প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব
৩.
আমার চিন্তা ভাবনা হয়তে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য। কারন একজন স্কুল ছাএ সমাজ থেকে চলে যাবার মত জটিল চিন্তা করতে পারে না। এই চিন্তা ধারা অবশ্যই কেউ আমাকে শিখিয়েছে?
স্কুল এর পার্ট চুকিয়ে আমি কলেজে উঠলাম। মনে জেগে উঠেছিল অদম্য ইচ্ছা, যেভাবে হক জীবনে সফল হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের আলোয় নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করলাম। “ভাল মানুষ হবে যদি ভাল ছাএ হও” নীতিকথাটি আমার জীবনের উদ্দেশ্যই করে ফেললাম। আদর্শ ছাএ ও তার আদর্শ পৃথিবী।
আমার আর্দশ পৃথিবী। অন্যরকম হয়ত আমার বন্ধুদের কাছ থেকে। হয়ত তারা যে পৃথিবী নিয়ে আছে তার সাথে আমার এই আদর্শ পৃথিবীর কোন মিল নেই। যার কারনে তারা হয়ত আমার সহপাঠি কিন্তু বন্ধু নয়।
আমার আদর্শ পৃথিবী আমার দর্শন আর মনন দিয়ে তৈরী। এই গ্রহে আমি ছাড়া আর কারু ঢুকার অনুমতি আমি দেইনা।
দর্শন কিন্তু পরিবর্তনশীল। কিন্তু আমি যেই সেই পরিবর্তনটিকে মেনে নিতে পারছিলাম না। তার যতই দিন যাচ্ছিল দর্শনের সাথে আমার পৃথিবীর বিবাদ যেন ততই বাড়ছিল।
এই বিবাদ টা আর বেড়ে গেল যখন প্রেম সম্পর্কীত গল্প আমাকে উদ্দেলিত করতে থাকে। আমি যেন বাইরের দিকে তার চরম বিরোধী কিন্তু মন সেই গল্পগুলো শুনতে চায়। কাব্যিক ভাষায় যেন প্রেম তার অর্থ আমাকে বুঝাতে চায়। কিন্তু আমার মনতো আর কাব্যিক নয়।
“প্রেম হল যৌনতা।”—এই মিথ্যাটিই আমার দর্শনে সাথে বিবাদের কারন। ক্লাশের সবচেয়ে ভাল আর সুদর্শন ছেলেটি যখন বয়স পরিক্রমার আচরন থেকে মুক্ত থেকে প্রেম কে দূরে সরিয়ে দিতে চায় তখন সমবয়সি সবাই যেন তার দিকে তাচ্ছিল্যমাখা করুনার চোখে তাকায়। লাইব্রেরীতে থাকা মনবিদ্যা সম্পর্কীত বই গুলো পড়তে থাকলাম আমি। প্রেম নামক এই বিছিন্ন অনুভুতি টুকু আমি নিতে চাইতাম বিভিন্ন মনবিদ্যার বই থেকে।
আচ্ছা কেন মানুষ তার পাশে অন্য একজন মানুষকে চায়?
কেন তার মন ধ্যান অন্য আরেকজনের জন্য দান করে?
কেন মানুষ সংসার করে?
উওর গুলো কি? সামাজিকতা, ভালবাসা, চাহিদা নাকি অন্যকিছু, নাকি প্রেম?
নীলা........ নীলা!!! তুমি কি আমার থেকে সারাজীবন দূরে দূরেই থাকবে? তোমার সাথে আমার এই কিসের সম্পর্ক? কেন আমি তোমাকে আকাশের চাঁদের মত ভালবাসি, ভালবাসি এই সুভাষিত প্রকৃতির মত?
সেই নীলার সাথে আমার পরিচয় হয় হঠাৎ। একদিন বৃষ্টির দিন চরম বৃষ্টি হচ্ছে। দেখলাম একটি মেয়ে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভিজছে। আমি আমার ছাতা নিয়ে তার মাথায় ধরলাম আর বললাম
--ভিজছেন কেন?
একপলক আমারদিকে তাকিয়ে সে বলল
--বৃষ্টির পানি আর কান্নার পানি আপনি আলাদা করতে পারবেন না। তাই ভিজছি।
আমি ভিমরি খেয়ে গেলাম। কি বলে মেয়েটা?
কি যেন হল আমার, তার হাতটি ধরে ছাতাটি ফেলে দিলাম, আমি বললাম
----ঠিকই বলেছ তুমি। কেন আমার আমাদের মনের কান্নাকে বৃষ্টির পানিতে ছেড়ে দেইনা? কেন কেন কেন?

আমার এত কেন শুনে সে একটা অট্টহাসি দিয়ে আমার হাতটি ধরে পাশের একটি ছাউনীতে প্রবেশ করল। এই প্রথম আমি বিদ্যুের আলোয় তার আলোকিত কিন্তু বিমর্ষ মুখটি দেখলাম। চোখে চোখ পড়তেই আমার শরিরে যেন বিদ্যুত প্রবাহিত হল।
আমি তোমাকে চাই, আপন করে পেতে চাই নীলা। সেই আপনের মানে কি তা আমি তখনও বুঝি নি হয়ত সেই আপনের নামই প্রেম।
আমারা নিয়মিত দেখা করতে লাগলাম। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কেউ কিছু বলতাম না শুধু চোখের ভাষায় কথা বলতাম। প্রেম নামক সক্রিয় এক আবেগে আমরা বাধা পড়ে গেলাম। আমার জীবনটি যেন পরিপূর্ন হয়ে গেছে। আমার দর্শনের পাতা গুলো নতুন করে লেখা হল। ক্রমেই ক্রমেই আমরা এই আবেগীয় পাতা দেখে বের হতে থাকলাম। সেই প্রথম কথাটি বলল
“কেমন আছ তুমি।” এই প্রশ্নের উওর যেন দুজনের একইরকম।
আমি আমার মনের সব কথা তাকে বলতাম। প্রতিদিনই তার প্রেমের জালে আমি আর শক্ত ভাবে বাধা পড়তে লাগলাম। দর্শন বিদ্যার সব কিছুই তার সাথে শেয়ার করতাম। সে অবাক হয়ে আমার কথা শুনত।
আচ্ছা মানুষের প্রিয় মানুষটিকে ভালবাসা কিভাবে বহি:প্রকাশ করতে পারে? আমার দর্শন বলে তোমার জীবনের মাধ্যমে, হয়তবা তাই। তবে উওরটি কিন্তু বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম। হয়ত কেউ বলবে “যৌনতাই এর সবচেয়ে বড় বহি:প্রকাশ”, কেউ হয়ত বলবে “আপনি তাকে না দেখার যে ব্যাথ্যাটুকু পাবেন তাই এর বহি:প্রকাশ।” এই উওরটি আমার জানা তা আমারই ভিতরে থাকুক।
তুমি কি আমাকে একইরকম অনুভব কর আমি যেমন তোমাকে করি?
“নীলা তুমি কি আমাকে অনুভব করতে পারছ। তোমাকে আমার খুবই দরকার, খুবই দরকার। তোমার জন্য আমি উপেক্ষা করছি, আমি বুড়ো হব তবু তোমার সেই দৃষ্টিটিকে আমি চাই নিজের মত করে।”
এইটিই তার কাছে পাঠানো আমার সর্বশেষ চিঠি। গত দুই মাস ধরে নীলার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। তার বাসা থেকে খবর নিয়েছি সে নাকি ভারত চলে গেছে কিছুদিনের জন্য। আর বড় সমস্যা হল সে আমাকে জানাতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তখন ছিলাম হাসপাতালে অনেক অনেক ব্যস্ত।
আমার মা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি প্যারলাইসিসে আক্রান্ত। দিনের পুরো সময়টুকু তাকেই দিতে হয়।তাই চাইলেই নীলার সাথে আমার যোগযোগ সম্ভব ছিলনা।
অবশেষে আমার চিঠি জবাব সে দিল। আমার ঠিকানতেই সে পাঠাল। চিঠিটি অনেক টা এরকম
“
তোমার মা কেমন আছেন? তিনি আশা করি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। আমি দেশে আসছি ২৩ মে। সেদিনই তোমার সাথে দেখা করব। আর প্রথম প্রশ্নের উওরটা আমি চোখেই চোখেই জবাব দেব।
ইতি
নীলা
”
আমার প্রান যেন আমার কাছে ফিরে এল আর বিশ্বকাপের ক্ষন গননার মতই আমি যে সেই মুহুর্ত থেকেই তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাও ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন।
আমি পার্কে তার জন্য অপেক্ষা করছি। আজ বিকেলেই সে আমার সাথে দেখা হওয়ার কথা। টেলিফোনে সে আমাকে তাই জানিয়েছে। অপেক্ষা যেন আর শেষ হয়না। আচ্ছ আমি কি সময়ের আগেই এসে গেছি।
১ ঘন্টা,
২ ঘন্টা
না সন্ধ্যে হয়ে আসছে। সে কখনও দেরী করে না। নিশ্চই কোন সমস্যা হয়েছে?
পার্ক থেকে বেড়িয়ে পাশের ফোনবুথ থেকে একটি ফোন দিলাম তাদের বাসায়। প্রথম বার কেউ ফোন ধরল না। পরেবার ভাবী ফোন ধরল
--হ্যালো আমি বিকাশ বলছিলাম।
পাশের কান্না ভেজা স্বর আমাকে বলল
--বিকাশ....বিকাশ.... নীলা মারা গেছে।
শব্দটি শুনার পর আমি আর এক মুহুর্ত স্হির থাকতে পারলাম না। মাটিতে বসে গেলাম। আর যেন কিছুই শুনে পাচ্ছিলাম না আমি।
আমার সেই প্রিয় চোখ, সেই প্রিয় হাসি সেই অপূর্ব মুখটি!!! না না এ হতে পারেনা। নিথর আমি যেন সেই দৃশ্য গুলো দেখছি।
আমাকে দেখার জন্য সে বাসা থেকে বেরিয়ে ছিল। রাস্তা পাড় হওয়ার সময় বিশাল বাসটি তার মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। ওই বাসটিকে আমি খুজেছি এখনও খুজে যাচ্ছি।
তাকে ভুলে যাওয়া হয়ত আমার পক্ষে সারাজীবনেও সম্ভব নয়। প্রিয়জনের মূত্যকে সেদিন যেন আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম। সেই বেদনার নীল দংশন যেন নিজেকে, নিজের মনকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে।
আমি নাকি এখন অস্বাভাবিক হয়ে গেছি। সারাদিন আমি আমার রুমেই থাকি। কারু সাথে কথা বলি না। কিন্তু আমি তো সারাদিন তার সাথে আমার নীলার সাথেই থাকি। প্রিয়জনের কাছে আমি র্নিজীব এক মানুষ হয়ে গেছি। যাকে দেখি তাকেই মনে হয় আমার নীলা কোন খবর হয়ত সে নিয়ে এসেছে। হোকনা সে মৃত্।
একজন মস্তিক বিজ্ঞানী আমার এই সমস্যাটির ব্যাখ্যা কিভাবে দেবে—
“আপনার মস্তিষ্কের স্মৃতির বিশেষ অংশজুড়ে আছে নীলা। নীলাকে আপনি আপনার অনুভুতির সাথে মিলিয়ে ফেলেছেন। যেমন কোন বস্তু দেখলে আমরা বন্তটি প্রপারটিস গুলো আলাদা করে নিয়ে আবার তা এক করে নেই। আর এইখানেই সমস্যা আপনি যে কোন মানুষের প্রাপারটিসের সাথে নীলা নামক অবজেক্টটির প্রপারটিস মিলিয়ে ফেলছেন। যার ফলে বার বার সে আপনার সামনে আসছে কিন্তু আপনার একটি অংশ বলছে সে মৃত্য তাকে আপনি আবার দেখতে পারেন না। আমাদের যুক্তি অংশ তাই সহজেই কনফিউসড হয়ে যাচ্ছে। সে কোন উওর পাচ্ছে আর কোন ডিসিশনও নিতে পারছে না। তা আপনি অনবরত তার দিকে চেয়ে থাকেন আর অমিল গুলো ধরার চেষ্টা করতে থাকেন।”
হয়ত আমি সত্যিই অসুস্থ কিন্তু তবুও আমি তাকে চাই । তার হাতটি একবার ছুয়ে দেখতে চাই। সেই অনুভুতি টুকু নিতে চাই। কিন্তু আমাকে যে তাকে বিদায় জানাতে হবে। আমি তাকে বিদায় দিয়ে দিলাম।
তাকে হারানো বেদনা আমাকে গত দুই বছর ধরে দংশন করছে। আমি বুঝতে পারছি আমি পুরো অগোছালো হয়ে গেছি। আয়না সামনে দাড়ালাম। নিজেকে চেনা শুরু করলাম। সত্যি আয়নার এই মানুষটির সাথে আমার পরিচয় ছিল না।
আমি দ্রুত আমার দাড়ি গোফ আর চুল কেটে নিজেকে সভ্য করার চেষ্টা করলাম। আজ প্রথম আমি আমাদের ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলাম সবার সাথে। খাবার শেষে মা উঠে দাড়ালেন। কি আশ্চর্য তিনি এখন পুরোপুরি সুস্ত হয়ে গেছেন । আজ অনেক দিন পর যেন তাকে আমি দেখলাম। তার স্নেহময় দৃষ্টি আমাকে যেন জীবন চালিয়ে নেওয়া প্রেরনা দিতে লাগল।
না আমাকে জেগে উঠতে হবে। নীলাকে স্মৃতিকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। রাতে বই পড়ছি মা তখন আমার রুমে ঢুকলেন। হাত হাত রেখে তিনি আমাকে বললেন আমার জীবনে জন্য শ্রেষ্ট কিছু উপদেশ
“বাবারে জীবন কোনদিন থেমে থাকে না তা তুমি যতই থামাবার চেষ্টা কর। চলার নামই জীবন। এই জীবন চালিয়ে নেওয়াই হল জীবনের উপলব্ধি। তুমি কাউকে হারিয়ে তোমার জীবন থেকে পালাতে পারবে না। এই জগতকে তোমার মত করে সাজিয়ে নাও। জ্ঞান আহরন কর অভিজ্ঞতা সন্ঞিত কর। মানুষকে চিন। আর এই উদ্দেশ্যেই তুমি পৃথিবীতে এসেছো।“
আমি ফিরে এলাম ফিরে এলাম আমাদের চেনা সমাজে। পৃথিবীর বুকে সামাজিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে আমি যেন পূর্নজন্ম নিলাম।
(এই উপন্যাসটির একটি সুন্দর ইংরেজি নাম দিয়েছি: Journey to the Death By Life । আরও প্রকাশ করতে আপনাদের সাহায্য চাই।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



