অনেক ছোট বেলার ঘটনা হলেও তার কাছ থেকে পাওয়া অনেক নৈতিক শিক্ষা এখনও ভুলে যাইনি।
এক দিনের ঘটনা বলি। আমাদের পড়ানো শেষ হয়েছে। মা চা নাস্তা পাঠিয়ে হুজুরের কাছে আমাদের বিষয়ে খোঁজ খবর করছেন। আমরা হুজুরের সামনে বসে আছি। হুজুর অনেক হাদিস কোরআনের কথা বলে যাচ্ছেন। মা আড়ালে দাঁড়িয়ে হুজুরের কথা শুনে যাচ্ছেন।
এক সময় মা জানতে চাইলেন, হুজুর, সৎ লোক কিভাবে চিনব ?
হুজুর বললেন, খুব সহজ। তার আয় দেখবেন এবং তারপর তার ব্যয় করার ধরণ দেখবেন। যদি দেখেন তার আয়ের চেয়ে ব্যয়ের ভাগ বেশি, তাহলে বুঝবেন তিনি সৎ লোক নন। তার অসৎ আয় আছে।
আমার মা আরও জানতে চাইলেন, অসৎ লোকের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে ?
হুজুর বললেন, অসৎ লোককে আঘাত দিয়ে কোন কথা বলা ঠিক হবে না। তবে তার সাথে সম্পর্ক না রাখাই ভালো। তার বাড়িতে যাওয়া, খাবার খাওয়া কিংবা তার সাথে বন্ধুত্ব সব কিছুই বাদ দিতে হবে। কেননা, অসৎ লোকের সাথে মিশতে থাকলে এক সময় নিজেই অসৎ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে।
আরেক দিন হুজুর বলেছিলেন, কোন লোক কী পোশাক পরে আছে, তাতে বোঝা যায় না, সে কেমন। সে সৎ নাকি অসৎ তা বোঝার জন্য তার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করে দেখতে হবে। যদি আর্থিক ব্যাপারে তার জবান ঠিক না থাকে, তবে বুঝতে হবে তিনি সৎ লোক নন।
অনেক ছোটকালের হুজুরের এই সদুপদেশগুলো এখনও আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
আমাদের সততা :
হুজুরের কাছে পড়ার সময়ই সেই ছোটকালে দাড়ি-টুপি পরা লোক দেখলেই সৎ লোক বলে ধরে নিতাম। আজ জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এসে বুঝতে পারি, সততার সাথে লেবাসের কোন সম্পর্ক নাই।
উপরের এই ছবির লোকটাকে দেখে বহু দিন আগের হুজুরের সৎ লোকের সংজ্ঞা মনে পড়ে গেল।
এই লোকটি বিজি প্রেসের কর্মচারী । নাম আবদুল জলিল। তিনি ২৮ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার হয়েছেন। সম্ভবত পাশের ওই ট্রাঙ্কে তিনি এই ঘুষের টাকাগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন।
লোকটার দাড়ি ও পাঞ্জাবি দেখে মনে হল, আসলেই লেবাস দেখে মানুষের সততা মাপা যায় না।
ক্রমশ বদলে যাওয়া আমাদের আচরণ :
মনে আছে , ছোটকালে দেখতাম, ঘুষখোরদের মানুষ ঘৃণা করত। আমাদের মহল্লায় এক ঘুষখোর ছিল, তার বাসায় কেউ যেত না। তার সম্পর্কে একটা কানাঘুষা চলত। তাকে এড়িয়ে চলত সবাই।
আর এখন মেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য মানুষ বিরাট বড় ঘুষখোর খোঁজে। উচ্চ শিক্ষিত মেয়েরা বিরাট বিরাট ঘুষখোর বিয়ে করতে পারলে ব্যাপক খুশি হয়।
আগে মানুষ ঘুষ খেত গোপনে, এখন মানুষ ঘুষ খায় সংঘবদ্ধভাবে। পুরো অফিস ঘুষ খায়। ধরা পড়লে পুরো অফিসই ধরা পড়বে।
আমরা এখন ঘুষখোরদের ঘৃণা করি না। তাদের সঙ্গ ত্যাগ করি না। তাদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেই না। বরং আমরা ঘুষ খাওয়াটাকে পানি খাওয়ার মতোই সহজ ব্যাপার বলে মেনে নিয়েছি।
এই রকম সামাজিক পঁচন আমাদের চরম সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে এখন অস্থিরতা, বদমায়েশি, ভোগ-বিলাস, অশ্লীলতা, প্রতারণা, নেমক হারামি আর জোচ্চুরির ছড়াছড়ি। কেননা, অসৎ পথে আয় করা টাকা অসৎ পথেই যায়।
মেধাবী ভালো মানুষগুলো এই দেশে সত্যিকার অর্থে ভীষণ কষ্টে আছে। এই দেশ সৎ মানুষের দেশ না।
খবর এখানে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



