মুনিরের বিয়ে হয়েছে প্রায় দুইমাস। এখন পর্যন্ত বউটার সাথে ঠিক মত কথাও বলতে পারলো না ?! সিনেমায় দেখেছে কবরী-রাজ্জাক, আজীম-সুজাতা কি সুন্দর বাগানের ধারে বসে প্রেম করে, আর তার এমনই কপাল বিয়ের আগে তো নয় বিয়ের পরেও বউটার সাথে একটু কথা বলার সুযোগ মেলেনা। সারাদিনতো বাড়ির ভেতরে যাওয়াই যায় না। সেই গভীর রাতে ঘরে ঢুকতে হয়।
হারিকেনটা টিমটিম করে জ্বলে, ঘরে ঢুকেই বউ হারিকেনটা আরও কমিয়ে দেয়। যাতে বেড়ার ফাঁক দিয়ে কোন আলো বাইরে না যায়। সকালে যেন কারো মুখ থেকে শুনতে না হয় ---“বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় এবার কেরসিন তেল আনবে। এত তেল আমরা খরচ করতে পারবো না বাপু।“
একটা কথা বলা যায় না বউ এর সাথে। ফিস ফিস করে বললেও পাশের ঘর থেকে গলা খাঁকারির আওয়াজ শোনা যায়। যার অর্থ আমরা শুনতে পাচ্ছি। কবে যে মুনির নিজের ঘরটা অন্যদিকে নিয়ে যাবে। তা নিতে নিতে প্রায় চার মাসতো লাগবেই।
আর বউটারও যেন কি হয়েছে? বিছানায় শুয়েই গুটিশুটি মেরে পরে থাকে এক পাশে । হাতটাও ধরতে দেয় না। অথচ এই বউ বাসর রাতে কত কথা বলেছে। মুনির ও কত কিছু যে বলেছে ? কেমন করে যে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়েছে টেরই পায় নি। সেটা ওর বাপের বাড়ি ছিল বলেই কি ও এমন সহজ ছিল?
রফিককে এই সমস্যার কথা বলতেই রফিক বললো-- “আগে বউ এর সাথে কথা বলে পরিচিত হ’। এর জন্য দরকার নিরিবিলি জায়গা । তোদের বাড়িতে ঘরগুলো সব একসাথে। বেড়ার ঘর দিয়ে সব শোনা যায়। কোন গোপনীয়তা নেই এই জন্যই এমন করছে ভাবী।“
এ বাড়িতে আসার পর থেকে তো বউটা বাইরের দুনিয়াটাও দেখে নাই। মুনিরের বউ খিয়ারি অঞ্চলে মানুষ। ওখানে পুকুর নেই। পাত কূয়া থেকে তারা পানি সংগ্রহ করে। বউ কখোনো পুকুর দেখে নাই। মুনিরদের আছে বড় বড় দিঘি। আর জোড়া দিঘিতো তাদের বাড়ির সামনেই। মুনির মনে মনে ঠিক করলো তার বউকে নিয়ে রাত্রে দিঘির ঐ পাড়ে যাবে । কেউ দেখবে না, কেউ শুনবে না, কেউ জানবেও না। সুন্দর প্রেম করা যাবে ।
রাতে বউ ঘরে আসতেই মুনির তার কানে কানে প্রস্তাবটা দিল। মুনিরের বউও সাথে সাথে রাজি। যখন বুঝতে পারলো বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পরেছে তখন চুপি চুপি তারা দরজা খুলে বের হলো। অগ্রাহনের মাঝামঝি সময়। বাতাসে পাকা ধানের গন্ধ। হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া নির্জন নিস্তব্ধ প্রকৃতি। দু জনই যেন মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করে এক মুহূর্তেই কাছাকাছি চলে এল।
একটু একটু ঠান্ডা, সেই সাথে মুনিরকে এভাবে একান্তে কাছে পাওয়া, তার উপর দিঘির বিশালত্ত দেখে মুনিরের বউ বোধ হয় একটু অবাকই হলো। মুনিরও তার কিশোরী বউ এর আহ্লাদিত মুখ ও মন দেখে নিজের সুবুদ্ধির তারিফ করে নিজেকে বাহবা দিল।
দুই দিঘির মাঝ দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। এই পথ পাড় হয়েই যেতে হবে ওপাড়ে। ওপাড়ে গেলেই সব সমস্যার সমাধান । তাদের আর কেউ দেখবে না।
দুই দিঘির মাঝের এই পায়ে চলা পথ ধরে কিছুটা গিয়েই মুনিরের বউ কাঁপতে শুরু করলো। সেই কাঁপুনি কিসের?-- রোমান্টিকতার, ঠান্ডার, রোমাঞ্চকতার নাকি ভয়ের তা যুবক মুনির ঠিক বুঝতে পারলো না। তাই মুনির বলে “কাঁপো কেন? শীত করে।“
ওর বউ মাথা নাড়িয়ে বলে “না”।
-“তবে আসো।“
ওর বউ বলে-“ না।“
-“ কেন?”
বউ কোন রকমে বলে- “ভয় করে।“
“কিসের ভয়?”
_” দিঘির?”
“দিঘিরে কিসের ভয়?”
“এই চিকন রাস্তা যদি পড়ে যাই। আমি তো সাঁতার জানি না।“
“পড়বা না আমি আছি না।“
দুইপাশে ভরা দিঘি। মাঝখানে চিকন পথ মুনিরের বউএর আর প্রেম করার ইচ্ছে নাই। মুনিরের হাত ধরে একটু একটু আগালো মুনিরের বউ। কিন্ত তার পায়ের কাঁপুনির জন্য আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। বসে পরলো। এবার বসে হাঁটার পালা। মুনির আর ওর বউ বসে বসে মাঝ দিঘি পর্যন্ত এল । এবারে মুনিরের বউ রীতিমত চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিতে লাগলো। সেই সঙ্গে মুনিরও।
এই হামাগুড়ি দেয়া অবস্থায় হঠাৎ দিঘি থেকে কে যেন উঠে এলো? কুকুর তাড়ানোর ভঙ্গিতে দূর দূর করে উঠলো লোকটা। এবারে তিন জোড়া চোখ স্থীর। দিঘি থেকে উঠে আসা ভদ্রলোকটি আর কেউ নয় স্বয়ং মুনিরের বাবা। দিঘিতে মাছ ধরবার জন্য জাগ দিতে এসেছিলেন। ছেলে আর বউকে প্রথমে আবছা আঁধারে শিয়াল, কুকুর বা ঐ জাতীয় কোন প্রানী ভেবেছিলেন।
হামাগুড়ি দেয়া অবস্থায় ওদের দেখে তিনি যে কি ভেবেছিলেন তা শুধু তিনিই জানেন। ক্ষনকাল মাত্র দেখে --“বেশি রাত পর্যন্ত দিঘির পাড়ে থাকলে বউএর ঠান্ডা লাগবে”--বলে তিনি হন হন করে হেঁটে চলে গেলেন। প্রেম করার সব স্বাধ মুনির ও তার বউএর ঘুচিয়ে দিয়ে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

