আরেকটি হাস্যকর কাজ ছিল বৈধ অপ্রদর্শিত অর্থকে বৈধ করার চেষ্টা। আদতে এটি আসলে কালো টাকা। যে টাকা অপ্রদর্শিত সেটি আর বৈধ থাকে না। আর যারা এই সুযোগটি নিয়েছিলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কি পরীক্ষা করে দেখেছে অর্থ কোথা থেকে এসেছে। বৈধ আয় নাকি চোরাচালান বা মাদক বিক্রির টাকা?
এটা ঠিক যে, অভিধানে কালো টাকা বা ব্লাক মানি বলতে কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। ইন্টারনেটে বহুল ব্যবহৃত ও নির্ভরযোগ্য এনসাইক্লোপেডিয়া উইকিপেডিয়ায়ও পাওয়া গেলো না কালো টাকার কোনা স্বীকৃতি। কালো বাজার আছে, কালো টাকা নাই। বরং আছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বা 'ইনফরমাল ইকনমি' ও 'আন্ডাগ্রাউন্ড ইকনমি' শব্দগুলি। এই শব্দগুলোর ব্যবহারও কিন্তু খুব বেশি দিন হয়নি শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী কেইথ হার্ট সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালে ঘানার উপর এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শব্দগুলো ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৭২ সাল থেকে এই শব্দগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা শুরু করে। তবে বাংলাদেশে কালো টাকাই বহুল ব্যবহৃত।
কালো টাকার সংজ্ঞা: অর্থনীতিবিদরা কখনোই কালো টাকা নিয়ে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা দিতে পারেননি । সাধারণ ভাবে বলা হয় সব ধরণের অনিবন্ধিত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকেই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। আরেক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানিক অর্থনীতি হচ্ছে বৈধ ও অবৈধ সেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যা আনুষ্ঠানিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব করার সময় চিহ্নিত করা সম্ভব হয়না। সাধারণত যে সকল কর্মকান্ড করের আওতায় থাকলেও তা মানা হয়না তাকেও কালো অর্থনীতি বলে। এমনকি বৈধ আয় যখন করের আওতার বাইরে রাখা হয় তখন তাও অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সংজ্ঞায় আনা হয়। চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, নারী ব্যবসা-এগুলোই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী অনানুষ্ঠানিক অর্থের বড় উৎস।
কালো টাকা, বাংলাদেশে: বাংলাদেশে কালো টাকা কতো? এর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ৯০ এর দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাদরেল রেজা কালো টাকা নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছিলেন। আর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের দেওয়া কালো টাকার হিসাব সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। এর মাঝে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. আবদুল গফুর চোরাচালানের উপর বড় ধরণের সমীক্ষা পরিচালনা করেছিলেন। সেটিও ৯০ দশকের শুরুর ঘটনা। কয়েকবছর আগে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান চোরাচালান নিয়ে আরেকটি সমীক্ষা করেছিলেন। এর বাইরে অনানুষ্ঠানিক বা আন্ডরগ্রাউন্ড অর্থনীতি নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি বাংলাদেশে। যদিও সব পই বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশে কালোটাকার অস্তিত্ব যথেষ্ট প্রবল। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. আবুল বারকাত মনে করেন, বছরে কালো টাকা তৈরি হয় ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো। তার হিসাবে, দেশে বর্তমানে ১৭৫ হাজার কোটি কালো টাকা আছে।
কালো টাকার সন্ধানে: কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ নিয়ে একমাত্র রেফারেন্স হচ্ছে 'সাইজ অ্যান্ড মেজারমেন্ট অব দ্য ইনফরমাল ইকনমি ইন ১১০ কান্ট্রিজ অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড' নামের একটি প্রকাশনা। তাও আবার ১৯৯৯/২০০০ অর্থবছরের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনপি) অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ এই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। অষ্ট্রিয়ায় জোহানস কেপলার ইউনিভার্সিটি অব লিনজ এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নেইডার এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করেন বিশ্বব্যাংকেরই 'ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করার ব্যয়' নামের প্রকল্পের অংশ হিসাবে। ২০০২ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এখন পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির উপরেই এটাই ভাল, নির্ভরযোগ্য ও সবচেয়ে ব্যবহৃত সমীক্ষা।
কার কতো কালো টাকা: গড়ে সবচেয়ে বেশি অনানুষ্ঠানিক অর্থ আফ্রিকার দেশগুলোর। সাব-সাহারান আফ্রিকার মোট কালো টাকা তাদের মোট দেশজ উৎপাদন উৎপাদন বা জিএনপির ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলো। তাদের কালো টাকা জিএনপির সাড়ে ৪১ শতাংশ। ইউরোপ ও মধ্য ইউরোপে কালো টাকা ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দণি এশিয়ায় সামান্য কম, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। মধ্য প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কালো টাকা সাড়ে ২৭ শতাংশ, পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিকে কালো টাকার পরিমান ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ধনী দেশগুলো মিলে গঠিত ওইসিডির কালো টাকা তাদের মোট জিএনপির ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

