somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মরণ: ববি ফিশার---+ ৫০তম পোষ্টের উৎসব...

১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সালটা ১৯৭২। বিশ্ব তখন দুই মেরুতে বিভক্ত। শীতল যুদ্ধের মধ্যগগণ। একদিকে মহা পরাক্রমশালী বিশাল সোভিয়েৎ ইউনিয়ন, অপরদিকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখানো উদিত সুপার পাওয়ার আমেরিকা। কি-রাজনীতি, কি অর্থনীতি, কি সংস্কৃতি কি খেলাধুলা; সব ক্ষেত্রেই উত্তেজনা টান-টান। কেহ কারে নাহি ছাড়ে...

স্বভাবতই ক্রীড়া ক্ষেত্রেও দারুন প্রতিদন্দ্বিতা এই দুই পরাশক্তির। অলিম্পিকে সর্বোচ্চ স্বর্ণপদক একবার এদিকে, তো আরেকবার ওদিকে। তবে একটা খেলাতেই দারুন পিছিয়ে ছিল আমেরিকা। সেইটা হল মাইন্ড গেম, চেস। সেই বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে ড.এমানুয়েল লস্কর-এর কাছথেকে বিশ্বসেরার টাইটেলটা ছিনিয়ে নিয়েছিল রুশ আলেকজান্ডার আলেখিন, তারপর থেকে অদ্যবধি সোভিয়েৎ চেস সম্রাজ্যে কেউ আঘাত হানতে পারে নি। আর এই শ্রেষ্ঠত্বকেই কি-না চ্যালেঞ্জ করছে ম্যানহাটনের ফুটপাতে খেলা কোথাকার এক উগ্র মেজাজী, একরোখা, জেদি, গোঁয়ার, রোগা-লিকলিকে এক মার্কিন ছোঁড়া!

ব্যাপারটা আঁতে ঘা লাগার মতই। রাজ্যের তাবৎ দাবা রথী-মহারথীরা দারুন উদ্বিগ্ন, চারিদিকে আলোচনা, কিভাবে ঠেকানো যায় এই বেয়াড়া প্রতিভাকে! তৎকালিন সোভিয়েৎ চেস স্পোর্টস কমিটির প্রধান ভিক্টর বাতুরিনস্কি'র কথায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়, "তখন সোভিয়েৎ নেতৃত্ব এবং ক্রিড়া সংশ্লিষ্ট সকলের কাছেই আলোচনার বিষয় ছিল মুলত একটাই, আর তা হল কিভাবে ফিশারকে বিশ্ব চাম্পিয়ন হওয়া থেকে বিরত রাখা যায়"।

কিন্তু ফিশারকে খেলাতে রাজি করানোটাই ছিল একটা অসাধ্য সাধন। প্রতি মুহুর্তে নিত্য-নতুন দাবি জুড়ে দিচ্ছিলেন আয়োজকদের সামনে। কোন কোনটা আবার নেহাৎ-ই মামাবাড়ির আবদার। যেমন পছন্দের চেস-সেট ছাড়া খেলবো না...ইত্যাদি। যাক, অবশেষে তাকে বশ মানানো গেল। ফিশার ছিল বিশ্বচাম্পিয়ন বরিস স্প্যাসকি'র চ্যালেঞ্জার। একজন নিপাট ভদ্রলোক। অপরদিকে ফিশারের আচরন ছিল এক্কেবারে 'প্রবলেম চাইল্ড'!
যা হোক, খেলা শুরু হল, ভেন্যু আইসল্যান্ডের মনোরম রেইকযাভিক, অঘটন কিছু ঘটেনি, প্রথম ম্যাচ স্প্যাসকি জিতে সকলকে একটু স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিলেন। দ্বিতীয় ম্যাচে আবার গন্ডগোল! টুর্ণামেন্ট হলে স্থাপিত টিভি ক্যামেরাতে ফিশারের অস্বস্তি। একগুঁয়ে ফিশার আর সেদিন খেললই না। কর্তৃপক্ষও এবার কঠোর, ফলাফল স্প্যাসকি পেলেন ওয়াকওভার। ম্যাচে স্প্যাসকি'র ২-০ লীড। তৃতীয় ম্যাচেও ফিশার তার জিদে অটল! বাধ্য হয়ে 'ভদ্রলোক' স্প্যাসকি, ফিশারের দাবী মেনে নিতে আয়োজকদের অনুরোধ জানালেন। এইবার স্বরুপে দেখা গেল ফিশারকে। ঘুরে দাঁড়ালেন সিরিজে। পরের ম্যাচ ড্র। তার পরের দুটো খেলা আবার জিতে নিল ফিশার। আর পেছনে তাকাতে হয়নি। দুর্দান্ত খেলে ২-০তে পিছিয়ে পরেও জিতে নিলেন বিশ্বচাম্পিয়নের খেতাব। রচিত হল নতুন এক ইতিহাসের। টানা সাত দশক রাজত্বের পর পতন হল সোভিয়েৎ চেস সম্রাজ্যের।

এই হল রবার্ট জেমস ফিশার, (ববি)। প্রচন্ড মেধাবি এই আমেরিকান দাবারু'র তার সমগ্র চেস ক্যারিয়েরেই একই রকম ঐজ্জল্য ছড়িয়েছেন। তার চেস ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা বোধকরি আর শেষ করা সম্ভব হবে না। নেশাদার দাবারু হওয়ার কারণে বার বছর বয়সেই স্কুল থেকে ড্রপ আউট হয়ে যান। শৈশবথেকেই ম্যানহাটনের একটা চেস ক্লাবের পরিচিত মুখ ফিশার। কিছু অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারি ছিলেন ফিশার। তিনি ছিলেন শ্রুতিধর। একবার তার এক বন্ধুকে ফোন করেছিলেন আয়ারল্যান্ডে। রিসিভ করল বন্ধুর মেয়ে। পেঁচানো আইরিশ একসেন্টে মেয়ে কি বলল, কিছুই ঠাহর করতে পারলেন না। পরে বন্ধু যখন জিজ্ঞেস করল, আমার মেয়ে কি বলেছিল, উত্তরে ফিশার বলল, কি বলেছিল, তা তো বুঝি নি, তবে আমি কেবল যা শুনলাম, তা হল এই; বলে হুবহু মেয়ের কথাটা নকল করে বলে ফেললেন!! তার আই.কিউ. স্কোর ছিল ১৮০, আইন্সটাইনের থেকেও বেশি!

ববি সাফল্য পেয়েছেন যত, দাবা-কে দিয়েছেন তারও ঢের বেশি। প্রাচীন রাজা-রাজড়াদের খেলা দাবা থেকে একসময় দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কেবলমাত্র একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল খেলাটা। ববি প্রথম প্রজন্মের অন্যতম একজন, যে কি-না ব্যাতিক্রমী সব চেস থিউরি প্রয়োগ করে, নিত্য-নতুন স্টাইলে খেলে প্রথম দর্শকদের আকৃষ্ট করেন। বটভিন্নিক-স্মাইসলভ-পেত্রোশিয়ানদের সময়ের 'ঘুমপাড়ানি' খেলা তাল-ফিশার-স্প্যাসকিদের যুগে চিত্তাকর্ষক একটা খেলায় পরিণত হল। নিখুঁত হিসাব, অসাধরণ অনুমানশক্তি, সম্মোহনী ক্ষমতা; আসলে ফিশারের খেলার মাঝে ছিল এক অন্যরকম সৌন্দর্য।

অথচ ব্যাক্তিগত জীবনে ইতিহাসের এই অন্যতম চেস শিল্পী শুধুমাত্র নিজের একগুঁয়েমির জন্যই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অবস্থায় অসময়েই তার ক্যারিয়েরের ইতি টানেন। ১৯৭৫-এ তার প্রতিপক্ষ ছিল আনাতলি কারপভ। ফিশার খেলতে রাজি হলেন বটে, তবে একগাদা বাল্যখিল শর্ত জুড়ে দেন আবারও। ফিদে কর্তৃপক্ষ ততদিনে তার উপর দারুন রুষ্ট। এরপরও কিছু দাবী মেনে নিলেন, যেমন, ম্যাচে প্রথম যে পক্ষ প্রথম ১০টা খেলা জয়লাভ করবে, তাকেই বিজয়ী ঘোষনা করা হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, এভাবে চলতে চলতে প্রথম ৩৬টা খেলাতেও যদি ফলাফল না আসে, তখন যে এগিয়ে থাকবে, তাকে বিজয়ী করা হবে, এইখানেই বেঁকে বসলেন ফিশার। অপর দিকে কর্তৃপক্ষও অনড়। ফলাফল কারপভ বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় বিশ্ব চাম্পিয়ন। অপর দিকে চেস ওয়ার্লড হারালো অন্যতম এক বিস্ময় প্রতিভাকে।

এরপর ফিশার যেমন দাবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, তেমনই লোকচক্ষুর সামনেথেকেও নিজেকে গুঁটিয়ে নেন। পরে অবশ্য আবার বিশ বছর পরে ১৯৯২-তে তাকে চেস বোর্ডে বসতে দেখা যায়, পুরনো প্রতিপক্ষ স্প্যাসকির বিপরীতে, সাবেক যুগোশ্লাভ ফেডারেশনের বেলগ্রেডে। বিপুল প্রাইজমানির সেই ম্যাচও ফিশার জিতে নেন, তবে অনেক বেশি খেসারত দিয়ে। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শত্রু রাষ্ট্রে খেলার দায়ে নাগরিকত্ব হারান যুক্তরাষ্ট্রের। কিছুদিন ফেরারী জীবন-যাপনের পর ২০০৪-এ মেয়াদউত্তীর্ণ পাসপোর্ট নিয়ে ধরা পরেন জাপানের নারিতা বিমান বন্দরে।

গত বছর, এই দিনে আয়ারল্যান্ডের একটা হাসপাতালে ৬৪ বছর বয়সে এই দাবা কিংবদন্তি চলে যান না ফেরার দেশে...
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ১:০৯
১৮টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×