আসছে সংযমের মাস। নিজের প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাস। সকল ধরনের ভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখাই তো সংযম।
স্বাভাবিকভাবে আমরা যে পরিমাণ খাদ্য বা ভোগ বিলাস করি, সংযমের মাসে তার থেকে কম পরিমাণ ভোগ করার কথা। মূলত এই মাসটির প্রচলন বা জন্ম সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে।
কেন করব সংযম ?
আমাদের ব্যবসায়ী ভাইয়েরা সরকার মানেন না। সরকারের কোন পরামর্শ মানেন না। তারা নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়েছেন। আলু, চিনি, ডাল, তেলসহ রমজানে অধিক ব্যবহার হয় যে সব খাদ্য, সেগুলির দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। দাম বাড়ার একমাত্র কারণ, ব্যবসায়ী ভাইয়েরা আমাদের সংযমের নমুনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তারা ভালো করেই জানেন, দাম যতই হউক, আমরা এই সব পণ্য কিনতেই থাকব। সুতরাং সংযমের মাসের এই সুযোগটুকু তারা পুরো মাত্রায় গ্রহণ করেছেন।
ধর্মীয় দিক থেকে মানুষকে ভোগ থেকে বিরত থাকার চর্চা করার জন্য সংযমের মাসটির প্রচলন হয়েছে। যারা না খেয়ে থাকে তাদের দুঃখ কষ্ট বোঝার জন্য আমরা দিনের বেলা না খেয়ে থাকি । তাই আমাদের না খেয়ে থাকা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা না খেয়ে থাকা দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর্দশার সাথী হব।
অপচয় করে লাভ কী ? বরং সঞ্চয়ই একটা মানুষের ভবিষ্যৎকে নিশ্চিন্ত করে। তাই অনর্থক অপচয় করে সংযমের মাসে মূলনীতির বিপক্ষে কাজ করে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকেই নষ্ট করি।
খাবার-দাবারে সংযম
সেহেরী ও ইফতারে কাড়ি কাড়ি খাবার খাওয়া সংযমের মাসের শিক্ষা নয়। বরং যতটুকু না হলে চলে না, ততটুকু করাই ভালো। সামাজিকতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে মিতব্যয়ী হলে নিজেরই লাভ। কিন্তু কিপটে হওয়া উচিত না।
ইফতারি থেকে সামান্য অংশ প্রতিদিন কোন গরীব মানুষকে দান করা উচিত। তার অংশটুকু রেখেই খাওয়া দাওয়া করা উচিত। মূলত গরীব দুঃখীর কষ্ট বোঝার জন্যই তো সংযমের মাস।
অন্য দিকে ইফতার পার্টির নাম করে কাড়ি কাড়ি খাবার নষ্ট করার রেওয়াজটি আমাদের বাদ দিতে হবে। ইফতার পার্টির মধ্যে সংযমের চেতনা ধারণ করতে হবে।
পণ্য কেনাকাটায় সংযম
মিডিয়ার কল্যাণে আমরা অনেক সময় আতঙ্কিত হয়ে কিনি। আরও বাড়তে পারে - এই জাতীয় হুংকারে আমরা নেতিয়ে পড়ি। পণ্য কিনে মজুদ করতে থাকি।
যারা ধর্ম পালন করেন এবং মানেন যে রেজেক আল্লাহর তরফ থেকে আসে, তারা তো অনর্থক আতঙ্কিত হতে পারেন না। তার মানে হল, আচরণই প্রমাণ করে দেয়, আমাদের ঈমানের জোর কতটুকু।
অন্য দিকে ব্যবসায়ীরা আমাদের এই আচরণের সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেন। সংযমের মাসে আমাদের অসংযমী আচরণের জন্য তারা অতি মুনাফা অর্জন করে ।
যে সব পণ্যে দাম বাড়ছে এবং বাড়তে থাকবে, সে সব পণ্যের বিকল্প কী হতে পারে, তা ভেবে বের করতে হবে। যেমন : বেগুনের কেজি ৮০ হলেও বেগুনী খাইতে হইবে - এই গোয়ার্তুমি বিক্রেতাকে লাভবান করে, ক্ষতি করে ক্রেতার। অথচ বেগুনের বিকল্প তরকারী বা বেগুনীর বিকল্প খাদ্য নির্বাচন করা সম্ভব।
সেহেরী ও ইফতারিতে বিকল্প খাদ্য নির্বাচন করলে সেটা সেহেরী ও ইফতারির একঘেয়েমিও দূর করবে।
একই কথা বিদেশী পণ্য কেনার সময়েও প্রযোজ্য। যে পণ্য দেশি আছে, সেটা বিদেশী কেনার কোন মানে নাই। দেশকে ভালোবাসলে দেশী পণ্যকেও ভালোবাসা উচিত। কেবল কেবল দেশকে ভালোবাসলাম কিন্তু দেশী পণ্যকে ভালোবাসলাম না, এটা এক ধরনের মোনাফেকি। তবে বিদেশী পণ্যের দাম দেশী পণ্যের চেয়ে কম ও মানে ভালো হলে মানুষ দেশী পণ্য ছেড়ে বিদেশী পণ্য কিনবেই। যারা দেশী পণ্য তৈরি করেন, তাদের এই কথাটা মাথায় রাখা উচিত।
ঈদের কেনা-কাটায় সংযম
সংযমের মাসের শেষে একটা উৎসব পালিত হয়। সেই উৎসবের কারণে সংযমের সব চর্চ ভেস্তে যায়। কে কিভাবে কত বেশি অপচয় করতে পারে তার একটা মহড়া হয়ে যায় ঈদ উৎসবে। তাহলে আর এক মাস সংযম কেন ?
তাই ঈদের কেনাকাটার ক্ষেত্রেও সংযমের মাসের ছাপ থাকা উচিত। আর থাকা উচিত সেইসব গরীব দুঃখী মানুষের জন্য একটি বিশেষ অংশ। কেননা, গরীব দুঃখী মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে বোঝার শিক্ষা নিয়ে সংযমের মাস আসে।
অন্য দিকে রমজানের শেষ ১০ দিনে ঈদ পালন করার জন্য মানুষ কুত্তা-পাগল হয়ে যায়। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন-জখম বেড়ে যায়। ঈদের বাড়তি খরচ যোগাতে কে কোন দিক থেকে কাকে মেরে খাবে সেই চর্চা শুরু হয়। এই হল আমাদের সংযমের নমুনা । তাই অনর্থক মার্কেটে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। আর মার্কেটে গেলে অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে । সেটাও একটা সংযম।
শেষ কথা :
একটা মাস সংযমের মাস হিসেবে পালন করা হয়। বাকী ১১ মাস সংযমের মাস নয়। কিন্তু বাস্তবে সংযমের মাসে আমরা অসংযমী আচরণ করি বেশি। খাবার, কেনাকাটা ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে কোন ভাবেই সংযমী হতে পারি না। সেটা আমাদের আচরণগত সমস্যা। এই সমস্যা থেকে বেরুতে না পারলে আমরা যতই সংযমের মাস বলে রমজানকে পালন করি না কেন , সংযম পালন হবে না কোন দিনও।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

