somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাত রাঙা পাপড়ি (গল্প )

০২ রা জুন, ২০১০ রাত ৯:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সোহানের বয়সটা আর কত হবে!এখনও যৌবনের মাঝ দুপুর পাড়ি দেয়নি ।এরইমধ্যে যেন তার মনের মাঝে জমে গেছে জীবনের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা, এক ধরনের হতাশা । তার সবকিছু কেমন এলোমেলো,কারো সাথে মিশে না,কারো সাথে কথা বলতে চায় না । কোন কিছু ভাল লাগে না,কোন কিছুতে মন বসাতে পারে না ।দেখে মনে হতে পারে প্রেমে পড়েছে,সেরকম ও কিছু না । প্রেম তো দূরে থাক তার একটা মেয়ে বন্ধু পর্যন্তও নেই ।ছেলে বন্ধুও হাতে গুনা কয়েকজন । এর মাঝে আমি একজন । তার চাল চলন আচার আচরণে মাঝেমাঝে মনে হয় জীবনের প্রতি প্রচন্ড রকম ক্ষোভ বুকে জমিয়ে রেখেছে । তাকে কেমন আছিস জিজ্ঞেস করলে প্রায়ই এক উত্তর দেয়,সেটা হল ভাল বললে ভুল হবে আবার ভাল নাই বললে সেটাও ভুল হবে । এই উত্তরের ব্যাখা কিংবা ব্যাক্তিগত কোন কিছু তার কাছে জানতে চাইলে সবসময়ি সে এড়িয়ে যায় । একদিন খুব করে ধরলাম আজ তোকে বলতেই হবে কেন সব সময় তুই এমন উদাসী হয়ে চলিস। তোর যদি কোন দুঃখ থাকে সেটা আজ আমার সাথে শেয়ার করতেই হবে । অনেক পীড়াপীড়ির পর সে মুখ খুলল -

আমরা পাঁচ ভাই তিন বোন ।আমি সবার ছোট ।পরিবারের সবার ছোট হলে শুনেছিলাম সবাই খুব আদর করে । আমার বেলায় হয়েছে ঠিক উল্টোটা । ছোটবেলা থেকে সংসারের অভাব অনটন ঝগড়াঝাঁটি এসব দেখেই বড় হয়েছি । নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে যেটা হয় আর কি । বাবা মা সব সময় বড়দের নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ।বাবা চাকরী করতেন শহরে । মাসে একবার বাড়িতে আসতেন । তাই বাবা সাথে একটু দুরত্ব ছিল ।তাছাড়া বাবাকে কেন জানি ভয় পেতাম তাই বাবার কাছে প্রয়োজন ছাড়া যাওয়া হত না ।বাবার গুরত্ব ভালভাবে বোঝার আগেই বাবা মারা গেলেন । এরপর মার উপর এসে পড়ল সংসারের ভার । মা অনেক কষ্ট করে বোনদের বিয়ে দিলেন,চার ভাইকে বিয়ে করালেন । সংসার চালাতে মা কত কষ্ট করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না ।তাছাড়া আত্নীয় স্বজন কারো কাছ থেকেও কোন রকম সাহায্য পাননি । উল্টো অনেকে অনেক ব্যঙ্গ করেছে,দুর্বলতার সযোগ নিতে চেয়েছে ।ভাইয়েরা বিয়ের পর সবাই আলাদা হয়ে গেল ।মায়ের দায়িত্ব আমার উপরে এসে পড়ল । আমি জাস্ট ইন্টার পাশ করে বি এ কোর্সে ভর্তি হয়েছি । একটা লাইব্রেরিতে কাজ নিলাম । সাথে সাথে পড়াটা ও চলল । রাতে যখন বাড়ীতে আসতাম তখন দেখতাম মা আমার জন্যে অপেক্ষা করছে । আমাকে ভাত বাড়িয়ে দিত,মাঝেমাঝে মুখে তুলে খাইয়ে দিত । আর দুঃখ করে বলত সংসারের জন্যে যে সংগ্রাম করেছে তার ইতিহাস ।এসব করতে গিয়ে কান্নাকাটি করত । মার কান্না দেখে মাঝে মাঝে আমার ও কান্না চলে আসত । আমি মাকে সান্তনা দিতাম,মা আমি তোমার অন্য ছেলেদের মত তোমাকে ছেড়ে যাব না। মা তুমি দেখ আমি একদিন অনেক বড় হব ।তোমার সব দুঃখ কষ্ট মুছিয়ে দিব । আমি মায়ের দুঃখ কষ্ট মুছে দিবার সুযোগ পাওয়ার আগেই মা মারা গেলেন ।

মা মারা যাবার পর আমি পড়লাম আরও বিপদে ।ভাইয়েরা সবাই মিলে সম্পত্তি ভাগ করে নিল । আমি আমার মেজ ভাইয়ের সাথে গিয়ে উঠলাম । প্রথমদিকে ভাই ভাবি দুজনে আমাকে সাদরে গ্রহন করলেন । হঠাৎ করে একদিন ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন - উনি আমাকে কিছু টাকা দিবেন আমি সে টাকা দিয়ে যেন ব্যবসা শুরু করি । তার বদলে আমি আমার সম্পত্তি তার নামে লিখে দেই । আমি প্রথমে রাজি হইনি । রাজি না হওয়ায় ভাই ভাবি দুজনে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করলেন ।এমনও হয়েছে আমি বাহিরে গেছি বাড়ি এসে দেখি ভাই-ভাবিকে নিয়ে উনার বাবার বাড়িতে গেছেন । কিন্তু আমাকে ঘরের চাবি দিয়ে যান নি ।আমাকে দিনের পর দিন মানুষের বাড়িতে থাকতে হয়েছে ।একদিন ভাবি আমাকে সরাসরি বলে দেন অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্যে । তারপর আমি আমার মেজ বোনের সাথে গিয়ে উঠলাম । উনার ছেলেমেয়েদের পড়াতাম তার বদলে উনি আমাকে থাকতে আর দুবেলা খাইতে দিতেন । একদিন দুলাভাই আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন - উনি চাচ্ছেন আমাকে উনার সাথে ব্যবসায় শেয়ার করতে ।উনার এই অফার শুনে আমিও খুশিতে রাজি হলাম ।ঐদিন রাতে আমার মেজ বোন আমাকে যেটা বললেন তাতে আমি আর খুশি থাকতে পারলাম না । কারণ আমার দুলাভাইও আমার ভাইয়ের মত ব্যবসায় শেয়ার করার বদলে আমার সম্পত্তি চান ।আমি রাজি না হওয়ায় আমার বোন আর দুলাভাই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে লাগলেন ।একসময় আমার বোন আমার খাবার দাবার নিয়েও হিসাব শুরু করলেন ।আমার খুব খারাপ লাগত যখন আমার বোন ওরা সবাই খাওয়ার শেষে আমাকে খাবার দিতেন ,তাও হিসাব করে। আমি বোঝলাম আমাকে আর এখানে থাকা হবে না । আমি গিয়ে উঠলাম আমার বড় ভাইয়ের সাথে ।সেখানেও আমি ভাল ছিলাম না । একবার আমি অসুস্থ হয়ে সাতদিন বিছানায় ছিলাম । কিন্তু আমার ভাই ভাবি কেউই আমাকে একটা প্যারাসিটামল এনে দেয়নি।আমি এভাবে এক এক করে সব ভাই বোনদের সাথে গিয়ে রয়েছি । কেউই আমাকে তাদের সাথে রাখতে চায়নি । আমি সবার কাছে অতিরিক্ত অবাঞ্চিত ছিলাম ।অথচ আমার সামান্য সম্পত্তির দিকেই সবার চোখ ঠিকই ছিল । তাই অবশেষে আমি আমার সম্পত্তি আমার মেজ ভাইকে দিয়ে উনার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আমি শহরে চলে আসি । শহরের আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমার পরিবারের কেউই আমার কোন রকম খোজ খবর নেয় নি । কেউ জানতে চায়নি আমি কোথায় আছি কেমন আছি,বেঁচে আছি না মারা গেছি ।

আমার চোখের জল এখনও লবনাক্ত আছে,শরীরে চিমটি কাটলে এখনও ব্যাথা অনুভব করি । তাই হয়ত আমারও মাঝেমাঝে ইচ্ছা করে ঈদের দিনে পরিবারের মানুষদের সাথে একটু লাচ্চা সেমাই খাই । বৈশাখীতে আমার পান্তা ভাতের প্লেটে কেউ তুলে দিক ফ্রাই করা ইলিশ মাছ । আমার জন্মদিনে রাত বারটা এক মিনিটে কেউ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসেজ সেন্ড করুক ।কত অজানা অচেনা প্রশ্ন মনে নিয়ে আমি প্রতিদিন বেঁচে থাকি ।মাঝেমাঝে মায়ের কবরে কাছে গিয়ে বলে আসি "মা আমি বড় হতে পারিনি"।

এখন তুই আমাকে বল আমি ভাল আছি না ভাল নেই? প্রশ্ন করে সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে ।অপেক্ষা করে আমি উত্তরে কি বলি। আমিও ভ্যাবলা চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তাকে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করলেও কোন কিছু বলতে পারিনা । অনেক্ষণ নিরব থাকার পর আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বলি" তুই ভাল নেই দোস্ত" । এভাবে কেউ ভাল থাকে না !

তারপর অনর্গল সে বলে যেতে লাগল - প্রতিদিন সূর্য ডুবার পর ভাবি হয়ত দেখা হবে না আগামীকালের সূর্য দ্বয় । সূর্য দ্বয়ের পর ভাবি এই বুঝি শেষবারের মত সূর্যকে স্বাগত জানালাম । কখনই আগামীর স্বপ্নগুলোকে সাজাবার সাহস পাইনা । কখনই কল্পনার আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করে সাজাবার কল্পনা করতে পারিনা । ভয়ংকর অনিশ্চয়তার ভিতর আমার দিনযাপন। জানিনা এভাবে আর কতকাল আমার এই পথচলা । প্রতিনিয়তই বিস্মৃতির অন্ধকার মহলে ঢুকে পড়ার দোদুল্যমান সময়ের পথ পাড়ি দেই । প্রতিমুহূর্তেই অনুভব করি মূত্যু যেন ঘুরঘুর করে আমার চারপাশে ।আর আমি আমার শরীরকে কড়া পাহারায় রাখি যেন মৃত্যু জীবন নিয়ে পালিয়ে না যায় ।এরপর সে কিছুক্ষণ থেমে বলল - বন্ধু সাত রাঙা পাপড়িতে জীবন সাজাব বলে আমি বাঁচতে চাই-অনেক দিন বাঁচতে চাই ।

উৎসর্গ -রাজসোহান আপনাকে
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুন, ২০১০ সকাল ৯:০৯
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×