কাল দুপুরে প্রায় দশ দিন পর নিপা সৈকতকে ফোন করে। এর মাঝে কেউ কারো সাথে যোগাযোগ করেনি। ওদের পরিচয়ের পর এটাই সবচেয়ে দীর্ঘসময় ওরা একে অপরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে।
-- তুমি কোথায়?
-অফিসে।
-তুমি ছুটি নাও নি?
-না পরশু থেকে নিব।
-তোমার বিয়ে শুরু তো পরশু।
-হ্যাঁ সেই দিন থেকে নেব।
-আচ্ছা ভালো থেকো।
ও ফোন রেখে দেয়।
নিপার সাথে সৈকতের পরিচয় ম্যাসেঞ্জারে। কথায় কথায় বেশ ভাব হয়ে যায়। তার পর ফোনে কথপোকথন। এভাবেই কখন যেন সৈকতের কাছে নিজেকে সমর্পন করে ফেলে। ভালবেসে ফেলে সৈকতকে? নিপা যদি বুঝতো সৈকতকে ভালবাসা যায় না তবে কি নিপা সৈকতকে ভালবাসতোনা। তা নয় নিপা সৈকতকে কখনই দেখেনি। তার পরও ভালোবেসেছে কারন ওখানে যেন ভালবাসার জাল বোনাই ছিল। যখন ভালোবেসেছে সৈকতকে তখনও নিপা বুঝতে পারেনি কি নির্মম পরিনতি তার জন্য অপেক্ষা করছে।
এক রাতে অনেক কথা হাসা হাসির মাঝে নিপা বলে ফেলে কথাটা। সৈকত বেশ গম্ভীর ভাবে বলে- তোমার বয়স অনেক কম। আবেগ দ্বারা চালিত হবে না। আমরা বন্ধু বন্ধুর মত থাকতে চাই। আমিও তোমাকে খুব পছন্দ করি। তোমার সাথে আমার অ্যাডযাস্ট বেশ ভালো। কিন্তু তা হবার নয়। যদি সম্ভব হত তবে আমি তোমাকেই বিয়ে করতাম।
-কেন সম্ভব নয়? আমি তোমার চেয়ে এগারো বছরের ছোট তাই।
-না ।
বেশ কিছুক্ষন চুপ থেকে সৈকত বললো-- ধর্ম।
-মানে??
-মানে আমি হিন্দু তুমি মুসলিম।
আকাশ ভেঙ্গে পরে নিপার মাথার উপর। সব কথা আটকিয়ে যায়। আস্তে করে ফোনটা রেখে দেয়। সারাদিন ছটফট করে রাতে আবার ফোন করে সৈকতকে। সৈকত বেশ ধৈর্য্যের সাথে বেশ সুন্দর ভাবে নিজের মনের আবেগকে চাপা রেখে বলে চলে -আমরা খুব ভাল বন্ধু হতে পারবো। তুমি অনেক ভালো মেয়ে । ব্রাইট ফিউচার তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। এখন তোমার ধ্যান জ্ঞান সব পড়াশুনা হওয়া উচিত।
অনেক কথা বলে যায় অভিভাবকের মত। নিপা অবুঝের মত বলে বসলো -তুমি আমাকে ভালোবাস কি না?
সৈকত চুপ।
--বলো।
-- কী বলবো?
--তুমি আমাকে ভালবাস কি না?
--বলে কি লাভ? জেনে কী হবে?
--তুমি বলবে না।
--আমি তোমার চেয়ে অনেক বড়। বাস্তবতা আমি বুঝি। আমাকে অনেক কথাই ভেবে চিন্তে বলতে হয়। আমি যদি বলি ভালবাসি তবে তুমি এই কথার জন্যই সারাটা জীবন কষ্ট পাবে। আর যদি বলি না, তবে- তা কি বলা উচিত?? ভুল আমারই। আমি তোমাকে প্রথমেই বলতে পারতাম আমি হিন্দু। বলিনি, কারন ভাবিনি তুমি এভাবে জড়িয়ে পরবে। আর বললে যদি তুমি সরে যাও স্বার্থ আমারও ছিল।
অবুঝ নিপা ফোন কেটে দেয় কিছু না বলে।
সৈকত ফোন করে। ---- এমন করলে তো বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। আমি তোমাকে মিথ্যে বলবো না। আমি তোমার মত কাউকে পাই নি আমার জীবনে তাই ভালবাসতে পারি নি কাউকে। প্রেম আসেনি আমার জীবনে কিন্তু তোমাকে বুঝেই আমার মনে হয়েছে আমিও যেন তোমাকেই খুঁজছিলাম। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমি প্রথমেই জেনেছি তুমি আমি দুই ধর্মের।
---আমি তোমার কাছে চলে আসব।
---- আমি তোমাকে নিতে পারবো না। আমার দ্বায়িত্ব, আমার মা, সমাজ সব কিছুই আমাকে চিন্তা করতে হয়। এটা সম্ভব নয়। তোমার পরিবার যে আঘাত পাবে আমার পরিবারও সেই আঘাত পাবে।
--- কিখুক্ষন দুজনই চুপচাপ। এক সময় সৈকত বললো --এবার এসব কথা থাক। আমরা যেমন বন্ধু ছিলাম তেমনি থাকি।
নিপা সব মেনে নেয় কিন্তু তারপরও পারে না নিজেকে বোঝাতে। দিনের পর দিন যেন একে অপরের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়তেই থাকে। এর খুশি ওর খুশি হয়ে উঠে এর হাসি যেন ওকে আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তারা বারবার নিজেদের মাঝে দেখা করার ব্যাপারটা এড়িয়ে যায়। একজন দেখা করতে চাইলে অন্য জন বলে কি দরকার পরে হবে। তাই সই পরে হবে। একটা অদৃশ্য কাঁটা বারবার তাদের জানায় তোমরা শুধুই বন্ধু হয়ে থাক। তোমাদের ভালোবাসা মিলনের নয়। তাই থাকনা একটু দুরত্ব। কি লাভ মায়া বাড়িয়ে? হায়রে অবুঝ মানুষের মন মায়া যে বেড়েই চলেছে।
এবার সৈকতের বিয়ে। নিপা হঠাৎ করেই যেন মনে হল একবার দেখা করবে সৈকতের সাথে ওর সাথে না করলে শান্ত হতে পারবে না। ওর সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সৈকতের বিয়ে তার আগেই দেখবে একবার। ওর ভালবাসাকে বিদায় দেবার আগেই একবার শুধু একবার এই পোড়াচোখে তাকে দেখবে। না কোন দাবি নিয়ে নয় শুধুই দেখা করা। যতই বলুক শুধুই দেখা করা কিন্তু আসলেই কি শুধু দেখা। নিপা কি নিজেকে সৈকতের সামনে শান্ত রাখতে পারবে। ওর ভালবাসাকে ও স্বেচ্ছায় বিদায় দিচ্ছে।
মন তোরে বলি যত
তুই চলেছিস তোরই মত
সাধ্য কি আমার ছুটি তোরই পিছনে।
মন বলি তুই ফিরে চা
মন ছাড়া কি যায়রে বাঁচা
তুই ছাড়া কে আর আছে এই জীবনে?
কি কারন অকারন
এত করিস জ্বালাতন
ভালো লাগেনা এ দোটানা
উচাটন সারাক্ষন।
বলনা তুই বলনা
কেন এই ছলনা
ও মন তুই বলনা ভালোবাসি বলনা।।
নিপা এখন গাজিপুরে সৈকতের করখানার সামনে দাঁড়িয়ে। সে এক দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এসেছে গাজিপুর শুধু সৈকতের সাথে দেখা করবার জন্য। নিপা বাস্তায় ট্যাক্সিতে বসে রয়েছে। কি প্রচন্ড বৃষ্টি চারিদিকে। যেন ওর হৃদয়ের ক্ষরন হচ্ছে অঝর ধারায়।
মবাইল ফোনটা নিয়ে ফোন করলো সৈকতকে।
সৈকত যখনই শুনলো নিপা দাঁড়িয়ে আছে ওর কারখনার বাইরে খুব অবাক হয়ে গেল? কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললো - তুমি চলে যাও??
-আমি চলে যাব?
সৈকত চুপ করে থেকে বললো -- একটু অপেক্ষা কর আমি আসছি।
নিপা গাড়িতে বসে আছে। বর্ষাতি মাথায় দিয়ে লম্বা একজন এসে দাড়ালো গাড়ির কাছে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিলে। ভিতরে এসে বসলো সৈকত।
আমি তো বুঝিনা ঠিক কবে বরষা কবে
বসন্ত দিন চোখে চোখ রেখে
আমি দৃষ্টি বিহীন।
সৈকত কিছু না বলে শুধু নিপার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। বাইরের বৃষ্টির সাথে নিপার চোখের জল যেন প্রতিযোগীতায় নেমেছে। কিছুতেই বেঁধে রাখা যাচ্ছে না।
মুখ তুলে তাকাতে পারছে না সৈকতের দিকে। সৈকত ও কিছুই বলছেনা। শুধু হাতটা শক্ত করেই ধরে রেখেছে। যাকে দেখলো না তাকে কিভাবে এমন ভালবেসে ফেললো নিপা ও সৈকত ।
তাকিয়ে দেখে সৈকতের অশ্রু ভেজা চোখ আর বিবর্ন মুখ। ট্যাক্সি চলছে ঢাকার দিকে। এই দুই ঘন্টা ওদের একান্ত ওদের। শুধু দুটি হৃদয় হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে একে অপরের সাথে কত শত শত কথা বলে যাচ্ছিলো । এখানে নেই কোন শব্দ, নেই কোন ভাষা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

