খালেদা জিয়া যখন র্যাব গঠন করেন, তখন অনেক প্রশংসিত হন। বিএনপির অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীও তখন র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয় । কিন্তু র্যাবের ক্রসফায়ার নিয়া তাকে অনেক সমালোচনাও শুনতে হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর র্যাবের ক্রসফায়ার বন্ধ করার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু কেরানীগঞ্জে একজনকে ক্রসফায়ার দেয়ার মাধ্যমে র্যাবের ক্রসফায়ার যে বন্ধ হয় নাই তা-ই বোঝা গেল।
কেউ কেউ র্যাবের ক্রসফায়ার পছন্দ করেন, চান যে এই ব্যবস্থা চালু থাকুক। কেউ কেউ ক্রসফায়ার বন্ধের দাবি করেন। বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো র্যাবের ক্রসফায়ারকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে সমালোচনা করে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একই সাথে ক্রসফায়ার সমর্থন করি আবার করিও না। বিতর্কিত শোনালেও কথাটা সত্যি।
কেন ক্রসফায়ার সমর্থন করি ?
আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা আছে। একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে এত বেশি সময় লাগে যে, যিনি বিচার দাবি করেন শেষ পর্যন্ত তিনি মামলা করাটাকেই বোকামি বলে মনে করেন। দিনের পর দিন মামলার তারিখ পড়তে থাকে। সেই মামলা যদি হয় কোন তারকা সন্ত্রাসীর বিপক্ষে তাহলে তো সেই মামলায় জেতার সম্ভাবনা নাই। কেননা তারকা সন্ত্রাসীরা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের শেল্টারে থেকে তারকা হন। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলে অনেক অনেক আইনজীবী নেতা আছেন, তাদের দ্বিতীয় পেশা হল রাজনীতি। আইনজীবী + রাজনীতিবিদ এই সব নেতারা তারকা সন্ত্রাসীদের মামলা দেখভাল করেন। একই দল করার কারণে আইনজীবী ও তারকা সন্ত্রাসীর মধ্যে অনেক অনেক স্বার্থের যোগসাজস থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। ফলে তারকা সন্ত্রাসীর জন্য মামলা চালানো কোন ব্যাপার না।
অন্য দিকে ভুক্তভোগী বাদী ও তার সাক্ষীদের হুমকি ধামকি দিয়ে চাপের মুখে রাখা হয়। মামলার সাক্ষীরা ভয়ে আর সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে বিজ্ঞ বিচারক সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে তারকা সন্ত্রাসীকে মামলা থেকে অব্যহতি দিতে বাধ্য হন।
তারপর বাদী হন এলাকাছাড়া। তারকা সন্ত্রাসী আরও বড় তারকায় পরিণত হন। এখন তার বিরুদ্ধে মামলা করার সাহসও কারও থাকে না।
তার মানে দাঁড়াল এই, তারকা সন্ত্রাসী যত অপকর্মই করুক, আমাদের দেশের প্রচলিত আইনী ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না।
এই ধরনের তারকা সন্ত্রাসী অনেক অনেক খুন করেন, অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা করেন। মানুষের জমি জায়গা দখল করেন, মানুষের সম্ভ্রম এদের হাতের ময়লা। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি তাদের মূল পেশা।
আমাদের বিচার ব্যবস্থা এদের কিছু্ই করতে পারে না। আমি এদের ক্রসফায়ার সমর্থন করি। এদের ক্রসফায়ারে দেয়া ছাড়া কোন পথ খোলা নাই।
কেন ক্রসফায়ার সমর্থন করি না
মূলত ক্রসফায়ার হল, বিকল্প বিচার ব্যবস্থা। রায়ের আগেই বিচার। পুলিশ বা র্যাবের আইনগত ক্ষমতা নাই কারও বিচার করার। তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়াও উচিত না। তাহলে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে কাউকে ধরে এনে নির্যাতন চালাতে পারে। সে জন্য আইনে বলা আছে, গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামীকে আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।
আসামীর বিচার করবে বিজ্ঞ বিচারক। কিন্তু ক্রসফায়ার আমাদের বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদি বিচারকের বিচারের আগে একজনকে মৃতু্ূদণ্ড দিয়ে দেয় র্যাব, তবে কেন আর এই আদালত, কেন এই বিচার বিভাগ ? তার মানে হল, ক্রসফায়ার সরাসরি বিচারিক ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের হাতে বিচার ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার সামিল। তাহলে আর বিচার বিভাগ পৃথক করে লাভ হল কী ?
অন্য দিকে র্যাবের মধ্যে সবাই ভালো লোক সেটা তো বলা যায় না। কেউ যদি টাকা পয়সার বিনিময়ে কোন ভালো লোককে সন্ত্রাসী বানিয়ে ক্রসফায়ারে দেয় সেক্ষেত্রে কী হবে ? র্যাবের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে এই রকম অভিযোগও উঠেছে। তার মানে র্যাবের হাতে একটি চূড়ান্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যা আমাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। যে কোন সময় কোন নিরীহ মানুষের জান বলি হয়ে যেতে পারে র্যাবের কোন ভুল বা স্বার্থ চরিতার্থ করার কারণে।
এই কারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিচার বহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না। আমিও করি না।
আসলে কী করা দরকার ?
১.আসলে করা দরকার দ্রুত বিচার ব্যবস্থা। দিনের পর দিন তারিখ পড়তে পড়তে এক সময় বাদী বিচার পাওয়া সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠে। তাছাড়া তার পক্ষে দীর্ঘদিন আইনজীবীর খরচ যোগানোও বোঝা মনে হয়। তাই প্রতিটি মামলার জন্য নির্দিষ্ট কর্ম দিবস নির্ধারণ করে দেয়া জরুরী। বাদীকে প্রথমেই জানিয়ে দিতে হবে উনি কত দিনের মধ্যে এই মামলার বিচার পাবেন। ওই তারিখেই রায় ঘোষণা করে আসামীকে শাস্তি দিতে হবে।
২.আইনজীবীদের কোন নির্দিষ্ট ফি নাই। যার থেকে যা পারছেন, রাখছেন। মুহুরীদের বকশিশের কোন সীমা পরিসীমা নাই। অনেক সময় আইনজীবীরা নিজেদের স্বার্থেই মামলা দীর্ঘয়িত করেন। আইনজীবীকে টাকা দিতে দিতে ফতুর হয়ে যায় বাদী। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত আইনজীবীর ফি নির্ধরিত করে দেয়া। বাদীর জন্য সহনশীল পর্যায়ে রেখে আইনজীবীর ফি নির্ধারণ করতে হবে।
৩.অপরাধের সাথে জড়িতদের রাজনৈতিক শেল্টার দেয়া বন্ধ করতে হবে। বাস্তবে ঘটে উল্টোটা। মামলা হলে তারকা সন্ত্রাসীর পক্ষে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে মিটিং মিছিল হয়। বলা হয়, এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। দাবি আদায়ে বড় বড় কর্মসূচি দেয়া হয়। ফলে বাদী মামলা তো দূরের কথা, নিজের জান বাঁচানোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। এভাবেই একটি রাজনৈতিক দল তারকা সন্ত্রাসী বানানোর কারখানায় পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য তারকা সন্ত্রাসীদের দল থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ওই রাজনৈতিক দলকেই। তারকা সন্ত্রাসী বানানোর এই কারখানা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কেউ নেবে ?
৪. পুলিশ বাহিনীকে সঠিক ও দ্রুত তদন্ত করার জন্য ডেটলাইন বেঁধে দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
৫.একই আসামী যদি একাধিকবার একই অপরাধ করে, তবে তার ক্ষেত্রে জামিন দেয়া বন্ধ করতে হবে। দেখা যায়, জামিনে বেরিয়ে সেই তারকা সন্ত্রাসী বাদীর উপর চড়াও হয়। ফলে বাদী এলাকা ছেড়ে পালায়। আর আমাদের বিচার ব্যবস্থা সেখানে নীরবে চেয়ে থাকে।
জানি না, ক্রসফায়ার সঠিক নাকি বেঠিক। অনেক তারকা সন্ত্রাসীকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। মনে হয়, কারো কারো ক্ষেত্রে ক্রসফায়ার দেয়া ছাড়া কোন পথ খোলা নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

