আমার প্রযোজক নিজেই একজন নাট্যকার ও পরিচালক। তিনি বললেন, গল্পটাতে কোন তথ্যগত ভুল থাকতে পারবে না। সুতরাং চর এলাকার মানুষের গল্প বলার জন্য চর এলাকায় অভিযান চালানোটা ফরজ হয়ে গেল।
গল্পের মূল ফোকাস হচ্ছে নদীভাঙ্গা মানুষের সুখদুঃখ। নদীভাঙ্গা চরের মানুষগুলো কিভাবে জীবনযাপন করে সেটা নিয়েই হবে এই ধারাবাহিক নাটকের গল্প।
গল্পের একটা সিনোপসিস লেখা আছে। স্ক্রিপ্টও অনেকটা লেখা হয়ে গেছে। ওই আধাখেঁচড়া স্ক্রিপ্টটা নিয়েই ছুটলাম পদ্মার চরের সন্ধানে।
আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোশারফ হোসেন। সে সন্ধান দিল, মাওয়া এলাকায় তার এক মামা থাকেন।মামার নাম আবুল চিশ্তি। সেই মামার বাড়িতে আমরা দুই বন্ধু গিয়ে উঠলাম।
রাত্রিটা পার করে পরের দিন সকালে চলে গেলাম ভাগ্যকুল। ভাগ্যকুল সরকারী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের ডাক্তার একজন নদীভাঙ্গা মানুষের সন্ধান দিলেন। ডাক্তার সাহেব নিজেই তার ওখানে নিয়ে গেলেন।
ভাগ্যকুল বাজারের গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখানে ৩ ভাই নদীভাঙ্গা পরিবারের মানুষ। তারা স্বীকার করলেন, তারা ভালো করে বলতে পারবেন না। বরং আমরা যেন ভাগ্যকুল তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের পরিচালকের নাম সবুজ আলম আকন্দ। নদী ভাঙ্গন সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন তিনি। আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগল। একে একে টুকে নিতে লাগলাম নানা তথ্য। কিন্তু আমাদের মন ভরল না। আমরা চাক্ষুস দেখতে চাই চরের নদীভাঙ্গা মানুষদের। সরাসরি কথা বলতে চাই তাদের সাথে। সুতরাং ভাগ্যকুলের একটা বালিশ মিষ্টি খেয়ে শুরু হল পদ্মার চরের দিকে অভিযান।
আমার বন্ধু পদ্মা নদীর মাঝখানে চরে যাওয়ার জন্য একজন মাঝির সঙ্গে কথা বলল। মাঝি জানাল, যদি ঘাট মালিক রাজি হয়, তাহলে যাওয়া যাবে। ঘাটের ইজারাদার সালেক তালুকদার। তাকে আমাদের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বললাম। তিনি বিপুল উৎসাহে রাজি হলেন। শুধু রাজি হলেন, তা নয়, চর জানাযাতে তার ঘাট শ্রমিক রনির সঙ্গেও ফোনে আলাপ করলেন। রনিকে বলে দিলেন, বিকেল ৫টার সর্বশেষ ট্রলার যেন আমাদের না নিয়ে ফেরে। ঘাটের ইজারাদারের ব্যবহার আমাদের খুব ভালো লাগল। তথ্য অফিসার ও ঘাটের ইজারাদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই মাছ ধরার ছোট্ট নৌকায় আমরা দু’জন চড়ে বসলাম। গন্তব্যস্থল পদ্মা নদীর মাঝখানে চর জানাযাত।
ছোট নৌকা শব্দ তুলে ছুটে চলল পদ্মার স্রোত ভেঙ্গে । ছোট নৌকায় আমি ভয়ে শক্ত হয়ে বসে রইলাম। কেবলই মনে হতে লাগল, নৌকা ডুবে যাবে। নৌকা কাত হলেই আমি তার বিপরীত পাশে সরে যাই। আমার বন্ধু নৌকার আরেক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলতে লাগল এবং মোবাইল রেকর্ডারে রেকর্ড করতে লাগল। চরে পৌছার আগেই আমরা চর সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে গেলাম। আধ ঘণ্টা পর নৌকা আমাদের নামিয়ে দিল চর জানাযাতে। আমরা রওয়ানা হলাম গল্পের সন্ধানে।
চরের মধ্যে বিশাল এলাকা পতিত অবস্থায় আছে। বড় বড় থোকা থোকা ঘাস ঢেকে আছে সেই এলাকা। কোন কোন জায়গায় কাশবনের বড় ঘাস। এই ঘাসের মাঝখান দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ। সেই পথ ধরে আমরা হাঁটতে লাগলাম।
বড় বড় ঘাস পেরিয়ে আমরা চরের ভেতরে ঢুকলাম। এলোমেলো অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘরবাড়িগুলো। কোন কোন বাড়ি একদম ভাঙ্গাচুরা অবস্থায়।
ঘাসের কার্পেট পেরিয়ে আমরা একটা ছোট মুদি দোকানের সামনে গেলাম। দোকানের পাশে একটা বাড়ি। সেই বাড়ির ছাপড়া রান্নাঘরের সামনে বসা এক থুত্থুরে বুড়ি। রান্নাঘরে একজন মহিলা রান্নায় ব্যস্ত। উঠোনে একটা নেংটা বাচ্চা খেলা করছে।
আমরা দোকানের সামনে গিয়ে দোকানদারকে খোঁজ করতে লাগলাম। রান্নায় ব্যস্ত মহিলাটিই হল দোকানদার। মহিলাটি রান্নাঘর থেকেই জিজ্ঞেস করল, আমরা কিছু চাই কি না।
আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করল, দুপুরে খাওয়ার মতো কিছু পাওয়া যাবে কি না।
মহিলাটি কী দেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। তার দোকানে অবশ্য তেমন কিছু নাই। সামান্য কিছু বিস্কুট ও কোমল পানীয় আছে।
আমার ব্যাগে আগে থেকেই কেনা একটা কেক এবং মিনারেল ওয়াটার ছিল। আমরা কেক বের করে খেলাম।আমাদের উদ্দেশ্য আসলে খাওয়া-দাওয়া করা না। আমাদের উদ্দেশ্য ওদের সাথে গল্প জমানো। তাই রান্নাঘরের মহিলাটি যখন আমাদের বসার জন্য পিড়ি দিল, আমরা তাড়াতাড়ি বসে গেলাম। বুড়িকেও আমাদের সঙ্গে বসতে বললাম।
বুড়ি আমাদের সঙ্গে নানা কথা বলতে লাগল। আমাদের মোবাইলের রেকর্ডার ওপেন ছিল। রেকর্ড হয়ে গেল তার কথা। বুড়ির ধারণা, তাকে প্রতি বছর একটা জ্বিন ধরে এবং তার একটা জটা তৈরি হয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ জ্বিন তার জটা কেটে দেয়।
আমার স্ক্রিপ্টে আগে থেকেই একটা বুড়ি চরিত্র ছিল।সেই চরিত্রটি বাস্তবে দেখতে পেলাম। এবার স্ক্রিপ্টের চরিত্রটি মডিফায়েড হয়ে যাবে।
আমরা তাদের সাথে কথা বলে চরের ভেতরের দিকে রওয়ানা হলাম। চরের পশ্চিম দিকে একটা দোকান। আমরা সেই দোকানে এসে বসলাম। নানা কথা হল।আমাদের চাউলের রুটি ও গরুর মাংস খেতে দিল সেই দোকানীর স্ত্রী। গরম রুটি ভালো লাগছিল। তবে মাংস ছিল অস্বাভাবিক শক্ত। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা চলছিল।
খাওয়া শেষ করে আমরা রওয়ানা হলাম মেম্বারের সঙ্গে দেখা করার জন্য। ঘাসের মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরে মেম্বারের বাড়ি। খুবই সাধারণ ঘর। তবে ঘরটা পাটাতন ঘর।
বাড়ির লোকজন লম্বা বেঞ্চ এনে দিল আমাদের বসার জন্য। খালি গায়ে মেম্বার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। আমরা পরিচিত হলাম। মেম্বারকে জিজ্ঞেস করলাম, এই চরের মধ্যে শুটিং করা সম্ভব কি না। মেম্বার বললেন, খুবই সম্ভব। লোকজনকে তাদের বাড়িঘরে থাকতে দিবেন বলেও কথা দিলেন। তার সঙ্গে অনেক কথা হল।
আমি আরেকটা চরিত্র বাস্তবে পেয়ে গেলাম।
ইতিমধ্যে ঘাটের লোক রনি ফোন করতে শুরু করেছে। ট্রলার নাকি চলে আসছে। আমাদের এক্ষুণি চলে যাওয়া উচিত, নইলে লাস্ট ট্রলার মিস করব। থাকার ইচ্ছা ছিল অনেকক্ষণ । কিন্তু বিকেল ৪টায় ফিরতি পথ ধরতে হল। মেম্বারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম।
রনি জানাল, চরের পশ্চিম দিকে ট্রলার পাওয়া যাবে। চরের পাশে একটা জায়গায় অনেক অনেক নৌকা বাধা ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, ওখানেই বুঝি আমাদের ট্রলার পাওয়া যাবে। কিন্তু ওখানে ট্রলার ছিল না।
রনিকে ফোন দিলাম। ও জানাল, পশ্চিম দিকে গেলে ট্রলার পাওয়া যাবে। আমরা তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি তো হাঁটছি। হাঁটছি এবং ছবি তুলছি। বিশাল ঘাসের প্রান্তর। থোকা থোকা ঘাস এখানে ওখানে। ডানপাশে ভেঙ্গে যাচ্ছে চরের জমি। আমাদের চোখের সামনেই তীর ভেঙ্গে পড়ছে।
ঘণ্টাখানেক পর একটা চালাঘরের কাছে পৌছলাম। পেছন থেকে একটা ছেলে আমাদের ডাক দিল। সেই ছেলেটি রনি।
আমরা দুজন চালাঘরের নিচে বসে রইলাম। ট্রলারের দেখা নেই। আমি ছবি তুলতে লাগলাম।চরের পশ্চিম দিকটা বিপুলভাবে ভাঙ্গছে। চালাঘরের কাছেই প্রবল স্রোতে মাটি ভেঙ্গে পড়ছে। আমি ভাঙ্গনের ছবি তুললাম।
অবশেষে সাড়ে ৫টায় ট্রলার এল। আমরা দুজন ট্রলারে চড়ে পদ্মার অপর পাড়ে ভাগ্যকুলের দিকে রওয়ানা হলাম। গল্পের সন্ধানের প্রথম দিনের অভিযান শেষ হল।
নতুন লেখকদের জন্য টিপস : মাথার উপর ভরসা করবেন না, কোন তথ্য মাথায় রাখবেন না, খাতায় রাখবেন, মাথাটা ঠাণ্ডা রাখার জন্য মাথাটাকে ফ্রি রাখা দরকার। মাথায় রাখা তথ্য ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু খাতার তথ্য থেকে যাবে। তাই যত বেশি পারেন, লিখে রাখেন। নোট বুক হাতের কাছে রাখুন এবং পুরোটা লিখে ফেলুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় রেকর্ড করে ফেলুন। যার সঙ্গে কথা বললেন, তার ছবি তুলুন। পারলে ভিডিও করে রাখুন। গল্প বা নাটক লেখার সময় এই তথ্যগুলো খুবই কাজে লাগবে।
যারা লেখক হতে চান, তাদের জন্য ভ্রমণ করা ফরজ। বাস্তবে নানা রকম চরিত্রের সঙ্গে না মিশলে নানা রকম চরিত্র সৃষ্টি করতে পারবেন না। কেবল টেবিল ওয়ার্ক করে ভালো গল্প তৈরি করাটা কঠিন। এ জন্য যাদের বাবা সরকারী চাকুরি করেন এবং নানা জেলায় চাকুরিসূত্রে যান, তারা আমাদের মতো ঘরকুনো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি মানবচরিত্র বুঝতে পারেন।
পরের পর্ব : গল্পের সন্ধানে - ০২ : পদ্মার চর শিমুলিয়া
এবার দেখুন ছবিতে চর জানাযাতের কিছু দৃশ্য।
চরের অগোছালো বাড়ি ঘর
চরের কাদামাটিতে পায়ে হাঁটা পথ
চরের ভেতরে অস্থায়ী জনবসতি
চরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে পদ্মা নদী।
চরের বিস্তৃত খোলা প্রান্তর
চর ভাঙ্গছে
বহু দূরে জনবসতি
ভাঙ্গনের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমার বন্ধু মোশারফ হোসেন
প্রবল স্রোতে চর ভাঙ্গছে
রবীন্দ্রনাথের মতো দেখতে এই লোকটি একজন মাছ ব্যবসায়ী। দাঁড়িয়ে আছেন ট্রলারের অপেক্ষায়।
গরুগুলো বাড়ি ফিরছে।
পদ্মায় সূর্যাস্ত
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১২ দুপুর ১২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



