বাইরে ঝুম বৃষ্টি। শ্রাবনধারা ঝরিছে ঝরো ঝরো। অঢেল বর্ষণধারার হাল্কা কিছু আঁচ এসে লাগছে আমার গায়ে, বাস চলছে “মাইলাইন”। তন্ময় হয়ে বৃষ্টি দেখি আমি জানালার পাশের সিটে বসে, বেশ রোমান্টিসিজম ভিড় করছে মনে, কাব্য উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে,পাত্তা দিলাম না। আজকাল কবিতা চলে না, গান লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একটাও কি গান লেখা হলো আজো? নাহ, আজ রাতে একটা গান লিখবোই - বৃষ্টির গান - “হ্যালো, বৃষ্টি কেমন আছো? বন্ধুর খবর কী ? টিপটিপ সুরে বলো তারে, আমি ভাল আছি। ”
এই জাতীয় চটুল গান, খুব চলছে ইদানীং।
রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা কয়েকটা স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে ভিজতে ভিজতে যাচ্ছে। আবার কয়েকটা ছেলেও যাচ্ছে স্কুলে, ছাতা মাথায় দিয়ে। কেন যেন ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ভিজতে বেশী পছন্দ করে। এর কারণ কী? হয়তো ওরাই ভালো জানে। চোখ বুজে বৃষ্টি ভেজা একটা মুখ মনে করার চেষ্টা করি। মনে পড়ে না, বরং অন্য আরেকটা চেহারা ভেসে ওঠে। মাথাটা মনে হয় গেছে। প্রায়ই এরকম হয় -ভাবি একজনকে আর দেখি আরেকজনকে
বাস চলছে না, স্টপেজ়ে সুদীর্ঘ লাইন। এই ঝুম বৃষ্টিতে এতগুলো মানুষ আসছে কোত্থেকে? খেয়াল করে দেখি এখানে ও সেই একই জিনিস- ব্যাটা ছেলেরা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে কাই-কুই করছে, আর যুবতী ললনারা পরম সুখে ভিজছে। আহা! ভিজতে জানি কত সুখ।
আমার ছাত্রীর কথা মনে পড়ে। পড়াচ্ছি মন উজাড় করে (বরাবরি এরকম ভাবে পড়াই)। ইন্টিগ্রেশনের ডাল -ভাত টাইপ কিছু অংক। মেয়েটার মুখের ভাব দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না - সে কী আদৌ অংক নিয়ে ভাবছে নাকি তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে। স্টুডেন্টদের আমার খুব রহস্যময় মনে হয়, পড়া বোঝানোর সময় ওরা জানি কি নিয়ে ভাবে।
আমি নিজে শেষ বর্ষের ছাত্র। আল্লাহ রহম করলে কিছুদিন পরেই ছাত্র জীবনের ইতি টানব। এই সুদীর্ঘ ২০ বছরের ছাত্রজীবনে (বয়স চার থেকে চব্বিশ!) আমি স্যারদের কাছে ২০% এ বেশী পড়া বুঝতে পারি নাই (হলফ করে বলতে পারি!)। তাহলে পাশ করতাম কিভাবে? আল্লাহর কসম, নিজে নিজে পড়ে আর গাব-জাব দিয়ে। অনেক সময় এমনো হইছে, আসল ধারনার ধার দিয়েও যায় নাই, আমি নিজের মত গোঁজামিল দিয়ে বুঝছি। যাইহোক এর জন্য আমি স্যারদের কোন দোষ দেই না, ৯০% সময় আমি অন্য কিছু নিয়ে ভাবতাম (কি নিয়ে সেটা আর নাইবা বললাম
ছাত্র গুলো অবশ্য তাদের ভাবনা মাঝে মধ্যে আমার সাথে শেয়ার করে। নিউটনের তৃতীয় সূত্র বুঝাচ্ছি- প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে। স্টুডেন্ট হঠাৎ বলে বসলো, “ভাইয়া, হাশমির নতুন ছবিটা দেখছেন?”
আমি কিছুই জানি না এমন একটা গোবেচারা ভাব করে বলি, “নাহ, অনেকদিন মুভি দেখা হয় না। কেমন হইছে, ভালো নাকি?”
ছাত্র বিজ্ঞের ভাব করে বলে, “চলে, গান গুলো জোশ।”
আমি আর কথা বাড়াই না। এরপরের কাহিনী কোনদিকে যাবে জানা আছে। :!>
আবার দেখা গেল ছাত্রের পড়ার টেবিলে দুটা লাঠির মত কি যেন!!
“এগুলো কি, পড়ার টেবিলে কেন?”
“ভাইয়া , আপনাকে তো বলাই হয় নাই। আমরা ফ্রেন্ডসরা মিলে একটা ব্যান্ড দিচ্ছি। কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমি ড্রামস বাজাব। তাই আজকে স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে এ দুইটা কিনে আনলাম।”
“ড্রামস বাজাবা কেমনে, পারো নাকি?” (লাঠি নিয়ে আমি টুকটাক করি)
“টনি ভাইয়ার কাছে ভর্তি হইতেছি তো, মাসে পাঁচশ টাকা করে, দারুন বাজায়”
“কোন টনি?” (আমি আকাশ থেকে পড়ি)
“ব্ল্যাকের টনি, চিনেন না ভাইয়া?”
“ও আচ্ছা, আচ্ছা”।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মেয়েদের নিয়ে। ওরা কিছু তো বলবেই না, মাঝে মাঝে হঠাৎ ভাবের কোন কথা বলে ওঠে। বড়ই রহস্যময়।
আমার সেই ছাত্রী, সেকেন্ড ইয়ারের সায়েন্স পড়ুয়া মেয়ে। পড়াচ্ছি তাকে জানালার পাশে বসে। দুম করে আকাশ বাতাস উজাড় করে নামলো বৃষ্টি।
“জানালাটা লাগিয়ে দাও” আমি বলি।
“স্যার, আপনার বৃষ্টি ভালো লাগে না?” (মেয়েটির চোখে অবাক বিস্ময়)
আমি তো আরো অবাক, পড়ানোর সময় আমি ভাবটাবের ধার ধারি না, পুরো পেশাদার হয়ে যাই। বৃষ্টিতে বই খাতা ভিজে যাচ্ছে, আর মেয়েটা বলে কিনা, আমার বৃষ্টি ভালো লাগে না খারাপ লাগে ?
সদা স্বল্পভাষী ভাববাজ মেয়েটা আপন মনে বলে চলে, “জানেন স্যার! বৃষ্টি যে আমার কি ভালো লাগে। রোজ কলেজ থেকে ফেরার সময় ভাবি- ইস, যদি বৃষ্টি নামত! ভিজতে ভিজতে বাসায় যাব। কিন্তু এক দিন ও নামে না, আর যখন বাসায় থাকি তখন ঠিকই ঝুম করে বৃষ্টি নামে।”
আমি কি বলব, ভেবে পাই না, চুপ করে থাকি।
ছাত্রী আমাকে কিছু বলতে না দেখে আস্তে- চুপ হয়ে যায়, সে চায় আমিও যেন এমন কিছু বলি, আমার রোবটিক ভাব দেখে খানিকটা মনোক্ষুন্ন কি সে হয়!
“সরি, আপনাকে পুরা ভিজিয়ে দিলাম।”
একটা মেয়ের কন্ঠে আমি বাস্তবে ফিরি, দেখি আমার পাশের সিটে আপাদমস্তক ভেজা একটা সুন্দরী মেয়ে বসেছে, বাসের সিটটা বেশ চিপা হওয়াতে আমার একপাশও সে ভালোমতোই ভিজিয়ে দিয়েছি, তার কোলের কলেজ ব্যাগটাও ভিজা। সে আমার দিকে কৌতুক মাখা চোখে তাকিয়ে আছে।
লেখাটি সিএসই র্যাগ সুভেনীরে লিখেছি। ভাবলাম সামুতেও দিয়ে দেই। পরের পর্বে সমাপ্য
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই আগস্ট, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


