somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... গাই ডি মোপাসাঁর ছোট গল্প - দি নেকলেস
মেয়েটি সাদামাটাভাবে জীবন যাপন করত, কেননা এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে ছিল খুবই অসুখী, যেন কোনো স্বর্গের দেবী নিঃস্ব হয়ে ভুল করে পৃথিবীতে চলে এসেছে। তাঁর এমন পরিবারে বিয়ে হয়েছে যেখানে রূপ, লাবণ্য ও সৌন্দর্যের জন্য না আছে কদর, না আছে মর্যাদা, শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেয়া, লালন-পালন করা, সংসার দেখাশুনা করাই যেন সবকিছু। মেয়েদের ক্ষেত্রে অকৃত্রিম কমনীয়তা, সহজাত লাবণ্য আর তুখোড় প্রজ্ঞাই কেবল দিতে পারে তাঁদের মর্যাদার পরিচয়, আর এ গুনগুলো একটি বস্তির মেয়েকেও দেশের সবচেয়ে সম্মানিত মহিলার সমতুল্য করে তুলতে পারে।

মেয়েটি নিঃসীম যন্ত্রণায় সবসময় কাতর হয়ে থাকত, ভাবত তাঁর জন্ম হয়েছিল বুঝি আভিজাত্য আর বিলাসিতায় জীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য। ঘরের দীন হীন অবস্থা, বিষণ্ণ দেয়াল, বিবর্ণ চেয়ার আর বিশ্রী পর্দাগুলোর জন্য সে যেন দুঃখে মরে যেত। এইসব বিষয়গুলো তাঁকে প্রতি নিয়ত যন্ত্রণা দিত, অপমানিত করত, যদিও তাঁর সম-মর্যাদার অনেক মেয়েই এ বিষয়ে আদৌ সচেতন ছিলেন না। লিটল ব্রিটনের মেয়েটি, যে তাঁর ছোট্ট বাড়িটায় কাজ করতে এসেছিল, ওর নানা গল্প তাঁর মনকে উসকে দিত হৃদয়-ভাঙা শত আক্ষেপ আর আশাহীন স্বপ্নে। সে কল্পনার জাল বুনত একটা শান্ত সুনিবিড় চিলেকোঠার; প্রাচ্যদেশীয় রঙিন, পশমি, কারুকার্য খচিত কাপড়ে ঢাকা তাঁর ঘরের দেয়াল, আসবাবপত্র; লম্বা লম্বা ব্রোঞ্জের ঝাড়বাতিতে আলোকিত ঘর; অতিথি অভ্যর্থনা আর খাবার টেবিলে পরিবেশনের জন্য বিশেষ পোশাক পরিহিত দুজন বড় মাপের খানসামা, যারা ঘুমোবে বড় বড় দুটি আরাম কেদারায়, পাশের চুল্লি থেকে আসা উষ্ণতায় যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরবে তাঁরা। মেয়েটি স্বপ্ন দেখত সুপ্রাচীন রেশমে সজ্জিত বড় একটা অতিথিশালার; সুন্দর সুন্দর ফার্নিচার আর অমূল্য সব অলঙ্কারে সজ্জিত ঘর; মনোমুগ্ধকর ও সুগন্ধীতে পূর্ণ ছোট ছোট অভ্যর্থনা ঘর যেখানে অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধব ও বিখ্যাত কিংবা অত্যন্ত কাঙ্খিত সব মানুষদের নিয়ে আয়োজন করা হবে ছোট ছোট পার্টি, যাদেরকে শ্রদ্ধা নিবেদন করলে অন্য সব মেয়েরা যেন হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে।

তিন দিনের ব্যবহৃত টেবিল-ক্লথে ঢাকা গোল-টেবিলে বসে যখন মেয়েটির স্বামী খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে স্যুপের বাটির ঢাকনা খুলতে খুলতে বলছিল, “আহা! স্কচ স্যুপ! এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে?”, মেয়েটি সেসময় তাঁর স্বামীর মুখোমুখী বসে স্বপ্নের জাল বুনছিল রুচিকর খাবারের, ঝলমলে রুপোর বাসন-কোসনের, দেয়াল জুড়ে সাজানো রেশমি কাপড়ের ক্যনাভাসে আঁকা প্রাচীন লোক-গাঁথা, মায়াময় অরণ্যের রূপকথার সব পাখি; সে কল্পনায় জমকালো পাত্রে সুস্বাদু সব খাবার পরিবেশন করছিল, গুন গুন করে গান গাইছিল, যেন কেউ ট্রাউট মাছের গোলাপি মাংস কিংবা তিতিরের ডানা খেতে খেতে রহস্যময় মিষ্টি হাসি নিয়ে তাঁর দিকে তাঁকিয়ে আছে।

মেয়েটির ভালো কোনো পোশাক নেই, গহনা নেই, নাহ! কিছুই নেই। অথচ সে এই জিনিসগুলোকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত; সে অনুভব করত, এ সবের জন্যই যেন তাঁকে বানানো হয়েছে। সে চাইত খুব সুখী হতে, চাইত ঈর্ষার পাত্রী হতে, অন্যের কাছে পরম আকাঙ্খিত, মনোহারিনী হয়ে থাকতে।

স্কুলে পড়াকালীন সময়ের পুরনো এক ধনী বান্ধবী ছিল মেয়েটির, যার বাড়িতে বেরানোর আমন্ত্রণ এলে সে নানা ছলে এড়িয়ে যেত, কেননা বাড়িতে ফিরে নিদারুণ মর্মপীড়ায় দগ্ধ হত সে। প্রচণ্ড দুঃখে, অনুতাপে, হতাশায় আর যন্ত্রণায় সে সারাটা দিন ফুঁপিয়ে কেঁদে চোখের জল ফেলত।
***

বড় একটা খাম হাতে নিয়ে, এক দিন সন্ধ্যায় তাঁর স্বামী জয়োল্লাস করতে করতে বাড়ি ফিরলেন।
“দেখো, কী নিয়ে এসেছি তোমার জন্য”, সে বলল।
মেয়েটি দ্রুত খাম ছিঁড়ে ছাপানো কার্ডখানা বের করল, সেখানে এই শব্দগুলো লেখা ছিল-
“শিক্ষামন্ত্রী ও মাদাম রামপোনিউ ১৮ জানুয়ারি, সোমবার সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ে মসিয়েঁ ও মাদাম লইজেল এর সদয় উপস্থিতি কামনা করছেন”।
মেয়েটির স্বামী ভেবেছিল সে উল্লাসে মেতে উঠবে, কিন্তু তার পরিবর্তে অনেকটা বিরক্তি নিয়ে দাওয়াত কার্ডটি টেবিলে ছুড়ে ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“এটা দিয়ে কি করতে বল আমাকে?”
“কেন, সোনা, আমি ভেবেছিলাম তুমি অনেক খুশি হবে। এত বড় আয়োজনে তুমি কখনো যাও নি। এটা পাওয়ার জন্য আমি প্রচণ্ড কষ্ট করেছি। প্রত্যেকেই এটা পেতে চেয়েছিল, কিন্তু এটা ছিল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য, অফিস সহকারীদের মধ্যে খুব অল্প কয়েক জনই এটা পেয়েছে। বিখ্যাত সব মানুষদের দেখা পাবে সেখানে তুমি”।

মেয়েটি তাঁর স্বামীর দিকে ক্রোধোন্মত্ত চোখে তাঁকিয়ে অধৈর্য্য নিয়ে বললেন,
“আর কী ভেবেছ তুমি, এই অনুষ্ঠানে আমাকে কী পরে যেতে হবে?”
সে এই ব্যপারটা নিয়ে কিছু ভাবে নি, তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“কেন, যে পোশাকটা পরে তুমি থিয়েটারে যাও। আমার কাছে ওটা দেখতে অনেক সুন্দর লাগে.......”

স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে সে চুপ হয়ে গেল, নিজেকে খুব বোকা ভাবতে ইচ্ছে করছিল তাঁর, কি বলবে বুঝতে পারছিল না সে। বড় বড় দুই ফোঁটা জল চোখের কোণ বেয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলল মুখের কোণের দিকে।
“কী হয়েছে তোমার? কী হয়েছে তোমার?”, তোতলাতে তোতলাতে বলল সে।

মেয়েটি তীব্র প্রচেষ্টায় তাঁর প্রচণ্ড দুঃখটাকে দমন করল, ভেজা গাল মুছে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“নাহ! কিছু হয় নি আমার। আমার তো শুধু পোশাক নেই, তাই পার্টিতে যেতে পারছি না। তুমি বরং কার্ডটি তোমার কোনো বন্ধুকে দিয়ে দাও, যার স্ত্রী সাজলে আমার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর দেখায়”।
কষ্টে লইজেলের হৃদয় ভেঙে গেল।

“এদিকে দেখো মাথিল্ডে”, সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “একটা মানানসই পোশাকের দাম কত পরবে, যা তুমি অন্য অনুষ্ঠানেও পরতে পারবে, খুব সাধারণ মানের একটা পোশাক?”।

মাথিল্ডে বেশ কয়েক সেকেন্ড ভাবল, হিসেব করে দেখল মূল্য কত হতে পারে, আর ভয়ে ভয়ে এও ভাবল অঙ্কটা বেশি হয়ে গেল কিনা, যেন হিসেবি কেরানি তা শোনার সাথে সাথেই অসম্মতি দিতে না পারে।
শেষ পর্যন্ত সে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে উত্তর দিল,
“আমি ঠিক জানি না, তবে মনে হয় চারশ ফ্রাঁতে হয়ে যাবে”।

লইজেলের মুখ কিছুটা মলিন হয়ে গেল, ঠিক এই পরিমান ফ্রাঁ সে জমিয়ে রেখেছিল একটা বন্দুক কেনার জন্য, ইচ্ছে ছিল আগামী গৃষ্মে তাঁর বন্ধুদের সাথে নাঁটেরে সমভূমিতে ছোট একটা শিকারে বের হবে, প্রত্যেক রবিবারে তাঁর বন্ধুরা সেখানে লার্ক পাখি শিকারে যায়।
তা সত্ত্বেও সে বলল, “ঠিক আছে, তোমাকে আমি চারশ ফ্রাঁ দেব। কিন্তু তোমাকে এই টাকাতেই খুব সুন্দর একটা পোশাক কিনতে হবে”।

পার্টির দিন এগিয়ে আসে, আর মাদাম লইজেলকে বিষণ্ণ, অস্থির ও উদ্বিগ্ন দেখায়। অবশ্য, তাঁর পোশাক তৈরী ছিল। এক সন্ধ্যায় তাঁর স্বামী জানতে চাইল,
“তোমার কি হয়েছে বলতো? গত তিন দিন ধরে তোমাকে খুব অস্বাভাবিক লাগছে”।
“আমার অবস্থা একদম যাচ্ছে-তাই, পরার মতো কোনো অলঙ্কার নেই, না আছে একটা হার”, মাথিল্ডে উত্তর দিল, “আমার দিকে কেউ তাঁকিয়েও দেখবে না। আমার বরং পার্টিতে না যাওয়াই ভালো”।
“ফুল পরতে পারো”, লইজেল বলল, “বছরের এই সময়টাতে ফুল দেখতে বেশ লাগে। দশ ফ্রাঁ দিয়ে তুমি দুই তিনটি চমৎকার গোলাপ পেয়ে যাবে”।
মাথিল্ডেকে বোঝানো গেল না।
“না...এত ধনী নারীদের মাঝে নিজেকে দরিদ্র হিসেবে দেখানো, এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু নেই”।
“তুমি কত বোকা!” বিষ্ময় নিয়ে তাঁর স্বামী বলল, “যাও, মাদাম ফরেস্টায়ের সাথে দেখা করে কিছু অলঙ্কার ধার চাও। তোমার সাথে তাঁর যে সম্পর্ক, তুমি ধার চাইলে সে না দিয়ে পারবে না”।
মাথিল্ডে আনন্দে প্রায় কেঁদে ফেলল।
“ঠিক বলেছ। আমি তো আগে কখনো ভেবে দেখি নি”।

পরের দিন সে তাঁর বান্ধবীর সাথে দেখা করে তাঁর সমস্যাটা জানালো।
মাদাম ফরেস্টায়ের তাঁর ড্রেসিং-টেবিলের কাছে গিয়ে বড় একটা বাক্স তুলে নিল, মাদাম লইজেলের কাছে এনে খুলে বলল, “বেছে নাও, বন্ধু”।
প্রথমে সে কিছু ব্রেসলেট দেখল, এরপর একটা মুক্তোর হার, নিপুণ হাতে তৈরী অপরূপ সুন্দর রত্নখচিত স্বর্ণের ভেনিসীয় ক্রুশ দেখল। অলঙ্কারগুলো পড়ে আয়নার সামনে নিজেকে মেলে ধরে দেখল কেমন মানায়, দ্বিধায় পড়ে গেল সে, না পারছিল ওগুলো রেখে দিতে, না ফিরিয়ে দিতে। অলঙ্কারগুলো রাখতে রাখতে জানতে চাইল,
“আর নেই এগুলো ছাড়া?”
“আছে তো। তুমি নিজেই দেখো না। আমি জানি না কোনটা তোমার সব চেয়ে বেশি পছন্দ হবে”।

মাথিল্ডে হঠাৎ কালো রেশমি কাপড়ে মুড়ান একটা বাক্সে চমৎকার একটা হীরের হার আবিষ্কার করল; হারটি পাওয়ার সুতীব্র আকাঙ্খায় তাঁর বুকে ধুক ধুক কাঁপন শুরু হল। সেটি তোলার সময় তাঁর হাত কাঁপছিল। হারটি গলায় জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে পুলকিত হয়ে উঠল সে।
এরপর, সে কিছুটা দ্বিধা আর ভয় নিয়ে জানতে চাইল,
“তুমি কি আমাকে এটি ধার দিতে পারবে, শুধু এটিই?”
“হ্যা, অবশ্যই”।

মাথিল্ডে খুশিতে তাঁর বান্ধবীর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে সজোড়ে আলিঙ্গন করল এবং তাঁর অলঙ্কারটি নিয়ে ফিরে এল।

পার্টির দিন চলে এল। মাদাম লইজেল সার্থক। উপস্থিত মেয়েদের মধ্যে সে সবচেয়ে সুশ্রী, রুচিশীল, মার্জিত, হাসি-খুশী আর আনন্দে উচ্ছ্বল। সকল পুরুষই তাঁর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে রইল, তাঁর নাম জানতে চাইল, আর তাঁর সাথে পরিচিত হতে চাইল। সব প্রতিমন্ত্রীই তাঁর সাথে নাচতে আগ্রহ দেখাল। মন্ত্রী তাঁকে লক্ষ্য করলেন।

মাথিল্ডে পরমানন্দে পাগলের মতো নাচলেন, মনের সুখে পান করলেন, কোন কিছুর জন্য ভাবনা নেই তাঁর, রূপ-লাবণ্যের জন্য বিজয়োল্লাস, সাফল্যের অহঙ্কার, সুখের মেঘে ভেসে যাওয়া, এই সব তাঁকে এনে দিল সার্বলৌকিক প্রণতি আর প্রশংসা, তাঁর মনের সকল বাসনা আজ পূর্ণতা পেল, তাঁর নারী হৃদয়ে এ পূর্ণ জয় বড় মধুর!

প্রায় সকাল চারটার দিকে মাথিল্ডে পার্টি-রুম থেকে ফিরলেন। তাঁর স্বামী আরো তিনজনের সাথে যাদের স্ত্রীরাও আনন্দ-ফুর্তিতে সময় পার করছিলেন পার্টিতে, ছোট একটা পরিত্যক্ত রুমে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢুলু চোখে অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাড়ি ফেরার জন্য মাথিল্ডের জন্য আনা পোশাক সে তাঁর কাঁধের দিকে ছুড়ে দিলেন, প্রাত্যহিক সাদাসিধা পোশাক, যার দৈনতা এই নাচের পোশাকের সৌন্দর্যের সাথে বড়ই বেমানান। মাথিল্ডে এ ব্যপারে সচেতন ছিলেন, তাই দ্রুত ফিরে আসার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন পাছে দামী পোশাক পরা অন্য মহিলারা তাঁকে দেখে ফেলে।

লইজেল তাঁকে থামালেন।
“একটু অপেক্ষা কর। খোলা জায়গায় দাঁড়ালে তোমার ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আমি ক্যাব আনতে যাচ্ছি”।
কিন্তু মাথিল্ডে তাঁর কথা না শুনে খুব দ্রুত সিঁড়ি মাড়িয়ে নিচে নেমে এলেন। রাস্তায় এসে তাঁরা কোন ক্যাব পেলেন না; খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন, দূর দিয়ে যাওয়া ক্যাবের ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে ডাকলেন।
হতাশাগ্রস্ত হয়ে তাঁরা সীন নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলেন, আর ঠক ঠক করে শীতে কাঁপছিলেন। অবশেষে তাঁরা জাহাজঘাটের কাছে পুরনো একটা নৈশ গাড়ি পেলেন, যেগুলো প্যারিসে শুধু রাতের আঁধার নেমে এলেই দেখা যায়, যেন দিনের আলোয় এদের জরাজীর্ণতা দেখাতে এরা লজ্জা পায়।

গাড়িটি তাঁদেরকে র্যো দ্যে মার্টিয়ার্সের দরজায় পৌছে দিলে, তাঁরা বিষণ্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টের দিকে হেঁটে চলে গেল। মাথিল্ডের জন্য এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু লইজেল ভাবছিল, তাঁকে অবশ্যই কাল সকাল দশটায় অফিস ধরতে হবে।

মাথিল্ডে তাঁর কাঁধ পর্যন্ত ঢেকে রাখা পোশাকগুলো খুলল, যেন সে আয়নার সামনে বসে নিজেই তাঁর মহিমাটুকু উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু হঠাৎকরেই সে আর্তনাদ করে উঠল। তাঁর গলায় হারটি আর নেই।
লইজেল ইতোমধ্যে তাঁর অর্ধেক পোশাক খুলে ফেলেছে। মাথিল্ডের কাছে জানতে চাইল, “কী ব্যাপার বলো তো?”
মাথিল্ডে চরম হতাশা নিয়ে তাঁর দিকে ফিরল।

“আ... আ... আমি মাদাম ফরেস্টায়েরের হারটি কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”
লইজেল মহাবিস্ময় নিয়ে মাথিল্ডের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো।
“কী!... অসম্ভব!”
মাথিল্ডের পোশাকের ভাঁজে, কোটের ভাঁজে, পকেটে, সব জায়গায় তাঁরা খুঁজে দেখলেন। কোথাও হারটি পেলেন না।
লইজেল বলল, “তুমি কি নিশ্চিত, বলরুম থেকে বের হয়ে আসার সময় হারটি তোমার গলায় ছিল?”
“হ্যা, মন্ত্রণালয়ের হলরুমে থাকতে ওটা আমি ছুঁয়ে দেখেছিলাম।”
“কিন্তু তুমি যদি রাস্তায় হারাতে, ওটা পড়ার শব্দ আমরা শুনতে পেতাম।”
“হ্যা। সম্ভবত পেতাম। তুমি কি ক্যাবটির নম্বর রেখেছিলে?”
“না। তুমিও খেয়াল করনি, তাই না?”
“না।”

তাঁরা বিহ্বল হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত, লইজেল তাঁর পোশাক আবার পরলেন, বললেন, “আমি বের হচ্ছি, যেসব জায়গায় আমরা হেঁটেছি তার সবখানেই যাবো, দেখি হারটি পাওয়া যায় কিনা।”

লইজেল বেরিয়ে পড়লেন। মাথিল্ডে সন্ধ্যার পোশাকগুলো পরে রইলেন, বিছানায় যাওয়ার শক্তিটুকু হারিয়ে, নিরুত্তাপ আর চিন্তাশূন্য হয়ে, চুপচাপ চেয়ারে বসে রইলেন।

কোথাও খুঁজে না পেয়ে, তাঁর স্বামী সাতটার দিকে ফিরলেন।
লইজেল পুলিশ স্টেশনে গেলেন, পত্রিকা অফিসে গেলেন, পুরস্কার ঘোষণা করলেন, ক্যাব কোম্পানিগুলোতে গেলেন, যা করা সম্ভব তার সবটুকুই করলেন, যেদিকে বিন্দুমাত্র আশার আলো দেখলেন, সেদিকেই ছুটলেন।
মাথিল্ডে সারাটা দিন অপেক্ষা করলেন, এই ভয়ানক বিপর্যয়ে সেই একই রকমভাবে বিহ্বল হয়ে।

বিষণ্ণ ও মলিন মুখে লইজেল রাতে বাড়িতে ফিরলেন; সে কিছুই খুঁজে পায় নি।
“তুমি এখনই তোমার বান্ধবীকে চিঠি লেখ”, লইজেল মাথিল্ডেকে বলল, “আর তাঁকে বলবে, তুমি তাঁর হারের আঙটা ভেঙে ফেলেছ এবং এটি মেরামত করতে পাঠানো হয়েছে। এতে করে, এটা নিয়ে ভাবার কিছুটা সময় অন্তত আমরা পাবো।”
মাথিল্ডে তাঁর স্বামীর নির্দেশনা মতো লিখলেন।
***

সপ্তাহ শেষে তাঁরা হারটি ফিরে পাওয়ার সব আশা হারিয়ে ফেলল।
এই কয়দিনে যেন লইজেলের বয়স পাঁচ বছর বেড়ে গেছে। সে বলল, “হারটি কিভাবে বদলে দেয়া যায়, আমাদের এখন তাই ভাবতে হবে।”
পরের দিন তাঁরা হারটির বাক্সের ভিতরে লেখা জুয়েলারি দোকানের ঠিকানায় বাক্সটি নিয়ে গেলেন। লইজেল হারটির মূল্য কেমন হতে পারে, কত দিনে দিতে পারবে, এসব নিয়ে দোকানীর সাথে আলোচনা করলেন।
“এই হারটি আমি বিক্রি করি নি, মাদাম; আমি স্রেফ এর আঙটা সরবারহ করতে পারি।”

এরপর তাঁরা একটার পর একটা জুয়েলারি দোকানে গেলেন, আগেরটির মতো দেখতে আরেকটি হার খুঁজলেন, তাঁদের স্মৃতি থেকে সেটার বর্ণনা দিয়ে দোকানীর পরামর্শ চাইলেন, তীব্র অনুতাপ আর মনঃকষ্টে দুইজনকেই অসুস্থ দেখাচ্ছিল।

পলা-রয়্যালের একটি দোকানে তাঁরা হীরের একটি হার খুঁজে পেলেন, দেখতে ঠিক আগেরটির মতই যা তাঁরা খুঁজছিলেন। এর মূল্য ছিল চল্লিশ হাজার ফ্রাঁ। দোকানি তাঁদেরকে এটা ছত্রিশ হাজার ফ্রাঁতে দিতে চাইলেন।
তাঁরা দোকানীকে অনুরোধ করল, যেন এটা আগামী তিন দিনের মধ্যে বিক্রি করা না হয়। আর দোকানীর সাথে এই সমঝোতায় এলেন, ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার আগেই যদি তাঁরা হারিয়ে যাওয়া হারটি খুঁজে পান, তবে দোকানী এটি চৌত্রিশ হাজার ফ্রাঁতে আবার ফিরিয়ে নেবেন।
লইজেলের কাছে আঠার হাজার ফ্রাঁ ছিল, যা তাঁর বাবা রেখে গিয়েছিল। সে ভাবল, বাকিটা সে ধার করবে।

সে ধার করল, এক জনের কাছে থেকে পেল এক হাজার ফ্রাঁ, অন্য জনের কাছে পাঁচশত ফ্রাঁ, পাঁচ লুই এখানে, তিন লুই সেখানে। সে দলিল জমা রাখল, সর্বনেশে সব চুক্তি করল, সুদের কারবারি আর সকল জাতের মহাজনদের কাছে থেকে ঋণ নিল। সে তাঁর সমগ্র অবশিষ্ট জীবনটাকেই বন্ধক রাখল, পরিশোধ করতে আদৌ পারবে কিনা না জেনেই এমন একটা দলিলে স্বাক্ষর করার ঝুঁকি নিল, যন্ত্রণাকাতর ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভেবে মর্মাহত হল, গভীর দুর্দশায় পড়ার আশঙ্কা নিয়ে, সকল ধরণের শারীরিক বঞ্চনা আর মানসিক পীড়নের সম্ভাবনা নিয়ে, সে নতুন হারটি আনতে গেল, জুয়েলারি দোকানের কাউন্টারে ছত্রিশ হাজার ফ্রাঁ জমা দিল।

যখন মাদাম লইজেল হারটি মাদাম ফরেস্টায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, তিনি তাঁকে কর্কশ কণ্ঠে বললেন, “তোমার আরো আগে ফিরিয়ে দেয়া উচিত ছিল; আমার এটি প্রয়োজন হতে পাড়ত।”
মাথিল্ডে বাক্সটি খুলল না, সে তাঁর বান্ধবীকে খুব ভয় পাচ্ছিল। যদি হার বদল সে লক্ষ্য করে, কি ভাববে সে? কি বলবে সে? সে কি তাঁকে চোর মনে করবে না?
***

মাদাম লইজেল শোচনীয় দরিদ্রদশার ভয়ঙ্কর জীবনের সাথে পরিচিত হতে লাগলেন। একেবারে শুরু থেকেই তাঁর দায়িত্বটুকু সে সাহসের সাথে পালন করে চললেন। এই ভয়ানক ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। সেই পরিশোধ করবে। কাজের লোক ছাটাই করা হল। তাঁরা তাঁদের ফ্ল্যাট পাল্টালেন; ছাদের নিচে একটা চিলেকোঠা নিলেন।

সে পরিচিত হতে লাগল গৃহের ভারী ভারী কাজকর্মের সাথে, রান্নাঘরের ঘৃণ্য কাজগুলোর সাথে। সে বাসনকোসন ধুয়ে দিত, তাঁর সুকোমল সুশ্রী আঙ্গুল আর গোলাপী নখগুলো দিয়ে পাতিলের চর্বি এবং কড়াইয়ের নিচে লেগে থাকা ময়লা পরিস্কার করত। সে ময়লা বিছানার চাদর, অন্তর্বাস, শার্ট আর থালাবাসনের ক্লথ ধুয়ে তারের উপর ঝুলিয়ে দিত রোদে শুকানোর জন্য; প্রত্যেক দিন সকালে সে ডাস্টবিনের ঝুড়ি নিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসত, পানি টানতে গিয়ে একটু পর পর থামত শ্বাস নিতে। গরিব মহিলার মত পোশাক পরে, কাঁখে ঝুড়ি নিয়ে সে ফলবিক্রেতা, মুদি দোকানী, মাংস বিক্রেতার কাছে যেত, দর কষাকষি করত, অপমানিত হত, তাঁর কষ্টার্জিত টাকার প্রতিটি আধা-পেনি বাঁচানোর জন্য যেন যুদ্ধ করত।

প্রত্যেক মাসের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হত, নতুবা সময় বাড়ানোর জন্য নতুন ঋণ নিতে হত।
তাঁর স্বামী সন্ধ্যায় বণিকের হিসাব রক্ষক হিসেবে কাজ করতেন, আর প্রায় রাতেই প্রতি পৃষ্ঠা দুই পেনি-আধা পেনি হিসেবে পাণ্ডুলিপি নকলের কাজ করতেন।

এইভাবে জীবন চলল দশ বছর।
দশ বছর শেষে সকল ঋণ পরিশোধ হল, সবকিছু, সুদের কারবারির সব টাকা, পুঞ্জিভূত সব চক্রবৃদ্ধি সুদ।
মাদাম লইজেলকে এখন বৃদ্ধ দেখায়। সে অন্য সব গরিব পরিবারের মহিলাদের মত সবল, শক্ত সামর্থ্য আর স্থূলকায় হয়ে উঠেছে। তাঁর চুলগুলো এলোমেলো, অপরিপাটি, স্কার্ট কুচকে গেছে, হাতদুটি লাল হয়ে গেছে। সে কথা বলে কর্কশ কণ্ঠে, মেঝে পরিস্কার করার সময় পানি পুরো মেঝেতে ছলকে পরে। কিন্তু মাঝেমাঝে, তাঁর স্বামী যখন অফিসে থাকে, সে জানালার পাশে বসে, অনেক দিন আগের সেই সন্ধ্যার কথা ভাবে, সেই বলরুম যেখানে সে দেখতে ছিল খুব সুন্দর, সকলের কাছে অনেক রূপমুগ্ধ।
কি ঘটত, যদি সে সেই হারটি না হারাত? কে জানে? কে জানে? জীবনটা কত বিস্ময়কর, কত পরিবর্তনশীল! কত অল্প কিছু প্রয়োজন একটা জীবন ধ্বংস করে দিতে অথবা বাঁচাতে?

সপ্তাহ ধরে পরিশ্রমের কাজ শেষে নিজেকে চাঙ্গা করার জন্য এক রবিবারে, সে চ্যাম্প-এলিসির পাশ দিয়ে হাঁটতে বের হল। হঠাৎ সে লক্ষ্য করল, এক মহিলা একটি শিশুকে সাথে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছে। সে মাদাম ফরেস্টায়ের, এখনও তরুণী, এখনও রূপবতী, এখনও আকর্ষণীয়।
মাদাম লইজেল নিজের অনুভূতির সাথে বোঝাপড়া করছিলেন। সে কি মাদাম ফরেস্টায়েরের সাথে কথা বলবে? হ্যা, নিঃসন্দেহে। কতটুকু মূল্য সে দিয়েছিল, এখন সব বলবে তাঁকে। কেন নয়?
মাদাম লইজেল তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।
“শুভ সকাল, জেনি।”
মাদাম ফরেস্টায়ের তাঁকে চিনতে পারল না, একজন গরিব মহিলা শুরুতেই এত অন্তরঙ্গভাবে সম্বোধন করছে দেখে সে বিস্মিত হল।
“কিন্তু... মাদাম...” সে তোতলামি করছিলেন, “আমি আপনাকে চিন্তে পারছি না... আপনি নিশ্চয় কোন ভুল করছেন।”
“না... আমি মাথিল্ডে লইজেল”।
তাঁর বান্ধবী আর্তনাদ করে উঠলেন।
“ওহ!... বেচারি মাথিল্ডে, তুমি কতটা বদলে গেছ!...”
“হ্যা, তোমার সাথে শেষ বার দেখা হবার পর, আমি কিছু কঠিন সময় পার করেছি; অনেক দুঃখ-কষ্ট... সব তোমার জন্য।”
“সব আমার জন্য!... কি ছিল তা?”
“তোমার মনে আছে সেই হীরের হারের কথা, মন্ত্রণালয়ের বল পার্টিতে পরার জন্য আমাকে ধার দিয়েছিলে?”
“হ্যা। তারপর?”
“তারপর, এটি আমি হারিয়ে ফেলি।”
“তুমি কি বলতে চাচ্ছ? কেন, তুমি তো ওটা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে?”
“আমি তোমাকে ঠিক ওটার মতই আরেকটি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আর গত দশ বছর ধরে, তার জন্য আমরা মূল্য দিয়ে আসছি। তুমি উপলব্ধি করতে পারবে, সেটা আমাদের জন্য সহজ ছিল না; আমাদের কোন টাকা পয়সা ছিল না... তারপরও, অবশেষে এটি পরিশোধ হয়ে গেছে, আর এজন্যই আমি আনন্দিত”।
মাদাম ফরেস্টায়ের তাঁকে থামালেন।
“তুমি বলছ, আমারটি বদলে দিতে তোমরা হীরের হার কিনেছিলে?”
“হ্যা। তুমি কি সেটি লক্ষ্য কর নি? ওটি দেখতে প্রায় একই রকম ছিল।”
মাদাম লইজেল আত্নতৃপ্তি নিয়ে মৃদু হাসলেন, নির্মল সে সুখ।
মাদাম ফরেস্টায়ের গভীরভাবে নড়ে উঠলেন, মাদাম লইজেলের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
“ওহ! বেচারি মাথিল্ডে! কিন্তু আমারটি ছিল মেকি। এর মূল্য বড় জোড় পাঁচ শত ফ্রাঁ!....”

মূল গল্পটি এখানে পড়ুন ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29489772 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29489772 2011-11-24 20:10:35
ও হেনরির ছোট গল্প - বিশ বছর পরে
পেশাগত গাম্ভীর্য নিয়ে পুলিশ অফিসারটি তাঁর টহল পথে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, এই গাম্ভীর্যটা তাঁর অভ্যেস, কেননা আশেপাশে দেখবার মতো তেমন কেউ ছিল না। সময় বেশি হয় নি, বড় জোর রাত দশটা, কিন্তু তীব্র আকস্মিক ঝড়ো হাওয়া আর হালকা বৃষ্টির জন্য রাস্তাটা জনশূণ্য হয়ে পড়েছে।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক একটা দরজা পরখ করে দেখছিল সে, কখনো কখনো তাঁর হাতের লাঠিটি দুর্বোধ্য ও বেয়াড়াভাবে আন্দোলিত হচ্ছিল, ইতস্ততভাবে ঘাড় ফিরিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছলি প্রশান্ত রাজপথকে, তিনি অফিসার, তাঁর স্থিরপ্রতিজ্ঞ মূর্তি ও মৃদু হামবড়াভাব সব মিলিয়ে শান্তির দেবদূতের সুন্দর একটা প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠেছে। মাঝে মাঝে দুই একটা চুরুট স্টোর বা সারা রাত্রী খোলা খাবারের দোকানের আলো চোখে পড়ে, কিন্তু অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের দড়জা।

নির্দিষ্ট এক জায়গার মাঝামাঝি এসে হঠাৎ হাঁটার গতি কমিয়ে আনল পুলিশ অফিসারটি। অন্ধকার হয়ে আসা এক হার্ডওয়্যার স্টোরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক, তাঁর ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা চুরুটটায় এখনো আগুন ধরানো হয় নি।

পুলিশ অফিসারটি তাঁর দিকে হেঁটে আসতেই লোকটি দ্রুত কথা বলে উঠল, “ঠিক আছে অফিসার”। লোকটি তাঁকে পুনঃআশ্বাস দিয়ে বলল, “আমি ঠিক আমার এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি। এখানে আজকের এই দেখা করার সময়টা ঠিক হয়েছিল বিশ বছর আগে। কথাটি আপনার কাছে কিছুটা অদ্ভুত শুনাচ্ছে, তাই না? ঠিক আছে, আপনি শুনতে চাইলে আমি ব্যাপারটি খোলাসা করে বলতে পারি। অনেক কাল আগে ঠিক এই স্টোরটার জায়গায় একটা রেস্তোরাঁ ছিল—‘বিগ জো’ ব্র্যাডির রেস্তোরাঁ।”
“পাঁচ বছর আগেও ছিল”, পুলিশ অফিসারটি বলল, “এর পর এটি উঠে যায়”।

দরজায় হেলান দেওয়া লোকটি দেয়াশেলাই ঠুকে তাঁর চুরুটটা ধরাল। দেয়াশেলাইয়ের আলোয় দেখা গেল এক ফ্যাকাশে মুখ, লম্বা চওড়া চিবুক, উৎসুক এক জোড়া চোখ আর ডান চোখের ভুরুর কাছাকাছি একটা সাদাটে ছোট কাটা দাগ। তাঁর স্কার্ফের পিনে অদ্ভুতভাবে বসানো একটা বড় আকারের হিরে।

“বিশ বছর আগে আজকের এই রাতে”, লোকটি বলে চলল, “এখানে ‘বিগ জো’ ব্র্যাডির রেস্তোরাঁয় এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু, সবচেয়ে কাছের মানুষ জিমি ওয়েলসের সাথে রাতের খাবার খেয়েছিলাম। ও আর আমি এই নিউইয়র্ক শহরে আপন দুই ভাইয়ের মতো এক সাথে বড় হয়েছি। আমার বয়স তখন আঠার আর জিমির বিশ। পরের দিন সকালে ভাগ্য গড়তে আমার পশ্চিমের দিকে বেরিয়ে পরার কথা ছিল। জিমিকে কিছুতেই আপনি কখনো নিউইয়র্কের বাইরে নিয়ে যেতে পারবেন না; ওর ধারনা পৃথিবীতে এই একমাত্র জায়গা। যা বলছিলাম, সেদিন আমরা দুই জন একমত হয়েছিলাম বিশ বছর পরে আমরা আবার এখানে দেখা করব ঠিক এই তারিখ ও এই সময়ে, আমাদের অবস্থা যাই হোক না কেন, আর যত দূরেই আমরা থাকি না কেন। ধরে নিয়েছিলাম, এই বিশ বছরে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌছে যেতে পারব আর আমাদের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে যাবে, যেভাবে হওয়ার কথা ছিল”।

“খুব আকর্ষণীয় ব্যাপার মনে হচ্ছে”, পুলিশ অফিসার বলল। “দু-বারের দেখা হবার মাঝের সময়টা অনেক লম্বা বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। আপনি চলে যাওয়ার পর বন্ধুর কোনো খোঁজ-খবর আর পান নি?”
“জ্বি, হ্যা, বেশ কিছুদিন আমরা একে অপরের সাথে চিঠিপত্র আদান প্রদান করেছি”, লোকটি বলল। “কিন্তু দুই এক বছর পরে আমাদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আপনি হয়ত জানেন, পশ্চিম অনেক বড় জায়গা, আর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাকেও অনেক ঠেলাঠেলি করতে হয়েছে। কিন্তু আমি জিমিকে চিনি, ও যদি বেঁচে থাকে অবশ্যই আমার সাথে দেখা করতে আসবে এখানে, কারন ও ছিল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি মানুষ আর সবচেয়ে বিশ্বস্ত পুরনো বন্ধু। ও ভুলে যাবে না কখনো। আমি হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আজ রাতে এই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, আমার পুরনো বন্ধু যদি আসে তবেই সেটা সার্থক হবে”।

ঢাকনার ওপর ছোট ছোট হিরের টুকরো বসানো একটি সুদৃশ্য ঘড়ি পকেট থেকে বের করল অপেক্ষারত লোকটি।

“দশটা বাজতে তিন মিনিট বাকি”, ঘড়ি দেখে বলল লোকটি। “ঠিক দশটায় আমরা সেদিন রেস্তোরাঁর দরজা থেকে বিদায় নিয়েছিলাম”।
“পশ্চিমে যেয়ে ভালোই লাভবান হয়েছেন, তাই না?”, পুলিশ অফিসার জানতে চাইলো।

“আপনি ঠিক বলেছেন! আশা করছি, জিমি এর অর্ধেক হলেও জুটিয়েছে। ও খুব ভালো লোক, ধীরে ধীরে ক্রমাগত কাজ করে নিরবে এগিয়ে যাওয়া ওর পছন্দ। প্রতিষ্ঠা পেতে আমাকে পাল্লা দিতে হয়েছে কিছু তীক্ষ্ণতর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সাথে। নিউইয়র্ক শহর একজন মানুষকে এক ঘেয়ে জীবনরীতিতে অভ্যস্ত করে তোলে, আর পশ্চিম তাঁর জীবনকে করে ক্ষুরধার”।

পুলিশ অফিসার তাঁর লাঠিটি মোচড়াতে মোচড়াতে দুই এক পা সামনে এগিয়ে বলল, “আমাকে কাজে যেতে হচ্ছে। আশা করছি, আপনার বন্ধু সময় মতো চলে আসবে। তাঁর সাথে দেখা হবার পরেই কি চলে যাচ্ছেন?”
“না না!”, “আমি ওকে কম করে হলেও আধা ঘন্টা সময় দেব। যদি জিমি পৃথিবীতে বেঁচেবর্তে থাকে, তবে ও ঠিক সময়েই এখানে হাজির হবে। ভালো থাকবেন, অফিসার”।

“শুভ রাত্রী, স্যার”, লোকটিকে বিদায় জানিয়ে পুলিশ অফিসার তাঁর টহল পথের দরজাগুলো পরীক্ষা করতে করতে এগিয়ে যায়।

ততক্ষনে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে আর হঠাৎ হঠাৎ আসা বাতাস একটানা সজোরে বইতে শুরু করেছে। যে কয়েকজন পথচারী তখনো রাস্তায় ছিল, কোটের কলার উচু করে হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিরবে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছিল। আর হার্ডওয়্যার স্টোরের দরজায় দাঁড়িয়ে যে লোকটি হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে তাঁর তরুন বয়সের ফেলে আসা বন্ধুটির সাথে কথা দেয়া অনিশ্চিত, প্রায় উদ্ভট সাক্ষাৎকার বজায় রাখতে, চুরুটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অপেক্ষা করে চলল সে।

প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষার পর, এক লম্বামত লোক লম্বা ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে কান পর্যন্ত কলার টেনে দিয়ে রাস্তার অপর পার থেকে দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে এল।

“তুমি বব?”, অনেকটা সন্দেহ নিয়ে জানতে চাইলো লোকটি।
“তুমি জিমি ওয়েলস?”, দরজায় দাঁড়ানো লোকটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

“আহা শান্তি!” নবাগত বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, উভয়েই ততক্ষনে পরস্পরের হাত মুঠোয় ধরে রেখেছে। “আমার বিশ্বাস ছিল, তুমিই বব। আমি নিশ্চিত ছিলাম, যদি তুমি এখনো বেঁচে থাকো আমি তোমাকে এখানেই খুঁজে পাবো। ভালো, ভালো, খুব ভালো--- বিশ বছর অনেক লম্বা সময়। পুরনো রেস্তোরাঁটা উঠে গেছে বব; যদি ওটা থাকত, তবে এখানে আরেকবার একসাথে রাতের খাবারটা সারা যেত। পশ্চিমে তোমার কেমন কাটল, আমার বুড়ো বন্ধু?”
“খাসা! সব পেয়েছি আমি যা চেয়েছিলাম। তুমি অনেক বদলে গেছ, জিমি। আমি কখনোই ভাবি নি তুমি আরও দুই তিন ইঞ্চি লম্বা হয়ে যাবে”।
“ওহ! বছর বিশের পরে আরও কিছুটা বেড়েছি”।
“নিউইয়র্কে ভালোই চলছে, জিমি?”
“মুটামুটি। শহরের সরকারী একটা দপ্তরে কাজ করি। চল, বব; আমার পরিচিত একটা যায়গায় গিয়ে অনেক সময় ধরে পুরনো দিনের সব গল্প করা যাবে”।

হাত ধরাধরি করে রাস্তা ধরে এগোল দুই জন। পশ্চিম থেকে আসা লোকটি, সাফল্য পেয়ে আত্নপ্রচারে মেতে উঠেছিল যে, সে তাঁর পেশাজীবনের ইতিহাস বলা শুরু করল একে একে। ওভারকোটে ঢেকে যাওয়া লোকটি আগ্রহসহকারে খুব মনোযোগের সাথে শুনে যাচ্ছিল। গলির এক কোনায় ছিল একটা ঔষুধের দোকান, যেখানটায় জ্বলছিল উজ্বল বৈদ্যুতিক বাতিগুলো। এই আলোতে এসে দুই জন একসাথে একে অপরের দিকে মুখ ফিরে তাকালো। পশ্চিম থেকে আসা লোকটি হঠাৎ থেমে গিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।

“তুমি জিমি ওয়েলস নও”, দাঁতে দাঁত কামড়ে বলল লোকটা। “বিশ বছর অনেক দীর্ঘ সময়, কিন্তু এত দীর্ঘ সময় নয় যেখানে এক জনের রোমান ধাঁচের নাক বদলে বোঁচা নাক হয়ে যায়”।

“সময় কখনো কখনো একজন ভালো মানুষকে খারাপ মানুষে বদলে দেয়”, লম্বা লোকটি বলে চলল, “আপনি দশ মিনিট ধরে গ্রেপ্তার হয়ে আছেন, ‘সরল’ বব। শিকাগো পুলিশ ধারণা করেছিল আপনি এদিকটায় আসবেন, তাই ওরা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানিয়েছিল, আপনার সাথে আলাপ করতে চায়। শান্তভাবেই যাবেন, যাবেন কি? এটাই শুভবুদ্ধির পরিচয় হবে। এখন, পুলিশ স্টেশনে রওনা দেবার আগে আপনাকে এই চিঠিটা দিতে বলা হয়েছে আমাকে। আপনি চিঠিটি এই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন। এটি টহল পুলিশ অফিসার ওয়েলস পাঠিয়েছে”।
পশ্চিম থেকে আসা লোকটি তাঁকে দেওয়া কাগজের টুকরোটির ভাঁজ খুলল। যখন চিঠিটি পড়তে শুরু করল লোকটি, তখনও তাঁর হাতটি স্থির ছিল, কিন্তু চিঠিটি পড়ে শেষ করার পরই তাঁর হাত মৃদুভাবে কাঁপতে লাগল। চিঠিটায় অল্প কিছু কথা লেখা ছিল।

“বব,
আমি ঠিক সময়েই দেখা করার স্থানে হাজির হয়েছিলাম। চুরুট ধরানোর জন্য যখন দেয়াশেলাই জ্বালালে, তখনই আমি দেখলাম তোমাকে, এই মুখের এক জনকে শিকাগো পুলিশ খুঁজছিল। যাই হোক, কাজটা নিজের হাতে করতে পারলাম না, তাই আমি ফিরে এসে সাদা পোষাকের একজনকে পাঠালাম দায়িত্বটা সম্পন্ন করতে।
জিমি”

মূল গল্পটি এই লিংক থেকে পড়তে পারেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29451457 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29451457 2011-09-20 02:19:02
একজন শহর আলীর গল্প শহর আলীর পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এদিকটায় কেউ আর আসে না, পথ ভুল করেও না। চারপাশের মানুষগুলো জীবনের তাগিদে অহর্ণীশ ছুটে চলছে।কখনো নতুন জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর আগমনী কান্নার সুর ভেসে আসে। কখনো বা আসে সদ্য কোনো মৃতের আত্নীয়ের বিরহ বিলাপ। শহর আলীর যেন কোনো ভাবান্তর নেই। কোনো কিছুই তাঁর মনকে আর ছুঁতে পারে না। নিজেকে জীবিত বা মৃত, কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করে না। ঘরের কোণে নিপুন হাতে জাল বুনে চলা মাকড়সাটাকে দেখে তাঁর সময় কেটে যায়। দলছুট ছুঁছোদের সাথে অর্থহীন কথা বলে রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয়। কান্দুপট্টির কোনো এক বকুলের পাতলা ঠোট, ভরাট বক্ষের ধূসর স্মৃতি তাঁকে আর উত্তেজিত করে না। পঁচা-গলা এক থালা পান্তা ভাত, কয়েক ফালি কাটা পিয়াজ, দুইটা কাঁচা মরিচ, কিছু লবন; দুই বেলা এটুকু হলেই চলে যায় তাঁর। খাওয়া শেষে পড়নের বহু দিনের আধোয়া ময়লা লুঙ্গিতে হাত-মুখ মুছে আবার শুয়ে পড়া, ভাঙা বেড়ার ফাঁক গলে ভুল করে ঢুকে পড়া কয়েকটা চড়ুইয়ের ইতঃস্তত উড়াউড়ি দেখা; এভাবেই তো ঠিকঠাক চলে যাচ্ছে জীবন।রোজ রাত্তিরে করিমনের ঘরে ওর ধর্ম ভাই, রফিক আসে। ছিটকিনি খোলার শব্দে প্রতি রাতেই ঘুম ভেঙে যায় শহর আলীর। ওদের ফিসফিসানি কথার আওয়াজ তাঁকে আর বিদ্রোহী করে তোলে না। ভোর রাত্তিরে রফিকের চলে যাওয়া, ঘুম জড়ানো কন্ঠে করিমনের বিদায় জানানো; সব কিছুই যেন স্বাভাবিক লাগে শহরের কাছে।

তিন বছর আগে পঙ্গু হয়ে যখন এই ঘরে ঠাঁই হয়েছিল তাঁর, একেবারেই আলাদা ছিল সে সময়টা। করিমন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে হাড়ভাঙা খাঁটুনি খেটে রাতে ফিরত ক্লান্ত হয়ে। নিজ হাতে খাইয়ে দিত শহরকে। নীরবে চোখের জল আঁচলে মুছে নিয়ে ভাত মাখাত। শহর চোকিতে শুয়ে শুয়ে চিন্তার বীজ বুনে যেত। কিভাবে সংসার চলবে, করিমনের কি হবে, ছেলেটাকে কিভাবে মানুষ করবে; কত চিন্তা! চিন্তা নামের গাছগুলো ক্রমশ বড় হত, ডালপালা বেড়ে যেত, পাল্লা দিয়ে বেড়ে যেত শহরের অস্থিরতা। এখন আর কোনো কিছু নিয়েই ভাবতে ইচ্ছে করে না তাঁর। মানুষগুলো ক্রমশ বদলে যায়। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা অচেনা আলোয় বড় অচেনা মনে হয়। বদলে যায় করিমনেরা। বদলাতে হয় শহর আলীদের।

২.
-আসমানে কী সোন্দর চাঁন ওঠছে!
শহর মনে মনে হিসাব করে, আজকে মনডায় কয় পূর্নিমা।
স্নিগ্ধ চাঁদের রুপালী আলো জানালার ফাঁক গলে শহর আলীর মুখে, বুকে, দুই হাতে এসে পড়ছে। সে এক মনে ভড়া চাঁদটার দিকে তাঁকিয়ে থাকে। কেমন যেন একটা ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় শহরের মনে।
অনেক দিন হল ছেলেটাকে দেখেনা সে। আহারে! পোলাডা এতিমের লাহান এহা এহা থাহে। কিডা জানে কী খায়, কী পড়ে! অসহায়তা, অক্ষমতার জন্য নিজেকে শাপ-শাপান্ত করে শহর। ক্যান এমুন হয়া গেল সব?
-ও বাজান! বাজান!
চমকে ওঠে শহর। পিছন ফিরে তাঁকিয়ে দেখে করিমকে। এক বছরে অনেক বড় হয়ে গেছে ছেলেটা। উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে ছেলেকে ডাকে,
-আয় বাপ! আমার কাছে আয়!
ছেলের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে ধরে শহর। অনেক দিন বাবাকে না দেখে করিমের শিশু মনও অস্থির হয়ে উঠেছিল। এক লাফে চোকিতে উঠে বাবার বুকে শরীর এলিয়ে দেয় করিম। দুই হাত দিয়ে বাবার শরীরটা শক্ত করে পেচিয়ে ধরতে চায়। শহর করিমের কপালে, গালে বার বার চুমু খেতে খেতে বলে,
-সোনা আমার! তুই আইছস!
শহরের দুই চোখে পানি চলে আসে। বাম হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে। কান্নার মাঝে এত সুখ, এত আনন্দ! শহরের চোখে যেন আজ কান্নার বাঁধ ভেঙেছে।
-মানিক আমার! তুই আইছস আমার কাছে!
করিমও কেঁদে ফেলে, হয়ত কান্না সংক্রামক তাই,
-বাজান! ও বাজান!
শহরের গলা জড়িয়ে ধরে আরো জোড়ে কাঁদে করিম।
আবারও চোখের পানি মুছে শহর। একটু শুকনো হাসি হাসে,
-তরে এইহানে কেডা লইয়া আইলোরে বাপ?
-মা’র লগে আইছি।
-হ্যায় এহন কুনহানে?
-মায় মনে অয় হেই ঘরে আছে।
-ওহ!
চুপ হয়ে যায় শহর।একটা চাপা অভিমানে বুকটা ফুলে ওঠে তাঁর।শহরের ডানহাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে করিম জিজ্ঞেস করে,
-বাজান! আপনে এমুন কইরা শুকাইয়া কাড হয়া যাইতাছেন ক্যান?
-ওইডা কিছুনারে বাপ! আমি ভালাই আছি।
কথাগুলো বলে একটু দম নেয় শহর। অভিমানের সুরে বলে ওঠে,
-এদ্দিন পর তর বাজানের কথা মনে হইল?
-বাজান! আপনেরে দেহার লাইগা আমার মোনডা সপ সুমায়ই পুড়ে! মা’রে কত কই আপনের কথা! হ্যায় তো লইয়া আহে না।
শহর বিরবির করে বলে,
-ক্যান তরে এইহানে তর মা আইতে দেয় না, আমি ভালাই জানি রে বাপ!
করিমের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলায় শহর।
-তর লেহা-পড়া ক্যামুন চলতাছে?
-ছেপাড়া পেরাই শ্যাষ কইরা ফালাইছি বাজান।
-সত্যই?
-হ বাজান! করিম যেন একটু লজ্জা পেয়ে যায়।
-কুল হুয়াল্লাহর ছুড়াডা এট্টু হুনা তো বাপ?
করিম সুর করে সুরা পড়ে। কী চিকন, আর মিষ্টি পোলাডার গলা! মনে মনে খুব সন্তুষ্ট হয় শহর। চোখ বুজে ছেলের কুরআন তেলোয়াত শুনে।
করিমন দড়জার ওপাশে দাঁড়িয়ে বাপ-ছেলের মিলন দেখে, আঁচলে চোখের জল মুছে।
-ও করিম! অহন আয় বাজান! দুগগা ভাত খাইয়া ল। হের পর হারা রাইত বাজানের লগে গল্প করিস।
করিমনের কন্ঠ শুনে চোখের পাতা কেঁপে ওঠে শহরের।
-বউ! পোলাডা এদ্দিন পরে আইলো, থাহুক না আর খানিক?
-এহন থাইকা ও এইহানেই থাকবো। সামনে অনেক সুমায় পাইবেন অরে কাছে রাহনের।
শহর করমনের কথার পিঠে কি বলবে ভেবে পায় না।
-ক্যান? অয় আর হেপেজি পড়ব না?
-না, পড়ব না। গরীব মাইনষের ঘরে জন্ম নিছে, এত লেহা-পড়া কইরা কি অইব?
ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে করিমন। জানালা গলে ফ্যালফ্যাল করে ভরা পূর্নিমার চাঁদটার দিকে তাঁকায় শহর। মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায় তাঁর।
-বউ! দ্যাখছস কী সোন্দর চাঁন ওঠছে? দুইন্যাডা ভেস্তের লাহান লাগতাছে!
করিমন অবাক হয়, আঁচলে চোখ মুছে।
-আমারে এট্টু দরিয়ার পাড়ে লইয়া যাইবি? আমার খুব যাইতে মন চাইতাছে। বুকডা ভইরা এট্টু তাজা বাতাস টানতে ইচ্ছা করতাছে!
করিমনের কান্না আরও বেড়ে যায়। পাঁচ বছর বয়সী করিম বুঝে উঠতে পারে না, এখন তার কী করা উচিত। বড়দের অনেক কিছুই সে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না।
—————-
শহর করিমনের ঘাড়ে ভর দিয়ে হাঁটছে কীর্তিনাশার পাড় ধরে। চুপচাপ পিছুপিছু হাঁটছে করিম। চাঁদের আলোয় যেন ভিজে যাচ্ছে ওদের শরীর, ধুয়ে যাচ্ছে বুঝি সকল দুঃখ-কষ্টরাজি।

৩.
-শহর? শহর আলী বাড়িতে আছস?
দড়জার বাইরে থেকে ঘরের ভিতরে উঁকি দেয় শফি। হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরে তাঁর রাখা চার বছর বয়সী মেয়ে, শরিফা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। শহর আলী বালিশে হেলান দিয়ে উঠে বসতে বসতে বলে,
-শফি তুই? ঘরের ভিতরে আয়?
অনেক দিন পর পুরোনো বন্ধু, শফিকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শহরের মুখ।
-গেরামে কবে আইলি?
-কাইলকা আইছি।
শফি কোলে করে মেয়েকে চোকির উপরে বসায়। নিজে এক পাশে বসতে বসতে বলে-
-তুই আছস ক্যামুন শহর?
শহর মৃদু হাসে।
-আমি তগো দুয়ায় ভালাই আছি।
ধীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে শহর।
-এই পরীর লাহান মাইয়াডা কি তর? কি নাম রাখছস?
মেয়ের প্রশংসা শুনে শফির বুকের ছাতি ফুলে ওঠে। আনন্দ গোপন করার চেষ্টা করে মেয়েকে বলে,
-আম্মা, চাচারে সালাম করেন।
শরিফা শহরের পায়ে দুইবার হাত ছুঁয়ে শব্দ করে নিজের হাতে চুমু খায়।
-আল্লাহ বাঁচাইয়া রাহুক। আল্লাহ বাঁচাইয়া রাহুক।
ছোট মানুষটার ব্যবহার দেখে শহরের খুব ভালো লাগে।
-বাহ! তর মাইয়াডা তো খুব লক্কি!
শরিফার মাথায় হাত বুলায় শহর।
-কী নাম তুমার মা?
-শ-রি-ই-ফা
-খুব সোন্দর নাম মা!
শফি ঝেড়ে কাশে।
-ভাবীসাবরে তো দ্যাখতাছি না! তর পোলাডা কই?
-করিমন সহালেই কামে বাইর অইছে। করিম অর লগেই গ্যাছে।
-ওহ!
শফি কিছুক্ষন চুপ থাকে। মনে মনে কথা সাজায়।
শহর জিজ্ঞাসা করে,
-ঢাহায় তর ব্যবসা-পাতি ক্যামুন চলতাছে?
-ব্যপসা-পাতি তো ভালাই। তয় আর ভালা লাগে না। ভাবতাছি দ্যাশে মাছের ব্যপসা শুরু করুম।
-কস কি? ভালাইতো!
-হ! হের লাইগাই তো তর কাছে আইলাম।
শহর শব্দ করে হেসে ওঠে। শফি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।
-কিরে শহর হাসস ক্যা? ভুল কিছু কয়া ফালাইছি নিকি রে?
শহর হাসি থামিয়ে মন মরা হয়ে যায়।
-আমি তো অচল মানুষ! তরে ক্যামনে সাহায্য করুম?
শফির গলা চড়ে যায়।
-হারাদিন বিছনায় হুইয়া থাকলে তো অচল হবিই। এট্টা পাও নাই, তয় কি অয়ছে? দুইডা হাত আছে না? আর মাইনষে কাম করে না?
শহর হা-করে শফির মুখের দিকে তাঁকিয়ে থাকে।
-হোন! আমার কাছে যে ট্যাহা আছে, তা দিয়া তিনডা টলার কিনন যাইবো। কাজিরহাটে এট্টা আড়ত খুলুম। তুই ক্যাশে বইবি। পেত্তেক টলার থাইকা মাছ বুইঝা লবি। আমি ঢাহায় চালান লইয়া যামু।
এটুকু বলে শফি একটু থামে।
-ছোডো বেলা থন তো তরে আমি চিনি শহর! তুই পারবি। ঠিকই পারবি।
তুই পারবি! কথাটা শহরের মনে দাগ কাটে। নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন করে সে,
-কিরে শহর? পারবি না? তরে তো পাড়তেই অইবো। রাজী অয়া যা শহর! আর কয় দিন মাইনষের ঘাড়ে বুঝা হয়া থাকবি?
শহরের মনে জিদ চেপে বসে। দৃঢ় কন্ঠে শফিকে বলে,
-হ শফি, আমি পারুম! আমি পারুম!
শফি হাসে। খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর।
-তাইলে কথা ইডাই রইল শহর। যা লাভ লস অইবো চাইর ভাগের এক ভাগ তর।
-হেইডা নিয়া আমি ভাবি নারে শফি।
-তাও সব খোলাসা কইরা কওন ভালা। আর হোন! ব্যপসাডা এট্টু দাঁড়ায়া গেলে তরে ঢাহায় লইয়া নহল পাও লাগাইয়া আনুম। কত মানুষ বাঁচতাছে নহল পা লইয়া।
শহরের কানে বার বার অনুরিত হয় শফির কথাটা,
-কত মানুষ বাঁচতাছে নহল পা লইয়া, নহল পা লইয়া……

৪.
-রসুল নেপালগো টলারের মাছগুলা ঠিকমত গনছস তো?
-জ্বে চাচা।
-আইজকা কয়ডা মাছ উঠছেরে?
-চারশ ছয় চল্লিশটা হইছে, চল্লিশটার দাম ধইরা দেন।
শহর নেপালের দিকে তাঁকিয়ে হাসে-
-মাচ তো আইজকা ভালাই পাইছস রে নেপাল?
নেপাল বোকার মত হাসে।
-ব্যাক মা লক্কির ইচ্ছা জ্যাডা! কাইলকা রাইতে জাল পাতনের সুমায় মা মনে অয় খুশি ছিলেন।
শহর ক্যাশ থেকে টাকা গুনতে গুনতে বলে,
-তর পোলাডা ঠিকমত স্কুলে যায় রে?
-না জ্যাডা! কত মারি! হ্যার মায়ও মারে, তাও যায় না! জাইলার ব্যাটা জাইলা অইবো আর কি!
-অত মারনের কামডা কি? বুঝায়া শুনায়া কইলেই তো অয়? অরে আমার কাছে লইয়া আহিছ।
-জ্বে আচ্ছা!
-নে টাহাডা ভালা কইরা গুইনা ল। ব্যবাকটিরে ঠিক মত ভাগ কইরা দিস।
-জ্বে জ্যাডা!
নেপাল চলে যায়। নেপালের চলে যাওয়া পথের দিকে উদাস হয়ে তাঁকিয়ে থাকে শহর। পশ্চিম আকাশে আধখান সূর্য মাটির কাছাকাছি যাবো যাবো করছে। শহর আলী স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। বিরবির করে বলে,
-দ্যাকতে দ্যাকতে বার তেরডা বছর ক্যামনে চইলা গেলগা?
————–
এই ক’বছরে শফির মাছের ব্যবসটা ফুলে ফেপে উঠেছে। তিনটা ট্রলার থেকে আটটা ট্রলার হয়েছে। কাজিরহাটে একটা চালের আড়ত খুলেছে শফি। বয়স হয়ে গেছে। মাছের চালান নিয়া রোজ ঢাকায় যাওয়া আসা জানে আর কুলায় না শফির। তাঁর হয়ে এখন করিম মাছের চালান নিয়ে ঢাকায় যায়। ছেলেটাকে অনেক স্নেহ করে শফি। শক্ত সামর্থ্য শরীর। বাপের মতই দিন রাত পরিশ্রম করতে পারে। শফির কোনো ছেলে নাই, একটাই মেয়ে শরিফা। দেখতে দেখতে চোখের সামনেই বড় হয়ে গেল মেয়েটা। মেয়েটার দিকে তাঁকালেই নিজের পড়তি বয়সের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। একটা ভালো দেখে ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দেবে মেয়ের। কিন্তু কল্কি অবতারের এই যুগে ভালো ছেলে পাবে কোথায়? করিমকে খুব পছন্দ শফির। মাঝে মাঝে মনে করে শহরকে বলবে,
-ও শহর! তর পোলাডারে আমারে দিয়া দে!
কিন্তু সাহস হয় না শফির। পাছে কি আবার মনে করে বসে শহর। এমনিতেই অনেক ঋণী তাঁর কাছে। শফির আজকের এই বিষয়-আসয়ের পিছনে শহরের অবদানই সবচেয়ে বেশি। ব্যবসা শুরুর দিকে তাঁর আপন ভাই, মন্তাজ ব্যাপারী পদে পদে বাঁধা সৃষ্টি করেছে। প্রথম কয়েক বছর লোকসান দেখে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চেয়েছিল শফি। তাঁকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবসাটা ধরে রেখেছিল শহর।

৫.
প্রতি বছর অগ্রহায়নের পনের তারিখ কাজিরহাটের অশথ তলায় মেলা বসে। মেলা চলে পনের দিন। এই পনের দিন এক মিনিটের জন্যও যেন ঘুমোয় না কাজিরহাট। রাতভর চলে যাত্রাপালা, সার্কাস আর পুতুল নাচের আসর। এই সময় কৃষকের গোলায় থাকে নতুন ধান, পকেটে কাঁচা টাকা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এটা ওটা কেনে। ছেলে বুড়ো সবার মুখেই হাসি লেগে থাকে। অগ্রহায়নের ত্রিশ তারিখ আজ। মেলা আজ ভাঙবে। তাই মানুষের ভীড় আর কোলাহল আজকে যেন একটু বেশিই।
-শরিফা মা তুই? এই ভর দুপুর বেলা কোনহান থে আইলি?
শরিফাকে দেখে মুখে হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ে শহরের।
-স্লামালাইকুম চাচা। বাড়িত থাইকা আইলাম।
-দাঁড়ায়া আছস ক্যা? আয় বয়।
শহর হাঁক ছেড়ে রসুলকে ডাকে।
-রসুল কই গেলিগা? বেঞ্চিডা এট্টু পুইছা দে। নাহ! কামের সুমায় কাউরে ঠিক মত পাওন যায় না।
বিরক্তি নিয়ে কথা শেষ করে শহর।
রসুল শরিফাকে দেখে দৌড়ে আসে।
-শরিফা বু! তুমি কুন সুম আইলা?
মাথায় বাঁধা গামছাটা খুলে বেঞ্চ মুছতে মুছতে বলে,
-বহ বু।
-নারে! আজকে বমুনা।
শরিফা করিমের খোঁজে এদিক ওদিক তাঁকায়।
-চাচা করিম ভাইজান কই? হ্যারে তো দ্যাকতাছি না?
-করিম তো সহালে চালান লইয়া ঢাহা গেল।
শরিফা মুখটা কালো করে ফেলে।
-হ্যায় তো আইজকা আমারে ম্যালা ঘুরাইয়া দ্যাহাইবো কইছিল।
-করিম আমারে কিছু তো কইলো না। তাইলে আমি রসুলরে পাডাইতাম।
কৈফিয়ত দেবার চেষ্টা করে শহর।
শরিফা চুপ করে বেঞ্চিতে বসে পড়ে।
-মারে! তুই মন খারাপ করিস না। তর মুখটা কালা দ্যাকলে আমার খুব অস্থির লাগে।
শহর কি করবে ভেবে পায় বা। অস্বস্তিবোধ করে।
-ওমা! তর বুইড়া পোলাডার লগে যাবি ম্যালায়?
শরিফা ফিক করে হেসে দেয়।
-চলেন চাচা। তয় ভাইজানের উচিত বিচার করন লাগবো কিন্তু?
শহর হাসে।
-আইচ্ছা ঠিক আছে।
——————–
-চাচা! ওই চুড়িগুলা খুব সোন্দর না?
-হ মা! তুই কিনবি।
-কিনুম।
-চলেক যাই।
দুই জন কাঁচের চুড়ির দোকানগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায়।
শরিফা কয়েক গোছা চুড়ি দেখিয়ে দোকানী মহিলাকে পড়িয়ে দিতে বলে। শহর ভয় পায়। কাঁচের চুড়ি সাবধানে না পড়ালে ভেঙে আবার হাতে না রক্তারক্তি কান্ড হয়ে বসে। শহর দোকানীকে বলে,
-এই মাতারি! চুড়ি কিন্তুক সাবধানে পড়াইবা। দেইখো হাত জানি কাটে না।
দুই হাতে চুড়ি পড়ানো হলে, শরিফা বলে ওঠে,
-আমি চুড়ির সাথে মিলাইয়া টিপ কিনুম।
শহর হাসে।
-কেনেক মা।
শরিফা সবুজ টিপ পড়ে আয়নায় নিজেকে দেখে নেয়। তারপর শহরের সামনে দুই হাত বাড়িয়ে ধরে বলে,
-চাচা, সব ঠিক আছে না?
-মা, তরে পরীর লাহান সোন্দর লাগতাছে!
শরিফা লজ্জা পায়।
-আপনে তো সব সুমায়ই আমারে পরীর লাহান সোন্দর কন?
-ঠিকইতো আছে। তুই তো আমাগো পরীই।
শহর ভাবে,
-মাইয়াডা চোহের সামনেই হটাৎ বড় হয়া গেল। ঐদিনকার ছোড শরিফা। গাঁয়ের রঙ এক্কেবারে কাঁচা সোনার লাহান হইছে। মুহে সারাক্ষন হাসি লাইগাই থাহে। ওরে এইবার বিয়া দ্যাওন লাগবো। কথাডা শফিরে কওন দরকার।
শফির কথা মনে হতেই বিরক্ত হয় শহর।
-সব কিছুতেই উদাস থাহস ভালা কথা, মাইয়াডার বয়স চইলা যাইতাছে এইডাও দেহস না?
শহর বিরবির করে বলে,
-ভালা ঘর দেইহা রাজপুত্রের লাহান পোলা আনুম তর লাইগা!
-চাচা চলেন যাই।
শরিফার ডাকে সম্বিয়ত ফিরে পায় শহর। শরিফা শহরের পাশে আস্তে আস্তে হেঁটে চলে।
-মা, কিছু খাবি না?
শরিফা হাসে।
-বিপিন ঘোষের দোহানের জিলাপী খামু চাচা।
-চল যাই। যাওয়ার পথে তর বাপেরেও সাথে লইয়া যামুনে।

বি. দ্র. চতুরে বারোয়ারি উপন্যাসের অংশ হিসেবে অনেক আগে এটা লিখেছিলাম, শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি আর এগোয় নি। কিছুটা সম্পাদনা করে তাই সামুতে শেয়ার করলাম <img src=" style="border:0;" /><img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29355402 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29355402 2011-04-02 09:53:20
গল্পঃ সুখ চালকুমড়ার পাতা আর সরিষা দিয়ে শাকের বড়া বানিয়েছিল হালিমা বেগম। বাড়ির পিছনের জঙ্গল থেকে হেলেঞ্চা, কলমি আর কচুর কচিপাতা কুঁড়িয়ে এনে পাঁচমিশালী শাক রান্না করেছিল। দুটোই খুব পছন্দ করে সেলিম। বেচারার আর তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া হল না। ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হেডমাস্টার সাহেব বাড়ির উপর এসে এমন তাগাদা দেওয়া শুরু করল, কোনো রকমে নাকে মুখে খেয়ে মাস্টার সাহেবের সাথে বেরিয়ে পড়ল। ওদের পিছে পিছে বাহির বাড়ি পর্যন্ত এলো হালিমা বেগম। সাথে সাথে এলো তাঁর ছয় বছর বয়সের মেয়ে হাফসা। যতক্ষণ পর্যন্ত ছেলের আবছা ছায়া দেখা যায়, ততক্ষন পর্যন্ত তাঁকিয়ে থাকল সে। এরপর আঁচলে চোখ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলল হালিমা বেগম। ছেলেটি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এবার ঢাকা বিভাগে প্রথম হয়েছে। তাই, সার্কিট হাউসে ওকে সম্বর্ধনা দেবে ডিসি সাহেব। পড়ালেখার প্রতি অনেক আগ্রহ ছেলেটার। কিন্তু টাকার অভাবে এখনো ক্লাস সিক্সে ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে আছে। ওর বাবা সোলেমান শেখের তেমন সামর্থ্য নেই। বাড়িটার বামদিকে ছয় কানি জমি আছে। ওখানে বছরে দুইবার ধান আর একবার পিয়াজ লাগিয়ে যে টাকা পয়সা আসে, এতে কোনো রকমে দুই বেলা খেয়ে না খেয়ে চারটে মুখের সংসার চলে যায়। সেলিম স্কুলের সময়টুকু বাদে, বাকি সময় বাপকে কাজে সাহায্য করে, লোক জনের গালাগাল খেয়েও দূর-দূরান্ত থেকে গাভিটার জন্য ঘাষ কেটে আনে, বাছুরটাকে দেখে দেখে রাখে, নিজে নিজেই দুধ দুইয়ে বট তলার বাজারে বেঁচতে নিয়ে যায়। এই করেই দিন ফুরিয়ে যায়। রাতে যদিওবা একটু অবসর মেলে, সোলেমান শেখের অতটা সামর্থ্য নেই কেরোসিন তেল পুড়িয়ে ছেলেকে পড়াবে। হালিমা বেগমের সময় সময় কষ্টে বুক ফেটে যায়, বাচ্চা দুইটা বড় হচ্ছে। অথচ কোনোদিনও ভালো মন্দ দুইটা কিছু খাওয়াতে পারল না। পোলাও, মাংস, পিঠা-পুলি; কিছুই চোখে দেখে নি বাচ্চা দুইটা। সেলিম যখন গাভীর দুধ দোহায়, হাফসার শিশু চোখ লোভী দৃষ্টি নিয়ে সেদিকে অপলক তাঁকিয়ে থাকে অমৃত তৃষ্ণায়। হালিমা বেগম সব জানে, সব বুঝে; তবুও পাষণ্ডর মত নির্লিপ্ত থাকে তাঁর চোখ, তাঁর ঠোট। কিন্তু হায়! কেউ যদি একবার হালিমা বেগমের অন্তরটা পড়ে দেখতে পাড়ত। কত ঝড় বয়ে যায় রোজ সেখানে! কত নদী কান্নার বসবাস সেখানে, কেউ যদি বুঝত! এই দুধ বেঁচা টাকা দিয়েই যে তেল, নুন, মরিচের যোগার আসে ওদের সংসারে!

গত মৌসুমে পিয়াজের দাম হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখতে পারে নি সোলেমান শেখ। তাই গত রোজার ঈদে বাচ্চা দুইটাকে নতুন পোষাক কিনে দিতে পারে নি সে। বছরে একবারই জামা জোটে ওদের দুই জনের। গত ঈদে জোটে নি। সেলিম কিছু বলে নি। সেলিম কখনো কিছু বলে না। পেটে ক্ষুধা থাকলেও বলে না, মা আর এক মুঠ ভাত দাও! কিন্তু হাফসা কিছু মানতে চায় না। ছোট মানুষ! পৃথিবীর কি সে বুঝে! নতুন জামা না পেয়ে সারাদিন চিল্লাচিল্লি করে কেঁদে গলা ভেঙেছে। হালিমা বেগম সেদিন আর নির্লিপ্ত থাকতে পারে নি। কাঁচা কঞ্চি দিয়ে দুই জনকেই ইচ্ছামত পিটিয়েছে, ওদেরকে আরো কাঁদিয়েছে, নিজে কেঁদেছে। একটাই মাত্র হ্যাফ প্যান্ট সেলিমের। দুই বছর ধরে ক্রমাগত পড়তে পড়তে বেশ কয়েক যায়গায় হালিমা বেগমের হাতের সযতন তালি পড়েছে। এক মাত্র শার্ট, পেছনের দিকটায় ভাঁজ হয়ে কুচকে গেছে। সেলিম অবশ্য শার্টটা শুধু স্কুলে যাওয়ার জন্যই পড়ত, আর বাকিটা সময় খালি গায়ে থাকত। সমাপনী পরীক্ষার সময় সোলেমান শেখ নতুন একজোড়া স্পঞ্জের রূপসা স্যান্ডেল কিনে এনে দিয়েছিল। এই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে যাওয়াটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল সেলিমের এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেলের অভাবে। তালি পড়া হাফ প্যান্ট কুচকে যাওয়া শার্টের আড়ালে হয়ত ঢেকে যাবে, কিন্তু স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়ে এত বড় বড় অতিথীর সামনে কীভাবে যাওয়া যায়! সেলিম অবশ্য বাবার কাছে স্যান্ডেলের কথা তুলে নি। ওর অনুষ্ঠানে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে যেন কোনো আগ্রহ নেই। হালিমা বেগম ভিতরে ভিতরে বিষয়টি মেনে নিতে পাড়ছিল না, তবুও স্বামীর কাছে স্যান্ডেলের কথা তোলে নি। তুলেই বা লাভ কি, তাঁর স্বামীর অবস্থা তাঁর চেয়ে আর কেইবা ভালো বুঝবে। কাল যখন সোলেমান শেখ ছেলে-মেয়ের জন্য নতুন জামা আর এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেল নিয়ে এলো, হালিমা বেগম এতই অবাক হয়েছিল, কথাই বলতে পারছিল না। বার বার শুধু কেঁদে ফেলছিল। হয়ত সোলেমান শেখও কেঁদে ছিল, স্যান্ডেল জোড়া কেনার সময়, ছেলের হাতে দেওয়ার সময়। পুরুষ মানুষও সুখের সময় কাঁদতে জানে, পুরুষ মানুষেরও বুকের মাঝে একটা কান্নার নদী থাকে।

-মা, ম্যাভাইরে খুব সোন্দর লাগতাছে না?
হাফসার ডাকে যেন সম্বিত ফিরে পায় হালিমা বেগম। তাঁর ঠোটের কোনায় ম্লান একটা হাসি মুক্তোর দানার মত ঝরে পরে।
-হ রে মা!
হালিমা বেগমের হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে যায়।
-কিরে! তরে তো অহনো খাইতে দিলাম না! মানুষটায়ও খায় নাই। চল দুইটা খায়া, তর বাপজানের লাইগা ভাত লইয়া যাবি।

২.
হালিমা বেগম হাড়িতে নিজের জন্য দুই এক মুঠো ভাত রেখে বাকিটা থালায় সুন্দর করে সাজাল। এক পাশে দুই ফালি কাটা পিয়াজ, দুইটা কাঁচা মরিচ, কিছু লবন রাখল। সকালের বানানো চালকুমড়া পাতার দুইটা বড়া, পাঁচ মিশালী শাক কড়াইয়ে যেটুকু ছিল সবটুকু রাখল আরেক পাশে। এরপর আরেকটা থালা দিয়ে খাবার ঢেকে দিয়ে গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে গিট দিতে দিতে হাফসাকে বলল, তর খাওয়া শ্যাষ হইলে বাজানের লাইগা লইয়া যাইস।

শ্বাস নেওয়ার জন্য কিছুক্ষন থেমে আবার বলল, দাঁড়া, আগেই যাইস না। গেলাসটা মাইজা লইয়া আসি, হেয়ার পরে যাইস।
হাফসার খাওয়া ততক্ষণে শেষ হয়ে এসেছে। আঙুল দিয়ে থালার খাবারের শেষ কণাগুলো চেটে খাওয়ার পর, ওর চোখ পড়ল পাটিতে পড়ে থাকা দুই চারটা ভাতের দিকে। একটা একটা করে মুখে পুরে নিচ্ছিল ও। এতক্ষণে হালিমা বেগম ফুরসুরৎ পেল হাফসার দিকে তাঁকানোর। মেয়েটার কাজ-কারবার দেখে মৃদু হাসল সে।
-কিরে হাফসা? প্যাটে এহনো ক্ষিদা আছে?

হাফসা কিছু বলল না। সম্মতির মতো করে লাজুক হাসি হাসল। হালিমা বেগম হাড়ির শেষ ভাতটুকু হাফসার থালায় ঢেলে দিল। স্বামীর ভাতের থালার গিট খুলে একটা বড়া হাফসার থালায় রাখল। অপ্রত্যাশিতভাবে কিছু পেলে মানুষের চোখ যেমন ঝিলিক দিয়ে ওঠে, দেবশিশুটির চোখেও যেন সেই খুশির ঝিলিক খেলে গেল। হালিমা বেগমের বুকের ভিতর যেন কেমন একটা অনুভূতি খেলে গেল। কোথায় যেন একটা সুখ সুখ অনুভূতি তাঁকে মোহিত করে তুলছিল।
-বোকা মাইয়া! তর এহনো ক্ষিদা আছে আগে কইবি না?

হালিমা বেগম মনের সুখে দেবশিশুটির খাওয়া দেখে চলল। পৃথিবীর সকল মা তাঁর সন্তানকে খাওয়ানোর মাঝে যে সুখ পায়, তার চাওয়া-পাওয়া পূরন করে যে আনন্দ পায়, এ সুখ, এ আনন্দ এমন, আর কিছুর সাথে তার তুলনা নেই। হালিমা বেগমের চোখে কখন যে জল চলে এসেছে, একটুও টের পায় নি। নাহ! গতকাল থেকে তাঁর সুখের রোগে পেয়ে বসেছে। পোড়া চোখে জল আসে, যতই লুকোতে চায়, বাঁধা দিতে চায়, ওরা বাঁধ ভেঙে জোয়ারের মত বারে বারে ফিরে আসে।

৩.

সোলেমান শেখের খুব ইচ্ছে ছিল ছেলের সাথে যাবার। মাস্টার সাহেবও ধরেছিল যাবার জন্য। কিন্তু জীবনযুদ্ধে ক্রমশ পরাজীত হয়ে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল নিজের কাছেই, তাই সাহস করে মাস্টার সাহেবকে হ্যা বলতে পারে নি। নানা কাজের বাহানা দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে।

নতুন শার্ট, প্যান্ট, চামড়ার স্যান্ডেলে ছেলেকে কেমন দেখায়, সেটা দেখারও খুব ইচ্ছে ছিল। সোলেমান শেখ সে ইচ্ছেকেও পাত্তা দেয় নি। পরাজীত মানুষদের যেন কোনো সখ থাকতে নেই, ইচ্ছে থাকতে নেই। ক্ষেতে পিয়াজ লাগানোর মৌসুম চলে যাচ্ছে। তাঁর পক্ষে কলের লাঙল ভাড়া এনে জমি চাষ দেওয়া সম্ভব নয়। ক্ষেতে লাঙল দেওয়ার জন্য রহিম সরদারের ষাড় ভাড়া নেয়া, আর সেচের জন্য হাতে ক’টা টাকা ছিল। অন্য চাষীরা আগেই ভাড়া নিয়ে নেয়ায়, তাঁর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এর মধ্যেই সেলিমের পরীক্ষার রেজাল্ট এলো। মাস্টারদের কাছে ছেলের অনেক প্রশংসা শুনেছে সে, সেলিমের মাথা ভালো। তাঁর ধারনা ছিল সেলিম পরীক্ষায় পাশ করবে। কিন্তু এমন রেজাল্ট করতে পারবে ভাবতেও পারে নি। ছেলের কথা ভাবলেই গর্বে বুক ভড়ে ওঠে সোলেমান শেখের। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিতে চায় না সে। সারাটা জীবন ধরে যে মানুষটা দুঃখ-কষ্ট সয়ে এসেছে, সে হঠাৎ পাওয়া আনন্দে আর সবার মত উল্লাসে মেতে উঠতে পারে না। এ আনন্দে সে আরো বিনয়ী হয়ে ওঠে, একা একাই নিজের মাঝে ডুবে থেকে আনন্দে মেতে ওঠে। সেখানের সবটুকু আনন্দই, সবটুকু সুখই তাঁর। কাউকে ভাগ দিয়ে হয় না এতটুকুও।

সেই টাকা দিয়ে ছেলে মেয়ের জন্য নতুন জামা কাপড়, চামড়ার স্যান্ডেল কিনে এনেছে সোলেমান শেখ। সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর এতটুকুও সময় লাগে নি। সুখের রোগ তাঁকেও পেয়ে বসেছে। জীবনের চুয়াল্লিশটা বছর পেরিয়ে হঠাৎ করেই যেন বদলে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। সুখের জন্য কাঙাল হয়ে ছটফট করে তাঁর মন, ছেলেটার হাসি দেখবার সুখ, মেয়েটার উচ্ছলতা দেখবার সুখ।

ফজরের নামাজ পড়েই হাতে কোদাল তুলে নিয়েছে সে। জমি কুপিয়ে কুপিয়ে ক্ষেতের মাটি আলগা করছে, বাশের মুগুর দিয়ে বড় বড় মাটির দলা ভাঙছে। শরীর থেকে ঘাম ঝরছে, সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তবুও থামতে পারছে না। সুখ! আহা সুখ! তাঁর সুখের রোগে পেয়ে বসেছে। অদ্ভুত এ রোগ! কোদালের প্রতিটা কোপে সুখ বেয়ে নামে শরীরে, মুগুরের প্রতিটি বাড়িতে সুখ খেলা করে শরীরে। হিল্লোল তোলে সুখ টুপটাপ ঝরে পড়া ঘামের তালে তালে।

-আব্বা তুমার লাইগা খাওন আনছি। এহনি খাইয়া লও।
ক্ষেতের আলের পাশে দাঁড়িয়ে আদেশের সুরে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে চলে হাফসা। মেয়ের দিকে তাঁকিয়ে মৃদু হাসে সোলেমান শেখ।
-আইছস মা! খাড়া! আইতাছি।

সে মেয়ের কাছে চলে এলে, হাফসা পানির জগ কাত করে ধরে। ময়লা হাতদুটো ধুয়ে নেয় সে। এরপর নিজেই জগ হাতে নিয়ে মুখে, ঘাড়ে, গলায় পানির ছিটা দেয়। কোমরে গিট বাঁধা গামছাটা খুলে হাতমুখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করে, মারে! সেলিম কি চইলা গ্যাছেগা?
হাফসা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
-নুতন জামা কাপড়ে ওরে ক্যামন দেহাইতেছিল রে?
-ম্যাভাইরে ম্যালা সোন্দর লাগতাছিল।
কথাটা বলে যেন খুব আনন্দ পায় হাফসা।
-কিরে! তর জামাডা পছন্দ হইছে তো?
-হু, খুব ভালা হইছে।

সোলেমান শেখ ভাতের থালা খুলতে খুলতে বলে, তুই খাইছস তো?
-আমি তো খায়ায় তুমার লাইগা খাওন লইয়া আইলাম।
-বুড়ি, তর মায় খাইছেনি রে?
-মা পরে খাইবোনে। তুমি আগে খায়া লও।

সোলেমান শেখ মৃদু হেসে ওঠে। মেয়েটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে সে জানে, তবুও বারে বারে নতুন করে জেনে নিতে ইচ্ছে করে তাঁর। সে ভাত মাখিয়ে মেয়ের মুখে তুলে দেয়, নিজে দুই এক লোকমা খায়। সুখ! আহা সুখ! সোলেমান শেখের সুখ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে, বাতাসে, ক্ষেতের আলের ধারে বসা দেবশিশুটির মাঝে। অদ্ভুত ক্ষমতা এ সুখের অসুখের।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29297632 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29297632 2010-12-28 15:59:12
ও. হেনরীর ছোট গল্প : দি লাস্ট লিফ
ওয়াশিংটন স্কয়ারের পশ্চিমে এক ছোট জেলা, যেখানে রাস্তাগুলো অনিরাপদভাবে ছুটে চলেছে এবং ভেঙে ভেঙে নিজেদের ভিতরে ছোট ছোট ‘গলি’ তৈরী করেছে। এই গলিগুলোতে গড়ে উঠেছে অদ্ভুত সব কোণা কানছি আর বাঁক। একটি রাস্তা নিজের উপর দিয়ে এক দুইবার করে অতিক্রম করে গেছে। একবার এক চিত্রশিল্পী এই রাস্তাটির মাঝে এক মূল্যবান সম্ভাবনা আবিষ্কার করে বসলেন। মনে করুন, একজন সংগ্রাহক রঙ, কাগজ এবং ক্যানভাসের জন্য বিল সাথে নিয়ে এই পথের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎকরে দেখল সে আগের জায়গায়ই ফিরে এসছে, এর জন্য তাকে এক পয়সাও খরচ করতে হয় নি!

তাই, চিত্রশিল্পীরা খুব তাড়াতাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এই অদ্ভুত পুরনো গ্রিনিচ গ্রামে চলে এল, খুঁজে বের করল উত্তর দিকের জানালাসহ আঠার শতকের পুরনো গ্যাবল (ডাচ গ্যাবল জ্যাকোবিয়ান সময়ের ইংল্যান্ডের বিশেষ স্থাপত্যের বাড়ী), কম ভাড়ায় এক ডাচ চিলেকোঠা। এরপর তাঁরা ছয় নম্বর এভিনিউ থেকে রান্না করা ও খাবার গরম রাখার জন্য চুল্লিযুক্ত দুই একটি পাত্র এবং কিছু পিউটর মগ নিয়ে এসে এখানে কলোনি গড়ল।

তিন তালা পাকা বাড়িটির নীচ তলায় ছিল সিউ ও জনসির স্টুডিও। ‘জনসি’ জোয়ান্না নামে পরিচিত ছিলেন। একজন এসেছিল মেইন থেকে, অন্যজন ক্যালিফোর্নিয়া। আট নম্বর স্ট্রীটের “ডেলমনিকো’স” হোটেলের খাবার টেবিলে তাঁদের পরিচয় হল এবং তাঁরা দেখলেন শিল্প, চিকরি সালাদ ও বিশপ স্লিভ (ফুল হাতার জামা বিশেষ) এ তাঁদের রূচির অনেক মিল, যার ফলশ্রুতিতে এই যৌথ স্টুডিওটি দাঁড়িয়ে গেল।

সময়টা ছিল মে মাস। নভেম্বরে এক শীতল, অদেখা আগন্তুক, যাকে ডাক্তাররা ডাকত নিউমোনিয়া, কলোনিতে জেকে বসল, তাঁর হিমশীতল আঙুলগুলো এখানে সেখানে স্পর্শ করল। এই ধ্বংসকারী দুঃসাহসিকভাবে লম্বা লম্বা পা ফেলে পূর্ব দিকে এগোলেন, তার শিকারকে আঁচড় বসিয়ে সজোরে আঘাত করলেন, কিন্তু এই সরু ও শেওলা পড়া গোলক ধাঁধার ‘গলি’ দিয়ে তার পা আস্তে আস্তে পথ মাড়াল।

একজন আদর্শ নাইট, বয়স্ক সজ্জন ব্যক্তিকে আপনি যা ডাকতে পারেন, নিউমোনিয়া সাহেব তেমনটি নন। ক্যালিফোর্নিয়ার মৃদুমন্দ পশ্চিমা বায়ুর সহানুভূতির পাত্র রক্তশূন্য ছোট মেয়েটি ছিল লাল মুঠো, স্বল্পস্থায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের নির্বোধ বুড়োটার জন্য নামেমাত্র বৈধ আক্রমণস্থল। তাই জনসিকে সে সজোরে আঘাত করে বসল; জনসি বিছানায় পড়ে গেল, হাঁটা চলা করত না বললেই চলে, নিজের আলপনা আঁকা লোহার খাটে শুয়ে শুয়ে ছোট ডাচ জানালার শার্সির কাচের ভিতর দিয়ে সামনের পাকা বাড়িটার শূন্য দিকটায় চেয়ে থাকত।

একদিন সকালে সিউয়ের আমন্ত্রণে উস্কখুস্ক, ধূসর ভ্রু’র এক ব্যস্ত ডাক্তার বিল্ডিংয়ে এলেন।

“তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দশে এক ”, ডাক্তার তাঁর ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারের পারদ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, “এবং তাঁর জন্য এই সম্ভাবনাটি হল তাঁর নিজের বেঁচে থাকার ইচ্ছা। শেষ সীমানায় পৌছে যাওয়া মানুষ জন এই উপায়েই আবার ফিরে আসে – যে সীমানায় মৃত্যুদূত সমগ্র ফার্মাকোপিডিয়াকে নিরর্থক বানিয়ে ফেলে। আপনার এই ছোট মেয়েটি নিজের মনকে বুঝিয়েছে সে আর সুস্থ হতে যাচ্ছে না। তাঁর মনে এছাড়া আর অন্যকিছু আছে কি?”

“সে – সে কিছুদিন নেপলস উপসাগরকে আঁকতে চেয়েছিল।”, সিউ বলল।

“চিত্রাঙ্কণ? – নাহ! তাঁর মনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিন্তা দুইবার এসেছিল কি – যেমন ধরুন কোনো মানুষকে নিয়ে?”

“কোনো মানুষ?”, জিউ’স হার্পের (এক ধরণের বাদ্য বিশেষ) টুং টাং শব্দের মত কর্কশ নাকি সুরে সিউ বলল, “কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ – কিন্তু, না, ডাক্তার; এমন কিছু হয় নি।”

“আচ্ছা, এটাই তাহলে তাঁর দুর্বলতা”, ডাক্তার বলল। “আমার সামর্থ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব, বিজ্ঞান অনুসারে আমি তার সবটুকুই করব। কিন্তু যখনই আমার রোগী তাঁর শব যাত্রার দিন গুনতে শুরু করবে, আমি ঔষধের উপশম-সহায়ক ক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসবো। নতুন শীতের ধরনে তাঁর ক্লোক স্লিভে (ফুল হাতার আলখাল্লা বিশেষ) কেমন লাগছে যদি আপনি তাঁকে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করতে পারতেন, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে দশে একের পরিবর্তে পাঁচে এক হবে।”

ডাক্তার চলে গেলে, সিউ তাঁর ওয়ার্করুমে গিয়ে নরম জাপানী ন্যাপকিনে মুখ ঢেকে কাঁদলেন। এরপর সে তাঁর ড্রয়িং বোর্ড নিয়ে তর্জন গর্জন করতে করতে জনসির রুমে গিয়ে সিটি বাঁজিয়ে র‍্যাগটাইম (১৯২০ এর দশকের নিগ্রোদের জনপ্রিয় গান) গাইতে লাগলেন।

জনসি কাঁথার নিচে বড়ো জোর একটু নড়াচড়া করে, জানালার দিকে মুখ করে শুয়ে রইল। সিউ সিটি বাঁজানো থামিয়ে ভাবলেন, জনসি ঘুমিয়ে আছে।

সে তাঁর বোর্ড সাজিয়ে ম্যাগাজিনের গল্প ফুটিয়ে তোলার জন্য কলম-কালি দিয়ে চিত্র আঁকতে শুরু করলেন। একজন নবীন চিত্রশিল্পীকে শিল্পকলায় প্রতিষ্ঠা পেতে হলে অবশ্যই ম্যাগাজিনের গল্পের জন্য চিত্র আঁকতে হয়, যেমন একজন নবীন লেখককে প্রতিষ্ঠা পেতে গল্প লিখতে হয় ম্যাগাজিনের জন্য।

সিউ ঘোড়-দৌড়ে পড়ার জন্য এক জোড়া রুচিশীল পায়জামা এবং গল্পের নায়ক, এক ইডাহো (যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য) রাখালের একপার্শ্বিক চিত্রের স্কেচ আঁকছিলেন, তখন সে বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তিসহ নিচু স্বরের একটি শব্দ শুনতে পেলেন। সে দ্রুত বিছানার পাশে ছুটে গেলেন।

জনসির চোখ পুরোপুরি খোলা ছিল। সে জানালার বাইরে তাঁকিয়ে গুনছিল – উল্টো দিক থেকে গননা।

“বারো”, সে বলল, এবং অল্প সময় পরে, “এগারো”; এরপর “দশ”, “নয়”; “আট”, সাত”, প্রায় এক সাথেই।

সিউ উৎকণ্ঠিতভাবে জানালার বাইরে তাঁকালো। কি আছে সেখানে গোনার মতো? সেখানে দেখা যাচ্ছিল এক শূন্য, বিষণ্ণ উঠোন, এবং কুড়ি ফুট দূরে এক পাকা বাড়ির শূন্য অংশ। একটি পুরনো, গাঁটযুক্ত ও ক্ষয়ে যাওয়া শিকড়যুক্ত বয়স্ক আইভি লতা ইটের দেয়ালের অর্ধেকটায় বেয়ে উঠেছিল। পরিত্যক্ত ইটের দেয়ালে প্রায় শূন্য লতাটির কাঠামো প্রশাখা দৃঢ়ভাবে লেগেছিল, যতক্ষন পর্যন্ত না হেমন্তের শীতল হাওয়া লতাটি থেকে পাতাগুলোকে দুর্বল করে ফেলেছিল।

“কি করছো, সোনা?” সিউ জিজ্ঞাসা করল।

“ছয়”, প্রায় ফিসফিস করে বলল জনসি। “ওরা এখন খুব দ্রুত পড়ে যাচ্ছে। তিন দিন আগেও প্রায় একশটা ছিল। ওগুলো গুনতে গুনতে আমার মাথাটা ধরে এসেছিল। কিন্তু এখন সহজ হয়ে এসেছে। আরেকটা পড়ে গেল। এখন আর মাত্র পাঁচটি বাকি আছে।”

“পাঁচটি কি, সোনা? তোমার সিউডিকে বলো?”

“পাতা। আইভি লতার। যখন শেষ পাতাটি পড়ে যাবে, আমিও অবশ্যই চলে যাবো। তিন দিন হল এটি আমি জেনেছি। ডাক্তার কি তোমাকে বলে নি?”

“ওহ! এই ধরনের অর্থহীন কথা আমি আর কখনো শুনি নি,” আশ্চর্যরকম অবজ্ঞার সুরে অভিযোগ করে বলল সিউ। “তোমার সুস্থ হয়ে যাওয়ার সাথে বুড়ো আইভি পাতার কি সম্পর্ক? তুমি ঐ লতাকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছো, দুষ্ট মেয়ে। বোকার মত আচরন করো না। কেন, ডাক্তার তো আজ সকালেই আমাকে বলল তোমার দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবার ভালো সম্ভাবনা আছে – মনে আছে তোমার, ডাক্তার ঠিক কি বলেছিল – সে বলল, সম্ভাবনা দশে এক! কেন, এটা তো প্রায়ই একটি ভালো সম্ভাবনা হতে পাড়ত যদি আমরা নিউ ইয়র্কে স্ট্রিট কারে চড়ে ঘুরে বেড়াতাম অথবা একটি নতুন বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতাম। এখন কিছুটা স্যুপ খাওয়ার চেষ্টা করো এবং তোমার সিউডিকে তাঁর ড্রয়িংয়ের কাছে আবার ফিরে যেতে দাও, যাতে সে ওগুলো সম্পাদক সাহেবের কাছে বিক্রি করে তাঁর অসুস্থ বাচ্চাটার জন্য পোর্ট ওয়াইন (পর্তুগালের গাঢ় লাল বা সাদা, উগ্র, মিষ্ট মদ বিশেষ) এবং নিজের জন্য লোভনীয় শুকরের চপ কিনতে পারে।”

“তোমাকে আর ওয়াইন কিনতে হবে না,” জানালার বাইরের তাঁর দৃষ্টি স্থির রেখে, জনসি বলল। “আরেকটা পড়ে গেল। না, আমি কোনো স্যুপ চাই না। আর মাত্র চারটা পাতা আছে। অন্ধকার নেমে আসার আগেই আমি শেষ পাতাটির পড়ে যাওয়া দেখতে চাই। এর পরে আমিও চলে যাবো।”

“জনসি, সোনা,” তাঁর উপর নুয়ে পড়ে সিউ বলল, “তুমি কি আমাকে কথা দিবে, তোমার চোখদুটো বন্ধ রাখবে, এবং যতক্ষন পর্যন্ত আমার কাজ শেষ না হয় তুমি জানালার বাইরে তাঁকাবে না? আমাকে ছবিগুলো কালকেই জমা দিতে হবে। আমার আলো দরকার, না হলে আমি পর্দা টেনেই আঁকতাম।”

“তুমি অন্য রুমে গিয়ে আঁকতে পারো না?” নিষ্প্রাণভাবে বলল জনসি।

“আমাকে এখানে তোমার পাশেও থাকতে হবে,” সিউ বলল। “এছাড়া, আমি চাই না তুমি ঐসব তুচ্ছ আইভি পাতার দিকে তাঁকিয়ে থাকো।”

“তোমার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমাকে বোলো,” ফ্যাকাশে ও ভূপতিত স্ট্যাচুর মত শুয়ে থেকে, চোখদুটো বন্ধ রেখে জনসি বলল, “কারন আমি শেষ পাতাটির পড়ে যাওয়া দেখতে চাই। আমি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। আমি ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত। আমি সকল বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চাই, ক্রমশ ডুবে যেতে চাই, ঠিক ঐসব নিঃস্ব, ক্লান্ত পাতাগুলোর মত।”

“ঘুমোতে চেষ্টা করো,” সিউ বলল। “বৃদ্ধ নির্জনবাসী খনি-শ্রমিকের মডেল হবার জন্য আমাকে বেহরম্যানকে ডাকতে যেতেই হবে। আমার যেতে এক মিনিটও লাগবে না। আমি না ফেরা পর্যন্ত নড়াচড়ার চেষ্টা করো না।”

বৃদ্ধ বেহরম্যান ছিলেন একজন পেইন্টার, যিনি তাঁদের নিচে গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকতেন। ষাট পেরোনো এই বুড়োর মাইকেল এঞ্জেলোর ‘মোজেসে’র মত দাড়ি ছিল, যেন স্যাটারের মাথা থেকে কোঁকড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে এবং দেহখানা খুদে শয়তানের মতো। (ইতালীর বিখ্যাত চিত্রকর ও ভাস্কর মাইকেল এঞ্জেলোর ভাস্কর্য ‘মোজেস’; দুই সুশোভিত মার্বেল স্তম্ভের মাঝখানে মার্বেল চেয়ারে বসা মোজেস, যার দীর্ঘ দাড়ি কোলের উপরে এসে পড়েছে। মোজেস ইসলাম ধর্মে মুসা নবী নামে পরিচিত ও ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক। স্যাটার গ্রীক ও রোমান পুরানে উল্লেখিত অর্ধমানব ও অর্ধপশুরূপী বনদেবতা।) বেহরম্যান চিত্রশিল্পে ছিলেন ব্যর্থ। চল্লিশ বছর ধরে ব্রাশ ঘষেও তাঁর গিন্নীর গাউনের আঁচলের কাছাকাছি কিছু একটা আঁকতে পারেন নি। সে সবসময় তাঁর শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মটি আঁকার কথা ভাবত, কিন্তু কখনোই সেটা শুরু করতে পারে নি। বেশ কয়েক বছর ধরে, কিছু ইতঃস্তত বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী আনাড়ি চিত্র আঁকা ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারে নি সে। কলোনির নবীন আঁকিয়ে যাদের পেশাদার চিত্রশিল্পীর মতো অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাঁদের মডেল হিসেবে কাজ করে সে অল্প কিছু উপার্জন করত। সে মাত্রাতিরিক্ত জিন (মদ বিশেষ) পান করত এবং সবসময় তাঁর আসন্ন শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মটি সম্পর্কে কথা বলত। বাকিটা সময় সে ছিল একজন রাগী ছোটখাটো বুড়ো মানুষ, অন্যের স্নেহ-মমতা পাওয়ার জন্য যে ছিল ক্ষুধার্ত, এবং নিজেকে গণ্য করেছিল অপেক্ষমান বিশেষ মাস্টিফ (প্রহরাকাজে দক্ষ, বড় আকারের শক্তিশালী কুকুর বিশেষ) হিসেবে যে উপরের স্টুডিওটির দুই নবীন চিত্রশিল্পীকে বাঁচাতে যাচ্ছিলেন।

সিউ বেহরম্যানকে তাঁর অনুজ্জ্বলভাবে আলোকিত আস্তানায় প্রবলভাবে জুনিপার (চিরসবুজ গুল্ম বিশেষ) ফলের ঘ্রাণ নিতে দেখতে পেলেন। এক কোণায় কাঠের ফ্রেমে একটি শূন্য ক্যানভাস সাজানো ছিল, শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মটির রূপ পেতে প্রথম রেখাটির জন্য যা পচিশ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে। সিউ বেহরম্যানকে জনসির অবাস্তব কল্পনার কথা বলল, বলল কতটা শঙ্কিত দেখাচ্ছে তাঁকে, নিজেকে তুচ্ছ ও ঠুনকো পাতার মত ভাবছে, ভেসে চলে যাচ্ছে দূরে, পৃথিবীর প্রতি তাঁর ক্ষুদ্র বন্ধন ক্রমশ দুর্বলতর হচ্ছে।

বুড়ো বেহরম্যানের রক্তিম চোখদুটোতে অশ্রুর বন্যা বেয়ে গেল, সে চেঁচিয়ে এই নির্বোধ ধরনের কল্পনাকে অবজ্ঞা ও উপহাস করল।

“ধুর!” সে কেঁদে ফেলল। “পৃথিবীতে এমন লোকও আছে, যারা তাঁদের নির্বুদ্ধিতার জন্য মারা যাবে, এক দুর্দশাগ্রস্ত লতা থেকে পাতাগুলো ঝরে পড়ে যাচ্ছে এই কারনে? আমি এই ধরনের কথা আগে কখনো শুনি নি। না, আমি আপনার বোকা নির্জনবাসী – নির্বোধ ব্যক্তির মডেলের পোজ দিতে পারব না। এই ধরনের বোকাটে কারবার কেন আপনি তাঁর মাথায় আসতে দিলেন? আহ, বেচারা ছোট্ট মিস জনসি।”

“সে এখন খুবই অসুস্থ ও দুর্বল,” সিউ বলল, “ এবং জ্বর তাঁর মনটাকে অসুস্থ করে দিয়েছে, আজব সব অবাস্তব কল্পনায় তাঁর মন ভরে উঠেছে। খুব ভালো, বেহরম্যান সাহেব, যদি আপনি আমার জন্য পোজ দিতে না চান, আপনাকে প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি একজন কুৎসিত বুড়ো – গল্পগুজবপ্রিয় বুড়ো ফচকে।”

“আপনিও আর দশটা মেয়ে মানুষের মতো!” চেঁচিয়ে উঠল বেহরম্যান। “কে বলল আমি পোজ দিব না? চলুন। আমি আপনার সাথে যাচ্ছি। আধা ঘন্টা ধরে আপনাকে আমি বলার চেষ্টা করছি, পোজ দিতে আমি প্রস্তুত। হায় ইশ্বর! এমন কোনো জায়গা থাকতে পারে না যেখানে মিস জনসির মতো একজন ভালো মানুষকে অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে। একদিন আমি আমার শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মটি আঁকব, এবং একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। হায় ইশ্বর! হ্যাঁ।”

তাঁরা উপরের তলায় যখন গেল, জনসি তখন ঘুমোচ্ছিল। সিউ জানালার চৌকাঠ পর্যন্ত পর্দা টেনে দিয়ে বেহরম্যানকে ইশারা করে অন্য রুমে যেতে বলল। সেখানে তাঁরা ভয়ের সাথে জানালার বাইরে উকি দিয়ে আইভি লতাটিকে দেখল। এরপর তাঁরা নিশ্চুপ থেকে কিছু সময়ের জন্য একে অপরের দিকে তাঁকালো। তুষারপাতসহ অবিরামভাবে শৈত্য বৃষ্টি পড়ছিল। বেহরম্যান তাঁর পুরনো নীল শার্টটি গায়ে চড়িয়ে, উল্টে রাখা কেটলির উপর অবিচলিতভাবে নির্জনবাসী খনি – শ্রমিকের মত বসে পড়ল।

পর দিন সকালে সিউ যখন তাঁর এক ঘন্টার ঘুম থেকে জেগে উঠল, জনসিকে দেখতে পেল মলিন, পুরোপুরি খোলা চোখ নিয়ে এক দৃষ্টিতে টেনে দেয়া সবুজ পর্দাটার দিকে তাঁকিয়ে আছে।

“এটাকে উপরে টেনে দাও; আমি দেখতে চাই,” জনসি ফিসফিসিয়ে নির্দেশ দিল।

সিউ ক্লান্তভাবে নির্দেশ পালন করলেন।

কিন্তু, দেখুন! সারা রাত ধরে তীব্র বৃষ্টিপাত ও আকষ্মিক প্রবল ঝড়ো হাওয়া সহ্য করার পরেও, ইটের দেয়ালে একটা আইভি পাতা তখনো টিকে আছে। এটা ছিল লতাটির শেষ পাতা। কান্ডের কাছে এটি এখনো গাঢ় সবুজ; মলিন ও ক্ষয়ে যাওয়া খাঁজ কাটা হলুদ প্রান্ত নিয়েও মাটি থেকে কুড়ি ফুট উপরে এক প্রশাখার সাথে চমৎকারভাবে ঝুলে আছে।

“এটাই শেষ পাতা,” জনসি বলল, “আমি ভেবে ছিলাম, এটা নিশ্চিতভাবেই কাল রাতে পড়ে গেছে। আমি বাতাসের শব্দ শুনেছিলাম। এটা আজকে পড়ে যাবে, এবং তখন আমিও মরে যাবো।”

“সোনা, সোনা!” সিউ তাঁর মলিন মুখখানা বালিশে চেপে বলল, “যদি তুমি তোমার কথা ভাবতে না চাও, তবে আমার কথা ভাবো। তাহলে আমি কি করব?”

কিন্তু জনসি কোনো উত্তর দিল না। একটি আত্না যখন তাঁর রহস্যময়, দূরের যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তখন এটি হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি একাকী আর দুঃখকাতর কোনো অস্তিত্ব। অবাস্তব কল্পনা তাঁর মাঝে এত প্রবলভাবে ভর করে যেন সব ধরনের বন্ধন যা তাঁকে বেঁধে ছিল বন্ধুত্বের মাঝে, পৃথিবীর সাথে, এক এক করে মুক্ত হয়ে যায়।

দিন পেরিয়ে গেল, এমনকি গোধূলির সময়ও তাঁরা নিঃসঙ্গ আইভি পাতাটিকে দেয়ালের উপর তার কান্ডের সাথে দৃঢ়ভাবে এঁটে থাকলে দেখল। এবং এরপর, রাত নেমে এলে উত্তরীয় হাওয়া আবার বইতে শুরু করল, জানালার উপর বৃষ্টি আছড়ে পড়ল সেদিনও এবং ছাদের সামনের দিকের নিচু অংশ দিয়ে টিপটিপ করে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ল।

যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল, হৃদয়হীনা জনসি পর্দাটিকে উপরে টেনে দিতে আদেশ দিল।

আইভি পাতাটি তখনো সেখানে ছিল।

জনসি বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এটার দিকে তাঁকিয়ে থাকল। এরপর সে সিউকে ডাকল, সিউ তখন গ্যাসের চুল্লীর উপর রাখা চিকেন স্যুপকে চামচ দিয়ে নেড়ে দিচ্ছিল।

“আমি খারাপ মেয়ে হয়ে গেছি, সিউডি,” জনসি বলল, “কোনো একটা কারনে শেষ পাতাটি সেখানে থেকে গিয়ে আমাকে দেখাচ্ছে কতটা মন্দ আমি। মরতে চাওয়াটা পাপ। তুমি আমাকে অল্প একটু স্যুপ এনে দাও, আর কিছু পরিমান দুধের সাথে অল্প একটু পোর্ট ওয়াইন, আর – না; প্রথমে তুমি আমার জন্য একটা হাত-আয়না নিয়ে আসো, এর পর আমার কিছু বালিশ জড়ো করো, আমি এর উপর বসে তোমার রান্না করা দেখব।”

এবং ঘন্টাখানেক পর সে বললঃ “সিউডি, আশা করি এক দিন আমি নেপলস উপসাগরকে আঁকতে পাড়ব।”

ডাক্তার বিকেলের দিকে এল, এবং সিউ ওজর দেখিয়ে ডাক্তারের সাথে বারান্দার দিকে গেল।

“এমনকি সুযোগ পেলে,” ডাক্তার সিউয়ের সরু হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল, “ভালো সেবা দিয়ে আপনি জয়ী হবেন।” “এখন আমাকে নীচতলার আরেকজন রোগীকে অবশ্যই দেখতে যেতে হবে। বেহরম্যান,তাঁর নাম – এক প্রকার চিত্রশিল্পী বলতে পারেন, আমি বিশ্বাস করি, তাঁরও নিউমোনিয়া হয়েছে। সে একজন বুড়ো, দুর্বল মানুষ, এবং আক্রমণটাও খুব মারাত্নক। তাঁর বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই; তবুও সে আজ হাসপাতালে গিয়েছে আরো অধিক আরামবোধ করার জন্য।”

পরের দিন ডাক্তার সিউকে বলল, “সে এখন বিপদমুক্ত। আপনি জিতে গেছেন। পুষ্টিকর খাবার আর যত্ন – এখন শুধু এইটুকুই যথেষ্ট।”

জনসি যে বিছানায় শুয়েছিল সিউ সেই বিকেলে সেখানে এল, একটি গাঢ় নীল এবং ব্যবহারের একেবারেই অযোগ্য উলের তৈরী কাঁধের স্কার্ফ মনের আশ মিটিয়ে সেলাই করতে লাগল এবং অন্যহাত দিয়ে জনসি, তাঁর বালিশ এবং চারপাশে বুলাতে লাগল।

“আমার সাদা ইঁদুর, তোমাকে কিছু বলার আছে আমার,” সিউ বলল, “বেহরম্যান সাহেব আজ হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। সে মাত্র দুই দিন অসুস্থ ছিল। প্রথম দিন সকালে দাঁড়োয়ানেরা তাঁকে নীচতলায় তাঁর রুমে অসহায়ভাবে ব্যাথায় কাঁতারানো অবস্থায় পেয়েছিল। তাঁর জুতো ও কাপর–চোপড় ছিল ভেজা এবং বরফ শীতল। তারা কল্পনাও করতে পারে নি ঐ ভয়ঙ্কর রাতে সে কোথায় ছিল। এরপর তারা একটি লণ্ঠন দেখতে পেল, সেটা তখনো জ্বলছিল, এবং আর একটি মই যেটি এখান থেকে টেনে নেওয়া হয়েছিল, আর কিছু ইতস্তত ছড়ানো ব্রাশ এবং একটি প্যালেট (চিত্রশিল্পীদের রঙ গোলা ও মেশানোর জন্য ব্যবহৃত বোর্ডবিশেষ) যার উপর সবুজ এবং হলুদ রঙ মেশানো হয়েছিল – জানালার বাইরের দিকে দেয়ালের উপর শেষ আইভি পাতাটার দিকে একটু তাঁকাও, সোনা। তুমি কি একটুও বিস্ময়াভিভূত হও না কেন বাতাস বয়ে গেলে এটি দোলে না বা নড়াচড়া করে না? ওহ সোনা! এটাই বেহরম্যানের শ্রেষ্ঠচিত্রকর্ম – শেষ পাতাটি পড়ে যাবার পর সেদিন রাতে সেখানে সে এটি এঁকেছে।”

মুল গল্পটি এখান থেকে পড়ুন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29288336 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29288336 2010-12-12 18:19:19
বুক রিভিউ : দি গড অব স্মল থিংস, অরুন্ধতী রায়
১৯৯৭ সালে লেখা “দি গড অব স্মল থিংস” অরুন্ধতী রায়ের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাস। ১৯৯৭ সালেই তিনি এই উপন্যাসের জন্য সম্মানজনক বুকার পুরস্কার লাভ করেন। অরুন্ধতী রায় বাস্তবজীবনে খুব অনুভূতিশীল মানুষ, মানুষের দুঃখে কেঁদে ওঠেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভারতের এ মাথা থেকে ও মাথা চষে বেড়ান। বুক ফুলিয়ে অবলীলায় যা সত্য তাই বলে দেন। তাঁর আত্নজীবনীমূলক এই উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম খুঁজে পাওয়া যায় নি। মানুষের হাসি, আনন্দ, দুঃখ, কষ্ট, ভালোবাসা, বিরহ, ঘৃণা প্রভৃতি সব মানবিক ব্যাপারগুলোকে খুব সূক্ষভাবে দেখার একটা অদ্ভুত গুন আছে তাঁর মাঝে। এই উপন্যাসে মানব জীবনের ছোট ছোট মূহুর্তগুলোকে ছোট ছোট করে হৃদয়গ্রাহীভাবে তিনি তুলে ধরতে পেরেছেন সুনিপুণ মুন্সিয়ানায়। অতীত ও বর্তমানকে নিয়ে যুগপৎভাবে পথ চলে পাঠককে একটা ঘোরের মধ্যে মোহিত করে রেখেছেন তিনি তাঁর লেখার জাদুতে। বর্ণবাদ, সমাজতন্ত্র, পুজিবাদ, প্রেম, প্রতিশোধ, দুই জমজ শিশুর দুঃখময় বেড়ে উঠা, একে অপরের প্রতি তাদের ভালোবাসা, সব ঘটনাপ্রবাহ মিশেছে যেন এক মোহনায়।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র আম্মু এইমেনেমের মেয়ে, দুই ভ্রুনের দুই জমজ শিশু এস্থা ও রাহেলের মা। দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যের শীনাচল নদীর তীরে এক ছোট শহর এইমেনেম। মালাবার, কালিকট, কোচিনসহ প্রাচীন ইতিহাস প্রসিদ্ধ জনপদ এ কেরালা রাজ্যেরই। পর্তুগীজ, ইংরেজসহ ইউরোপীয় জাতিগুলোর সাথে এ রাজ্যের মানুষের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল অনেক আগে থেকেই। এদের হাত ধরেই জলপথে খৃষ্টধর্ম এসেছিল, এসেছিলেন সিরিয়ান খ্রিষ্টানরা। ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে তাই এই রাজ্যটা ব্যতিক্রম, এখানে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি, শিক্ষার হারও বেশি। মেধাবী মার্কসবাদী নেতা কমরেড ই.এম.এস নাম্বুদিরিপাদের নেতৃত্বে পৃথিবীর প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই রাজ্যে ১৯৫৭ সালে ও ১৯৬৭ সালে। সেই সময়টাকেই ধারন করেছে “দি গড অব স্মল থিংস”। ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলো থেকে ব্যতিক্রম হলেও, এটি বর্ণবাদ, জাতিভেদ, সন্ত্রাস ও প্রশাসনিক দূর্নীতিকে এড়িয়ে যেতে পারেন নি। পৃথিবীর অন্য এলাকার খৃষ্টধর্মের সাথে এর মিল নেই, মিল নেই বামপন্থার সাথেও। যে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণেরা খৃষ্টধর্ম গ্রহন করেছিলেন, তাঁরা নিজেদেরকে সমাজের প্রভুই বানিয়ে রাখেন। বর্ণবাদ, জাতিভেদের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে যে ছোট জাতের মানুষগুলো খৃষ্টধর্মের পদতলে আশ্রয় খুঁজে ছিল, তাঁরাও নতুন ধর্মে এসে অচ্ছুৎই থেকে যায়। সাম্যবাদ, মার্কসবাদের লালপতাকা উপরে তুলে ধরে যে উচ্চবর্ণের কমরেডরা ক্ষমতার সাধ পায়, তাঁদের বাড়িতেও অচ্ছুৎ থেকে যায় নিম্নবর্ণের এই কমরেডরা। তাই আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে সশস্ত্র নকশালবাদী বামপন্থী আন্দোলন।

আম্মু এইমেনেমের এক প্রভাবশালী সিরিয় খ্রিষ্টান ইপে পরিবারের মেয়ে। তাঁর পিতা পাপাচি (শ্রী বেনান জন ইপে) ব্রিটিশরাজের অধীনে দিল্লীতে ‘রাজকীয় পতঙ্গবিদ’ হিসেবে কাজ করে অবসরে যান, দাদা পুণ্যান কুঞ্জু (রেভারেন্ড ই. জন ইপে) সিরিয় খৃষ্ট সম্প্রদায়ের মাঝে খুব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন, বড়ভাই চাকো ছিলেন অক্সফোর্ডের নামকরা বিদ্বান। এইমেনেমে তাঁদের ছোটখাটো জমিদারী ছিল, ছিল ‘প্যারাডাইস পিকলস অ্যান্ড প্রিজার্ভস’ নামে একটি আচার কারখানা। আচার কারখানাটি প্রথমদিকে তাঁর মা মামাচি (সোশাম্মা ইপে) চালালেও, পাপাচি মারা যাওয়ার পর এটি চাকোই দেখাশুনা করতে থাকেন। তাঁদের পরিবারে আরেক সদস্য বেবী কোচাম্মা (নবমী ইপে), আম্মুর ফুপু। বেবী কোচাম্মা দাদা রেভারেন্ড ইপের খুব আদরের মেয়ে ছিলেন। বেবী কোচাম্মা যখন আঠার বছরের, তিনি ভালোবাসেন এক সুদর্শন আইরিশ যাজক, ফাদার মুলিগানকে। কাজ দিয়ে তাঁকে মাদ্রাজ থেকে কেরালায় পাঠানো হয়েছিল। সপ্তাহে একদিন ধর্ম বিষয়ে রেভারেন্ড ইপের সাথে আলোচনা করতে ফাদার মুলিগ্যান আসতেন তাঁদের বাড়িতে। ফাদার মাদ্রাজে ফিরে গেলে, বেবী কোচাম্মা তাঁর পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রোমান ক্যাথলিক হলেন। তিনি ভ্যাটিকানের বিশেষ অনুগ্রহে মাদ্রাজের এক কনভেন্টে শিক্ষানবীশ হিসাবে শপথও নেন। তাঁর ধারনা ছিল, এতে তিনি ফাদারের কাছাকাছি থাকতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে বেবী কোচাম্মার ফাদারের ভালোবাসা আর পাওয়া হয় নি। ফাদার মুলিগান পরে হিন্দু ধর্মে দিক্ষিত হন এবং ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। বেবী কোচাম্মা পরে কুমারী থেকে যান।

পাপাচি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে যে বছর দিল্লি থেকে এইমেনেমে ফিরে আসেন, সে বছর আম্মু সবে মাত্র তাঁর স্কুলের পড়া শেষ করেছেন। পাপাচি মনে করত, কলেজে মেয়েদের পড়া অপ্রোজনীয় ও বাজে খরচ। তাই আম্মুকেও পরিবারের সাথে এইমেনেমে চলে যেতে হল। তখনকার দিনে এইমেনেমের ছোট মেয়েদের বিয়ের প্রস্তাবের অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় ছিল। আম্মু দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন, কিন্তু তাঁর বাবার তেমন সঙ্গতি না থাকায় যৌতুকের মাত্রাও ছিল কম। দুবছর কেটে গেল, কোনো বিয়ের প্রস্তাব এল না। এভাবেই আঠার বছরের জন্মদিন পার হয়ে গেল। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর বাবা মায়ের মাঝে কোনো তোড়জোর ছিল না। আম্মু ভিতরে ভিতরে বিয়ের জন্য খুব অস্থির হয়ে উঠে। সারা দিন তাঁর মাথায় ঘুরত এইমেনেমে তাঁর বদ মেজাজী বাবার কাছ থেকে পালানোর কষ্ট কল্পনা। পাপাচি তাঁকে গরমের ছুটিটা কলকাতায় এক দূর সম্পর্কের ফুপুর কাছে কাটানোর অনুমতি দিলেন। সেখানে একজনের বৌভাতের অনুষ্ঠানে আম্মু তাঁর ভবিষ্যৎ স্বামীকে পছন্দ করেছিলেন। ভদ্রলোক আসামের এক চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপকের চাকরি করত। তাঁর পরিবার ছিল বিত্তশালী জমিদার। সে দেখতে বেটেখাটো হলেও, সুঠাম ও সুদর্শন ছিলেন। তবে মদ্যপান করে সব সময় মাতাল হয়ে থাকতো। ছুটি কাটাতে কোলকাতায় এসেছিলেন। পরিচয়ের মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই সে আম্মুকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। আম্মু তাঁকে ভালোবাসার ভান করে নি, সে শুধু তাঁর চারপাশের অস্থির, অনিশ্চিত, পাথুরে সময়ের কাছে থেকে মুক্তি চাইছিল। আম্মু যেন ছিল একটা খালি চেয়ার, আর ভদ্রলোক সেখানে বসে পড়লেন। আম্মু ভেবেছিলেন, এইমেনেমে ফিরে যাওয়ার চেয়ে অন্য যে কোনো কিছুই তাঁর জন্য ভালো হবে। আম্মু তাঁর মা-বাবাকে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে চিঠি লিখলেন, কিন্তু তাঁরা উত্তর দেবার প্রয়োজনও মনে করেন নি। অনেক জাঁকজমকপূর্ণভাবে আম্মুর বিয়ে হল। আম্মু শ্বশুর ছিলেন রেলওয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান, কেম্রিজ বক্সিংএ ব্লু পদকপ্রাপ্ত, দি বেঙ্গল এমেচার বক্সিং এসোসিয়েশনের সচিব। তিনি নব দম্পতিকে অনেক গয়না আর উপহারের সাথে, গোলাপী রঙের সুন্দর একটি গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। বিয়ের পর আম্মু তাঁর স্বামীর সাথে আসামে চলে এলেন।

১৯৬৭ সালের অক্টোবরে চীনের সাথে ভারতের যুদ্ধ লেগে গেল। আম্মু তখন আট মাসের গর্ভবতী। নভেম্বরে এক দিন আম্মুর প্রসব বেদনা উঠল। আম্মু তাঁর স্বামীকে নিয়ে শিলঙের পথে রওনা দিলেন। বাসে অসংখ্য যাত্রীর চাপাচাপি। গর্ভবতী আম্মুকে দেখে গরিব সহযাত্রীদের একটু দয়া হল। তাঁরা একটু বসার যায়গা পেল। বাসের প্রচন্ড ঝাঁকুনির তীব্র ব্যথা তাঁকে দাঁত কামড়ে সহ্য করতে হয়েছে। সারা পথ আম্মুর পেট চেপে রেখেছিল তাঁর স্বামী। লোকজন বলাবলি করছিল, চীন ভারতকে দখল করে নিয়েছে। হাসপাতালের সব বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে মোম বাতি জ্বালানো হয়েছিল, জানালাগুলো পর্যন্ত অন্ধকার করে দেয়া হয়েছিল। এরকম অস্থির সময়ে এস্থা আর রাহেলের জন্ম। এস্থার জন্মের আঠার মিনিট পরে রাহেলের জন্ম। আম্মু ভয়ে ভয়ে ওদের দেখল, ওরা কোনো অঙ্গ বিকৃতি নিয়ে জন্মেছে কিনা। আম্মু গুনে দেখল চারটে চোখ, চারটে কান, দুটো মুখ, দুটো নাক, বিশটা আঙুল আর বিশটা নিঁখুত নখ। আম্মুর ভয় কাটল, তারপর চোখ বুজে এল অবসাদে ক্লান্তিতে।

আম্মু অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন। পিঠখোলা কালো ব্লাউজ পড়তেন। সোনালী রঙের শিকল লাগানো ভ্যানিটি ব্যাগ সাথে রাখতেন। লম্বা সিগারেটের পাইপে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে ধোঁয়ার বৃত্ত বের করতে শিখেছিলেন। সে চা-বাগানের মালিকদের ক্লাবে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠলেন। সাদা চামড়ার মালিকেরা এর আগেই শ্রমিকদের ভিতরে সাদা চামড়ার ছেলেমেয়ের জন্ম দিয়ে চলেছিলেন, এবার নজর পড়ল কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের দিকে। চা বাগানের মালিক আম্মুর স্বামীকে ছাঁটাইয়ের হুমকী দিয়ে আম্মুর সেবা পেতে চাইলেন। আম্মু শুনে হতবাক হয়ে কথা হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মদ্যপ স্বামী নীরবতা দেখে প্রথমে অস্বস্তিতে ভুগলেও, পরে ভয়ানক রেগে তাঁর চুলের মুঠি ধরে কিল ঘুসি মেরে অজ্ঞান হয়ে যান। আম্মুও বইয়ের তাক থেকে সবচেয়ে ভারি বইটি নামিয়ে তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে স্বামীর মাথায়, পায়ে, ঘাড়ে, পিঠে আঘাত করেন। পরবর্তীতে এটা একটা রুটিনমাফিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। মাতলামী আর মারামারি। আম্মু তেতো বিরক্ত হয়ে উঠলেন। যখন স্বামীর মারামারি স্ত্রী থেকে সন্তান পর্যন্ত গড়াল তখন আম্মু স্বামীকে ছেড়ে অনাহূতের মতো এইমেনেমে মা-বাবার কাছে ফিরে এলেন। সেখানেই সে ফিরলেন যেখান থেকে কয়েক বছর আগে সে পালিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু পার্থক্য এই যে এখন তাঁর দুটো জমজ সন্তান। তাঁর আর কোনো স্বপ্ন নেই।

আম্মুর কাছে তাঁর জমজ সন্তান ছিল একজোড়া আশ্চর্য ব্যাঙের মতো। যারা একজন আরেক জনের ওপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল। রাহেল আর এস্থাও নিজেদের অভিন্ন ভাবত। ভাবত, দুজনে মিলে তারা একজন। দুজনের শরীর দুটো হলেও পরিচয় এক। এস্থা রাতে যে স্বপ্ন দেখত, রাহেল সকালে তা শুনে এমনভাবে হাসত যেন স্বপ্নটা সেই দেখেছে। দুই জমজের মধ্যে মাঝে মাঝে খুনসুটিও হত। এস্থা মামাচির আচার কারখানায় সাহায্য করতে যেত মাঝে মাঝে। সে একদিন আচারের কালো কড়াইয়ে লাঠি দিয়ে খেলার ছলে নৌকা বাইছিল। এমন সময় রাহেল সেখানে উঁকি দিল।
“এস্থা না তাঁকিয়েই বলল - কী চাস?
রাহেল বলল – কিছু না।
- এখানে এলি কেন?
রাহেল উত্তর দিল না। হিংসুটে নীরবতা নিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
রাহেল জিজ্ঞেস করল – জ্যামের মধ্যে নৌকা বাইছিস কেন?
এস্থা বলল – ভারত স্বাধীন দেশ।
কারো কিছু বলার ছিল না। ভারত ছিল স্বাধীন দেশ।”

আম্মু এস্থাকে আচারের রেসিপি লিখে রাখার অনুমতিও দিয়েছিল। সে আম্মুর দেয়া তাঁর নোটখাতায় খুব সুন্দর করে মামাচির আচারের রেসিপি লিখে রাখত।
কলার জ্যাম।
কলা চটকাও। পানি মেশাও, ঢেকে দাও, তারপর জ্বাল বাড়িয়ে দাও। যতক্ষণ না নরম হয় ফোটাও ততক্ষণ। হালকা কাপড়ে চিপে চিপে রস ছেঁকে নাও। সমান মাপের চিনি মেপে পাশে রেখে দাও। রস জ্বাল দিতে থাকো বেগুনি রঙ হওয়া পর্যন্ত। রসটা অর্ধেক শুকিয়ে গেলে জ্বাল কমাও। গেলাটিন (পেকটিন) তৈরী করো এভাবে-
পরিমাণ ১ : ৫, অর্থাৎ - টেবিল চামচ পেকটিন : ২০ চা চামচ চিনি। ......জমাট বেঁধে আসা রসে পেকটিন মেশাও। সামান্য কয়েক (পাঁচ / ছয় ) মিনিট জ্বাল দাও। জ্বাল বাড়িয়ে দাও চারিদিকে যেন আগুন ওঠে। চিনি মেশাও। জ্বাল দিতে থাক যতক্ষণ না চটচটে ভাব না আসে। ধীরে ধীরে ঠান্ডা করো। আশা করি এ রান্নাটা করে আনন্দ পাবে।”

এস্থা এলভিস প্রিসলির গান খুব ভালো বাসত। খুব সুন্দর করে তাঁর গান গাইতে পারত। একবার আম্মু, বেবী কোচাম্মা, রাহেল ও সে কোট্টাইমে (এইমেনেমের পাশে অবস্থিত কেরালার অন্যতম বড় শহর) সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। সিনেমার মাঝখানে এলভিস প্রিসলির গান চলে আসায় সেও গেয়ে উঠল। আশেপাশের দর্শকেরা বার বার অনুরোধ করে, ভয় দেখিয়েও তাকে থামাতো পারছিল না দেখে বাইরে চলে যেতে বলছিল। এস্থাও নিজেকে থামাতে পারছিল না দেখে, ভয়ে ভয়ে আম্মুকে বলল, আম্মু আমি বাইরে গিয়ে গানটা গেয়ে আসি। আম্মু বিরক্ত হয়ে বলল, তুই এত মানুষের সামনে আমাদের অপমান করলি! এরপর এস্থা সবাইকে ডিঙিয়ে বাইরে যেয়ে মন খুলে তার প্রিয় এলভিস প্রিসলির গান গেয়েছিল।

সোফি মল চাকো আর মার্গারেট কোচাম্মার মেয়ে। চাকো অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়ে মার্গারেটের প্রেমে পড়ে যায়। ইংরেজ মহিলা মার্গারেটকে সে বিয়েও করে। চাকো ছিল অগোছালো ও অলস। তাই শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়েটা টিকে নি। মার্গারেট পরে চাকোকে ডিভোর্স দিয়ে জো নামে এক ইংরেজকে বিয়ে করেন। সোফি মল জো এর পরিবারেই বড় হতে থাকে, তাঁকেই আসল বাবা ভাবে, চাকো শুধুই তাঁর জন্মদাতা পিতা। জো এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে, মার্গারেট শোক কাটাতে সোফি মলকে নিয়ে এইমেনেমে আসেন চাকোর বাড়িতে। সোফি মলের তখন নয় বছর, আর জমজ ভাই-বোনদের সাত।

ভেলুথা এক নিম্নবর্ণের অচ্ছুৎ পারাভান। সে কেরালা কমুনিস্ট পার্টির সাথে জড়িত ছিল। ভালো কাঠের কাজ, যন্ত্রপাতির কাজ জানত সে। সে নিজেকে কখনো অচ্ছুৎ ভাবতে পারে নি। সে দুই জমজ ভাইবোনের খুব ভালো বন্ধু ছিল, খেলার সাথী ছিল, এটা ওটা বানিয়ে দিত; মোটকথা ওদের বাবার অভাব পূরন করতে পেরেছিল। বিষয়টি আম্মুও বুঝতে পারে। আম্মু উচ্চবর্ণের সিরিয়ান খ্রিষ্টান হয়েও তাই ভেলুথার সাথে নিষিদ্ধ প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ে। ভেলুথার বাবা বিষয়টি ধরতে পেরে খুব ভয় পেয়ে মামাচিকে জানিয়ে দেন। মামাচি জানতে পেরে খুব রেগে যান। ভেলুথাকে ডেকে যাচ্ছেতাই ভাবে গালমন্দ করেন। সেখানে বেবী কোচাম্মাও উপস্থিত ছিলেন। বেবী কোচাম্মা বামপন্থীদের ঘৃণা করতেন। ইতোপূর্বে বামপন্থীদের এক মিছিলের মাঝখানে পড়ে গিয়ে লাল পতাকা নেড়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই মিছিলে ভেলুথাও ছিল। বেবী কোচাম্মার প্রতি ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে সে অপমান হিসবেই দেখেছিল, এর জন্য মনে মনে ভেলুথাকেই দায়ী করেছিল। আজ শিকার হাতে পেয়ে তিনি উচিত শিক্ষা দেওয়ার ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। প্রথমেই আম্মুকে কৌশলে ঘরে বন্দী করে পুলিশের কাছে মামলা করতে ছুটে যান, ভেলুথা আম্মুকে ধর্ষণ করেছে।

আম্মু তাঁর জমজ দুই ছেলেমেয়েকে খুব ভালো বাসতেন। ওদের নিষ্পাপ বড় বড় চোখের আকর্ষণ, অন্য মানুষকে ভালোবাসার ইচ্ছা যারা ওদেরকে ভালো বাসে না, এই ধরনের ভাবনাগুলো আম্মুকে খুব জ্বালতন করত, ওদের ধরে মারতে ইচ্ছে করত। ওদের বাবা চলে গেছে, সেই জানালাটা ওরা খুলে রেখেছে, অন্য কেউ আসবে বলে এবং এলে স্বাগতম জানাবে। তাঁর দুই জমজ নিষ্পাপ বাচ্চার প্রতি অসীম মায়া মমতা আর ভালোবাসা দেখে আম্মু ভেলুথার উপর দুর্বল হয়ে পড়ে। এর জন্যই আম্মুকে আজ লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। “আম্মু চিৎকার করে বলল – তোদের জন্য। যদি তোরা না জন্মাতি, তবে আমার এখানে থাকতে হত না। এসবের কোনো কিছুই ঘটনা। আমি এখানে থাকতাম না। আমি মুক্ত থাকতে পারতাম। যেদিন তোরা জন্ম নিয়েছিলি আমার উচিত ছিল তোদের এতিমখানায় ফেলে আসা। আমার ঘাড়ের উপর তোরা পাথরের মতো বোঝা।..... আম্মু বলল – তোরা এখান থেকে চলে যা। তোরা চলে যেতে পারিস না। আমাকে একটু একা থাকতে দিতে পারিস না?
ওরা মায়ের কথা রেখেছিল।”

এস্থা অনেক সময় অদ্ভুতভাবে বাস্তবটাকে উপলব্ধি করতে পারত। “জ্যাম নাড়তে নাড়তে এস্থা ভাবল, দুটো ভাবনা – এক. যে কারো যে-কোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। দুই. যে-কোনো অবস্থার জন্য তৈরী থাকা ভালো।” এস্থা তাই তার প্রিয় বোনটিকে নিয়ে পালাতে চাইল। যেখান থেকে কেউ কখনো ফেরে না। ওরা সোফি মলকে নিতে চাই নি, সেও গেল জোর করে। তিনজন ছোট নৌকা নিয়ে ছোট শীনাচল নদী বেয়ে চলল। হঠাৎকরে স্রোতের টানে নৌকাটা উল্টে গিয়ে সোফি মল হারিয়ে গেল। পড়ে তার লাশ এক জেলে খুঁজে পেল।

ভেলুথা এইমেনেমের স্থানীয় বামপন্থী নেতা কমরেড পিল্লাইয়ের সাহায্য চেয়েছিল, বর্ণবাদী স্বার্থপর কমরেড তাঁকে কোনো সাহায্য করে নি। পরে ছয় জন পুলিশ, বর্ণপ্রথার রক্ষার ছয় যুবরাজ ভেলুথাকে নির্মমভাবে পিটুনি দিল দুই জমজ এস্থা আর রাহেলের সামনে। বেবী কোচাম্মা এস্থা ও রাহেলকে ভেলুথার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে বলল, সেই সোফি মলকে ডুবিয়ে হত্যা করেছে। এস্থা ও রাহেল প্রথমে মিথ্যে সাক্ষী দিতে রাজী হয় নি। বেবী কোচাম্মা ভয় দেখালো মিথ্যা সাক্ষী না দিলে, “তোদের জেলে যেতে হবে, তোদের জন্য তোদের মাকেও জেলে যেতে হবে, ভালো লাগবে? তোরা তোর মাকে ভালো বাসিস না?” সে রাত্রেই ভেলুথার মৃত্যু হল। মৃত্যুর আগে সে জেনে গেল সে ধর্ষণকারী, শিশু অপহরণকারী, শিশু হত্যাকারী। ভেলুথা ছিল দুই জমজ, আর তাদের মায়ের কাছে দেবতা। ছোট মানুষের দেবতা, ছোট দেবতা। বড় দেবতারা যখন হিংসায় আক্রোশে ছোট দেবতাকে মারতে আসে, তখন ছোট দেবতা সাধারণ মানুষ হয়ে যায়, রক্ত মাংসের মানুষ। তাঁর সম্মান মর্যাদার আর বালাই থাকে না। দুই জমজ মনে করতে থাকে ভেলুথার মৃত্যুর জন্য তারাই দায়ী। ভেলুথারা স্মৃতি তাদেরকে ছিড়ে কুড়ে খায়। আম্মু মনে করত, ভেলুথাকে সেই হত্যা করেছে।

সোফি মলের মৃত্যুর জন্য মার্গারেট কোচাম্মা এস্থাকে দায়ী করত, ওকে কাছে পেলেই চড় বসিয়ে দিত। চাকো আম্মুকে তার দুই জমজ সন্তান নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। আম্মু এস্থাকে তাঁর মাতাল বাবার কাছে পাঠিয়ে দিল। আট বছরের এস্থা। আম্মু এস্থার যাওয়ার সময় নেক জামা কাপড়, ডাইরি, চিঠির ঠিকানা লেখা খাম দিয়ে এস্থার ব্যাগ গুছিয়ে দিল। বিদায়ের সময় বলল, “তুই কথা দে আমাকে লিখবি। তুই কথা দে, কখনো রাহেলকে ভুলে যাবি না, রাহেলকে ছেড়ে কোথাও যাবি না।.... আমি একটি ভালো চাকরি পেলে তোকে আবার নিয়ে আসবো। আমরা একটি স্কুল খুলবো। সেই স্কুলে তোরা পড়বি।” এস্থার সাথে আম্মুর আর কখনো দেখা হয় নি। আম্মু চাকরি খুঁজতে গিয়ে এক সস্তা হোটেলে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। আম্মু তখন সারাক্ষন কাশত, বমি করত। রাহেল আম্মুকে তখন এই অবস্থার জন্য ঘৃণা করত। আম্মুর অন্ত্যষ্টিকৃয়ার জন্য কোনো পাদরী রাজী হয়নি। তাই আম্মুকে কোট্টাইমের এক শশ্বাণে নিয়ে পোড়াতে নিয়ে যায় চাকো আর রাহেল। পোড়ানো শেষ হলে ছাই সাথে করে নিয়ে আসে রাহেল, রশিদটি হারিয়ে যায়। এস্থা নেই, এস্থা থাকলে ঠিকই রশিদটি যত্ন করে রেখে দিত। টুকিটুকি সব জিনিস এস্থা গুছিয়ে যত্ন করে রাখে।

এস্থা বাবার কাছে ফিরে যাবার পর দ্রুত পালটে যেতে থাকে। নিজেকে চারপাশ থেকে গুটিয়ে নেয়। নিরব হয়ে যায়। কারো সাথে কথা বলত না। শুধু হেঁটে যেত একাকী, এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায়। সে যেন হেঁটে যেত মহাকালের পথে....

আম্মু মারা যাবার পর চাকো আর মামাচি রাহেলকে পড়তে মিশনারী স্কুলের এক হোস্টেলে পাঠিয়ে দেয়। রাহেলকে নিয়ে চাকো বা মামাচির কোনো উদ্বেগ ছিল না। তারা ওর খোঁজ খবরও নিত না। অবশ্য মাস শেষে খরচের টাকাটা ঠিকমত পাঠাত। স্কুলের পড়া শেষ হলে, দিল্লির এক সস্তা আর্কিটেক কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে পিএইচডির এক আমেরিকান ছাত্র ল্যারি ম্যাককাস্লিনের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। রাহেল তাঁর জীবন সম্পর্কে ছিল উদাসীন, তার চোখটা ছিল অন্য রকম সুন্দর, সেখানে ছিল রাজ্যের মায়া আর বিষাদ। ল্যারি রাহেলের চোখের প্রেমে পড়ে যায়। ওরা বিয়ে করে, আমেরিকা চলে যায়। কিছুদিন পর ল্যারির মোহ কেটে গেলে বিয়ে ভেঙে যায়, রাহেল আবার একা হয়ে যায়।

তেইশ বছর পর এস্থা আবার এইমেনেমে ফিরে এসেছে। এস্থার বাবা নতুন চাকরি পেয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। এস্থাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই এস্থা এইমেনেমে ফিরে এসেছে। এস্থা এইমেনেমে ফিরে এলে বেবী কোচাম্মা রাহেলকে চিঠি লিখে জানায় ও ফিরে এসেছে। রাহেল ভাইকে দেখার জন্য আমেরিকা থেকে এইমেনেমে ফিরে আসে। ওদের চোখাচোখি হয়। কেউ কথা বলে না। ওদের বয়স এখন একত্রিশ বছর। আম্মু একত্রিশ বছর বয়সেই মারা গিয়েছিল। একত্রিশ বছর খুব কমও নয়, বেশিও নয়। কিন্তু মৃত্যুর জন্য বয়সটা যথেষ্ট।

বইটি ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন।
********************************
এক নজরেঃ
The God of Small Things By Arundhati Roy
পেপার ব্যাক ও শক্ত মলাটে বাঁধাইঃ ৩৩৬ পৃষ্টা
প্রকাশকঃ Harper Perennial; First Edition edition (৬ মে, ১৯৯৮)
মূল্যঃ $৩.৫০
ধরনঃ উপন্যাস
ভাষাঃ ইংরেজী
আইএসবিএন - 10: 0060977493
আইএসবিএন - 13: 978-0060977498
********************************

লেখক পরিচিতিঃ

ভারতের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী, বুকার জয়ী ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায় ভারতের মেঘালয়ের শিলঙে ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর মা ছিলেন কেরালার এক সিরিয়ান খ্রিষ্টান পরিবারের মেয়ে মেরি রায়, বাবা ছিলেন বাঙালি, শিলঙে চা-বাগানের কর্মকর্তা রঞ্জিত রায়। অরুন্ধতি রায় তাঁর ছেলেবেলা কাটিয়েছে কেরালার এইমেনেমে, কোট্টাইমের করপাস ক্রিস্টি স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। এরপর, দিল্লির স্কুল অব প্ল্যানিং এন্ড আর্কিটেকচারে স্থাপত্যবিদ্যার উপর শিক্ষা নেন। ১৯৮৪ সালে ফিল্ম মেকার প্রদীপ ক্রিশেনের সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর এক মাত্র উপন্যাস “দি গড অব স্মল থিংস” এর জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পান। তিনি ২০০৪ সালে সিডনী শান্তি পুরস্কার পান।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29281807 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29281807 2010-12-01 20:39:50
ও. হেনরীর ছোট গল্প : দি গিফট অব দি মেজাই
এক ডলার সাতাশি সেন্ট। এটুকুই সব। এর মধ্যে ষাট সেন্ট আছে পেনিতে। একেক সময়ে একটি দুইটি করে পেনি বাঁচানো হয়েছে মুদি দোকানী, সবজী বিক্রেতা আর কশাইয়ের সাথে তীব্র দর কশাকশি করে, এমন করেই পুঙ্খানুপুঙ্খ লেনদেন চলেছে সব সময়, যতক্ষন পর্যন্ত না মনে মনে কৃপণ ঠাওরে তাদের মুখ আরক্তিম হয়ে উঠেছে। ডেলা তিনবার গুনে দেখেছে। এক ডলার সাতাশি সেন্ট। অথচ পরের দিন ক্রিসমাস।

মলিন ছোট আরাম কেদারাটার উপর এগুলো ছুড়ে ফেলে চিৎকার করে কান্না কাটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ডেলা তাই করল। এটা মানুষের নৈতিক অভিব্যক্তিকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যেন, জীবনটা ফুঁপিয়ে কাঁদা, দীর্ঘ শ্বাস আর মৃদু হাসির সম্মিলনে গড়া, যেখানে দীর্ঘ শ্বাসটাই বেশি প্রবল।

বাড়ীর গৃহকর্ত্রী যখন খরচ ক্রমশ প্রথম থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনেন, প্রথমেই তার নজর পড়ে বাড়ির দিকে। একটি সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের জন্য প্রতি সপ্তাহে আট ডলার গুনতে হয়। যারা দিন আনে দিন খায় ঠিক তাদের জন্য নয়, কিন্তু ভিক্ষুকের দলের জন্য নিশ্চিতভাবেই অন্য কোনো উপায় খুঁজে দেখতে হবে।

প্রবেশ কক্ষের নীচে যে চিঠির বাক্সটি আছে সেখানে কখনো কোনো চিঠি আসে না, বৈদুতিক বোতামটি কোনো পার্থিব আঙুল টিপে কখনো ঘন্টা বাঁজায় না। এর নীচে অধিকার নিয়ে একটি নাম ফলক শোভা পাচ্ছে, যাতে লেখা “মি. জেমস ডিলিংহাম ইয়াং”।

আগেকার সমৃদ্ধ সময়ে “ডিলিংহাম” নামের এই বাড়িটি প্রমোদ উল্লাসের মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে, যখন এর মালিক সপ্তাহে ত্রিশ ডলার পেত। এখন, যখন আয় কমে কুড়ি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে, “ডিলিংহাম” এর অক্ষরগুলোও ঝাপসা দেখাচ্ছে, যেন তারাও ঐকান্তিকভাবেই প্রত্যাশা করছে সংকুচিত হয়ে যেয়ে নিরহঙ্কারী ও বিনয়ী “ডি” হতে। কিন্তু যখনই মি. জেমস ডিলিংহাম ইয়াং বাড়িতে ফেরেন এবং তাঁর এই ফ্ল্যাটে আসেন, তাঁকে ডাকা হয় “জিম” এবং নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন মিসেস জেমস ডিলিংহাম ইয়াংয়ের, যিনি ইতোপূর্বেই আপনাদের কাছে পরিচিত হয়েছেন “ডেলা” নামে। যেখানে সবকিছুই খুব ভালোভাবে চলছে।

ডেলা তাঁর কান্না শেষ হলে, পাউডারের ন্যাকড়াটা দিয়ে গাল মুছলো। জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিরানন্দ নিয়ে ধূসর বাহিরবাড়ির ধূসর বেড়ার উপর দিয়ে ধূসর বিড়ালটিকে হেঁটে যেতে দেখল। আগামীকাল ক্রিসমাসের দিন, কিন্তু তাঁর কাছে আছে মাত্র এক ডলার সাতাশি সেন্ট, যা দিয়ে জিমের জন্য উপহার কিনতে হবে। সে প্রত্যেকটা পেনি বাঁচিয়ে মাসের পর মাস ধরে, এই টাকাটা জমিয়েছে। কুড়ি ডলারে সপ্তাহ বেশি দূর চলে না। সে যা হিসাব করে, খরচ তার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। সব সময়ই এমন হয়। মাত্র এক ডলার সাতাশি সেন্ট আছে জিমের জন্য উপহার কেনার। তাঁর জিম। সে অনেক সুখী সময় কাটিয়েছে পরিকল্পনা করে করে, কিছু চমৎকার জিনিস নিয়ে জিমের জন্য। কিছু সুন্দর, দুর্লভ এবং খাঁটি...কিছু এমন একটা জিনিস, যা জিমের মর্যাদার সাথে খুব কাছাকাছি মানিয়ে নেয় এমন মূল্যবান।

কক্ষটির দুই জানালার মাঝে বৃহদাকার লম্বাটে একটি আয়না আছে। এই ধরণের বৃহদাকার লম্বাটে আয়না আপনি সম্ভবত আট ডলারের ফ্ল্যাটগুলোতে দেখতে পাবেন। খুব কৃশকায় এবং খুব চটপটে একজন নারী, দ্রুত একের পর এক তাঁর পরিধেয় বস্ত্রগুলো লম্বালম্বিভাবে খুলে নগ্ন হয়ে তাঁর প্রতিবিম্ব দেখেলে, তিনি দেখতে কেমন সম্পূর্ণভাবে তার একটা নিখুত ধারণা পেতে পারে। ডেলা কৃশকায় হওয়ায়, এই কৌশলটি প্রয়োগ করত।

হঠাৎকরেই সে জানালা থেকে সরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল। উজ্জ্বলভাবে তাঁর চোখদুটি ঝিলিক দিচ্ছিল, কিন্তু কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁর মুখের রঙ হারিয়ে গেল। দ্রুত সে তাঁর চুল টেনে নামিয়ে পূর্ন দৈর্ঘ্যে পড়তে দিল।

বর্তমানে, দুটি সম্পদ আছে জেমস ডিলিংহাম ইয়াংয়ের অধিকারে, যার উভয়েই বড় গর্বের ধন। একটি জিমের স্বর্ণের ঘড়ি, যা ছিল তাঁর পিতার এবং পিতামহের। অন্যটি ডেলার চুল। যদি শেবার রানী ঘুলঘুলির পাশে একটি ফ্ল্যাটে বাস করতেন, তবে ডেলা তাঁর চুল শুকানোর জন্য সেগুলোকে তাঁর জানালার সামনে ঝুলিয়ে রাখতো কিছুদিন, এতে মহামান্যার গহনা ও উপহারগুলোর মূল্য পড়ে যেত। যদি রাজা সলোমন তাঁর ভূ-গর্ভস্থ কক্ষগুলোতে জমানো গুপ্তধনের দ্বাররক্ষী হতেন, তবে জিম সে স্থান দিয়ে যাবার সময় প্রত্যেকবার তাঁর ঘড়িটি দেখিয়ে আসতো, শুধুমাত্র দেখার জন্য কেমন করে তিনি হিংসায় তাঁর দাড়ি ধরে টানেন।

ডেলার সুন্দর চুলগুলো এখন তাঁর শরীরের উপরে পড়ে আছে, যেন জলপ্রপাতের পিঙ্গল জলের মত মৃদু হিল্লোল তুলে ঝিলিক দিচ্ছে। চুলগুলো তাঁর হাঁটুর নীচে নামে এবং পোষাক হয়ে প্রায়ই যেন তাঁর শরীরকে ঢেকে দেয়। সে বিচলিত হয়ে দ্রুত আবার তাঁর শরীরকে চুলগুলো দিয়ে ঢাকলো। হঠাৎ সে এক মিনিটের মত কেঁপে উঠে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো, এক দুই ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল জীর্ণ লাল কার্পেটটিতে।

পুরনো পিঙ্গল জ্যাকেটটি পড়ে, পুরনো পিঙ্গল হ্যাটটি মাথায় দিয়ে সে বের হল। দ্রুত আবর্তিত হয়ে আসা স্কার্ট পড়ে এবং এখনো দীপ্তিময় উজ্জ্বল চোখদুটি নিয়ে, এলোমেলো অবস্থায় সে দড়জার বাইরে এলো এবং সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নামল।

একটা সাইনবোর্ডের সামনে এসে সে থামলো, “মিসেস সফরোনী। সকল ধরণের কেশ সামগ্রী”। একরকম উড়ে দৌড়ে চলে সে হাঁপিয়ে উঠলো। মাদাম, দীর্ঘ, খুব শাদা, আকর্ষণীয়া, কদাচিৎ দেখা মিলে “সফরোনী”।

“আপনি কি আমার চুল কিনবেন?”, ডেলা জিজ্ঞেস করে।
“আমি চুল কিনি”, মাদাম বলল। “আপনার হ্যাটটি খুলে আমাকে একবার দেখতে দিন এটি দেখতে কেমন?”
পিঙ্গল জলপ্রপাত মৃদু হিল্লোল তুলে নীচে নেমে এল।
“কুড়ি ডলার”, মাদাম বলল, নিপুন হাতে একগোছা চুল উপরে তুলে ধরল।
“আমাকে টাকাটা এখনই দিন”, ডেলা বলল।

আহা, নষ্ট পাথুরে সময়কে ভুলে গিয়ে, এর পরের দুই ঘন্টা ধরে সে যেন গোলাপী ডানায় ভর করে নেচে বেড়ালো। দোকানগুলোতে তন্ন তন্ন করে জিমের জন্য উপহার খুঁজে বেড়ালো।

অবশেষে সে উপহারটি খুঁজে পেল। এটি নিশ্চিত জিমের জন্যই বানানো হয়েছে, অন্য কারো জন্য নয়। অন্য দোকানগুলোতে এর মত আর একটিও নেই, সে তাদের সবগুলোই উল্টে পাল্টে দেখেছে। এটি ছিল প্ল্যাটিনামের ঘড়ির চেইন, নকশায় সহজ ও সরল, কেবল বস্তুমান বিচারেই যথার্থভাবে এর তাৎপর্য প্রকাশ করছিল, বাহ্যিক চাকচিক্যময় অলঙ্করণে নয়...যেমনটা সকল উৎকৃষ্ট পণ্যের হওয়া উচিত। এটি এমনকি ঘড়িটার জন্যও প্রয়োজনীয় ছিল। সে এটি দেখতে না দেখতেই মনে করল, এটি অবশ্যই জিমের জন্য। এটা তাঁর মতো। বর্ণাধিক্যহীন এবং মূল্যবান...দুটি বিশেষণই এর জন্য প্রযোজ্য। তাঁর কাছে থেকে তারা এটির জন্য একুশ ডলার নিল এবং সাতাশি সেন্ট নিয়ে সে তাড়াতাড়ি করে বাড়িতে ফিরল। কেউ সঙ্গে থাকলে, ঘড়ির সেই পুরোনো চেইনের কারনে জিম অবশ্য পুরোপুরি চিন্তিত থাকত সময় দেখার ব্যপারে। ঘড়িটার মতই দেখতে মস্ত বড়, চেইনের পরিবর্তে পুরোনো চামড়ার ফিতা ব্যবহার করায়, জিম মাঝে মাঝে ঘড়িটা গোপনে দেখত।

ডেলা বাড়িতে ফিরলে, তাঁর উন্মত্ততা কিছুটা পরিণামদর্শিতা ও কারণ বিশ্লেষণের অবসর পেল। সে তাঁর ইস্পাতের চুল ছাটাইয়ের কাচি বের করে গ্যাসের বাতি জ্বালালো, এর পর, তাঁর ভালোবাসায় অসীম মহত্ব যোগ করতে যেয়ে যে ধ্বংসস্তুপ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা মেরামতের কাজ চালিয়ে গেল। প্রিয় বন্ধুরা, এটা সব সময়ই একটা সুমহৎ কাজ....একটি মস্ত বড় কাজ।

চল্লিশ মিনিটের মধ্যে তাঁর মাথা অতি ক্ষুদ্র, ঠিক অনেকটা কোঁকড়ানো চুলের মত গুচ্ছে ঢেকে গেল, চমৎকার দেখাচ্ছিল তাঁকে যেন সে একজন নিয়মিত স্কুল পালানো বালক। সে আয়নায় তাঁর প্রতিবিম্বের দিকে সময় নিয়ে, যত্নের সাথে এবং সমালোচনার দৃষ্টিতে তাঁকালো।

“যদি জিম আমাকে হত্যা না করে”, সে নিজেকেই বলল, “আমার দিকে তাঁকানোর আগে সে এক সেকেন্ড সময় নেবে, এর পর বলবে, তোমাকে কনি দ্বীপের গীতিনাট্যের বালিকাদলের বালিকার মত লাগছে। কিন্তু কি করতে পারতাম আমি...আহা! এক ডলার সাতাশি সেন্ট নিয়ে কি করতে পারতাম আমি?”

সাতটার সময় কফি বানানো হল। মাছ ভাঁজার কড়াই গরম চুলোর উপর রেখে চপ বানানোর জন্য প্রস্তুত করা হল।

জিমের ফিরতে কখনো দেরি হয় না। ডেলা ঘড়ির চেইনটি হাতে নিয়ে দুই ভাঁজ করে দড়জার কাছে টেবিলের এক কোণে বসল, যেখান দিয়ে দিয়ে সে সব সময় প্রবেশ করেন। এরপরে, সিঁড়িতে সে তাঁর প্রথম বার পা ফেলার আওয়াজ পেয়ে কিছু মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। প্রতিদিনের সাদামাটা বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর ছোট নীরব প্রার্থনা পড়ার অভ্যাস ছিল, এবং এখন সে ফিসফিস করে প্রার্থনা করল, “দয়া কর,ইশ্বর, সে যেন ভাবে আমি দেখতে এখনো সুন্দর।”

দড়জা খুলে গেল, জিম প্রবেশ করে এটি বন্ধ করল। তাঁকে কৃশকায় ও খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল। দুর্বল মানুষ, বয়স মাত্র বাইশ ... একটি পরিবারের ভার বয়ে ভারাক্রান্ত! তাঁর একটি নতুন ওভারকোটের প্রয়োজন, কোনো দাস্তানা নেই।



জিম দড়জার দিকে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেভাবে একটি দীর্ঘ লোমওয়ালা সেটের জাতের কুকুর তিতিরের গন্ধ পেলে নিশ্চল হয়ে যায়। তাঁর চোখ দুটি ডেলার উপরে স্থির হয়ে আছে, সেখানে এমন একটি অভিব্যক্তি যা ডেলা পড়তে পারছে না, এতে সে ভীত হয়ে পড়ছে। এটা রাগ নয়, নয় বিস্ময়, নয় অননুমোদন, নয় আতঙ্ক, নয় এমন ধরণের অনুভূতির অভিব্যক্তি যার জন্য ডেলা প্রস্তুত ছিল। মুখে সেই বিচিত্র অভিব্যক্তি নিয়ে, সে সহজাতভাবে স্থির দৃষ্টি নিয়ে ডেলার দিকে তাঁকিয়ে আছে।

ডেলা কাঁচুমাঁচু করে টেবিল থেকে উঠে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।
“জিম, প্রিয়তম”, সে কেঁদে উঠল, “আমার দিকে এভাবে তাঁকিও না। আমি আমার চুল কাটিয়েছি এবং সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছি কারন ক্রিসমাসের ভিতর তোমাকে কোনো উপহার না দিয়ে আমি থাকতে পারবো না। এগুলো আবার বড় হয়ে উঠবে...তুমি কিছু মনে কর না, করবে কি? এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার। আমার চুল ভয়ানক দ্রুত বেড়ে উঠে। বল,’মেরি ক্রিসমাস!’ জিম, চল আমরা আনন্দ করি। তুমি জাননা কতটা চমৎকার – কতটা সুন্দর, চমৎকার উপহার তোমার জন্য আমি এনেছি”।

“তুমি তোমার চুল কাটিয়েছো?”, অনেক কষ্ট করে, জিম জিজ্ঞেস করে, যেন বাস্তবিকপক্ষেই এখনো স্পষ্ট ধারনায় পৌছতে পারছে না, এমন কি কঠিনতম মানসিক পরিশ্রমের পরও।

“কাটিয়েছি এবং এগুলো বিক্রি করে দিয়েছি”, ডেলা বলল। “তুমি কি আমাকে এভাবে পছন্দ করছ না, কোনোভাবেই? আমার চুল গেলেও আমিই তো আছি, আমি নেই?”

জিম উৎসুকভাবে কক্ষের চারিদিকে তাঁকালো।
“তুমি বলছ তোমার চুল গেছে?”, প্রায় চরম নির্বোধোচিত হয়ে সে বলল।
“এটি খুঁজে আর কাজ নেই তোমার”, ডেলা বলল, “এটি বিক্রি হয়ে গেছে, আমি তোমাকে বলছি... বিক্রি হয়েছে, চলেও গিয়েছে। বোকাছেলে, এটা ক্রিসমাস ইভ। আমার দিকে ভালো করে তাঁকাও, এর জন্যই তোমাকে দিতে পেরেছি। সম্ভবত আমার মাথার চুল কমে গিয়েছিল”, সে হঠাৎকরেই গভীর মিষ্টি সুরে বলে চলল, “কিন্তু কেউ কখনো গুনে দেখতে পারবে না কতটা ভালোবাসা রাখা আছে তোমার জন্য। আমি কি তোমার জন্য চপ সাঁজাবো, জিম?”

এই অস্বাভাবিক মোহগ্রস্ত অবস্থার বাইরে জিমকে মন হল দ্রুত জেগে উঠছে। সে তাঁর ডেলাকে জড়িয়ে ধরল। দশ সেকেন্ড ধরে আসুন আমরা অন্য ক্ষেত্রের কিছু অগুরুরত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক নীরিক্ষার সাথে মনোযোগ দেই। এক সপ্তাহে আট ডলার কিংবা বছরে দশ লক্ষ ডলার...পার্থক্যটা কোথায়? এক জন গনিতবিদ বা একজন আইনজ্ঞ আপনাকে ভুল উত্তরটি দিবে। মেজাইয়েরা অনেক উপহার নিয়ে আসে, কিন্তু সেগুলো অর্থের মধ্যে নেই। কিছু পরেই এ দৃঢ় অন্ধ উক্তি আলোকিত হয়ে উঠবে।
জিম তাঁর ওভারকোটের ভিতর থেকে একটি পার্সেল বের করে টেবিলের উপর ছুড়ে মারল।



“কোনো ভুল করো না, ডেল”, সে বলল, “আমার ক্ষেত্রে, আমি মনে করি না কোনো হেয়ারকাট, শেভ বা শ্যাম্পু আমার বউয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা একটুও কমাতে পারবে। কিন্তু যদি তুমি পার্সেলটি খুলে দেখো, তুমি বুঝতে পারবে কেন একটু আগে আমাকে অমন করতে দেখে ছিলে?”
ফর্সা আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে সুতো এবং কাগজ ছিড়ে ফেলল। একটি পরম আনন্দিত চিৎকার এবং এর পরে, আহা! খুব দ্রুত নারীসুলভ পরিবর্তিত উন্মত্ত চোখের জল এবং বিলাপ, ইশ্বরের সান্তনা দানের সকল ক্ষমতার তাৎক্ষনিক প্রয়োগ এই ফ্ল্যাটে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

এটি ছিল চিরুনি...চিরুনির সেট, পার্শ্বে ও পিছনে দাঁত, যার কামনায় ডেলা দীর্ঘ দিন ধরে দোকানের জানালায় চেয়ে থেকেছে। চমৎকার চিরুনি, কচ্ছপের খাঁটি খোলকের সাথে অলঙ্করিত বাঁট... সুন্দর সুশোভিত কেশের পরিধেয় ছায়া। সে জানত চিরুনিগুলো খুব দামী এবং কোনো আশা নেই জেনেও এগুলো পাবার জন্য তাঁর হৃদয়ে ছিল ব্যাকুল কামনা ও বাসনা। এখন এগুলো তাঁর আছে, কিন্তু যে দীর্ঘ কেশ সাঁজানোর জন্য এটি প্রয়োজন ছিল, সেই প্রবল কামনার ধন হারিয়ে গেছে।

কিন্তু সে এগুলোকে তাঁর বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল, অবশেষে সে ঝাপসা চোখে তাঁকাতে পারল এবং মৃদু হেসে বলল, “আমার চুল খুব দ্রুত বাড়ে, জিম!”

এর পর ডেলা ছ্যাঁকা খাওয়া ছোট বিড়ালের মত লাফিয়ে কেঁদে উঠল, “আহা, আহা!”

জিম তাঁর সুন্দর উপহারটি এখনো দেখে নি। ডেলা তাঁর হাতের খোলা তালুতে এটি রেখে জিমের সামনে মেলে ধরল। তাঁর উজ্জ্বল ও অতিশয় আকুল আত্নার প্রতিফলিত আলোর ছটায় মনে হচ্ছিল অনুজ্জ্বল মূল্যবান ধাতুটি চমকে উঠবে।

“এটা কি খুব চমৎকার নয়, জিম? এটি খুঁজে পেতে আমি সারা শহর চষে বেড়িয়েছি। এখন তোমাকে সময় দেখতে যেয়ে প্রতিদিন এটিকে একশ বার দেখতে হবে। তোমার ঘড়িটি আমাকে দাও। তোমার ঘড়িতে এটি কেমন দেখায় আমি দেখতে চাই”।

ডেলার অনুরোধ না রেখে, জিম হুড়মুড় করে গদিওয়ালা চেয়ারটায় বসে পড়ল এবং মাথার নিচে হাত দুটি রেখে মৃদু হাসল।

“ডেল”, সে বল, “চল আমাদের ক্রিসমাসের উপহারগুলোকে সাঁজিয়ে রাখি। এখন এগুলোর ব্যবহার খুব একটা প্রীতিকর নয়। তোমার চিরুনি কেনার টাকা যোগার করতে যেয়ে আমি ঘড়িটি বিক্রি করে দিয়েছি। মনে কর, এখন তোমাকে চপগুলো সাঁজাতে হবে”।

আপনারা জানেন, মেজাইয়েরা জ্ঞানি মানুষ ছিলেন...বিস্ময়কর রকম জ্ঞানি মানুষ..যারা গোশালার শিশুর জন্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন। ক্রিসমাসে উপহার প্রদান কৌশল তাঁরা আবিষ্কার করেন। তাঁরা জ্ঞানী হওয়ায়, নিঃসন্দেহে তাঁদের দেওয়া উপহারও জ্ঞানগর্ভ, দুটো একই বস্তুর ক্ষেত্রে এটি বিনিময়ের সম্ভাব্য সুযোগ প্রদান করে। এখানে আমি অছিলা আকারে আপনাদের সাথে সম্পর্যুক্ত হয়েছি এমন একটি বিরল ঘটনাপঞ্জীতে যেখানে একটি ফ্ল্যাটের দুই বোকা শিশু তাঁদের বাড়ীর সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ সর্বাধিক অজ্ঞানীভাবে একে অপরের জন্য উৎসর্গ করেছে। কিন্তু আজকের দিনের জ্ঞানীরা শেষ কথা হিসেবে এটাই বলবে, যারা উপহার দিয়েছে তাঁদের মধ্যে এই দুইজনই সবেচেয়ে জ্ঞানী। যারা উপহার দিয়েছে এবং পেয়েছে, তাঁদের সকলের মধ্যে এরাই সবচেয়ে জ্ঞানী। সবক্ষেত্রেই তাঁরা সবচেয়ে জ্ঞানী। তাঁরাই মেজাই।

*******************
টীকাঃ The Three Magi
কথিত আছে, মেজাইরা ছিলেন পূর্ব দেশীয় তিনজন জ্ঞানী মানুষ, যারা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র অনুসরণ করে বেথেলহামে এসেছিলেন শিশু ইসা মাসীহ (আঃ) কে উপহার প্রদান করতে। “Magi” মেজাই (এক বচনে Megus, মেজাস) শব্দটি গ্রিক শব্দ “Megos” থেকে এসেছে।
*******************


ও. হেনরী , কালজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিক। আসল নাম উইলিয়াম সিডনী পোর্টার। জন্ম ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৬২, নর্থ ক্যারোলিনা , যুক্তরাষ্ট্র এবং মৃত্যু ৫ জুন, ১৯১০, নিউ ইয়র্ক সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

ও. হেনরী কয়েকশত জনপ্রিয় ছোট গল্প লিখেছিলেন। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য, A Blackjack Bargainer, The Princess and the Puma, The Coming-Out of Maggie, The Ransom of Red Chief, The Gift of the Magi, The Whirligig of Life, The Last Leaf ইত্যাদী।

“The Gift of the Magi” বা “মেজাইয়ের উপহার” ছোট গল্পটি ১৯০৫ সালে নিউ ইয়র্ক সিটির একটি পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ১৯০৬ সালে “The Four Million” গ্রন্থে সংকলিত হয়।

মুল গল্পটি এখান থেকে পড়ুন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29271344 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29271344 2010-11-13 16:05:18
গল্পঃ কাশফুল কন্যা
গ্রামে ভাঙাচোরা বেড়ার একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। বৃষ্টির দিনে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে, ভিজে জুবুথুবু হয় ছাত্র ছাত্রীরা। ঝড়ের দিনে ভাঙা দড়জা জানালাগুলো যেন আর্তনাদ করে উঠে। আর শীতের দিনে হুহু করে ঠান্ডা বাতাস আসে। গ্রামের একমাত্র কাঁচারাস্তাটায় হাঁটু সমান কাদা হয় বর্ষাকালে। ইলেক্ট্রেসিটি তো দূরের কথা, খাম্বারও দেখা নেই। বটগাছ তলার করিম সরকারের একটা বহুমুখি মুদি দোকানই (চা এর স্টল থেকে শুরু করে সব পাওয়া যায়) গ্রামের মানুষের বাজার, বিনোদোনের জায়গা। করিম সরকারের একটা ১৭ ইঞ্চি সাদা কালো টিভি আছে, ব্যাটারির সাহায্যে চলে। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই ভিড় বাড়তে থাকে দোকানটায়। টিভির দর্শক ছেলে বুড়ো সবাই।

দোকানটায় চায়ের অর্ডারটা যেন আজ একটু বেশিই হচ্ছে।গ্রামের মানুষের বুক গর্বে ভড়িয়ে দিয়েছে সিরাজ মঝির বেটি সুফিয়া। সরকার প্রাইমারিতে কী যেন একটা পরীক্ষা চালু করল এবার, সেই পরীক্ষায় বড় পাশ দিয়েছে সিরাজ মাঝির বেটি।গতকাল বড় বড় গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছিল। ফটো তুললো, ভিডিও করলো, কী সব যেন লিখে নিল।

করিম সরকারের টিভিতে সুফিয়াকে যতবারই দেখাচ্ছে, ছোট বড় সবাই খুশিতে হাত তালি দিয়ে উঠছে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, ওই দেহ আমাগের সুফিয়ারে দেহাচ্ছে। আহা! এমন আনন্দ গ্রামের মানুষ কত দিন পায় নি।

২. আজকের সকালটা কেন যে গত চার পাঁচ দিনের মত হত হল না, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না আট বছর বয়সের সুহেল মাঝি। কুয়াশা যদি থাকতো, সূর্যটা যদি না উঠত, শীতের দোহাই দিয়ে আরেকটু ঘুমানো যেত। অথচ এখন উঠানে পাটি বিছিয়ে পড়তে বসতে হয়েছে তাকে। সে ভেবে পায় না, তার দিদি এমন নিষ্ঠুর হয় কি করে? সুহেল ক্লাস টুতে পড়ে, আর তার দিদি ফাইভ পাশ দিয়ে মাত্র সিক্সে উঠেছে। সুহেলের পাশেই বসে তার নিষ্ঠুর মাস্টার মশাই তার নিজের ক্লাসের বই মনযোগ দিয়ে পড়ছে। সুহেল মনে মনে বলে, দিদি তর পড়া তুই পড়েগ গে, এই কালের মদ্দি আমারে ক্যান ডাকপের গেলি? উঠানে তিনটা চড়ুই পাখি কী যেন খুঁজ়ে খুঁজে খাচ্ছিল। পড়ার চেয়ে সুহেলের মনোযোগ সেদিকেই বেশি।

হঠাৎ খেয়াল হতেই মাস্টার মশাই সুফিয়া খাতুন ধমকে উঠল।
-কিরে পড়স না ক্যান? ওই দিকে তাকাইয়ে কী দ্যাখস?
-না দিদি! কিছু না। আতকে উঠে সুহেল।
-তালি পরে পড়।

ওদের মা, হালিমা খাতুন দুই জনের কান্ড কারখানা দেখে একটু হাসল। তারপরে আবার নিজের কাজে মনযোগ দিল। ভাঙা চুলাটা কাদা দিয়ে মেরামত করছে সে। হালিমা খাতুনের মনে আজ খুব আনন্দ। গতকাল সুফিয়ার বাপ আতপ চাল আর খেজুরের গুড় কিনে এনেছে ছেলে মেয়েদের পিঠা খাওয়ানোর জন্য। আহারে! কতদিন যে ওরা ভাল মন্দ খায় না। সিরাজ মাঝির তিন কানি জমি আছে।যে ফসল আসে, এতে বছরের ছয় মাসও যায় না। বাকিটা সময় যায় অভাব অনটনে। এখানে ওখানে কামলার কাজ করে দুই বেলা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন চলে যায়।

-মা, বাপজান কনে গেছে? বিয়ান বেলা থিকাইতো দেখতেছি না? উত্তর পাওয়ার আশায় মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সুহেল।
-তর বাপে বিয়ান বিয়ান কাম খুঁজপের জন্যি বাইর হইছে।
-ও। সুহেল আবার পড়ায় মনযোগ দিল।

সুফিয়ার খুব সখ মায়ের সাথে থেকে ভিজানো চাল পাটায় বেটে বেটে আটা বানাবে। তারপর পিঠা বানাতে বসবে। সুফিয়ার ধারনা, তার মায়ের মত ভালো করে পিঠা বানাতে এই গ্রামের অনেকেই পারে না।

-মা, চাল গুড়া কইরবে না?
-হ। চুলাডা ভালো কইরে লেইপে নেই আগে।
সুফিয়া আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুহেল বই এগিয়ে দিয়ে বলল,
-দিদি পড়া হইছে। ধর দেহি।
-ঠিক আছে। ক।
সুহেল মুটামুটি নির্ভুল ভাবেই পড়া বলে যায়। খুশিতে মনটা ভরে যায় সুফিয়ার। তবুও কৃত্তিম অখুশির ভান করে বলে,
-বেশি ভালা হয় নাই। আরো পড়েক।
সুহেলের মুখটা কালো হয়ে যায়।
-দিদি!
-কী কবি, কলিই তো পারিস।
-তরে একটা কথা কই, রাখপি?
-পাড়লে রাখপোনে, ক দেহি একবার?
-বড় পিলারডার ওই হানে ম্যালা কাশ ফুল ধরছে। চলেক কাইটে নিয়ে আসি।
-খবরদার না! ওই হানে ভারতি মেলেটারি আছে। গুলি করি মাইরে ফেলাবেনে।
দিদির না শুনে সুহেল ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। খুব মায়া লাগলো সুফিয়ার ভাইটির জন্য।
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই দূরে দাড়াইয়ে থাকিস আমি কাইটে নিয়ে আসপানে।
দিদির আশ্বাস পেয়ে যেন সুহেলের খুশি আর ধরে না।

৩. দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের পঞ্চম পাতায় সপ্তম কলামে ছোট্ট একটা রিপোর্ট-
‘বিএসএফের গুলিতে বার বছরের একটি মেয়ের মৃত্যু। মেয়েটি কাশফুল কাটতে গিয়েছিল। বিএসএফের দাবী, মেয়েটি ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু মেয়েটির লাশ বাংলাদেশের সীমান্তেই পাওয়া যায়’।

১০ জানুয়ারি, ২০১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29267671 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29267671 2010-11-06 14:44:28
বুক রিভিউ : কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ, নেলসন ম্যান্ডেলা
(নেলসন ম্যান্ডেলার সাম্প্রতিক প্রকাশিত গ্রন্থ ‘কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ’ নিয়ে গার্ডিয়ান পত্রিকার আন্তর্জালিক সংস্করণে ১৭ অক্টোবর, ২০১০ সাংবাদিক পিটার গডউইনের একটি রিভিউ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, তিনি ‘দি ফিয়ারঃ দি লাস্ট ডেইজ অফ রবার্ট মুগাবে’ গ্রন্থটির প্রণেতা। সেই রিভিউটি বাংলায় অনুবাদ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।)

চুয়াল্লিশ বছর বয়সে কারান্তরীণ হয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেলেন। পরবর্তী সিকি শতক ধরে, তিনি হয়ে গেলেন একজন রহস্যময় মানুষ, একজন হারিয়ে যাওয়া নেতা। অবশেষে ১৯৯০ সালে তিনি যখন বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন, মানুষ তাঁর কথা শোনার জন্য অবদমিত আকাঙ্খা নিয়ে ছুটলেন। তখন থেকেই, তাঁকে নিয়ে লেখা বই এবং তাঁর লেখা বই পরিনত হয়েছে একটি শিল্পে, বলতে গেলে তাদের একটি নিজস্ব সাহিত্য শাখাঃ বিপুল সংখ্যক আত্নজীবনী, অনুমোদিত এবং অননুমোদিত শিশুতোষ বই, তাঁর নেতৃত্ব শৈলী উপস্থাপন করে বই, বানিজ্যিক বই এবং শিল্পকলার বই বেরিয়েছে। সেখানে সত্যিকারভাবেই কি আরেকটি বই ম্যান্ডেলা নামক স্ফিত বইয়ের তাকে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে? আর কিইবা বলার আছে নতুনকরে? এই বইটি পেরেছে, খুব ভালোভাবেই উতরে গেছে।

‘কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ’কে প্রথাগত বইয়ের চেয়ে বরং সাহিত্য সংকলন বলা ভালো, এতে আছে ম্যান্ডেলার জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনার বর্ণনা, ডাইরীর পাতা, দিনপঞ্জি, চিঠি এবং এমনকি রিচার্ড স্টেনগেল, যিনি ম্যান্ডেলার আত্নজীবনী ‘লং ওয়ার্ক টু ফ্রিডম’ এর অনুলেখক ছিলেন (এবং বর্তমানে টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদক), তাঁকে দেওয়া প্রায় পঞ্চাশ ঘন্টার কথোপকথনের প্রতিলিপি। এতে আরো স্থান পেয়েছে ম্যান্ডেলার একটি আত্নজীবনীর কিছু অনুচ্ছেদ, যেটি থেকে তিনি নিজেই কিছু মুহূর্ত ইতঃস্ততভাবে বইটিতে সন্নিবেশ করেছেন, কিন্তু আবার চূড়ান্ত পর্যায়ে বাদ দিয়ে বইটি সংকলন করতে দিয়েছেন।

সব বিষয় কিছুটা অগোছালো ও পরিপাটিহীনভাবে উপস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা থাকত, অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, এতে করে এমনটি হয় নি। এই বইটি গভীরভাবে গতিময়, নৈসর্গিক এবং হস্তক্ষেপহীন, এতে প্রকৃত সময়কে তুলে ধরা হয়েছে পারিপার্শ্বিক সকল পরিবর্তনসহ, বছরের পর বছর, বিরস মুহূর্তগুলো মিশে গেছে অতীব গুরুত্বপূর্ন সময়ের সাথে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিষয়, স্বপ্ন, রাজনৈতিক পদক্ষেপ সব একত্রে উঠে এসে, ম্যান্ডেলার এই পর্যন্ত সবচেয়ে পূর্নাঙ্গ জীবনের ছবি প্রকাশ করেছে।

ভার্ন হ্যারিস, ম্যান্ডলা সেন্টার অব মেমরি অ্যান্ড ডায়ালগের পরিচালক, যিনি সংকলনের জন্য এই দলিলগুলো বাঁছাই ও সন্নিবেশিত করার প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি মুখবন্ধে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, নতুন দক্ষিন আফ্রিকার কিংবদন্তীতূল্য বিনির্মানে ম্যান্ডেলা একটি অংশ হয়ে আছে। সর্বসাধারণে প্রচারিত তাঁর কথাগুলোর সবটুকুই তাঁর নিজের লেখা নয়, এমন কি তাঁর আত্নজীবনী ‘লং ওয়ার্ক টু ফ্রিডম’ এএনসির সহকর্মীদের তত্ত্বাবধানে সংকলিত হয়েছে, যারা অনুধাবন করতে পারত এই লেখাটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ‘কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ’ বইটিতে, ম্যান্ডেলার ‘লং ওয়ার্ক টু ফ্রিডম’ বইটির উপরে এএনসি নেতা আহমেদ ক্যাথরাডা’র চমৎকার কিছু খসড়া পঠন আলোচনার প্রতিলিপি সন্নিবেশিত আছে। ক্যাথরাডা পুস্তক প্রকাশক কর্তৃক প্রচারিত বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনকে উদ্ধৃত করে, ম্যান্ডেলার বিভিন্ন অন্তরঙ্গ সময়ের আরো অধিকতর ব্যক্তিগত মুহূর্তকে বইটিতে সন্নিবেশ করতে আহবান জানিয়েছিলেন। সেই বইটিতে, এক জন লৌহমানব পাথুরে ম্যান্ডেলাকে খুব কমই একজন মানবিক অনুভিতশীল ম্যান্ডেলায় দেখা গেছে। “কেমন লাগত সে দিনগুলোতে?” এই ধরনের প্রশ্ন উত্তর দিতে প্রায় সময় তাঁকে নির্লিপ্ত দেখা গেছে।

এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ম্যান্ডেলার এই চাপা স্বভাবই ‘কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ’ বইটিকে এমন একটি আবশ্যকীয় বইয়ে রূপ দিয়েছে। তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত নোটখাতাগুলো পড়ে, আমরা অবশেষে আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া একজন মানুষকে যেন এক ঝলক দেখতে পাই। সৌভাগ্যক্রমে এমন হয়েছে যে, ম্যান্ডেলা প্রায় সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংরক্ষণ করে রাখতেন এবং প্রচুর নোট লিখতেন, যদিও পুলিশ তাঁর লেখা বহু নোটখাতা বছরের পর বছর ধরে জব্দ করে নিয়ে গেছে, যেগুলো আজ অনিবার্যভাবেই অন্ধকারের অতল গহবরে হারিয়ে গেছে।

বন্দী দিনগুলোতে, এক জন ব্যক্তির প্রবল প্রত্যাশাগুলো স্বাভাবিকভাবেই ক্রমশ হারিয়ে যায়। ম্যান্ডেলা বলেছেন, “যত দিন আমি জেলে বন্দী ছিলাম, আমার স্মৃতি শক্তির ক্ষমতার উপর সেভাবে কখনই ভরসা করতে পারি নি”। তাঁর পরিবার পরিজন এবং বন্ধু বান্ধবদের কাছে থেকে, তাঁর লেখা কিছু চিঠির সারসংক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বইটিতে, অবশ্য সরকারী সেন্সরশীপে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে অনেক চিঠিই তার প্রাপকের কাছে পৌছাতে পারে নি। ম্যান্ডেলা তাঁর শক্ত বাঁধাই করা নোটখাতাটিতে, এই সব চিঠির একটি অনুলিপি লিখে রাখতেন ( এই নোটখাতাটিও কর্তৃপক্ষ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ২০০৪ সালে এক অনুতপ্ত সাবেক নিরাপত্তারক্ষী পুলিশ সদস্য এটি ফেরত দেন)। এই নোটখাতাটি এই বইয়ে সংযুক্ত করার ফলে, বন্দী নম্বর ও নোটখাতাটির উপরে ডানকোণের ডাকটিকিটসহ ম্যান্ডেলার নিখুত পরিপাটি লেখাগুলো দেখার সুযোগ আমরা পাই।

বইটি আমাদের সংশোধনক্ষম প্রবনতার জন্য সহায়ক হবে, অতীত ঘটনাবলীকে পর্যালোচনা করে ইতিহাসকে দেখার, যা কিছু ঘটেছিল তার কতকটা অপরিহার্য ছিল, ভাবার। সেই সময়ের রুবেন দ্বীপের বন্দীদের কাছে, এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশীল বর্ণবাদী রাষ্ট্রটিকে পরাজীত করা ছিল একটি দূরবর্তী স্বপ্ন, তথাপি সেদিনের মত আজকের দিনেও এটি একটি মর্যাদাশীল সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত। বইয়ের এই উজ্জ্বল পাতাগুলো প্রত্যেককে সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোকে মনে করিয়ে দেয়, যেমন, ৪৬৬/৬৪ নম্বর বন্দীটি কয়েক দশক আগেই মুক্তি পেতে পারত, যদি বন্দীকারীদের তৈরী কালো ‘স্বদেশভূমি’র যে কোনো একটিতে মুক্তি নিতে চাইতো এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যাগ করত। কিন্তু সে এমনটি করেন নি। পরবর্তীতে, ১৯৮৭ সালে দক্ষিন আফ্রিকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর করা এক আবেদনে, ম্যান্ডেলা তাঁর আইন ডিগ্রী থেকে ল্যাটিন পেপারটি উঠিয়ে নিতে বলেন, তিনি নিরাবেগভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন যে, তাঁর পক্ষ্যে কোনোভাবেই সত্যিকারের আইন ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়, “কেননা আমি যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাঁজা খাটছি”।

নিজের প্রতি দয়া বিহীন এক জন মানুষ এভাবেই আবির্ভূত হয়েছেন এখানে, যিনি নিজের ক্ষমতা, বিত্ত ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রলোভন থেকে মুক্ত ছিলেন। একটা ক্ষেত্রে, তিনি তাঁর আত্নজীবনীর অনুলেখক রিচার্ড স্টেনগেলকে সতর্ক হওয়ার জন্য জোর দিয়েছিলেন, কেননা সামরিক প্রশিক্ষন নিয়ে আলোচনার সময়, তিনি নিয়মিতভাবেই তাঁর লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছিলেন।

বইটি প্রত্যককে আরো স্মরন করিয়ে দেয় যে, ম্যান্ডেলাকে ইতিহাসের কতটা খাড়া পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, তিনি কতটা অবিসংবাদিত। তিনি সব ধরণের বই পড়তেন, ‘ওয়ার এন্ড পিস’ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিতেন, যখনই কোনো ‘সংগ্রাম’ এর প্রস্তুতি শুরু করতেন, পরামর্শের জন্য নানা রকম বই যেমন ম্যাকিয়াভেলি, ক্ল’জওয়িটয, মাও জেদং এবং মেনাকেমের সাযায্য নিতেন। তিনি অ্যাংলো-বোয়ের যুদ্ধ সম্পর্কে সবিস্তারে পড়াশুনা করেছিলেন, এবং পরবর্তীকালে এটি তিনি তাঁর নিজস্ব কারারক্ষীদের বিপক্ষে আফ্রিকান্সভাষী-বিষয়ক যুক্তি-তর্কে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ম্যান্ডেলার ক্ষেত্রে, আমরা তাঁকে এখানে একজন রূঢ়ভাবে আত্নসমালোচনাকারী হিসেবেও দেখতে পাই। তাঁর স্ত্রী, উইনিকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, “মধুরতা দুঃখ যন্ত্রনা ভোগ থেকে আসে….”, এর পর তিনি বলেন, তিনি তাঁর পূর্বে দেওয়া কিছু ভাষণের প্রতিলিপি পরীক্ষা করে দেখেছেন, “এই ভাষণগুলোতে আনুষ্ঠানিকতার উপর অধিক মনোযোগ, কৃত্রিমতা এবং মৌলিকতার অভাব তাঁকে মর্মাহত করেছে। মানুষেকে মুগ্ধ করা ও নিজেকে প্রচারের বাসনা সেখানে খোলাখুলিভাবেই দৃশ্যমান”।

বইটি একটি মূল্যবান দৃষ্টি সহায়ক কাঁচের মত, যাতে চোখ রেখে দেখা যায় কিভাবে ম্যান্ডেলা তাঁর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন – মার্কসীয় দর্শন, তাঁর খ্রিস্টিয় বিশ্বাস, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং নিরীহ সমর্থনকারী ও অপরাধ সংঘটনকারীদের উপরে কর্তৃপক্ষের দুর্দমনীয় অত্যাচারী মনোভাব সম্পর্কে তিনি কি ভাবতেন। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি রোল মডেল হিসেবে তিনি গান্ধীজির চেয়ে নেহুরুকেই বেশি পছন্দ করতেন। এটাও খোলাসা করে বলেন যে, তিনি অহিংস নীতিকে আদর্শ হিসেবে নয়, বরং কৌশল হিসেবেই বিশ্বাস করতেন, যদিও তাঁর বিচারের সময় এগুলো সে বলেন নি। তিনি আলোচনা করেছেন কিভাবে তিনি ঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছিলেন, তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে, কেমন লাগবে আপনার কাছে যখন আপনি চিন্তা করবেন, “এক জন বিচারক আপনার দিকে এগিয়ে আসবে এবং আপনাকে এখনি বলবে, ‘আপনার জীবনের শেষ সময় উপস্থিত’ – ”।

বিষাদময় ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও এখানে তুলে ধরা হয়েছে, – উদাহারন হিসেবে বলা যায়, তাঁর প্রথম স্ত্রী, এভিলিনকে একবার প্রহার করেছিলেন এই মর্মে তাঁর বিরূদ্ধে অভিযোগ, “তিনি তাঁর গলা টিপে ধরে ছিলেন”। (ম্যান্ডেলার নিজস্ব অভিমত হল, একবার তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে, এভিলিন চুলা থেকে লাল উত্তপ্ত খুন্তি বের করে তাঁর মুখের দিয়ে এগিয়ে আসছিল, এবং তিনি তাঁর হাত থেকে খুন্তিটি কেড়ে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিয়েছিল।) ১৯৬৮ সালে, তাঁর ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা তাঁর গ্রাম ট্রানসকেই থেকে একাই রুবেন দ্বীপে তাঁকে দেখতে আসেন, ম্যান্ডেলা লিখেছেন, “আমার সাথে সাক্ষাত শেষ হলে, আমি তাঁকে ধীরে ধীরে নৌকার দিকে হেঁটে যেতে দেখি, যেটি তাঁকে মূল ভূখন্ডে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, এবং তখনি আমার মনের মাঝে একটি চিন্তাই বার বার দোলা দিচ্ছিল যেন, আমি শেষ বারের মত আমার মাকে দেখছি”।

ম্যান্ডেলার কথাই ঠিক হল – কয়েক মাস পরেই তাঁর মা মারা যান, এবং তাঁকে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হয় নি, এমনকি নিরাপত্তাক্ষী দ্বারা বন্দী অবস্থায়ও নয়। দশ মাস পরে তাঁর বড় ছেলে, থেম্বি মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। ১৩ জুলাই, ১৯৬৯ সালে রুবেন দ্বীপ কারাগারের কমান্ডিং অফিসার বরাবর, ম্যান্ডেলা তাঁর ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থাকার অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখেন, এটি পড়লে যে কারো হৃদয় ভেঙে যাবে কষ্টে। কর্তৃপক্ষ এটিও প্রত্যাখান করে।

‘কনভারসেশনস উইথ মাইসেলফ’ বইটিতে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে খাটো করে দেখা হয় নি (ম্যান্ডেলা বইটিকে নিয়ন্ত্রন করার কোনো চেষ্টা করেন নি) এবং পারিবারিক জীবনকে প্রারম্ভেই বড় করে তুলে ধরা হয়েছে। যখন উইনি তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন, তাঁর জন্য “কিছু সিল্কের পায়জামা এবং নাইট গাউন…” নিয়ে আসতেন। ম্যান্ডেলা সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, “এই পোষাক এই জায়গায় ব্যবহারের জন্য নয়”। জেলখানার বন্দী দিনগুলোতে, ম্যান্ডেলা ও স্টেনগেলের মধ্যে যৌনতা বিষয়ক প্রশ্ন এবং ঐসব দিনগুলোতে ম্যান্ডেলাকে না পেয়ে উইনি কি করত, তা নিয়ে ইতস্তত কথা হত, এই সময় ম্যান্ডেলাকে প্রচন্ডভাবে আত্ন সংযমী দেখা যেত।

স্টেনগেল গভীরভাবে অনুসন্ধান করে বলতেন, “তাঁরও (উইনি) বাইরে আলাদা একটা জীবন আছে, সে অন্য পুরুষের সাথে মেলামেশা করে….”। কিন্তু ম্যান্ডেলার মাঝে কোনো ঈর্ষা প্রকাশ পেত না। পরবর্তীতে, উইনি যখন নিজেই জেলে অন্তরীণ হলেন, কিভাবে জেল জীবন মানিয়ে নিতে হয়, তা জানিয়ে ম্যান্ডেলা উপদেশ পাঠাতেন, বিছানায় ঘুমোতে যাওয়ার পনের মিনিট ধ্যান করার জন্য তাঁকে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু উইনি ছিলেন তাঁর স্বামীর থেকে একেবারেই আলাদা ধাঁচের। যখন ম্যান্ডেলার স্বল্পবয়স্ক মেয়েরা তাঁর সাথে দেখা করে চলে যেত, তিনি তাঁর স্ত্রীকে চিঠি লিখে জানাতো, কত সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে মেয়েগুলো, তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন যে, “এমন হত, আমি যেন বড় ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা করেছি…..সে আমাকে মনে করিয়ে দিত, ‘তুমি নও, আমিই বড় করে তুলেছি এই বাচ্চাগুলোকে, যাদেরকে তুমি আমার চেয়েও বেশি প্রিয় ভাবছো!’ আমি বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতাম”।

বইটিতে কিছু স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিজ্ঞানের উল্লেখ আছে, বিশেষকরে ম্যান্ডেলা কর্তৃক আলাপ আলোচনার বর্ণনা, যার মাধ্যমে বর্ণবাদনীতি বিলুপ্ত হয়। যখন কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাঁর সহকর্মীদের থেকে আলাদা করে অন্য স্থানে নিয়ে এলেন, তাঁদের থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন, তিনি এই অবস্থান্তরকে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কেননা এটি তাঁকে খোলাখুলিভাবেই বর্ণবাদী কর্তৃপক্ষের সাথে গোপন আলোচনার সুযোগ প্রদান করবে, তাঁর সহকর্মীদের সাথে কোনো ধরণের পরামর্শ ছাড়াই। “আমি তাঁদের না জানিয়েই সেই মত আলাপ আলোচনা শুরু করলাম, এবং পরবর্তীতে তাঁদের মুখোমুখি হয়ে বলি, যা হবার হয়ে গেছে, এখন আর ফেরানোর পথ নেই”। তিনি অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

ম্যান্ডেলার দিনপঞ্জি থেকে একটি বিষয় কুড়িয়ে তুলে আনা হয়েছে এখানে, যখন তাঁকে বন্দী করা হল, পৃথিবীর চারিদিকে তাঁকে ঘিরে সংঘঠিত পদক্ষেপগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর কাছে। তাঁর মুক্তির জন্য জন সাধারণের আদালতে করা আবেদনপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁকে সম্মানজনক আচার্য্য করার উদ্যোগ, এমনকি জন্মদিনের কার্ড – যা প্রায়ই শিশুতোষভাবে ফেলে দেওয়া হত, নিষ্ফল আন্দোলন ও পদক্ষেপসমুহ – এগুলো পরিষ্কারভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর মনোবল ধরে রাখতে।

বইটিতে অপ্রত্যাশিত কিছু আনন্দদায়ক মুহূর্তের বর্ণনাও আছে। আমরা ম্যান্ডেলাকে একজন চলচিত্র সমালোচক হিসেবে দেখতে পাই – তিনি ‘অ্যামাডিউস’ এর সমাপ্তীকে পেয়েছিলনে “কিছুটা বিরস” ও নেলসন ম্যান্ডেলার সাথে খুব মিলে যায়, এবং “দি নার্ডস টেক রিভেঞ্জ” (আমার মনে হয়, তিনি অবশ্যই “রিভেঞ্জ অফ দি নার্ডস” এর কথা বলেছেন) চমৎকার। এখানেই শেষ নয়, এই বইটিতে আরো প্রকাশ পেয়েছে “ফ্রম দি ডেস্ক অফ ম্যান্ডেলা” নামক চিঠি লেখার খাতার মুদ্রিত ছবি, যার ডান কোণে শোভা পাচ্ছে একটি দেঁতো হাসির গার্ফিল্ড কার্টুনের ছবি।

এক নজরেঃ
Conversations with Myself By Nelson Mandela
শক্ত মলাটে বাঁধাইঃ ৪৮০ পৃষ্টা
প্রকাশকঃ Farrar, Straus and Giroux (১১ অক্টোবর, ২০১০)
মূল্যঃ $২৮.০০
ভাষাঃ ইংরেজী
আইএসবিএন – ১০: ০৩৭৪১২৮৯৫২
আইএসবিএন – ১৩: ৯৭৮-০৩৭৪১২৮৯৫১]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29265956 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29265956 2010-11-03 01:40:31
বুক রিভিউ : ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ
“ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম” বইটি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের আত্নজীবনীমূলক রচনা হলেও, ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মৌলানা আজাদের অন্যতম প্রধাণ ভূমিকা ছিল। এই গ্রন্থে তিনি ভারত-ভাগের পটভূমিসহ ১৯৩৫-৪৮ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলীর অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দিয়েছেন।অনেক ইতিহাসবিদের কাছেই বইটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে অনন্য স্থান করে নিয়েছে।

মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন একাধারে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক সংবাদপত্র ধারার রূপকার, কবি, দার্শনিক ও শিক্ষা-সংস্কারক। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছরে তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেসের কনিষ্ঠতম সভাপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্রান্তিকালীন সময়ে ১৯৩৯-৪৬ সাল পর্যন্ত নিখিল ভারত কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে নিয়ে গেছেন স্বাধীনতার বন্দরে। চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী মৌলানা আজাদ আমৃত্যু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কতৃক প্রস্তাবিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত-ভাগকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন ভারত-ভাগ ঠেকানোর। কারন, তিনি বিশ্বাস করতেন এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাঁরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে বিভাজিত হয়ে আরো সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র দুইটিতে বজায় থাকবে চিরকালীন অশান্তি, উভয় দেশেই বার্ষিক বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দ কমে গিয়ে সামরিক বরাদ্দ বাড়বে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণ। ভারত-ভাগের এত বছর পরে, তাঁর আশঙ্কাই যেন আজ এই উপমহাদেশের জন্য চির বাস্তবতা।

মৌলানা আজাদ ১৮৮৮ সালে মক্কায় এক সমভ্রান্ত রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলানা খয়রুদ্দিন সেকালে আরব, পারস্য ও ভারতবর্ষে ধর্মগুরু হিসেবে ব্যপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিঁনি ১৮৯০ সালে বসবাসের জন্য কোলকাতায় ফিরে আসেন। রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হওয়ায় মৌলানা আজাদকে বাড়িতে বসেই সাবেকি পদ্ধিতে শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। মাত্র পনের বছর বয়সেই তিনি আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ দখল অর্জন করেন। তিঁনি আরবীতে দর্শন, জ্যামিতি, গনিত ও বীজগনিতের উপর শিক্ষালাভ করে সাবেকি পদ্ধতিতে শিক্ষা-অর্জনের সমস্ত ধাপ সমাপ্ত করেন এবং শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে উঠে মৌলানা আজাদের মন মুক্তির আশায় ছটফট করতে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের লেখা তাঁর নজরে আসে। তিনি আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে উঠেন। এজন্য তিনি ততকালীন প্রাচ্যশিক্ষা পাঠক্রমের প্রধাণ পরীক্ষক মৌলভী মোহাম্মেদ ইউসুফ জাফরীর কাছে ইংরেজী শিখেন। পারিবারিক কক্ষপথ ছেড়ে সত্যের সন্ধানে নিজস্ব পথে বেড়িয়ে পড়েন মৌলানা আজাদ। তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, “প্রথমে যে জিনিসটা আমাকে ফাঁপরে ফেলল, সেটা হল মুসলমানদের নানা গোষ্ঠীর মধ্যকার প্রভেদ নিয়ে শোরগোল। তারা দাবি করে যে, তাদের সকলেরই উৎসস্থল এক; তাহলে কেন তারা একে অন্যের পরিপন্থী, সেটা আমার ঢুকতো না। যেভাবে চোখ বুঝে কোনোরকমে ভাবনা চিন্তা করে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভ্রান্ত আর অবিশ্বাসী বলে দাগিয়ে দিত, তার সঙ্গে আমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসীদের এই ভেদবুদ্ধি ক্রমশ ধর্ম জিনিসটার ওপরই আমার মনে সন্দেহ ধরাতে থাকে। ধর্ম যদি বিশ্বজনীন প্রকাশ হয়, তাহলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এত কেন চুলোচুলি আর ঠোকাঠুকি? প্রত্যেকটি ধর্মই বা কেন নিজেকে সত্যের একমাত্র আধার বলে দাবি করবে এবং কেনই বা অন্য সব ধর্মকে নস্যাৎ করবে?...... এই সময় নাগাদ আমি ‘আজাদ’ বা ‘মুক্ত’ এই ছদ্মনাম গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিই। এই নামের সাহায্যে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমি আর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিশ্বাসের বন্ধনে বাধা নই।” (পৃ. ১১-১২)।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বৃটিশরাজের শাসন সুবিধার্থে বঙ্গভঙ্গ করলে ভারত বিশেষ করে বাংলায় চরম ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা ব্রিটিশরাজ থেকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য স্বদেশী আন্দোলনে উদ্ধুধ হয়ে বিপ্লবী দল গঠন করেন। এ সময় মৌলানা আজাদ বিপ্লবী শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ও শ্রী শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন এবং বিপ্লবীদের দলে নাম লেখান। বিপ্লবীদলগুলোকে মৌলানা আজাদ একক প্রচেষ্টায় বাংলা থেকে সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেন। দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার উদ্দ্যেশে তিনি ১৯১২ সালের জুনে ‘আল-হিলাল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। “উর্দু সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘আল-হিলাল’ প্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা। অল্প সময়ের মধ্যে এই কাগজ অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করল। লোকে এর প্রতি আকৃষ্ট হল শুধু এর উন্নত ধরনের ছাপা আর সৌকর্যের জন্যই নয়, বরং তার চেয়েও বেশি এর প্রচারিত বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদের অভিনব সুরের জন্য” (পৃ. ১৫)।

১৯২০ সালে মৌলানা আজাদ তুরস্কের খেলাফত ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভারতীয় মুসলমানদের উদ্বেগকে সামনে রেখে তাদেরকে সংগঠিত করেন, গড়ে তোলেন খেলাফত আন্দোলন। ততদিনে ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্না গান্ধীর আবির্ভাব হলেও, মৌলানা আজাদ জেলে অন্তরীন থাকায় তাঁর সাথে সাক্ষাত হয় নি। গান্ধীজী, লোকমান্য তিলকসহ কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা খেলাফত প্রশ্নে ভারতীয় মুসলমানদের মনোভাব সমর্থন করেন। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে গান্ধীজী স্বরাজলাভ এবং খেলাফত সমস্যার সন্তোষজনক মীমাংসার জন্য অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহন করেন। এই সময় গান্ধীজী এবং মৌলানা আজাদ সারা ভারতবর্ষে ব্যপকভাবে সফর করে অসহযোগ আন্দোলনের জন্য জনসমর্থন আদায় করেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত নাগপুরে এবং এই অধিবেশনেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করেন।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, ভারতীয় রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নেয়। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব এ যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে মত-বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। গান্ধীজী খোলাখুলিভাবেই যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে মত দেন, এমনকি এর বিনিময়ে ভারত স্বাধীনতা পেলেও। “আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে ঝড়-ঝঞ্ঝা যত ঘনিয়ে আসছিল, ততই ঘোরতর বিষাদে গান্ধীজীর মন ভরে উঠছিল। ইউরোপ আর আমেরিকার নানা সমিতি আর ব্যাক্তিবর্গ তাঁর কাছে ব্যগ্রতা জানাচ্ছিলেন, আসন্ন যুদ্ধ ঠেকাবার জন্যে তিনি কিছু করুন-এইসব আবেদন তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ আরও ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। সারা দুনিয়ার শান্তিবাদীরা শান্তিরক্ষার কাজে তাঁকেই স্বাভাবিকভাবে তাদের নেতা হিসেবে দেখেছিল। গান্ধীজী গভীরভাবে এ বিষয়ে ভেবে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কাছে প্রস্তাব করেন যে,…..আসন্ন যুদ্ধে ভারত কোনোক্রমেই যোগ দেবে না, এমনকি তা যদি ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, তাহলেও নয়-এই ছিল গান্ধীর মত” (পৃ. ২৭-২৮)। জওহরলাল নেহুরু ও মৌলানা আজাদ ভিন্নমত প্রকাশ করেন। ইউরোপ ও আমেরিকার গণতান্ত্রীক রাষ্ট্রগুলো আক্রান্ত হওয়ায় নেহুরু তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না দেখে, ভিতরে ভিতরে খুব অশান্তিবোধ করেন ও বিচলিত হয়ে পড়েন। মৌলানা আজাদ ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তী সাপেক্ষে নাৎসীবাদ ও ফ্যাসীবাদ শক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রীক শক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহনের প্রস্তাব করেন।

৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ বৃটেন জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে আহবান জানায়। ডমিনিয়নের পার্লামেন্টগুলো বসে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও, ভারতের ক্ষেত্রে স্বয়ং বড়লাট লর্ড লিনলিথগো কারো সাথে আলোচনা না করেই জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভারতকে যুদ্ধে ভিড়িয়ে দেয়। এতে গান্ধীজী মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন। “ভারতকে যখন অভদ্রভাবে যুদ্ধে টেনে নামানো হল, গান্ধীজীর মানসিক অশান্তি প্রায় সহ্যের সীমা ছাড়াল। যুদ্ধে ভারতের যোগ দেওয়ার ব্যাপারটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি।…..গান্ধীজীর পক্ষে এটা ছিল খুবই কঠিন সময়। গান্ধীজী দেখতে পাচ্ছিলেন যে, যুদ্ধে বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং তা রোধ করার আর কোনো ক্ষমতা নেই। তাঁর মর্মপীড়া এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, তিনি বেশ কয়েকবার এমন কি আত্নহত্যা করার কথাও বলেছিলেন। আমাকে তিনি বলেছিলেন যে, যুদ্ধজনিত দুঃখযন্ত্রণা ঠেকানোর ক্ষমতা যদি তাঁর না থাকে, তাহলে অন্তত তাঁর জীবনের অবসান ঘটিয়ে এ জিনিস চোখে দেখার দায় থেকে রেহাই পেতে হবে” (পৃ.২৮-৩১)।

১৯৪২ সালের শুরুতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে পড়লে, যুদ্ধে ভারতীয় জনগণের সার্বিক সমর্থন ও অংশগ্রহণ লাভের আশায় মার্কিন যুক্ত্ররাষ্ট্র ও চীনের অনুরোধে ভারতীয় সমস্যা সম্পর্কে বৃটিশ সরকার মনোভাব বদল করে। বৃটিশ সরকারের যুদ্ধকালীন মন্ত্রীসভার সদস্য স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বে ক্রিপস কমিশন ভারতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করতে ভারতবর্ষে আসেন। তার প্রস্তাব ছিল, “ বৃটিশ সরকার তখনই এই মর্মে ঘোষণা করবে যে, যুদ্ধ মিটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হবে। ঘোষণায় এই মর্মে আরও একটি ধারা যুক্ত থাকবে যে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতর থাকা না থাকার বিষয়টি ভারত স্বাধীনভাবে স্থির করতে পারবে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের জন্যে একজিকিউটিভ কাউন্সিল পুনর্গঠিত হবে এবং তার সদস্যরা মন্ত্রীর পদমর্যাদা পাবে। বড়লাট থাকবেন নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসেবে। এইভাবে এটা হবে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা হস্তান্তর তবে এই হস্তান্তর আইন মোতাবেক হতে পারবে কেবল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর” (পৃ. ৪১)। প্রথম থেকেই গান্ধীজী যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন, তাই তিনি এই প্রস্তাব সমর্থন করেন নি্, কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষনেতৃত্বকে ভারতের মঙ্গলের স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। ২৯ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল, ১৯৪২ একটানা কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে দিনের বেলায় ক্রিপসের প্রস্তাবগুলো আলোচিত হয় এবং সন্ধ্যায় মৌলানা আজাদ ও জওহরলাল নেহেরু ক্রিপসের সাথে কথা বলেন। কংগ্রেস যুদ্ধের পরে ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করা হবে, একজিকিউটিভ কাউন্সিল মন্ত্রীসভার ন্যায় ক্ষমতাভোগ করবেন, যুদ্ধ একজন ভারতীয় মন্ত্রীর অধীনে পরিচালিত হবে ও বড়লাট থাকবেন নিয়মতান্ত্রিক প্রধান এই মর্মে লিখিত ঘোষণা চাইছিল। স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস শেষ পর্যন্ত তাঁর পূর্ব অবস্থান থেকে সরে এলে, এই মিশন ব্যর্থ হয়ে যায়।

১৯৪২ সালের জুনে জাপান কর্তৃক ভারত আক্রমণ বিশেষকরে বাংলা দখলের আশঙ্কা, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। করণীয় নির্ধারণে কংগ্রেস নেতৃত্ব দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের শুরুর দিকে মৌলানা আজাদ বিভিন্নভাবে গান্ধীজীকে বৃটিশের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলনের কথা বললেও তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু জাপানী বাহিনীর ভারত আক্রমণের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে গান্ধীজী নতুনকরে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা বলেন। মৌলানা আজাদ ও জওহরলাল নেহুরু গান্ধীজীর এই মতকে সমর্থন করতে পারেন নি। মৌলানা আজাদের আশঙ্কা ছিল, ভারতীয় সীমান্তে যখন শত্রুপক্ষ দাঁড়িয়ে, বৃটিশ সেসময়ে সংঘবদ্ধ কোনো আন্দোলন সহ্য করবে না, সব কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তারসহ প্রয়োজনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করবে। “গান্ধিজীর ধারণা করেছিলেন যে যুদ্ধ ভারতের সীমান্তে এসে যাওয়ায় আন্দোলন শুরু হওয়া মাত্র বৃটিশ কংগ্রেসের সঙ্গে একটা রফা করে নেবে। যদি তা নাও হয় তবু জাপানীরা যখন ভারতের দোরগোড়ায় তখন কোনো চরম পথ নিতে বৃটিশ ইতস্তত করবে। তিনি ভেবেছিলেন এর ফলে কংগ্রেস একটি সার্থক আন্দোলন গড়ে তোলার সময় এবং সুযোগ পাবে” (পৃ. ৬১)। ১৯৪২ সালের ১৪ জুলাই মৌলানা আজাদ ও জওহরলাল নেহুরুর সমর্থন ছাড়াই কংগ্রেস ব্রিটিশ বিরোধী অহিংস বিপ্লব “ভারত ছাড়” আন্দোলন ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে মৌলানা আজাদের আশঙ্কাই সত্যি হয়। সরকার গান্ধীজীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলে পাঠায় এবং “ভারত ছাড়” আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বৃটিশ সরকার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত-সচিব লর্ড পেথিক লরেন্স, বোর্ড অব ট্র-এর সভাপতি স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং ফাস্ট লর্ড অব অ্যাডমিরালটি মিঃ এ. ভি. আলেক্সান্ডারের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট ক্যাবিনেট মিশন আলোচনার উদ্দেশ্যে ২৩ মার্চ, ১৯৪৬ ভারত আসেন। ভারতের স্বাধীনতা প্রদানের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যা। মুসলমানরা তিনটি প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সামগ্রিকভাবে ভারতে তারা সংখ্যালঘু। ১৯৩৯ সালে জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্ব ঘোষণা, ১৯৪০ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত লাহোর প্রস্তাব, পরবর্তীতে সংশোধিত পাকিস্তান প্রস্তাবের মাধ্যমে মূলত মুসলমানরা বিচ্ছিন্নতাবাদের পথে অগ্রসর হয়। এসময় মুসলমানদের মন থেকে হিন্দুদের আধিপত্যের ভয় দূর করার বাস্তব উপায় খুঁজতে থাকেন মৌলান আজাদ। তিনি প্রস্তাব করেন, ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যা দূর করার একমাত্র উপায় ভারতের সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্রিয় সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন, কেন্দ্রিয় সরকারের হাতে থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্র, বাকি সব বিষয় থাকবে প্রদেশগুলোর হাতে। এভাবে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে তাদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ধরে রেখে সর্বভারতীয় সরকারে আলাদা ভূমিকা রাখতে পারবেন। তাঁর এই প্রস্তাব গান্ধীজীসহ শীর্ষ কংগ্রেস নেতৃত্ব সমর্থন করেন। পরবর্তীতে ১৬ মে ক্যাবিনেট মিশন সেই প্রস্তাব অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহন করে সমগ্র ভারতকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেন, ‘ক’ অংশে পড়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, ‘খ’ অংশে পাঞ্জাব, সিন্ধু প্রদেশ, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বৃটিশ বালুচিস্তান এবং ‘গ’ অংশে বাংলা ও আসাম। এই পরিকল্পনা মুসলীম লীগ মেনে নিলে ভারত-ভাগের প্রধাণ বাঁধা সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু ইতিহাসের দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় তখনও অপেক্ষায় ছিল। জওহরলাল নেহুরু ১০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে বলে বসেন, “কংগ্রেস ‘বোঝাপড়ার কোনোরকম বাঁধন না মেনে এবং সব সময় অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণের স্বাধীন মনোভাব নিয়ে’ গণপরিষদে প্রবেশ করবে। সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা আরও জিজ্ঞেস করেন, এর মানে এটা কিনা যে, ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার হেরফের করা যাবে। এর উত্তরে জওহরলাল জোর দিয়ে বলেন যে, কংগ্রেস রাজী হয়েছে শুধু গণপরিষদে যোগ দিতে এবং মনে করে যে, তেমন বুঝলে কংগ্রেস অবাধে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার রদবদল বা ইতরবিশেষ করতে পারে” (পৃ. ১১৬)। নেহুরুর এই ঘোষণার পরে জিন্নাহ কংগ্রেসের মনোভাব নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। দেশ স্বাধীন হবার আগেই কংগ্রেস মত পরিবর্তনের ইংগিত দিলে, পরবর্তীতে মুসলমানরা কতটুকু নিরাপদ হতে পারে, এই ভাবনা থেকেই জিন্নাহ ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা বিষয়ে মুসলীম লীগের পূর্ববর্তী সমর্থন প্রত্যাহার করে স্বাধীন পাকিস্তানের দাবী পুনর্ব্যক্ত করেন। ফলশ্রুতিতে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়।

বৃটিশ প্রধাণমন্ত্রী মি. এটলি লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা বেধে দিয়ে শেষ ভাইসরয় করে পাঠান। মৌলানা আজাদ লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করে ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানান। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তান প্রস্তাবকে সামনে রেখে অগ্রসর হন। এক্ষেত্রে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বল্লবভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহুরুকে পাশে পান। জওহরলাল নেহুরু প্রথম দিকে ভারত-ভাগের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু লেডী মাউন্টব্যাটেনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায়, তিনি মত বদল করে ফেলেন। “জওহরলালের ভোল বদলের পেছনে একটা কারণ লেডি মাউন্টব্যাটেন। ভদ্রমহিলা যেমন অতীব বুদ্ধিমতি তেমনি ভারী মায়াবী আর বন্ধুভাবাপন্ন। তিনি ছিলেন তাঁর স্বামীর খুব গুনগ্রাহী এবং বহুক্ষেত্রে তাঁর স্বামীর সঙ্গে যাদের গোড়ায় মতের অমিল হত তাদের কাছে তিনি স্বামীর বক্তব্য ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন” (পৃ. ১৩৭)। গান্ধীজীও প্রথম দিকে ভারত-ভাগের বিরোধী ছিলেন। মৌলানা আজাদ ভারত-ভাগ ঠেকানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে গান্ধীজীর শরনাপর্ণ হয়ে বলেন, “যেমন এতদিন, তেমনি এখনও আমি দেশভাগের বিরুদ্ধে। বরং দেশভাগের বিরুদ্ধে আমার মনোভাব আগের চেয়েও কড়া।...এখন আপনিই আমার একমাত্র ভরসা। আপনি যদি দেশভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, এখনও আমাদের শেষ রক্ষার আশা আছে। তবে আপনি যদি চুপ করে থাকেন তো আমার ভয়, ভারতের ভরাডুবি হবে” (পৃ. ১৪০)। গান্ধীজী প্রতিউত্তরে বলেন, দেশভাগ হলে আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে হবে। কিন্তু প্যাটেল ও নেহুরু বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে নিয়ে আসেন। মৌলানা আজাদ গভীর দুঃখ নিয়ে বলেন, “প্যাটেলকে আজ জিন্নার চেয়েও দ্বিজাতিতত্ত্বের বড় সমর্থক হতে দেখে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। দেশ ভাগের পতাকা জিন্না তুলে থাকলেও তার প্রকৃত পতাকাবাহক এখন প্যাটেল” (পৃ. ১৩৯)।

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হয়। মৌলানা আজাদ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও, তাঁর দেশপ্রেম ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট মতামত, তাঁর সততা ও সাহসকে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ নতুন করে প্রশংসা করতে বাধ্য হবে।

অন লাইনে বইটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

এক নজরেঃ
India Wins Freedom By Maulana Abul Kalam Azad
অনুবাদঃ ভারত স্বাধীন হল (সুভাষ মুখোপাধ্যায়)
অরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড, ১৯৮৯
পেপারব্যাক সংস্করণ। পৃষ্ঠা-১৯২
মূল্যঃ ১৫০ রুপি
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29262503 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29262503 2010-10-27 18:33:06
ঠিক ঠাক চলছে নিয়ম করে পৃথিবী ঘুরছে,
সূর্য ডুবছে,
চাঁদ উঠছে,
ফুল ফুটছে,
বাতাসে দুলছে।
তবে কেন প্রজাপতি
রঙিন পাখা মেলে
উড়তে ভুলছে?

সব কিছু ঠিক ঠাক চলছে,
নিয়ম করে সন্ধ্যায় সবাই যাচ্ছে,
মধুদার ক্যান্টিনে
আড্ডা চলছে,
সিগারেট পুড়ছে,
কেউ গাইছে,
কেউ হাসছে,
চায়ে গলা ভিজছে,
গেলাস ভাঙছে,
অরুনদা মারছে,
দশ টাকা কাটছে,
কাওছার কাঁদছে,
চোখ মুছছে,
আবার হাসছে।
তবে কেন ওর চোখে
লুকোনো কান্না
চুপিসারে ফিরছে?

সব কিছু ঠিক ঠাক চলছে,
নিয়ম করে হার্ট কাঁপছে,
পা চলছে,
ঠোট নড়ছে,
ক্ষুধা বাড়ছে,
শরীর ফুলছে,
হেলে দুলে চলছে।
তবে কেন ভিতরের লোকটা,
থেকে থেকে বলছে,
আসলেই কি সব কিছু
ঠিক ঠাক চলছে?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29257029 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29257029 2010-10-18 06:03:20
শান্তিন্তে নোবেল বিজয়ী লিউ সিয়াওবোর কবিতাঃ একটি চিঠিই যথেষ্ট
২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী লিউ সিয়াওবো (Liu Xiaobo) চীনের একজন মানবাধিকার কর্মী, বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদী কবি ও সাহিত্যিক। তিনি ২০০৩ সাল থেকে সাহিত্যকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন PEN এর চৈনিক শাখা Independent Chinese PEN Center এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ২০০৯ সালে কাব্যে PEN/Osterweil পদক এবং একই বছর সাহিত্যে PEN/ Barbara Goldsmith Freedom পদক পান। ১৯৮৯ সালের ৪ জুনে চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ছাত্রদের গণতন্ত্রের দাবীতে বিক্ষোভ আয়োজনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। চীনা কর্তৃপক্ষ গুলী চালিয়ে কয়েক শ ছাত্রকে হত্যা করে নির্মমভাবে এই বিক্ষোভ দমন করে। লিউ সিয়াওবোসহ অসংখ্য গণতন্ত্রপন্থীকে গ্রেপ্তার করে। সেই থেকে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে চীনের কারাগারে রাজবন্দী থেকে গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। PEN American Center এর আন্তর্জাল পাতায় জেফরে ইয়াং (Jeffrey Yang) এর অনুবাদকৃত লিউ সিয়াওবোর চারটি কবিতা One Letter is Enough, Longing to Escape, A Small Rat in Prison এবং Daybreak সংকলিত আছে। প্রথম কবিতা One Letter is Enough বাংলায় অনুবাদ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। সেই সাথে, আমার ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে গণতন্ত্রপন্থী মানবতাবাদী এই মহান বিপ্লবী কবির মুক্তি দাবী করছি।

একটি চিঠিই যথেষ্ট

একটি চিঠিই যথেষ্ট
আমার জন্য, বর্ণনা শক্তির সীমা ছাড়িয়ে মুখোমুখি হয়ে
তোমাকে বলার

যেমন করে বাতাস বইছিল কাল
রাত্তিরে
নিজেরি রক্তের অক্ষরে
লিখছিল গোপন পদ্য
মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমায়
প্রতিটি শব্দই শেষ শব্দ

তোমার শরীরের হিম
গলে হয়েছিল পৌরানিক বহ্নি
জল্লাদের রক্তচক্ষুর
ক্রোধোন্মতা হয়েছিল অদ্রি

দুই সারি সমান্তরাল লোহার রেললাইন
আচমকাই মিশে গিয়েছিল
পতঙ্গগুলো পাখা ঝাপটিয়ে ছুটেছিল প্রদীপ শিখায়
আলো, যেন এক শাশ্বত নিদর্শন
দেখেছিলাম তোমার ছায়ায়
০৮।০১।২০০০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29253817 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29253817 2010-10-12 22:21:13
অনুরাধা

মনে আছে তোমার
দেবাশিষ আর হিমাদির কথা?
মনে পড়ে তোমার?
ঢাকা হলের ইট বাঁধানো পুকুড় ঘাটে
কত খুঁনসুটি হত ওঁদের
হল থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে
হিমাদি খাওয়াতো দেবুদাকে?
তোমারও খুব শখ ছিল
আমি হিমাদি হই
আর তুমি দেবুদা।

মাঝে মাঝেই ঘাটলাটায় যাই
ওঁরা যেখানটায় বসত
সেখানটায় গিয়ে বসি।
আমারও এখন খুব ইচ্ছে করে
আমি তোমার হিমাদি হই।


যাবার সময় তুমি বলেছিলে
আমার জন্য সোনালী সকাল
নিয়ে ফিরবে,
আর আমাদের খোকার জন্য
আনবে স্বাধীনতার হাসি।

আটত্রিশ বছর চলে গেল
তুমি ফিরে এলে না।
নাকি তুমি এসে ছিলে?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বৃদ্ধা….

প্রতি পূজোয় বৌমা
নতুন সাদা শাড়ি এনে দেয়
চুলগুলোও সব সাদার মিছিলে
ভারী ফ্রেমের পুরু চশমায়
হয়ত চিনতেই পারনি
আমি তোমার সেই
চিরচেনা অনুরাধা।

পুনশ্চঃ কবিতাটি কয়েক মাস আগে লেখা। পুজো উপলক্ষ্যে শেয়ার করলাম। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা<img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29250986 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29250986 2010-10-07 18:16:25
কর্নেল তাহেরের শেষ চিঠি
শ্রদ্ধেয় আব্বা, আম্মা, প্রিয় লুৎফা, ভাইজান ও আমার ভাইবোনেরা। গতকাল বিকালে ট্রাইব্যুনালের রায় দেয়া হল। আমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। ভাইজান (তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান) ও মেজর জলিলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। আনোয়ার, ইনু, রব ও মেজর জিয়াউদ্দিনের দশ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ও দশ হাজার টাকা জরিমানা (প্রকৃতপক্ষে জিয়ার বারো বৎসরের কারাদণ্ড হয়েছিল)। সালেহা, রবিউলের ৫ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা (সালেহা যশোরের প্রাক্তন জাসদ নেত্রী, রবিউল সালেহার স্বামী, তৎকালীন যশোর জেলার জাসদ নেতা)। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদি কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ড. আখলাক, সাংবাদিক মাহমুদ ও মান্নাসহ ১৩ জনকে এ মামলা থেকে খালাস দেয়া হয়েছে (সাংবাদিক মাহমুদ হচ্ছেন কে বি এম মাহমুদ একসময়ের সাপ্তাহিক 'ওয়েভ' পত্রিকার সম্পাদক আর মান্না হচ্ছেন মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক সহ-সভাপতি)। সর্বশেষে ট্রাইব্যুনাল আমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে বেত্রাহত কুকুরের মত তাড়াহুড়া করে বিচার কক্ষ পরিত্যাগ করলো।

হঠাৎ সাংবাদিক মাহমুদ কান্নায় ভেঙে পড়লো। আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমার কান্না এ জন্য যে একজন বাঙালি কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করতে পারলো!' বোন সালেহা হঠাৎ টয়লেট রুমে গিয়ে কাঁদতে শুরু করল। সালেহাকে ডেকে এনে যখন বললাম, 'তোমার কাছ থেকে দুর্বলতা কখনোই আশা করিনি।' সালেহা বললো, 'আমি কাঁদি নাই, আমি হাসছি।' হাসি-কান্নায় এই বোনটি আমার অপূর্ব। জেলখানায় এই বিচার কক্ষে এসে প্রথম তার সঙ্গে আমার দেখা। এই বোনটিকে আমার ভীষণ ভাল লাগে।

সমস্ত সাথীদের শুধু একটাই বক্তব্য, 'কেন আমাদেরকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো না।' মেজর জিয়াউদ্দিন বসে আমার উদ্দেশ্যে একটি কবিতা লিখলো। জেলখানার এই ক্ষুদ্র কক্ষে হঠাৎ আওয়াজ উঠল, 'তাহের ভাই-লাল সালাম।' সমস্ত জেলখানা প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। জেলখানার উঁচু দেওয়াল এই ধ্বনীকে কি আটকে রাখতে পারবে? এর প্রতিধ্বনি কি পৌঁছাবে না আমার দেশের মানুষের মনের কোঠায়?

রায় শুনে আমাদের আইনজীবীরা হতবাক হয়ে গেলেন। তারা এসে আমাকে জানালেন, যদিও এই ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না তবুও তারা সুপ্রিম কোর্টে রিট করবেন। কারণ বেআইনিভাবে এই আদালত তার কাজ চালিয়েছে ও রায় দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করবেন বলে বললেন। আমি তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলাম, প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করা চলবে না। এই প্রেসিডেন্টকে আমি প্রেসিডেন্টের আসনে বসিয়েছি, এই বিশ্বাসঘাতকদের কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইতে পারি না।

সবাই আমার কাছ থেকে কয়েকটি কথা শুনতে চাইলো। এর মধ্যে জেল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে সরিয়ে নেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। বললাম, আমি যখন একা থাকি তখন ভয়, লোভ-লালসা আমাকে চারদিক থেকে এসে আক্রমণ করে। আমি যখন আপনাদের মাঝে থাকি তখন সমস্ত ভয়, লোভ-লালসা দূরে চলে যায়। আমি সাহসী হই, বিপ্লবের সাথী রূপে নিজেকে দেখতে পাই। সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করার এক অপরাজেয় শক্তি আমার মধ্যে কাজ করে। তাই আমাদের একাকিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আমরা সবার মাঝে প্রকাশিত হতে চাই। সে জন্যই আমাদের সংগ্রাম।

সবাই একে একে বিদায় নিয়ে যাচ্ছে। অশ্রুসজল চোখ। বেশ কিছুদিন সবাই একত্রে কাটিয়েছি। আবার কবে দেখা হবে। সালেহা আমার সঙ্গে যাবে। ভাইজান ও আনোয়ারকে চিত্তচাঞ্চল্য স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু তাদেরকে তো আমি জানি। আমাকে সাহস জোগাবার জন্য তাদের অভিনয়। বেলালের চোখ ছলছল করছে। কান্নায় ভেঙে পড়তে চায়। জলিল, রব, জিয়া আমাকে দৃঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো। এই আলিঙ্গন অবিচ্ছেদ্য। এমনিভাবে দৃঢ় আলিঙ্গনে আমরা গোটা জাতির সঙ্গে আবদ্ধ। কেউ তা ভাঙতে পারবে না।

সবাই চলে গেলো। আমি আর সালেহা বের হয়ে এলাম। সালেহা চলে যাচ্ছে সেলের দিকে। বিভিন্ন সেলে আবদ্ধ কয়েদি ও রাজবন্দীরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে বন্ধ সেলের দরজা-জানালা দিয়ে। মতিন সাহেব, টিপু বিশ্বাস ও অন্যান্যরা দেখালো আমাকে বিজয় চিহ্ন। এই বিচার বিপ্লবীদেরকে তাদের অগোচরে ঐক্যবদ্ধ করলো।

ফাঁসির আসামিদের নির্ধারিত জায়গা ৮ নম্বর সেলে আমাকে নিয়ে আসা হলো। পাশের তিনটি সেলে আরো তিনজন ফাঁসির আসামি। ছোট্ট সেলটি ভালোই, বেশ পরিষ্কার। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন জীবনের দিকে তাকাই তাতে লজ্জার তো কিছুই নেই। আমার জীবনের নানা ঘটনা আমাকে আমার জাতির ও জনগণের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এর চাইতে বড় সুখ, বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?

নীতু, যীশু ও মিশুর কথা_সবার কথা মনে পড়ে। তাদের জন্য অর্থ-সম্পদ কিছুই আমি রেখে যাইনি। কিন্তু আমার গোটা জাতি রয়েছে তাদের জন্য। আমরা দেখেছি শত-সহস্র উলঙ্গ মায়া-মমতা-ভালোবাসা-বঞ্চিত শিশু। তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় আমরা গড়তে চেয়েছি।
বাঙালি জাতির উদ্ভাসিত নতুন সূর্য ওঠার আর কত দেরি! না, আর দেরি নেই, সূর্য উঠল বলে।

এ দেশ সৃষ্টির জন্য আমি রক্ত দিয়েছি। আর সেই সূর্যের জন্য আমি প্রাণ দেব, যা আমার জনগণকে আলোকিত করবে, উজ্জীবিত করবে_এর চাইতে বড় পুরস্কার আমার জন্য আর কী হতে পারে? আমাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। আমি আমার সমগ্র জাতির মধ্যে প্রকাশিত। আমাকে হত্যা করতে হলে সমগ্র জাতিকে হত্যা করতে হবে। কোন শক্তি তা করতে পারে? কেউ পারবে না।

আজকের পত্রিকা এলো। আমার মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্যদের মেয়াদি কারাদণ্ডের খবর ছাপা হয়েছে প্রথম পাতায়। মামলার যা বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। রাজসাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্রকাশ পেয়েছে, আমার নেতৃত্বেই ৭ নভেম্বর সিপাহি বিপ্লব ঘটে। আমার নির্দেশেই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়, আমার প্রস্তাবেই বর্তমান সরকার গঠিত হয়। সমগ্র মামলায় কাদেরিয়া বাহিনীর কোন উল্লেখই ছিল না। অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান, জুলমত আলী ও অন্যান্য যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা যেন এই মিথ্যা প্রচারের প্রতিবাদ করেন ও সমগ্র মামলাটির সত্য বিবরণ প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ও চক্রান্তকারী জিয়া ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা আমাকে জনগণের সামনে হেয় করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।

সুত্রঃ কালের কন্ঠ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29231366 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29231366 2010-08-28 19:33:25
ছবি ব্লগঃ ব্রিটিশ শাসন আমলে বাংলাদেশ
১৮৭০ সালে তোলা বুড়িগঙ্গা নদীর একাংশ


১৮৭০ সালে তোলা বড় কাটরার দক্ষিন অংশ


১৮৫১ সালে ফেড্রিক ফাইবিশের (Frederick Fiebig ) তোলা পর্যটকদের জন্য নির্মিত বাংলো


১৮৬০ সালে তোলা একদল আফিমখোরের ছবি


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা ঢাকা কলেজ


১৮৭৫ সালে তোলা রেসকোর্স বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে প্রবেশের জন্য নির্মিত রমনা (ঢাকা গেট)


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা দিলকুশার ডানা দিঘি


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা ঢাকেশ্বরি মন্দির


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ গেট


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা চক বাজার


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা মিডফোর্ট হাসপাতাল


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা ইমামবাড়া হোসেনি দালান


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা দোলাই নদীর (ধোলাই খাল) উপর নির্মিত লোহারপুল


১৮৬০ সালে তোলা একজন কুলীন ব্রাহ্মণ


১৮৬০ সালে তোলা লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ অংশ


১৯০৪ সালে ফ্রিটস কাপের (Fritz Kapp ) তোলা নর্থবুক হল


১৮৬০ তোলা আমাদের এক পূর্ব পুরুষ


১৮৬০ তোলা এক বৃদ্ধা


১৮৬০ তোলা এক কৃষাণী বালিকা


১৮৬০ তোলা পুরানা পল্টন


১৮৭২ সালে তোলা সোনারগাঁও এ গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের ধ্বংসপ্রাপ্ত মাজার


১৮৮৫ সালে সামুয়েল ব্রুনের (Samuel Bourne) তোলা আবহমান বাংলার পল্লী গ্রাম


১৮৮৫ সালে সামুয়েল ব্রুনের (Samuel Bourne) তোলা গ্রাম্য বাজার


১৮৬০ তোলা ঢাকার একটি রাস্তা


১৮৬০ সালে তোলা পূর্ব বাংলার মেয়েরা


১৮৮৫ সালে সামুয়েল ব্রুনের (Samuel Bourne) তোলা বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকা
ছবি সুত্রঃ ব্রিটিশ লাইব্রেরি]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29230209 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29230209 2010-08-26 20:12:45
জুয়েল ফিস
Hemichromis bimaculatus

সিসিলিড পরিবারের সবচেয়ে সুন্দর আর সমরপ্রিয় মাছগুলোর একটি জুয়েল ফিস। এদের গায়ের উজ্জ্বল বর্ণিল কারুকাজ যে কাউকে সহজেই মুগ্ধ করে। প্রজননের সময় এদের গায়ের রঙের ঔজ্জ্বল্য আরো বেড়ে যায়। মাছগুলো সাধারনত পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকা্র নদী বিশেষ করে নাইল(Nile), নাইজার(Niger) এবং কঙ্গ(Congo) নদীতে দেখতে পাওয়া যায়। পশ্চিম আফ্রিকায় খাঁড়ি, জলপ্রপাত, লেক, নদী এমনকি সমুদ্র তীরবর্তী লোনা পানির লেগুনেও এদের দেখা মেলে।



জুয়েল ফিসের বৈজ্ঞানিক নাম Hemichromis sp এবং বানিজ্যিক নাম জুয়েল সিসিলিড(Jewel cichlids)। এদের বেশ কয়েকটি প্রজাতি রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য H. bimaculatus, H. angolensis, H. cerasogaster, H. cristatus, H. elongates, H. exsul ইত্যাদী।



জুয়েল ফিস প্রকৃতিতে প্রজাতিভেদে ৮-৩০ সেমি. বা ৩-১২ ইঞ্চি হয়। কিন্তু এ্যাকুরিয়ামে এদের আকৃতি কিছুটা কম হয়। আকৃতিতে H. bimaculatus সাধারনত ২০ সেমি. এবং এ্যাকুরিয়ামে ১৫ সেমি. হয়।



পুরুষ মাছগুলো সাধারনত মেয়ে মাছগুলোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল রঙের হয়। তবে H. cristatus এর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়, মেয়ে মাছগুলো দেখতে পুরুষ মাছের মতই উজ্জ্বল।


H. cristatus
অন্যান্য সিসিলিড মাছের মত জুয়েল ফিসও এদের বাচ্চাদের খুব যত্ন নিয়ে থাকে।মজার ব্যপার হচ্ছে, এই মাছগুলো সারা জীবনের জন্য সাধারনত একজন সঙ্গী বেছে নেয়। মা মাছ সাধারনত সমতল পৃষ্ঠ বিশেষ করে পাতা বা পাথরের উপর ডিম পাড়ে। ডিমগুলোকে মা মাছ ও পুরুষ মাছ উভয়েই পাহারা দেন এবং ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া ও বড় হওয়া পর্যন্ত এই পাহারা চলতে থাকে।



জুয়েল ফিসের শ্রেনীবিন্যাসঃ
Kingdom: Animalia
Phylum: Chordata
Class: Actinopterygii
Order: Perciformes
Family: Cichlidae
Subfamily: Pseudocrenilabrinae
Genus: Hemichromis
তথ্য ও ছবি সুত্রঃ ইন্টারনেট]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29229550 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29229550 2010-08-25 17:26:01
লে. জে. এ এ নিয়াজির একটি দুর্লভ সাক্ষাতকার
(১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারন অনুসন্ধানে গঠিত হামূদুর রহমান কমিশনের আংশিক রিপোর্ট পাকিস্তানে ২০০১ সালে সরকারিভাবে প্রকাশিত হয় (এই সম্পর্কিত আমার পূর্বের পোস্টটি দেখুন) ।এটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধ ও গনহত্যা ও পাকিস্তানের ভাঙনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য জন-সাধারনের চাপ বাড়তে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার, লেফটেনান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে rediff.com এর মালিকানাধীন সর্বাধিক প্রচারিত ইন্দো-আমেরিকান সংবাদপত্র India Abroad এ একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন।এখানে তিনি অনেক স্পর্শকাতর কথাই অকপটে স্বীকার করেন, অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ করেন, আবার তাকে বা তার অধীন ইস্টার্ন কমান্ডের প্রতি তোলা অভিযোগগুলো কৌশলে এড়িয়ে যান।এই সাক্ষাতকারটি পরবর্তীতে তিনি মারা যাওয়ার একদিন পর ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখে rediff.com তাদের আন্তর্জালের পাতায় পুনরায় প্রকাশ করে।বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য নতুনভাবে উদ্যোগ শুরু হওয়ায়, প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে দুর্লভ এই ইংরেজী সাক্ষাতকারটি বাংলায় অনুবাদ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম।)

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে উপুর্যপরি,হতচকিত আক্রমণ ও অগ্রাভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পতন ঘটায় এবং বাংলাদেশকে মুক্ত করে।ভারতের এই অন্যতম ক্ষিপ্রতর ও উজ্জ্বলতম সেনা অভিযান শুধু পাকিস্তানকে ভাঙেনি, পাশাপাশি দেশটিকে উপহার দি্যেছিল এক চিরস্থায়ী লজ্জা।

পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম বাংলাভাষীদের উপর দমন অভিযান শুরু করে যারা অধিকতর স্বায়ত্বশাসন চাইছিল, এর ফলে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধের কারনে সামরিক অভিযানের ভয়ে পূর্ব থেকে পলায়নপর ১০ মিলিয়ন বাঙ্গালি শরণার্থীকে ভারতবর্ষ আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল।পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জম্মু ও পাঞ্জাবে অবস্থিত ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণের নির্দেশ দিলে উত্তেজনা চরমে পৌছায়।এর সমুচিত জবাব দিতে ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন।

১৩ দিন পরে লেফটেনান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্ত্বাধীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্নসমর্পন করে।পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্ব জেনারেল নিয়াজির অধীনে থাকায়, যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য তাকে দায়ী করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অপসারন করা হয়।যুদ্ধ শেষ হলে পাকিস্তানে যে হামূদুর রহমান তদন্ত কমিশন গঠিত হয়, তার আংশিক রিপোর্ট সরকারীভাবে ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে যদিও জেনারেল নিয়াজির কোর্ট-মার্শাল হওয়া উচিত বলে সুপারিশ করা হয়, অবশ্য তাকে কোনো ধরণের বিচারের মুখোমুখি হতে হয় নি।

তিন দশক পরে, অসুস্থ, ৮৬ বছর বয়সী জেনারেল নিয়াজি নিজেকে নির্দোষ প্রমানের জন্য স্বেচ্ছায় কোর্টমার্শালে বিচারের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন।

তৎকালীন ভারতবর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশের মিয়ানওয়ালির নিকট বালো-খেল গ্রামে ১৯১৫ সালে জন্ম নেওয়া জেনারেল নিয়াজি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ২৪টি মেডেল পেয়েছিলেন।তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমান্ডের নেতৃত্ত্বে ছিলনঃ ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরূদ্ধে যুদ্ধে ৫ পাঞ্জাব, পাকিস্তান কর্তৃক কাশ্মির ও সিয়ালকোট দখল অভিযানের সময় ১৪ প্যারা ব্রিগেড।তিনি করাচি ও লাহোরের সামরিক প্রশাসক ছিলেন।

জেনারেল নিয়াজি যিনি গত সোমবার মারা গিয়েছেন , ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে rediff.com এর মালিকানাধীন সর্বাধিক প্রচারিত ইন্দো-আমেরিকান সংবাদপত্র India Abroad এ একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। এই দুর্লভ সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন আমির মির।

হামুদূর কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ হবার পর নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে, রিপোর্টের সুপারিশ যা জন-সাধারণের সমর্থ্ন পাচ্ছে, ১৯৭১ সালের পরাজয়ের জন্য যে সব সামরিক অফিসার দায়ী তাদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

আমি জন-সাধারণের দাবীকে সমর্থন জানিয়ে বলছি, যারা বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর যেসব সদস্য পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কটের জন্য দায়ী, তাদের শাস্তি পাওয়া উচিত।পরাজয়ের পর পাকিস্তানে ফিরে আমি স্বেচ্ছায় কোর্ট-মার্শাল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চেয়েছিলাম।কিন্তু সেসময়ের সেনাবাহিনী প্রধান টিক্কা খান আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।সে প্যান্ডোরার বাক্স খুলতে চায় নি।এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে যুদ্ধ পরিচালনায় জেনারেল হেডকোয়্যাটারের অযোগ্যতা ও রিজার্ভ সেনাবাহিনী্র কমান্ডার হিসেবে টিক্কার ভূমিকা প্রকাশ হয়ে যেত।সত্য বলতে কি, হামুদূর রহমান কমিশনের সামনে আমাদের আত্ন-রক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছিল, কিন্তু কোর্ট-মার্শালের সময় এটা অস্বীকার করা যায় না।

পাকিস্তান আর্মি অ্যাক্ট অনুসারে আপনি আপনার স্বপক্ষে এক জন প্রত্যক্ষদর্শীকে জেরা করতে পারেন, ডাকতে পারেন, বিশেষ করে যখন আপনার চরিত্র ও সম্মান ঝুঁকির মধ্যে থাকে।এই ধরনের সুযোগ জেনারেল হেডকোয়্যাটারের(GHQ) দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে দেয়, তাই আমাদের কখনই কোর্ট-মার্শাল হবে না।যদি কখনও কোর্ট-মার্শাল হয়ও, আমি সহজেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবো।কমিশন আমার এই যুক্তির প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেছে যে, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আমাকে আত্ন-সমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

আপনি বলেছেন, কমিশন আপনার এই যুক্তির প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেছে যে, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আপনাকে আত্ন-সমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু মোশারফের সময়ে প্রকাশিত রিপোর্টে এই পরাজয়ের জন্য আপনিসহ কয়েকজন জেনারেলকে দায়ী করা হয়েছে?

যদি আমি এই বড় বিয়োগান্তক ঘটনার জন্য দায়ী হই, কেন আমার কোর্ট-মার্শাল হল না, যদিও টিক্কা আমাকে ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছিল?সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েই টিক্কা, কাসুরে আমার জন্য বরাদ্দকৃত সীমান্তে দুইটি স্কয়ার(ব্যরাক) বাতিল করে দেয়।১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে এক ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত বিবৃতিতে টিক্কা বলেছিলেন, “আমরা লে. জে. এ এ কে নিয়াজির বিরূদ্ধে এমনকি কোনো সম্ভাব্য উপাদান খুঁজে পাই নি যিনি ভারতীয় কমান্ডার লে. জে. জগোজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্ন-সমর্পন করেছিলেন, কারন তিনি আত্নসমর্পনের জন্য ইয়াহিয়া খানের কাছে থেকে অনুমতি পেয়েছিলেন।কিন্তু আমরা তাকে সেনাবাহিনীতে আর ফিরিয়ে নেই নি এবং সকল স্বাভাবিক সুবিধাদিসহ নির্বাহি আদেশে তাকে অবসর দেওয়া হয়।”
আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ঢাকার পতনের জন্য রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এককভাবে দায়ী এবং আপনি শুধু তার নির্দেশ অনুসরন করেছেন?

না। ইয়াহিয়া খান ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কটের জন্য আরো কয়েকজন জন ব্যক্তিবর্গ সমানভাবে দায়ী ছিল যাদেরকে রিপোর্টে দায়ী করা হয় নি।কমিশন কিছু ব্যক্তি বা ফ্যাক্টর সম্পর্কে প্রকৃত সত্যের জট খুলতে পারে নি, যা পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনকে শক্তি যুগিয়েছে এবং যা জিন্নাহর অখন্ড পাকিস্তানের চূড়ান্ত ভাঙনের কারন।

রিপোর্টটিতে উপসংহার টানা হয়েছে এই বলে, আত্ন-সমর্পনের জন্য কোনো নির্দেশ ছিল না।যদিও আপনার অঙ্কিত (ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হয়ে) “আপনার দৃষ্টিতে নিদারুণ হতাশার বেপরোয়া চিত্রে”, উর্ধতন কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র তখনই আপনাকে আত্নসমর্পন করার অনুমতি দিয়েছিলেন, যদি প্রয়োজন হয়।রিপোর্ট বলছে, আপনি সেই নির্দেশ অমান্য করতে পারতেন, যদি আপনি মনে করতেন আপনি ঢাকাকে রক্ষা করতে পারবেন।
আমি শপথ করে বলতে পারি, ইয়াহিয়ার কাছে থেকে আমাকে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আত্ন-সমর্পনের জন্য, কিন্তু আমি তখনও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম।এমনকি আমি সংবাদও পাঠিয়েছিলাম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই।তথাপি, জেনারেল আব্দুল হামিদ খান এবং এয়ার চীফ মার্শাল রহিম আমাকে টেলিফোন করে নির্দেশ দেন, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ জেনারেল হেড কোয়্যাটার(JHQ) থেকে যে সংকেত(Signal) এসেছে, সেই অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করি, কারন পশ্চিম পাকিস্তান তখন বিপদাপন্ন ছিল।এই সময় আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় অস্ত্র-বিরতিতে রাজী হওয়ার জন্য, যেন সৈন্যদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

কমিশন প্রমান পেয়েছে, আপনার সৈন্যদল পূর্ব পাকিস্তানে লুট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত ছিল, এই ব্যাপারে আপনি কি বলবেন?

পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ড হাতে নেওয়ার পর পরই আমার কাছে সৈন্যদল সম্পর্কে অসংখ্য রিপোর্ট আসতে শুরু করে, এরা বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে অকারনেই লুট, অগ্নিসংযোগ, হত্যায় জড়িত হয়ে পরছে, যা আমার কাছে পরিষ্কারভাবে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম বলে মনে হয়েছে।পরিস্থিতির গভীরতা অনুভব করে, ১৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে চিঠির মাধ্যমে আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করি, যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা উল্লেখ করি।আমি পরিষ্কারভাবে লিখে জানাই, অনেকগুলো ধর্ষনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানিরাও এ কর্মকান্ড থেকে মুক্ত নন।আমি আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাই, অফিসাররাও এই ধরনের ঘৃণ্যকাজে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

তথাপি, বার বার সতর্কবানী ও নির্দেশনা সত্ত্বেও, স্ব স্ব কমান্ডারগন এই বিশৃঙ্খল অবস্থার লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হন। এই প্রবণতা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সৈন্যদলের যুদ্ধ করার দক্ষতাকে হ্রাস করে দেয়।

একজন মিলিটারি কমান্ডার হিসেবে আপনার ব্যর্থতাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই অপমানজনক আত্ন-সমর্পনের দায়-দায়িত্ব আপনি কি নেবেন?

আমাদের ৪৫,০০০ ট্রুপ্(সৈন্যদল) লড়েছিল ভারতের আধা মিলিয়ন ট্রুপ, লাখ লাখ মুক্তি মুক্তিবাহিনী (বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা যারা ভারতের সমর্থনপুষ্ট ছিল) এবং সর্বপরি বৈরী এক বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে।প্রকৃতপক্ষে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাদের প্রায় ৩০০,০০০ ট্রুপের প্র্য়োজন ছিল।তখন আমরা ইতঃপূর্বে মূল ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়েছিলাম, তারপরেও বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

যদি হামূদ মনে করে থাকেন আমরা বন-ভোজনে গিয়েছিলাম, তাঁর আমাদের সাথে যোগ দেওয়া উচিত ছিল।আমি স্পষ্ট বলতে চাই, পূর্ব পাকিস্তানে আমার অধীনস্ত সেনাবাহিনী সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে।প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল এক অদম্য ক্ষমতার লড়াই যা ১৯৭১ সালে এই সঙ্কট তৈরী করেছিল, বিশেষকরে যখন বন্দুকের নল ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

১৯৭১ সালের এই সঙ্কট ছিল ইয়াহিয়া, মুজিব (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা, শেখ মুজিবুর রহমান) এবং ভুট্টোর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জুলফিকার আলী ভুট্টো) মধ্যে চলা অদম্য ক্ষমতার লড়াইয়ের ফল।ইয়াহিয়া চেয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখতে আর ভুট্টো চেয়েছিল ক্ষমতায় বসতে।শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ স্পষ্ট বিজয় অর্জন করেছিল, সরকারের উচিত ছিল তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।ভুট্টোর অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা বাগাড়ম্ভর ছাড়া কিছুই ছিল না, তিনি যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।যদি মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হত, তবে পাকিস্তান অখন্ড থাকত।এটা খুব দুঃখজনক, কমিশন ভুট্টোকে সব ধরনের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

১৯৭১ সালের সঙ্কটের জন্য দায়ী জেনারেলদের জন-সম্মুখে বিচারের জন্য কমিশন সুপারিশ করেছিল।জেনারেল টিক্কা , সাহিবজাদা ইয়াকূব আলী খান(ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক কমান্ডার) এবং রাও ফরমান আলীকে(নিয়াজির উপদেষ্টা) অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তারা কি নিরপরাধ ছিল?

কমিশনের রিপোর্টে এভাবে এই তিন জনকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিতে আমি একমত হতে পারছি না।এটা খুবই আশ্চর্যজনক ব্যপার, পাকিস্তান ভাঙার জন্য টিক্কা, ইয়াকূব এবং ফরমানকে দায়ী করা হয় নি।প্রকৃতপক্ষে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে ইয়াকূবের নিষ্ক্রিয়তাই পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল।ইয়াকূব প্রত্যকটি ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরী করে তাঁর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে পালিয়েছিলেন, অথচ তাঁর এই নীতি বিবর্জিত কাজগুলোকে গোপন করা হয়েছে।জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো উচিত।ইয়াহিয়া তাঁর পদ-মর্যাদা অবনমন করেছিলেন।পরবর্তীতে ভুট্টো তার পদ-মর্যাদা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত করেন।সেনাবাহিনীর দায়িত্ব থেকে পলায়নের জন্য কী বড় পুরস্কার!
হামূদুর কমিশন তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন, এভাবেই যারা শ্ত্রুর সাথে লড়াই করার পরিবর্তে পালিয়েছিল, পদত্যাগ করেছিল, যাদের কারনে পরিস্থিতি আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল, তাদেরকেই পুরস্কিত করা হয়।একইভাবে, এই রিপোর্টে টিক্কার নাম উল্লেখ করা হয় নি, যদিও ২৫ মার্চে তাঁর বর্বরচিত ভুমিকার জন্য তাঁকে কসাই নামে ডাকা হত।কমিশন তাঁর হায়েনার মত বর্বরচিত অপরাধগুলোকে এড়িয়ে গেছে।

রাও ফরমান আলীও দায়ী, তিনি ঢাকা অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন।
ভুট্টো সরকার হামূদুর রিপোর্টকে কেন জন-সম্মুখে প্রকাশ করে নি?

ভুট্টো রিপোর্টটি প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছিলেন, কারন পাকিস্তান ভাঙার জন্য তিনিও সমানভাবে দায়ী ছিলেন।ভুট্টোর সমর্থনপুষ্ট সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি এই রিপোর্টটি পরীক্ষা নিরিক্ষা করে দেখে রিপোর্টটিকে জন-সম্মুখে প্রকাশ না করতে সুপারিশ করেছিলেন।পরবর্তীতে ভুট্টো ক্ষমতার অপ-ব্যবহার করে এটিকে ইচ্ছেমত পরিবর্তন করে ৩৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টে পরিনত করেন।

আপনি জোর দিয়ে বলছেন হামূদুর রিপোর্ট ত্রুটিপূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভুট্টো কর্তৃক প্রভাবান্বিত।অপর দিকে, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তাঁরা কেউই ঢাকা সঙ্কটের জন্য দায়ী জেনারেলদের কোর্ট-মার্শাল চান বলে মন হয় না।এই ক্ষেত্রে, আপনি কি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য দৃঢ় কোনো প্রস্তাবনা দিতে পারেন?
১৯৭১ সালের সঙ্কটের প্রকৃত কারন খুঁজে বের করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে, এজন্য অধিক ক্ষমতাসম্পূর্ণ একটি নতুন কমিশনের নিয়োগ প্রদান করা প্রয়োজন।এই তদন্তটি সেনাবাহিনী প্রধানের সভাপতিত্বে হওয়া উচিত। দুটি সিন্ডিকেট এক সাথে কাজ করবে।

এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা তদন্ত কাজ হবে, এতে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য বের হয়ে আসবে। একটি সামরিক তদন্ত হওয়া উচিত প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করার জন্য, কিভাবে এবং কেন একটি ছোট, ক্লান্ত ও দুর্বলভাবে সজ্জিত ইস্টার্ন গ্যারিসনকে (ইস্টার্ন কমান্ড) তাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়েছিল সব ধরনের প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে এবং পশ্চিম গ্যারিসন যারা পর্যাপ্ত সৈন্য ও রসদ নিয়েও কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারল না, যার কারনে যুদ্ধে পরাজীত হতে হয়েছিল এবং মাত্র দশ দিনেরও কম সময়ে দেশের ৫৫,০০০ বর্গমাইল ভূমি হারাতে হয়েছিল।

১৯৭৪ সালে ভারতীয় বন্দীদশা থেকে পাকিস্তানে ফেরার পর, পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কট বিষয়ে যখন আমি রিপোর্ট প্রস্তুত করছিলাম, জেনারেল হেড কোয়্যাটার(GHQ) এর সূত্র থেকে স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম পূর্ব কমান্ডকে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল; এবং এর সিনিয়র কমান্ডারদের পূর্ব পাকিস্তান হারানোর জন্য দায়ী করে বলীর পাঁঠা বানানো হয়েছিল।আমার প্রাথমিক সন্দেহ কয়েক বছরের মধ্যেই দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিনত হয়, আমি এই অধ্যায়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি, বহু লোকের সাথে আলোচনা করেছি যারা জানতো কিভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে জেনারেল হেড কোয়্যাটার(GHQ), হাই কমান্ডের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পূর্ব কমান্ডের সাথে প্রতারনা করেছিল, কুট-কৌশলের আশ্রয় নিয়ে পূর্ব কমান্ডকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল।

প্রকৃতপক্ষে এটা এতই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভারতীয় মেজর জেনারেল শাহ বেগ সিং আমাকে বলেছিলেন, “আপনার আশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে, স্যার।তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই অধ্যায়ের জন্য আপনি ও আপনার কমান্ডকে দায়ী করা হবে।” এর ফলে আমি নিশ্চিত হলাম, পূর্ব পাকিস্তানের ভাঙন ছিল স্পষ্টতই একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ।

পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কট ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরী করা হয়েছিল, এই যুক্তির স্বপক্ষে আপনি কোনো প্রমাণ দিতে পারবেন?
মুজিবের ১৯৭০ সালের বিজয়কে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তিক্তভাবে নিয়েছিল, কারন এর ফলে ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হত এবং ভুট্টোকে অপজিশন বেঞ্চে বসতে হত, যা ছিল তাদের উচ্চাকাঙ্খার পরিপন্থী।তাই এই দুইজন একত্রে ভুট্টোর নিজের শহর লারকানায় বসে একটি পরিকল্পনা আঁটে, যা পরবর্তীতে লারকানা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিতি পেয়েছিল।ন্যাশনাল অ্যাসেম্বেলির অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা, আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে কূটনৈতিকভাবে রুদ্ধ করা, ভীতি-প্রদর্শন করা, চক্রান্ত ও সেনাবাহিনীর ব্যবহার করা ছিল এই পরিকল্পনার অংশ।

এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছিল ‘এম এম আহমেদ প্ল্যান’, ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল রাখা ও ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী করা ছিল যার লক্ষ্য, এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানকে কোনো উত্তরসূরি সরকার ছাড়াই ত্যাগ করা।অ্যাসেম্বেলি অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা পর (যা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল) এটা বয়কট করার জন্য রাজনীতিবিদদের উপর চাপ ছিল।এর কারন দেখানো হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে, তাই এটি বাতিল করা উচিত।

শেষ পর্যন্ত, চক্রান্তকারী এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পেরেছিল।

আপনি কি মনে করেন না, এখন সময় এসেছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার মত-পার্থক্যগুলো দূর করা এবং জন-সাধারনের মঙ্গলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সংলাপের আয়োজন করা?

আমাদের কখনই ভারতকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।একটি শক্তিশালী পাকিস্তানের ধারনা কোনো ভারতীয় সরকার কখনই মেনে নিতে পারে নি এবং তারা সব সময় আমাদের দেশটাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।পূর্ববর্তী নজির থেকে দেখা যায়, ভারত সব সময়ই পাকিস্তানের ক্ষতি করেছে।ভবিষ্যত্বে যদি তারা আবার কখনও সুযোগ পায়, পাকিস্তানের ক্ষতি করা থেকে কখনই নিবৃত হবে না।এমনকি বর্তমানে ভারত কাশ্মিরে হাজার হাজার ট্রুপ রেখেছে, জঙ্গী দমনের নামে নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করছে।

এমনকি পাকিস্তান কোনোভাবেই ভারতের সাথে শান্তিপূর্ন সংলাপে বসতে পারে না, যদি না ভারত লিখিতভাবে এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে, কাশ্মির বিরোধটি তারা “জাতিসংঘ রেজুলেশন” এর মাধ্যমে সমাধান করবে।

যদি সুযোগ আসে, কাশ্মির বিরোধের শান্তিপূর্ন সমাধানের জন্য নেওয়া বর্তমান এই কূটনৈতিক উদ্যোগে আপনি কি কোনো ভূমিকা রাখবেন?

না। আমি কখনই ভারতের সাথে এটা চাইবো না।আমি এখন খুবই বৃদ্ধ, যুদ্ধ করার মত অবস্থা নেই, তবুও জম্মু ও কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ড দিতে এখনো প্রস্তুত আছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29227085 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29227085 2010-08-21 17:10:09
গল্পঃ রূপার কাঁকন - ও ময়না! মেল টেরেন জাতিছে না কি রে! কিসের শব্দ হতিছে ভাল কইরে শুইনে দ্যাকদিনি!

চুলোতে শুকনো পাতা গুজে দিতে দিতে বলে চলে মমতা। লিচু গাছটার ছায়ায় বসে একমনে পুতুল খেলছে তাঁর চার বয়সী মেয়ে ময়না।
- দেকতি দেকতি কেমন কইরে দুটো বেঁইজে গেইল। কালের দিনে বেলা মেলা তাড়াতাড়ি ছুইটে যায়।

ময়না মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁকায়।
-মা! আমারে কি ডাকিছেন?
-হ। তর কি বেশি খিদা লাগিছে? একনও তো ভাত ফুটে নাইরে মা!

ময়না আবার পুতুল খেলায় মনোযোগ দিয়েছে। রতন কাল মেলা থেকে নতুন পুতুল কিনে এনেছে বোনের জন্য। বোনটাকে খুব ভালোবাসে সে। কাল ছিল মেলার শেষদিন।গত ছয়দিন ধরে একটানা দোকানটায় গিয়েছে পুতুলটা কেউ কিনে নিল কিনা দেখার জন্য।পুতুলটার দাম দশ টাকা। ও মাত্র ক্লাস ফোরে পড়ে।এত টাকা কোথায় পাবে সে। তিন চারদিন টাকার জন্য বাবার কাছে ধরনা দিয়েছে।তার কাছেও টাকা নেই।অভাবের সংসার, দুই বেলা দু’মুঠো ভাতের চাল যোগার করাই যেখানে বড় দায়!ভিটে-বাড়ি বন্ধক রেখে হরিপদ মহাজনের কাছে থেকে যে টাকা এনেছিল, সবই তো গেছে সার, বীজ আর কীটনাশক কিনতে। এখন সেচের জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে, তা চিন্তা করেই কূল কিনারা পাচ্ছে না।

মাকে খুব ভয় পায় রতন। মায়ের কাছে টাকা চাইতে সাহস পায় নি সে।টাকা চাইলেই পিঠে জুটতো দুইটার কুঞ্চির বাড়ি।মমতা ঘরে ষোলটা ডিম রেখেছিল মুরগীর বাচ্চা ফুটানোর জন্য।সেখান থেকে তিনটা চুরি করে বেচে দিয়ে কাল পুতুলটা কিনে এনেছে রতন।চুপি চুপি ময়নাকে ডেকে পুতুলটা দিয়ে সারাদিন এদিক ওদিক পালিয়েছিল।আহা বেচারা!রাতে ফিরতে হয়েছে নিতান্ত বাধ্য হয়েই।এতটুকু মানুষ, আর কোথায় যাবে রাতের বেলায়। পিঠে কুঞ্চির বাড়ি খাওয়ার নিয়তি তাই মেনে নিতে হয়েছে। তবুও তো ছোট্ট মানুষটার মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটবে।বড়দের অনেক কিছুই রতন বুঝে না।কাল মা তাকে মারে নি, এমনকি কিছুই বলেনি, ব্যপারটা রতনের কাছে খুব আশ্চর্য ঠেকেছে।

-ময়না, মাঁচালির পাড় ছোট একটা হাড়ি দেকপি।ওয়ের মদ্দি চাল ভাজা রাখিছি।তুই খানিক খা, আর খানিক রতনের জন্যি রাইখে দিস।
-মা, ভাইজানের ইশকুল ছুটি হবেনে ককন?ভাইজান আলি পরে খাবানে?
-রতনের ইশকুল তো মেলা আগেই ছুটি হয়েছে। দেক কনে খেলতিছে?
-মা!তালি পরে কি আমি দেইকে আসপো? ভাইজানকে ডাইকে নিইয়ে আসপো?
মমতা মৃদু হাসে।যেমন ভাই, তেমন তার বোন!
-যা দেকগে! ছাওয়ালটা কনে কনে যে যায়! তুই কিন্তু আবার খুঁজপের জন্যি বেশি দূর যাবি না কতিছি।

২.
বাহির বাড়ি এসেই রতনকে খুঁজে পায় ময়না।উকি ঝুকি মেরে রান্না ঘরের দিকে তাকিয়ে মায়ের মন বুঝার চেষ্টা করছিল রতন। সারা গায়ে কাদা মাখামাখি, দেখে মনে হচ্ছে কাদার সাথে বড় একটা যুদ্ধ করে এসেছে।একবার ভাবছে বাড়ির ভিতরে ঢুকবে, কুঞ্চির বাড়ির ভয়ে আবার পিছিয়ে আসছে।ময়না অবশ্য ভাইকে এভাবে দেখে অভ্যস্ত।

-ভাইজান, আপনে একানে দাঁড়ায়ে রইছেন, মা খাতি ডাকতিছে আপনেরে।
হঠাৎ ভাইয়ের দিকে তাঁকিয়ে খুশিতে আত্নহারা হয়ে ময়না বলে,
-ও আল্লা! এত বড় কাতলা মাছ কনে পাইছেন ভাইজান?
বোনের খুশি দেখে রতনের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে।মৃদু হেসে বলে,
-তুই বড় মাছ খাতি চাইছিলি না ওদিন? তাই ধইরে নিইয়ে আলাম।
-কনে থেকে ধরিছেন?
ময়নার বিস্ময় যেন কাটতে চায় না।
-তুই মাছটা নিইয়ে ভিতরে চইলে যা একন। পরে সব কবানে।
-আপনে একন যাবেননানে?
-হু, মা কি মারতি পারে?
-কতি পারি না, মারলিও মারতি পারে।
-তুই তালি পরে আগে যা, আমি আসতিছি।

রতনকে দেখেই মমতা রান্না ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
-আয়িছিস! আয় আইজকে। আয়নার দিকে একবার তাকিয়ে দেকদিনি চেহারার কি ছিড়ি করিছিস?

রতন ভয় পেয়ে একটু পিছিয়ে যায়।তার গলা শুকিয়ে আসছে।আজ মনে হয় আর রক্ষা নাই।পালিয়ে যাবে কি না দ্রুত ভাবল রতন।মন কিছুতেই সায় দিল।রাতে তো ফিরতেই হবে, এখন যা শাস্তি হবার হয়ে যাক। তা না হলে রাতে দ্বিগুন শাস্তি পেতে হবে।
-কি রে পিছোয়ে যাচ্ছিস কি জন্যি? কাইলকে যে কান্ড ঘটাইয়েছিস, কিছু কলাম না দেইকে ভাবিছিস আইজকেও কিছু কবনানে?

রতন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।আশু শাস্তি বরণের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কি করার আছে তার?
-কি রে কথা কতিছিস না কি জন্যি? আর কত জ্বালাবী আমারে?কোতা থেইকে মাছ চুরি কইরে আনিছিস? যা তাড়াতাড়ি ফিরোয়ে দিয়ে আয়।

রত্ন মৃদুভাবে মায়ের কথার উত্তর দেবার চেষ্টা করে।
-মাছ চুরি কইরে আনি নাই মা। আমারে দেছে।
-কে তোরে মাছ দিল ক’দেকেনি?
-চৌধুরী সাবের পুকুরে পানি সেইচে জাইলেরা মাছ ধরতিছিল,তাগের সাথে গ্রামের মানুষরাও মাছ ধরিছে।আমিও কয়টা ধইরে দিছি।চৌধুরী সাবের বিবি খুশি হইয়ে আমারে এইটা দেছে।
-তুই মাছ ধরতে গেইলি কেন? সাপে কাটলে কী করতি?
-ময়না ওইদিন বড় মাছ খাতি চাইছিল। ওর কথা মনে পড়তিই নাইমে পড়িছি মাছ ধরতি।

ছেলের কথা শুনে মমতা হতভম্ব হয়ে যায়।অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
-তোর বই খাতা কনে রাখিছিস?
-মামুনের কাছে রাখিছি। বৈকাল বেলা যাইয়ে নিইয়ে আসপানে।
-ঠিক আছে।একনি কল পাড়ে যা।আমি বাসনা সাবান নিইয়ে আসতিছি।

রতন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এ যাত্রায় মনে হয় বেঁচে গেল সে।

মমতা নিজ হাতে সাবান ঘসে ঘসে ছেলেকে গোছল করায়।
-বাপজান! ইশকুলে আজ পড়া পারিছিস?
-পারিছি মা। অমল ছাড় কঠিন দেকে তিনটা অঙ্ক দিছিল। কেউ পারে নাই। আমি পারিছি দেকে ছাড় খুব খুশি হয়েছে।
-কী কল তোর ছাড়?
-ছাড় আমারে কাছে ডাইকে নিইয়ে অনেক আদর কইরে দেছে।আমার খুব ভালো লাগিছে মা।

মমতা ছেলের কথা শুনে মৃদু হাসে।
-বাপজান! মন দিইয়ে লেকাপড়া করবি।তালি পড়ে সপ সময় ছাড়গের দুয়া পাবি।
-ছাড় কল, আমি বড় হলি পরে নাকি ডাকা ইনভার্সিটি চানেস পাব।মা,ডাকা ইনভার্সিটি কি অনেক বড় ইশকুল?
-কী জানি বাপ, কতি পারি না, হবার পারে।
-মা! চৌধুরী সাবের বিবির দুই হাত ভরা সোনার চুড়ি।আমি বড় হলি পরে আপনের জন্যি সোনার চুড়ি কিনে আনবো।
রতন মায়ের দুই হাতের রূপার চুড়ি দুইটিতে হাত বুলায়।ছেলের পাগলামী দেখে মমতা হাসে।
-মা, রূপার চুড়ি হলি পরে কি হবি, আপনের হাত চৌধুরী সাবের বিবির চাতিও অনেক বেশি সুন্দর।

মমতার চোখে পানি চলে আসে।
-বাপ আমার! বাঁইচে থাক তুই।

৩.
বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই রতনের জ্বর চলে আসে।মমতা বিকেল থেকেই মাথায় পানি ঢালছে, গা মুছিয়ে দিচ্ছে, মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে।তবুও্ জ্বর কমার কোনো লক্ষণ নেই।পাল্লা দিয়ে জ্বর বেড়েই চলছে।

ঘরে একটা কানা-কড়িও নেই।এবাড়ি-ওবাড়ি করেও একটা পয়সা যোগার করতে পারে নি রতনের বাবা।ওদিকে ছেলেটা জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকে বকে ঘুমিয়ে পড়েছে।মমতা ছেলেকে বুকের কাছে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাদছে।ময়না ভাইয়ের পা বারে বারে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে।বাহির বাড়ির বেঞ্চিতে রতনের বাবা মন মরা হয়ে বসে আছে।নিজের চোখের সামনে ছেলেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, জ্বরে কাতরাচ্ছে, অথচ সে কিছুই করতে পারছে না।বুকটা ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠছে কষ্টে।

মমতা রতনের বাবার পিছনে এসে দাঁড়ায়।স্বামীর পিঠে হাত রাখে।রতনের বাবা ফুঁপিয়ে কেদে ওঠে।
মমতা হাতের চুড়ি দুইটা খুলে দিয়ে রতনের বাবার সামনে ধরে আকুতি জানিয়ে বলে,
আপনে আমার ছাওয়ালরে বাঁচান।চুড়ি দুইটা বেইচে তাড়াতাড়ি ডাক্তর নিইয়ে আসেন।

রতনের বাবা ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে থাকে মমতার দিকে।
-আপনে কথা কতিছেন না ক্যান? তাড়াতাড়ি যান, আমার ছাওয়ালরে বাঁচান। ওর কষ্ট আমি আর সইয্য করতি পারতিছি না।
-বউ, আমারে তুমি এই চুড়ি নিইয়ে যাতি কইয়ো না।এই চুড়ি আমাগের বংশের পেতিক।
-দোহাই আপনের, আপনি একনি যান। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মমতা।
-আমার রতনরে বাঁচান।

এশার আযানের সময় রতনের ঘুম ভাঙে।অনেক কষ্টে চোখ খুলে মাকে ডাকে,
-মা, আমার খুব পানির তিয়াস পাতিছে। একটু পানি দিবেন?
দাঁড়া বাজান, আমি পানি দিতেছি।
মমতা রতনকে আধ-শোয়া করে পানি খাওয়ায়।
-মা, বাপজান কনে গেছে?
-তোর জন্যি ডাক্তর আনতি গেছে।
-মাছটা কি রান্না করিছেন?
-হ বাপ! তোর কি খিদা লাগিছে?ভাত নিইয়ে আসপো?
-বাপজান আসলি একসাথে খাবানে? মা! মাথাখান কিন্তু ময়নারে দিবেন।

মমতা অনেক কষ্টে হাসে।
-ঠিক আছে বাপজান।
মা! আপনের হাতখান একটু দেন, ধরতি ইচ্ছে করতিছে।

মমতা ছেলের দিকে হাতদুটি বাড়িয়ে ধরে।
-মা, আপনের চুড়ি কনে?
-খুইলে রাখিছি বাপ! মমতার চোখে জল চলে আসে।
-ভাইজান! বাপজান মার চুড়ি বেচতি নিইয়ে গেছে।বাপজানের কাছে আপনের ওষুদ কিনার টাকা ছিল না।
-ময়না তুই চুপ কইরবি।
মমতা ফুঁপিয়ে কাঁদে।ময়নাকে কে বুঝাবে, ওরা যে তার কাছে দুই দুইটা হিরার চুড়ি।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29163789 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29163789 2010-05-27 17:34:27
একাত্তরে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধঃ হামূদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট
কমিশন তিনশ প্রত্যক্ষদর্শীর স্বাক্ষ্য ও যুদ্ধের সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কর্তৃক আদান-প্রদানকৃত গোপনীয় তথ্যগুলো পরিক্ষা করে দেখেন। কমিশন সর্ব বিস্তৃত স্বেচ্ছাচারীতা, জেনেরেলদের ক্ষমতার অপ-ব্যবহার, বেসামরিক নেতৃত্বের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা ও সামরিক শাসকদের নেতৃত্বকেই পাকিস্তান ভাঙার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই রিপোর্টে যুদ্ধাপরাধের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে শিউরে উঠতে হয়। স্বভাবতই তিনি অনেক তথ্য চেপে গিয়েছেন; তারপরও একজন পাকিস্তানী নাগরিকের চোখে যে তথ্যগুলো উঠে এসেছে, বাস্তব অবস্থা আরো কত ভয়ঙ্কর ছিলো তা সহজেই অনুমেয়।

কমিশন যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করেছেন তার সারমর্ম এমনঃ
১. বেসামরিক নাগরিক ও বাঙালি সৈন্যসহ হাজার হাজার বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়।
২. সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়েই চলে ধর্ষন, লুট, ব্যাংক ডাকাতির মহা-উৎসব।
৩. পাকিস্তানি সৈন্য ও জেনারেলদের মাতলামী; এমনও দেখা গেছে ভারতীয় বোমারু বিমান বোমা বর্ষণ করছে, অথচ পাকিস্তানি অফিসাররা বন্দী নারীদের সাথে পাশবিকতার লালসায় ও অত্যাচারের উদ্দেশ্যে সেনা ক্যাম্পের টর্চার সেলে প্রবেশ করছে।
এই কমিশন পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের সহায়ক বাহিনীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের জন্য কোর্ট-মার্শাল করার সুপারিশ করে ছিল।কিন্তু সেনা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানি সরকারগুলো এই রিপোর্টকে শুধু অবজ্ঞায় করে নি, বরং বিভিন্নভাবে এটাকে গোপন রাখার চেষ্টা করেছে।


কমিশনের প্রধাণ বিচারপতি হামূদুর রহমান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টর কাছে চূড়ান্ত রিপোর্টটি হস্তান্তর করেন।

কমিশন পাকিস্তানের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক ও নৈতিক পরাজয়ের স্বরূপ উদঘাটন চূড়ান্ত রিপোর্টটি ১৯৭৪ সালের ২৩ অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টর কাছে হস্তান্তর করেন। পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের নির্মম এই স্বাক্ষ্যকে দশকের পর দশক গোপনীয় দলিল (classified) হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে।পাকিস্তান সরকার জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে রক্ষিত অনুলিপিটি ছাড়া হামূদুর রহমান কমশনের চূড়ান্ত রিপোর্টের সকল অনুলিপি ধংষ করে ফেলে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ভারতীয় সংবাদপত্রে এই রিপোর্ট হুবুহু প্রকাশ হয়ে পড়লে, বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামছদের নিষ্ঠুরতাকে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও দানা বেধে উঠতে থাকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের সোচ্চার দাবী ও বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহবান।

কমিশনের রিপোর্টির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছিঃ
“The excesses committed by the Pakistani Army fall into the following categories:- a) Excessive use of force and fire power in Dacca during the night of the 25th and 26th of March 1971 when the military operation was launched. b) Senseless and wanton arson and killings in the countryside during the course of the “sweeping operations” following the military action. c) Killing of intellectuals and professionals like doctors, engineers, etc and burying them in mass graves not only during early phases of the military action but also during the critical days of the war in December 1971. d) Killing of Bengali Officers and men of the units of the East Bengal Regiment, East Pakistan Rifles and the East Pakistan Police Force in the process of disarming them, or on pretence of quelling their rebellion. e) Killing of East Pakistani civilian officers, businessmen and industrialists, or their mysterious disappearance from their homes by or at the instance of Army Officers performing Martial Law duties. f) Raping of a large number of East Pakistani women by the officers and men of the Pakistan army as a deliberate act of revenge, retaliation and torture. g) Deliberate killing of members of the Hindu minority.”

যার সরল বাংলা অর্থ এমন দাঁড়ায়ঃ
পাকিস্তান আর্মির যুদ্ধাপরাধকে নিম্মোক্তভাবে শ্রেণীকরণ করা যায়ঃ
ক) ২৫ ও ২৬ মার্চ রাত্রে ঢাকায় যখন সেনা অভিযান চলছিল, পাকিস্তান সৈন্য বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি অ গোলা বারুদ ব্যবহার করে।
খ) সেনা-বাহিনী কর্তৃক সারাদেশে “sweeping operations” এর নামে অবিবেচনাপ্রসুত ও নিষ্ঠুর গন-হত্যা চলে।
গ) যুদ্ধের শুরুর দিকে ও ডিসেম্বরর ক্রান্তিকালীণ সময়গুলোতে দিকে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ পেশাজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে গণ-কবর দেওয়া হয়।
ঘ) বাঙালি অফিসার বিশেষ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও ইস্ট পাকিস্তান পুলিশের বাঙলি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার নামে ও বিদ্রোহের মিথ্যা ও কপট অভিযোগে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
ঙ) পাকিস্তানি অফিসাররা মার্শাল ল ডিউটি পালন করার সময় নির্বিচারে বেসামরিক বাঙালি অফিসার, ব্যবসাহী, শিল্পপতিদের হত্যা করে, ঘর-বাড়িগুলোতে লুট, অগ্নি-সংযোগ করে।
চ) প্রতিশোধ, আক্রোশ ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিরাট অংশের নারী গোষ্ঠীকে পাকিস্তানি অফিসার ও তাদের দোসরেরা ধর্ষণ করে।
ছ) সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

পুরো রিপোর্টির লিংক দেওয়া হলঃ
১।Introduction
২।Cabinet note
৩।Press release
৪।Chapter 1
৫।Chapter 2
৬।Chapter 3
৭।Chapter 4
৮।Chapter 5
৯।Annexure ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29151859 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29151859 2010-05-09 16:18:24
শত বর্ষে গীতাঞ্জলি
অনেকটা নিরবেই শতায়ু হতে চলেছে কবিগুরুর অমর এই সৃষ্টি।গীতাঞ্জলিকে ঘিরে বাংলা সাহিত্যে যতটা উচ্ছাস, আলোচনা ও গবেষনা হয়েছে ও হচ্ছে, অন্য কোনো গ্রন্থ নিয়ে এতটা আর হয় নি।শত বর্ষ পরেও গীতাঞ্জলির প্রতিটি গান/কবিতা একই রকম আবেদন সৃষ্টি করে।এক অদৃশ্য টানে পাঠককে মোহিত করে!এই অদৃশ্য টানের মূল সুর ঈশ্বর প্রেম, ঈশ্বরস্বত্তায় নিজেকে বিলীন করা, ঈশ্বরের মাঝে নিজেকে নিঃশর্ত আত্নসমর্পন!গীতাঞ্জলির মূল সুর ইশ্বরমুখিতা হলেও তা কোনো সম্প্রদায়-বিশেষের নয়।বিশ্বের বিশালতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে উৎসারিত এক আধ্যাত্নবোধের সঙ্গে এই বিশ্বাসযুক্ত।

গীতাঞ্জলি কবিগুরুর ১৫৭টি গান/কবিতার সংকলন।গানগুলি রচিত হয় ১৯০৮-০৯ সালে এবং শান্তিনিকেতন থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় আগস্ট,১৯১০ (ভাদ্র,১৩১৭ বঙ্গাব্দ) খৃস্টাব্দে।এই গ্রন্থের প্রথম দিকের কয়েকটি গান গীতবিতান, স্বরবিতান, ব্রহ্মসঙ্গীত, পূজা, পূজা-আনন্দ, পূজা-বিরহ, প্রকৃতি, শেফালি, কেতকী, গীতলিপি প্রভৃতি গ্রন্থে প্রকাশিত হয় এবং কিছু সময় পরে কবিগুরু যে গানগুলো রচনা করেন তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের ঐক্য থাকায় সবগুলো গানকে তিনি গীতাঞ্জলিতে সংকলিত করেন।গীতাঞ্জলির ভূমিকায় কবিগুরু নিজেই লিখেছেন,

“বিজ্ঞাপন
এই গ্রন্থের প্রথমে কয়েকটি গান পূর্বে অন্য দুই-একটি পুস্তকে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে যে-সমস্ত গান পরে পরে রচিত হইয়াছে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভাবের ঐক্য থাকা সম্বভপর মনে করিয়া তাহাদের সকলগুলিই এই পুস্তকে একত্রে বাহির করা হইল।
শান্তিনিকেতন
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বোলপুর
৩১ শ্রাবণ ১৩১৭”

গীতাঞ্জলির গানগুলো মূলত কবিতা।এগুলো সহজ ভাষায়, সাবলীল ছন্দে লিখিত।ভাবধারার দিক থেকে কবিতাগুলোকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
যেমন, প্রার্থনাঃ

বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা ,
বিপদে আমি না যেন করি ভয় ।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
নাই-বা দিলে সান্ত্বনা ,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয় ।
সহায় মোর না যদি জুটে
নিজের বল না যেন টুটে ,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয় ।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা ,
তরিতে পারি শকতি যেন রয় । (৪ নম্বর গান)

অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে ।
নির্মল করো উজ্জ্বল করো ,
সুন্দর করো হে ।
জাগ্রত করো , উদ্যত করো ,
নির্ভয় করো হে ।
মঙ্গল করো , নিরলস নিঃসংশয় করো হে ।
অন্তর মম বিকশিত করো ,
অন্তরতর হে । (৫ নম্বর গান)

তোমার দয়া যদি
চাহিতে নাও জানি
তবুও দয়া করে
চরণে নিয়ো টানি ।
আমি যা গড়ে তুলে
আরামে থাকি ভুলে
সুখের উপাসনা
করি গো ফলে ফুলে —
সে ধুলা-খেলাঘরে
রেখো না ঘৃণাভরে ,
জাগায়ো দয়া করে
বহ্নি-শেল হানি । (১৪৬ নম্বর গান)

ঈশ্বরকে না পাবার বেদনাঃ

বিশ্বে তোমার লুকোচুরি ,
দেশ-বিদেশে কতই ঘুরি ,
এবার বলো , আমার মনের কোণে
দেবে ধরা , ছলবে না ।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না । (২৩ নম্বর গান)


যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু ,
এবার এ জীবনে
তবে তোমায় আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে ।
যেন ভুলে না যাই , বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে । (২৪ নম্বর গান)


হেরি অহরহ তোমারি বিরহ
ভুবনে ভুবনে রাজে হে ।
কত রূপ ধ'রে কাননে ভূধরে
আকাশে সাগরে সাজে হে ।
সারা নিশি ধরি তারায় তারায়
অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায় ,
পল্লবদলে শ্রাবণধারায়
তোমারি বিরহ বাজে হে । (২৫ নম্বর গান)


বিশ্ব যখন নিদ্রামগন ,
গগন অন্ধকার ;
কে দেয় আমার বীণার তারে
এমন ঝংকার ।
নয়নে ঘুম নিল কেড়ে ,
উঠে বসি শয়ন ছেড়ে ,
মেলে আঁখি চেয়ে থাকি
পাই নে দেখা তার । (৬০ নম্বর গান)


সে যে পাশে এসে বসেছিল
তবু জাগি নি ।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল
হতভাগিনী ।
এসেছিল নীরব রাতে
বীণাখানি ছিল হাতে ,
স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল
গভীর রাগিণী । (৬১ নম্বর গান)


নিজের অহংকার ত্যাগ ও হৃদয় নির্মল করে সহনশীলতা প্রদর্শনঃ

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধুলার তলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে ।
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলি করি অপমান ,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে । (১ নম্বর গান)


নামাও নামাও আমায় তোমার
চরণতলে ,
গলাও হে মন , ভাসাও জীবন
নয়নজলে ।

একা আমি অহংকারের
উচ্চ অচলে ,
পাষাণ-আসন ধুলায় লুটাও ,
ভাঙো সবলে ।
নামাও নামাও আমায় তোমার
চরণতলে । (৫৩ নম্বর গান)

তোমার সাথে নিত্য বিরোধ
আর সহে না —
দিনে দিনে উঠছে জমে
কতই দেনা ।

সবাই তোমায় সভার বেশে
প্রণাম করে গেল এসে ,
মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই
মান রহে না (১৫০ নম্বর গান)

ঈশ্বরের ক্ষণদর্শনানুভূতিঃ
প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে ;
দেখা নাই পাই ,
পথ চাই ,
সেও মনে ভালো লাগে ।

ধুলাতে বসিয়া দ্বারে
ভিখারি হৃদয় হা রে
তোমারি করুণা মাগে ।
কৃপা নাই পাই ,
শুধু চাই ,
সেও মনে ভালো লাগে । (২৮ নম্বর গান)

নিভৃত প্রাণের দেবতা
যেখানে জাগেন একা ,
ভক্ত , সেথায় খোলো দ্বার ,
আজ লব তাঁর দেখা ।
সারাদিন শুধু বাহিরে
ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে ,
সন্ধ্যাবেলার আরতি
হয় নি আমার শেখা । (৫০ নম্বর গান)

তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ , লহো ।
এবার তুমি ফিরো না হে —
হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো ।
যে দিন গেছে তোমা বিনা
তারে আর ফিরে চাহি না ,
যাক সে ধুলাতে ।
এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে
যেন জাগি অহরহ । (৫৭ নম্বর গান)

দীন-হীন-পতিতের মাঝে ঈশ্বরকল্পনাঃ
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে
হবে গো এইবার —
আমার এই মলিন অহংকার ।
দিনের কাজে ধুলা লাগি
অনেক দাগে হল দাগি ,
এমনি তপ্ত হয়ে আছে
সহ্য করা ভার ।
আমার এই মলিন অহংকার । (৪১ নম্বর গান)

যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে , সবার নীচে ,
সব-হারাদের মাঝে ।
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি ,
প্রণাম আমার কোন্খানে যায় থামি ,
তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে
সবার পিছে , সবার নীচে ,
সব-হারাদের মাঝে । (১০৭ নম্বর গান)

নিন্দা দুঃখে অপমানে
যত আঘাত খাই
তবু জানি কিছুই সেথা
হারাবার তো নাই ।
থাকি যখন ধুলার'পরে
ভাবতে না হয় আসনতরে ,
দৈন্যমাঝে অসংকোচে
প্রসাদ তব চাই । (১২৬ নম্বর গান)

অসীম-সসীমের লীলাতত্বঃ
কোথায় আলো , কোথায় ওরে আলো ।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো ।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা ,
এই কি ভালে ছিল রে লিখা —
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো ।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো । (১৭ নম্বর গান)

ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায় ,
তবু জান , মন তোমারে চায় ।
অন্তরে আছ হে অন্তর্যামী ,
আমা চেয়ে আমায় জানিছ স্বামী —
সব সুখে দুখে ভুলে থাকায়
জান , মম মন তোমারে চায় ।

ছাড়িতে পারি নি অহংকারে ,
ঘুরে মরি শিরে বহিয়া তারে ,
ছাড়িতে পারিলে বাঁচি যে হায় —
তুমি জান , মন তোমারে চায় । (২৯ নম্বর গান)

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন ।
নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে ,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে
হয়েছে মগন । (৪৪ নম্বর গান)

আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে
মরছে সে এই নামের কারাগারে ।
সকল ভুলে যতই দিবারাতি
নামটারে ওই আকাশপানে গাঁথি ,
ততই আমার নামের অন্ধকারে
হারাই আমার সত্য আপনারে । (১৪৩ নম্বর গান)

প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর বন্দনাঃ
আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়
লুকোচুরি খেলা ।
নীল আকশে কে ভাসালে
সাদা মেঘের ভেলা ।
আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে ,
উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে ;
আজ কিসের তরে নদীর চরে
চখাচখির মেলা । (৮ নম্বর গান)

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ , আমরা
গেঁথেছি শেফালিমালা ।
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা ।
এসো গো শারদলক্ষ্মী , তোমার
শুভ্র মেঘের রথে ,
এসো নির্মল নীল পথে ,
এসো ধৌত শ্যামল
আলো-ঝলমল
বনগিরিপর্বতে ।
এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল
শীতল-শিশির-ঢালা । (১১ নম্বর গান)

মেঘের'পরে মেঘ জমেছে ,
আঁধার করে আসে ,
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে ।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে ,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারি আশ্বাসে । (১৮ নম্বর গান)

আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মতো নীরব ওহে
সবার দিঠি এড়ায়ে এলে ।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি ,
বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি ,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি
নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে । (১৮ নম্বর গান)

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর
ভরা বাদরে ।
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা
কোথাও না ধরে ।
শালের বনে থেকে থেকে
ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে ,
জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে
মাঠের'পরে । (২৭ নম্বর গান)

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ।
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে ।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো ,
আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো ,
এই সংগীত-মুখরিত গগনে
তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো ।
এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে
দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে । (৫৫ নম্বর গান)

জননীরূপে ঈশ্বরকল্পনাঃ
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ
দুখের অশ্রুধার ।
জননী গো , গাঁথব তোমার
গলার মুক্তাহার !
চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে
মালা হয়ে জড়িয়ে আছে ,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার
দুখের অলংকার । (১০ নম্বর গান)

জননী , তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে ।
জননী , তোমার মরণহরণ বাণী
নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে ।
তোমারে নমি হে সকল ভুবন-মাঝে ,
তনু মন ধন করি নিবেদন আজি
ভক্তিপাবন তোমার পূজার ধূপে ।
জননী , তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে । (১৪ নম্বর গান)
ইংরেজী অনুবাদ:
গীতাঞ্জলি'র কবিতা/গানগুলোর অনুবাদ শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। ৫৩টি গানের অনুবাদ গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংস‎ গ্রন্থে সংকলিত হয়। রবীন্দ্রনাথ সবগুলো কবিতা/গানের অনুবাদ সম্পন্ন করেন নি। গীতাঞ্জলি'র সবগুলো কবিতা/গানগুলোর অনুবাদ যারা করেছেন তাদের মধ্যে আছেন ব্রাদার জেমস এবং ব্রিটিশ কবি ও অনুবাদক জো উইন্টার।

নিচে গীতাঞ্জলি কাব্যের ১২৫ নম্বর গানটি উদ্ধৃত হল:
“আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার
তোমার কাছে রাখেনি আর সাজের অহংকার।
অলংকার যে মাঝে প’ড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার।

তোমার কাছে খাটে না মোর কবির গরব করা–
মহাকবি, তোমার পায়ে দিতে চাই যে ধরা।
জীবন লয়ে যতন করি
যদি সরল বাঁশি গড়ি,
আপন সুরে দিবে ভরি সকল ছিদ্র তার।”

এই কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথই (Gitanjali, verse VII):
"My song has put off her adornments. She has no pride of dress and decoration. Ornaments would mar our union; they would come between thee and me; their jingling would drown thy whispers."

"My poet's vanity dies in shame before thy sight. O master poet, I have sat down at thy feet. Only let me make my life simple and straight, like a flute of reed for thee to fill with music."

“গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংস‎” ইংরেজী ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম সংকলনগ্রন্থ।“গীতাঞ্জলি” নামটি বিশ্লেষন করলে দাঁড়ায় গীত+অঞ্জলী=গীতাঞ্জলি। গীত বা Song ও অঞ্জলী বা Offerings থেকেই কবিগুরু এই গ্রন্থটির নামকরণ করেন Song Offerings।অনূদিত কবিতাগুলি পাশ্চাত্যে খুবই সমাদৃত হয়। কিন্তু গ্রন্থদুটির নাম অভিন্ন হলেও ইংরেজী গীতাঞ্জলিতে বাংলা গীতাঞ্জলি'র একচ্ছত্র আধিপত্য নেই।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা গীতাঞ্জলি'র ১৫৭টি গান/কবিতা থেকে ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে (Song Offerings) মাত্র ৫৩টি স্থান দিয়েছেন। বাকি ৫০টি বেছে নিয়েছেন গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া, শিশু, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, স্মরণ ও অচলায়তন থেকে। গীতিমাল্য থেকে ১৬টি, নৈবেদ্য থেকে ১৫টি, খেয়া থেকে ১১টি, শিশু থেকে ৩টি, কল্পনা থেকে ১টি, চৈতালি থেকে ১টি, উতসর্গ থেকে ১টি, স্মরণ থেকে ১টি এবং অচলায়তন থেকে ১টি কবিতা/গান নিয়ে তিনি ইংরেজি গীতাঞ্জলির বিন্যাস করেছেন। অর্থাৎ ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে তিনি মোট ৯টি গ্রন্থের কবিতা বা গানের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।

গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংসে প্রথম গান হিসেবে কবিগুরু গীতিমাল্যের ২৩ নম্বর গানটিকে স্থান দিয়েছেন।
আমারে তুমি অশেষ করেছ
এমনি লীলা তব।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।
কত যে গিরি কত যে নদীতীরে
বেড়ালে বহি ছোটো এ বাঁশিটিরে,
কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
কাহারে তাহা কব।

তোমারি ওই অমৃতপরশে
আমার হিয়াখানি
হারালো সীমা বিপুল হরষে
উথলি’ উঠে বাণী।
আমার শুধু একটি মুঠি ভরি
দিতেছ দান দিবসবিভাবরী,
হল না সারা কত-না যুগ ধরি,
কেবলই আমি লব।

যার ইংরেজী অনুবাদ কবিগুরু নিজেই করেছেনঃ
"Thou hast made me endless, such is thy
pleasure. This frail vessel thou emptiest
again and again, and fillest it ever with
fresh life.

This little flute of a reed thou hast carried
over hills and dales, and hast breathed
through it melodies eternally new.

At the immortal touch of thy hands my little
heart loses its limits in joy and gives birth
to utterance ineffable.

Thy infinite gifts come to me only on these
very small hands of mine. Ages pass, and
still thou pourest, and still there is room to
fill."

অনুবাদের ইতিহাস:
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথের জাহাজযোগে লণ্ডন যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রার পূর্বে তিনি অর্শ রোগের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পদ্মা নদীতে নৌকায় বিশ্রাম নিতে শুরু করেন। এ সময় তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ থেকে সহজ ইংরেজীতে অনুবাদ শুরু করেন। পরবর্তীতে গীতাঞ্জলি ৫৩টি এবং গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া প্রভৃতি আরো নয়টি কাব্যগন্থ থেকে ৫০টি - সর্বমোট ১০৩টি কবিতার অনুবাদ নিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরী করেন। এই পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথ ২৭ মে ১৯১২ বোম্বাই বন্দর থেকে বিলেত যাত্রা করেন। তিনি লন্ডনে পৌঁছান ১৬ জুন। এ সময় ইউলিয়াম রোদেনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং পাণ্ডুলিপিটি তাকে দেয়া হয়। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে লণ্ডনে ইন্ডিয়া সোসাইটি কর্তৃক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সঙ্গ অফরিংস-এর ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং কবি ইয়েটস্। এ ভূমিকাটি ছিল একই সঙ্গে আন্তরিক ও যথেষ্ট প্রশস্তিতমূলক।ভূমিকাটির কিছু অংশ এমনঃ
“I have carried the manuscript of these translations about with me for days, reading it in railway trains, or on the top of omnibuses and in restaurants, and I have often had to close it lest some stranger would see how much it moved me. These lyrics-- which are in the original, my Indians tell me, full of subtlety of rhythm, of untranslatable delicacies of colour, of metrical invention--display in their thought a world I have dreamed of all my live long. The work of a supreme culture, they yet appear as much the growth of the common soil as the grass and the rushes. A tradition, where poetry and religion are the same thing, has passed through the centuries, gathering from learned and unlearned metaphor and emotion, and carried back again to the multitude the thought of the scholar and of the noble.”

নিজ অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ বেশ স্বাধীনতা নিয়েছিলেন। আক্ষরিক তো নয়ই বরং ভাবানুবাদেরও বেশি ; কখনো কবিতাংশ সংক্ষেপিত করা হয়েছে কখনো বা শুধু ভাবার্থ করা হয়েছে ; কেবল কবিতার ভাবসম্পদ অক্ষত রাখা হয়েছে। ইংরেজিভাষী সমালোচকরা সানন্দে তাঁর অনুবাদের উৎকর্ষতা স্বীকার করেছেন। তবে এ উৎকর্ষতার ক্রমাবনতি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ইংরেজ পাঠক ও সমালোচক এবং রবি-জীবনীকার এডওয়ার্ড টম্পসন মন্তব্য করেছেন, "প্রথম দিকের অনুবাদ ছিল নিখুঁত ও মনোরম ; শেষের দিকে অযত্নে ও নৈমিত্তিকভাবে অনুবাদের কাজ সারা হয়েছে"। তবে স্বকৃত অনুবাদ নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মনেই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। ইয়োরোপে যাওয়ার আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে শিলাইদহে কিছু দিন কাটান, তখন সময় কাটানোর ছলেই তিনি গীতাঞ্জলি’র অনুবাদে হাত দেন। কিন্তু প্রিয় কবিতাগুলোর অনুবাদ তাঁর কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি, মনে হয়েছিল ‘school-boy exercise'।

গীতাঞ্জলির ডাউনলোড লিংক।

সুত্রঃ
১. রবীন্দ্র-রচনাবলী, ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ।
২. গীতাঞ্জলি
৩. Gitanjali - Song Offerings
৪. উইকিপিডিয়া
৫. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29151238 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29151238 2010-05-08 18:43:35
সমকালীন বাংলা কমিউনিটি ব্লগ ভাবনা বাংলা ব্লগের ইতিহাসঃ
বাংলা ভাষায় “বাঁধ ভাঙা আওয়াজ” স্লোগান নিয়ে প্রথম বাংলা কমিউনিটি ব্লগ “সামহোয়্যার ইন ব্লগের” যাত্রা শুরু।
২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে ব্লগার দেবরার “ইমরান ব্লগ স্রষ্টা” শিরোনামে প্রথম পোস্টের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলা কমিউনিটি ব্লগের অগ্রযাত্রা।

“ইমরান তুমি একটা ভাল কাজ করেছ, হাসিন ভাই আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনাদের জানাই আমাদের শুভু কামনা।”

এই দুই লাইন দিয়েই শুরু। মজার ব্যাপার পোস্টটিতে ১৮ ই জুলাই, ২০০৬ রাত ৮টা ০৭ মিনিটে প্রথম মন্তব্য পড়ে। মাঝখানে প্রায় সাত মাস! ব্লগার সারিয়া তাসনিমের মন্তব্য,” প্রথম পোস্ট অথচ মন্তব্য বিহীন ।
ভালো লাগছে প্রথম পোস্টে মন্তব্য করতে পেরে”।

“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” স্লোগান নিয়ে ২০০৭ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করে আরেকটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগ “সচলায়তন”।

২২ অক্টোবর ২০০৮ সালে বাংলা কমিউনিটি ব্লগ জগতে আবির্ভাব হয় “প্রথম আলো ব্লগের”।

এভাবেই এগিয়েছে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে বাংলা ব্লগিং। কৈশোর পেরিয়ে রীতিমত যৌবনে পদার্পন। এখন অনেকটাই পরিনত হয়েছে বাংলা ব্লগিং। আমরাও ব্লগিং ধারনার সাথে নিজেদের একটু একটু করে গুছিয়ে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছি।এই দীর্ঘ সময় পরে একটু যদি পিছন ফিরে তাকাই, গর্বে বুক ভরে যায় আমাদের। বাংলা ব্লগিংএ আমাদের অর্জন অনেক।অনেক অমিত সম্ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের।

বাংলা ব্লগ দিবসঃ
আন্তর্জালের বিস্তৃত দুনিয়ায় এখন বেশ কয়েকটি বাংলা ব্লগ আছে। নতুনের তালিকায় আরো বাংলা ব্লগ আসছে। প্রতিটি ব্লগেরই নিজস্ব মতাদর্শ ও বিশ্বাস আলাদা, ব্লগারদের কাছে এদের জনপ্রিয়তার ধরনও আলাদা।মতাদর্শের হের-ফের থাকলেও বাংলা ভাষার চর্চা এবং বিশ্বজুড়ে মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রকৃতপক্ষে সবার উদ্দেশ্য অভিন্ন। এই অভিন্ন ও সম্মিলিত বিশ্বাসকে সামনে রেখে এবং বাংলা ভাষাকে বিশ্বময় আরো ছড়িয়ে দেবার জন্যে গতবছর ১৯শে ডিসেম্বর,শনিবার, ২০০৯ পালিত হয় "বাংলা ব্লগ দিবস" ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলা ব্লগঃ
১. প্রথম আলো ব্লগের নীতিমালার ৬ এর (ক) তে আছে, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে অবমাননা ও কটাক্ষমূলক কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না”।

২. সচলায়তনের নীতিমালার প্রথম বাক্যতে আছে “সচলায়তন বেশ কিছু বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিসংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলিকে আক্রমণ করে লেখা পোস্ট, মন্তব্য বা অন্যান্য উপাদান সচলায়তন থেকে মডারেটরবৃন্দ যে কোন সময় অপসারণ করতে পারেন"।

৩. আমার ব্লগের নীতিমালার প্রথমেই আছে, “আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী কোনো প্রচারণা আমারব্লগ ডট কমে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।”।

এভাবে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোর নীতিমালায় গুলো দেখলেই বুঝা যায়, প্রতিটি ব্লগই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল।

সচলায়তনের কথা আলাদা না করে বললেই নয়। কিছু আন্তর্জালিক দুঃষ্কৃতকারী মিথ্যা ও ভুলভাবে আন্তর্জালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরছে। সচলায়তন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে সাথে নিয়ে উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস রচনায় নেমে পড়েছেন “উইকিযুদ্ধ - মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার সমবেত প্রয়াস”।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত গঠনঃ
সামহোয়্যার ইন ব্লগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গন-স্বাক্ষর কর্মসূচী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য তারা তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি পিটশন ফরম ডাউনলোড সংযুক্তি দিয়েছেন।

আমার ব্লগের নীতিমালার শুরুতেই আছে, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপরীত যে কোনো প্রচারণা আমারব্লগ ডট কমে কঠোরভাবে দমন করা হবে”।
এছাড়া আমার ব্লগ ১৪ই ডিসেম্বরের দল (14december.org) কে সাথে নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে জনমত গঠনের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

প্রথম আলো ব্লগে সে রকম প্রচেষ্টা দেখা না গেলেও, এর অনেক ব্লগারই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময় পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন।

গনতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতাঃ
প্রথম আলো ব্লগের নীতিমালা ২ এ আছেঃ
ক) দেশীয় বা দেশের বাইরের কোনো জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা ও ধর্মের প্রতি অবমাননামূলক বা কারো অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে এমন কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
খ) বিবদমান দুই বা ততোধিক জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষের উস্কানি দিতে পারে এমন লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
গ) ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস বা ভাষাকে কটাক্ষ বা অবমাননা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
ঘ) প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অনুসারে শ্রদ্ধেয় কোনো ব্যক্তিকে হেয় করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।
ঙ) কোনো জাতি, জনজাতি, গোষ্ঠী, জাতি-উৎস, লিঙ্গপরিচয়, বয়স, শ্রেণীপরিচয়, শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা নিয়ে ঘৃণা বা অবমাননামূলক কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা যাবে না।
চ) ধর্মগ্রন্থের বাণী ত্রুটিপূর্ণভাবে উদ্ধৃত করা যাবে না। এমনভাবে ধর্মগ্রন্থের বাণী উদ্ধৃত করা যাবে না, যাতে ধর্ম বা বাণীর অসম্মান হয়।

সামহোয়্যার ইন ব্লগের নীতিমালায় আছে, “বাংলাদেশ অথবা যে কোন স্বীকৃত জাতি বা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, ধর্ম বিষয়ক সত্যকে অস্বীকার করে, বিরুদ্ধাচারণ করে, অসম্মান করে অথবা সত্যের অপলাপ বা অর্থহীন পোস্ট মুছে ফেলা হতে পারে এবং ব্লগারের ব্লগিং সুবিধা সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে স্থগিত কিংবা বাতিল করা হতে পারে”।

সচলায়তনের নীতিমালায় আছে “লেখকেরা যদিও স্বাধীন তথাপি, সচলায়তনে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে জোরালো ভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে: ধর্মপ্রচার......সাম্প্রদায়িক / বর্ণবাদী / লিঙ্গবাদী / অবমাননাকর লেখা ও মন্তব্য......”

এভাবে নীতিমালা দেখলে আমরা একটা ধারনা পেতে পারি, কতটা অসাম্প্রদায়িক ও গনতান্ত্রিক আমাদের বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো।

ব্লগারদের নৈতিকতা ও মনোবলঃ
সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গীবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন সময় বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল। তাদের অপ-মতবাদগুলো বাংলা কমিউনিটি ব্লগের মাধ্যমে প্রচার ও প্রসারের অপ-প্রয়াস নিয়েছিল। অনেক সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্লগার মন ও মনজগতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাদের এই অপ-প্রয়াস একাধিক নিক ফ্যাক্টারী নিয়ে কৌশোলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েও গিয়ে ছিল। যেহুতু সামহোয়্যার ইন ব্লগ বাংলা কমিউনিটি ব্লগের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ও বড় ব্লগ, তাই তাদের ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দুই ছিল সামহোয়্যার ইন ব্লগ।

কিন্তু স্বাধীনতমনষ্ক অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধপন্থি ব্লগারদের অদম্য প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত তারা অসফল হয়ে বরং বিছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্লগে এই প্রয়াস ক্ষুদ্র পরিসরে এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।
সংবাদ মাধ্যমের বিকল্প উৎসঃ
ব্লগের আবেদন নিছক সামাজিকতা ও বিনোদনকে ছাপিয়ে অনেক উপরে উঠে এসেছে। কালক্রমে বাংলা ব্লগগুলো সংবাদ মাধ্যমের বিকল্প উৎস হয়ে উঠছে। জাতীয় দূর্যোগ ও ক্রান্তিকাল, এমনকি খেলাধুলার আপডেট অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে আসার আগেই বাংলা ব্লগগুলোতে চলে আসছে।

গত বছর ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ এ বিডিআর বিদ্রোহের সময় বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো অসাধারন ও অনন্য ভূমিকা রেখেছে। অনেক ব্লগারই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ঘটনাস্থলের পাশে থেকে সামগ্রিক খবর মোবাইলের মাধ্যমে ব্লগে জানিয়েছে।

আমরা একই ধারা দেখেছি এ বছরের ২৮ জানুয়ারিতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার রায় কার্যকরকে ঘিরে ব্লগারদের নিয়মিত আপডেট দিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের জানিয়েছেন।
সংবাদের সত্যতা নিয়ে বিতর্কঃ
অনেক সংবাদ মিডিয়াই ব্লগের এই উত্থানে ভীত হয়ে এর বিরুদ্ধে নানা অপ-প্রচার চালান। জাতির সামনে বাংলা ব্লগকে নিয়ে কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছেন। তাদের যুক্তি ব্লগে অনেক সময় মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করা হয়। এটা কিছুটা সত্য হলেও, বহুলাংশেই মিথ্যা। যারা ব্লগিং করেন, তারা সবাই শিক্ষিত ও মার্জিত রূচীর অধীকারী। খুব সহজেই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারেন।

তাই যারা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের প্রয়াস নিবেন, অন্য ব্লগারদ্বারা অবশ্যই ধিকৃত হবেন ও প্রতিবাদের মুখে পরবেন। তাই দ্ব্যার্থহীনভাবে, বলা যায় ব্লগে পরিবেশিত অনেক সংবাদ মিথ্যা হলেও মন্তব্য আকারে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে।
বাংলা সাহিত্য ও কমিউনিটি ব্লগঃ
সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে রেঁনেসার সূত্রপাত হয়েছিল, একটি অমিত সম্ভাবনাময় সাহিত্যিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল, যারা আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেক বড় উঁচুতে। বর্তমানে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে তেমনই রেঁনেসা শুরু হয়ে গেছে। ব্লগগুলো থেকে তৈরী হচ্ছেন অনেক প্রতিভাশীল ও অমিত সম্ভাবনাময় কবি ও সাহিত্যক।

বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদী ও সাহিত্যে নব-সংযোজন লিটল ম্যাগাজিনের চর্চা চলছে। এখান থেকেও বের হয়ে আসবে অনেক প্রতিভাশালী লেখক, কবি ও সাহিত্যিক।

প্রতি বছর অমর একুশে বই মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোতে পড়ে যায় সাঁজ সাঁজ রব।বিভিন্ন ব্লগ কর্তৃপক্ষ ও ব্লগারদের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ব্লগারদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বই। এ সব পদক্ষেপই আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যাবে অনেক দূর ও অনেক উচ্চতায়।

মানবিকতায় বাংলা ব্লগঃ
বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো মানবিকতাবোধকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। আর্ত্মামানবতার সেবায় ব্লগাররা যার যার অবস্থান থেকে সবাই নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন, এগিয়ে আসছেন।

প্রায় প্রতিটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগে অসুস্থ ও অসহায় ব্যাক্তিদের জন্য সাহায্য চেয়ে পোস্ট আসে। কর্তৃপক্ষ সেই সব পোস্টগুলোকে দ্রুত বিবেচনা করে নির্বাচিত পোস্ট বা স্টিকি পোস্টে রাখেন সবার দৃষ্টি আকর্ষনে জন্য। ব্লগাররা যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।

শীতার্তদের জন্য প্রথম আলো ব্লগের ব্লগারদের উদ্যোগ উল্ল্যেখ না করলেই নয়। যেখানেই মানবতা কষ্ট পায়, সেখানেই ব্লগারদের বিবেক আত্নদংশনে অস্থির করে তোলে সাহায্য করার তাগিদে।

রক্তের প্রয়োজনে যেকোন পোস্ট এলেই বা কারো অসুস্থতার খবর হলেই নিমিষেই ব্লগের পরিবেশ বদলে যায়। সবাই যার যার স্থান থেকে সাহায্যে এগিয়ে আসে।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও হাস্পাতাল নির্মানের জন্য প্রথম আলো ব্লগের ব্লগার জোহরা ফেরদৌসীর নাম না না বললেই নয়। অনেকটা একাকী ও নিষ্ঠার সাথে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি এই সংগ্রামে।

পরিশেষে এটুকুই বলব, বাংলা ব্লগগুলো আন্তর্জালের কল্পিত গণ্ডী ছেড়ে ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠছে। ব্লগাররা নিজেদেরকে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও অনুভূতি থেকেই, বিভিন্ন কল্যানমূলক ও সেবামূলক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহন করছেন। আন্তর্জালিক আলাপচারীতা থেকে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হচ্ছেন একে অপরের সাথে। বিভিন্ন মীটআপ, পিকনিক, চড়ুইভাতি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অপূর্ব বন্ধন গড়ে উঠছে চারপাশে। অনেক অচেনা কেউ হয়ে যাচ্ছে, চির চেনা একজন; এখানেই বাংলা কমিউনিটি ব্লগের স্বার্থকতা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29129649 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29129649 2010-04-05 22:18:09
জননী
ছেলেটা দেখতে দেখতে এত বড় হয়ে গেল। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়; ছালেহা ভাবে। আসাদের বাবা করিম মিঞা উজানচর প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। আসাদের বয়সই বা কত, পাঁচ কি ছয়? করিম মিঞা ছালেহা বেগমকে ডেকে বলল, বৌ আমাগের আসাদরে একটু সাঁজাইয়ে গুছাইয়ে দাও দিনি, ওরে স্কুলে নিইয়া যাই।

আসাদ পাড়ার ছেলেদের সাথে মার্বেল খেলছিল। ছালেহা বেগম ডাকল, আসাদ বাপ! শুইনে যা!
মায়ের ডাক শুনে দৌড়ে আসে আসাদ, মা! আমারে ডাকিছেন?
-হ। তোর বাপ কতিছিল তোরে স্কুলে নিইয়ে যাবি। তুই গোছল সাইরে নে।
মায়ের কথা শুনে আসাদের খুশি যেন আর ধরে না। লুঙ্গি, গামছা নিয়ে কল পাড়ের দিকে ছুটল গোছল করতে। গোছল শেষ হলে, ছালেহা নিজ হাতে জামা কাপড় পড়ালো, মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে মাথার চুল আঁচড়ে দিল। আসাদ লক্ষী ছেলের মত ওর বাবার সাইকেলের পিছনের সিটে দুই পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল।
করিম মিঞা বলল, শক্ত কইরে ধরিস বাপ! পইড়ে যাতি পাড়স।
-না আব্বা! আমি শক্ত কইরে ধরিছি!

ছালেহা বেগম হাসে। আনমনেই চোখের কোণে জল গরিয়ে পড়ে। আসাদ কত বড় হয়ে গেছে। মাট্ট্রিকুলেশন আর এফএতে বড় পাশ দিছে। এখন ঢাকায় ভার্সিটিতে পড়ে। বাড়িতে এলে, এক মহূর্তের জন্যও কাছে পায় না ছেলেটাকে। কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়ায়! দুই তিন গ্রামের লোক আসে ওর সাথে দেখা করতে, গল্প করতে। তবুও ভাল, এই কয়টা দিন ছেলেটা চোখের সামনে থাকে। ভাল মন্দ দুইটা খেতে পাড়ে। বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকে, কী খায় আর না খায়? ছেলেটা ভাঁপা পিঠা পছন্দ করে। ছোট ছোট চিংড়ি সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ, পিয়াজ দিয়ে ভর্তা করে দিলে খুব তৃপ্তি নিয়ে ভাত খায়। শিম দিয়ে নুনওয়ালা ইলিশ মাছের ছালুন, বড় বড় আলুর টুকরো দিয়ে গরুর গোশত রান্না খুব পছন্দ করে আসাদ।

বছরে দুই ঈদে দুই বার মাত্র বাড়ি আসে। অবশ্য প্রতি মাসেই একটা করে চিঠি পাঠায়। তেমন বেশি কিছু লিখে না; সে ভালো আছে, পড়া লেখা ভালোই চলছে এই সব। ডাক পিওন চিঠি নিয়ে এলে খুব যত্ন করে ছালেহা বেগম, মুরগি জবাই করে খাওয়ায়।

২। আজ বৃহস্পতিবার। পাঁচটার শ্যাটল ট্রেনে আসার কথা আসাদের। ছালেহা বেগমের কাল রাতে ভালো ঘুম হয় নি। ফজরের আযানের আগেই একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায়। কী অলুক্ষণে স্বপ্ন! একটা লাশ দেখতে ঠিক আসাদের মত, কাঁদতে কাঁদতে বলছে, মা! আমারে নিইয়ে যাতি দিও না। মা! আমারে ধইরে রাহো।

ছালেহা বেগমের ধড়ফড়ানিটা বেড়ে যায়। বাঁশ ঝাড়ের দিকে একটা শিয়াল শব্দ করে কাঁদছে। ছালেহার বুকে ছ্যাৎ করে উঠে। এক অজানা ভয়ে কুঁকরে উঠে।
-বিয়ান বেলায় আমি কী খোয়াব দেকলাম? শুনিছি বিয়ান বেলার খোয়াব ফইলে যায়। ইয়া আল্লাহ! ইয়া রছুল! আমার আসাদরে ভাল রাখিও।
ছালেহা বেগম মনে মনে ভাবে, আসাদ বাড়ি আলি পড়ে মজিদে ছিন্নি দেব।বার বার আয়েতাল কুরছি পড়ে। তবুও ভয় কাটে না।

সকালে ঘরের কপাট খুলে ছালেহার মন আরো খারাপ হয়ে যায়। উঠানে একটা খোঁড়া শালিক তারস্বরে চেচাচ্ছে। সকালে এক শালিক দেখলে অমঙ্গল হয়।
ছালেহা খুব যত্ন করে ভাঁপা পিঠা বানাচ্ছে। খেজুরের গুড় আর নারকেল বেশি দেওয়া পিঠা আসাদ পুছন্দ করে।সব কয়টা পিঠাই আসাদের পছন্দ মত বানাচ্ছে ছালেহা। আসাদ এলেই ভাত খেতে চাইবে। সকালে কী না কী খেয়ে রওনা দিয়েছে? ছালেহা আসাদের জন্য চিংড়ি ভর্তা, শিম দিয়ে নুনওয়ালা ইলিশের সালুন আর গরুর গোশত রান্না করে রেখেছে।

পাঁচটা কখন বেঁজেছে। সন্ধ্যা হতে চলল। শ্যাটল ট্রেনও ঠিক সময়ে এসেছে। ছালেহা বেগম রান্না ঘরে বসে ট্রেন আসার শব্দ শুনেছে। আসাদ এখনও এল না। কেন এল না? আজ কি তবে আসবে না? না কি কোনো বিপদ………. আর ভাবতে পারে না ছালেহা। ভাবতেও চায় না। আজ আসে নি, কাল নিশ্চই আসবে।

৩। চার দিন হয়ে গেল। এখনো আসাদ আসে নি। সকাল থেকেই ছালেহা বেগম কান্নাকাটি করছে।
-আসাদের বাপ! আপনে একটু ঢাকা যাইয়ে দেহি আসেন। আমাগের আসাদরে সাথে কইরে নিইয়ে আসেন। আমার কিছুতিই ভাল ঠেকতিছে না।

করিম মিঞা ঢাকা হলে পৌছতে পৌছতেই আসরের আযান দিয়ে দিল। এর আগে তিনবার সে আসাদের হলে এসেছে। কিন্তু আজ সব কেমন যেন লাগছে। চারি দিকে নিরব, নিঃস্তব্ধ, একটা শোক শোক ভাব। সময়ও যেন চলতে ভুলে গিয়ে থমকে আছে।

আসাদ ১২১ নম্বর রুমে থাকে। করিম মিঞা আসাদের রুমের দড়জায় আঘাত করল। আসাদের রুমমেট সোহেল দড়জা খুলল। সোহেলকে আগে যে কয়বার দেখেছে করিম মিঞা, প্রাণোচ্ছল টগবগে ছেলে, সব সময় হাসি খুশি থাকে। অথচ আজ বড় বিষণ্নমাখা ওর মুখ। করিম মিঞাকে দেখে চমকে উঠল সোহেল। আসাদের আরেক রুমমেট কামাল দড়জার কাছে চলে এল। বিষণ্ণমুখে বলল, কাকা আপনি কখন এলেন? ভিতরে আসেন?

করিম মিঞা আসাদের বিছানায় বসলেন। জিজ্ঞাসু চোখে ঘরটায় চোখ বুলালেন। ভেন্টিলেটরের ফাঁকা দিয়ে একটা চড়ুই একবার রুমে ঢুকছিল, আবার বের হয়ে যাচ্ছিল।
করিম মিঞা বলল, আসাদ কনে? ওরে তো দেখতিছি না?
সোহেল কামাল দুই জনই চুপ করে থাকল। ওদের নিরবতা আর দুই চোখের বিষণ্ণতা করিম মিঞাকে ভিতরে ভিতরে দগ্ধ করছিল অজানা কোনো আশঙ্কায়। তবুও মুখে হাসি এনে বলল, কি তোমরা তো কিছু কতিছো না?
সোহেল আমতা আমতা করে উত্তর দেবার চেষ্টা করল।
-কাকা আসাদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
করিম মিঞার মুখের হাসি হারিয়ে গেল।
-কি কতিছো তোমরা? খুঁইজে পাওয়া যাবি না ক্যান? আসাদ কনে গেছিল? ওর তো ২১ তারিখ বাড়ি আসপের কথা ছিল।
সোহেল কামালের চোখের দিকে তাকাল, যেন আশ্রয় খুঁজতে চাইছে।
কামাল বলল, কাকা ২১ তারিখ সকালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে আমাদের একটা মিছিল হওয়ার কথা ছিল। আসাদ ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল, মিছিল শেষ করেই বাড়ি রওনা দেওয়ার জন্য।
কামালের সাথে সাথে সোহেলও বলতে শুরু করল।
-মিছিলে আসাদ আমাদের সাথেই ছিল।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা একটা রক্তাক্ত প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে সোহেল বলল, এই প্ল্যাকার্ডটা আসাদের হাতে ছিল। আমরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের মোড়ের দিকে যেতেই হঠাৎ পুলিশ গুলি শুরু করল।
কামাল বলল, আসাদের বুকে আর ডান পায়ে গুলি লেগেছিল। আমি ওকে নিয়ে মেডিকেলের দিকে আসছিলাম। পুলিশ আমার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পড়ে শুনেছি যারা আহত হয়েছিল, গুলি খেয়েছিল, প্রায় সবাইকে পুলিশ গাড়িতে করে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।
সোহেল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ঐ দিন দুপুর থেকেই আসাদকে খুঁজছি। হাসপাতাল, থানা, জেলখানা সব জায়গায় খুঁজে দেখেছি। কোথাও আসাদ নেই।

করিম মিঞা কি বলবে বুঝতে পারে না। একটা ভারি পাথর কে যেন তার বুকে বেঁধে দিয়েছে। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বার বার হতভাগিনী ছালেহা বেগমের কথা মনে পড়ছে। শুন্য হাতে কিভাবে সে আজ বাড়ি ফিরবে। কি জবাব তাঁকে দেবে।
ভেন্টিলেটরের ফাঁকে তখনো খেলা করছিল চড়ুই পাখিটা। করিম মিঞা ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে থাকে সেদিকটায়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29103413 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29103413 2010-02-22 21:19:37
চর্যাপদ

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। তবে অসমীয়া ও উড়িয়া ভাষার সাথে অনেক মিল থাকায়, অসমীয়া এবং উড়িয়া ভাষারও আদি নিদর্শন হিসেবে দাবী করেন অনেক ভাষা পন্ডিত। একে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকোষ বা চর্যাগীতি নামেও অভিহিত করা হয়। এটা আসলে একটা গানের সংকলন। বৌদ্ধ ধর্মমতে এর বিষয়বস্তু সাধন ভজনের তত্ত্ব প্রকাশ। চর্যাপদের তিব্বতীয় ভাষার অনুবাদটি ‘Tibetan Buddhist Canon’ বা ‘তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ’ হিসেবে সংরক্ষিত।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রয়েল লাইব্রেরী থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায়। এর রচনাকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর পদগুলো রচিত হয়। সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পন্ডিতই ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন করেন।

চর্যাপদের কবির সংখ্যা ২৩, মতান্তরে ২৪। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত ‘Buddhist Mystic Songs’ গ্রন্থে ২৩ জন কবির নাম আছে। সুকুমার সেন ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খন্ড)’ গ্রন্থে ২৪ জন কবির কথা বলেছেন। চর্যাপদের কবিরা আসাম, বাংলা, উড়িষ্যা ও বিহার থেকে এসেছেন বলে ধারনা করা হয়।

চর্যাপদ ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায়, এতে কতটি পদ বা গান আছে তা নিয়েও মতভেদ দেখা দেয়। সুকুমার সেনের মতে এর পদের সংখ্যা ৫১, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৫০টি। চর্যাপদের ২৪ নং (কাহ্নপা রচিত), ২৫ নং (তন্ত্রীপা রচিত) ও ৪৮ নং (কুক্কুরীপা রচিত) পদগুলো পাওয়া যায় নি। ২৩ নং (ভুসুকপা রচিত) পদটি পাওয়া গেছে ছিন্ন অবস্থায়।

সংস্কৃত টীকাকার মুনিদত্তের মতে চর্যাপদ ‘Twilight Language’; সংস্কৃত ‘সান্ধ্য ভাষা’ বা ‘আলো আঁধারী ভাষায়’ রচিত। পরিবর্তীতে বিধুশেখর শাস্ত্রী বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সাথে এর রচনারীতির সাযুজ্য থাকায় এর ভাষা ‘Intentional Lanuage’; সংস্কৃত ‘সন্ধ্যা ভাষা’ হিসেবে অভিহিত করেন। যে ভাষা সুনির্দিষ্ট রূপ পায় নি, যে ভাষার অর্থও একাধিক অর্থাৎ আলো আঁধারের মত, সেই ভাষাকেই পন্ডিতগন সান্ধ্য ভাষা বা সন্ধ্যা ভাষা বলে থাকেন।

চর্যাপদের প্রথম পদ লিখেছেন লুইপা। সর্বাধিক ১৩টি পদ (১২টি পদ পাওয়া গেছে) লিখেছেন কাহ্নপা, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮টি পদ লিখেছেন ভুসুকপা।

চর্যাপদের কবি ও তাঁদের পদের নম্বরঃ
লুইপা ১, ২৯ নং পদ
কুক্কুরীপা ২, ২০, ৪৮ নং পদ
বিরুপা ৩ নং পদ
গুন্ডরীপা ৪ নং পদ
চাটিল্লাপা ৫ নং পদ
ভুসুকপা ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং পদ
কাহ্নপা ৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ২৪, ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৫ নং পদ
কম্বালম্বরপা ৮ নং পদ
ডোম্বীপা ১৪ নং পদ
শান্তিপা ১৫, ২৬ নং পদ
মহীধরপা ১৬
বীণাপা ১৭
সরহপা ২২, ৩২, ৩৮, ৩৯ নং পদ
শবরপা ২৮, ৫০ নং পদ
আর্যদেবপা ৩১ নং পদ
ঢেগুনপা ৩৩ নং পদ
দারিকপা ৩৪ নং পদ
ভাদেপা ৩৫ নং পদ
তাড়কপা ৩৭ নং পদ
কঙ্কণপা ৪৪ নং পদ
জয়নন্দীপা ৪৬ নং পদ
ধর্মপা ৪৭ নং পদ
তন্ত্রীপা ২৫ নং পদ।


লুইপার লিখিত চর্যাপদের প্রথম পদ (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পাঠ অনুসারে)

কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ
লূই ভণই গুরু পূছঅ জাণ।।
সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই
সুখ দূখেতেঁ নিচিত মরিঅই।।
এড়িঅউ ছান্দ বান্ধ করণ কপটের আস
সূনু পাখ ভিড়ি লাহুরে পাস।।
ভণইলূই আমহে ঝাণে দীঠা
ধমণ চবণ বেণি পিন্ডী বইঠা।।

আধুনিক বাংলায় রুপান্তরঃ

কায়া তরুর মত পাঁচটি তার ডাল
চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবেশ করেছে।।
দৃঢ় করে নাও মহাসুখ পরিণাম
কবি লুই বলছে গুরুকে জিজ্ঞাস করে জান।।
সমস্ত সমাধিতে কি করে
সুখ দুঃখে নিশ্চিত মরা।।
এড়িয়ে যাওয়া যায় ছন্দ ও করণের পারিপাট্য
শূন্য পাখা পাশে চেপে ধর।।
লুই বলছে আমি স্বপনে দেখেছি
ধমণ চমণ দুই পিঁড়িতে আমি বসে।।
(ছন্দ=বাসনা, করণ=ইন্দ্রিয়চেতনা)


ধারনা করা হয়, ক্কুকুরীপা ছিলেন চর্যাপদের একমাত্র নারী কবি। তবে এ সম্পর্কে সুনিশ্চিত প্রমাণ নেই। ক্কুকুরীপা রচিত অতিপরিচিত দুটি পদঃ

দিবসহি বহূড়ী কাউহি ডর ভাই
রাতি ভইলে কামরু জাই।। (২ নং পদ)

অর্থাৎ, দিনে বউটি কাকের ভয়ে ভীত হয়, কিন্তু রাত হলেই সে কামরূপ যায়।


ঢেগুনপার রচিত ৩৩ নং পদে আবহমান বাঙালির চিরায়ত দারিদ্র্যের ছবি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমনঃ

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।।

অর্থাৎ লোকশুন্য স্থানে প্রতিবেশীহীন আমার বাড়ি। হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রেমিক এসে ভিড় করে।


ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ভুসুকপা ছিলেন পূর্বঙ্গের লোক। তাঁর রচিত ৪৯ নং পদে পদ্মা (পঁউআ) খালের নাম আছে, ‘বাঙ্গাল দেশ’ ও ‘বাঙ্গালী’র কথা আছে। তাঁর রচিত পদসমুহের মাঝে বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
ভুসুকপা রচিত অতিপরিচিত একটি পদঃ

অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।। ( ৬ নং পদ )


সুত্রঃ ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।
http://en.wikipedia.org ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29074493 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29074493 2010-01-08 17:21:43
আজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের শুভ জন্মদিন

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারীর কথা। আমার তখন প্রথম বর্ষের সমাপনী পরীক্ষা চলছিল।হলে থাকি।রাত জেগে পড়ার কারনে ঘুম থেকে উঠতাম বেশ বেলা করে। সকালের খাবার খেতে খেতে ১১টা বাঁজতো। সেদিন সম্ভবত ছিল শুক্রবার। প্রতিদিনের মত পুকুরপাড়ের দোকানগুলোতে গিয়েছি সকালের খাবার খেতে। চোখে তখনও ঘুম ঘুমভাব। একেবারে কোণার দোকানটার বেঞ্চে সাত আট জন বাচ্চা ছেলে মেয়ে আর দুই জন মধ্যবয়সী পুরুষ ও মহিলা বসে গল্প করছিল। হাসিতে আনন্দে বেশ জমে উঠেছিল আড্ডাটা। হঠাৎ একটা পিচ্চি মেয়ে গান গেয়ে উঠলো, “আলো আমার আলো ভুবন ভরা……”। আমি খুব মুগ্ধ হয়ে তাকালাম সেই আড্ডার মানুষগুলোর দিকে। লোকটার দিকে ভালো করে তাকাতেই আমার চোখ আটকে গেল। খুব মায়াবী সৌম চেহারা। কোথায় যেন দেখেছি। জাফর ইকবাল স্যারের মত লাগছে না? নিজেকেই প্রশ্ন করি। তাই তো, স্যারই তো! নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখি, আমি কি এখনো ঘুমোচ্ছি? না, জেগেই আছি।পাশের জন নিশ্চয় ইয়াসমিন আপা। খুব ইচ্ছে করছিল স্যারের সামনে যাই। সালাম দিয়ে আসি। আবার ভয়ও করছিল, অতবড় মানুষ। কী ভাববে? মনকে যতই বুঝাই, না মন মানতে চায় না। মনে দ্বিধা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে স্যারের সামনে গেলাম। সালাম দিলাম। বললাম, স্যার কেমন আছেন? স্যার খুব সুন্দর করে হাসলেন। স্যারের এই হাসিটা আমার অনেক পরিচিত। তাঁর বইয়ের মলাটের পিছনে কত দেখেছি! খুব ইচ্ছে করছিল স্যারকে একটু ছুঁইয়ে দেখি। স্যার বললেন, আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? আমার চোখে জল চলে আসতে চাইছিল। অনেক কষ্টে আটকালাম। কী পবিত্র মানুষটা! কত সহজে মানুষকে আপন করে নেয়। স্যারের সাথে কয়েকটা কথা বলে চোখের জল লুকোনোর জন্য একরকম পালিয়ে আসলাম। দূরের একটা বেঞ্চিতে বসে স্যারকে দেখলাম। তাঁর উচ্ছলতা, সরলতা, শিশুদের জন্য মায়া আমাকে খুব মুগ্ধ করছিল। স্যার যতখন সেখানে ছিল, আমিও ছিলাম। এরপর স্যার তাঁর পিচ্চি বাহিনী নিয়ে কার্জন হলের দিকে আগালো। আমি চেয়ে রইলাম, যতখন তাঁদের দেখা যায়।


মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার ও ডঃ ইয়াসমীন আপা

এরপর প্রতিটি বই মেলায়, যখন শুনেছি স্যার আসবে, দেখা করে এসেছি। প্রতিবারই একই অনুভুতি, একই ভালো লাগা কাজ করেছে আমার মাঝে। কত সহজ সরল জীবন যাপন তাঁর। কত সহজেই সবার সাথে মিশে যেতে পারে।


অন্তরঙ্গ মুহুর্তে অধ্যাপক আবু সাইদ স্যার, ডঃ ইয়াসমীন আপা ও মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার

আজ স্যারের জন্মদিন। ১৯৫২ সালের আজকের দিনে সিলেটে জন্ম গ্রহন করেছিলেন তিনি। এই শুভক্ষনে জন্ম হয়েছিল বাঙলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সাহিত্যিকের, সাইন্স ফিকশন লেখকের এবং জনপ্রিয় একজন কলামিস্টের।



স্যার শুভ জন্মদিন। আজকের এই শুভ দিনে আপনার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। ভালো থাকবেন স্যার।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29064225 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29064225 2009-12-23 14:25:38
স্বাদু পানির এঞ্জেল ফিস

স্বাদু পানির “এঞ্জেল ফিস” নামটি যেমন সুন্দর, মাছটি দেখতেও তেমনই খুব সুন্দর। দক্ষিন আমেরিকার আমাজান নদী (Amazon River), অরিনোকো নদী (Orinoco River) এবং এসেকুইবো নদীতে (Essequibo River) এদের প্রাচুর্যতা দেখা যায়। এই মাছের সাধারনত তিনটি প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো হল Pterophyllum scalare, Pterophyllum altum এবং Pterophyllum leopoldi।

মাছটি আমাদের দেশের রূপচাঁদা মাছের মত পার্শ্বীয়ভাবে খুব চ্যাপ্টা, দেহ গোলাকার এবং পৃষ্ঠ ও পুচ্ছ পাখনা দীর্ঘ ত্রিকোনাকৃতির। মাছের এই আকৃতি, একে পানিতে নিমজ্জিত গাছ এবং এদের গোড়ায় লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। মাছটির দেহে আড়াআড়ি তিনটা লম্বা রঙীন দাগটানা থাকে, এতে মাছটিকে গাছের বাকল বা লতাপাতার মত দেখায়। এর ফলে মাছটির লুকিয়ে থাকতে (camouflage) সুবিধা হয়। এরা অ্যামবুশ (ambush) করে শিকার ধরে থাকে। এদের খাবার সাধারনত ছোট মাছ ও অন্যান্য ছোট অমেরুদন্ডী প্রাণী। এরা জীবন সঙ্গীনি হিসেবে সারাজীবনের জন্য একটি মাছকেই বেছে নেই। এরা সাধারনত ডুবন্ত গাছের গুড়ি, বাকল অথবা ভাসমান কোন পাতায় ডিম পাড়ে।


অরিনোকো এঞ্জেল ফিস

Pterophyllum altum প্রজাতিটি অল্টাম বা অরিনোকো এঞ্জেল ফিস নামে পরিচিত। অরিনোকো নদীতেই এদের বিচরন সীমাবদ্ধ। এঞ্জেল ফিসের প্রজাতিগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় হয়ে থাকে। মুক্ত পরিবেশে এগুলো ৫০ সে. মি. ও অ্যাকুরিয়ামে ৪০ সে. মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের গাঁয়ের রঙ রূপালী বর্ণের, দেহে আড়াআড়ি বাদামী বা লাল রঙের তিনটা লম্বা দাগটানা থাকে। পাখনাগুলোতে থাকে লাল রঙের বিশেষ চিন্হ।


বামণ এঞ্জেল ফিস

Pterophyllum leopoldi প্রজাতিটি বামণ বা লম্বা নাক বা রোমান নাকের এঞ্জেল ফিস নামে পরিচিত। আমাজান নদী এবং এর শাখা রুপোনুনি নদী (Rupununi River) ও সোলিময়েস নদীতে (Solimoes River) এদের দেখতে পাওয়া যায়। এরা এঞ্জেল ফিস প্রজাতিগুলোর মাঝে সবচেয়ে ছোট ও আক্রমণাত্নক।


Halfblack Veil Angelfish


Sunset Blushing Veil Angelfish

Pterophyllum scalare প্রজাতিই সর্বাধিকভাবে এঞ্জেল ফিস বা স্বাদু পানির এঞ্জেল ফিস নামে পরিচিত। আমাজান নদী, সোলিময়েস নদী, এসেকুইবো নদী, আমাপা নদী (Amapa River) ও ওয়াপক নদীতে (Oyapock River) এদের সর্বাধিক বিচরন। অ্যাকুরিয়ামে এরা ২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটে থাকে। এদের প্রজাতিতে অনেক বৈচিত্র দেখা যায়। এদের মধ্যে Halfblack Veil Angelfish, Sunset Blushing Veil Angelfish, Koi Angelfish, Marble Angelfish ও Gold Pearlscale Angelfish উল্লেখযোগ্য।


Koi Angelfis


Marble Angelfish


Gold Pearlscale Angelfish

সুত্রঃ ইন্টারনেট
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29059411 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29059411 2009-12-15 18:51:06
গনহত্যাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭১
৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ৬৬ এর ছয়দফা আন্দোলন, ৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন, ৬৯ এর গন অভ্যুথ্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়, ৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চের অসহযোগ আন্দোলনসহ সকল গন্তান্ত্রিক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল আমাদের প্রিয় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে বাঙালিদের দমনের অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমনকারী পাকিস্তান বাহিনীতে ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, এবং ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন। ২৫ মার্চের রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত এ বিশেষ মোবাইল বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী বিকয়েললস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার মার্টার ভারি ও হালকা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। পশ্চিম দিক থেকে রেললাইন জুড়ে ৪১ ইউনিট, দক্ষিণ দিক জুড়ে ৮৮ ইউনিট এবং উত্তর দিক থেকে ২৬ ইউনিট কাজ শুরু করে। শুরু হয় বিশ্বের মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক ও ভয়ংকর গনহত্যা। তারা একে একে হত্যা করে আমাদের দেশের সূর্য সন্তান আমাদের শিক্ষক, আমাদের ছাত্রদের। এখনেই শেষ হয়ে যায় নি ইতিহাসের ঘৃণ্য এই গনহত্যা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যখন আমাদের স্বাধীনতার সূর্য উদীয়মান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামছরা শুরু করে দ্বিতীয় দফা গনহত্যা। ১৪ ডিসেম্বর তারা আমাদের জাতিকে মেধাশুন্য করার মানসে একে একে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে আমাদের শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সূর্যসন্তানদের।

শিক্ষক হত্যাঃ
২৫শে মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমান। তাকে তার বাসায় দুই আত্নীয়সহ হত্যা করা হয়। ফুলার রোডের ১২নং বাড়িতে হানা দিয়ে হানাদাররা নামিয়ে নিয়ে যায় অধ্যাপক সৈয়দ আলী নকিকে (সমাজ বিজ্ঞান)। তাঁকে গুলি করতে গিয়েও, পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উপরের তলার ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদিরকে গুলি করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ২৭শে মার্চ অধ্যাপক মুকতাদিরের লাশ পাওয়া যায় ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল), তাকে পরে প্লটনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাফন করা হয়। সলিমুল্লাহ হল এবং ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ্ হল) হানা দিয়ে সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ইংরেজীর অধ্যাপক কে এম মুনিমকে সেনারা প্রহার করে এবং ঢাকা হলে হত্যা করে গণিতের অধ্যাপক এ আর খান খাদিম আর অধ্যাপক শরাফত আলীকে। জগন্নাথ হলের মাঠের শেষ প্রান্তে অধ্যাপকদের বাংলোতে ঢুকে তারা অর্থনীতির অধ্যাপক মীর্জা হুদা এবং শহীদ মিনার এলাকায় ইতিহাসের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীরের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের নাজেহাল করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর যে সব সম্মানিত শিক্ষক শহীদ হনঃ
১. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ
২. ডঃ এ. এন. এম. মনিরুজ্জামান
৩. ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা
৪. এ. এন. মুনীর চৌধুরী
৫. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী
৬. ডঃ আবুল খায়ের
৭. ডঃ সিরাজুল হক খান
৮. রাশীদুল হাসান
৯. আনোয়ার পাশা
১০. ডঃ জি. সি. দেব
১১. ডঃ ফজলুর রহমান
১২. ডঃ ফয়জুল মহি
১৩. আব্দুল মুকতাদির
১৪. শরাফৎ আলী
১৫. সাদত আলী
১৬. এ. আর. খান খাদিম
১৭. সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য
১৮. অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য
১৯. মোহাম্মদ সাদেক (ইউনিভার্সিটি ল্যাবটরি স্কুল)
২০. ডাঃ মোহাম্মদ মর্তুজা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মেডিক্যাল অফিসার)

ছাত্র ছাত্রী হত্যাঃ
১৯৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলিতে “স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের” কর্মকান্ড পরিচালিত হত ইকবাল হল (পর সার্জেন্ট জহুরূল হক হল থেকে)। পাকিস্তানি অপারেশন সার্চ লাইটের ১নং লক্ষ্যবন্তু ছিল জহুরুল হক হল। ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পূর্বে ছাত্র লীগের প্রায় সব নেতাকর্মী হল ছেড়ে যান। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারা দিন রাত ঐ হলের উপর নীলক্ষেত রোড থেকে মার্টার, রকেট লঞ্চার, রিকয়েলস রাইফেল এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচন্ড আক্রমন পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এ মুনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, শুধু জহুরুল হক হলেই প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হন।
রাত বারটার পর ইউওটিসি এর দিকের দেয়াল ভেঙ্গে পাকবাহিনী ট্যাংক নিয়ে জগন্নাথ হলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং প্রথমেই মর্টার ছোড়ে উত্তর বাড়ির দিকে। সাথে সাথে অজস্র গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তারা ঢুকে পড়ে জগন্নাথ হলে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বাড়ির প্রতিটি কক্ষ অনুসন্ধান করে ছাত্রদের নির্বিচারে গুলি করে। সে রাতে জগন্নাথ হলে ৩৪ জন ছাত্র শহীদ হয়। জগন্নাথ হলের কিছু ছাত্র তখন রমনার কালী বাড়িতে থাকত। ফলে, প্রায় ৫/৬ জন ছাত্র সে রাতে সেখানে নিহত হয়। এদের মধ্যে শুধু অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র রমনীমোহন ভট্টাচার্য ব্যতীত অন্যদের নাম জানা যায় না। এছাড়া বহু সংখ্যাক অতিথিও নিহত হয় এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর কলেজের বাবুল পাল, জগন্নাথ কলেজের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ও অমরের নাম জানা যায়।
১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লাডের লেখা গ্রন্থ, “দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ” থেকে জানা যায় সে রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকোথন হয় তা থেকে জানা যায় ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০০ ছাত্র নিহত হয়।

কর্মচারী হত্যা
জহুরুল হক হল আক্রমনকারী বাহিনী ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রহরারত ইপিআর সদস্যদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। তারা শিক্ষকদের ক্লাব লাউঞ্জে আশ্রয়গ্রহণকারী ক্লাব কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলি গাজী এবং আবদুল মজিদকে হত্যা করে। টিএসসিতে নিহত কর্মচারীরা ছিলেন আবদুস সামাদ, আবদুস শহীদ, লাড্ডু লাল। রোকেয়া হল চত্তরে নিহত হন আহমদ আলী, আবদুল খালেক, নমী, মো: সোলায়মান খান, মোঃ নুরুল ইসলাম্, মোঃ হাফিজউদ্দিন, মোঃ চুন্নু মিয়া এবং তাদের পরিবার পরিজন।
যে বাহিনী শহীদ মিনার ও বাংলা একাডেমী আক্রমন করে তারাই ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) সংলগ্ন শিক্ষকদের আবাসে ও মধুসূদন দে’র বাড়িতে হামলা চালায়। সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ নং বাড়ির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। ২৩ নং নীলক্ষেত আবাসের ছাদে আশ্রয়গ্রহণকারী নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি পুলিশ কর্মচারী, প্রেসিডেন্ট হাউস (পুরাতন গনভবন) প্রহরারত বাঙালি ইপিআর সদস্য এবং নীলক্ষেত রেল সড়ক বস্তি থেকে আগত প্রায় ৫০ জনকে সৈন্যরা হত্যা করে লাশ ফেলে যায়। ২৫ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে তিনটি ধর্মস্থান ধ্বংস ও ঐ সব স্থানে হত্যা যজ্ঞ চালায়। তিনটি স্থান ছিল, কলা ভবন সংলগ্ন শিখ গুরুদ্বার, রমনার মাঠে দুটি কালি মন্দির এবং শহীদ মিনারের বিপরীত দিকে অবস্থিত শিব মন্দির। সে রাতে আরো নিহত হয় দর্শন বিভাগের কর্মচারী খগেন দে, তার পুত্র মতিলাল দে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সুশীল চন্দ্র দে, বোধিরাম, দাক্ষুরাম, ভীমরায়, মনিরাম, জহরলালা রাজভর, মনভরন রায়, মিস্ত্রি রাজভর, শংকর কুরী।

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29057683 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29057683 2009-12-12 19:27:02
মান্দারিন ফিস
মান্দারিন ফিস দেখতে ছোট, উজ্জ্বল বর্ণের ড্রাগনেট পরিবারের মাছ। প্রশান্ত মহাসাগরের রিয়ুকু দ্বীপে (Ryukyu Islands ) (জাপান)এই মাছের প্রাচুর্যতা দেখা যায়। এই মাছের দুটি প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়। Synchiropus splendidus প্রজাতি দেখতে নীল রঙের। ত্বকের Cyanophore নামক Chromatophores বর্ণকণিকার কারনে এরা নীল রঙের হয়। এদের ত্বকে আরো আছে আলো প্রতিফলনকারী কোষ, যা এই মাছকে করে তোলে আকর্ষণীয়। এদের আরেকটি প্রজাতির নাম S. picturatus।

মান্দারিন ফিস প্রবালের মাঝে, বিশেষকরে লেগুন এবং তীরবর্তী প্রবালের মাঝে বসবাস করতে পছন্দ করে। এরা ৬ সে. মি. পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এদের চলন খুব ধীর। এরা সাধারনত সাগরের তলানীতে খাবার খোঁজে। তাই সচারচর এদের দেখতে পাওয়া যায় না। এরা দিনের বেলায় খাবার শিকার করে থাকে। এদের প্রধাণ খাবার ক্ষুদ্র ক্রাস্টাসিয়া, গাস্ট্রপড (শামুক প্রজাতি), পলিকিট পোকা, অন্যান্য ছোট অমেরুদন্ডী প্রাণী এবং মাছের ডিম।
লোনা পানির একুরিয়াম ফিস হিসাবে এই মাছ খুব জনপ্রিয়। কিন্তু একুরিয়ামে এই মাছ রাখা খুব কষ্টসাধ্য। এরা খাবারের ব্যাপারে খুব সংবেদনশীল।

এই মাছের Scientific Classification:
Kingdom: Animalia
Phylum: Chordata
Class: Actinopterygii
Order: Perciformes
Family: Callionymidae
Genus: Synchiropus Gill, 1860
Species: S. splendidus

সূত্রঃ ইন্টারনেট]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29056903 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29056903 2009-12-11 03:56:53
জননী ও মাওলানা মতি ১. লোকটি মাওলানা মতি। মুখে ছোট ছোট কাঁচা পাকা দাড়ি, মাথায় জিন্নাহ টুপি। সন্ধ্যা হলেই সফেদ পাঞ্জাবীর উপর জিন্নাহ কোট চাপিয়ে, হারকিউলিক্স ব্রান্ডের নতুন সাইকেলখানা চালিয়ে অক্লান্ত ছুটে চলেন এক পাকি ক্যাম্প থেকে আর এক ক্যাম্পে। পেল্লাই পেল্লাই গোঁফওয়ালা খানসাহেবদের সাথে কী সব সলাপরামর্শ করেন। মাঝে মাঝে হো হো শয়তানী হাসিতে কেঁপে উঠে টেবিলখানা। চক চক করে উঠে মাওলানা মতির দুই চোখ। দুই হাতের তালু কচলাতে কচলাতে তাজিমের সাথে বিদায় নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। নিঃশব্দে ছুটে চলে হারকিউলিক্স ব্রান্ডের নতুন সাইকেলখানা। আল বদর বাহিনীতে নাম লেখানোর পর এই সাইকেলখানা পেয়েছেন মাওলানা মতি। আরো পেয়েছেন একখানা পাঁচ ব্যাটারিওয়ালা টর্চলাইট আর একখানা থ্রি নট থ্রি রাইফেল। নিঃশব্দে ছুটে চলে তার সাইকেলখানা। পাঁচ ব্যাটারিওয়ালা টর্চলাইটের বিদীর্ণ আলোয় বড় ভয়ংকর লাগে তার মুখের অবয়বটা।
এই বছর খানেক আগেও লোকটিকে অন্যরকম জানতাম। আমাদের মত যুবকদের দেখলেই এগিয়ে আসতেন। হাসিমুখে গল্প করতেন। ইসলামের গল্প, নবীজীর গল্প, সাহাবা অলি আল্লাহদের গল্প।বদর যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ, খন্দকের যুদ্ধে ইসলামের বীরত্ব গাঁথা। আমি তন্ময় হয়ে তার গল্প শুনতাম। খুব ভালো লাগতো সেই গল্পগুলি। তিনি যখন গাজী সালাহউদ্দীনের গল্প বলতেন, উত্তেজনায় আমার শরীরের রোমকূপগুলো খাড়া হয়ে যেত। ইশ! আমি যদি গাজীর মত বীর হতে পারতাম।
আমি বীর হতে পেরেছি কি না জানি না, তবে যোদ্ধা হয়েছি। আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমি আমার মাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি আমার বোনকে, বাবাকে, আমার দেশকে। আমি ভালোবাসি এই দেশের আকাশকে, বাতাসকে। এই দেশের মানুষগুলো আমার আত্নার আত্নীয়। তাদের জন্য আমি মুক্ত আকাশ, স্বাধীন মাটি আর শিশুর নিষ্পাপ হাসি আনবোই।
মাওলানা মতিকে আমি খুব ঘৃণা করি। তিনি এখন হায়েনাদের দোসর, মানুষরূপী জানোয়ার, শয়তান। নিঃশব্দে ছুটে চলে হারকিউলিক্স ব্রান্ডের নতুন সাইকেলখানা। তার সফেদ পাঞ্জাবীর বুক পকেটে বাঙালি যুবকদের নাম ঠিকানার ফর্দ। পাঞ্জাবীর ডান পকেটে সংখ্যালঘুদের আর বাম পকেটে বাঙালি বোনদের নামের লিস্টি। এখন আর তার কাছে কেও নিরাপদ নয়। নয় সে বাংলার হিন্দু, নয় সে মুসলমান। তিনি নতুন নতুন ফর্দ করেন, আর খানসাহেবদের ক্যাম্পে দিয়ে আসেন। খান সাহেবদের দাক্ষিণ্য পেয়ে আনন্দে বিগলিত হয়ে উঠেন, চক চক করে উঠে তার দুই চোখ। দুই হাতের তালু কচলাতে কচলাতে তাজিমের সাথে বিদায় নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। নিঃশব্দে ছুটে চলে হারকিউলিক্স ব্রান্ডের নতুন সাইকেলখানা। নিজের স্বজাতিকে হত্যার জন্য ধরে নিয়ে যান পাকি ক্যাম্পে, নিজের মা বোনকে তুলে দিয়ে আসেন পাকিদের ফুর্তির জন্য। হায়রে বাঙালি, হায়রে মুসলমান!
২. সাঁথিয়াতে আমাদের অপারেশনটি অবশেষে সফল হল।পাকিদের ক্যাম্পের সবকয়টা সেনা মরছে। ওদের সবগুলো ভারি অস্ত্র আমরা অক্ষত পেয়েছি। পেয়েছি চার বাক্স আর্জেস গ্রেনেড, গোলা বারুদ আর সপ্তাহ খানেক চলার মত খাদ্য রসদ।
আমরা এখন দশ জন। দুই জন মারাত্নক আহত। এক জনের বুকে আরেক জনের বাম পায়ে গুলি লেগেছে। একটু দূরে বন্ধু সাইফুলের লাশ পড়ে আছে। আহারে! আমাদের সাইফুল আজ লাশ হয়ে পড়ে আছে তার প্রিয় বাংলার মাটিতে। বাংলা মা পরম মমতায় সোঁদা গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছে তার গায়ে। টগবগে প্রাণবন্ত যুবক সাইফুল লাশ হয়ে পড়ে আছে। এই কি সেই ঢাকা হলের টগবগে সাইফুল! যার কথার ফুল ঝুরিতে চির সজিব থাকতো আমাদের আড্ডাগুলো। যার স্বপ্নময় বাংলাদেশের প্রত্যাশা আলোকিত করতো আমাদের ও। রক্তে মাখামাখি সাইফুলের শরীর, ক্ষতবিক্ষত সাইফুলের শরীর। ওর চোখ দুটি এখন ও খোলা। কি জানি, সেই চোখে হয়তো এখনো খেলা করছে স্বপ্ন স্বাধীন বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে না ক্ষুধা, অভাব, অবিচার। যেখানে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সবাই ভাই ভাই, সবারই এক পরিচয়; আমরা সবাই বাঙালি।
সাইফুল আমিও তোর মত ভালোবাসি এই বাংলাদেশকে। আমাদের নেতা শেখ মুজিবকে। আমি সাইফুলের চোখদুটি বুজিয়ে দেই। আমার কান্না চলে আসে। গত চার দিন এই এগারোটা মানুষ একবেলাও কিছু খায় নি। ক্ষুধা, মৃত্যু, শোক, বেদনার সাথে আমাদের নিত্য বসবাস। সাত কোটি বাঙালি আজ ক্ষুধিত, শোকার্ত, আশ্রয়হীন। আর কত রোগ, শোক, মৃত্যু, রক্ত আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন? আমার চোখে কান্না ঝরছে আঝোর ধারায়। বাঁধনহারা এ কান্না।
সাইফুলের বুক পকেটে একটি চিঠি পাওয়া গেল। ওর মাকে লিখেছিল। রক্তলাল ছেঁড়া চিঠিখানা আমি পড়লাম, তারপর কবির ভাই, তপু, আমরা সবাই। এ চিঠি যেন আমাদের সবারই মনের কথা। ওর চিঠি আমাদের সাহস দেয়, শক্তি যোগায়। আরো বেশি করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে মাকে, প্রিয় বাংলা দুঃখীনি মাকে।
মা
কেমন আছ? আমি ভালো আছি। সবসময় তোমার কথা মনে পড়ে। বাবা কেমন আছে? বাবার প্রেশারটা কি বেড়েছে? সানু কি ঠিক মত পড়াশুনা করছে, না কি শুধু দুস্টমি করে বেড়ায়? তুমি খুব কস্ট পেয়েছ তাই না, মা? তুমি যুদ্ধে আসতে দিতে না, তাই পালিয়ে এলাম। লক্ষী মা আমার! তুমি রাগ করো না। তোমার ছেলে স্বাধীন দেশ নিয়ে তোমার কোলে আবার ফিরে আসবে। আর যদি ফিরে না আসি, তবে সাত কোটি বাঙালি আর আমার নেতা শেখ মুজিবকে তোমার সন্তান ভেবে চির দিন ভালোবেসে যেও।
ইতি
তোমার সাইফুল

৩. এখন রাত সাড়ে নয়টা। তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছি মাকে দেখতে। বাবা চিঠি পাঠিয়েছিল, মা খুব অসুস্থ। সাইফুলের মত আমিও পালিয়ে গিয়েছিলাম যুদ্ধে। মা আমার চিন্তায় চন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই বুঝি তার সোনা মানিকের বুকে গুলি লেগেছে। এই বুঝি তার মানিকের জীবন নিভে গেছে।
আমার গ্রামটা আমি চিনতে পারছিলাম না। মাওলানা মতির আল বদর আর পাকিরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে গ্রামখানা। আমার পরিচিত সব মানুষজনকে ধরে ধরে নিয়ে লাইনে দাড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। লাশগুলোকে শকুন কুকুর দিয়ে খাইয়ে মাটি চাপা দিয়ে রেখেছে। বাড়ির পর বাড়ি পোড়া মাটি হয়েছে। গ্রামের যুবতী মেয়েদের পাকি ক্যাম্পে নিয়ে অত্যাচার শেষে হত্যা করেছে। বাতাসে পোড়ামাটি আর লাশের গন্ধ। কান পাতলে এখনো শোনা যায় গ্রামের মেয়েগুলোর আত্নচিৎকার। হায়রে মাওলানা মতি, হায়রে মুসলমান।
মা আমার পাতে লাউ শাক আর ভাত তুলে দিচ্ছিল। তখনই মাওলানা মতির পাঁচ ব্যাটারিওয়ালা টর্চলাইটের আলোয় আমাদের অন্ধকার বাড়িটা আলোকিত হয়ে উঠলো। মাওলানা মতি দড়জায় আঘাত করছে, হাসানের মা দড়জা খোল, শুনলাম তোমার ছাওয়াল নাকি ফিরছে, হাসান বাবাজীর সাথে একটু গল্প করতে এলাম, শেখ সাহেবের গল্প, বাংলাদেশের গল্প। মা তার বুকের মাঝে আমায় শক্ত করে আগলে ধরে, আমার সোনা মানিক, তোরে আমি মরবার দিমু না। পাকিরা দড়জায় বুট দিয়ে লাথির পর লাথি মারে, এই বুঝি দড়জা ভেঙ্গে যায়। আমার দুঃখীনি মা কাঁদে, আরো শক্ত করে বুকের মাঝে আগলে রাখতে চায়। আমারও চোখে জল চলে আসে। মা আমি তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29055259 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29055259 2009-12-08 03:19:29
তুমি আসবে বলে...... পূর্নতা পেতে চায় কবিতা
চোখের জলে ভেসে যায় জমাট ব্যর্থতা
আব্যক্ত ব্যথার অনলে দগ্ধ মন
স্বপ্ন খুঁজে ফেরে
অজস্র পথের মাঝে হাতড়ে বেড়ায়
চিরচেনা পথতারে
ধুলো পড়া স্মৃতি
চাপা পড়া নিঃশ্বাস
ফিরিতে চায় চুপিসারে......

হয় না তাহাদের ফেরা
পায় না চিরচেনা সে পথ
শুধু তুমি আসনি বলে......]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29052595 http://www.somewhereinblog.net/blog/amins/29052595 2009-12-02 20:01:52