স্কুল ও কলেজ জীবনে মোটামুটি ফুলবানু-বর্জিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। কোন একটা অদৃশ্য কারণে ফুলবানুরা আমাকে পছন্দ করত না।
প্রাইভেট স্যারের যে ব্যাচে ভর্তি হয়েছি, দেখেছি সেখানে সব লুলবাবু কিন্তু ফুলবানু একটাও নাই।
তবে উপরওয়ালা বোধহয় আমার জন্য সঞ্চয় হিসাব খুলেছিলেন। এত দিনের ফুলবানু-বর্জিত জীবনের সঞ্চয় হিসাব ভাঙ্গানো শুরু হল, যখন এম.এ প্রথম পর্ব ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলাম জগন্নাথ কলেজে।
ভর্তি হইয়াই আমি পুরা টাসকি। নারায়ণগঞ্জ থেকে মাত্র ৩ জন লুলবাবু এবং ১৬ জন ফুলবানু ভর্তি হয়েছে। ৩ জন লুলবাবুর মধ্যে আমিও একজন। অন্য ২ জনের মধ্যে ১ জন্য ক্লাসে আসে না, চেহারা দেখি নাই জীবনে, ফুলবানুদের কাছে পরবর্তী সময়ে তার চেহারার বর্ণনা শুনেছি মাত্র। অপরজন মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু কারো সাথে মেশে না। ফলে ১৬ জন ফুলবানুর বিপরীতে আমি একা লুলবাবু।
আমার এক মামা আমাকে হিতোপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, কখনও ক্লাসমেটরে পাত্তা দিবি না, ও গুলো বড়দের খাবার।
মামার হিতোপদেশ মনে করে ১৬ জনের কাউকেই পাত্তা দিলাম না। বাসে, ট্রেনে বা লঞ্চে যাওয়া আসা করি। তারা আমার দিকে তাকায়, আমিও তাদের দিকে তাকাই। কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলি না। সপ্তাহখানেক পরে ওদের দলের এক মৈনাক পর্বত আমার কাছে এল, জিজ্ঞেস করল, আমি নারায়ণগঞ্জ কোথায় থাকি এবং তাদের ক্লাসমেট কিনা। আমি মৈনাক পর্বতকে নিশ্চিত করলাম যে, তার অনুমান সঠিক - আমি তাদের ক্লাসমেট।
ব্যাস, কাজ হয়ে গেল। পরবর্তী সপ্তাহে আমি ওদের দলে ভিড়ে গেলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে ১৬ জন দলের মধ্যে ২ ভাগ হয়ে গেছে। ৮ জন হুজুরাইন ধরনের মহিলা। তারা আমার সাথে পারত পক্ষে কথা বলে না। তারা অন্য ছেলেদের সাথেও তেমন মেশে না। বাকি ৮ জন সবার সাথেই মেশে।
৮ জন ফুলবানু ও আমি লুলবাবু মিলে ৯ জনের একটা দল হয়ে গেলাম। কয় দিন পর এক ফুলবানুর বিয়ে হয়ে গেল। এবার আমাদের দলটি হল ৮ জনের।
আমরা ৮ জন একসাথে ক্লাস করি, আড্ডা দেই, আসা যাওয়া করি। প্রথম পর্বে একটা পেপার ছিল ইংরেজি গ্রামার। ওরা একদিন বলল, কলেজের এক স্যারের কাছে এই পেপারটা পড়া উচিত। ওকে, আমি রাজি হলাম।
স্যারের বাসা মিরপুর ১১ নম্বরে। নারায়ণগঞ্জ থেকে যেতে ২ ঘণ্টা লাগে। স্যারের কাছে পড়া শুরু হয় সকাল ১১ টায়। আমরা ৯টার ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে রওয়ানা হই। স্যারের কাছে পড়া শেষ করতে করতে দুপুর ১টা বেজে যায়।
ওরা বলল, দুপুরে কোন হোটেলে খাওয়া দরকার। প্রথম দিন আমি ভড়কে গেলাম। ধরে নিলাম, খাবারের বিলটা পুরা আমার পকেটের উপর দিয়া যাবে।
তখন আমি একটা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র পড়িয়ে হাজার তিনেক টাকা পাই। সেই টাকা থেকে ২ হাজার ছিল পকেটে। আল্লাহ ভরসা করে ঢুকে পড়লাম কাছের একটা হোটেলে।
ওরা পরামর্শ করা শুরু করল কী খাওয়া যায়। আমি পাত্তাই পেলাম না। ওরাই অর্ডার দিয়ে ফেলল। টেনশনে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। ২ হাজার টাকায় কুলাবে তো ?
কাচ্চি বিরিয়ানি আর মুরগির মাংস দিয়ে গেল প্রত্যেকের সামনে। বার বার এইচ.এস.সি তে পড়া বিখ্যাত গল্প লাঞ্চনের কথা মনে পড়ল। ভাবলাম, যদি বিল কম পড়ে ওই গল্পের মতো ঘড়ি খুলে দেব। কিন্তু আমার হাতের ঘড়ি যেই পুরাতন, আমার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে কি না কে জানে।
খাচ্ছি আর আমার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। ওরা সবাই মজা করে খাচ্ছে আর গল্প করছে। আমার দিকে তাকাচ্ছেও না। অবশেষে খাওয়া শেষ হল। এবার বিল দেয়ার পালা।
মৈনাক পর্বত বলল, শামীম, বিলটা দে। তুই তো আমাদের খাওয়ালি।
ওয়েটার বিল নিয়ে এল। ভয়ে ভয়ে বিলের দিকে তাকালাম। না, বেশি আসেনি, সাড়ে আটশ'র মতো। ২টা ৫০০ টাকার নোট দিলাম। ওয়েটারের টিপসসহ ৯০০ নেমে গেল আমার পকেট থেকে।
মিরপুর থেকে দোতলা বাসে আসতাম গুলিস্তান। দুপুরের দিকে দোতলায় তেমন যাত্রী থাকত না বলে ফুলবানুরা দোতলায় উঠত। আমিও দোতলায় বসতাম।
বাসে ওঠার পরই দেখি মৈনাক পর্বত আমাকে টাকা সাধে। কী ব্যাপার, কিসের টাকা ? তখন ও আমাকে বুঝিয়ে বলল, আমরা স্যারের কাছে ৪ মাস পড়ব। প্রতিদিন দুপুরে হোটেলে খেতে হবে। বিলটা তুই দিস, পরে আমরা আমাদের অংশ শোধ করে দেব।
ওরা সবাই যার যার অংশের বিল দিয়ে দিল। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাহলে আমার উপর দিয়ে যায়নি।
এই নিয়মে আমরা সপ্তাহে ৩ দিন সেই হোটেলে খাই। আমি বিল দেই। পরে ওদের কাছে বলি, ওরা হিসেব করে প্রত্যেকে টাকা দিয়ে দেয়।
কিন্তু হোটেল মালিক ও ওয়েটারদের ব্যবহার বদলে গেল ১৫ দিনের মধ্যে। প্রত্যেকবার খাওয়ার পর মোটা অংকের বিল ছাড়াও ভালো টিপস দিতাম আমি। ফলে তারা ধরে নিয়েছিল, আমি কোন কোটিপতির সন্তান, আমার পকেট ভর্তি অনেক টাকা, বাপের টাকায় আমার বান্ধবীদের খাওয়াই।
আমি হোটেলে ঢোকার মুখেই জোরে স্যালুট দিত এক ওয়েটার। আমার জন্য ফ্রি স্পেশাল শরবত করে দিত। মালিক নিজে উঠে এসে আমার খোঁজ খবর নিত। আমার হাত ধোওয়ানোর জন্য এক ওয়েটার গরম পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাত মোছানোর জন্য বিশেষ টিসু্য পেপার কিনে এনেছিল।
মাসখানেক পরেই আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ফুলবানুরা ইচ্ছে মতো অর্ডার দিত এবং খেত। তারপর ওরা হা হা হি হি করে গল্প করত। আমি একটু ধীরে খেতাম। ওরা উঠে বেরিয়ে গেলে সবার শেষে বিল দিয়ে বেরুতাম আমি। আমি কত বিল দিচ্ছি ওরা কেউ খেয়াল করত না।
বাসে উঠেই যথারীতি ওরা বিল কত জিজ্ঞেস করত। আমি বাড়িয়ে বলতাম। এমন বাড়িয়ে বলতাম যে, আমার স্যারের কাছে যাওয়া-আসার খরচ ও খাওয়ার খরচ উঠেও কিছু টাকা পকেটে থাকত। পরে আমি ওদের আইসক্রীম খাওয়াতাম।
কিছু দিনের মধ্যে হাতখোলা খরুচে লোক বলে ফুলবানুরা আমার সুনাম ছড়িয়ে দিল।
বাকি ৩ মাস ওদের টাকার ওপরেই আমি বেশ হেসে খেলে ভেসে চলে গেলাম।
আহা ! কী সব দিন ছিল
(অফ টপিক : এই কাহিনীটা পরে কোন এক ফুলবানুর বিয়েতে ফাঁস করে দিয়েছিলাম। পারলে ওরা আমার চুল ছিঁড়ে নেয় আর কি ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

