somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাঁকড় : ২ (বইমেলা ২০১৯)

১৪ ই জুন, ২০১৮ রাত ৩:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

----কাঁকর----
এ এম আহাদ লিও
বইমেলা ২০১৯।
(২)
সে কত সালের কথা, কাঁকড়ের ঠিক মনে নেই। বাবার চাকুরীর সুবাদে কুষ্টিয়া শহরে সরকারী কলোনীতে বসবাস। সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসের পাশেই কল-কাকলী স্কুলটি কিছুদিন হলো চালু হয়েছে। স্কুলের এক পাশে সার্কিট হাউজ, অন্য পাশে সরকারী কলোনী। স্কুলে খেলার সময়ে কৌতুহলবশতঃ সার্কিট হাউসের দিকের সীমানা প্রাচীরের দিকে চলে যেতো সব ছেলে ছোকড়ার দল। পোশাক পরিহিত সেনা সদস্যদের কুচকাওয়াজ, হাক-ডাক, দৌড়-ঝাপ চলছে প্রায় সব সময়েই। বড় হয়ে কাঁকড় জানতে পারে, তখন ছিলো সামরিক শাসন। স্কুলের সীমানা প্রাচীরের রেডক্রস মার্কা ফাঁকা অংশ দিয়ে মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যেতো এক লাইনে অনেক যুবক দায়িয়ে আছে, খালি গায়ে, মাথা নিচু, সকলের পরনে বেলবটম প্যান্ট, লম্বা মোটা চেকের শার্ট, মাথায় জর্জ হ্যারিসন মার্কা চুল। কখনও দেখা যেতো এক সারিতে যুবকদের বসিয়ে সবার চুল ছেটে দেওয়া হচ্ছে। সীমানা প্রাচীরের ফাক দিয়ে দেখতে দেখতে, সাহস বেড়ে গেলো। কিছুদিনের মধ্যে ছেলে-ছোকড়া সকলেই প্রাচীরের উপরে চড়ে বসে দেখতে শুরু করে দিয়েছে সার্কিট হাউসের দৈনন্দীন কর্মকান্ড। মিলিটারীদের দেখার আগ্রহ তো ছিলোই, তবে মূল আগ্রহ ছিলো ছোট ছোট গাছে ধরে থাকা পেয়ারাগুলো। লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সকলে। কিচ্ছু করবার নেই। সাহসে কুলোয় না। আস্তে আস্তে দল ভারী হতে লাগলো। হঠাৎ একদিন, একজন সৈনিক এগিয়ে এলেন হাসি হাসি মুখে। কিসের হাসি মুখ, সবাই পড়ি মরি করে প্রাচীর থেকে নেমে ভোঁ দৌড়। পরের দিন আবার প্রাচীরের উপর। সেদিন দূর থেকেই দু-তিনজন সৈনিক হাসি মুখে বাচ্চাদেরকে উচ্চ স্বরে অভয় দিলেন। সবাইকে পেয়ারা দেবেন বলে আশ্বাস দেয়া হলো। তবে শর্ত হলো, সবাইকে ছড়া কিংবা কবিতা শুনাতে হবে। অনেকেই সাহস করে সার্কিট হাউসের দিকে নেমে পড়লো। কাঁকড়ের সাহস হয় না, প্রাচীরের উপর বসে থাকে। সবাই একে একে ছড়া শুনিয়ে পেয়াড়া নিয়ে ফিরছে। কাঁকড় বিষন্ন মুখে বসে রয়েছে। প্রাচীর খুব বেশী উচু ছিলো না। চার-পাঁচ ফুটের মতন হবে, তবে ঠিক অর্ধেক উচ্চতায় কিছু দূর পর পর যোগ চিহ্নের মতন একটি করে ফাকা অংশ ছিলো। ছেলে-ছোকড়াদের উঠতে নামতে খুব বেশী অসুবিধা হতো না। একজন সৈনিক এগিয়ে এসে কাঁকড়ের দুই বগলের নীচে হাত দিয়ে ধরে প্রাচীরের নীচে নামালো। কাঁকড় কথন মুখ বুঁজে দাঁত কাঁমড়ে ভয়ে কাপছে। অভয়, আশ্বাস কোনকিছুতেই কাজ হলো না, ছড়া-কবিতা কিছুই মুখ দিয়ে বের হলো না। তবে করুণাবশতঃ একখানা পেয়াড়া কপালে জুটলো। সেটাই হাতে নিয়ে বাড়ী ফেরে কাঁকড়। পরের দিন আবার প্রাচীরাসন। আবার ছড়া বলে সকলেই পেয়াড়া পেলো, বাদ পড়লো শুধু কাঁকড়। অনেক আশ্বাসের পরে ঠোট নাড়িয়ে শুধু বলতে পারলো,
- আমি ছড়া পারি না, ভুলে যাই।
- তাহলে কি পারো? যা পারো তাই শুনাও।
- গান পারি
- কি গান, সিনেমার?
- না, আমি বড় হলে, তখন সিনেমা দেখতে দেবে।
- তাহলে কি গান? শুনাও দেখি
কাঁকর গাইতে শুরু করলো, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়....’। দুই তিন লাইনের বেশী মুখস্ত নেই। সৈনিকেরা কয়েকজন একে অপরের দিকে তাকায়।
- এটা কোথায় শুনেছো? কে শিখিয়েছে?
- বাবা।
- বাবা কি করে?
- জানি না। ঐদিকে অফিস।
- তোমার বাবা গান গায়?
- না, গান শোনে। আমাদের একটা গান শোনার ক্যাসেট আছে।
- আর কি করে?
- মুক্তিযুদ্ধ করে। বাবা বলেছে।
সেদিনের সেই সেনা সদস্যরা আর কিছু জানতে চায়নি। তবে কাঁকরের কপালে বড় পুরষ্কারটি জুটলো। বলা হলো, ছোট গাছগুলো থেকে যতগুলো ইচ্ছে পেয়াড়া সে পেড়ে নিতে পারে। এমনকি বাসায়ও নিয়ে যেতে পারবে। তবে এই গান আর না শুনালেও চলবে। অন্যদের মতন ছড়া শিখে আসলেই হবে।
বাসায় ফিরে এই বীরত্বগাথা কাওকে না শুনানো পর্যন্ত শান্তি হচ্ছিলো না। অবশেষে বড় বোনকে জানিয়ে কাঁকর। অন্য ভাইবোনদেরকে বলতে নিশেধ করা হলো। বড় আপা পেয়ারা লুকিয়ে রাখলেন। মায়ের বকুনীর ভয় দেখালেন। তবে বাবাকে বলা যাবে, আর কাওকে নয়।
বাবা শুনলেন। বকা দিলেন না। শুধু বললেন,
- আর যেও না। ওরা কিন্তু সবাইকে ধরে নিয়ে যায়!
কাঁকরের আর ওদিকে যাওয়া হয়নি। স্কুলে যাওয়া, বাসায় ফিরে আসা- এভাবে অনেকদিন কেটে গেলো। সম্ভবত পরের বছর, সার্কিট হাউসে আর আগের মতন অতো বেশী সংখ্যক মিলিটারী নেই। এর মধ্যে কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে বিশাল এক দাঙ্গা হয়ে গেলো। বড় ভাই পড়তেন সেই স্কুলে। জেলা স্কুলটি ঠিক সার্কিট হাউসের পিছন দিকে। জেলা স্কুলের মাঠে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ড্রাম বাজিয়ে কুঁচকাওয়াজ করতো। একদিন নাকি পরীক্ষা চলছিলো। তার মধ্যে ড্রামের শব্দ। স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র সকলেই ড্রাম না বাজাতে অনুরোধ করলো। কিন্তু হিতে বিপরীত। ঝগড়া বেধে, কয়েকজন পিটুনি খেলো। এই নিয়ে বিশাল দাঙ্গা। তিন তলার ছাদ থেকে সেই দাঙ্গার কিছু অংশ দেখা গেলো। বড় ভাই বীরদর্পে বাসায় ফিরলেন বেতের একখানা ঢাল নিয়ে। নতুন অবস্থায় জলপাই রঙ করা ছিলো। ব্যবহারে মলিন হয়েছে সে রঙ। মা চেচামেচি শুরু করে দিলেন। বড় ভাইয়া সেটা দিয়ে ছাদে একটা দোলনা তৈরী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কান্নাকাটি, ভাইয়ার অনেক অনুরোধের পরেও মা সেই ঢালখানা বিল্ডিংয়ের পিছনের জঙ্গলে ফেলে দিলেন। তিন চারটে বানর সেই ঢাল নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়ে গেলো। হ্যাঁ, বানরই হবে বোধ হয়, কিংবা হনুমান? কুষ্টিয়ায় সেসময় বানরদের বেশ উৎপাত ছিলো। কাঁকরের আসলে অত কিছু মনে নেই। সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলো আবছা আবছা মনে পড়ে। আবার কখনওবা স্মৃতিগুলোর প্রতিটি খুটি নাটি কথা ছবির মতন ভেসে ওঠে। বানরের দলতো একবার বাসায় ঢূকে ভাতের হাড়ি লুট করে নিয়ে গিয়েছিলো! বানরের দল সেই ঢালখানা কয়েকজনে মিলে বয়ে নিয়ে চলে গেলো কোথাও। বানরদেরও বোধ সার্কিট হাউস কিংবা ক্যান্টনমেন্ট জাতীয় কিছু আছে। পুরোনো কোন বড় গাছে হয়ত তাদের সেই দুর্গ। সেই ঢাল দিয়ে বানরেরাই বাচ্চা বানরদের জন্য দোলনা বেঁধেছিলো হয়ত।
কাঁকরের তখন কোন খেলনা ছিলো না। তিন চাকার একটা বেবী সাইকেল, সেটাও আবার বড় ভাই-বোনদের ব্যবহৃত। উত্তরাধিকারসূত্রে কাঁকরের হয়েছে। সেটা নিয়ে তো আর সব সময়ে খেলা যায় না। বাবার সিগারেটের প্যাকেট একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে গাড়ী বানাবার একটা অদ্ভুত উপায় কাঁকর আয়ত্ব করে নিয়েছিলো সেই ছোটবেলাতেই। সেই গাড়িতে মাটির কিংবা লিচুর বিচি দিয়ে চাকা তৈরী করে লাগানো হতো ঝাঁটার কাঠি দিয়ে। সেসময়ে কলোনীর বাচ্চাদের আর একটা খেলার সামগ্রী ছিলো। দশ পয়সা দামের রঙিন আইসক্রিমের কাঠি। সেই কাঠি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে হরেক রকমের খেলার সামগ্রী তৈরী হতো। এই ছিলো ছোট্ট কাঁকরের খেলার সামগ্রী। কোন রং পেন্সিল ছিলো না। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, সংখ্যা সবকিছুই স্লেট-পেন্সিলে। একবার পরিচিত এক আঙ্কেল কাঁকরদের বাসার সামনে এলেন। বাবার খোঁজ করছিলেন। ভদ্রলোককে কাঁকর এর আগেও দেখেছে। বাবার অফিসে বেড়াতে গিয়ে এই লোককে দেখেছে সে।
- চাচ্চু, তোমার বাবা বাসায় আছে?
- না, অফিসে।
- এগুলো কি? আইসক্রিমের কাঠি? ছি! এগুলো নোংরা, এগুলো দিয়ে খেলে না। চলো তেমাকে একটা ভালো খেলনা কিনে দেই। যাবে আমার সাথে?
- যাবো।
তিনি একটা রিক্সায় চড়িয়ে কুষ্টিয়া বড়বাজারে নিয়ে গেলেন। একটা খেলনা পিস্তল কিনে দিলেন। সেই পিস্তলের নলের সামনে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে গুলি করলে বেশ কিছুদূর যায়। অমন পিস্তল কলোনীর বয়সে বড় কিছু ছেলেদের হাতে দেখা যায় ইদানিং। ওরা বড়ইয়ের বিচি দিয়ে গুলি করতো ছোট বাচ্চাদের পিঠে। সিলভার কালার, সম্ভবত ঢালাই লোহার কিংবা এ্যালুমিনিয়ামের ছিলো। সেই পিস্তল নিয়ে কাঁকর বাসায় ফিরে এলো। নিজেকে তার বেশ বড় বড় মনে হচ্ছে। মায়ের পিটুনী খেতে হলো। পিস্তল তুলে রাখা হলো, বাবা বাসায় এলে দেখানো হবে। ভয়ে কাঁকরের অবস্থা কাহিল। বাবা এলেন, কান মললেন। পিস্তল কাগজে মুড়ে রাখলেন পরের দিন ফিরিয়ে দেবেন বলে। পরে কাঁকর জেনেছিলো, সেই আঙ্কেল ছিলেন বাবার অফিসের একজন ঠিকাদার। বিশেষ কোন সুবিধালাভের আশায় তিনি কাঁকরকে সেটি কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার সততার গিলোটিনে কাঁকরের খেলনা পিস্তলের সাধটির গলা কাটা পড়লো।
এর বেশ কিছু দিন পরে। তখন দুপুরে বাসার বাইরে তো যাওয়া একেবারেই নিষেধ। ঘুমানো বাধ্যতামূলক। বাসার প্রধান দরজাটির উপরের সিটকানী লাগানো থাকতো। বিশেষ করে কাঁকর যেন কোনভাবেই সেটি খুলতে না পারে। একদিন ভর দুপুরে বাসায় মা আর ছোট বোনটি ছাড়া আর কেও নেই। বড় ভাই-বোনেরা যে যার স্কুলে। কাঁকরের স্কুল সেই সকাল এগারোটায় ছুটি। গোসল খাওয়া সেরে মা ছোট বোনটিকে নিয়ে বিছানায়। কাঁকরও ঘুমের ভান করে মটকা মেরে থাকে। কিছুক্ষণ পর বিছানা থেকে উঠে বসবার ঘরের দিকে হেঁটে যায়। মা তাকিয়ে দেখলেন। কিছু বললেন না- ভাবলেন, বাসার মধ্যেই খেলা ধুলা করবে। বসবার ঘরে গিয়ে দেখা গেলো প্রধান দরজার উপরের সিটকানি লাগানো হয়নি। নীচের সিটাকানি শব্দ না করে খুলে বাসার বাইরে বেরিয়ে যায কাঁকর। সিড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তিন তলা থেকে নামবে কি নামবে না এই নিয়ে দোটানায় পড়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে দোতালায় নেমে আসে। দোতালার একটি বাসার দরজা খুলে মেজ ভাইয়ের বন্ধু বের হলো। নামটি ছিলো সম্ভবত হীরক। কিন্তু ওর তো পক্স হয়েছে! কাঁকর উল্টো ঘুরে তিন তলায় আবার উঠতে যাবে, অমনি হীরক পথ আগলে দাড়ায়,
- এই কোথায় যাচ্ছিস? দাড়া।
- বাসায়। তোমার পক্স, তোমার কাছে গেলে আমারও পক্স হবে।
- গাধা। আমার পক্স সেরে গেছে। তোরও তো কদিন আগে পক্স হলো। একবার হয়ে গেলে আর হয় না।
- আমি বাসায় যাবো।
- বাসায় যাবি তো বের হয়েছিলি কেন? আমার হাতে এগুলো কি দেখেছিস?
হীরকের হাতে কয়েকটি পুরোনো ফিউজ হয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রিক বাল্ব। সেগুলো পিছন দিক থেকে ফুটো করে ফাঁকা করা হয়েছে। এর মধ্যে রঙিন পানি ভরে কি যেন করে ওরা। মেজ ভাইয়ের সমবয়সীদের কিছু উদ্ভট খেলা ছিলো। একবার তো তারা কিভাবে যেন মোমবাতি, কাগজ গোল কাঁচ এসব হাবিজাবি দিয়ে অদ্ভুতদর্শন এক বায়োস্কোপ বানিয়ে ফেললো। বাবা তাদেরকে পাঁচ টাকা সন্মানীও দিলেন। বড় ভাই কলোনীর মাঠে বড়দের সাথে কাঠের বল দিয়ে ক্রিকেট খেলে। সে বড়দের সাথে থাকে। মেজ ভাই আর ওর বন্ধুদের সাথে কাঁকরের বেশ ভাব। মাঝে মধ্যে ওরা তাকে দিয়ে বেশ ফাই-ফরমাশ খাটায়। বড় ভাইয়ার সাথে বেশ দূরত্ব তৈরী হয়েছে। এইতো কদিন আগে, মাঠের পাশে কাঁকর অন্য বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলছিলো। হঠাৎ কে যেন বললো- ঐ দেখ তোর বড়ভাই ব্যাটিং করছে। কাঁকর কিছু না ভেবেই মাঠের মাঝখানে ক্রিকেট পীচের দিকে দৌড়ে যেতে থাকে ‘ভাইয়া, ভাইয়া’ বলে ডাকতে ডাকতে। ফিল্ডাররা দু-একজন ওর দিকে দৌড়ে আসে- যাসনে, যাসনে, বল লাগবে। ওদিকে বোলার বল করে দিয়েছে। বড় ভাইয়া পুল করেছিলেন। বল সোজা এসে কাঁকরের ডান কানের কাছা-কাছি লাগলো। প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলো সেদিন। ক্রিকেটের সাথে প্রথম পরিচয় ওভাবেই। কিছুক্ষণ পরে কাঁকর নিজেকে বাসার বিছানায় আবিষ্কার করে। পানি ঢালা হচ্ছে। মা কান্না-কাটি করে একাকার। পরে কাঁকর যেনেছিলো, খুব নাকি কপালজোড়ে সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলো। বড়ভাই বাসায় ফেরেনি। পরে বাবা খোঁজা-খুজি করে ফিরিয়ে এনেছে। পরে বড় ভাইয়ের কাছে জানা গেলো, বলটা আসলে খুব একটা জোরে মারতে পারেননি তিনি। আলতো করে ছুইয়ে ছিলেন ব্যাটে। পারফেক্ট পুল শট হলে নাকি কাঁকরকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। সেই থেকে বড় ভাইয়ার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে কাঁকর। এখন মেজ ভাই তার বন্ধু। মেজ ভাইয়ের বন্ধুরাও তার বন্ধু!
হীরকের হাতে এমন লোভনীয় জিনিস দেখে পক্সের কথা বেমালুম ভুলে যায় কাঁকর,
- এগুলো দিয়ে কি করবে? রঙ কোথায়?
- রঙ কিনতে যাবো। যাবি আমার সাথে? আমার কাছে এক টাকা আছে। আটানার রঙ, আর আটানার সনপাপড়ী।
- যাবো। চলো।
দুজনে রওনা হলো। সার্কিট হাউসের পিছন দিকে জেলা স্কুলের মাঠের ধার দিয়ে হেঁটে চলেছে গল্প করতে করতে।
- তোর পক্স হয়েছিলো। অনেক ওষুধ খেতে হয়েছিলো, তাই না?
- হুম। কাচের বোতলে কাগজের দাগকাটা মিকচারগুলো খুব তেঁতো। তুমি খাওনি?
- না, মুখে নিয়ে পরে ফেলে দিয়েছি। ধুর, ওসব কেও খায়। ছ্যাঁ!
- হুমোপতি ওষুদটা খুব মিষ্টি। আমি অনেক খেয়েছি। আর শুধু পাউরুটি। কয়দিন খুব ভালো ভালো বিস্কুট খেয়েছি। বিস্কুট শেষ, আর নেই।
পাউরুটি আর বিস্কুটের জন্যই অসুখ বিসুখ বেশ উপভোগ্য ছিলো। যখন কারো অসুখ হতো, তার সেকি কদর! অন্যদের তখন শুধুই হিংসা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। তখনকার দিনে বাসায় কমলা, আপেল, হরলিক্স, পাউরুটি এসব আসতো শুধু কেউ অসুস্থ হলে।
হীরক আর কাঁকর হাঁটতে হাঁটতে জেলা স্কুল পেরিয়ে মূল বড় রাস্তার ধারে কিছু ঝুপড়ি দোকানে এসে পৌছায়। হীরক আট আনার রঙ কিনে নেয়। দুজনে সন পাপড়ী খেতে খেতে ফিরে চলেছে একই পথে। জেলা স্কুলের মাঠের ধারে সার্কিট হাউসের পিছন দিকে দেয়াল ঘেষে হাঁটছে দুজন। হীরক হঠাৎ কাঁকরের দিকে তাকিয়ে বলে,
- চল, পেয়াড়া পারি। ভিতরে ঢুকে আমি গাছে উঠবো, তুই নীচের দাড়িয়ে থাকবি।
- না, আর্মিরা ধরে নিয়ে যাবে। বিকাল হয়ে যাচ্ছে। মা খুঁজবে।
- আরে ধুর! আমি গাছে উঠবো। তুই দাড়িয়ে থাকবি নীচে। কেউ টেরই পাবে না। সবাই এখন ঘুমে। চল।
পেয়াড়ার লোভের কাছে সকল ভয় ভীতি পরাজিত। কাঁকর হীরকের পিছু পিছু সার্কিট হাউজের দেয়ালের দিকে যেতে থাকে। দেয়াল টপকে সার্কিট হাউসের পেয়াড়া বাগানে ঢুকে পড়েছে দুজন। অনেকদিন আগে এই বাগানে এসেছিলো কাঁকর। গান শুনিয়ে অনেকগুলো পেয়াড়া নিয়ে গিয়েছিলো বাসায়। সেকথা মনে পড়তেই ভয় কেটে যায়। বাগানের ভিতর দিয়ে আড়া আড়ি হেঁটে দুজনে কলকাকলী স্কুলের সীমানার কাছে পৌছে যায়। দেখেশুনে একটা গাছে তরতর করে উঠে যায় হীরক। কাঁকর নীচে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। উপরে গাছের একটা ডালে বসে বেশ আয়েশ করে হীরক একটা পেয়াড়া ছিড়ে কামড় বসায় তাতে। কাঁকর নীচ থেকে তাকিয়ে দেখে।
- ভাইয়া, আমাকে একটা দাও।
- দাঁড়া। ছুঁচো কোথাকার। চুপ করে থাক। আগে কয়েকটা পেড়ে নেই।
উপর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কাঁকর। হীরক একটা পেয়াড়া নীচে ফেলে দেয়। পেয়াড়াটা কুড়াবার জন্য নীচের দিকে তাকাতে গিয়ে কাঁকরের দৃষ্টি চলে যায় সার্কিট হাউজের বিল্ডিংয়ের এক কোনায়, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জী এবং হাফ ফ্যান্ট পরিহিত দুজন লোক খুব ধীরে ধীরে গাছের দিকে এগিয়ে আসছে। একজনের হাতে এক গোছা দড়ি। বিষয়টা বুঝতে উঠতে তার কিছুক্ষণ সময় লাগলো। ততোক্ষণে লোক দুজন কাছাকাছি চলে এসেছে। ভয়ে হাত-পা ভিতরে সেধিয়ে গিয়েছিল। গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয় না। লোক দুটো হঠাৎ করে ‘ধর, ধর’ চিৎকার করে। এই চিৎকারেই কাজ হলো। কি হলো কে জানে। একেবারে ঝেড়ে দৌড় কলকাকলী স্কুলের সীমানা প্রাচীরের দিকে। পিছন থেকে ‘ধর, ধর’ আওয়াজ আসছে। কিভাবে যেন সীমানা প্রাচীরের মাঝখানের সেই রেডক্রস মার্কা ফাঁকা জায়গায় পা দিয়ে দেয়াল টপকে স্কুলের মাঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁকর। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে দেয়ালের ওপাড় থেকে একজন লোক কাঁকরের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কাঁকর উঠে দাড়াবার চেষ্টা করে, দাড়িয়ে ভীত দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালের এপাড় থেকে লোকটির বুক থেকে মাথা অবধি দিব্যি দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছে করলেই এক লাফে এসে কাঁকরকে ধরে ফেলতে পারে। লোকটা হাসছে। কাঁকরকে খুব অবাক করে দিয়ে লোকটি বলে,
- তুমি অনেক জোরে দৌড়াতে পারো। পেয়ারা খেতে চাইলে ঐ গানটা শুনিয়ে, পেয়ারা নিয়ে যেও। বাসায় চলে যাও এখন।
কাঁকর আবার দৌড়াতে শুরু করে। এক দৌড়ে বাসার দড়জার সামনে। মা দরজার সামনে চিন্তিত মুখে দাড়িয়ে আছেন। ছেলেকে শাসন করবেন কি। কাঁকরের অবস্থা দেখে তারই প্রাণ ওষ্ঠাগত। ছেলে তার নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মা কাঁকরের বুক-পিঠ সাপটে দিচ্ছেন।
- কি দেখে ভয় পেয়েছো, বাবা, কি হয়েছে বাবু।
তখন প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। বড় ভাই বোনেরা সবাই স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে ইতিমধ্যেই। কাঁকরকে নিয়ে সে এক হুলুস্থুল ব্যাপার। প্রায় আধা ঘন্টাখানেক সময় পরে কাঁকরের মুখে শব্দ ফিরে এলো। শুধু এটুকুই বলতে সে যে, হীরক ভাইয়াকে আর্মিরা ধরে রেখেছে। হীরকের বাবা গিয়ে সার্কিট হাউস থেকে ছেলেকে নিয়ে এলেন। তিনি বিস্তারিত ঘটনা জেনে এসেছিলেন, কিন্তু বাসায় ফিরে কাওকেই আর কিছু বললেন না। হীরকও ঘটনাটি বেমালুম চেপে গেলো সকলের কাছে।
মা, কোথা থেকে একটা তাবিজ জোগাড় করে এনে কাঁকরের হাতে ঝুলিয়ে দিলেন। ছেলেটা দিন দিন রোগা-পটকা হয়ে যাচ্ছে, অযথা যখন তখন ভয় পায়-এই নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা। তাবিজের গুনুাগুন ঠিক রাখতে মওলানা সাহেবের কড়া নির্দেশে সেই থেকে কাঁকরের জন্য কালবাউস মাছ খাওয়া বন্ধ করা হলো

কে যেন কাঁকরের শার্টের হাতা ধরে টান দিচ্ছে। সাদ্দাম ডেকে চলেছে এক নাগারে
- ছার, ও ছার, ছার। রাইত দুইটার টেরেন গ্যাছেগা। ছার উঠেন।
কাঁকর চমকে ওঠে। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো। মাথার মধ্যে কালবাউস মাছ শব্দটা ছটফট করছে। সামনে তাকিয়ে দেখে সাদ্দাম তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাজির। জনা আষ্টেক ছেলে ছোকড়ার দল। কারো পরনে ময়লা হাফ ফ্যান্ট, কেউবা ময়লা, মলিন হয়ে যাওয়া স্পোর্টস ট্রাউজার। প্লাটফর্ম বেশ নির্জন। কিছু ভবগুরে কিছিমের লোকজন এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। চায়ের দোকানের সামনে কিছুটা ভিড়। টুং-টাং শব্দে সাদ্দামের মহাজন মান্নান ভাই চা বানিয়ে চলেছে। স্টেশনের বড় ঘড়িতে রাত আড়াইটা বাজতে চলেছে।
- সকলে এসেছেন? তা, আপনাদের বই-খাতা কোথায়?
সাদ্দাম যথারীতি হলদে দাঁত বের করে হেসে ওঠে,
- ছার, আইজকা পড়তাম না। আইজকা গপ হুনবাম।
- কিছুক্ষণ পড়ে নিন। তারপর গপসপ হবে। এক কাপ চা বলেন আগে।
----- চলবে -----
কাঁকর: ১ পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জুন, ২০১৮ ভোর ৪:৪২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ

লিখেছেন সনেট কবি, ১৮ ই জুন, ২০১৮ সকাল ৯:২৩



বাংলাদেশ, চিরায়ত সবুজে ভোরের
সূর্য উঠে রক্তলাল; অবাক বিস্ময়ে
অনন্য সুন্দর দেখি দিগন্তে তাকিয়ে,
সবুজে রোদ্র প্রলেপ কি চমৎকার!
রাতের আকাশে চাঁদ সুন্দর দোরের
শিকল খুলে নিমিশে আঁধার তাড়িয়ে
মনমুগ্ধতা ছড়ায় সীমানা ছাড়িয়ে,
উতলা হৃদয়ে সেতো সেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহারে বাবা!!!

লিখেছেন পবন সরকার, ১৮ ই জুন, ২০১৮ সকাল ১১:১৫



বাবা ছিল ছায়া ছিল
বটের গাছের মত
জান প্রাণে ঠেকিয়ে যেত
ঝড়-ঝামেলা যত।

বটের ছায়ায় যেমনি মোরা
আরাম করে থাকি
তেমনি থাকতাম বাপের কোলে
নিজের মাথা রাখি।

খাওয়া পরার দুঃশ্চিন্তাটা
ছিল বাপরে ঘাড়ে
মনটা চাইলেই সকল বায়না
করতাম গিয়া তারে।

ধমক-ধামক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বের ছয় নম্বর দলের ফাউল ফুটবলের সঙ্গে রেফারির বদান্যতায় অঘটনের দিনে ব্রাজিলের ড্র -বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ১৮ ই জুন, ২০১৮ দুপুর ১:১২



অঘটনের রাতে ব্রাজিল ড্র করেছে। এটাই ছিলো চূড়ান্ত ফলাফল। তবু আরও কথা আছে।যাদের সঙ্গে ড্র করেছে সেই সুইজারল্যান্ড বিশ্বের ৬ নম্বর দল। গায়ের জুরে ফুটবল খেলেছে।তাদের ফা্উলের প্রধান লক্ষ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোটগল্প: ভুলোমন

লিখেছেন পার্থ তালুকদার, ১৮ ই জুন, ২০১৮ দুপুর ১:২৭



আমার এই একটাই সমস্যা। মানুষের নাম ভুইল্লা যাই !

পৃথিবীর কোন দেশের উপর দিয়া কোন অক্ষাংশ রেখা চইলা গেছে, আফ্রিকার জঙ্গলে সবচেয়ে বিষাক্ত পিঁপড়ার নাম কি, এমনকি কোন দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

**** ঈদ - সমাচার ****

লিখেছেন ওমেরা, ১৮ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৫২



ঈদ মানে হাসি, খুশী,আনন্দ, কিন্ত এবারও আমার ঈদ মনে হয় নিরানন্দ ভাবেই কেটে গেল গত ১৬টা ঈদের মতই।তবু আলহামদুল্লিলাহ ! ঈদে আমার পরনের নতুন কাপড় ছিল, ঘরে নানা ধরনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×