somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফুলবানুদের ধরা খাওয়ার কাহিনী (ফুলবানুদের জন্য অবশ্য পাঠ্য, লুলবাবুরা উঁকি না মারলেও চলবে)

৩০ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ২:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্কুল ও কলেজ জীবনে মোটামুটি ফুলবানু-বর্জিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। কোন একটা অদৃশ্য কারণে ফুলবানুরা আমাকে পছন্দ করত না। X(
প্রাইভেট স্যারের যে ব্যাচে ভর্তি হয়েছি, দেখেছি সেখানে সব লুলবাবু কিন্তু ফুলবানু একটাও নাই। X( নাটকের দলে কাজ করেছি, কিন্তু ফুলবানুরা সব বড় ভাইদের সঙ্গ উপভোগে ব্যস্ত। আমরা পুলাপাইনরা ফাইফরমাস খেটেছি মাঝে মধ্যে। :((
তবে উপরওয়ালা বোধহয় আমার জন্য সঞ্চয় হিসাব খুলেছিলেন। এত দিনের ফুলবানু-বর্জিত জীবনের সঞ্চয় হিসাব ভাঙ্গানো শুরু হল, যখন এম.এ প্রথম পর্ব ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলাম জগন্নাথ কলেজে।
ভর্তি হইয়াই আমি পুরা টাসকি। নারায়ণগঞ্জ থেকে মাত্র ৩ জন লুলবাবু এবং ১৬ জন ফুলবানু ভর্তি হয়েছে। ৩ জন লুলবাবুর মধ্যে আমিও একজন। অন্য ২ জনের মধ্যে ১ জন্য ক্লাসে আসে না, চেহারা দেখি নাই জীবনে, ফুলবানুদের কাছে পরবর্তী সময়ে তার চেহারার বর্ণনা শুনেছি মাত্র। অপরজন মাঝে মাঝে আসে, কিন্তু কারো সাথে মেশে না। ফলে ১৬ জন ফুলবানুর বিপরীতে আমি একা লুলবাবু। :P
আমার এক মামা আমাকে হিতোপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, কখনও ক্লাসমেটরে পাত্তা দিবি না, ও গুলো বড়দের খাবার। :D
মামার হিতোপদেশ মনে করে ১৬ জনের কাউকেই পাত্তা দিলাম না। বাসে, ট্রেনে বা লঞ্চে যাওয়া আসা করি। তারা আমার দিকে তাকায়, আমিও তাদের দিকে তাকাই। কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলি না। সপ্তাহখানেক পরে ওদের দলের এক মৈনাক পর্বত আমার কাছে এল, জিজ্ঞেস করল, আমি নারায়ণগঞ্জ কোথায় থাকি এবং তাদের ক্লাসমেট কিনা। আমি মৈনাক পর্বতকে নিশ্চিত করলাম যে, তার অনুমান সঠিক - আমি তাদের ক্লাসমেট।
ব্যাস, কাজ হয়ে গেল। পরবর্তী সপ্তাহে আমি ওদের দলে ভিড়ে গেলাম। কিন্তু ইতিমধ্যে ১৬ জন দলের মধ্যে ২ ভাগ হয়ে গেছে। ৮ জন হুজুরাইন ধরনের মহিলা। তারা আমার সাথে পারত পক্ষে কথা বলে না। তারা অন্য ছেলেদের সাথেও তেমন মেশে না। বাকি ৮ জন সবার সাথেই মেশে।
৮ জন ফুলবানু ও আমি লুলবাবু মিলে ৯ জনের একটা দল হয়ে গেলাম। কয় দিন পর এক ফুলবানুর বিয়ে হয়ে গেল। এবার আমাদের দলটি হল ৮ জনের।
আমরা ৮ জন একসাথে ক্লাস করি, আড্ডা দেই, আসা যাওয়া করি। প্রথম পর্বে একটা পেপার ছিল ইংরেজি গ্রামার। ওরা একদিন বলল, কলেজের এক স্যারের কাছে এই পেপারটা পড়া উচিত। ওকে, আমি রাজি হলাম।
স্যারের বাসা মিরপুর ১১ নম্বরে। নারায়ণগঞ্জ থেকে যেতে ২ ঘণ্টা লাগে। স্যারের কাছে পড়া শুরু হয় সকাল ১১ টায়। আমরা ৯টার ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ থেকে রওয়ানা হই। স্যারের কাছে পড়া শেষ করতে করতে দুপুর ১টা বেজে যায়।
ওরা বলল, দুপুরে কোন হোটেলে খাওয়া দরকার। প্রথম দিন আমি ভড়কে গেলাম। ধরে নিলাম, খাবারের বিলটা পুরা আমার পকেটের উপর দিয়া যাবে।
তখন আমি একটা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র পড়িয়ে হাজার তিনেক টাকা পাই। সেই টাকা থেকে ২ হাজার ছিল পকেটে। আল্লাহ ভরসা করে ঢুকে পড়লাম কাছের একটা হোটেলে।
ওরা পরামর্শ করা শুরু করল কী খাওয়া যায়। আমি পাত্তাই পেলাম না। ওরাই অর্ডার দিয়ে ফেলল। টেনশনে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। ২ হাজার টাকায় কুলাবে তো ?
কাচ্চি বিরিয়ানি আর মুরগির মাংস দিয়ে গেল প্রত্যেকের সামনে। বার বার এইচ.এস.সি তে পড়া বিখ্যাত গল্প লাঞ্চনের কথা মনে পড়ল। ভাবলাম, যদি বিল কম পড়ে ওই গল্পের মতো ঘড়ি খুলে দেব। কিন্তু আমার হাতের ঘড়ি যেই পুরাতন, আমার মুখের উপর ছুঁড়ে মারবে কি না কে জানে।
খাচ্ছি আর আমার শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। ওরা সবাই মজা করে খাচ্ছে আর গল্প করছে। আমার দিকে তাকাচ্ছেও না। অবশেষে খাওয়া শেষ হল। এবার বিল দেয়ার পালা। :|
মৈনাক পর্বত বলল, শামীম, বিলটা দে। তুই তো আমাদের খাওয়ালি। :-*
ওয়েটার বিল নিয়ে এল। ভয়ে ভয়ে বিলের দিকে তাকালাম। না, বেশি আসেনি, সাড়ে আটশ'র মতো। ২টা ৫০০ টাকার নোট দিলাম। ওয়েটারের টিপসসহ ৯০০ নেমে গেল আমার পকেট থেকে।
মিরপুর থেকে দোতলা বাসে আসতাম গুলিস্তান। দুপুরের দিকে দোতলায় তেমন যাত্রী থাকত না বলে ফুলবানুরা দোতলায় উঠত। আমিও দোতলায় বসতাম।
বাসে ওঠার পরই দেখি মৈনাক পর্বত আমাকে টাকা সাধে। কী ব্যাপার, কিসের টাকা ? তখন ও আমাকে বুঝিয়ে বলল, আমরা স্যারের কাছে ৪ মাস পড়ব। প্রতিদিন দুপুরে হোটেলে খেতে হবে। বিলটা তুই দিস, পরে আমরা আমাদের অংশ শোধ করে দেব।
ওরা সবাই যার যার অংশের বিল দিয়ে দিল। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাহলে আমার উপর দিয়ে যায়নি।
এই নিয়মে আমরা সপ্তাহে ৩ দিন সেই হোটেলে খাই। আমি বিল দেই। পরে ওদের কাছে বলি, ওরা হিসেব করে প্রত্যেকে টাকা দিয়ে দেয়।
কিন্তু হোটেল মালিক ও ওয়েটারদের ব্যবহার বদলে গেল ১৫ দিনের মধ্যে। প্রত্যেকবার খাওয়ার পর মোটা অংকের বিল ছাড়াও ভালো টিপস দিতাম আমি। ফলে তারা ধরে নিয়েছিল, আমি কোন কোটিপতির সন্তান, আমার পকেট ভর্তি অনেক টাকা, বাপের টাকায় আমার বান্ধবীদের খাওয়াই। ;)
আমি হোটেলে ঢোকার মুখেই জোরে স্যালুট দিত এক ওয়েটার। আমার জন্য ফ্রি স্পেশাল শরবত করে দিত। মালিক নিজে উঠে এসে আমার খোঁজ খবর নিত। আমার হাত ধোওয়ানোর জন্য এক ওয়েটার গরম পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাত মোছানোর জন্য বিশেষ টিসু্য পেপার কিনে এনেছিল। B-)
মাসখানেক পরেই আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ফুলবানুরা ইচ্ছে মতো অর্ডার দিত এবং খেত। তারপর ওরা হা হা হি হি করে গল্প করত। আমি একটু ধীরে খেতাম। ওরা উঠে বেরিয়ে গেলে সবার শেষে বিল দিয়ে বেরুতাম আমি। আমি কত বিল দিচ্ছি ওরা কেউ খেয়াল করত না।
বাসে উঠেই যথারীতি ওরা বিল কত জিজ্ঞেস করত। আমি বাড়িয়ে বলতাম। এমন বাড়িয়ে বলতাম যে, আমার স্যারের কাছে যাওয়া-আসার খরচ ও খাওয়ার খরচ উঠেও কিছু টাকা পকেটে থাকত। পরে আমি ওদের আইসক্রীম খাওয়াতাম।
কিছু দিনের মধ্যে হাতখোলা খরুচে লোক বলে ফুলবানুরা আমার সুনাম ছড়িয়ে দিল।
বাকি ৩ মাস ওদের টাকার ওপরেই আমি বেশ হেসে খেলে ভেসে চলে গেলাম।
আহা ! কী সব দিন ছিল /:)

(অফ টপিক : এই কাহিনীটা পরে কোন এক ফুলবানুর বিয়েতে ফাঁস করে দিয়েছিলাম। পারলে ওরা আমার চুল ছিঁড়ে নেয় আর কি । :D থাক সেই কাহিনী আরেক দিন বলা যাবে।)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ২:৫৭
৪৮টি মন্তব্য ৩৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×