somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই!'

২৪ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'প্রতিদিন একটি রুমাল' শিরোনামে একটি অসামান্য গল্প লিখেছিলেন মাহমুদুল হক। আমাদের বটু ভাই। এই গল্পের 'নায়ক' সবুজ আর তার বন্ধু আলতাফ মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় বিপরীতভাবে বদলে যাওয়া মানুষ। সবুজের কাছে--

'আমি মৃত্যুকে ভয় পাই আলতাফ, সত্যি বলছি, ভয় পাই ! পঁচিশে মার্চের আর্মি ক্র্যাক ডাউন না হলে কখনো হয়তো জানতেও পারতাম না জীবনকে এতো ভালোবাসি, এতো ভয় করি মরণকে!'

ওদিকে আলতাফ--

'আরে গর্দভ মরণের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তো সত্যিকারের আনন্দ। চিলমারি অপারেশনে থাকলে বুঝতিস, মৃত্যু কতো তুচ্ছ ব্যাপার, মৃত্যুকে নিয়ে কিভাবেই না ছেলেখেলা করেছিলাম আমরা প্রাইভেট আর্মির দস্যুরা। মরণকে আবার ভয় কিরে?'

একই যুদ্ধ দু'জনকে দুইভাবে জীবনের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একজন যুদ্ধের ভয়াবহতায় ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেছে নিজের মধ্যে, অন্যজন যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে হয়ে উঠেছে সাহসী, একরোখা, মৃত্যুকে পরোয়া না করা মানুষ। যুদ্ধ হয়তো এভাবেই বদলে দেয় একেকজন মানুষকে।

কিন্তু এরকম একটি গল্পকেও লেখক কীভাবে একটি ভিন্নতর মাত্রা এনে দেন, পৌঁছে দেন দৃষ্টিগ্রাহ্য উচ্চতায় সেটি বোঝা যাবে এটিকে একটু গভীরভাবে পাঠ করলেই। এই গল্পের 'নায়ক' সবুজ গ্রামের এক কলেজে পড়ায়; ম্লান, ম্রিয়মান, সম্ভাবনাহীন, অনুজ্জ্বল এক জীবন তার। অবিরাম গ্লানি সঞ্চয়ই যেন তার একমাত্র নিয়তি। জীবনযাপন মানেই যেন নানারকম গ্লানিময় অভিজ্ঞতা। কখনো সচেতনভাবে, কখনো অলক্ষ্যেই জমা হয় হিসেবের খাতায়, কিছুতেই তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সবুজের আপাত নিরীহ জীবনযাপনের মধ্যেও অনবরত জমে উঠছে গ্লানি, কিছুতেই তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না, কিছুতেই ধুয়ে মুছে ফেলা যাচ্ছে না অনিবার্যভাবে জমে ওঠা ওই গ্লানির পাহাড়।

অথচ তার ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এমন ছিলো না; তার বন্ধু আলতাফের ভাষায়--

'স্কুল লাইফে তুই ছিলি আমাদের মধ্যে আদর্শ চৌকস ছেলে। চমৎকার ক্রিকেট খেলতিস, ডিবেটে কচুকাটা করতিস বড় বড় চাঁইদের, ছবি আঁকতিস, কবিতা লিখতিস। স্ট্রাইক হয়ে যেতো দুদ্দাড় তুই ডাক দিলে, আর এখন ?'

আর এখন ? এখন সে এক গ্রামের কলেজের 'মাস্টার' আর--

'ছেলেমেয়ে আগলে ঢাকায় পড়ে থাকে রেখা (তার স্ত্রী )। সব দায়ভাগই তার। সবুজ শুধু মাসের মধ্যে দু'চারবার ঘুরে যায়, মাস পয়লা পয়সা দিয়ে যায়। ইছাপুরায় পড়ে থাকতে তার নিজেরও খুব একটা ভালো লাগে তা নয়; কিন্তু নিরুপায়। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। টেনেটুনে চালাচ্ছিলো সে এতোদিন কোনমতো, এখন আর একেবারেই ভালো লাগছে না। সংসার চলার অন্য উপায় থাকলে নির্ঘাৎ ছেড়ে দিতো কলেজের চাকরি, আর পেরে উঠছে না সে।'

তো, গল্প এখানে নয়। গল্পটা হচ্ছে, আলতাফ-- যে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে চায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে-- সবুজকে জোর করে নিয়ে বাইরে বেড়াতে বেরোয়। বেরিয়ে সে নানারকম কাণ্ড করে-- জোরসে গাড়ি হাঁকায়, রাস্তায় অন্য সব গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়, হৈ-হল্লায় মেতে থাকে-- এসব তার চরিত্রের সঙ্গে মানিয়েও যায়, কারণ (সে বলে)-- 'আমি সারাদিন, সারা জীবনভর ভীষণ উত্তেজনার ভেতর থাকতে চাই, উত্তেজনাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়!' -- কিন্তু সবুজের চরিত্রের সঙ্গে এসব একেবারেই বেমানান। সে এসব দুদ্দাড় কর্মকাণ্ডে রীতিমতো পীড়িত বোধ করে। তারা একবার শহরের বাইরে বনভূমির কাছে গিয়ে বসে-- সেখানেও আলতাফ জীবনের পক্ষে, আনন্দের পক্ষে সোচ্চার, আর সবুজ যথারীতি ভেঙ্গে পড়া মানুষ--

'আমি আর পারছি না। একবার ঢাকা, একবার ইছাপুরা, এ আর ভালো লাগছে না। ওখানে যা পাচ্ছি এ বাজারে তা এমন হাস্যকর! জীবন চলে না।'

ফেরার পথে আলতাফ এক রিকশারোহী বিষণ্ন তরুণীকে তাড়া করে, পাত্তা না পেয়ে তার রিকশাটাকেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়; এবং সবুজকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ঘটনাটার ব্যাখ্যা দেয় এভাবে--

'দোষগুণ যাই বলিস না কেন আমার ধরনটাই এখন এই। আমার যা প্রয়োজন আমি তা জোর করে আদায় করে নেই, কারো মুখ চেয়ে বসে থাকি না হা-পিত্যেশ করে। যেখানে তা সম্ভব নয় সেখানে গায়ের জোর খাটাই, প্রয়োজন হলে উড়িয়ে দেই, নিজের অস্তিত্বের জন্য এইসব করতে হয় আমাকে। বুঝতে পারছি খুব খারাপ লাগছে তোর, আমি দুঃখিত। মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কর, ভুলে যা সবকিছু, দেখবি সবকিছু আবার কেমন ফর্সা হয়ে গেছে। দুনিয়াটাই এভাবে চলছে বন্ধু, ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই !'

কিন্তু সবুজ কি ভুলতে পারে সবকিছু? সবার পক্ষে কি সবকিছু ভুলে যাওয়া সম্ভব? সবার কি 'ভুলে যাবার পর্বতপ্রমাণ ক্ষমতা' থাকে? সবুজের স্বভাব তো আলতাফের সম্পূর্ণ বিপরীত, আলতাফ যা সহজেই পারে সবুজের পক্ষে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নইলে তো আর ঢাকায় কোনো একটা কর্মসংস্থানের জন্য তাকে আলতাফের মুখের দিকে চেয়ে হা-পিত্যেশ বসে থাকতে হতো না, নিজের জীবনকে এমন দুর্দশাপূর্ণ করে তুলতে হতো না।

গল্প শেষ হয়ে যায় এখানেই। কোনো কোনো পাঠক হয়তো ভাববেন-- এ গল্পের মানে কি? কেবল জনৈক আলতাফের তারুণ্যের উচ্ছ্বাসমাখা কর্মকাণ্ডের বিবরণ ছাড়া এ গল্পের মধ্যে আছেটা কি? কিন্তু যারা একটু মনোযোগী পাঠক, তারা এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই তুলবেন যে, সবুজ আলতাফের কথামতো আদৌ সবকিছু ভুলে যেতে পেরেছিলো কী না। গল্পের কোথাও এ সম্বন্ধে কিছু বলা নেই। কিন্তু আলতাফের--

'ভীষণ ঘেমে গেছিস, মুখ মুছে নে'-- বলার প্রেক্ষিতে-- -

'সবুজ পকেট হাতড়ালো। রুমাল খুঁজে পেল না। বাঁশবনের তলায় রুমাল পেতে বসেছিলো, মনে পড়লো ফেলে এসেছে। প্রায়ই ফেলে আসে, রেখা বলে এতো রুমাল হারাও কি করে!'

অংশটি পড়ে গল্প সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হয়। আমরা তো প্রতিদিনই আমাদের দেহে জমে থাকা ঘাম-ধুলো-ময়লা মুছে ফেলি রুমাল দিয়ে-- সেই রুমাল যদি হারিয়ে যায় তাহলে কি উপায় হবে? সমস্ত ঘামধুলোবালিময়লাআবর্জনা কি জমা হবে না শরীরে? এই গল্পের রুমালটি তো কেবল নিছক একটি রুমালই নয় বরং এ যেন এক উজ্জ্বল প্রতীক-- যা দিয়ে জীবনযাপনের গ্লানিগুলো মুছে ফেলা যায়। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে রুমাল হারিয়ে গেলে মোছা আর হয়ে ওঠে না, কেবল জমা হতে থাকে গ্লানিগুলো--_ জমা হতে হতে গ্লানির পাহাড় জমে ওঠে, জীবনটাই হয়ে ওঠে বিপুল গ্লানিময়।

রুমালের আদলে ব্যবহৃত এই প্রতীকটির কারণেই গল্পটি হয়ে ওঠে অনন্যসাধারন। শুধু মাহমুদুল হকের গল্পগুলোর মধ্যেই নয়--_ সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই এমন গল্পের উদাহরণ বিরল। এত অল্প কথায়, এত সংযম, এত উজ্জ্বল ইঙ্গিতময়তায় মানবজীবনের এক রূঢ় সত্যের এই অসামান্য রূপায়ন খুব বেশি ঘটে নি আমাদের সাহিত্যে।

'ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই!' যার সেই ক্ষমতা আছে, সে না হয় ভুলেই গেলো সবকিছু। আর যার ভুলে যাবার ক্ষমতা নেই, তার কি হবে, বটু ভাই?
১৬টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×