ঃ কেমন আছেন আপা?
ঃ ভাল। তুই কেমন?
ঃ ভালো না। এমনি এমনি তো এখানে আসিনি। আপনি সাবার সমস্যা নিয়ে মিটমাট করেন। এবার আমার বিচার করে দেন।
ঃ কি হয়েছে?
ঃ আপনার পিয়ন হাবিব্বায় বললো এখানে নাকি শুধু মানুষের বিচার হয়, তবে আপা আমরা কি?
একেতো এই প্রচন্ড শীতের সকাল সাতটায় বিশেষ কারনে অফিসে আসতে হয়েছে পুরো টিমকে খবর দিয়ে, তার উপর অফিসের বারান্দায় পা রাখতে না রাখতেই এই অলুক্ষনে ব্যাক্তির সাথে দেখা। মেজাজ বিগড়েই গেল। আজকের মিশন কোন ভাবেই সফলতার মুখটো দেখবেই না - আবার না জানি কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পরি। চরম বিরক্তি নিয়ে তাকালাম এই ব্যাক্তির দিকে। ব্যাক্তির নাম মালা। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। ও জানে ওকে দেখলেই মানুষের যাত্রা নাস্তি এবং সবাই ওকে দেখলে চরম বিরক্ত হয়। কুকুর শূকর কেউ মানুষ এতটা ঘৃনার চোখে দেখেনা যতটা ঘৃণার চোখে এই মালাদের দেখা হয়।
তার পরনে একটি জড়ি পাড় সবুজ বং এর শাড়ি। মাথার চুল উঁচু করে বাঁধা বিভিন্ন রঙের ফিতা দিয়ে। এই সাত সকালেও তার নিজের রুচিমত বেশ পরিপাট সাজএ সে আমার সামনে একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়ালো। দেখে বোঝার কোন উপায় নেই তার কোন সমস্যা আছে যার জন্য সে আমার কাছে এসেছে। আমি জিজ্ঞাস করলাম ঃ কি সমস্যা?
পিছন থেকে কাঞ্চন উঁকি দিল। কাঞ্চন এর পরনে লুঙ্গী ও শার্ট। হাতে পায়ের লম্বা নখে লাল নেইল পলিশ লাগানো। মাথার চুল বয়কাট করা, গলার স্বরও কিছুটা মেয়েলি ধরনের। কাঞ্চন খন খনে গলায় বললো ঃ আপা বিশ্বাস করেন আমি কাল রাতে ওর টাকা চুরি করে হাড়িয়া খাইনি। হাড়িয়া ওয়ালার টাকা আমি শোধ করেছি আমার টাকা দিয়ে।
মালা বললো ঃ তুই পরে কথা বল, আগে বলেনতো আপা হাবিব্বা যে বললো এখানে মনুষের সমস্যা দেখা হয় আমরা তবে কী??
ঃপরে আসিস, একটু ব্যস্ত আছি। দেখছিস না কত্ত সকালেই চলে আসতে হয়েছে? বলে কোন রকমে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম।
কিন্তু প্রশ্নটা কানে বেজেই চললো “আমরা তবে কী?” মনে মনে বার বার উত্তর দিলাম তোমরা ব্যাক্তি। ব্যাক্তির কোন লিঙ্গ নেই। ব্যাক্তি থার্ড জেন্ডার বা ক্লীব লিঙ্গ। মালা-কাঞ্চন দুইজনই ক্লীব। আমরা যাদের হিজরা বলি। হিজরারা মানুষ না !! মানুষের ঔরসজাত এবং মানুষের গর্ভজাত প্রকৃতির নির্মম খেয়ালে সৃষ্ট অসমাপ্ত মানুষ। যারা আমাদের মতই হাসে কাঁদে খায় ঘুমায় কিন্তু নেই কোন লিঙ্গ বা জ়েন্ডার। তারা নারীও নয় তারা পুরুষ ও নয়।
মালার তার বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান মেয়ে তাই বড় আশা ছিল দ্বিতীয় সন্তান ছেলে হবে কিন্তু আবারও দাইবুড়ি আঁতুর ঘর থেকে বের হয়ে বললো-মেয়ে হয়েছে। সারাটা দিনই সবার মনেই একটা বিরুপ পতিক্রিয়া চলছিল মেয়ে শিশু জন্মের কারনে। কিন্তু সন্ধ্যা হতে না হতেই কয়েকজন হিজরা এসে হাজির মালাদের বাড়ির উঠানে। তারা মালার বাবাকে বললো তাদেরকে বাচ্চাটিকে দিয়ে দিতে। মালার বাবা তখন বুঝে গেছেন কি হয়েছে। তিনি বিনা বাক্যে বাচ্চাটিকে তাদের হাতে তুলে দেন।
আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় হিজরাদের আলাদা পল্লী আছে। এই সব হিজরাদের বেশীর ভাগেরই পেশায় যৌনকর্মী। এদেরকে কেউ কাজ দেয়না বা দিতে চায় না। এরা অপয়া বা অলক্ষী বলেই পরিচিত। কিছু কিছু হিজরা সন্তানকে বাবা মা বড় আদর করে অন্যান্য সন্তানদের সাথে বড় করেন কিন্তু তাদের বিচিত্র দৈহিক গঠন বয়ঃসন্ধী কালের পর থেকেই বেশ প্রকট হয়ে উঠে। তখন তারা আর স্বাভাবিক বাচ্চাদের সাথে মিশে থাকতে পারেনা আমাদের টিটকারি টিপ্পনীর জন্যই। স্কুল থেকে খুব সহজেই ঝরে পরে। শহরে ধর্ণাঢ্য পরিবারগুলি ওদের উচ্চশিক্ষা দেবার চেষ্টা করে কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় এদের চেহারা এবং আচরণ। আমাদের এই সব ভাই বা বোন বা ভাইবোনকে আমাদের পরিবারে রাখতে পারিনা। এদেরকে আমাদের সমাজ প্রথমেই আলাদা করে দেয়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই আমরা এদের কাউকেই আমাদের আশেপাশে দেখি না। ওদের আমাদের সাথে রাখলে যে সমাজও আমাদের পতিত করবে।
মালা দেখতে একেবারেই পুরুষের মত এমন কি এর কন্ঠস্বর ও পুরুষালী কিন্তু ওর স্বভাব মেয়েলী আর ও মেয়ে সেজে থাকতে পছন্দ করে। আর ওর সঙ্গী যে ওর স্বামী বা বন্ধু বা জোড়া সে কিন্তু দেখতে মেয়েদের মত কন্ঠও খন খনে এমন কি বুকও একটু স্ফিত কিন্তু ওর স্বভাব পুরোটাই পুরুষের মত। কাঞ্চন পোষাক ও পরে পুরুষের মত।
হিজরাদের মানবেতর জীবন বর্ননার বাইরে। এদের কেউ সাহায্য করে না, কাজ দেয় না, পিতার সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই, নেই শিক্ষা গ্রহন করবার অধিকার অথচ ওদের আছে আমাদের মত ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অসুখ, জ্বালা ও জরা। সমাজের অবহেলিত,ঘৃণিত, বঞ্চিত এবং অভিশপ্ত মানুষগুলির নাম হিজরা। অথচ ওদের এই পরিণতির জন্য ওরা নিজেরা দায়ী নয়, ওরা প্রকৃতির খেয়াল কিংবা সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ। এই অবহেলিত সম্প্রদায় আমাদের সমাজের এক অভিশপ্ত অন্ধকার অধ্যায়। এরা নয় হিন্দু নয় মুসলিম নয় বৌদ্ধ নয় খৃস্টান--এদের নেই কোন ধর্ম।
আমরা হিজরাদের দেখলে অবহেলায় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেই। ওদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেই না কেউ, ওদের নিয়ে ভেবেও দেখি না কেউ। নাচ-গান, হাসি তামাশার মাধ্যমে মানুষের কাছে হাত পেতে সাহায্য নেয়াই ওদের পেশা। বাইরে হাসি খুশির মুখোশ পরিহিত এদের জীবনটা আগাগোড়াই দুঃখ-কষ্টের অন্তহীন অন্ধকারময়।
ব্যাংককের পাতাইয়াতে হিজরাদের শো বা টিফেনী শো হয়। এর আয়োজন বিশাল। অনেকটা বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতার মত। এই টিফেনী-শো ১৯৭৪সাল থেকে শুরু হয়, যা সেই সময় নাম মাত্র ভাবে চালু হয়েছিল। ২০০১ সাল থেকে শুরু হয়েছে সুন্দরী প্রতিযোগীতা। প্রতিবছর এখানে সুন্দরী প্রতিযোগীতা হয়। হিজরারা যে কত সুন্দর এবং তাদের জ্ঞান, মেধা, গান শারিরীক সৌন্দর্য্য যে কত উঁচু মার্গের তা পাতাইয়াতে না দেখলে বোঝা যাবে না। এখানে যে সকল সুন্দরী অংশগ্রহন করেন তাদের অনেকেই সৌন্দর্যের মাত্রা বৃদ্ধি করবার জন্য বিভিন্ন ব্যয় বহুল অস্ত্রপ্রচার করে থাকেন। সব শেষে এটাই দাঁড়ালো তাদের মূল জিবীকা বা পেশা এই যৌনকর্ম যা একটু সভ্যতার বা আধুনিকতার, ভালবাসার বা দরদের মোরকে মোড়ানো।
আমি জীবনে যতবার এদের দেখেছি বিরক্তিতে বা ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। কোন দিন এক মুহূর্ত ভেবে দেখিনি কি রখম ওদের জীবনযাপন, কেমন করে বেঁচে আছে ওরা। ওদের নিয়ে হয়েছে কি কোন গবেষণা? কেন প্রকৃতি ওদের এমন ভাবে তৈরী করলো। সত্যিই বলতে কি আমি কিছুই জানি না। জানবার চেষ্টাও করিনি কখনও। অথচ ওরা আমাদেরই সন্তান আমাদেরই ভাই-বোন। যে কোন মুহুর্তেই হয়ত খুঁজে পাব ওরা আমাদের রক্তের সম্পর্কের কেউ অথবা আত্মার আত্মীয়।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


