০১. ছোটবেলার ইশপের গল্প :
সেই ছোট বেলায় শোনায় ইশপের গল্প মনে পড়ে গেল। এক জলাশয়ে অনেক ব্যাঙ বাস করত। একবার কতগুলো বালক খেলাচ্ছলে সেই জলাশয়ে পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল। বালকদের ছোঁড়া পাথরে অনেক ব্যাঙ মারা গেল, অনেক হল আহত। অবশেষে এক সাহসী ব্যাঙ উঠে এল কিনারে। বলল, তোমরা আমাদের গায়ে পাথর ছুঁড়ে মারছ কেন ?
বালকেরা বলল, এটা তো আমাদের কাছে খেলা।
ব্যাঙ বলল, ওটা তোমাদের জন্য খেলা হতে পারে। কিন্তু আমাদের জন্য মরণ।
০২. পরিবারেই প্রথম শুরু :
ভাই ও বোন খেতে বসেছে। ভাইটা ডানপিটে। বেয়াদব। তারপরও তার পাতে বড় মাছ, দুধ, ডিম সবই যায়। বোনটার পাতেও যায়, তবে সেটা পরিমাণে কম। বোনটা মনে করে এটাই নিয়ম। মা শেখায় তাকে এ নিয়ম।
ভাইটাও মনে করে, সে ছেলে বলে তার জন্য এই বাড়তি আদর যত্ন। শুরু হল বৈষম্য । মনের ভেতর জন্ম নিল এক নিপীড়নের ইতিহাস।
০৩. পাড়ার মোড় ও স্কুলের ফটক :
পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে টাংকি মারাটা কোন খারাপ কাজ না। একটা বয়সে এটা করা যেন অধিকার। আরও একটু লায়েক হওয়ার পর সেটা চলে যায় মেয়েদের স্কুলের ফটকে। দু হাতে দুটি গোলাপ ফুল আর চোখে সানগ্লাস গুঁজে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রোমিও। মেয়েদের স্কুল শুরুর সময় ও ছুটির সময় এই দৃশ্য সবাই দেখে। ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম নিবেদন শুরু হলেও শেষটায় এটাই হয়ে ওঠে নিপীড়নের প্রধান কেন্দ্র। এই ছোট ঘটনা থেকে ঘটে যায় কত বড় ঘটনা। যদি রোমিওটি হয় কোন প্রভাবশালীর সন্তান, তবে মেয়েটির মুখে এসিড পড়বে না তার গ্যারান্টি নেই। তুলে নিয়ে গিয়ে নগ্ন ছবি তোলা কিংবা শ্লীলতাহানি সব কিছু্ই ঘটতে পারে।
০৪. কলেজের রাজনীতি :
কলেজে এসে অনেকের মনে নতুন করে পাখা গজায়। তারা ভাবে তাদের যা কিছু সম্ভব সবই করে নিতে হবে। যদি সেটা হয় রাজনীতি তবে তো কলেজটাই তার। কত মেয়ে এই রাজনীতির চাপে পড়ে কলেজ ছেড়ে চলে যায় তার খবর কে রাখে ? নিঃসন্দেহে কলেজের চেয়ে দেশ বড়।
০৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন খেলা :
এখন দ্বিমুখী আক্রমণে থাকতে হয়। একজন ক্যাডার ভাই, আরেক জন চতুর শিক্ষক। তাদের দাবি না মানলে তো পড়াশোনার পাট চুকাতে হবে। সুতরাং হয় দাবি মেনে নাও, নচেৎ চলে যাও স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে। যে যেভাবে পারছে ম্যানেজ করছে। যারা পারছে না বা শেষ পর্যন্ত সহ্য করা যাচ্ছে না, যাচ্ছে আন্দোলনে।
অভিযোগ উঠছে, প্রমাণ হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। শিক্ষক বা ক্যাডার কারোই কিছু হয় না। কেবল আন্দোলন চলে।
০৬. বস বনাম সেক্রেটারি - ইঁদুর বিড়াল খেলা :
বসেরা ধরেই নেয় সেক্রেটারি তার সেক্রেট সব কাজের সঙ্গী। সুতরাং আবারও ম্যানেজ করার খেলা। হয় ম্যানেজ কর, নয় ম্যানেজ হও। নচেৎ পাট চুকাও তোমার। নিয়মের মধ্যে থাকতে না পারলে এই অফিস তোমার নয়।
০৭. সেই পুরোনো রাস্তা, সেই পুরোনো হাত :
সেই পুরোনো রাস্তা। সেই পুরোনো বাস। সেই পুরোনো গাদাগাদি। সেই পুরোনো হাত। নিশপিশে হাত। কখন কোথায় হামলে পড়বে কোন ঠিক নেই। এই হাতের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দাঁড়িয়ে থাক ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য। কখন ভীড় কমবে বাসে, অথবা সিএনজি অটো রিক্সা ধরে বাড়ি ফেরা।
০৮. অবশেষে আইন এবং তারপর :
উচ্চ আদালত যৌন নিপীড়নের জন্য কিছু নীতিমালা দিয়েছে। সেটা নিয়ে কী হাসাহাসি ? এই দেশে এর চেয়ে বেশি মস্করা হয় নি কখনও।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অনেক পণ্ডিত আছেন, মঞ্জুরি কমিশন আছে এবং সবশেষে আছে সংসদ। তারা কেউ কোন নীতিমালা করতে পারেনি। তারা একমতও হতে পারেনি।
একদিন আইন হবে সংসদে। সেই আইনে কোন কোন রোমিও আটকাও পড়বে। কিন্তু যে সমাজে সব কিছুই কেড়ে নেওয়ার বিধান, সেই সমাজে নিপীড়ক কি কমবে ? এখানে জমি দখল দিতে হয়, টেন্ডার দখল করতে হয়, চাকুরি দখল করতে হয়, প্রতিপত্তি দখল করতে হয়, নেতৃত্ব দখল করতে হয়, পুরস্কার দখল করতে হয়, রাজনীতি দখল করতে হয়, তবে কেন নারী নয় ? সব কিছু পাওয়ার জন্য জবরদস্তি করার এই যে সংস্কৃতি, এই সংস্কৃতিই বানাচ্ছে একেক জন নিপীড়ক। মনের কোণে বাসা বাঁধা সেই জবরদস্তি করার মানসিকতা থেকেই নারীর প্রতিও হিংস্র থাবা মেলে আসছে নিপীড়ক রোমিও।
যে সমাজ এই নিপীড়ক বানাচ্ছে, সে সমাজ বদলাতে হলে আমাদের আরও সংগ্রাম করতে হবে। বন্ধ করতে হবে সকল প্রকার জবরদস্তি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। এ এক দীর্ঘ পদযাত্রা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

