সালটা ১৯৭২। বিশ্ব তখন দুই মেরুতে বিভক্ত। শীতল যুদ্ধের মধ্যগগণ। একদিকে মহা পরাক্রমশালী বিশাল সোভিয়েৎ ইউনিয়ন, অপরদিকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখানো উদিত সুপার পাওয়ার আমেরিকা। কি-রাজনীতি, কি অর্থনীতি, কি সংস্কৃতি কি খেলাধুলা; সব ক্ষেত্রেই উত্তেজনা টান-টান। কেহ কারে নাহি ছাড়ে...
স্বভাবতই ক্রীড়া ক্ষেত্রেও দারুন প্রতিদন্দ্বিতা এই দুই পরাশক্তির। অলিম্পিকে সর্বোচ্চ স্বর্ণপদক একবার এদিকে, তো আরেকবার ওদিকে। তবে একটা খেলাতেই দারুন পিছিয়ে ছিল আমেরিকা। সেইটা হল মাইন্ড গেম, চেস। সেই বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে ড.এমানুয়েল লস্কর-এর কাছথেকে বিশ্বসেরার টাইটেলটা ছিনিয়ে নিয়েছিল রুশ আলেকজান্ডার আলেখিন, তারপর থেকে অদ্যবধি সোভিয়েৎ চেস সম্রাজ্যে কেউ আঘাত হানতে পারে নি। আর এই শ্রেষ্ঠত্বকেই কি-না চ্যালেঞ্জ করছে ম্যানহাটনের ফুটপাতে খেলা কোথাকার এক উগ্র মেজাজী, একরোখা, জেদি, গোঁয়ার, রোগা-লিকলিকে এক মার্কিন ছোঁড়া!
ব্যাপারটা আঁতে ঘা লাগার মতই। রাজ্যের তাবৎ দাবা রথী-মহারথীরা দারুন উদ্বিগ্ন, চারিদিকে আলোচনা, কিভাবে ঠেকানো যায় এই বেয়াড়া প্রতিভাকে!
কিন্তু ফিশারকে খেলাতে রাজি করানোটাই ছিল একটা অসাধ্য সাধন। প্রতি মুহুর্তে নিত্য-নতুন দাবি জুড়ে দিচ্ছিলেন আয়োজকদের সামনে। কোন কোনটা আবার নেহাৎ-ই মামাবাড়ির আবদার। যেমন পছন্দের চেস-সেট ছাড়া খেলবো না...ইত্যাদি। যাক, অবশেষে তাকে বশ মানানো গেল। ফিশার ছিল বিশ্বচাম্পিয়ন বরিস স্প্যাসকি'র চ্যালেঞ্জার। একজন নিপাট ভদ্রলোক। অপরদিকে ফিশারের আচরন ছিল এক্কেবারে 'প্রবলেম চাইল্ড'!
যা হোক, খেলা শুরু হল, ভেন্যু আইসল্যান্ডের মনোরম রেইকযাভিক,
এই হল রবার্ট জেমস ফিশার, (ববি)। প্রচন্ড মেধাবি এই আমেরিকান দাবারু'র তার সমগ্র চেস ক্যারিয়েরেই একই রকম ঐজ্জল্য ছড়িয়েছেন। তার চেস ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা বোধকরি আর শেষ করা সম্ভব হবে না। নেশাদার দাবারু হওয়ার কারণে বার বছর বয়সেই স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়ে যান। শৈশবথেকেই ম্যানহাটনের একটা চেস ক্লাবের পরিচিত মুখ ফিশার। কিছু অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারি ছিলেন ফিশার। তিনি ছিলেন শ্রুতিধর। একবার তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিলেন আয়ারল্যান্ডে। রিসিভ করল বন্ধুর মেয়ে। পেঁচানো আইরিশ একসেন্টে মেয়ে কি বলল, কিছুই ঠাহর করতে পারলেন না। পরে বন্ধু যখন জিজ্ঞেস করল, আমার মেয়ে কি বলেছিল, উত্তরে ফিশার বলল, কি বলেছিল, তা তো বুঝি নি, তবে আমি কেবল যা শুনলাম, তা হল এই; বলে হুবহু মেয়ের কথাটা নকল করে বলে ফেললেন!! তার আই.কিউ. স্কোর ছিল ১৮০, আইন্সটাইনের থেকেও বেশি!
ববি সাফল্য পেয়েছেন যত, দাবা-কে দিয়েছেন তারও ঢের বেশি। প্রাচীন রাজা-রাজড়াদের খেলা দাবা থেকে একসময় দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কেবলমাত্র একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল খেলাটা। ববি প্রথম প্রজন্মের অন্যতম একজন, যে কি-না ব্যাতিক্রমী সব চেস থিউরি প্রয়োগ করে, নিত্য-নতুন স্টাইলে খেলে প্রথম দর্শকদের আকৃষ্ট করেন। বটভিন্নিক-স্মাইসলভ-পেত্রোশিয়ানদের সময়ের 'ঘুমপাড়ানি' খেলা তাল-ফিশার-স্প্যাসকিদের যুগে চিত্তাকর্ষক একটা খেলায় পরিণত হল। নিখুঁত হিসাব, অসাধরণ অনুমানশক্তি, সম্মোহনী ক্ষমতা; আসলে ফিশারের খেলার মাঝে ছিল এক অন্যরকম সৌন্দর্য।
অথচ ব্যাক্তিগত জীবনে ইতিহাসের এই অন্যতম চেস শিল্পী শুধুমাত্র নিজের একগুঁয়েমির জন্যই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অবস্থায় অসময়েই তার ক্যারিয়েরের ইতি টানেন। ১৯৭৫-এ তার প্রতিপক্ষ ছিল আনাতলি কারপভ। ফিশার খেলতে রাজি হলেন বটে, তবে একগাদা বাল্যখিল শর্ত জুড়ে দেন আবারও। ফিদে কর্তৃপক্ষ ততদিনে তার উপর দারুন রুষ্ট। এরপরও কিছু দাবী মেনে নিলেন, যেমন, ম্যাচে প্রথম যে পক্ষ প্রথম ১০টা খেলা জয়লাভ করবে, তাকেই বিজয়ী ঘোষনা করা হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, এভাবে চলতে চলতে প্রথম ৩৬টা খেলাতেও যদি ফলাফল না আসে, তখন যে এগিয়ে থাকবে, তাকে বিজয়ী করা হবে, এইখানেই বেঁকে বসলেন ফিশার। অপর দিকে কর্তৃপক্ষও অনড়। ফলাফল কারপভ বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বিশ্ব চাম্পিয়ন। অপর দিকে চেস ওয়ার্লড হারালো অন্যতম এক বিস্ময় প্রতিভাকে।
এরপর ফিশার যেমন দাবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, তেমনই লোকচক্ষুর সামনেথেকেও নিজেকে গুঁটিয়ে নেন। পরে অবশ্য আবার বিশ বছর পরে ১৯৯২-তে তাকে চেস বোর্ডে বসতে দেখা যায়, পুরনো প্রতিপক্ষ স্প্যাসকির বিপরীতে, সাবেক যুগোশ্লাভ ফেডারেশনের বেলগ্রেডে। বিপুল প্রাইজমানির সেই ম্যাচও ফিশার জিতে নেন, তবে অনেক বেশি খেসারত দিয়ে। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শত্রু রাষ্ট্রে খেলার দায়ে নাগরিকত্ব হারান যুক্তরাষ্ট্রের। কিছুদিন ফেরারী জীবন-যাপনের পর ২০০৪-এ মেয়াদউত্তীর্ণ পাসপোর্ট নিয়ে ধরা পরেন জাপানের নারিতা বিমান বন্দরে।
গত বছর, এই দিনে আয়ারল্যান্ডের একটা হাসপাতালে ৬৪ বছর বয়সে এই দাবা কিংবদন্তি চলে যান না ফেরার দেশে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

