somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, আইএমএফকে না বলুন

১৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ দুপুর ১২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
২০০৪-০৫ অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার সময় পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী ছিলেন শওকত আজিজ। শওকত আজিজ তার বাজেট বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে বাজেটের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) ‘গুড বাই’ জানানোর মধ্য দিয়ে বাজেটে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।’ বক্তৃতায়ই এর কারণ হিসেবে তিনি দারিদ্র বিমোচন প্রবৃদ্ধি সুবিধার (পিআরজিএফ) আওতায় ঋণ কর্মসূচি থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারার কথা বলেছিলেন।
২.
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ একদমই পছন্দ করতো না। তাঁদের পছন্দের মানুষ ছিল এম সাইফুর রহমান। মনে আছে, গত জোট সরকারের শুরুতে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে আমীর খসরু মাহমুদকে অর্থমন্ত্রী করার একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একজন সাংবাদিক হিসেবে দেখেছি বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তাযুক্ত কপালের ভাঁজ। তারা চাননি অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সাইফুর রহমান চলে যাক। কারণ সাইফুর রহমান দাতাদের সব কথাই শুনতেন। আর এস এ এম এস কিবরিয়া ৫ বছরে আইএমএফ থেকে একটা ডলারও ঋণ নেননি। এর পরিবর্তে তিনি শেষ দিকে এসে রিজার্ভ বাড়াতে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তিনি দাতাদের চাপিয়ে দেওয়া পিআরএসপি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভারতের মতো বলতে পারেননি যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আছে, এটা মানলে মানো, তা না হলে চলে যাও।
৩.
অনেক খোঁজাখুজি করেও আইএমএফের সাফল্য তেমন কিছু পাওয়া গেল না। সর্বশেষ ব্যর্থতা হচ্ছে বিশ্বমন্দাকে বুঝতে না পারা। বরং তারা বলেছিল, মন্দা হলেও তা হবে নিয়ন্ত্রণসাধ্য। ১৯৯৭-৯৮ সালের পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সমস্যার সামাধানেও আইএমএফ ছিল চরম ব্যর্থ। আর ব্যর্থতার চরম উদাহরণ হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও কেনিয়া। আইএমএফের নীতি মেনে এই দুটি দেশ চরম বিপদে পড়েছিল। উইকিপিডিয়ায় ঢুকলে খুব ভাল একটা পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। আর সেটি হচ্ছে সামরিক একনায়কতন্ত্রের প্রতি তাদের পক্ষপাত। সামরিক একনায়কতন্ত্র থাকলেই তাদের ঋণ দেওয়ার পরিমান বেড়ে যায়।
৪.
আইএমএফ সম্বন্ধে জানতে হলে পড়তে পারেন জোসেফ স্টিগলিজের ‘গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ডিজকন্টেন্ট’ বইটি। তিনি একবার ঢাকায় এসেছিলেন। শুনতে গিয়েছিলাম তার বক্তৃতা। তীব্র সমালোচনা করেছিলেন আইএমএফের কর্মপদ্ধতির।
আমি একটু ব্যাখ্যা দেই। আইএমএফ বাংলাদেশ কার্যালয় হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা অংশ তারা দখল করে রেখেছে। একজন কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ থাকেন। আর হাতে গোনা কয়েকজন সহাকারী। স্থায়ী কর্মকর্তা বলতে তাদের আর কেউ নেই। অথচ এই কার্যালয় থেকেই ঠিক হয় বাংলাদেশের মুদ্রা নীতি। মুদ্রা সরবরাহ কত হবে, বাজেট ঘাটতি কত শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে, রাজস্ব নীতি কি হবে-মোটামুটি সব কিছুই ঠিক করে দেয় তারা। কিভাবে তারা ঠিক করে? বছরে আইএমএফের একটা মিশন আসে ওয়াশিংটন থেকে বাজেটের আগে। নেতৃত্বে থাকেন মধ্যম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। তারা ২ সপ্তাহ ঢাকায় থাকে, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সচিবের সাথে বৈঠক করে আর ওয়াশিংটন ফিরে গিয়ে লম্বা একটা রিপোর্ট দেয়। আর সেখানেই বলা থাকে কী করতে হবে, কী করা যাবে না। মাত্র ২ সপ্তাহে ঠিক হয় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি। আর ঠিক করে দেয় কয়েকজন দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা।
৫.
সামিষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলার এখন একচেটিয়া অধিকার আইএমএফের। এটাই দাতাদের মধ্যে বোঝাপড়া। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির নীতি নিয়ে কথা বলবে একমাত্র আইএমএফ এবং আর বিশ্বব্যাংক, এডিবি সহ সবাই এটা মেনে নেবে। এটা একটা বড় ফাঁদ। এই ফাঁদে পা দিতে হচ্ছে অনেককেই। কেননা, আইএমএফের কথা মেনে না চললে অন্যরা ঋণ সহায়তা দেবে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেককেই আইএমএফের ঋণ নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ একটা দেশ ঋণ পাওয়ার যোগ্য কীনা নেই সার্টিফিকেট দেয় আইএমএফ, আর বাকিরা তা মেনে নেয়।
৬.
আবার আসছে আইএমএফের ফাঁদ। এবারের ফাঁদের নাম বিশ্বমন্দা। জি-২০ বৈঠকে আইএমএফের জন্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের একটা তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে, এখান থেকে ঋণ দেওয়া হবে তিগ্রস্ত দেশগুলোকে।
আমাদের মন্ত্রী ও আমলাদেরও চোখে লোভের লালসা ফুটে উঠেছে। মনে হচ্ছে আবারো বাংলাদেশ আইএমএফের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে। আইএমএফের ঋণ মানেই তাদের কথা অনুযায়ী নীতি তৈরি করা। আইএমএফ একবারে সব অর্থ দেওয়া না। একটা কিস্তি দেয়, তারপর দেখে কথা শোনা হচ্ছে কিনা। অর্থমন্ত্রীর আনুগত্যে সস্তুষ্ট হলে দ্বিতীয় কিস্তি। শেষ পিআরজিএফ ঋণ ছিল সাত কিস্তির।
অর্থমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ, দয়া করে নিজের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারাবেন না। অর্থনৈতিক নীতি আপনিই নিন, আইএমএফকে এ থেকে দূরে রাখুন। ভারত বলেছে, তারা আইএমএফের ঋণ নেবে না। আরও বড় সংকটে থাকা শ্রীলংকাও একই কথা বলেছে। তাহলে আমরা বলতে পারবো না কেন?
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের একটি কথা মনে করিয়ে দেই। ‘আমরা যখন বলি সবকিছু দাতানির্ভর হয়ে গেছে তার মানে এই নয় যে, দাতারা অনেক বেশি ক্ষমতা অর্জন করেছে। বরং আমাদের দেউলিয়াত্বের জন্যই এমনটি ঘটেছে।’
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৭
১২৬টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×