্টা আগের মুহূর্তগুলোও আগন্তুকের কাছে এখন স্বপ্ন বটে। কিংবা দুঃস্বপ্ন। তবে এক অদ্ভুত শারীরিক পরিতৃপ্তিকে সে অস্বীকার করতে পারলো না। মাথার দপদপ ব্যথাটা আর নেই। হালকা হয়ে গেছে। বস্তুজগত স্বচ্ছ ও সহজবোধ্য। প্রগাঢ় সন্তোষসাধন। পরম পরিতুষ্টি।

কিন্তু...
না কোন কিন্তু নয়। সে শুধুই বর্তমানে আছে এখন। এখানেই থাকতে চায়। অতীতকে ফ্যানের দুইনম্বর পাখাটায় লট্‌কে দিয়ে ভবিতব্যগুলোকে ছুড়ে দিলো সে গলির মাতালদের স্বচ্ছন্দ স্বরযন্ত্রে। ছন্দিত স্পন্দনে ঘুরে বেড়াক ওগুলো। অনুশোচনা নেই। খচ্‌খচে ভাবগুলো বিভ্রম শুধু। অলীক। ঘেমে উঠা শরীর আর পাশের উষ্ণ দেহ আজ প্রকৃত বাস্তবতা। প্রত্যক্ষ বর্তমান। আত্মগ্লানি আর অপরাধবোধ আজ নির্বিবেক। অনৈতিকতাগুলো পাশের খুপড়িগুলোর শীৎকারের মতোই অকৃত্রিম।

হঠাৎ উঠে বসলো সে। চৌকির একদিকে মাথা ঝুঁকিয়ে চিবুকে হাত রেখে শান্ত চোখে চুপচাপ দেখে নিলো অন্তর্বাস আর অন্তর্বসনদের এনট্রপি। সহবাসের পরের মুহূর্ত থেকেই একা হতে ইচ্ছে হচ্ছিলো তার। কেমন গুমট শ্বাসরোধ ভাব। ছটফট অস্থিরতা, তথাপি উদগ্র দৈহিক সন্তুষ্টি। এ এক অন্তহীন উপসেবন, বুঝে গেলো সে। পুনঃপুনঃ আসক্তি। মানসিক কাঠামোগুলো নড়েচড়ে বসেছে। দেয়ালের টিকটিকিটা তাই ক্ষণে ক্ষণে এই আবদ্ধ কুঠুরীর মাঝে ঘোষণা করছে এক লুম্পেন উপসেবকের অস্তিত্ব। শব্দহীন এক শব্দউপাসক যে খুঁজে বেড়াচ্ছে ধ্বনিসমষ্টির চ্যালিস।

পাশের কুঠুরীগুলো চুপচাপ হয়ে আসছে এখন। শ্রান্তি আর ক্লান্তি। আগন্তুক উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় টেবিলের উপর রাখা জলের পাত্রটির দিকে। তেষ্টা পেয়েছে। জলসেবনের পর কাঁপা হাতে তুলে নেয় পরিচ্ছদ। ধূসর প্যান্ট। সাদা শার্ট। অন্তর্বাসগুলো। আনমনে পরিধান করে নেয় ওগুলো। মেঝেতে লুটিয়ে থাকা পাদুকায় পদাঙ্গুলি ঢুকোতে ঢুকোতেই আচমকা মাতাল ঘূর্ণিহাওয়া জাপ্‌টে ধরে তাকে। বদ্ধবৈরী সেই বিষাদ। দেয়ালগুলো এগিয়ে আসছে। পড়ে যায় আগন্তুক। নিয়ন্ত্রণ হারায়। ধূলিময় মেঝেতে বসে পড়ে সে। দু’এক ফোঁটা অশ্রুজলে কর্দমাক্ত গৃহতল।

ওহ্‌ ঈশ্বর!

ঈশ্বর কোথায়। আজ এই আবদ্ধ কামরায় জড়বস্তুর অবস্থানই কাম্য।
জীবন নিশ্চেতন। কর্মচাঞ্চল্যরহিত।
অশ্রুপূর্ণ মানসে আগন্তুকের মনে পড়ে কিছু। মনে পড়ে কে কবে তাকে বলেছিলো - তুমি পূর্ণ নও হে কবি। তোমার অপরিণত অন্তর্জ্ঞান যথেষ্ট নয়। তুমি তো সংসারত্যাগী নও। তুমি তো নিজেকে ছুড়ে দাও না বিশ্ব-বিশৃঙ্খলায়। আত্মসচেতন তুমি তাই সর্বদা রইবে সাধারণদের কাতারে। তুমি ভয় পাও তোমার মনস্কামনা। সন্ত্রস্ত তুমি চেপে রাখো তোমার কাম। তোমার অভিলাষ। তুমি ভীত। তুমি ভীরু। তুমি শব্দহীন। ভাবহীন। মহাকালের রহস্য তোমার কাছে অধরাই থাকবে।

ভাঙ্গা কাঁচের জানালা খুলে যায় হঠাৎ।
আগন্তুকের হাতের মুঠোয় কিছু সাদা পৃষ্ঠা।
পরক্ষণেই ছিঁড়ে যায় ওগুলো।
ছেঁড়া টুকরোগুলো ভাসতে থাকে ধূলোয়।
আগন্তুক বের হয়ে আসে আবদ্ধ কামরা থেকে। চুলগুলোকে বেঁধে ফেলে। চুপচাপ জড়িয়ে নেয় নীল ওড়না। সরু করিডোর দিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় নেমে আসতেই দেখা হয়ে যায় সরল সোজা নির্ভেজাল মানবপ্রজাতির সাথে।

আফা কুন সমস্যা অয় নাই তো?

আহিলকারের দাঁত কেলানো হাসি অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেলো কিছু কড়কড়ে নোট। অতঃপর নিস্তরঙ্গ পদযুগল নেমে এলো পূতিগন্ধময় মূত্রভেজা পথে। মহার্ঘ শূন্য ধ্বনিসমষ্টিগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে রাতের শেষভাগে নির্জন গলির নিরন্তর আঁধার পার হচ্ছে কোন এক ছদ্মবেশধারী শব্দউপাসক। নির্মেঘ হাওয়ায় তার পেলব ঠোঁট শুধু গুঞ্জরনে...

Is the day long, O Lesbian maiden, And the night endless In thy lone chamber... ...but how far Too brief will the night be, When I returning To the dear portal Hear my own heart beat...

মেঘ করেছে আকাশে।
ঘনবসতিপূর্ণ কোন এক শহরের নিষিদ্ধ কোন গলিতে প্রাচীন গ্রিসের লেসবস দ্বীপের অস্পৃশ্য হাওয়ার ঊর্ধ্বমুখে নির্বাণপ্রাপ্তি। আর বৃষ্টিফোটার মতন টুপটুপিয়ে ঝরে পড়ছে অতীন্দ্রিয় শব্দসমষ্টি।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29195520 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29195520 2010-07-09 01:24:45
আত্মকথন


পুরোনো এক মন্দির। একাংশ ভেঙে গেছে। সম্মুখের পুরু কাঠের দরজায় তবু এক অতিকায় তালা ঝুলছে। দরজার ঠিক পাশের ভাঙা দেয়ালের শেওলা পরা ইটের খাঁজে স্মৃতিগুলোকে লুকিয়ে রেখেছি আমি। লুকোনো স্মৃতির নির্যাস শুষে বেড়ে উঠেছে লতাগুল্ম। পিচ্ছিল সবুজ। মাঝে মাঝে পচে যাওয়া হলুদ। হলুদগুলোর মাঝে হেঁটে যায় কিলবিলে অমেরুদণ্ডী। ওগুলো নেমে যায় দেয়াল বেয়ে। ঠুনকো ইটের ফাঁকে হারিয়ে যায় কখনও। আবার বেরিয়ে আসে। নেমে আসে মাটিতে। হালকা বৃষ্টি হয়েছে আজ। দেয়ালের গোড়ায় জল জমেছে। ইতস্তত কিলবিলে অমেরুদণ্ডী। গর্ত খুঁজে পাচ্ছে না। ইতিউতি তাকাচ্ছে। খুঁজে পাচ্ছে না। দূর্বাঘাসের ফাঁকে বেঁচে থাকা ঐ অন্ধকার রাজ্যের সলীল সমাধি হয়েছে আজ। নিশ্চুপ অমেরুদণ্ডী। এলেমেলো পায়ে সে এগিয়ে যায় ক্ষণভঙ্গুর ইট বেয়ে। শুষ্ক অঞ্চলের কোথাও আরেকটি আঁধার-রাজ্যের বড্ড প্রয়োজন তার।

কিলবিলে অমেরুদণ্ডী যখন তার ডেরা খুঁজতে ব্যস্ত, তখন দেয়ালের পাশের ওই পথ, আর পথের পাশের ওই অশ্বত্থ গাছের ডালে বসে থাকে এক কালপেঁচা। হুট্‌ হুট্‌ নয়, চিৎকার করে এ পেঁচা। তীক্ষ্ণ সেই আর্তনাদ। এখন অবশ্য শব্দহীন। নির্বাক। চোখে কিলবিলে অমেরুদণ্ডীর প্রতিচ্ছায়া। ঝুলে পড়া জটাজূট ঝুরি বেয়ে সেই প্রতিচ্ছায়া এই বুঝি ছোঁ মারে মারে। না হচ্ছে না। কোন ঘটনাই ঘটছে না। বড় বেশী চুপচাপ হয়ে আছে পরিত্যক্ত এই অঞ্চল। মন্দিরের উত্তর দিকের নিম আর ছাতিম আজ কোন আলাপ করছে না। পূবের তেঁতুল একাকী দাঁড়িয়ে। দক্ষিণের অর্জুন আর গর্জনের আজ তর্জন-গর্জন নেই। এঁটেল মাটির পথে নেই কোন মনুষ্যপায়ের ছাপ। উত্তর-পূর্বের মহিষগুলো আজ আর আসেনি এদিক। পশ্চিমের নেড়ীকুত্তার দলও অনুপস্থিত। বৃষ্টিভেজা লালমাটির পথ আজ ছাপশূন্য। আর্দ্র ঘাসে কিছু ঘাসফড়িং শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে তিড়িংবিড়িং। হঠাৎ উড়ে যাচ্ছে। ঘুরপাক খাচ্ছে। শিউলি-ডালে ঝুলে থাকা বাবুই-বাসার চারপাশে পাখা ঝাপটাচ্ছে। বাবুই নেই। বাসাটা খালি পড়ে আছে। শিউলি গাছেও ফুল চোখে পড়েনি আজ অনেকদিন হোলো। শুধু অশ্বত্থগাছটার চূড়ায় ঐ কলুষিত চোখের শকুনটা যখন এসে বসে, ছাতিম গাছের নীরব কাঠঠোকরা আর মন্দির-বেদির তলার ঐ মস্ত সোনাব্যাঙটার চোখে ক্ষণিকের আতঙ্ক আমার চোখ এড়ায় না।

আমি সবই দেখছি। আমার সবই দেখতে হয়।
কিন্তু এসবের পরও মানুষ দেখতে আমি বড়ই ভালবাসি।

আমার দুটো পা।
এক পা অশ্বত্থগাছে আর অন্যটি মন্দিরের ভাঙা উঁচু স্তম্ভের উপর লট্‌কে আমি ঝুলে থাকি কৃষ্ণকায়।
যে মানুষদের আমি খুব ভালোবাসি, তারা আজ আমায় এড়িয়ে চলে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29189938 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29189938 2010-07-02 00:47:33
Miksang





অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি জলের ফোঁটা। চুপচাপ দুপুরের হালকা বৃষ্টি শেষে দুএকটি ফোঁটা এখনও টুপ্‌টাপ্‌ টুপ্‌টাপ্‌। শেয়াল-বিয়ে শুরু হতেই অতর্কিত মধ্যবিত্ত মানুষগুলো যখন ঐক্যবদ্ধ হয় ভঙ্গুরাশ্রয়ে, আমি তখন দেখি তাদের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ানো। অপ্রস্তুত। বিব্রত। বৃষ্টিফোঁটার সাথে তাদের শরীরে ঝরছে বাহারি অর্থের সুগন্ধি। ভ্যাপসা আর্দ্রতায় সেগুলো অভিসিঞ্চিত। সম্পৃক্ত। শেয়ালের সাথে কার বিয়ে হচ্ছিলো জানিনা, কিন্তু তাদের বিয়ে যখন ভেঙে গেলো, অতিথিরা বেশ ব্যস্ততা দেখিয়ে চলে গেলো এদিক সেদিক। ফাঁকা আশ্রমে জলের ফোঁটা তখনও টুপ্‌টাপ্‌ টুপ্‌টাপ্‌। নির্বিকার চিত্তে আছড়ে পড়ছে ভাঙা মাটির পাত্রে। দুএকটি ফোঁটা লাফিয়ে উঠে হঠাৎ।

চোখ এবং ক্যামেরার মাঝে পার্থক্য আছে শুনেছি। প্রথম যখন বস্তুটি হাতে নিই, মনে পড়ছিলো বার্কলে। মনে আছে, প্রথম তোলা ছবির দিকে আমার শঙ্কিত চাহনি। আমার অবাক চোখের সামনে সে তুলে ধরে পরিচিত রঙ। অন্তরঙ্গ ছাঁচ। সিলভার হ্যালাইডের আস্তরণ আমার মতই প্রতারিত বটে।

এক একটি আলোকচিত্র, এক একটি অতীত। থেমে থাকা মুহূর্ত। একমুখো জীবনের ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চাপতে থাকি বিরামহীন শাটার। তারপর অন্ধকার ঘরের এক কোনে বসে আলোছায়ার সঞ্চালনে দেখতে থাকি আত্মপ্রকৃতির যাপিত জীবন। ফ্রেমের পর ফ্রেম। ক্ষণে ক্ষণে করতালি। ক্ষণে ক্ষণে বিমর্ষতা। পপকর্ণগুলোর ইতস্তত এদিক-ওদিক। পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ানো।

চোখ দিয়ে কতটুকু দেখা যায়, যতটা দেখা যায় চোখ বন্ধ করলে?
অকৃত্রিম সৌন্দর্যের কোথাও পতিত হলে তাই অদৃশ্য দৃশ্যমান জগত। নেত্র দুটির আত্মগোপন। শামুকের খোলসে গুটিয়ে যাওয়া অক্ষিপট।

ক্যামেরা অবস্‌কিউরা। এক রিচুয়াল। মহাকালের প্রতি আমার ধর্মীয় আচার।
প্রিয় ব্যাপারগুলো অবহেলায় ঠেলে দেয়া এক অনন্য আত্মতৃপ্তি। অথবা অপারগতা।

আমি ইদানীং ভুলে গেছি সব আচারানুষ্ঠান।
ভুলে গেছি সামাজিকতা।

শুধু চোখ বন্ধ করে থাকা।
আর জলের টুপ্‌টাপ্‌।
টুপ্‌টাপ্‌। টুপ্‌টাপ্‌। টুপ্‌টাপ্‌।





মিকস্যাঙ (Miksang) তিব্বতীয়। মানে দাঁড়ায় 'ভালো/কল্যাণকর/উত্তম চক্ষু' (Good Eye)। এই 'ভালো' শুধু কোন শব্দ নয়, ভালো-খারাপ আপেক্ষিকতার টানাপড়েন নয়। 'উত্তম' বলতে এখানে চিন্তাবিষ্টতা/চিন্তাকুলতায় জর্জরিত নয়, শর্তাধীন নয় এমন মুক্ত, শান্ত, উন্মুক্ত মানসকেই বোঝানো হচ্ছে। যাপিত জীবনের কামনা, স্পৃহা, অভিলাষ বর্জিত শান্ত-নীরব-সাধারণ মন। এই মিকস্যাঙের মূলে দাঁড়িয়ে আছে বৌদ্ধ ঋষী Chögyam Trungpa Rinpoche আর তাঁর Shambhala আর Dharma Art teachings।

When steady mind, clear vision and soft heart come together in one single moment, ‘Good Eye’ manifests।

পবিত্রতা এই দৃকশক্তি/অন্তর্দৃষ্টির এক সহজাত গুণ। অনন্য এই দৃকশক্তির কোন প্রতিবন্ধকতা নেই, বিষাদ নেই, খেদ নেই এবং এটা সর্বপ্রকার ব্যাখ্যান ও স্পষ্টীকরণের ঊর্ধ্বে।

When we synchronize eye and mind, we abandon all concepts and predispositions and become completely present in the moment. The world becomes a magical display of vivid perception.

চক্ষু-মনের এই যুগলবন্দী, চার্বাক-মানবাত্মার এই বন্ধন আলোকচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার এক চর্চাই হচ্ছে Miksang Contemplative Photography। মিকস্যাঙ আলোকচিত্রগ্রাহক তিনিই যিনি তার দৃকশক্তি দিয়ে দেখেন অতি সাধারণ সত্য। অবিমিশ্র, অনলঙ্কৃত অনাড়ম্বর জগত। সাদামাঠা মুহূর্ত। তিনি যোগ করেন না কিছু। তিনি মিথ্যে বলেন না। তিনি সত্যবাদী, সত্যবৃত্ত, নিষ্কপট। তিনি বাস্তবতার ওপর মিথ্যে রঙতুলির আঁচড় বুলান না। অর্থহীন জৌলুসতা এড়িয়ে চলেন। তিনি একজন straight shooter। তিনি যা দেখেন, তাই তুলে আনেন। অর্থহীন জীবনের ফাঁক গলে তিনি তুলে আনেন অর্থবহ কিছু মুহূর্ত। তবে তার জন্য চাই সেই দৃকশক্তি। সেই অন্তর্দৃষ্টি। চাই steady mind, clear vision আর soft heart।

To me the path of Miksang is about uncovering truth, the truth of pure perception in our moment to moment experience. We see something penetrating, something pure and self-existing, and then we have the opportunity to express that perception without making anything up. We can be totally honest about what we saw. In that moment of staying with the perception, we hang out in the push and pull of wanting to manipulate it. But that all dissolves and is cut when we press down and feel the shutter click. It is the joy of letting go.
- Julie DuBose, Miksang Instructor

















টুপ্‌টাপ্‌ জলের প্রতিচ্ছায়ায় যখন ভেসে উঠে অর্থহীনতা আর অশান্ত চিত্ত, তখন যাবতীয় দৃকশক্তি আর অন্তর্দৃষ্টির নির্বাসন বেশ অর্থবহ হয়ে দাঁড়ায়।





আলোকচিত্র - Alice Haspray, Andy Karr, Wayne Williams, Jill Scott, Micheal Wood প্রমুখ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29177025 http://www.somewhereinblog.net/blog/akash1981/29177025 2010-06-14 23:15:19