মিয়াভাই।
বুবু।
আমার একজন খুব প্রিয় ব্যাক্তি আছেন। এই ব্যক্তি নাম করা কেউ নন। তার নেই কোন শিক্ষিত হবার প্রমান স্বরূপ কোন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট। তিনি যেমন মোটা ওনার স্ত্রী ঠিক তেমনি শুকনা।
কিন্তু সত্যি কথা সেই প্রথম যে দিন তাকে দেখেছি সেদিন থেকেই আমি নীল দেয়া সাদা পলেস্টারের পাঞ্জাবী আর পায়জামা পরা এই লোকটির ভক্ত হয়ে গেলাম। এই ভদ্রলোকের বাবার খুব ইচ্ছা ছিল উনি যেন মেট্রিক পাশ করেন, তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মেট্রিক পরিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন চেয়ার টেবিল সব কিছুই পাশ করলেও উনি পাশ করতে পারেননি। তবে তার স্ত্রী পাশ করেছেন এবং তখন থেকেই প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
ওনার স্ত্রীর সাথেও আমার বেশ আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেছে। ওনাকে আমি বুবু বলি আর এই ভদ্রোলোককে মিয়া ভাই। প্রতিদিন ভদ্রোলোক তার স্ত্রীকে মটর সাইকেলে করে স্কুলে রেখে যান। স্কুলটি আমার অফিসের পাশেই।
একদিন আফিসে এসে মিয়া ভাই বললেন --বুঝলা ভেবে দেখলাম খড়ের গাদায় শুয়ে রাত কাটানোর চাইতে সুন্দরবনে রাত কাটানো ভালো। রাততো কাটাবোই বনটাও দেখা হবে আর তোমার বুবুর রাগ কমলে আমাকে খুঁজবার জন্য যাবে সুন্দরবনে তখন একখরচেই দুইজনে বাঘের পেটে হানিমুনও করা যাবে। মরব তো একসাথেই মরব, আর মানুষও বলবে এইরকম মরন কয়জনের হয়।
-----হা হা হা !!??সুন্দরবনের বাঘ আপনাকে কি বাঁচিয়ে রাখবে বুবু যাওয়া পর্যন্ত।?
---আরে বুঝো নাই। আমার তো কিছু নাই। ছেলে, মেয়ে, ধন, সম্পদ সব তো তোমার বুবুর। আমি তো যাব হেঁটে হেঁটে। আমার তো টাকা পয়সা নাই। আর তোমার বুবু তো যাবে হেলিকপ্টার ভাড়া করে!!।।
---কেন কেন? কি হয়েছে? এত্ত তাড়াতাড়ি মরার চিন্তা কেন? বুবু তো ঝগড়া করে না !! আজও তো এলেন বুবুকে নিয়ে স্কুলে।?
বুড়ির ডিউটি তো আমি করছি সেই যুবক বয়স থেকেই।
তুমিই বল আমি কি করি নাই ? একদিন এসে বলল- তুই যুদ্ধে যাবার আগে আমাকে বিয়া করে রেখে যা।
আমি কোন কথা না বলে ওকে বিয়ে করলাম। বিয়ের পর আমাকে বলল --তুই যুদ্ধে যেতে পারবি না।
এটা একটা কথা হল । তবুও আমি ক্যাম্পে গেলাম। যেয়ে দেখি, আমি ক্যাম্পে যাবার আগেই ও ক্যাম্পে এসে হাজির। আমি আর ওকে ছেড়ে যুদ্ধে যেতে পারলাম না। টুকটাক ওর সাথেই খবর দেয়া নেয়ার কাজ ছাড়া কিছু করতে পারি নাই। সেই শুরু। তার পর থেকে ও যা বলে আমি তাই করি।
ও একদিন বলল- আমরা আট ভাই বোন সবারই একটা করে গাড়ি আছে, খালি আমার কোন গাড়ি নাই।
বুঝলাম আমাকে বিয়ে করেই ও গ্রামে আছে । তাই ওর গাড়ি নাই। গ্রামে মোটর গাড়ি দিয়ে কি হবে? আর কাঁচা রাস্তা। তাও ওর মনের কষ্টের কথা ভেবে এই কথার পরের দিনেই আমি একখানা রিক্সাভ্যান কিনে আনি।
ওই ভ্যানখানা দেখে ও আমাকে মারে না ধরে সে কি অবস্থা।!! আমি কথা শেষ করতেই পারি নাই। আমি বলতে চেয়েছিলাম যে সবাই তো তাদের নিজের নিজের গাড়িতে অফিসে যায়, তুমিও যাবা তোমার নিজের ভ্যানে চড়ে স্কুলে।
খালি বেটার বউ ছিল বলে কোন রকমে বেঁচে গেলাম।
এর ঠিক সাতদিন পরে আমি এই বুড়া বয়সে একটা মটর সাইকেল কিনলাম। রংপুর শহর থেকে মাষ্টার এনে এনে সাতদিন ধরে সাইকেল চালানো শিখলাম। তা তুমিই বলো এটা কার জন্যে করা। আর আমি যে প্রত্যেকদিন সকালে ওকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে আসি তাতে আমার কি লাভ।? আমি তো আরও দুই ঘন্টা ঘুমাতে পারি। স্কুল তো ওকে বেতন দেয় আমাকে তো দেয় না।?
সেদিন বললাম -অনেক দিন নারিকেল দিয়ে মুরগীর মাংস খাইনা। একটু রান্না কর না। কি মুখ ঝামটা দিল। বলে -রাধঁব কার জন্য একটা বাচ্চা কাচ্চা নাই। নাতী নাতনী গুলি নাই। তোমার এত খাওয়ার শখ হয় কেন? কই আমারতো হয় না? প্রতিদিনইতো মাছ মাংস খাও। ছেলে মেয়েরা আসলে ঐ সব খাওয়া খেও।
তাও জেদ করেছি বলে রান্না করে সব আমার পাতে ঢেলে দিয়ে গেল আর বলল --খাও! খাও একলাই খাও!। এত্ত তোমার খাওয়ার শখ।?
ও একটা টুকরাও খায় নাই। তাও আমি কিছু বলি নাই একলাই খেয়েছি।
কাল রাতে তো মশারীর ভিতরে মশা ও ঢুকিয়েছে। আমি বললাম --বিছানায় শুয়ে দশ বার মশারী থেকে না বের হলে হয় না? ঢুকো আর বের হও ! মশা তো ঢুকবেই?
ও বলল -- কই মশা।? আমাকে তো কামড়ায় না।? সব তোমাকে কামড়ায়।!?
আমি বললাম-- মশারা মানুষ দেখে কামড়ায়। আমাকে কামড়াবে নাতো কি তোমাকে কামড়াবে। তোমার শরীরে মশা কামড়ালে তো তোমার হাড্ডির সাথে ধাক্কা খেয়ে মশার শুঁড় ভাঙ্গে যাবে।
যেই না আমি এই কথা বললাম সাথে সাথে আমাকে বললো-- কেন নিজের কাজ গুলি নিজে করে মশারীর ভিতরে ঢুকতে পার না?। গায়ে দেবার কাঁথা নাওনি সেটা আমাকে আনতে বললে । স্বার্থপরের মত নিজের বালিশটা নিয়ে একা একা শুয়েছ, আমার বালিশটাও নেও নাই। আমি শোবার পর বললা ঔষধ খাও নাই। এগুলি কি আমার কাজ। এর জন্য যদি মশা ঢুকে থাকে তবে তা তোমার দোষ। আর মশা তোমাকে কামড়াচ্ছে তাই তুমি মশা মারবা না পারলে মশার কামড় খাও আর ঘুমাও গায়ে অনেক চর্বি হয়েছে কিছু কমুক।
আমি রাগ করে ঘর থেকে বাইরে এসে খড়ের গাদার উপর শুয়ে মশারী ছাড়া সারা রাত ছটফট করলাম , কোন দরদ আছে ঐ মহিলার। একবারের জন্য খোঁজ নেয় নাই। কি সুন্দর নাক ডেকে ঘুম??!!! তার উপর সে এখন কি সুন্দর আমার মটর সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসলো। তুমি এর একটা বিচার কর। করতেই হবে।
আমি হা হা করে হাসলাম । মিয়া ভাই আর আমি চা সিঙ্গারা খেলাম। আর স্কুল ছুটির পর বুবুকে বললাম-- বড় মেয়েতো এখন চিটাগংএ থাকে । যান দুই জনে সেখান থেকে দুই দিন বেড়িয়ে আসেন।
বিঃদ্রঃ --আমি তাদের অনুমতি নিয়েই ছবি দিয়েছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

