সাহেল সেই ছোটবেলা থেকেই বাউন্ডুলে স্বভাবের । সব সময় বাহিরে বাহিরে থাকে । মহল্লার সবকিছুর শিরোমনি, খেলাধুলা,সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,গান বাজনা,বিয়ে সাদি,বিপদে আপদে যে কোন কিছুতেই সাহেল কে সবার আগে পাওয়া যায়। কলেজেও একি অবস্থা সবার আগে সব কিছুর মাঝে গিয়ে উপস্থিত হয় । বন্ধুদের আড্ডা তো ওকে ছাড়া একদম জমেই না । তাই বন্ধু মহলে সে খুব জনপ্রিয় এক মুখ! এমনকি ঘরে আসার পর ঘরের থমথমে পরিবেশ হাসি খুশিতে ভরে তুলে।সব সময় হাসি খুশি হৈ হুল্লোড়ের মাঝে সে থাকে । বন্ধুরা তাকে মাঝেমাঝে জিজ্ঞেস করে কি করে তুই এরকম হাসি খুশি থাকিস? তুর কোন দুঃখ নাই, তুর কখনও মন খারাপ হয় না । সে সবাইকে হাসি মুখে উত্তর দিত আমি হলাম সুখি মানুষ আমার আবার কিসের দুঃখ!
তার এই বাউন্ডুলে স্বভাবের কারণে তার বাবা নাসিম সাহেব তাকে নিয়ে নানা রকম দুশ্চিন্তা করেন। কারণ উনি মনে করেন এই পৃথিবীতে যারা যত বেশি হাসি খুশি স্বভাবের তারা তত বেশি তাদের জীবনে দুঃখ পেয়ে থাকে । তাই উনি উনার স্ত্রীকে প্রায়ই বলে থাকেন - দেখ তোমার এই ছেলের জীবনে অনেক দুঃখ আছে । তাকে বল সে যেন একটু আনন্দ ফুর্তি কম করে , অন্যথায় তাকে অনেক দুঃখ পোহাতে হবে । উত্তরে উনার স্ত্রী বলেন - আমি চাই আমার ছেলে এরকম হাসি খুশির মাঝে কাটিয়ে দিক, তাইতো আমি ওর জন্য একটা ফুটফুটে হাসিখুশি টাইপ মেয়ে ঘরে আনব । যাতে করে সে তার জীবন এরকমই আনন্দ করে কাটিয়ে দিতে পারে । স্ত্রীর কথা শুনে নাসিম সাহেব মনে মনে উনি ও দোয়া করেন- তাই যেন হয়!
ইদানিং সাহেল কলেজ থেকে দেরিতে ফিরে,দুপুরের খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে যায়,তারপর অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে । ঘরে এসে রাতের খাবার খেয়ে কারো সাথে কোন রকম কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়ে । তার এই হঠাৎ পরিবর্তন ঘরের সবাইকে অবাক করেছে ।আরও অবাক করার ঘটনা তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তার কোন জবাব দেয় না । ঐদিকে কলেজে ক্লাসে নিয়মিত যায় না,ক্লাসে গেলে আগের মত সবার সাথে কথা বলে না । চুপচাপ ক্লাস করে চলে আসে । কলেজের বন্ধুরা তার এই পরিবর্তন দেখে তাকে জিজ্ঞেস করে - কি হয়েছে তুর, তুই এত চুপচাপ হয়ে গেল কেন??সে তাদের জবাব এড়িয়ে চলে,শুধু বলে একটা মানুষ কি সব সময় এক রকম থাকে নাকি?? মানুষ বদলে যাবে এটাই জগতের নিয়ম !!মহল্লায় ও তাকে আর দেখা যায় না,মহল্লার অনেকে তার খুঁজ করে বাসায় আসে,জানতে চায় সে অসুস্থ কিনা!
যে মানুষটি সবুজ ঘাস ফড়িংয়ের চাঞ্চল্য নিয়ে একদিন পথ চলেছে । মনের উর্বর জমিতে করেছে স্বপ্নের চাষাবাদ ।কল্পনায় চড়ে বেড়িয়েছে আকাশ পাতাল ।কত যে ভাঙা কে গড়ার চেষ্টা করেছে । জাদুঘরের হাস্যোজ্জ্বল মূর্তির মত তার মায়াবী মুখে কখনো কেউ মলিনতা দেখেনি ।চোখের মাঝে ছিল সব সময় সুখের বসবাস ।অন্যের বিপদে আপদে সব ভয় ভীতিকে উপেক্ষা করে সবার আগে গেছে । অপরের দরিদ্রতা তাকে কত যে কাঁদিয়েছে!!সে মানুষটি হঠাৎ করে বদলে গেল অথচ কেউ কিছু জানে না কেন তার এমন হল ! কেন সে হঠাৎ করে বদলে গেল ! সবাই শুধু অবাক হয়ে বলে, ছেলেটার যে হঠাৎ করে কি হয়ে গেল !
তার এই আমুল পরিবর্তন দেখে তার মা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যান । তার দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দেয় কাজের বুয়া কুলসুমা। কারণ উনাকে কুলসুমা বলছে – ভাইজানের লগে জ্বিন ভর করছে,তা আমি নিশ্চিত বইলতে পারি,তাই তো উনি এত বদলাইয়া গেছেন ।তয় উনার গলায় তাবিজ দিয়া দিলে উনি আবার ঠিক হইয়া যাবেন । আপনি যদি কন আমি ভাইজানের লাগি একটা তাবিজ আইন্না দিতে পারি !তিনি কুলসুমাকে বলেন তুমি একটা তাবিজ নিয়ে এসো । পরেরদিন কুলসুমা তাবিজ নিয়া আসে । কুলসুমার এনে দেওয়া তাবিজ উনি সাহেলের গলায় ঝুলিয়ে দেন । তার বাবা তাকে অনেক পীড়াপীড়ি করেন তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাওয়ার জন্য । প্রথমে যেতে সে রাজি হয়নি,অবশেষে একদিন তার বাবার সাথে সে ডাক্তারের কাছে যায় ।ডাক্তার তাকে কিছু টেস্ট করতে দেয় । নাসিম সাহেব অনেক জোরাজুরি করে তাকে দিয়ে সব টেস্ট করান । টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে যখন উনি আবার ডাক্তারের কাছে যান – তখন ডাক্তার সব রিপোর্ট চেক করে বলেন – আপনার ছেলে মাদক আসক্ত । তাই তার মাঝে এই হঠাৎ পরিবর্তনটা এসেছে ।তবে সে এখন ও তেমন সিরিয়াস পর্যায়ে যায়নি । এখন যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেন তাহলে তার আরো অধঃপতন হবে ।
ডাক্তারের সব কথা শুনে - নাসিম সাহেব আস্তে আস্তে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন -আরো অধঃপতন বলতে কি হতে পারে?ডাক্তার বলেন আরো অধঃপতন মানে হতে পারে -দিন দিন তার চারিত্রিক,শারিরীকক,মানসিক পরিবর্তন হবে । আর এই পরিবর্তনটা পজিটিভ নয় নেগেটিভ পরিবর্তন ।এভাবে আস্তে আস্তে করে সে এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই এখনি আপনারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেন ।নাসিম সাহের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের যাবতীয় পরামর্শ ডাক্তারের কাছ মনযোগ দিয়ে শুনে এখন হেটে হেটে বাসায় ফিরছেন । কিন্তু ভালভাবে হাটতে পারছেন না,মনে হচ্ছে হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পায়ে অবশিষ্ট নেই । আবার রিকশা ও যে ডাকবেন সে শক্তি পাচ্ছেন না ,বারবার চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের করতে পারছেন না ।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১০ রাত ৩:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


