somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাজেট নিয়ে কয়েকটা কথা

১৬ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকাল বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন, টক শোতে টানা আলোচনা হয়। নতুন অনুসঙ্গ ব্লগ, সেখানেও কম বেশি লেখালেখি হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ কম নয় বাজেট নিয়ে। তারাও বুঝতে চায় বাজেট কি প্রভাব ফেলবে জীবনে।
এবারের বাজেট বক্তৃতা ছিল অতি দীর্ঘ। এক সময় বাজেট বক্তৃতা ছিল দুই পর্বের। গত কয়েক বছর ধরে ক্রমশ বাজেট বক্তৃতার আকার ছোট হয়ে আসছিল। বক্তৃতাও একপর্বে সীমিত হয়ে আসে। সেখান থেকে আবার দীর্ঘ বক্তৃতার সময়ে ফিরে গেলেন অর্থমন্ত্রী। ১০৮ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অনেক কথা বলেছেন। বিস্তারিতই বলেছেন। অনেকগুলো নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন। পুরাতন প্রস্তাবের কথাও বলেছেন। অনেক বিষয় নিয়ে কথা হলেও এখন মূলত বাজেট আলোচনা কয়েকটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া নিয়ে। এরপরে আলোচনা হচ্ছে বাজেটের উচ্চাভিলাষ ও এর বাস্তবায়ন সমতা নিয়ে। সবশেষ বিষয় বাজেট আগেভাগেই ফাঁস। এই তিনটি বিষয়ের ফাঁদে পড়ে বাজেট নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা আর তেমন হচ্ছে না। তবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি নিয়েও কিছু আলোচনা অবশ্য হচ্ছে। এর সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এ নিয়ে সন্দিহান মানুষের সংখ্যাই বেশি।

কালো টাকা সাদা: কালো টাকা সাদা করা নিয়ে এতো বেশি আলোচনার সুযোগ প্রখম তৈরি করে দিয়েছিলেন সাবেক জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার কয়েকদিন আগে থেকে তিনি কালো টাকা সাদা না করার বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। প্রচার মাধ্যমকে সাাৎকার দিয়ে দিনের পর দিন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না বাড়ানোর কথা বলেছিলেন। তিনি কালো টাকাকে ‘হারাম’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। বাজেট পেশের দু’দিন আগ পর্যন্ত তার এসব বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে। কিন্তু এর পর নিজেই বাজেটে কালো টাকাকে স্বীকৃতি দিয়ে গতানুগতিক বাজেট আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
তারপর থেকেই কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি থেকে গেছে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। যেমন হলো এবারও। অর্থনীতির সংজ্ঞায় যেমন খারাপ অর্থ ভাল অর্থকে দূরে সরিয়ে ফেলে তেমনি কালো অর্থ এবার বাজেটকেই দূরে সরিয়ে রাখছে।
ভারতে সর্বশেষ ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আর তাতে ৩৩ হাজার কোটি রুপি সাদা হয় এবং ভারত সরকার কর হিসেবে পায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি রুপি। মাত্র ৯ মাসে সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩১ জন এই সুযোগ নিয়েছিল সে সময়। ভারতে এর পর আর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়নি। অথচ বাংলাদেশে প্রায় সরকারই কালো টাকাকে সাদা করতে সুযোগ দেওয়ার জন্য সবসময়ই অতি আগ্রহী। রাজনীতিতে আপস করতেই উৎসাহী অর্থমন্ত্রীরা। অথচ বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে বার বার এই সুযোগ দেওয়া হলেও কালো টাকার সাদা হয়েছে খুব সামান্যই। কালো টাকার বড় অংশই থেকে গেছে অপ্রদর্শিত অবস্থায়। অর্থনীতিবিদরা ঠিকই জানেন, কালো টাকা সাদা করা নয়, বরং কালো টাকার উৎস বন্ধ করাই মূল কাজ। কেবল অর্থমন্ত্রীরাই এটা মানেন না।

বাজেট ফাঁস: এবার বাজেট ফাঁস হয়েছে। প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখার মতো করে বললে বলতে হয় যে, রাজস্ব অংশটুকু পুরোপুরি ‘কমন’ পরেছে। অর্থাৎ বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশই আগে প্রকাশ হয়ে গেছে। আর এই গোপন তথ্য জেনে চুটিয়ে ব্যবসা করেছে গাড়ি ব্যবসায়ীরা। শুল্ক বাড়লো বলে এখন তারা কান্নাকাটি করছেন, কিন্তু আগাম তথ্য জেনে কত ব্যবসা করলেন সে তথ্য আর দিচ্ছেন না।
অর্থমন্ত্রী বাজেট ফাঁসের দায়িত্ব অনেকটাই নিজের কাধে নিয়েছেন। বিষয়টিতে অনেকেই হয়তো মা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। তবে এর অন্য এক ইতিহাস নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা তথ্যটা প্রথম দেন। সামহোয়ারইন ব্লগে বাঙ্গাল একজন ব্লগার সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করলেন। ভদ্রলোকের নাম এডওয়ার্ড জন ডালটন। ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৯৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি বৃটেনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে যখন তিনি বাজেট বক্তৃতা শেষ করেননি, তার আগেই একটি পত্রিকার সান্ধ্যকালীন সংস্করণে বাজেট প্রস্তাবগুলো ছাপা হয়ে যায়। তখন শেয়ার বাজারেও লেনদেন চলছিল। এই বাজেট ফাঁসের দায় দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করতে হয়েছিল ডালটনকে।

পাবলিক মানি টু প্রাইভেট পকেট: এই উপ-শিরোনামটি ধার করা ব্লগ থেকে। সামওয়ারইনের ব্লগার দিনমজুর পিপিপি নিয়ে লিখতে গিয়ে এভাবেই পিপিপির অর্থ বের করেছেন। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ বেসরকারি খাতের পকেটেই কেবল যাবে, সাধারণ মানুষ লাভবান হবে না-এমনটিও মনে করেন অনেকে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেও পিপিপি নিয়ে একটি অবস্থানপত্র বের করেছে। পিপিপি বুঝাতে গিয়ে তারা দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রতীকি একটি ছবি দিয়েছে। দুই হাতের করমর্দনের একটি ছবি। একটি হাত সরকারের, আরেকটি বেসরকারি হাত। কোনো বর্ণবাদের গন্ধ না ছড়িয়েই বলা যায় এর একটি হাতের রং একটু বেশিই কালো, আরেকটি ফর্সা। এটা প্রতীকি ছবি, কিন্তু কিসের। কালো হাতটা কার? শেষ পর্যন্ত কি পিপিপি মানে আসলেই ‘পাবলিক মানি টু প্রাইভেট পকেট’? বলে রাখা ভাল, ভৌত অবকাঠামোর কয়েকটি খাতে কালো টাকা সাদা করা যাবে, আবার সেগুলো থাকছে পিপিপির আওতায়ও।
অতীতেও অনেক ভাল উদ্যোগ নষ্ট হয়েছে এমন উদাহরণ আছে অনেক। বিভিন্ন দেশে যেমন সফল পিপিপির উদাহরণ আছে, ব্যর্থ উদাহরণও রয়েছে। এটাকে সফল করতে সবাই এগিয়ে আসবে নাকি বেসরকারি খাতের ল্য থাকবে কিছু অর্থ পকেটস্থ করার। আর আমলারাই বা কিভাবে সক্রিয় থাকবে সেটাও একটা দেখার বিষয় হবে।

বাজেট বাস্তবায়ন: সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বাজেটের আগে এক টক শোতে বলেছিলেন বাজেট বাস্তবায়ন নীতি প্রয়োজন। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, বাজেট তৈরির তুলনায় বাস্তবায়ন কঠিন। এই কঠিন কাজটির দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। এ এম এ মুহিতের ভাষায়, ‘আমাদের সরকার এ চ্যালেঞ্জ নিয়েছে।’
তিনি বলেছেন, অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই বাস্তবায়ন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর সেই উদ্যোগের একটা অংশ হচ্ছে গণখাতে ক্রয় বিধিমালা ২০০৮ সংশোধন। এ নিয়ে দাতাদের উদ্বেগ রয়েছে। সংশোধন মানে যদি হয় কেবল ঠিকাদারদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা শিথিল তাহলে শঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
শেষ বিচারে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যায় কম। কেবল দেখা প্রয়োজন তা করতে গিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা যাতে নষ্ট না হয়। কেননা বাজেট ঘাটতি নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ল্যমাত্রার মধ্যেই কম বেশি থাকবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি) বাস্তবায়ন করতে না পারাই এর প্রধান কারণ। তবে ঘাটতি অর্থায়নটাই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করে অর্থায়ন করলে বঞ্চিত হতে পারে বেসরকারি খাত। আবার বৈদেশিক উৎস থেকে বেশি করলে দায় অনেক কম হলেও শঙ্কা অন্যত্র। আবার আইএমএফের খপ্পরে পড়ার বিপদ রয়েছে। নীতির সার্বভৌমত্ব তাতে নষ্ট হয়।
দাতারা পছন্দ করবে না এমন কিছু প্রস্তাব এবারের বাজেটে রয়েছে। যেমন প্রস্তুত পণ্যের উপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ, বিলাস পণ্যের উপর সম্পূরক শুল্ক আরোপ, আবার পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় ফিরে যাওয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে কর অবকাশ সুবিধা আর থাকবে না ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, যা মূলত দাতাদের সুপারিশ। সুতরাং শেষ পর্যন্ত নীতির সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে, সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখে এই বাজেট কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবেন অর্থমন্ত্রী সেটাই মূল বিষয়।

বাজেট নিয়ে ব্লগের জন্য আলাদা করে লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সময়ই পাচ্ছি না। ফলে পত্রিকার জন্য লেখাটাই দিলাম। তবে এর সঙ্গে আমি তিনটি লেখা পড়ার অনুরোধ করছি।
১। বাঙ্গালের ব্যানানা বাংলাদেশ-৪ (কি চমেতকার দেখা গেল!)
২। দিনমজুরের বাজেটে পিপিপি :পাবলিক-মানি টু প্রাইভেট পকেট?- ১ম কিস্তি
বাজেটে পিপিপি :পাবলিক-মানি টু প্রাইভেট পকেট?- শেষ কিস্তি
৩। পাললিক মনের বাংলাদেশ। শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি। নির্লজ্জতার পাঠচক্র।

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৪:৪৪
২০টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×