০১.
স্কুলে আনুষ্ঠানিক ভর্তি প্রথম ক্লাশ থ্রিতে। আনুষ্ঠানিক নাম রাখাও তখন। এর আগে যে প্রাথমিক স্কুলে ছিলাম, সেখানে কেবল শামীম নামেই পরিচিত ছিলাম। কিন্তু ক্লাশ থ্রিতে এসে আমার বড় মামা আমার স্কুল পাল্টানোর জন্য মাকে পরামর্শ দিলেন। পরামর্শ মতো আমাকে ভর্তি করানোর দায়িত্ব বড় মামার কাঁধে পড়ল। তিনি স্কুলে নিয়ে গেলেন। নাম আদর্শ স্কুল। ইসলামী ভাবধারায় চালিত স্কুল। স্কুলের অধ্যক্ষ আমার মামার বন্ধু।
প্রথম সমস্যা বাঁধল নাম নিয়ে। আমার নাম কেবল শামীম।অধ্যক্ষ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ভালো নাম কী ?
আমি থতমত খেয়ে গেলাম। ভালো নাম বলে যে কোন বস্তু আছে, সেটা তখনো জানা ছিল না। আমি আমার নাম আবারো বললাম। তিনি তখন মামার কাছে ভালো নাম জানতে চাইলেন। আমি আমার নামটা কেন ভালো নাম নয়, সেটা ভাবতে ভাবতে বার বার একই নাম বার বার বলে গেলাম।
মামা ও অধ্যক্ষ মিলে পরামর্শ করে আমার ভালো নাম রাখলেন। নাম রাখা হল শাহজাহান। মুহূর্তের মধ্যে আমার নাম বদলে গেল। কিন্তু কী মনে করে অধ্যক্ষ সাহেব শাহজাহান নামটার পাশে আমার ডাক নামটাও জুড়ে দিলেন। হয়ে গেলাম শাহজাহান শামীম। মামা ও অধ্যক্ষ মিলে আমাকে শেখালেন এটা আমার ভালো নাম।
তারপর গোল বাঁধল জন্মদিন নিয়ে। আমাকে জন্মদিন জিজ্ঞেস করল। আমি বলতে পারলাম না। তখন আবারো মামা ও অধ্যক্ষ মিলে জন্মদিন ঠিক করলেন। আমি মামাকে বার বার বলতে লাগলাম, জন্মদিন তো ভুল হয়ে গেল। বাসায় গিয়ে মায়ের কাছ থেকে আমার জন্মদিন জেনে নিতে বললাম। মামা বা অধ্যক্ষ কেউই আমার কথার গুরুত্ব দিলেন না।
আমি সেই ছোট বয়সেরই বুঝতে পারলাম, নাম আর জন্মদিন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না - যে কোন সময়ই বদলানো যায়।
০২.
নাম নিয়ে আর কখনো গণ্ডগোল বাঁধেনি। কিন্ত জন্মদিন নিয়ে আবারো সমস্যা তৈরি হল। ক্লাশ নাইনে উঠে এস.এস.সি পরীক্ষায় রেজিস্ট্রেশন করব। আমাদের শ্রেণী শিক্ষক জয়নাল আবেদীন স্যার কঠোর নির্দেশ জারি করলেন, কেউ জন্মদিন লিখবি না। আমরা জন্মদিন হিসাব করে বসিয়ে দেব।
সেই তখন জানতে পারলাম, বয়স যারা না কমিয়ে এস.এস.সিতে রেজিস্ট্রেশন করে, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কমপক্ষে তিন বছর বয়স না কমালে সরকারী চাকুরি পাওয়া যাবে না। আর সরকারী চাকুরি না পেলে জন্ম নেয়াই বৃথা।
যাই হোক, রেজিস্ট্রেশন ফরম আমরা পূরণ করতে পারলাম না। স্যারেরা পূরণ করলেন। আমরা কেবল স্বাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করলাম। তবে জন্মদিন তৎক্ষণাৎ দেয়া হল না। শ্রেণী শিক্ষক জয়নাল আবেদীন স্যার হিসেব করে পরে জন্ম তারিখ বসাবেন।
রেজিস্ট্রেশন করার পর ২ বছর কেটে গেল। আমরা কেউ জানতে পারলাম না আমাদের জন্ম তারিখ কবে।
এস.এস.সি পরীক্ষার ফরম পূরণ করার পূর্বে আমাদের হাতে রেজিস্ট্রেশন কার্ড বুঝিয়ে দেয়া হল। রেজিস্ট্রেশন কার্ডে দেখি জন্ম তারিখ বসানো আছে । সেটা হল ২৪ নভেম্বর ১৯৭৩।
০৩.
ক্লাশ থ্রিতে জন্ম তারিখ কত লেখা হয়েছিল জানতে পারি নি। জয়নাল স্যার জানিয়েছিলেন, ওই জন্ম তারিখ রেজিস্ট্রেশন কার্ডে লিখলে সর্বনাশ হয়ে যেত। তিনি এটাও বলেছিলেন, কোন গাধা ছাড়া এই রকম জন্ম তারিখ লেখার কথা না। আমারও কেন যেন কথাটা সত্যি বলে মনে হল।
০৪.
মা আমাকে জন্ম তারিখ জানাতে পেরেছিলেন। আমার আব্বার একটা ডায়েরি আছে। সেটাতে একটা তারিখ দিয়ে লেখা আছে - ছেলের জন্ম হল। তারিখটি হল ২৭/০৮/১৯৭০। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছি আমার জন্ম রাত দুইটায়। মানে হল আমার জন্ম আসলে ২৮/০৮/১৯৭০ তারিখে।
আমার মায়ের কাছে শুনেছি, আমার জন্ম হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। সেই বৃষ্টি চলেছিল সারা রাত। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি নামাতে অনেকে নাকি বলেছিলেন, এই ছেলে খুব সৌভাগ্যবান হবে। তাদের কথা সত্যি কি না আজও বুঝতে পারিনি।
০৫.
জন্মদিনে সামুতে একটা ভার্চুয়াল বেলুন উপহার পাওয়া যায়। আমাকে যে কবে এই উপহারটা দেয়া হয়, সেটা এখনো বের করতে পারলাম না। আজকে তো পাইনি দেখতেই পাচ্ছি। ২৪ নভেম্বর তারিখটা মনে থাকে না বলে খেয়াল করিনি কখনো । সামুতে রেজিস্ট্রেশনের সময় কোন জন্ম তারিখটা ব্যবহার করেছি, সেটা আর মনে নেই।
০৬.
বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষদের প্রায় সবাইকে দুটো জন্মদিন বহন করতে হয়। একটা তার প্রকৃত জন্ম তারিখ। আরেকটা সার্টিফিকেটে লেখা জন্ম তারিখ। জীবন যে কেবল সত্য দিয়ে চলে না, তার সঙ্গে মিথ্যাও লাগে, এই চরম সত্য কথাটা স্মরণ করিয়ে দেয় সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখ। সত্য ও মিথ্যার মাঝে ঝুলন্ত এক জীবন নিয়ে বেশ ভালোই তো কেটে যাচ্ছে সময়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



