somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... 'অশ্রুপাত শেষ হলে নষ্ট করো আঁখি'
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'ও চিরপ্রণম্য অগ্নি' কবিতা এটি- তাঁর একুশতম কাব্যগ্রন্থের, সম্ভবত প্রায় শেষ বয়সের রচনা। শক্তি আমার প্রিয় কবিদের একজন। তাঁর অনেকগুলো কবিতা প্রায় ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে, পড়তে পড়তে। এটি তারই একটি।

কবিতাটি, মৃত্যুর পর কবির আকাঙ্ক্ষা ও মিনতি নিয়ে। মৃত্যুর পর না বলে, সৎকারের সময় বলাই ভালো। অর্থাৎ দাহ করবার সময় কবি আগুনের কাছে যে মিনতি জানাচ্ছেন তাই নিয়ে এই কবিতা।

কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে-

'ও চিরপ্রণম্য অগ্নি
আমাকে পোড়াও।
প্রথমে পোড়াও ঐ পা দুটি যা চলৎশক্তিহীন,
তারপর যে-হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই।
এখন বাহুর ফাঁদে ফুলের বরফ,
এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা,
ওদের পুড়িয়ে এসো জীবনের কাছে
দাঁড়াও লহমা, তারপর ধ্বংস করো
সত্যমিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ।'

বোঝাই যাচ্ছে - মৃত্যু হয়েছে কবির, দাহ করবার জন্য সমস্ত আয়োজন শেষ, আর কবি আগুনকে 'চিরপ্রণম্য' সম্বোধন করে পোড়াতে বলছেন তাঁর সবকিছু- চলৎশক্তিহীন পা, প্রেম-পরিচ্ছন্নতাহীন হাত, দায়িত্ববিহীন কাঁধ (যে কাঁধে সারাজীবন ধরে আমরা নানারকম দায়িত্ব বয়ে বেড়াই), তারপর 'সত্যমিথ্যা রঙে-শ্বেতে স্তব্ধ জ্ঞানপীঠ'- সবই।

সবই? না, এর পরের পঙক্তিতেই আছে-

'রক্ষা করো দুটি চোখ
হয়তো তাদের
এখনো দেখার কিছু কিছু বাকি আছে।'

অর্থাৎ, চোখ দুটো রক্ষা করতে বলছেন তিনি, কারণ- 'হয়তো' এখনো দেখার কিছু বাকি আছে! কি বাকে আছে? পরের পঙক্তিটি পড়ুন-

'অশ্রুপাত শেষ হলে নষ্ট করো আঁখি'

কার অশ্রুপাত? নিজের? না, বলাইবাহুল্য। তিনি তো মৃত এখন, নিজের অশ্রুপাতের প্রশ্ন নেই তাই। এইঅশ্রুপাত স্বজন-প্রিয়জন এমনকি অপ্রিয়জনদেরও! আমরা তো কখনো-কখনো নিজের অজান্তেই এমনটি ভাবি - আমি মরে গেলে কে-কে কাঁদবে আমার জন্য? কার দুচোখ ভেসে যাবে জলে? কার চোখের কোণ ভিজে উঠবে শুধু? কে-ই বা অবরুদ্ধ কান্নায় নিজেকে কেবল পুড়িয়েই চলবে? কবিও তেমনটি ভেবেছেন নিশ্চয়ই, আর তাই অশ্রুপাতগুলো দেখে যেতে চান। কিন্তু এ-ও জানেন এই অশ্রুপাত একসময় শেষ হবে, তখন- 'নষ্ট করো আঁখি'! কী অভূতপূর্ব একটি পঙক্তি, না?

কবিতার আসল বাঁকটি অবশ্য দেখা যাবে পরের পঙক্তিগুলোতে। নিজের সবকিছুই পোড়াতে বলছেন তিনি 'চিরপ্রণম্য অগ্নি'কে, কিন্তু একটি জিনিস না পোড়াবার জন্য মিনতি জানাচ্ছেন-

'পুড়িয়ো না ফুলমালা স্তবক সুগন্ধে আলুথালু
প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে।'

ফুলমালা-স্তবক যাকিছু দেয়া হয়েছে তার শবদেহে, তা যেন না পোড়ানো হয়! কেন? কারণ-

'প্রিয় করস্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে'

এ কি শুধু ফুলমালা? না তো! ওতে যে 'সুগন্ধে আলুথালু' প্রিয়জনের করস্পর্শ লেগে আছে! ওই করস্পর্শ কি পোড়ানো যায়?

কী বিপুল আবেগ, কী ভয়াবহ রোমান্টিকতা!

এবং পরের পঙক্তি-

'গঙ্গাজলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত, স্বেচ্ছাচারি...'

ওকে পুড়িও না, হে অগ্নি, বরং গঙ্গাজলে ওকে ভেসে যেতে দাও- মুক্ত, স্বেচ্চাচারি। শেষের ডটচিহ্নগুলোও লক্ষ্য করবার মতো। এই ভেসে যাওয়ার মুক্ততা ও স্বেচ্ছাচারিতা যেন অনন্ত হয়, যেন অনন্তকাল ধরে 'প্রিয় করস্পর্শ' নিয়ে ওই ফুলমালা ভেসে যেতে পারে...

মাঝে মাঝে ভাবি, শেষ বয়সে এসেও এই কবির মধ্যে এমন তুমুল রোমান্টিকতা আসতো কোত্থেকে?

[উৎসর্গ : প্রিয় নিতির, তোমার সবকিছুর জন্য...]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/29018886 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/29018886 2009-10-01 23:28:40
বেলা পড়ে আসছে, আলো নিভে আসছে...
সেদিন এক বন্ধু-- দীর্ঘকাল ধরে প্রবাসী-- ফোনে কথা বললো অনেকক্ষণ। অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা ছিলো একসময়, একাই আড্ডা জমিয়ে রাখতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বহুদিন দেখা হয় না, কেমন হয়েছে এখন জানি না, জিজ্ঞেস করতে বললো-- আয়নার সামনে দাঁড়ালে তো নিজেকে একইরকম মনে হয়, মনে হয় বদলাইনি খুব একটা, কিন্তু যখন পুরনো দিনের কোনো ছবি দেখি, তখন বুঝি-- কতোটা বদলে গেছি, কতোটা বুড়িয়ে গেছি! বয়স হয়ে যাচ্ছেরে, দোস্ত, সত্যিই বয়স হয়ে যাচ্ছে।

হ্যাঁ, বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সবারই বয়স হয়ে যাচ্ছে! সবার মধ্যেই ক্লান্তি ভর করেছে, জীবন কাউকে ছাড় দেয়নি, নানারকম জটিলতায় বিপন্ন-বিমূঢ় একেকটা জীবন। এ যেন এক অনিবার্য পরিণতি। জীবনের হা খুব বড়ো, সবকিছু গিলে খেতে চায়-- তারুণ্যের সময়, যৌবনের সময় সেটা বোঝা যায় না, একটু বয়স বাড়লেই তীব্রভাবে ধরা পড়ে ব্যাপারটা। বোঝা যায়-- নির্মম সময় কেড়ে নিয়েছে সমস্ত উচ্ছলতা-উজ্জ্বলতা!

'বয়সে বড়ো হয়ে যাবার মধ্যে একটা দুঃখবোধ আছে'-- কোথায় যেন পড়েছিলাম কথাটা। হ্যাঁ, বড়ো হয়ে যাবার দুঃখবোধ, বুড়িয়ে যাবার দুঃখবোধ, বেলা পড়ে আসার দুঃখবোধ!

একটা সময় ছিলো, সেই প্রথম তারুণ্যে, যখন একেকটা দিন যেতো আর মনে হতো-- ক্রমশ যেন সমৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছি, ক্রমাগত সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছি। তখন সামনে 'অনন্ত' যৌবনের হাতছানি, আর যৌবন মানেই অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য, অশেষ সম্ভাবনা। তারুণ্য গেলো, যৌবন এলো। সূর্য তখন মধ্যগগনে। একেকদিন দিন তখন রৌদ্রকরোজ্জ্বলতায় ভরা। এখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তে শুরু করছে। এখন একেকটা দিন যায়, আর মনে হয়-- বেলা পড়ে আসছে, বেলা ফুরিয়ে আসছে।

আর এমন সময়গুলোতে মাঝে মাঝে সবকিছু থেকে, সব জায়গা থেকে নিজেকে উইথড্র করে নিতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, কিছুই আমার জন্য নয়, কেউ-ই আমার জন্য অপেক্ষা করে নেই।

বেলা পড়ে আসছে, টের পাচ্ছি। হয়তো আরো কিছু কাজ করবার ইচ্ছে ছিলো, কিংবা আরো কিছু কাজ করবার কথা ছিলো, আরো কিছু কথা বলার ছিলো, আরো কিছু লেখা লিখবার ছিলো...। হয়তো সবকিছু করে যাওয়া হবে না।... আপত্তিও নেই তাতে। প্রস্তুত হয়ে আছি, ডাক পড়লে হাসিমুখে চলে যাবো!

জানি, কোথাও কোনো আলোড়ন পড়বে না তাতে। পড়তে নেই আসলে।... মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই চলে যাওয়া মানুষগুলোর কথা ভুলে যেতে চায়!

বেলা পড়ে আসছে, বেলা ফুরিয়ে আসছে। আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে, ধীরে ধীরে আলো নিভে আসছে। এ-ই স্বাভাবিক, জানি। তবু, আলো পুরোপুরি নিভে যাবার আগে আরো কিছুটা পথ যেতে চাই। আরো কিছুটা পথ...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28954446 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28954446 2009-05-23 03:13:55
'চক্ষু তো এই দুইখান, আর কতো দেখাইবা...'
'হৈরব' নামে এক অসামান্য চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন মাহমুদুল হক, তাঁর 'হৈরব ও ভৈরব' গল্পে। বংশানুক্রমে ঢাকী সে; ঢাকঢোল তার জীবন ও জীবীকা। কিন্তু জীবনটা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, জীবীকাও হুমকির মুখে। একদিকে বয়সের ভার, অন্যদিকে সীমাহীন দারিদ্র। যেন এক ব্যর্থ, ম্রিয়মাণ, নুইয়ে পড়া, জীবনের কাছে পরাজিত মানুষ সে। এবং স্মৃতিভারাক্রান্ত একসময় তাদের জীবনে ঔজ্জ্বল্য ছিলো- অন্তত সে তাই-ই মনে করে; তখন 'বাবু'রা ছিলেন, নানান পালাপার্বনে তাদের বাড়িতে হৈরবদের মতো আরও অনেক ঢাকীদের ডাক পড়তো-

'কয়কীর্তনের ঢাকীদের কি দাপটটাই না ছিলো একসময়, পালাপার্বনের আগে সারাদেশ থেকে বায়না করতে আসতো মানুষজন। বনেদি বাবুদের বাড়ি না হলে তারা বায়না ফিরিয়ে দিয়েছে কতোবার, সেই তারাই এখন ঋষিদাশদের সঙ্গে বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি বুনে কোনোমতে নিজেদের পেট চালায়, চুরি ডাকাতি করে বেড়ায়। সময়ে কি না হয়; মাটিতে পড়া ডুমুর ,তার আবার গোমর কিসের।'

এখন আর সেই দিন নেই, বাবুরা দেশগাঁ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে ওই পাড়ে, সবকিছু ছেয়ে গেছে অভাব, দারিদ্র আর বেলেল্লাপনায়- এখন নবমীর রাতে পূজাকমিটির ছেলেছোকরারা 'খানকি' নাচাতে চায়। হৈরব তাই পা বিছিয়ে কাঁদে, একা একা। স্মৃতির জাবর কাটে, কষ্ট সইতে না পেরে কখনো কখনো নিজের মৃত্যু কামনা করে। এই যখন জীবন- অভাব, দারিদ্রই যখন সার, অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকা, চারদিকে কেবল ভাঙনের সুর, অতীতের সুখস্মৃতিচারণ ছাড়া আর কিছু নেই- তখন গনি মিয়ার কাছ থেকে ধার করা টাকা হৈরব শোধ করে কিভাবে? গনি মিয়া এসে টাকার জন্য চোটপাট করে, ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে বলে, তার বিধবা বোন 'দয়া'র দিকে কুনজর ফেলে- যেন সবকিছু গিলে ফেলতে এসেছে।

এ তার কঠোর বাস্তব জীবন বটে, কিন্তু সে যেন বাস করে বাস্তবাতিরিক্ত কোনো উচ্চতার জগতে। জনজীবনের মধ্যে যে প্রবহমান দার্শনিকতা, মাহমুদুল হক যেন এই দার্শনিক ঢাকির মধ্যে দিয়ে ধরতে চেয়েছেন। যেমন, দারিদ্রক্লিষ্ট সংসারে বিধাব পিসি আর মায়ের কলহ দেখতে দেখতে ত্যক্ত-বিরক্ত ভৈরব ( হৈরবের ছেলে) যখন চেঁচায়, তখন ভৈরবের উক্তি :

'তরা যে কি হইলি, বুঝি না তগো। ঘর হইলো গিয়া তর বাগান, বাগানে পাখিরা তো চিক্কুর পারবই'

শুধু জীবনযাপনেই নয়, 'বাজনা' নিয়েও তার আছে এক গভীর দার্শনিক ভাবনা-

'ঢাক বইলা কথা, ঢাকী বইলা কথা; যে নিকি নিজেরে বাজাইয়া থুইছে হ্যার কাছে যা দিবা হ্যা তাই বাজায়া দ্যাখাইবো।... তরা বুঝছ না, হাত কি বাজাইব, বাজায় গিয়া মন; পেরথম নিজেরে বাজান শিখ, শ্যাষম্যাষ যা ধরছ হেই বাইজা উঠব'। ... 'যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো; পর্বত বাইজা উঠছে, জল বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ। তারপর স্যান বাইজা উঠলো মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠলো মনুষ্যধর্ম, মানবজীবন...।'

যেন এক দারিদ্রপীড়িত ঢাকি নয়, এক দার্শনিকের কথা শুনছি আমরা। (ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও এমন এক ঢাকির দেখা পেয়েছিলাম, যে বিশ্বাস করে- তার মৃদঙ্গ কথা বলে! একদিন আমাদেরকে সেই অভাবিত কথাবলা মৃদঙ্গ বাজিয়ে শুনিয়েছিল সে, আর আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম!)

শুধু কি তাই? ভাষাহীন-মূক প্রাকৃতিক অনুষঙ্গেরও ভাষা বোঝে হৈরব। যখন নিজের কাছে কাঁদতে বসে, এমন সব ভাবনায় সে আমাদের চমকিত করে, যে মনে হয়- কিছুই আর ভাষাহীন নয়, সবই যেন কথা বলে ওঠে তার কাছে। তার কান্নাটিও তাই হয়ে ওঠে ভীষণ তাৎপর্যময়-

'ঈশ্বর, ঈশ্বর আমারে তুইলা নাও-' হৈরব নিজের কাছে কাঁদবে বলে পা বিছিয়ে বসে। কতো কথা মনে পড়ে, মরে পড়ে সিরাজদিখাঁর সেই পাতক্ষীরের কথা, জিভে স্বাদ লেগে আছে এখনো। মনে পড়ে রামপালের কলামুলোর কথা, গাদি ঘাটের কুমড়ো, আড়িয়লবিলের কই মাছ, কত কিছু। আতরপাড়ার সেই দই, আহারে সব গেল কোথায়। ...গোটাগ্রাম জুড়ে ছিল কদমের বন, বর্ষার নদী ধীরে মন্থর গতিতে ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে করে পথ হারিযে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো। এখন গ্রাম কি গ্রাম উজার; দেশলাইয়ের কারখানা গিলে ফেলেছে সবকিছু। কদমের সে বনও নেই, নদীর সেই ছেলেমানুষিও নেই; এখন ইচ্ছে হলো তো এক ধারসে সব ভাসিয়ে দিলো, সবকিছু ধ্বংস করে দিলো, 'আমি তোমাদের কে, আমার যা ইচ্ছে তাই করবো' ভাবখানা এমন।

কিন্তু এসব ভেবেই কি বসে থাকলে চলে? গনিমিয়া তার পাওনা টাকার তাগাদা দিতে আসে নিয়মিতই। 'দয়া'র জন্য সুবিধা করতে পারে না অবশ্য। অবশেষে 'দয়া'র রংঢংয়ের কাছে হেরে গিয়ে 'বাজনা' শুনতে চায়। হৈরবের ছেলে ভৈরব এবার বাপের মতো করেই ঢাকে আওয়াজ তোলে-

'যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো, পর্বত বাইজা উঠছে, জল বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ বাইজা উঠছে মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠছে মনুষ্যধর্ম, বাইজা উঠছে মানবজীবন, ...বাবু হুনতাছেন? ঢাকে কেমনে কথা কইতাছে হুইনা দ্যাহেন। দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মানবজীবন কথা কইতাছে বাবু! দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মনুষ্যধর্ম বোল তুলতাছে, আখিজলে আখিজলে, টলমল টলমল, ধরাতর ধরাতল, রসাতল, হা'

ঢাকের বাজনা নিছক বাজনা তো নয় ঢাকীদের কাছে, তাদের হাতে মানবজীবন বেজে ওঠে, বেজে ওঠে মনুষ্যধর্ম। পাহাড় বাজে, ধরিত্রি বাজে, জল-মাটি-আকাশ বাজে। ভৈরবের এমনতর বাজনাতে গনি মিয়া ভয় পেয়ে যায়, কারণ ভৈরব যেন এখন আর ঢাক বাজাচ্ছে না, বাজাচ্ছে অন্য কিছু- 'ফিরান দিয়া বহেন,..দশখুশি বাজাই দ্যাহেন ক্যামনে, মাইনষের চামড়ার ছানিতে দ্যাহেন কেমুন বাজে...'- যেন স্বয়ং মানুষকেই বাজিয়ে চলেছে সে তার সমস্ত আক্রোশ মিটিয়ে। কিন্তু একসময়-

'গনি মিয়ার পিঠ নয়, পরিশ্রান্ত ভৈরব একসময় অবাক বিস্ময়ে দেখে এতোক্ষণ সে তার নিজের ঢাকের গায়েই সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হেনেছে; চামড়ার দেয়াল আর ছানি ফেঁসে গেছে, চুরচুর হয়ে ছিটকে পড়েছে টনটনে আমকাঠ, বেঘোরে নিজের ঢাকটাকেই চুরমার করেছে এতোক্ষণ।'

গল্পের মুখ ঘুরে যায় আবার। নিপীড়িত হৈরব বা ভৈরবদের হাতে ওই গনি মিয়াদের পিঠের চামড়ার দুরবস্থা দেখে যখন একটু খুশি হওয়ার কথা ভাববেন পাঠক তখনই লেখক দেখিয়ে দেন- গনি মিয়ার পিঠ নয়, ভৈরব নিজের ঢাকটারই বারোটা বাজিয়েছে এতোক্ষণ। ইচ্ছে করলেই তো নিপীড়কদের পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া সম্ভব নয়, ওটা শ্লোগানে সম্ভব, কিংবা সম্ভব তথাকথিত বিপ্লবী লেকখদের ইচ্ছেপূরণের গল্পে। মাহমুদুল হক শ্লোগানে বিশ্বাসী নন, বিপ্লবীও নন, তিনি কেবল মানুষের প্রকৃত রূপটি আবিষ্কার করতে চান।

সমাজ-বাস্তবতার রূপ যারা খুঁজতে চান শিল্প-সাহিত্যে, তাদের জন্য সব ধরনের উপকরণ রেখে দিয়েও এই গল্পকে তিনি নিয়ে গেছেন শিল্পসফলতার তুঙ্গে। সকল বাস্তবতা বুঝেও আমাদের মন পড়ে থাকে হৈরবের অসামান্য দার্শনিকতার কাছে, মাহমুদুল হকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী বর্ণনা আমাদেরকে ঘোরগ্রস্থ করে রাখে দিনের পর দিন-

'এক একবার বিস্তীর্ণ দুপুর ঝনঝন করে বেজে ওঠে। ঝলসানো গাছপালা মুখ নিচু করে আচ্ছন্নপ্রায় দাঁড়িয়ে থাকে। এরই মাঝে এক একটি গন্ধ নেশার মতো জড়িয়ে ধরে হৈরবকে, সে বুঝতে পারে বৌনার ডালে ডালে এখন মঞ্জরি, কী আনন্দ, কী আনন্দ, ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি নামে। এক একটা গন্ধ এমন এক একটা স্মৃতি, যাতে নখের কোনো আঁচড় নেই, দাঁতের কোনো দাগ নেই, ছিমছাম, নির্ভার, অবিরল। কাঠালের মুচির গন্ধে হৈরবের বুক গুমরে ওঠে। টুনটুনি পাখি চিরকালই তার চোখে একটা আশ্চর্য প্রাণী, যেমন কাচকি মাছ; এই তো একফোঁটা অথচ এরাও কী স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকে, তাল মিলিয়ে বংশ বৃদ্ধি করে চলে। একটা টুনটুনি, যার ঠোঁটে তুলো, চোখে রাজ্যের বিস্ময়, আকন্দগাছের শাখায় দোল খেয়ে ফরফর করে একদিকে উড়ে যায়; হৈরবের মনে শিশিরের ছোঁয়ায় পদ্মকোরক শিরশির করে ওঠে, ঐ যে তিনি, তিনি নিরভিমান, তিনি নম্র, তিনি ব্যাকুল, তিনি বলেন আমি একফোঁটা, আমি তুচ্ছ, অতিতুচ্ছ।... ঈশ্বর, ঈশ্বর আমারে তুইলা নাও- হৈরব নিজের কাছে কাঁদবে বলে পা বিছিয়ে বসে। কতো কথা মনে পড়ে... সবকিছু দেখে, সব কথা ভেবে হৈরব এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছায়, অনেক কিছু তার দেখা হয়ে গেছে, অনেক, অনেক, আর দরকার নেই তার দেখার- চক্ষু তো এই দুইখান, আর কতো দেখাইবা, ঈশ্বর, আমারে তুইল্লা নাও।... জীবনের কি খাঁই, কতো কিছু তার চাই, আজ আর তার কোথাও বাঁশপাতার কোনো গন্ধ লেগে নেই, উইঢিপির গন্ধ নেই, এ্যাওলাশ্যাওলার গন্ধেও কতো আত্নীয়স্বজন, কতো পালাপার্বণ, কতো জন্মমৃতু্যর স্মৃতি ভুরভুর করেছে একসময়। জীবনের এখন গণ্ডা গণ্ডা মাথা, গণ্ডা গণ্ডা চোখ, হাত, নখ, দাঁত; রাবণ কোন ছার; জীবনের এখন সবকিছু চাই, কেবল ভালোবাসা ছাড়া, যতো কিছু আছে সব...। ঈশ্বর আমারে তুইলা নাও- গলায় আকন্দের মালা পরে 'হে বিরিক্ষ এ অধমের পেন্নাম লইবেননি, হে হনুমানসকল, আপনেরা খুশি থাকিলেই বিশ্ব সংসার লীলাময় হয়, 'আহা সরলতার কিবা দিব্যকান্তি, মরি মরি' আপন মনে এইসব বলে আর কেউ একা একা কেঁদে ফিরবো না দেবদারু বনে, আর কেউ চৌতালে, একতালায়, টেওটে, ত্রিতালে, ঝাঁপতালে, ঠুমরি ঠেকায় ঢাকে বর্ষাভর ডাহুকের ডাক বাজাবে না, ঈশ্বর হৈরবরে তুমি তুইলা নাও-'

নিজেকে মাঝে মাঝে হৈরবের মতো মনে হয় আমার। মনে হয়- 'আহা সরলতার কিবা দিব্যকান্তি'... মনে হয়, মাটিতে পা বিছিয়ে বসি, বলি- চক্ষু তো এই দুইখান, আর কতো দেখাইবা, ঈশ্বর...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28948193 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28948193 2009-05-09 00:15:57
ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো....
ছন্নছাড়ার পেন্সিল তার প্রোফাইলে এই কথাগুলো লিখে রেখেছেন : 'কারো প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখার উপায় হচ্ছে তার সাথে কখনো সাক্ষাৎ না করা!'

কথাগুলো হুমায়ুন আজাদের, সেটিও জানিয়েছেন তিনি। যে কেউ তার প্রিয় কোনো উদ্ধৃতি তার প্রোফাইলে ঝুলিয়ে রাখতেই পারেন, কিন্তু কেন বেছে বেছে নির্দিষ্ট ওই কথাগুলোই নির্বাচন করলেন, তা নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই একমুহূর্ত হলেও ভাবি। অন্তত আমি তো ভাবি। ছন্ন'র প্রোফাইলের ওই লেখাগুলো পড়ে মনে হয়- ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার বয়ানই লিখে রেখেছেন তিনি এবং অভিজ্ঞতাটা তার জন্য শকিং ছিলো। ধারণা করি, কোনো এক ভার্চুয়াল সম্পর্কের মানুষকে কাছ থেকে দেখে তার ভালো লাগেনি, আশাহত হয়েছেন বা বেদনাদায়ক কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে। মোট কথা, দেখা হওয়ার আগে ভার্চুয়ালি যে শ্রদ্ধাবোধটা ছিলো, সেটা মিলিয়ে গেছে।

কথাগুলো আমাকে ভাবিয়েছে, এবং আমার মতামতটা দাঁড়িয়েছে অন্যরকম। মনে হয়েছে- দেখা হলেই যার ওপর থেকে শ্রদ্ধা চলে যায়, তার সঙ্গে দেখা হওয়াই উচিত এবং শ্রদ্ধাটা চলে যাওয়াই উচিত।

২.
ভার্চুয়াল সম্পর্ক নিয়ে সমস্যাটা সব সময়ই থেকে যায়! যার সঙ্গে দেখা হয়নি, অথচ প্রচুর কথাবিনিময় হয়েছে, মধুর একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, হয়তো শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে অথবা জন্ম হয়েছে প্রেমের; অথচ দেখা হওয়ার পর সেই অনুভূতিটি আর থাকে না। কেন এমন হয়? হয়, কারণ, ভার্চুয়ালি কোনো মানুষই নিজেকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার সুযোগ পান না, বা ইচ্ছেকৃতভাবে প্রকাশ করেন না! ভার্চুয়ালি প্রকাশিত মানুষটি আসলে খণ্ডিতভাবে প্রকাশিত মানুষ, সেই মানুষটিকেই কাছ থেকে দেখতে গিয়ে যখন তার অপ্রকাশিত দিকগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে তখনই বুকে আঘাতটা লাগে!

ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো নির্মাণ করার সময় বা রক্ষা করার সময় আমরা ভুলেই যাই- এই মানুষটিও যে কোনো বাস্তব মানুষের মতোই দোষগুণ-ভালোমন্দ মেশানো একজন মানুষ! তার সবকিছুই শুদ্ধ, সবকিছুই সুন্দর হওয়াটা অবাস্তর, যদিও সেভাবেই সে নিজেকে প্রেজেন্ট করছে! এই ভুলে যাওয়াটাই বিপত্তি ঘটায়।

৩.
আমরা যখন তরুণ ছিলাম (কথাটা বলতে অস্বস্তি লাগে। মনে হয়, বুড়ো হয়ে গেলাম নাকি? কিন্তু চারপাশে যখন তরুণতরদের ভিড় দেখি, তখন...), তখনো ভার্চুয়াল সম্পর্ক ছিলো, তবে এখনকার মতো এত সর্বব্যাপি নয়, এমন দুকূলপ্লাবি নয়, এমন প্রভাববিস্তারি নয়। এর কারণ হয়তো এই যে, তখন ভার্চুয়াল সম্পর্ক গড়ে ওঠার জন্য এতসব যোগাযোগ মাধ্যম ছিলো না। সেলফোন আসেনি তখনো, ইন্টারনেটের নামও শুনিনি। শহরাঞ্চলে যাদের বাসায় ল্যান্ডফোন ছিলো (এই সংখ্যাও নগণ্য, এবং যাদের ছিলো, তারা মোটামুটি স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতেন), তারা আন্দাজে কোনো নম্বরে চাপাচাচি করে কাউকে পেয়ে যেতো কখনো কখনো, তাদের সঙ্গেই কথা-বলার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতো! আগেই বলেছি, এই সংখ্যা ছিলো অতিশয় নগণ্য। এর বাইরে সম্পর্কগুলো গড়ে উঠতো চিঠিকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ 'পত্রমিতালি'। 'বিচিত্রা' নামের একটা প্রভাবশালী-অভিজাত পত্রিকা ছিলো, সেখানে 'ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন' নামে একটা বিভাগ ছিলো, যেটিতে অসংখ্য পত্রবন্ধুতার আহ্বান সম্বলিত বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। 'চিত্রবাংলা' নামের একটা প্রায়-পর্নো পত্রিকা ছিলো, সেটার শেষ পাতাগুলো বরাদ্দ থাকতো পত্রতিালির বিজ্ঞাপনের জন্য। পরে চিত্রালী আর ছায়াছন্দ নামের দুটো সিনে-কাগজও এই দলে যোগ দেয়! তবে বিচিত্রার সঙ্গে এদের মানগত পার্থক্যই শুধু ছিলো না, আরেকটি পার্থক্যও ছিলো। বিচিত্রায় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন ছাপাতে টাকা লাগতো, অন্যগুলোতে লাগতো না। এইসব বিজ্ঞাপন থেকে কেউ কেউ পেয়ে যেতেন তাদের কাঙ্ক্ষিত বন্ধু, চিঠিবিনিময় হতো, ওই চিঠিই কথা, চিঠিই সম্পর্ক! একেকটি চিঠির জন্য সে কি নির্ঘুম প্রতীক্ষা! হায়, এই ইমেইল-চ্যাট-এসএমএস যুগের ছেলেমেয়েরা সেই প্রতীক্ষার মর্মই বুঝলো না!

৪.
আমার নিজেরও এমন বন্ধু ছিলো! গভীর ভার্চুয়াল সম্পর্ক হয়েছিলো আমার, একজনের সঙ্গে। ঘটনাটা একটু অদ্ভুত! সেই গল্পটিই বরং বলি।

বিচিত্রায় 'কুরুক্ষেত্র' নামে একটা বিভাগ ছিলো। সেখানে যৌথ সম্পর্ক নিয়ে (প্রেম, বন্ধুতা বা দাম্পত্য যে কোনো ধরনের যৌথ সম্পর্ক) নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা লিখতেন লেখক-পাঠকরা! আমিও সেখানে একটা লেখা পাঠাই (চোখ কপালে তুলবেন না প্লিজ, ১৯৮৯ সালের কথা বলছি, আমার বয়স তখন মাত্র উনিশ+)! চিঠির ফর্মে লেখা ওই লেখাটিতে আমার ভয়াবহ রোমান্টিক 'চেতনা'র প্রকাশ ঘটে। কিন্তু একটা ভুল করে ফেলেছিলাম আগেই। কোনো লেখা প্রকাশের জন্য লেখার সঙ্গে বিভাগীয় সম্পাদকের কাছেও 'লেখা প্রকাশের অনুরোধ/আবেদন' জানিয়ে একটা চিঠি লিখতে হতো, সেই চিঠিতে আমি আমার বাসার ফোন-নম্বরটি দিয়ে দিয়েছিলাম! আগেই বলেছি, তখন ল্যান্ডফোন থাকাটা ছিলো স্ট্যাটাস সিম্বল, আমি যে হেদিপেদি ধরনের কেউ নই, রীতিমতো টিএন্ডটি ফোন আছে বাসায়, বিভাগীয় সম্পাদককে সেটি বুঝিয়ে দেবার জন্যই যে চিন্তাটা মাথায় এসেছিলো, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! তো লেখাটা বেরুনোর দুদিন পরই একটা ফোন পেলাম, বিপরীত লিঙ্গের। যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, সে কোনো সাড়াই দিলো না, অন্যদিকে এক 'অচেনা'র ফোন! খুশি হয়েছিলাম বলাইবাহুল্য, কিন্তু 'ভাব' নেয়ার জন্য প্রথমেই জিজ্ঞাসাবাদ- ফোন নম্বর কোথায় পেলেন? -বিচিত্রায় ফোন করে নিয়েছি (সরল স্বীকারোক্তি! মনেও আসেনি যে, আপনি বিচিত্রায় ফোন করে আমার নম্বর চাইলেন, আর ওরা দিয়ে দিলো? মগের মুল্লুক নাকি? কিংবা একজন বিভাগীয় সম্পাদক একজন লেখকের নম্বর একজন পাঠককে দেয়ার নৈতিক অধিকার রাখেন কী না- এইসব জটিল প্রশ্নের ধারেকাছেও যাইনি! যাবো কেন, আমি তো দারুণ খুশি!)

তো, এই মেয়েটির সঙ্গে আমার এই ভার্চুয়াল সম্পর্ক প্রায় পনের বছর টিকে ছিলো। কতো চিঠি, কতো ফোন, কতো উপহার বিনিময়, (ইমেইল আসার পর) কতো কতো ইমেইল! সবই বিনিময় হয়, তবু দেখা হয় না! একই শহরে থাকি দুজন, তবু কেন যেন দেখাটা আর হয়ে ওঠে না। কেন হয়নি, ব্যাপারটা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। যথেষ্ট উদ্যোগ ছিলো না, বলাইবাহুল্য। প্রশ্ন হলো, কেন ছিলো না!? ভার্চুয়াল মুগ্ধতা নষ্ট হয়ে যাবার ভয়, নাকি অন্যকিছু? সে আমার এমন বন্ধু ছিলো যে, ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি লেখা সে সংগ্রহে রেখেছিলো, যার অনেকগুলোই আমি নিজে হারিয়ে ফেলেছি! অনেকবার ভেবেছি, হারিয়ে যাওয়া লেখাগুলো ওর কাছ থেকে চেয়ে নেব, কিন্তু চাওয়ার আগেই সে নিজে হারিয়ে গেল! একদিন ফোন করে প্রচুর কান্নাকাটি সহযোগে জানালো- সে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে, আমার সঙ্গে এই যোগাযোগটা আর কন্টিনিউ করতে চায় না!

আমি কিছু বলিনি!

নতুন জীবন শুরু করতে হলে যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে হয়, তাহলে তো আর কিছু বলার থাকে না!

এরপরও অবশ্য আমি ওকে মেইল করেছি, উত্তর আসেনি। ফোন করে দেখেছি,সেলফোন বন্ধ! আর ল্যান্ডফোন! এই নম্বরে এই নামে কেউ থাকে না!!

এখনো মেয়েটিকে খুব মনে পড়ে আমার। বিশেষ করে লেখালেখিতে কোনো একটা প্রাপ্তিযোগ ঘটলে- ছোট্ট একটা প্রশংসা থেকে শুরু করে বড়ো পুরস্কার- সবই আমার প্রাপ্তি,- ওকে মনে পড়ে! মনে হয়, ও-ই আমার লেখার প্রথম অ্যাডমায়ার ছিলো!

৫.
এই লেখাটি লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো। হয়তো লেখার সঙ্গে কথাটির কোনো যোগসূত্রই নেই! এলোমেলো একটা লেখা, এত যোগসূত্র খোঁজার দরকারই বা কি!

বছর দশেক আগে কর্মসূত্রে কয়েকমাস আমি চট্টগ্রাম ছিলাম। শহরটা আমাকে অসম্ভব মুগ্ধ করেছিলো, কিন্তু আমি ছিলাম একা! চট্টগ্রামে আমার কোনো বন্ধু ছিলো না, পরিচিতজনের সংখ্যাও ছিলো নগণ্য। ওই অসম্ভব সুন্দর শহরে আমার সময়গুলো তাই কেটে গেছে ভয়াবহ একাকিত্বের মধ্যে দিয়ে। তো, সময় কাটানোর জন্য মানুষ ছিলো না বলে আমি একা একা হেঁটে বেড়াতাম। হাঁটতে হাঁটতেই একসময় পেয়ে গেলাম টাইগার পাস নামক সেই মনোমুগ্ধকর জায়গাটা। ওই রোডটাকে আমার কাছে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রোড! যেন 'হাইওয়ে টু হেভেন' (এই নামে একটা টিভি সিরিয়াল হতো আশির দশকের মাঝামাঝিতে; সেই সিরিয়ালে যে পথটিকে দেখানো হতো, টাইগার পাস রোডটা তারচেয়ে অনেক সুন্দর ছিলো)! কী মায়াময়, নির্জন, সবুজ প্রশান্তিতে ভরা!

আমি আজো আমার একাকিত্বের সময়গুলোতে ওই সড়কটি ধরে হেঁটে যাই, কল্পনায়! একা। হেঁটে যাই, হেঁটে যাই... আর ভাবি- আমার পাশে আরেকজন মানুষ তো থাকতেই পারতো, যার সঙ্গে হয়তো আমার এখনো দেখাই হয়নি, যে আমারই মতো জীবনের কাছে মার খাওয়া, আমারই মতো নিঃসঙ্গ, নির্জনতাপ্রিয়, একা! আমারই মতো 'ভালোমন্দের রক্তমাংসে গড়া, দোষত্রুটিতে গড়া একান্ত এক পার্থিব মানুষ!'
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28940982 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28940982 2009-04-21 22:45:52
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না
'একটা মোটরকার
খটকা নিয়ে আসে।'

এরপর মোটরকার নিয়ে তার নিজস্ব বোঝাপড়া-

'মোটরকার সব-সময়েই একটা অন্ধকার জিনিস
যদিও দিনের রৌদ্র-আলোর পথে
রাতের সুদীপ্ত গ্যাসের ভিতর
আলোর সন্তানদের মধ্যে
তার নাম সবচেয়ে প্রথম।'

তারপর মোটরকারের গতিময়তায়তার বর্ণনা দেবার আগে বেশকিছু লাইনে এ নিয়ে তাঁর বিস্ময়-বিরক্তি-হতাশা এবং যথারীতি জীবনের বিবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে নানা প্রশ্ন, এবং অতপর এর গতিময়তা সম্বন্ধে তাঁর অভিব্যক্তি-

'রাতের অন্ধকারে হাজার-হাজার কার হু-হু করে ছুটছে
প্যারিসে-নিউইয়র্কে-লন্ডনে-বার্লিনে-ভিয়েনায়-কলকাতায়
সমুদ্রের এপার ওপার ছুঁয়ে
অসংখ্য তারের মতো,
রাতের উল্কার মতো,
মানুষ-মানুষীর অবিরাম সংকল্প আয়োজনের অজস্র আলেয়ার মতো
তারাও চলেছে-
কোথায় চলেছে, তা আমি জানি না।'

তারপরই সেই মোক্ষম-অনবদ্য লাইনগুলো:

একটা মোটরকারের পথ- মোটরকার
সবসময়ই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না; আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে, পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে। জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে নক্ষত্রের নিচে।
২.
এই লেখার জন্য কেন এই কবিতা? সামহোয়ারে আমি লিখছি একবছর হয়ে গেলো! বর্ষপূতিতে পোস্ট দেয়াটা ব্লগীয় রীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্লগারদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির চমৎকার প্রকাশ ঘটতে দেখেছি সেসব পোস্টে। কিন্তু আমি অনেক ভেবেও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না- কী লেখা যায়! পরিসংখ্যানটা দেখুন :

ব্লগার পরিসংখ্যান পোস্ট করেছেন: ৬০টি মন্তব্য করেছেন: ২৩৭৬টি মন্তব্য পেয়েছেন: ৩৩৫০টি ব্লগ লিখেছেন: ১ বছর ১ দিন ব্লগটি মোট ৪৮১৯৪ বার দেখা হয়েছে

এরকম পরিসংখ্যান কোনো নিয়মিত-অ্যাক্টিভ ব্লগারের জন্য বেমানান। অনেকেই মাত্র তিন মাসেই এই পরিসংখ্যান অর্জন করে ফেলেন! তুলনামূলক বিচারের দিকে যদি যাই তাহলে ওই কবিতার এই দুটো লাইন খুব মোক্ষম হবে :

'আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে'

কিন্তু আমাকে স্বান্ত্বনা জোগায় শেষ প্যারার ওই সমস্ত উজ্জ্বল লাইনগুলো। মনে হয়-

'আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না'

মোটকথা : আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না!

সত্যি বলতে কি, আমি আসলে কোথাও যেতেই চাই না, কোথাও পৌঁছতেও চাই না, আমার আসলে কোনো গন্তব্য নেই; আমি কেবল প্রবাহমান থাকতে চাই, কেবল বয়ে চলতে চাই; কারণ, জীবনের অন্য নাম জার্নি- এ কথা অনেক আগেই জেনে ফেলেছি।

বুঝি, এ সবই আসলে 'গভীরভাবে অচল মানুষ'দের নিজেকে স্বান্ত্বনা দেবার নিজস্ব পদ্ধতি। আসলে যে পারে, সে মোটরকারে করেই যায়, যে পারে না, সে ওইসব কবিতার পঙক্তি নিয়ে পড়ে থাকে। হায়, জীবনানন্দ, আমিও আপনার মতো না-পারা না-হওয়া অচল মানুষ!

৩.
সামহোয়ারে আমার এই একবছরের অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি লিখতে গেলে এক লেখায় কুলোবে না! সেই চেষ্টা তাই না করাই ভালো। তবে দু-একটি কথা বলা যায়।

পত্রপত্রিকায় লিখছি দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে, বইও বেরিয়েছে একাধিক, বেশকিছু পাঠকও আমার আছে- জানি সেটা। কিন্তু গত একবছরে সামহোয়ারে সহব্লগারদের কাছ থেকে আমি যে পরিমান পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেয়েছি তা গত দেড়যুগেও মূলধারার মিডিয়ায় পাইনি! এখানকার এই মিথস্ক্রিয়াটা অসাধারণ! শুধু তাই নয়- আমার ধীরগতির ব্লগিং, দীর্ঘদিন পরপর লেখা পোস্ট করা নিয়ে সহব্লগারদের আপত্তি এবং নতুন লেখার জন্য আমাকে ক্রমাগত চাপের ওপর রাখাটাও আমার জন্য খুব উপভোগ্য ব্যাপার ছিলো। সহব্লগারদের কাছ থেকে যে অযাচিত ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি তা আমাকে অসম্ভব স্পর্শ করেছে, হয়েছি গভীরভাবে আপ্লুত।

আমি ব্লগিং শুরু করার প্রায় প্রথম থেকেই সামহোয়ারের বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয় নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে এসেছি। ব্লগারদের লেখার কপিরাইট কি কতৃপক্ষের নাকি লেখকের- এই বিষয়ে বিতর্ক শুরু করেছিলাম ব্লগিঙের শুরু থেকেই, এরপর ব্লগ বাতিল/স্থগিত করার নীতিগত অধিকার কতৃপক্ষের আছে কী না- এ নিয়েও আরেকদফা সমালোচনা করেছি, কতৃপক্ষের অস্বচ্ছ মডারেশন নীতিমালা নিয়েও বিভিন্ন পোস্টে প্রচুর কথা বলেছি। এ ছাড়াও নানা ইস্যুতে প্রতিবাদ ও সমালোচনায় আমার কখনো ক্লান্তি ছিলো না। কিন্তু সেই অর্থে প্রশংসা পাবার মতো যেসব বৈশিষ্ট্য এই ব্লগের আছে, সেগুলো নিয়ে কখনো কথা বলা হয়নি। এসব দেখে যে-কারো মনে হতে পারে- আমি বোধহয় এই মাধ্যমটির মধ্যে ভালোকিছু দেখতে পাই না!

কেউ যদি সেটা মনে করে থাকেন, তিনি ভুল করবেন। আজকে আমি খুব পরিষ্কার করেই বলতে চাই- সামহোয়ার নিশ্চিতভাবেই আগামী দিনে এ দেশের একটি বিকল্প গণমাধ্যম হয়ে উঠবে! কেন বলছি একথা, সেটি একটি ভিন্ন লেখায় বলার চেষ্টা করবো। আজ শুধু এটুকুই বলি- এই বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

৪.
ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি কিংবা সম্পর্ক রক্ষা করায় আমি প্রায় ব্যর্থ একজন মানুষ। বাস্তব জীবনে এবং এই ভার্চুয়াল জগতে আমার সাড়াহীনতা প্রায় জড়পদার্থের মতোই! আমার মেইলবক্সে আসা চিঠিগুলো, আমার ফেইসবুকের ওয়াল বা ইনবক্সে আসা চিঠি বা লেখাগুলো, ব্লগে আসা মন্তব্যগুলো বেশিরভাগ সময়ই নিরুত্তর পড়ে থাকে! আমি শুধু দেখি, পড়ি, ভাবি- কিন্তু নিজে আর লেখা হয় না! এমনকি ব্লগে বহু লেখা পড়ার পরও স্রেফ আলস্যের কারণে মন্তব্য করা হয় না! আমার এই পর্বতসমান আলস্য নিয়ে, আর যাই হোক, একটা ইন্টারঅ্যাক্টিভ মিডিয়ায় বিচরণ করা কঠিন কাজ! কিন্তু কী-ই বা করতে পারি আমি!
'আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ/ হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে!'

৫.
মাঝে মাঝে মনে হয় ব্লগিংটা ছেড়ে দিলে কেমন হয়! হুটহাট করে কোনোকিছু ছেড়ে দেবার অভ্যাস আমার আছে! মনে হয়, কি লাভ এতসব মায়া-মমতা-স্নেহ-ভালোবাস-শ্রদ্ধা-সম্মানের সম্পর্কে জড়িয়ে! ভার্চুয়াল এই সম্পর্ক, তবু এ যে বড়ো প্রাণবন্ত, বড়ো মায়াভরা! কতো ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো এখানে! দেখলাম কেউ কেউ এমনকি কাঁধে পাহাড় তুলে নেবার মতো মনের জোরও রাখেন! যতোই থাকবো এখানে ততোই জড়িয়ে পড়বো! তারচেয়ে চলে গেলে ভালো হয় না! কিন্তু ঘোষণা-টোষণা দিয়ে, নাটক-ফাটক করে কোনোকিছু করার লোকই নই আমি। চলে গেলেও নিঃশব্দে যাবো, কেউ টেরই পাবে না! এত বড়ো একটা প্ল্যাটফর্ম থেকে একজন সামান্য ব্লগারের প্রস্থানে কোথাও এতটুকু সাড়াও পড়বে না!

না, এই ভাবনা কারো প্রতি কোনো অভিমান থেকে নয়, কোনো অভিযোগ থেকেও নয়! একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের নানাবিধ দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ক্লান্ত হয়ে এসব ভাবি!

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28932909 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28932909 2009-04-03 00:50:12
সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে...
কবিতাটি শুরু হয় এভাবে :

'সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ'

নিজেকে 'পাথর' হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বটে, কিন্তু একইসঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছেন, এ পাথর যেমন-তেমন পাথর নয়; এ পাথর 'কেবলি লাবণ্য ধরে'! শুধু লাবণ্য ধরলেও না হয় কথা ছিলো, লাবণ্য-ধরা পাথর জগতে অনেক আছে; কিন্তু ওখানেই থামছেন না তিনি, টানা বলে যাচ্ছেন- 'উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র, মায়াবী করুণ'! উজ্জ্বলতার ব্যাপারটা বোঝা যায়, হিরকখণ্ডও উজ্জ্বলতা ধরা পাথরই, কিন্তু 'আর্দ্র মায়াবী করুণ' উজ্জ্বলতা! কেমন সেটি?

শেষ নয় সেখানেই, পরের পঙক্তিতেই বলছেন তিনি-

'এটা সেই পাথর নাকি? এটা তাই?'

সংশয় তৈরি হয়ে গেল! অমন একটা মনকাড়া পাথরের কথা বলে আবার আত্নমগ্ন কবি যেন নিজের কাছেই জানতে চাইছেন- 'এটা সেই পাথর নাকি?' কবি নিজেই যেখানে সংশয়ী হয়ে উঠেছেন, সেখানে পাঠকের আর কি উপায় থাকে, পরের পঙক্তির দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়া? এবং আমরা দেখি, বলছেন তিনি-

'এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ?
মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা? তীব্র তীক্ষ্ণ তমোহর
কী অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?'

এইবার বেছে নেবার অপশন বাড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি- পাথর, নদী, উপগ্রহ, রাজা, 'পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্না ভেজা চোখ' অথবা 'মহাকাশে ছড়ানো ছয়টি তারা'! কিন্তু এই অপশন তিনি কাকে দিচ্ছেন? নিজেকে, নাকি পাঠককে? নাকি নিজের পরিচয় খুঁজছেন এইসবকিছুর মধ্যে? কি-ইবা মানে এই প্যারার ওই শেষ দেড়-লাইনের?-- 'তীব্র তীক্ষ্ণ তমোহর/ কী অর্থ বহন করে এইসব মিলিত অক্ষর?' নাকি এগুলোও ওই অপশনই? তবে কি আত্নপরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে 'এইসব মিলিত অক্ষরের' মধ্যে?

না, এখানেই শেষ হয়নি পরিচয় খোঁজা বা পরিচয় দেয়ার আয়োজন। কবি এগিয়ে যান, আমরাও এগোই পরের পঙক্তিগুলো নিয়ে-

'আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,
যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এ ঘরে ও ঘরে যায়
সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী
তারা কেউ কেউ আমাকে বলেছে-
এটা তোর জন্মদাতা জনকের জীবনের রুগ্ন রূপান্তর,
একটি নামের মধ্যে নিজেরি বিস্তার ধরে রাখা,
তুই যার অনিচ্ছুক দাস!'

নিজেকে প্রশ্ন করে, বা অন্যকে জিজ্ঞেস করে তিনি জেনেছেন (এই অন্যরা আবার যে-সে নয়, তাদের কেউ কেউ 'সময়ের সাহসী সন্তান যারা সভ্যতার সুন্দর প্রহরী', কেউ বা 'খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে'), এটা তার বাবার জীবনেরই 'রুগ্ন রূপান্তর!' এতক্ষণ ধরে আত্নপরিচয় খোঁজার যে মনোমুগ্ধকর-বিশাল আয়োজন ছিলো, এইখানে এসে যেন সেটি করুণ বেদনায় ভরে ওঠে! আর যা-ই হোক, কোনো জীবনের 'রুগ্ন রূপান্তর' হিসেবে নিজের জীবনকে কেউ দেখতে চায় বলে মনে হয় না! সেটা বোঝাও যায় শেষ লাইনটি পড়ে- 'তুই যার অনিচ্ছুক দাস!'

কিন্তু পরিচয়পর্ব তবু শেষ হয় না। এর পরের পঙক্তিগুলোতে আবার নিজেকে খোঁজেন তিনি এইভাবে-

'হয়তো যুদ্ধের নাম, জোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,
নীল দীর্ঘশ্বাস কোনো মানুষের!
সত্যিই কি মানুষের?'

এবার যুদ্ধ, জোৎস্নায়, নীল চাঁদে, কোনো মানুষের নীল দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে চলে নিজের পরিচয় খুঁজে ফেরা! কিন্তু এবারও শেষ লাইনে ছুঁড়ে দেন মর্মান্তিক প্রশ্ন- 'সত্যিই কি মানুষের?' এবং এগিয়ে যান কবিতার শেষ প্যারায়-

'তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনোদিন
ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল?
ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?'

শেষে এসে সংশয়টা চূড়ান্তে পৌঁছে। মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কি ছিলো কখনো? সে কি ভালোবেসেছিলো 'যুবতীর বামহাতে পাঁচটি আঙ্গুল' বা 'ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?'

প্রশ্নেই শেষ হয় পরিচয় খোঁজার পালা, উত্তর পাওয়া যায় না! হয়তো এইসবকিছুর মধ্যেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, অথবা কোনোকিছুর মধ্যেই নয়- এমন এক বিমূঢ় সংশয় রেখে কবিতা শেষ করে দেন আবুল হাসান। আর আমরা বুঝে যাই- এ কেবল কবির নিজের পরিচয় খোঁজার আয়োজনই নয়, এ আসলে আমাদেরকেও মুখোমুখি করে দিয়েছে এইসব চিরন্তন প্রশ্নের, সেইসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা অতপর ঘুরে বেড়াই, উত্তর মেলে না, উত্তর মেলে না...




[এই লেখাটি লিখতে গিয়ে একজনের কথা খুব মনে পড়ছিলো, যাকে আমার মনে হয় সেই পাথরের মতো, যে কেবলি লাবণ্য ধরে! খুব ভালো লাগতো যদি তাকে উৎসর্গ করতে পারতাম এটি, কিন্তু গত রাতেই সে আমার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে-- আমি যেন যেখানে-সেখানে তার নাম না নিই! জানি, এই লেখা তার চোখে পড়বে, তাকে বলি-- উৎসর্গপত্র রচিত হয়নি বটে, তবু এটা 'আপনার' জন্যই!]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28930304 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28930304 2009-03-27 23:34:17
আসেন, একটু আড্ডা দেই!
ব্যক্তিগত জীবনে তো ঝামেলা থাকেই, সেইটা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাইতে হয়, তার ওপর আবার একের পর এক জাতীয় দুঃসংবাদ।

ব্লগটাকেও কেমন যেন মনমরা মনমরা লাগে।

আর ভাল্লাগে না! মনটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে।

একটু আড্ডা-টাড্ডা দিয়া মনটা হালকা করতে চাই। যারা রাজি আছেন তারা আসেন। মন খুইলা কথা কন। শুধু আমার সাথে না, সবাই সবার সাথে।

যারা রাজি নাই, অথবা যারা মনে করেন, এই অবস্থায় আড্ড দেয়াটা একটা ফাইজলামি, তারা একটা মাইনাস দিয়া যান! বইলা-কইয়া দিয়েন রে ভাই, মাইন্ড করুম না!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28923910 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28923910 2009-03-13 22:28:34
কেবলই চোখ ভিজে ওঠে...
দেখি সারাদেশ দুই পক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। কেউ বলছে বিডিআর জওয়ানদের দাবিদাওয়াগুলো সঠিক ছিলো, তাদের এই বিদ্রোহ অসঙ্গত নয়, যেহেতু 'অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ন্যায়সঙ্গত'! আবার কেউ বা বলছেন- যে বিদ্রোহ এতগুলো মৃত্যু উপহার দেয় তা কখনোই সঙ্গত হতে পারে না!

ভাবি এ-ও, এই বিদ্রোহের সঙ্গে হয়তো সকলে জড়িতও ছিলেন না, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তো নয়ই। খুব ছোট্ট একটা অংশই এই বীভৎস খুনের সঙ্গে জড়িত। কারণ ইতিহাসই বলে, সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যতগুলো বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সব জায়গাতেই কিলার গ্রুপ ছোট আকারের। যৌক্তিক কারণেই এটা হয়ে থাকে। খুনের পরিকল্পনা অনেক লোক জানা মানে, ফাঁস হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া।

কিন্তু যারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়নি, অথচ বিদ্রোহ করেছে, তারা? তাদের ব্যাপারে আমরা কি ভাববো? আমি নিজেই নিজেকে বোঝাবার জন্য বিশ্লেষণ করতে বসি। ভাবি- দীর্ঘকাল ধরে নিপীড়িত-বঞ্চিত বিডিআর সদস্যরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদ্রোহটা করেছে কম দুঃখে নয়! তারা জানতো- জয়ীই হোক আর পরাজিতই হোক তাদের জন্য অবধারিত হয়ে আছে কঠোর শাস্তি। সামরিক বাহিনীর ভেতরে থেকে 'শৃঙ্খলা ভঙ্গ' মানেই তো নিশ্চিত শাস্তি। তবু তারা এই বিদ্রোহ করলো কেন? জীবন কি এতটাই দুঃসহ হয়ে উঠেছিলো যে এই অবধারিত শাস্তির কথা জেনেও এই বিদ্রোহটাকেই সঠিক উপায় বলে মনে হয়েছিলো তাদের? জানতে পারি, বেতন-ভাতার প্রসঙ্গ ছাড়াও তাদের প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি ছিলো- কর্মকর্তারা তাদেরকে মানুষ বলে মনে করতেন না, এতটাই ছিলো দুর্ব্যবহারের মাত্রা। ভাবি-- মানুষ হিসেবে নূন্যতম মর্যাদা পাওয়ার অধিকার তাদের ছিলো/আছে। তারা তো আমারই ভাই, এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি! এই বিদ্রোহ তো সেই মর্যাদাবোধ আর একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার ফল! কিভাবে তাহলে এই বিদ্রোহকে অসঙ্গত বলবো?

আর ঠিক তখনই টেলিভিশন থেকে ভেসে আসে আহাজারির শব্দ, সামরিক কর্মকর্তাদের স্বজনদের কান্নায় আকাশ ভারি হয়ে উঠতে দেখি। মর্মান্তিক-বীভৎস মৃত্যুর শিকার হওয়া সামরিক অফিসারদের লাশগুলো দেখে শিউরে উঠি, আতংকে নীল হয়ে যাই... পরিবারগুলোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, কান্না-হাহাকার-আহাজারি দেখি, অনুভব করি স্বজন হারানোর বেদনা, কারণ- তারাও তো আমারই ভাই! আমি মৃত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবি- এমন বীভৎস মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার আছে, প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে মৃত্যুর আগে প্রিয়জনের মুখগুলো শেষবারের মতো দেখে যাওয়ার।

আমি কোনো পক্ষ নিতে পারি না।

বরং সবকিছুর চেয়ে আমার কাছে বড় হয়ে ওঠে এই অনাকাঙ্ক্ষিত-অগ্রহণযোগ্য মৃত্যু। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে আমি ক্ষুব্ধ, ব্যথিত, হতাশ ও বেদনাক্রান্ত হয়ে উঠি।

অবশেষে কেউ একজন তাদের ইউনিফর্মগুলো খুলে নিলে আমার সামনে থেকে অফিসার-জওয়ান পার্থক্য ঘুচে যায়, দেখি সবগুলো মুখই মানুষের মুখ। আমি তাই মানুষের পক্ষ নিই। দেখি, তাদের কেউ হয়তোবা গ্রামের কৃষক-পরিবার থেকে আসা যুবক, একটু 'ভালো' থাকার বা 'সুন্দর জীবনের স্বপ্ন চোখে মেখে তাকিয়ে আছে; কেউ হয়তো মধ্যবিত্ত, বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের যুবক, 'সিকিউরড' নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন মাখা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে! তাদের সকলের চোখেই একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন, একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। টের পাই, ইউনিফর্ম খুলে ফেলার পর যে লোকটিকে দেখতে পাচ্ছি, সে নিতান্তই এক সাধারণ মানুষ, ঠিক যেন আমারই মতো! আমাদের চাওয়াগুলোও যেন এক- একটু নিশ্চয়তা, একটু মর্যাদা, একটু সুন্দর জীবন! আমি নিথর হয়ে থাকা মুখগুলোর মধ্যে নিজেকেই দেখি, জীবনের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো অথবা রাতের অন্ধকারে গুম হয়ে যাওয়া মুখগুলোর মধ্যে নিজেকেই খুঁজে পাই!

আমি তথাকথিত লেখকসুলভ নির্মোহতা আর ধরে রাখতে পারি না, এই মর্মান্তিক-ভয়াবহ-অসহনীয় মৃত্যু, এই অনিশ্চিত-নিরাপত্তাহীন-পলাতক জীবন আর তার মধ্যে বিমূঢ় হয়ে থাকা চিরদুঃখী মাতৃভূমিকে দেখে আমার চোখ ভিজে ওঠে, কেবলই চোখ ভিজে ওঠে...


এ বিষয়ে আমার প্রথম লেখাটির লিংক : Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28917807 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28917807 2009-02-28 01:34:33
মনটা খারাপ হয়ে আছে...
সরকার অতিদ্রুত পদক্ষেপ নেয়ায় আপাতত শংকা সামান্য হলেও কমেছে। রাজনৈতিক সরকার থাকার এই এক সুবিধা, যে কোনো সমস্যাকে তারা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার কথা ভাবে। আজকে যদি কোনো সামরিক সরকার বা অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকতো তাহলে নিশ্চিত রক্তের গঙ্গা বয়ে যেত পিলখানায়! আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানানোই যায়!

কিন্তু তাতে উদ্বেগ কমে না। এমনিতেই সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরিণ টানাপোড়েনের কারণে বেসামরিক মানুষের আহত-নিহত হওয়ায় বিমূঢ় হয়ে আছি, তার ওপর এই ভাবনা আসছে মনে- এই বিদ্রোহীরা কি সত্যিই ক্ষমা পাবে? নাকি তারাও মারা পড়বে আমাদের অজান্তেই?

বিডিআর সদস্যরা তাদের সমস্যা ও অভিযোগের কথা জানাতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে গতকালের দরবারে! জানাতে দেয়া হয়নি! উর্ধ্বতন কতৃপক্ষই সে ব্যবস্থা করেননি।

তা কি ছিলো তাদের অভিযোগ বা দাবিদাওয়া?

এমন বিরাট কিছু নয়! বেতন বৈষম্য কমানো (মানে তাদের বেতন বাড়ানো), প্রাপ্য ভাতা প্রদান (যেমন ডাল-ভাত কর্মসূচিতে নিজেদের প্রাপ্য ছুটি বাতিল করে অবিরাম কাজ করে যাওয়ার বিনিময়ে সামান্য কিছু মজুরি), উর্ধ্বতনদের কাছ থেকে একটু ভালো ব্যবহার! এই তো! সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের এইটুকু নায্য দাবির কথা তাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারবে না?

মনটা খারাপ হয়ে আছে.. সব মিলিয়ে... ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28916391 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28916391 2009-02-25 21:23:47
আরেকটি অ-নিরাপদ পোস্ট!
ব্লগারদের ব্লগ বাতিল করা নিয়ে এইরকম একটি পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করে ফেলেছে কতৃপক্ষ! তাদের আচরণ শেয়ালের মতো! সাময়িকভাবে ব্যান করা (জেনারেল, ওয়াচ বা কমেন্ট ব্যান যা-ই হোক না কেন!), আর ব্লগ বাতিল করা এক ব্যাপার নয়! ব্লগ বাতিল করার মানে হলো, ওই ব্লগে স্বয়ং ব্লগারেরও প্রবেশাধিকার থাকছে না। তার মানে হলো- আমার ব্লগ যদি বাতিল করা হয় তাহলে আমার এতদিনকার লেখাগুলোর কোনো হদিস থাকছে না! ব্যাপারটা আমি ভাবতেও পারছি না! একজন ব্লগারের লেখার ওপর সম্পূর্ণ অধিকার তো তার নিজের! তিনি সেই লেখা মুছে ফেলবেন, না পুড়িয়ে ফেলবেন, না রেখে দেবেন সেই সিদ্ধান্তও একান্তভাবেই সংশ্লিষ্ট ব্লগারেরই। কতৃপক্ষ সেটি কোন অধিকারে বাতিল করেন? কোন অধিকারে নিজের ব্লগবাড়িতে ব্লগারের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন?

কয়েক মাস আগে রবিউল করিম ব্লগারদের লেখার কপিরাইট প্রসঙ্গে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। Click This Link

নীতিমালার একটি অস্পষ্ট পয়েন্ট উল্লেখ করে তিনি কতৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছিলেন। কতৃপক্ষের ব্যাখ্যাটা ছিলো এরকম :

"২২ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৫:৫০

নোটিশবোর্ড বলেছেন: 'বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ' এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ব ও দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট লেখকের। ব্লগে প্রকাশিত যেকোন লেখা সংশ্লিষ্ট ব্লগারের পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সামহোয়্যার ইন সমর্থন করে না। সামহোয়্যার ইন এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্লগারদের অনুমতি ছাড়া কোন লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ করে নি এবং সেরকম কোন ইচ্ছাও সামহোয়্যার ইন এর নেই।

ব্লগ রেজিস্ট্রেশনের শর্তাবলীতে এ ব্যাপারে কিছুটা অস্পষ্টতার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। ব্লগ শর্তাবলীতে কপিরাইট সংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করার জন্য অতি শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

শুভ ব্লগিং।"

কতৃপক্ষের মতে যদি -"'বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ' এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ব ও দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট লেখকের" হয়ে থাকে (এবং সেটি হতে বাধ্য), তাহলে নিজের লেখা বাতিলের অধিকারও একমাত্র সংশ্লিষ্ট লেখকেরই, কতৃপক্ষের নয়!

কতৃপক্ষ কি ভেবে দেখেছেন, যদি এই প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট ব্লগার আইনগত ব্যবস্থা নিতে চান তাহলে তারা কি বিপদে পড়বেন!

ব্লগ বাতিলের এই কালো নিয়মটিকে আমি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করছি এবং নিয়মটি রদ করার জন্য কতৃপক্ষের কাছে দাবি করছি।

[আরেকটা অ-নিরাপদ পোস্ট দিলাম, এই পোস্টের প্রথম লাইনটিই এর কারণ!]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28915723 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28915723 2009-02-24 13:54:14
একটা অ-নিরাপদ পোস্ট দিলাম!
এইসব 'নিরাপদ' পোস্টের ভিড়ে আমি একখান অ-নিরাপদ পোস্ট দিলাম। এইসব ব্লগীয় উত্তেজনা আমি সাধারণত এড়ায়া চলি। কিন্তু এইবার দুইটা কথা না বলেই পারলাম না!

কতৃপক্ষকে বলি, সা.ইন এখনো প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি, হওয়ার প্রক্রিয়ায় মধ্যে আছে; সা.ইন এখনো গণমাধ্যম হয়ে ওঠেনি, হয়ে ওঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। এই হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াধীন সময়ে যতবেশি সমালোচনা হবে, ততোই ভালো। নিজেদের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে একটি উন্নততর প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা সহজ হবে। গণমাধ্যমের জন্য এই সমালোচনাটা আরো বেশি জরুরী। 'গণমাধ্যম' শব্দটার মধ্যেই জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতের একটা ব্যাপার আছে। সেই মত যে সবসময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যাবে এমন কোনো কথা নেই। বিপক্ষে মত থাকবে এবং সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বাংলাদেশে 'সমালোচনা'কে দেখা হয় 'নিন্দা' হিসেবে। সমালোচক মানে যেন নিন্দুক। অথচ কেউ বুঝতে চায়না- শুধু অ্যাপ্রেশিয়েশন দিয়ে একটি নির্মিয়মান প্রতিষ্ঠানের চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না, দরকার ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রেশিয়েশন। অর্থাৎ 'ক্রিটিক' টা লাগে। আপনাদের সমালোচনা যারা করে, তারা এই ব্লগকে ধারণ করে বলেই করে। অতএব তাদেরকে শত্রু ভাবার কোনো কারণ নেই।

অনুরোধ করি, এইসব ব্যান-ব্যান খেলা বন্ধ করেন। গলা চাইপা ধরলে কথা বন্ধ হয় বটে, কিন্তু যে গোঁ-গোঁ শব্দ আসে, সেইটা একসময় গর্জনের মতো শোনায়। কালকে সামী তার পোস্টে সেই প্রমাণ দিছেন। অতএব গলা চাইপা ধরা কোনো কাজে কথা না। সবাইরে মুক্তভাবে কথা বলতে দেন, সেইটা সবার জন্য শুভ ও কল্যাণকর হইবো।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28915198 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28915198 2009-02-23 13:52:00
'আসলে কেউগা আমি? কোনহানতে আইছি হালায় দাগাবাজ দুনিয়ায়?'
'এই মাতোয়ালা রাইত' শিরোনামে আশ্চর্য-অসাধারণ একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান; পুরনো ঢাকার এক বাসিন্দার মুখ দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন জীবনের এক অসামান্য ব্যাখ্যা।

পুরনো ঢাকার মানুষগুলো যখন সাহিত্যে উঠে আসে তখন এমনিতেই খুব কালারফুল হয়ে ওঠে, বিশেষ করে তাদের ভাষার কারণে। আখতারুজ্জমান ইলিয়াস এবং শহীদুল জহিরের গল্প-উপন্যাসে আমরা এমন অনেক কালারফুল চরিত্রের দেখা পেয়েছি। কিন্তু কবিতায়? আমার জানা মতে রাহমানের এই কবিতাটিই একমাত্র।

কবিতাটি শুরু হয় খুব হালকা চালে, এক আপাদমস্তক নেশাখোরের জবানিতে-

'হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের
লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি
মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা
রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন
আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান
আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও'

বোঝা যায়, নেশাখোর এই লোকটি নিশিখোরও বটে- ' রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা' ; আর রাতের কী আশ্চর্য বর্ণনা দিচ্ছে সে, দেখুন-'কান্দুপট্টির খানকি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে!' রাতের শরীরে 'কান্দুপট্টির খানকি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান'! কী অসাধারণ উপমা!

কবিতা আরো কিছুদূর এগোয় হালকা চালেই-

'আবে, কোন্ মামদির পো সামনে খাড়ায়? যা কিনার,
দেহস না হপায় রাস্তায় আমি নামছি, লৌড় দে;
না অইলে হোগায় লাথথি খাবি, চটকানা গালে।
গতরের বিটায় চেরাগ জ্বলতাছে বেশুমার।'

মনে হচ্ছে, যেন এক রাজা সে, এই রাতের শহরে। কেউ সামনে দাঁড়ালে 'হোগায় লাথথি ' খাবে, অথবা 'চটকানা গালে।' কিন্তু এখানেই থামছে না সে, নিজের পরিচয় দিচ্ছে এইভাবে-

'আমারে হগলে কয় মইফার পোলা, জুম্মনের
বাপ, হস্না বানুর খসম, কয় সুবরাতি মিস্ত্রি।
বেহায়া গলির চাম্পা চুমাচাট্টি দিয়া কয়, 'তুমি
ব্যাপারী মনের মানু আমার, দিলের হকদার।'

অর্থাৎ, আমাদের যা যা পরিচয় হতে পারে তার সবই ধরা হলো এই পঙক্তিগুচ্ছে- কারো সন্তান, কারো বাবা, কারো স্বামী, কারো বা প্রেমিক। এমনকি পেশাগত পরিচয়েও তো পরিচিত হই আমরা! কিন্তু এগুলো কি সত্যিকার অর্থেই আমাদের 'পরিচয়' তুলে ধরতে পারে? পারে না। আর তাই, কবিতাটিও এতক্ষণের হালকা চাল ছেড়ে এবার প্রবেশ করে এক গভীর দার্শনিক জগতে-

'আমার গলায় কার গীত হুনি ঠাণ্ডা আঁসুভরা?
আসলে কেউগা আমি? কোনহানতে আইছি হালায়
দাগাবাজ দুনিয়ায়? কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ?
চুড়িহাট্টা, চান খাঁর পুল, চকবাজার, আশক
জমাদার লেইন, বংশাল; যেহানেই মকানের
ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল
মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ,
যেমুন আধলি একখান খুব দূর জামানার।'

নিজের গলায়ই সে যেন অন্য কারো 'গীত' শোনে 'ঠাণ্ডা' অশ্রুভরা! এবং প্রশ্ন করে - কে আমি, কোত্থেকে এসেছি এই 'দাগাবাজ দুনিয়ায়?' শেষ পর্যন্ত কোথাযই বা যাবো? যেখানেই যাক, সে তো সে-ই একই মানুষ- 'গোলগাল মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ'! এবং নিজেকে তার মনে হচ্ছে- খুব দূর অতীতের 'আধলি একখান!'

মানুষের অস্তিত্ব-অনুসন্ধানের জন্য প্রাচীন সব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে একই তালে কবিতা এগোয়, এবং আমাদেরকে উপস্থিত করে আরো গভীর-গভীরতর প্রশ্নের মুখোমুখি-

'আমার হাতের তালু জবর বেগানা লাগে আর
আমার কইলজাখান, মনে অয়, আরেক মানুর
গতরের বিতরে ফাল পাড়ে; একটুকু চৈন নাই
মনে, দিল জিঞ্জিরার জংলা, বিরান দালান। জানে
হায়বৎ জহরিলা কেঁকড়ার মতন হাঁটা-ফিরা
করে আর রাইতে এমুনবি অয় নিজেরেও বড়
ডর লাগে, মনে অয় যেমুন আমিবি জমিনের
তলা থন উইঠা আইছি বহুত জমানা বাদ।'

নিজেকেই নিজের কাছে অচেনা লাগে! এমনকি নিজের হাতের তালুও 'বেগানা' লাগে; নিজের 'কইলজাখান'ও যেন অন্য কারোর, নিজের শরীরে এসে 'ফাল পাড়ে!' আর রাতে নিজেকেও বড় 'ডর লাগে', মনে হয় মাটির ভেতর থেকে সে উঠে এসেছে বহুকাল পর!

কবিতা থামে না, এবার তার চোখে পড়ে এক শবযাত্রা। পুরনো ঢাকার স্বভাবজাত কৌতুকপূর্ণ ভাষায় তার বর্ণনাও দেয় সে, আর মনে হয়-'আজরাইল আইলে' তাকেও অন্ধকার কবরে 'হান্দাতে' হবে! এবং মনে হয় এ-ও যে, মৃত্যু এক নিত্য সহচরের মতোই সত্য আর কাছের-

'এ-কার মৈয়ত যায় আন্ধার রাইতে? কোন ব্যাটা
বিবি-বাচ্চা ফালাইয়া বেহুদা চিত্তর অইয়া আছে
একলা কাঠের খাটে বেফিকির, নোওয়াব যেমুন?
বুঝছোনি হউরের পো, এলা আজরাইল আইলে
আমিবি হান্দামু হ্যাষে আন্ধার কব্বরে। তয় মিয়া
আমার জেবের বিতরের লোটের মতই হাচা মৌত।'

কিন্তু মৃত্যু তো আসলে আমাদেরকে জীবনের পক্ষেই দাঁড় করিয়ে দেয়! আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়- আমরা বেঁচে আছি; বেঁচে থাকা কী সুন্দর, কী অসাধারণ! সে-ও এবার তা-ই ভাবছে, এবং বেঁচে থাকার গৌরবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে! -

'এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে
গোলাব ফুলের বাস, মাঠার মতন চান্নি দিলে
নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ
মাইয়া, গহীন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর
আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ, ঝুম
কাওয়ালীর তান, পৈখ সুনসান বানায় ইয়াদ।
এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া
মৌত তক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই।'

হ্যাঁ, বেঁচে আছি বলেই তো এখনো ফুলের সুবাস নাকে আসে, চাঁদনি রাত 'দিলে ঝিলিক মারে', আর জীবনের নানা আয়োজনের মধ্যে ফিরে ফিরে যাই- নারী, সুর ও সুরার কাছে! আর তাই- 'মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া মৌত তক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই!' কী অসাধারণ লাইন!

কিন্তু এখানে এসেও কবিতাটি থামে না। আত্ন-অনুসন্ধানের পরিক্রমা শেষে কোনো প্রশ্নের ঠিকঠাক না পেয়েও যখন সে জীবনের পক্ষে দাঁড়ায়, বেঁচে থাকার আনন্দে মুখর হয়, তখন আবার ফিরে আসে সেই ভাবনা! অস্তিত্বের অর্থ কি?-

'তামাম দালান কোঠা, রাস্তার কিনার, মজিদের
মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের
পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির-
হগলই খোওয়াব লাগে আর এই বান্দাবি খোওয়াব!'

সবই স্বপ্ন তাহলে? এমনকি এই আমিও? আমার অস্তিত্বও?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28913100 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28913100 2009-02-19 00:12:04
কৈশোরপর্ব
এখন আমার মনে হয়, ওই অভিজ্ঞতাগুলো আমার ঝুলিতে জমা না পড়লে- 'দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ মরণের সাথে লড়িয়াছে'- এই পঙক্তির অর্থ আমি বুঝতেই পারতাম না! ফড়িঙের ওই ঘন শিহরণ কী মায়াময়, কী মন খারাপ করা! জীবনানন্দ ছাড়া আর কেই-বা এভাবে দেখতে পেরেছিলেন!

২.
আমার ছোটবেলা ছিলো পাখিময়। টুনটুনি, চড়ুই, শালিখ, কবুতর, ঘুঘুর বসবাস ছিলো আমার গ্রামের বাড়িতে। নারকেল গাছে কাঠ ঠোকরা আর টিয়ে বাসা বেঁধেছিল। বাবুইয়ের বাসা ঝুলতো তালগাছের ডগায়! দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবুইয়ের ওই কারুকার্যময় বাসা বোনার কাণ্ড দেখতাম। বাড়িতে বিরাট একটা শিমুল গাছ ছিলো, ছোটবেলায় সেটাকে মনে হতো আকাশের সমান উঁচু, সেখানে বাসা বেঁধেছিল চিল, মাঝে মাঝেই হানা দিয়ে ছোঁ মেরে মুরগির বাচ্চা ধরে নিয়ে যেত। শকুনের দেখা মিলতো গরু মরে গেলে। রাত দুপুরে প্রহরজাগা পাখি ডাকতো। ওই পাখির নাম কখনো জানা হয়নি, গ্রামের মানুষ বলতো 'কোড়াল'। আসল নাম যে কী, কে জানে! ডাকটা ছিলো করুণ আর প্রলম্বিত, শুনলে ভারি মন খারাপ হয়ে যেত! মাকে কতবার জিজ্ঞেস করেছি ওই পাখির কথা। মা বলতো, রাতের তিন প্রহরে তিনবার ডেকে ওঠে ওই পাখি, তাই ওর নাম প্রহরজাগা পাখি। গাছের ডালে ঠিক মাঝরাতে ডেকে উঠতো পঁ্যাচা। ওই গুরুগম্ভীর ডাক শুনে অজানা কারণে ভয়ে গা হিম হয়ে যেত। তেমনই এক ভয় ধরানো পাখি ছিলো 'কুক পাখি'। এই পাখিটারও নাম জানা হয়নি কোনোদিন। সবাই বলতো- কুক পাখি অমঙ্গল বয়ে আনে! প্রায় সারারাত ধরে পাখিটা কোন অন্ধকারে বসে যে ডেকে চলতো! ডাকের ধরনটা ছিলো এইরকম : কুক... (বিরতি)... কুক... (বিরতি)...কুউক...(দীর্ঘ বিরতি)...কুক কুক কুক...। কোনোদিন দেখা হয়নি পাখিটাকে। আরেকটা পাখিও ছিলো অমঙ্গলের চিহ্নবাহী। মাটিতে ঠোঁট ডুবিয়ে বিচিত্র ঘররর ঘররর শব্দে ডাকতো ওটা। সবাই বলতো- এই পাখিটা সবসময়, সব জায়গায় ডাকে না; যে বাড়িতে মৃত্যু আসন্ন, সেই বাড়িতে ডাকে। মাটিতে মুখ ডুবিয়ে ডাকার মানে হলো- সময় হয়ে এসেছে, কবর খোঁড়ো। আমি জীবনে একবারই ওই পাখির ডাক শুনেছি। বাড়িতে সেদিন বাড়তি সতর্কতা। এবং কী আশ্চর্য, দুদিন পরই দাদু মারা গেলেন! প্যাঁচা, কোড়াল, কুক, আর মাটিতে মুখ ডুবিয়ে ডাকা পাখি- এর সবগুলোই ছিলো রাতে ডাকা পাখি। প্যাঁচা ছাড়া আর কোনোটাকে কোনোদিন দেখাই হয়নি। টুনটুনি, চড়ুই, শালিখ, কবুতর, ঘুঘু, বাবুই, টিয়ে, কাঠ-ঠোকরার মতো আনন্দময় পাখি যেমন ছিলো, তেমনই ছিলো ওইসব নাম-না-জানা ভয়-ধরানো রোমাঞ্চকর পাখি।

নানা ধরনের ছোটখাটো জিনিসের প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো মাত্রাতিরিক্ত। প্রজাপতির রঙ দেখে মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতাম। টুনটুনি পাখি বরাবরই ভীষণ মন কাড়তো আমার। এই এতটুকুন পাখি, অথচ কী প্রাণবন্ত! সদা চঞ্চল, সর্বদা চলমান; কোথাও দুদণ্ড বসবার ফুরসত নেই। যদিও বা এক দণ্ড বসে, তখনো ব্যস্ততার শেষ নেই। চড়ুইও কাছাকাছি ধরনের চঞ্চল। মনে পড়ে- একবার ভাইয়া একটা চড়ুই ধরে দিয়েছিল। গভীর মমতায় আমি সেই চড়ুই বুকের মধ্যে চেপে ধরে সারা বিকেল আর সন্ধ্যা ঘুরে বেড়ালাম। রাতে খাবারটাও নিজ হাতে খেলাম না। মা বারবার বলতে লাগলো- ওটাকে ছেড়ে দে, মরে যাবে তো! এত আদর করে ধরে রেখেছি, মরে যাবে কেন, বুঝতে না পেরে মা'র কথা শোনা হলো না। কখন যে চড়ুইটাকে বুকে চেপেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই। ঘুম ভেঙে দেখি, হাতের মধ্যে চড়ুইটা মরে পড়ে আছে। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

ঘটনাটি আমাকে এক ধাক্কায় অনেকখানি বড় করে তুলেছিল।

সারা জীবন ধরে মনে হয়েছে- অতি কাঙ্ক্ষিত, অতি ভালোবাসার কোনো জিনিসকে এত গভীরভাবে চেপে ধরতে নেই। ধরলে, মরে যায়!

[শৈশব-কৈশোরের কথা লিখতে গেলে কলম থামতে চায় না! তবু, এতটুকুই থাকুক আজ।]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28909377 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28909377 2009-02-10 22:29:32
আমরা যা বলতে পারি না, সেখানে নীরবতাই উত্তম কথক
‘what we can not speak about, we must consign to the silence’

এই একটি বাক্যই আমাকে বুঝিয়ে দেয় - এক আশ্চর্য প্রতিভাবান মানুষের একটা বই আমি বুঝে হোক না বুঝে হোক, পড়ে শেষ করে ফেলেছি। আগ্রহ জন্মে তাঁর ব্যাপারে। নানা বইপত্র ঘেঁটে জানতে পারি, এ্যারোনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেছিলেন তিনি, সেখানেই গণিতের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং হাতে পান বার্টান্ড রাসেলের প্রিন্সিপলস অব ম্যাথমেটিক্স, যেটি তাকে দর্শন সম্পর্কেও উৎসাহী করে তোলে। রাসেল নিজেই ভিটগেনস্টাইনের সঙ্গে তার কথাবার্তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, (ভিটগেনস্টাইন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন)-

‘Will you please tell me whether I am a complete idiot or not?’ (আপনি কি দয়া করে বলতে পারেন, আমি পুরোপুরি ইডিয়ট কী না!)

I replied, ‘My dear fellow, I don’t know. Why are you asking me?’(আমি তো জানি না! কেন একথা জিজ্ঞেস করছেন?)

He said, ‘Because, if I am a complete idiot, I shall become an aeronaut; but, if not, I shall become a philosopher.’(আমি যদি পুরোপুরি ইডিয়ট হয়ে থাকি, তাহলে ইঞ্জিনিয়ার হবো। তা না হলে দার্শনিক হবো!)

I told him to write me something during the vacation on some philosophical subject and would tell him whether he was a complete idiot or not. At the beginning of the following term he brought me the fulfillment of this suggestion. After reading only one sentence, I said him, ‘No, you musrt not become an aeronaut.’(আমি তাকে সামনের ছুটিতে দার্শনিক বিষয়ে কিছু একটা লিখে আনতে বললাম এবং জানালাম, ওটা পড়ে আমি তাকে জানাবো, সে ইডিয়ট কী না! ছুটিশেষে যথারীতি সে একটা লেখা আমাকে দেখালো, আর একটা মাত্র বাক্য পড়েই আমি তাকে বললাম - না, আপনি কোনোভাবেই ইঞ্জিনিয়ার হবেন না!)

কমপ্লিট ইডিয়ট হলে ইঞ্জিনিয়ার হবেন, আর না হলে দার্শনিক হবেন! রাসেলের এই স্মৃতিচারণ পড়ে ভীষণ মজার আর মধুর এক চরিত্র মনে হলো ভিটগেনস্টাইনকে। শুধু কি তাই, পিএইচডির জন্য থিসিসটি হাজির করার পর মৌখিক পরীক্ষার দিন তিনি তাঁর পরীক্ষকদ্বয় বার্টান্ড রাসেল আর জি ই মূরকে বলে বসেন, 'আমি জানি আপনারা এটা বুঝবেন না!' মৌখিক পরীক্ষার সময় পরীক্ষকদের কেউ একথা বলতে পারেন, এবং সেটি শুনেও পরীক্ষকরা তাকে ডিগ্রি দিতে পারেন - এটা বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। শুধু এখানেই নয়, তার চরিত্রের অদ্ভুতত্ব আরো অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি মনে করতেন, দার্শনিকের কোনো সম্পত্তির প্রয়োজন নেই! কেমব্রিজ ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রায় ছ-বছর গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। এই সময় কোলাহল এড়ানোর জন্য তিনি কিছুদিন এক সরাইখানার পরিত্যক্ত বাথরুমে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন! কেমব্রিজে ফিরে তিনি দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে স্বেচ্ছায় সেই পদ ত্যাগ করে কাজ করলেন হাসপাতালে প্রথমে পোর্টার এবং পরে ল্যাবরেটরি এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে।

তাঁর ওই থিসিসে মোট সাতটি প্রোপোজিশন ছিলো। শেষেরটি ছাড়া অন্যগুলোতে আবার সমর্থনমূলক প্রোপোজিশনও ছিলো। ব্যাপারটা এরকম : তিনি থিসিস শুরু করেছিলেন এইভাবে- ১. দি ওয়ার্ল্ড ইজ অল দ্যাট ইজ দা কেইস। [জগৎ হলো সমুদয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার সমষ্টি]

এই প্রোপোজিশনের সমর্থনে তিনি লিখলেন :

১.১ দি ওয়ার্ল্ড ইজ দা টোটালিটি অফ ফ্যাক্টস, নট অফ থিংস। [জগৎ হলো সমুদয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার সমষ্টি, বস্তুর সমষ্টি নয়।]

১.১১ দি ওয়ার্ল্ড ইজ ডিটারমিনড বাই দা ফ্যাক্টস, অ্যান্ড বাই দেয়ার বিইং অল দা ফ্যাক্টস [ জগৎ নিরুপিত হয় বাস্তব ঘটনা/অবস্থার দ্বারা এবং এইসব অবস্থার ফল দ্বারা!]
ইত্যাদি।

একেকটি প্রোপোজিশন ব্যাখ্যার জন্য তিনি অনেকগুলো করে সমর্থনসূচক প্রোপোজিশন লিখলেন বটে (যেমন : ৪, ৪.১, ৪.১১... ৪.৪৪১, ৪.৪৪২... ৪.৪৬৬১, ইত্যাদি), কিন্তু শেষ প্রোপোজিশন - ‘what we can not speak about, we must consign to the silence’-এর পরে আর কিছুই লিখলেন না!

মনে হয়, যেন, এতকিছু বলার পরও যে কথাগুলো বলা হলো না, সেগুলো সম্বন্ধে নীরবতা পালন করা ছাড়া উপায় নেই! নীরবতারও তো নিজস্ব একটা অর্থ আছে। যদি অনুবাদ করে নেয়া যায়, তাহলে নীরবতাই সর্বোত্তম ভাষা - এই কথা মনে হয়েছিল আমার, ওই অসামান্য লাইনটি পড়ে। আর জীবনে বারবার তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে উচ্চারিত শব্দের চেয়ে নীরবতাই অধিকতর বাঙময় হয়ে উঠেছে।

নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি। ছিলেন চিরকুমার, বন্ধু-বান্ধবও ছিলো না কোনো। তাঁর চরিত্রের যে প্যাটার্ন, তাতে নিঃসঙ্গ থাকাটাই ছিলো স্বাভাবিক। কিন্তু এমনটি বলা হয় যে, তাঁর পরে পৃথিবীতে এমন কোনো দার্শনিক আসেননি, যিনি তাঁর সম্বন্ধে (পক্ষে-বিপক্ষে) দু-চার কথা লেখেননি! এমন গুরুত্ব কজন মানুষই বা পান?

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিজ চিকিৎসকের বাড়িতে মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন : `Tell them, I’ve had a wonderful life!’ হ্যাঁ, wonderful-ই বটে। জীবন নিয়ে এইভাবে ছিনিমিনি কজন-ই বা খেলতে পারেন! কজন-ই বা বলতে পারেন -'হোয়াট উই ক্যান নট স্পিক অ্যাবাউট, উই মাস্ট কনসাইন টু সাইলেন্স!'
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28898791 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28898791 2009-01-17 22:52:32
প্রেডিকশন! " style="border:0;" />

এবার বন্ধুরা বাজি ধরার উৎসাহ পাচ্ছে না! কারণ কী কে জানে! বাজি ধরা হোক আর না হোক, সহব্লগারদের সামনে নিজের প্রেডিকশন তো হাজির করা যায়! চাইলে আপনারাও আপনাদের প্রেডিকশন এখানে রেখে যেতে পারেন, দুদিন পর না হয় সবাই মিলিয়ে দেখবো!

আমার এই প্রেডিকশনের মূল পয়েন্ট হলো- কোনো দল বা জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, এবং এটি হবে একটি ঝুলন্ত সংসদ! এই ধারণা যদি মিলে যায়, তাহলে পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করবো এমনটি মনে হবার কারণ কী! না মিললে তো আর ব্যাখ্যার প্রয়োজনই পড়বে না!

আগামীকালের নির্বাচনে দল-অনুযায়ী আসনসংখ্যা হবে এরকম :

আওয়ামী লীগ : ১২০ থেকে ১২৫
বিএনপি : ১১০ থেকে ১১৫
জাতীয় পার্টি : ২০ থেকে ২২
জামাত : ৮ থেকে ১০
অন্যান্য : ৩০ থেকে ৩৫

* অন্যান্য বলতে বিভিন্ন ছোট দল, যেমন বিকল্প ধারা, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম প্রভৃতি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরকে বোঝানো হচ্ছে। সরকার গঠনে এরাই হবে ডিটারমিনিং ফ্যাক্টর।

** আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় মিলেও ১৫১টি আসন পাবে না।

*** জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচনের পর ডিগবাজি দিয়ে বিএনপি-জামাত জোটের সঙ্গে যোগও দেয় তবু ১৫১টি আসন পাবে না।

এবার আপনাদের পালা, দেখা যাক কার প্রেডিকশন কতোটা সঠিক!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28889393 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28889393 2008-12-28 22:56:44
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ : অনিবার্য ছিলো, আকস্মিক নয়
এরকম একটা কথা বলা হয় যে, পলাশির আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব যখন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন আশেপাশের কৃষকরা হয়তো তাদের দৈনন্দিন জীবনের ধারাবাহিকতায় মাঠে কাজ করছিলো, যুদ্ধ শেষ হলে হয়তো একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেসও করেছিলো - আজকে কী ঘটলো! হয়তো যুদ্ধের কথা জেনে এ-ও জানতে চেয়েছিলো কে হারলো কে জিতলো, কিন্তু নবাব হেরে গেছেন শুনে তাদের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো বলে মনে হয় না। এই পরাজয়ের সংবাদটিকে হয়তো তারা একটি মাত্র বাক্য দিয়ে গ্রহণ করেছিলো - 'ও আচ্ছা।' কিন্তু এই ঘটনা যে তাদের জীবনে কী দীর্ঘস্থায়ী ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনবে তা তারা ভেবেই দেখেনি। এ কথা সত্যি যে, নবাবের সঙ্গে বৃহত্তর জনজীবনের কোনো সম্পর্ক ছিলো না, ফলে নবাবের জয়-পরাজয়ে তাদের বিশেষ কোনো ভাবান্তর না থাকাই স্বাভাবিক। তাই বলে নিজেদের নবাব হেরে গেলো বিদেশী একদল লোকের কাছে এটা কী কোনো প্রভাবই ফেলবে না তাদের মনে?

এরকম ঘটনা শুধু দুশো বছর আগেই নয়, আজও ঘটে চলেছে। স্বাধীনতার পর এদেশে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে - '৯০ এর গণআন্দোলনের কথা মনে রেখেই বলছি - সেগুলো মূলত ছিলো শহরভিত্তিক, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, যারা গ্রামে বাস করে, এসবের তোয়াক্কাই করেনি।

অথচ বড়ো মাপের পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছিলো সেখানে তারা এমন নিরাসক্ত ছিলো না, আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি, বরং তাদের তুমুল অংশগ্রহণই আমাদের বিজয়কে অনিবার্য করে তুলেছিলো। এক অদ্ভুত উদাসীনতা, নিরাসক্তি ও নিস্পৃহতা থাকা সত্ত্বেও একাত্তরে এই জাতি যে মুক্তিযুদ্ধে তুমুলভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো তার কারণ কি? বাঙালি তো কোনোদিনই যোদ্ধা জাতি নয়, চিরকাল সে নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চেয়েছে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই মিলে এমন মরনপণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো কেন? এটা কি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা? সেরকমটি মনে করার কোনো কারণ নেই। হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনায় এত দ্রুত একটি জাতি সংঘবদ্ধ হতে পারে না। তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আগে থেকেই এমন একটি প্রস্তুতি ছিলো? থাকলে তো তাদেরকে আর উদাসীন বলে আখ্যা দেয়া যায় না। বোঝা যায় এ নিয়ে তাদের আগে থেকেই চিন্তাভাবনা ছিলো। তাহলে সেটা বোঝা যায়নি কেন? তবে কি বিষয়টা এরকম যে, বাঙালি যতটা উদাসীনতা দেখায় আসলে তারা অতোটা উদাসীন নয়! এ প্রসঙ্গে আমি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি তাঁর একমাত্র লিখিত বক্তৃতা - 'বাংলাদেশ: জাতির অবস্থা'য় বলেছেন -

'বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা একটা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়। .... এই জাতিকে তৈরি করেছে তার অনমনীয় গর্ব, সুখে-দুঃখে আট কোটি মানুষের সঙ্গে একই পরিচয় বহন করা, অন্য কিছু নয়, শুধু বাঙালি হতে চাওয়ার জেদ।' ১৯৪৭-এর দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও ভাগ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য _ 'বাংলাভাষী জনগণের অধিকতর বাঙময় অংশটি (অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি) ভারতীয় জাতির বৃহত্তর পরিচয়ে নিজের অধিকার হারানোকেই ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিলো।... কিন্তু - 'বাংলাভাষী জনগোষ্ঠির বৃহত্তর অংশটি (অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের বাঙালি) যদিও ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একলা পথ চলতে গররাজি ছিলো না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের মিলিত হওয়ার পক্ষে রায় দিলো, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিলো যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ।'

অধ্যাপক রাজ্জাক মনে করেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার ব্যাপারে এদেশের মানুষের কোনো আপত্তি না থাকলেও বৃহত্তর ভারতীয় জাতিসত্ত্বায় নিজেকে বিলীন করে দেয়াতে তাদের আপত্তি ছিলো, ফলে বিকল্প হিসেবে তারা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলো এবং সেটা তারা করেছিলো নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। এই বৈশিষ্ট্যগুলোরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষা আন্দোলনসহ, বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চালানো পাকিস্তানি বিভিন্ন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে নানাবিধ আন্দোলন ও পরিশেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

কেন মুক্তিযুদ্ধ এদেশের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো - এ প্রশ্ন করলে যেসব উত্তর বিভিন্ন তরফ থেকে পাওয়া যায় তাতে অবশ্য এ কথা মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে প্রায় সবাই-ই পাকিস্তানি শাসন-শোষণের কথা বলেন। এসব কথা শুনলে মনে হয় যে, পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী যদি আমাদের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক নির্যাতন না চালাতো, কিংবা কেন্দ্রে যদি বাঙালি শাষক থাকতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। এ কথার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আমাদের যুদ্ধটি হয়েছিলো পাকিস্তান কনসেপ্টের বিরুদ্ধে নয়, পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে। বলাবাহুল্য যে, এটা একটা কারণ বটে তবে একমাত্র কারণ নয় মোটেই, একমাত্র কারণ যদি হয়েই থাকে তাহলে একে মহান একটি ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করার মধ্যে ঝুঁকি আছে। কারণ, সেক্ষেত্রে মনে হতে পারে - পাকিস্তান নামক একটি চাপিয়ে দেয়া কনসেপ্টের বিরুদ্ধে না গিয়ে এদেশের মানুষ স্রেফ ওদের শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলো। অর্থাৎ এই যুদ্ধ অনিবার্য ছিলো না, ছিলো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা, ওদের শাসনটা শোষণে পরিণত না হলে ঘটনাটি আর ঘটতো না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মতের পক্ষে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিলো, কারণ এই দেশের মানুষ নিজেদেরকে একটি জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলো, আর যেহেতু একটি জনগোষ্ঠীকে জাতি হয়ে উঠতে হলে তাদের জন্য একটি আবাসভূমির প্রয়োজন হয় তাই তারা নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিলো (আমি এ-ও মনে করি পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ হতো, হয়ত সেটা '৭১-এ নয়, তবে হতোই) ফলে একটি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র নির্মাণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্য এ দেশের মানুষের প্রতীক্ষা ও আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘকালের (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মানে শুধু '৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বরের ইতিহাস নয়, এমনকি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর ইতিহাসও নয়, এই ইতিহাসের মূল খুঁজতে গেলে আমাদেরকে আরও সুদূর অতীতে যেতে হবে - অধ্যাপক রাজ্জাকও তাঁর বক্তৃতায় সেদিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন); মুক্তিযুদ্ধ তাদের সুযোগ করে দিয়েছিলো যুদ্ধের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রটি নির্মাণের। অতএব কেবল মাত্র পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্যই যুদ্ধটি হয়েছিলো - এরকম ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বিষয়টিকে বন্দি করে ফেলার কোনো সুযোগই নেই। বরং নিজস্ব জাতিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে এটাই ছিলো বাঙালির ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র পদক্ষেপ, এবং এতে অংশগ্রহণ ছিলো এদেশের আপামর জনসাধারণের। এদেশের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিলো এর জন্য, পাকিস্তানি শোষণ কেবল এক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলো। একটি জনগোষ্ঠী যখন নিজেদেরকে একটি জাতি হিসেবে আত্নপরিচয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং একটি স্বতন্ত্র রাষ্টের আকাঙ্ক্ষা থেকে এরকম ব্যাপক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অর্থও হয়ে ওঠে ব্যাপক, ঘটনাটি হয়ে ওঠে মহান। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধও ছিলো তেমনই একটা মহান ব্যাপার।

বিষয়টি এভাবে দেখলে আমরা বলতে পারি যে, '৪৭-এ মানুষ যে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো সেটা তাদের মনের কথা ছিলো না, তারা শুধু বৃহত্তর ভারতীয় জাতিসত্ত্বার অংশ হয়ে উঠতে চায় নি বলেই একটি বিকল্প বেছে নিয়েছিলো এবং সুযোগ আসা মাত্র অবিলম্বে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো।

প্রশ্ন হচ্ছে - দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির এমন ভয়াবহ, করুণ, মর্মান্তিক ও হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা দেখে কি আমরা আমাদের স্বপ্নকে বাক্সবন্দি করে দীর্ঘনিদ্রায় যাবো, এবং ভাববো যে, এই ঘুম ভাঙার পরে নিশ্চয়ই অবস্থা ভালো হয়ে যাবে? আমার মনে হয় না - মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলার কোনো কারণ আছে। যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি ঘটনা ঘটায় - এত সহজে তাদের প্রতি আস্থা হারালে চলবে কীভাবে? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28882071 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28882071 2008-12-14 02:00:22
'পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন'
কবিতা কি ব্যাখার মতো বিষয়, নাকি অনুভবের? ব্যাখ্যায় কি কবিতা হারিয়ে যায় না, নাকি সহায়তা করে বুঝে ওঠার জন্য? এইসব প্রশ্ন প্রায়ই মনে জাগে, আর কেবলি মনে হয় - এটি ব্যাখ্যাযোগ্য কোনো বিষয় নয়! তবে পাঠক নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই দাঁড় করায়, নিজের মতো করে গ্রহণ করে একটা কবিতাকে। আর সেটিই কবিতার শক্তি। একটা কবিতা একেকজন পাঠকের কাছে একেক মাত্রায় ধরা দেয়। ব্যক্তিভেদে একটা কবিতার ব্যাখ্যা পাল্টে যায়, হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক। এদিক থেকে দেখতে গেলে কবিতার ব্যাখ্যা একইসঙ্গে বিপদজনক এবং আনন্দদায়ক। বিপদজনক, কারণ - যে কেউ বলতে পারেন, এই ব্যাখ্যা ঠিক নয়, ব্যাখ্যাটা আসলে এইরকম। তিনি ভুল বলেন না, কারণ তার কাছে কবিতাটি ওভাবেই ধরা দিয়েছে। অন্যদিকে আননন্দদায়ক, কারণ এই তর্ক-বিতর্কে একটা কবিতার বহুমাত্রিক রূপটিও ধরা পড়ে।

এই লেখায় আমি জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' সম্বন্ধে নিজের অনুভুতির কথা বলার চেষ্টা করবো।

কবিতার শুরুটা এরকম :

'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।'

হাজার বছর ধরে আসলে কে পথ হাঁটে? এটাকে কি আক্ষরিক বলে ধরে নেব আমরা? সেক্ষেত্রে তো প্রশ্ন জাগেই - একজন মানুষ 'হাজার বছর ধরে' পথ হাঁটে কীভাবে? সেটি যেহেতু সম্ভব নয়, তাই কথাটিকে আক্ষরিক বলে ধরে নেবারও সুযোগ নেই। তাহলে কি দীর্ঘ ভ্রমণের ইমেজ আনার জন্য কথাগুলো বলা হয়েছে? হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা, বা সমুদ্রে ঘোরা, বা সুদূর অতীতে বাস করার এই ভাষ্যগুলো কি নিছক একজন পথিকের পথচলার বিবরণ আর পথচলাজনিত কারণে তৈরি হওয়া ক্লান্তির অনুভূতি পাঠকের মনে ছড়িয়ে দেবার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে? নাকি অন্য কোনো মানে আছে এর? আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা নিছক একজনমাত্র পথিকের পথচলার বিবরণ নয়। বরং হাজার বছর ধরে যারা এই পথে হেঁটে গেছে, যারা সাগর-সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়েছে, এমনকি 'বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে' যারা ছিলো বা ছিলো 'আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে' - এই বর্ণনাটি তাদের সবার। আর এই সব মানুষই দীর্ঘপথ পেরিয়ে যখন ক্লান্তপ্রাণ হয়ে গেছে, যখন তাদের 'চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন' তখন তাদেরকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছে 'বনলতা সেন'।

এখানে পথিক যেমন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, 'বনলতা সেন'ও তেমনই নির্দিষ্ট কেউ নয়। এটি কেবলই একটি নাম, যেটি বহন করছে ক্লান্ত মানুষের মোহন আশ্রয়ের প্রতীক। এইভাবে দেখলে আমার সুবিধা হয়, নিজেকেও ওই হাজার বছর ধরে পথচলা পথিকদের একজন বলে ধরে নিতে পারি। ভাবতে পারি, আমারও একজন 'বনলতা সেন' থাকলে চমৎকার হতো, আমার সমস্ত ক্লান্তি, সকল বেদনা ও হাহাকার আমি তাকেই সমর্পণ করে দুদণ্ড শান্তি পেতাম!

কিন্তু এইরকম ধরে নিয়ে পরের প্যারায় গিয়ে

'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; ...

পঙক্তি দুটো পড়লে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে- মুখটি কি শ্রাবস্তীর কারুকার্য হওয়া বা চুলগুলো 'অন্ধকার বিদিশার নিশা' হওয়া কি আবশ্যক? না হলে ক্ষতি কি? না, আশ্যক নয় মোটেই, না হলেও ক্ষতি নেই কোনো, আপনার 'বনলতা সেন' আপনার মনের মতো হলেই হলো! কিন্তু এই প্রশ্নও হারিয়ে যাবে পরের পঙক্তিগুলো পড়লে-

'...অতি দূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর..'

কী অসাধারণ চিত্রকল্প! 'অতিদূর সমুদ্রের পর' হাল ভেঙে যে নাবিক 'দিশা' হারিয়েছে, তার তো অনিশ্চয়তার শেষ নেই। সে তখন আছে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে - সে কী কোনোদিন ফিরতে পারবে মানুষের পৃথিবীতে, নাকি ওই সমুদ্রেই শেষ হয়ে যাবে তার জীবন - এরকম একটা দোলাচলে। আর তখন যদি হঠাৎ চোখে পড়ে - 'সবুজ ঘাসের দেশ .. দারুচিনি দ্বীপের ভিতর' - কেমন লাগবে তার? জীবন ফিরে পাবার আনন্দ, বেঁচে থাকার আনন্দ কী অসামান্য হয়ে উঠবে না তার কাছে? এরকম একটি ভয়াবহ চিত্রকল্প তৈরি করে, তারপর বলা হচ্ছে -

'তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।'

মানে- বনলতা এমনই একজন, যে জীবন ফিরে পাবার আনন্দ দেয়!

অবশ্য 'পাখির নীড়ের মতো চোখ' নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে কারো কারো। অসুবিধা নেই, আগেই বলেছি, আপনার বনলতা আপনার মনের মতো হলেই হলো। তারচেয়ে বড়ো কথা, এটাকে আক্ষরিকভাবে নেয়ারও কোনো দরকার নেই। 'পাখির নীড়' হয়তো আশ্রয়েরই প্রতীক।

এই কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় কথাগুলো আছে শেষ প্যারায়।

'সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে'

শিশিরের শব্দ? কেমন সেটা? বোঝা যায়, নাকি বোঝানো যায়? নাকি কেবলই অনুভব করে নিতে হয়?

'ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল'


রৌদ্রের গন্ধ? সেটা কিরকম? নিজেই কি বুঝলাম কিছু, যে বোঝাবো অন্য কাউকে?

'পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জেনাকীর রঙে ঝিলমিল'

এটা মোটামুটি বোঝা গেল। পৃথিবীর সব রঙ মুছে গিয়ে জীবন এখন বর্ণহীন, সাদাকালো। পাণ্ডুলিপির আয়োজন শেষ, তখন সবই 'গল্প' হয়ে গেছে। একদিন তো সবকিছুই 'গল্প' হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত!

এই পঙক্তি দুটোকে আরো বেশি সাপোর্ট দেয় শেষের দুই পঙক্তি -

'সব পাখী ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ-জীবনের সব লেন দেন ;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।'

জীবনের সব লেনদেন ফুরিয়ে গেছে, আর কিছু নেই কোথাও। আছে শুধু অন্ধকার, আর এই বিপুল অন্ধকারের মধ্যে মায়াময় আলোর মতো বনলতা সেন!

আহা, আমাদের সবার জীবনে যদি অমন একজন করে 'বনলতা সেন' থাকতো!

[কৃতজ্ঞতা : প্রিয় ব্লগার একরামুল হক শামীম। এই কবিতাটিও আমি তার লেখা থেকে তাকে না বলেই ধার নিয়েছি!] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28869973 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28869973 2008-11-16 23:41:22
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৬ (শেষ পর্ব)
মধ্যবিত্তের চিন্তাশীল অংশটি অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা যুগ যুগ ধরে সততা, সত্যবাদিতা, ন্যয়পরায়নতা, দেশপ্রেম, মানবকল্যাণ ইত্যাদি মূল্যবোধ সৃষ্টি ও তা রক্ষা করার উপায় নিয়ে কথা বলে আসছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব নীতিবাক্য প্রায়ই মাঠে মারা যাচ্ছে। যারা এগুলো বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, স্বয়ং তাদের সন্তানরাই এগুলোর থোড়াই কেয়ার করে। তারা সত্যবাদিতাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, সততাকে মনে করে বোকামী, ন্যায়পরায়নতাকে মনে করে দুর্বলতা আর দেশপ্রেমকে মনে করে কুপমণ্ডকতা। এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে - মধ্যবিত্তের প্রথম জেনারেশনে এসব নীতিবাক্য বেশ কাজ দিলেও, দ্বিতীয় প্রজন্মই এর মধ্যেকার ফাঁকফোকরগুলো ধরে ফেলে এবং আবিষ্কার করে যে, একটু চালাকচতুর হলে আর এসব মূল্যবোধকে খানিকটা সরিয়ে রাখতে পারলেই মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙ্গিয়ে উচ্চবিত্তের উজ্জ্বল জগতে প্রবেশ করা যায়। অর্থাৎ 'ওপরে' ওঠা যায়। (দেখা যাচ্ছে, যারা ওপরে উঠতে চায় তারাই এসব মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখায়। মধ্যবিত্তের এই অংশটিই স্বাধীনতার পর নীতিহীন লুটতরাজে অংশ নিয়েছিলো।) ওপরে ওঠার সিঁড়িটি যে খুবই সরু, একসঙ্গে একজনের বেশি ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায় না, সে অচিরেই সেটাও আবিষ্কার করে ফেলে। ফলে প্রথমেই তাকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। ওঠার সময় পেছন থেকে কেউ তার পাশে আসার চেষ্টা করলে সে তাকে কনুই মারে, ধাক্কা মারে; সামনে থাকা লোকটিকে ল্যাং মারে আর পেছনে উঠতে থাকা লোকটিকে মারে পিছ-লাথি। এতসব কনুই, ধাক্কা, ল্যাং, পিছলাথি মারতে গেলে প্রথম তার জন্য যেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে এতকাল ধরে শিখে আসা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ। ফলে ওপরে ওঠার জন্য তাকে অনিবার্যভাবেই এসব মূল্যবোধ ঝেড়ে ফেলতে হয় - আর এভাবেই জন্ম নেয় (সামাজিক ভাষ্যমতে) নীতিবিবর্জিত, লুটেরা, আদর্শহীন (এই নীতি ও আদর্শের মানদণ্ডটি কিন্তু মধ্যবিত্তের তৈরি করা) উচ্চবিত্ত সমপ্রদায়। এর ফলে কি মধ্যবিত্তের মূল্যবোধগুলো সমাজ থেকে উধাও হয়ে যায়? না, যায় না। নীতিবাগিশ অনড় পুরনো চিন্তাবিদদের পাশাপাশি নতুন নতুন চিন্তাবিদদের উদ্ভব হয় মধ্যবিত্তদের ভেতর থেকেই। এদের কথাবার্তা তার নিজ শ্রেণীকে প্রভাবিত করুক আর নাই করুক, নিম্নবিত্ত থেকে যারা মধ্যবিত্ত হতে চাইছে তাদের কাছে এগুলো খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে - কারণ তার সমাজে এগুলো নেই, সে মনে করে এগুলো শিখলেই সে তার স্বপ্নের মধ্যবিত্তে পরিণত হতে পারবে। ফলে এসব নীতিবাক্য, মূল্যবোধ কিংবা আদর্শের আবেদন সহসা ফুরিয়ে যায় না। অতএব বলা যায় - মধ্যবিত্ত হচ্ছে একটা ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। নিম্নবিত্তরা স্বপ্ন দেখে মধ্যবিত্ত হবার, আবার মধ্যবিত্ত হয়েই বড়জোর এক বা দুই প্রজন্ম - তারপর উচ্চবিত্ত হবার জন্য তোড়জোর শুরু করে সে - অর্থাৎ মধ্যবিত্ত অবস্থানটিতে কেউ দীর্ঘদিন থাকতে চায় না।

মধ্যবিত্তদের নিয়ে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে সাধারণ যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো - এই শ্রেণীর ভবিষ্যৎ কি? মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা মধ্যবিত্তকে কোনো শ্রেণী হিসেবেই মানতে নারাজ। কেউ যদি মানেনও তাহলে সঙ্গে সঙ্গে গলার রগ ফুলিয়ে উচ্চকণ্ঠে এ কথাও বলতে ভোলেন না যে, এই শ্রেণীর অবস্থা মুমূর্ষু এবং অচিরেই এরা মৃতু্যবরণ করবে। যুগের পর যুগ ধরে তারা এই কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে - মধ্যবিত্ত তো মরছেই না বরং তাদের আকার ও আয়তন দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, বরং বেশ দাপটের সঙ্গে বেঁচে আছে। অবশ্য বিশ বছর আগের মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্যরা যে এখনো মধ্যবিত্তই আছে তা বলা যায় না। কেউ চেষ্টাচরিত্র করে উচ্চবিত্তের জগতে চলে গেছে, কেউ বা যুদ্ধে টিকতে না পেরে নিম্নবিত্ত হয়ে গেছে। এই নিম্নবিত্তকেই মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে। বিত্তের বিচারে এরা নিম্নবিত্তই, কিন্তু যেহেতু মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো তারা বেশ শক্তভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকে তাই তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে অমন একটি সমাসবদ্ধ নামে ডাকতে হয়। অন্যদিকে যারা উচ্চবিত্ত হবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে - অর্থাৎ যথেষ্ট বিত্তবান হলেও যারা মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো এখনও পুরোপুরি বিসর্জন দিতে পারেনি তাদেরকে বলা হচ্ছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত। আর দু-তিন প্রজন্ম ধরে যারা স্রেফ মধ্যবিত্তই রয়ে গেছে তারাই আসলে মধ্যবিত্ত বলে পরিচিতি পাচ্ছে। মধ্যবিত্তের চরিত্র বুঝতে হলে বুঝতে হবে এদেরকেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এতসব রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে তারা কতদিন তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে? বলা বাহুল্য মধ্যবিত্ত অবস্থাটি বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য - যে কোনো সময় নিম্নবিত্তের কাতারে চলে যাবার একটি ভয় থাকে। অনেক সময় দেখা যায় মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। এরকম দু-একটি উদাহরণ দেখে অবশ্য - এই শ্রেণী মৃত্যুমুখে পতিত - এমনটি ভাবার কোনো মানে হয় না। কারণ, যতদিন পর্যন্ত সমাজে নিম্নবিত্তরা থাকবে এবং তাদের জন্য শিক্ষার দ্বার স্থায়ীভবে বন্ধ করে দেয়া না হবে - ততদিন পর্যন্ত নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না। আর বন্ধ হবে না বলেই নতুন করে মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাবে - অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার আয়তন বাড়তে থাকবে। এ-দিক থেকে দেখলে বলতেই হয় - মধ্যবিত্তরা অমর ও অক্ষয় - কোনোদিনই এদের মৃত্যু হবে না।

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৫
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৪
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৩
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
Click This Link

যারা সম্পূর্ণ লেখাটি একসঙ্গে পড়তে চান, তাঁরা এই লিংক থেকে (আমার ওয়েবসাইটের) পড়তে পারেন।

লিংক : Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28862740 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28862740 2008-10-31 23:55:22
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৫
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে তার শ্রেণীকে নীতি শেখান তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মহান কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিজে মধ্যবিত্ত হয়েও মধ্যবিত্তদের সমালোচনায় ছিলেন মুখর, নিজেও সারা জীবন ধরে মধ্যবিত্তদের অনড়-অচল মূল্যবোধের সীমানা ডিঙিয়ে চলে যেতে চেয়েছেন, এবং এইসব রীতি-নীতিকে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে তিনি নিজেই যে বেশকিছু মূল্যবোধের জন্ম দিচ্ছেন, সেটা হয়তো খেয়ালও করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন - 'সাধারণ মানুষ যে ভালোভাবে বাঁচবে এটা আমি কোনো নীতিবোধ থেকে বলিনা - বলি কাণ্ডজ্ঞান থেকে; সাম্যের সমাজ চাওয়াও কাণ্ডজ্ঞানেরই চাওয়া।' - বলাইবাহুল্য তিনি যে কাণ্ডজ্ঞানের কথা বলেন তা মধ্যবিত্তেরই কাণ্ডজ্ঞান। উচ্চবিত্তের এই কাণ্ডজ্ঞান থাকার প্রশ্নই আসেনা, কারণ তা তাদের শ্রেণীস্বার্থের বিপক্ষে যাবে, নিজের শ্রেণীর ধ্বংস ডেকে আনবে। আবার এমন কাণ্ডজ্ঞান যে থাকতে পারে বা থাকা উচিৎ নিম্নবিত্তরা তা ভাবতেই পারেনা, এমনকি কল্পনাও করে না বা কল্পনা করার সাহস পায়না।

মধ্যবিত্তের এই কাণ্ডজ্ঞানকে কি আপনি ভালো বলবেন না খারাপ বলবেন? যদি ভালো বলেন তাহলে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে, মধ্যবিত্তরা এমন কিছু কাণ্ডজ্ঞান বা মূল্যবোধ বা নীতিবোধ তৈরি করে যা নিজ শ্রেণীর সীমানা ডিঙিয়ে অন্য শ্রেণীর জন্যও কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয়। এখানটায় এসে মধ্যবিত্তদের প্রশংসা না করে পারা যায় না। যুগ যুগ ধরে এরা এইসব মূল্যবোধের কথা বলে আসছে। সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়নতা, দেশপ্রেম, মানবকল্যাণ ইত্যাদি নিয়ে মধ্যবিত্ত চিন্তাবিদদের চিন্তার অন্ত নেই, এবং শুধু তত্ত্বেই নয়, বিষয়টি তারা প্র্যাকটিসও করে। তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের সমস্ত গণআন্দোলনে মধ্যবিত্তদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করলেই। সত্যি বলতে কী - '৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে '৯০-এর গণআন্দোলন পর্যন্ত সবই পরিচালিত হয়েছে মধ্যবিত্তদেরই নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে। আরো পরিস্কার ভাবে বলা যায় - '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অন্য সবগুলো আন্দোলন আসলে মধ্যবিত্তদেরই আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধে আপামর মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও এর পটভূমি তৈরি করেছিলো মধ্যবিত্তরা এবং এর নেত্বত্বেও ছিলেন মধ্যবিত্তরাই। এইসব আন্দোলন-সংগ্রাম-যুদ্ধ মধ্যবিত্তরা কেবল নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার জন্যই করেছে, এমনটি ভাবা খুব ভুল হবে। এর মধ্যে দেশপ্রেম ছিলো, ছিলো জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, মানুষের জন্য কল্যাণচিন্তা। এই ভাবনা-চিন্তাগুলো তাদের মধ্যে এতটাই প্রবল ছিলো যে, নিজেদের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি তারা। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য আন্দোলন সংগ্রামগুলোতে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের প্রায় ৮০ ভাগই মধ্যবিত্ত। যারা মধ্যবিত্তদের বাছবিচারহীনভাবে গালাগালি করেন তারা এই বিষয়টি ভুলে যান। এদের ইতিবাচক কোনোকিছুই তারা খুঁজে পান না, পেলেও প্রশংসা করতে দারুণ কার্পন্য করেন, যদিও এই প্রশংসা তাদের প্রাপ্য।

মধ্যবিত্তরা, বিশেষ করে এই শ্রেণীর তরুণ অংশটি, যখন নিজ শ্রেণীর মূল্যবোধগুলোকে তীব্রভাবে ধারণ করে, তখন তারা কী ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করে তার প্রমাণ তারা রেখেছে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯০-এর গণআন্দোলন পর্যন্ত সমস্ত আন্দোলন ও সংগ্রামে। প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তারা নিরংকুশ বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু এই সঙ্গে এ-ও বলা দরকার যে, তারা তাদের এই বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে তারা আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলো, বিজয় অর্জিত হবার পর তারা আবিষ্কার করে - এই বিজয় ছিনতাই হয়ে গেছে, এবং যারা ছিনতাই করেছে তারাও তাদেরই শ্রেণীর লোক। মধ্যবিত্তরা কী পরিমাণ সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে তার প্রমাণও তারা রেখেছে মুক্তিযুদ্ধের পর ব্যাপক লুটতরাজ-চুরি-ডাকাতি-কালোবাজারি-রাহাজানি-ছিনতাই করে। ওই সময় জনগণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বারোটা বাজিয়ে তারা নিজেরা ফুলে ফেঁপে বিকট চেহারা ধারণ করেছে। এতটাই বিকট যে তাকে আর মধ্যবিত্ত বলে চিহ্নিতই করা যায় না। একই ঘটনা একটু সীমিত আকারে হলেও ঘটেছে '৯০-এর গণআন্দোলনের পর। তবে বলা দরকার - যে মধ্যবিত্ত যুদ্ধ করেছিলো আর যে মধ্যবিত্ত এই লুটতরাজে অংশ নিয়েছিলো তারা একই মধ্যবিত্ত নয়। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা হয়তো কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাবো। আগামী পর্বে (অর্থাৎ শেষ পর্বে) আমরা সেই বিশ্লেষণটিই করতে চাই।

আগের পর্বগুলোর লিংক :

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৪
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৩
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28862330 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28862330 2008-10-31 01:07:06
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৪
এখন অবশ্য সে চিত্রটি আর নেই। আগের দিনের মধ্যসত্ত্বভোগী মধ্যবিত্তের সঙ্গে আজকের দিনের একজন চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের তুলনাই চলে না। এমনকি চাকরিজীবী লোকটিকে ঠিক মধ্যসত্ত্বভোগীও বলা যায় না। সে-ও ভোক্তারই দলে। অতএব উদ্ভবকালের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা এখন আর নেই।

তাহলে এদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত এলো কোত্থেকে? বাংলাদেশে এই শ্রেণীর জন্ম একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। '৪০-এর দশকে দেশভাগের ফলে হিন্দু মধ্যবিত্তরা দেশত্যাগ করলে নানা ক্ষেত্রেই একটি শূন্যতা তৈরি হয় এবং বাঙালি মুসলমানরা ব্যাপারটাকে গ্রহণ করে একটি সুযোগ হিসেবে। নিরক্ষর কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে শুরু করেন। তাদের আশা ছিলো - এই সন্তান শিক্ষিত হয়ে চাকরি বাকরি করবে - 'বড় অফিসার' হবে, 'ভদ্রলোক' হবে। তাদের সেই আশা পূরণও হয়েছিলো, কিন্তু সমস্যা বাঁধলো অন্য জায়গায়। কৃষকের সন্তান হঠাৎ করে ভদ্রলোকে পরিণত হলে এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাপন শুরু করলে তাদের পক্ষে পিতৃপরিচয়টিই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। কারণ বাপ-মা-ভাইবোন বা অন্য আত্নীয়স্বজন তাদের 'মর্যাদা' কমায় বৈ বাড়ায় না। ফলে পিতৃ-মাতৃকুলের সঙ্গে তারা একটি ইচ্ছেকৃত দূরত্ব তৈরি করে নিলো। কৃষকের সন্তানেরা চাকরি-বাকরি করে ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করেছিলো এবং যথাসম্ভব দ্রুত নিজেদের শরীর থেকে মাটির গন্ধ মুছে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু এই কাজে তারা পুরোপুরি সফল হয়েছিলো তা বলা যাবে না। যতই চেষ্টা করুক না কেন, হাজার হলেও মা-বাপ, তাদেরকে একেবারে অস্বীকার তো করা যায় না! তবে এই মধ্যবিত্তদের প্রথম প্রজন্ম নানাবিধ কারণে নিজেদের অতীতকে পুরোপুরি অস্বীকার না করতে পারলেও, দ্বিতীয় প্রজন্ম তা অনেকখানিই করেছিলো এবং তৃতীয় প্রজন্মে এসে এই অস্বীকৃতি পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা ভুলেই গেছে যে তাদের পূর্বপুরুষ কোনো একসময় কৃষক ছিলো। অর্থাৎ একজন কৃষকের পুত্র ভদ্রলোকে পরিণত হবার পর নিজের বাপ-মাকে অস্বীকার না করতে পারলেও, তার পুত্র অর্থাৎ ওই কৃষকের নাতির জন্য তার দাদাকে অস্বীকার করাটা খুব বেশি অসম্ভব নয়। তবে আফটার অল দাদা তো, তাই পুরোপুরি অস্বীকার সে করে না, কিন্তু তার পুত্র অর্থাৎ ঐ কৃষকের পৌপুত্রের জন্য কৃষকের অস্তিত্ব স্বীকার করবার কোনো প্রয়োজনই নেই। আমাদের দেশে এই ঘটনাটিই ঘটেছে। ৩/৪ পুরুষ ধরে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাউকে খুব শক্ত করে ধরে আপনি যদি জেরা করতে থাকেন, তাহলে তারা একসময় হয়তো স্বীকার করবে যে, তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ গ্রামে বাস করতেন বটে, তবে তিনি মোটেই কৃষক ছিলেন না, ছিলেন জমিদার! একসময় যেমন মুসলমান সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন দাবি করতেন যে, তাদের পূর্বপুরুষরা আরব থেকে এসেছেন - এই দাবিটিও সেরকম। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে সবার পূর্বপুরুষই যদি জমিদার ছিলো তাহলে কৃষক ছিলো কে? কিংবা বাংলাদেশে মোট জমিদারের সংখ্যাই-বা কত ছিলো? কতই-বা ছিলো মুসলমান জমিদারের সংখ্যা?

১৪/১৫ বছর আগেও আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন অন্তত ৫০% ছাত্র আসতো গ্রাম থেকে - মূলত কৃষক পরিবার থেকে। কিন্তু পারতপক্ষে তারা সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করতো না, প্রসঙ্গ উঠে গেলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতো, নাছোড়বান্দার মতো কেউ লেগে থাকলে স্বীকার করতো বটে যে সে গ্রাম থেকেই এসেছে - কিন্তু সেখানে তার বাবা বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক। ঘনিষ্ট বন্ধুরা ছাড়া কেউ আসল সত্যটা জানতে পারতো না। এই অবস্থা এখনও চলছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অন্তত শতকরা ৫০ ভাগ ছাত্রই গ্রাম থেকে আসে, কিন্তু সেটা তারা স্বীকার করে না। এ অবস্থায় আপনি যদি এ নিয়ে সেখানে জরিপ চালান, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভুল এবং বিভ্রান্তিকর ফলাফল পাবেন। আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এইসব পরিসংখ্যানজাত ফলাফলের ওপরই সবসময় নির্ভর করেন এবং পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেন। জনজীবনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের হাতে পড়ে আমাদের চিন্তার জগৎটি কেমন যেন একপেশে তত্ত্বনির্ভর-পরিসংখ্যাননির্ভর-বইনির্ভর হয়ে পড়েছে; যার ফলে আসল সত্য কোনোদিনই আমাদের জানা হয়ে ওঠে না। যাহোক, দেখা যাচ্ছে - মধ্যবিত্তরা, কিংবা মধ্যবিত্ত হবার প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে এমন লোকেরা নিজেদের শেকড়কে অস্বীকার করতে চায় - এটি মধ্যবিত্তদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। যেমন, আমাদের মধ্যবিত্তরা ভুলে গেছে তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া মানুষদেরই একজন। আর ভুলে গেছে বলেই নিম্নবিত্তদের সম্বন্ধে অত্যন্ত নিচু ধারণা পোষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়।

আগের পর্বগুলোর লিংক :

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৩
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28861769 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28861769 2008-10-29 22:39:13
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০৩
শ্রেণীর সঙ্গে বিত্তের একটা সম্পর্ক আছে, তা তো বলাইবাহুল্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে - উচ্চবিত্ত বলতেই যেমন প্রাচুর্যপূর্ণ বিত্তসম্পন্ন শ্রেণীটির কথা মনে আসে, নিম্নবিত্ত বলতেই যেমন বিত্তের অভাবে বিপর্যস্ত ও নিগৃহিত শ্রেণীটির চেহারা ভেসে ওঠে, মধ্যবিত্ত বললে সেরকম কোনো সুনির্দিষ্ট চেহারা ভাসে না। ফলে, বিত্তের বিচারে কে যে মধ্যবিত্ত সেটাই নির্ধারণ করা দুস্কর হয়ে ওঠে। তবু বিত্তের বিচারে এই শ্রেণীটির একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাতে চাইলে কেউ হয়তো বলবেন - যে শ্রেণীর বিত্ত-সম্পদের পরিমাণ উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণের মোটামুটি মাঝামাঝি অবস্থানে আছে তাকে বলা যায় মধ্যবিত্ত। কিন্তু এই সংজ্ঞা দিয়ে মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করা যাবে না, কারণ বিভিন্ন দেশে মধ্যবিত্তের সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাপনের ধরন একই নয়। অর্থাৎ এমন কোনো আন্তর্জাতিক পরিমাপ নেই যা দিয়ে সব দেশের মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করা যায়। অন্য দুই শ্রেণীর বিত্তের সঙ্গে তুলনা করতে হলে আগে দেখতে হবে ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে একজনকে উচ্চবিত্ত বলা যাবে বা ঠিক কতোটুকু বিত্তহীন হলে তাকে আমরা নিম্নবিত্ত বলবো। এই বিবেচনায় একজন ইউরোপীয় বা আরব উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণ আর বাংলাদেশের একজন উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণ নিশ্চয়ই এক হবে না। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত হবারও তো কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই! অতএব বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত আর ইউরোপিয়ান/আমেরিকান/আরব মধ্যবিত্ত এক জিনিস নয়। আর সমস্যাটা এখানেই। বিষয়টি অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয় বলে তারা একই তত্ত্ব দিয়ে দুই দেশের একটি শ্রেণীকে ব্যাখ্যা করতে চান এবং তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। বিভিন্ন দেশের মধ্যবিত্তদের সম্পদের পরিমাণ যেমন বিভিন্ন হতে পারে, তেমনই এই শ্রেণীতে সম্পদের বিভিন্নতার কারণে তৈরি হতে পারে বিভিন্ন উপশ্রেণী - যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশে। এইসব উপশ্রেণীর অস্তিত্বই বলে দেয় যে, মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় সম্পদ নয়। আরো কিছু আছে।

সেগুলো কি কি?

দু-একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা করি। মধ্যবিত্ত শব্দটির সঙ্গে বোধহয় শহর বা নগরের একটা সম্পর্ক আছে, আমরা মোটামুটিভাবে ওই শব্দটি দিয়ে শহুরেদের কথাই বলি। কি রকম? ধরুন, এই আমাদের কথাই - যারা এই শহরে বাস করছি, চাকরি বাকরি করছি, কিংবা টুকটাক ব্যবসা-বানিজ্য (যে ব্যবসা দোকানদারির ওপরে কোনোদিনই ওঠে না) করে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত আছি এবং সমাজে মধ্যবিত্ত বলে একটা পরিচিতি ও মর্যাদা পাচ্ছি, তাদের সঙ্গে গ্রামের মোটামুটি স্বচ্ছল একজন কৃষকের তুলনা করা যেতে পারে। হয়তো ঐ স্বচ্ছল কৃষকটির আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য আছে এবং সারা বছরে হয়তো তার কিছু উদ্বৃত্তও থাকে। জমিজমা-বাড়িঘর ইত্যাদির হিসাব নিলে বিত্তের বিচারে ওই কৃষক অবশ্যই একজন মধ্যবিত্ত। অন্যদিকে এই আমরা - সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মানুষ - উদ্বৃত্তের কথা ভাবতেই পারি না, খানিকটা সঞ্চয়ের জন্য আমাদের রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়, তবু আমরাই মধ্যবিত্ত - গ্রামের ওই কৃষকটি 'কৃষক'ই অথবা বড়জোর 'শ্রমজীবী'।

নগর-সম্পর্ক ছাড়াও মধ্যবিত্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো অ্যাকাডেমিক শিক্ষা। তবে কেবলমাত্র শিক্ষাই সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। এর একটি উদাহরণও দেয়া যায়। একবার 'বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প' নামে একটি কার্যক্রম চালু করা হয়েছিলো, যার উদ্দেশ্য ছিলো শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এই কার্যক্রমের আওতায় ঢাকার রাস্তায় অনেকগুলো বাস নেমেছিলো - সম্ভবত অনেকেরই তা চোখে পড়েছে। এইসব বাসের চালকরা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু বাসযাত্রীরা এবং সমাজের অন্যান্য মানুষ তাদেরকে কখনোই একজন বাস ড্রাইভারের চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি, তারচেয়ে বেশি কোনো মর্যাদা দেয়নি। অথচ এই ড্রাইভারটির যে সহপাঠী কোনো উচ্চপদে চাকরি করেছে তাকে ঠিকই মর্যাদাপূর্ণ আসনটি ছেড়ে দিতে দ্বিধা করেনি। তাহলে দেখা যাচ্ছে - শুধু শিক্ষা হলেই চলে না, চাই একটি ভালো চাকরিও! এমনকি আজও আমাদের সমাজ শিক্ষিত যুবকদের ব্যবসা করাটাকে ভালো চোখে দেখে না। অর্থাৎ বিত্ত-শিক্ষা ছাড়াও সমাজে একটি মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বশীল অবস্থান মধ্যবিত্ত হওয়ার অনেকগুলো উপাদানের অন্যতম একটি উপাদান।

তাহলে কি বিত্ত, শিক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক অবস্থান দিয়েই এই শ্রেণীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যাবে? এখানে সঙ্গত কারণেই নারীদের প্রসঙ্গ এসে যায়। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলে যাদেরকে চিহ্নিত করি, সেসব পরিবারের বেশিরভাগ নারীরই উচ্চশিক্ষা নেই, তারা কোনো সম্পদের বা বিত্তের মালিক নন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত নন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের কোনো আলাদা আইডেন্টিটি নেই - স্বামী বা বাবার পরিচয়ে তাদেরকে পরিচিত হতে হয় - তাহলে তাদেরকে কীভাবে মধ্যবিত্ত বলা হয়, কেনই-বা বলা হয়? কোনো বিচারেই তো তারা এই শ্রেণীতে পড়েন না! তাহলে?

এর কারণ অনুসন্ধান করতে হলে আমাদেরকে আরো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। সেটি হলো মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ। প্রকৃতপক্ষে এই মূল্যবোধই মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং এই মূল্যবোধগুলো মধ্যবিত্ত পুরুষদের চেয়ে নারীরা অনেক কঠোরভাবে ধারণ করে থাকেন। পুরুষরা অনেকসময় এসব ঝেড়ে ফেলতে চায়, বিশেষ করে যারা মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙিয়ে উচ্চবিত্তের এলাকায় ঢুকতে চায়, তাদের জন্য এই ঝেড়ে ফেলাটা খুবই জরুরী। কিন্তু তারা প্রথম বাধাটা পায় নারীদের কাছ থেকেই - মা, বোন, স্ত্রী, এমনকি কন্যার কাছ থেকেও। যাহোক এ প্রসঙ্গে একটু পরে কথা বলা যাবে।

তার আগে বলা দরকার যে, মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সম্পদ এই মূল্যবোধ। এই শ্রেণীর মূল্যবোধ-নীতিবোধ-ঔচিত্যবোধ সবই বহু ভুলভ্রান্তি, স্ববিরোধিতা ও পরস্পরবিরোধিতায় ভরা। শুধু তাই নয় - এগুলো প্রায় ভাঙাচোরা, জোড়াতালি মারা। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে, যেমনই হোক এদের একটা মূল্যবোধ আছে। কথাটা অবশ্য কেমন যেন শোনায়, কারণ মূল্যবোধ সব শ্রেণীরই থাকে - তাদের নিজেদের মতো করে, হতে পারে তা মধ্যবিত্ত-মূল্যবোধের মতো নয় - অন্যরকম, কিন্তু অন্যরকম মানে তো খারাপ নয়! কিন্তু তা সত্ত্বেও মূল্যবোধের কথা উঠলেই মধ্যবিত্ত-মূল্যবোধের কথা মনে পড়ে কেন? পড়ে কারণ - এই শ্রেণীর অন্তর্গত চিন্তাশীল অংশটি বেশ জোরেশোরে তাদের মূল্যবোধের কথা বলে, ফলাও করে প্রচার করে, মূল্যবোধে সংযোজন-বিয়োজন ঘটায়, এসবের পক্ষে প্রবলভাবে দাঁড়ায়, ব্যাখ্যা করে, কোথাও এতটুকু ব্যাত্যয় দেখলো গেলো গেলো বলে রব তোলে এবং এসব মূল্যবোধগুলোকেই জগতের পক্ষে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় (এবং অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য) মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। অন্য শ্রেণীর লোকজন তা করে না। মধ্যবিত্তরা এতটাই সোচ্চার ও দৃঢ়কণ্ঠ যে, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীও তাদের কথায় আস্থা রেখে সেই মূল্যবোধকেই সত্য হিসেবে ধরে নেয়। তারা যা বলে তার কতটুকু তারা নিজেরা পালন করে সেটা অবশ্য একটি সঙ্গত প্রশ্ন, এবং সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর কেউ না পেলেও একথা বলা যায় যে, তারা একটি ব্যাপারে তুমুলভাবে সফল হয়েছেন - নিজেদের কথাগুলো তারা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন।

ফলে, এমনকি, উচ্চবিত্তরা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাজনক ও ক্ষমতাশালী অবস্থানে থাকলেও নিজেদের নিজস্ব মূল্যবোধগুলোর কথা জোরেশোরে বলার সাহস পায় না। জোরেশোরে দূরে থাক, নিম্নকণ্ঠেও বলে না - বরং তাদের আদৌ কোনো ভিন্ন রকমের মূল্যবোধ আছে কী না, কেউ তা জানতেই পারে না। সমাজের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার ফলে তাদেরকে নানা সভা সমাবেশে যেতে হয়, প্রিন্ট মিডিয়ায় নানান বাণী দিতে হয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চেহারা দেখাতে হয় (বস্তুত এগুলো তাদেরই সম্পত্তি), আর এসব জায়গায় গিয়ে তাদেরকেও মূল্যবোধ, নীতিবোধ, উচিত-অনুচিত ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা বলতে হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো - তারা যা কিছু বলে তা-ও মধ্যবিত্তদের শিখিয়ে দেয়া! নিজেরা যে মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙ্গানোর সময় এসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিলো (অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একথা বলা যায় যে, এদেশের উচ্চবিত্তরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে এসেছে, এবং এই রূপান্তরের জন্য তাদেরকে মূল্যবোধ-বিরোধী অনেক কাজ করতে হয়েছে। অন্তত আমাদের উচ্চবিত্তদের উচ্চবিত্ত হবার পেছেনে একটা না একটা লুটের বা চুরির বা ডাকাতির বা লাম্পট্যের গল্প আছেই। প্রায় কেউই সৎপথে 'বড়লোক' হয়নি, অন্তত এদেশে), সেটা তারা এমনভাবে চেপে যায় যে, মনে হয়, এটা নিয়ে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ রয়েছে! অন্যদিকে নিম্নবিত্তেরও কিছু মূল্যবোধ আছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে তাদের মধ্যে কথা বলার কেউ নেই। এখানটায় উচ্চ- ও নিম্নবিত্তের মধ্যে চমৎকার মিল আছে - উভয়েরই কথা বলার জন্য বুদ্ধিজীবী নেই। বুদ্ধিজীবী আছে কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে, অন্য কোনো শ্রেণীর তা নেই - এটি মধ্যবিত্তের আরেকটি পরিচয়চিহ্ন।

আগামী পর্বে এই শ্রেণীর জন্ম-ইতিহাস, মূল্যবোধ ও মূল্যবোধের চর্চা নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে রইলো।

আগের পর্বগুলোর লিংক --

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
Click This Link

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28861232 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28861232 2008-10-28 21:20:59
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০২ Click This Link প্রকাশিত হয়েছে। আজ দ্বিতীয় পর্ব। আগের পর্বে সাড়া দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, প্রিয় সহযাত্রীগণ।]

যেসব লেখায় মধ্যবিত্তদের গালাগালি করা হয় - তার পাঠকরা মধ্যবিত্ত, যেসব সভায় তাদেরকে বকাবাজি করা হয় তার শ্রোতারাও মধ্যবিত্তই। অথচ এই পাঠক ও শ্রোতৃকূল ভাবেন বকাবাজিটা তাকে নয়, অন্য কাউকে করা হচ্ছে। এর কারণ কি? কারণ হলো - যে সমালোচনাটা করা হচ্ছে, ওই পাঠক বা শ্রোতা নিজেকে সেটার উপযুক্ত বলে ভাবছে না। আরেকটি কারণও আছে - যিনি সমালোচনাটা করছেন পাঠক-শ্রোতা তাকে আবিষ্কার করেন নিজেরই লোক বলে। অর্থাৎ ওই লোকটিও মধ্যবিত্ত। যতই সমালোচনা করুন - ওই লেখক বা বক্তাও যে মধ্যবিত্তের বৃত্ত ভেঙে, মধ্যবিত্তের নিরাপদ সীমানা ডিঙ্গিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেননি - পাঠক-শ্রোতার তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ফলে একজন মধ্যবিত্ত যে তার নিজের শ্রেণীভূক্ত কাউকে এই ভাষায় গালাগালি, বকাবাজি বা সমালোচনা করতে পারেন এটা তাদের বিশ্বাস হয় না।

কিন্তু এইসব সমালোচনায় 'মধ্যবিত্ত' শব্দটি বেশ ব্যাপকভাবে ও প্রবলভাবে থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তরা সেটা নিজের গায়ে নেয় না কেন? কেন ভাবে যে, এই বকাবাজি অন্য কাউকে করা হচ্ছে? তাহলে কি সে তার নিজের শ্রেণীগত অবস্থান সম্বন্ধে সচেতন নয়? হ্যাঁ, সমস্যটা সেখানেই। নিজের শ্রেণীগত এবং সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকার জন্যই মধ্যবিত্তরা বুঝতে পারে না - গালাগালিটা তাদেরকেই করা হচ্ছে! আর পরিষ্কার ধারণা থাকবেই-বা কীভাবে? এই শ্রেণীটি যে সমরূপ নয়! এই শ্রেণীর মধ্যেই আছে আরো অনেক শ্রেণীবিভাগ বা উপশ্রেণী। যেমন : উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত (বা শুধুই মধ্যবিত্ত) এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত। আর ওই উপবিভাগ বা উপশ্রেণীগুলোই সমস্যা তৈরি করেছে। এরকম উপশ্রেণী কিন্তু উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের বেলায় দেখা যায় না। উচ্চ-উচ্চবিত্ত বলে কোনো শ্রেণী নেই, যেমন নেই নিম্ন-নিম্নবিত্তও। এই বিভাজন একান্তভাবেই মধ্যবিত্তের বৈশিষ্ট্য।

এইসব উপশ্রেণীর মূল্যবোধ-সংস্কার-বিশ্বাস-আচার-ব্যবহারে অনেকখানি সাদৃশ্য থাকলেও জীবনযাপনে তারা বেশ খানিকটা আলাদা। নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনযাপনের মধ্যে যেমন হা-হুতাশ, হতাশা, এবং নিম্নবিত্তের কাতারে চলে যাবার আতংক কাজ করে - উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে তা করে না। তাদের নিম্নবিত্তে পরিণত হবার আতংক নেই, আছে উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে আরোহন করার স্বপ্ন-প্রত্যাশা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় কূটকৌশল ও কর্মকাণ্ড। সবচেয়ে বিপদে থাকে মধ্য-মধ্যবিত্তরা (প্রকৃতপক্ষে এরাই মধ্যবিত্ত সমাজের পরিচয়চিহ্ন ধারণ করে থাকে)। তাদেরও স্বপ্ন-প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা উচ্চবিত্ত হবার, নিদেনপক্ষে উচ্চমধ্যবিত্তের মর্যাদা ভোগ করার, কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে ক্রমাগত নিম্নমধ্যবিত্তের দিকে ঠেলে দিতে থাকে। এর ফলে তারা থাকে এক ভয়ংকর দোদুল্যমান অবস্থায়। শুধু তাই নয়, নিম্নমধ্যবিত্তরা জীবনের প্রয়োজনেই কখনো কখনো মধ্যবিত্ত সমাজের অনড়-অচল মূল্যবোধ ও সংস্কারের বেড়াজাল পেরিয়ে ঢুকে পড়ে নিম্নবিত্তের মূল্যবোধের এলাকায়; আবার উচ্চমধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্ত হবার আকাঙ্ক্ষায় কখনো কখনো উচ্চবিত্তের মূল্যবোধ ও জীবনযাপন-পদ্ধতি ধারণ করতে চায়, নিদেনপক্ষে অনুকরণ করতে চায়;- মধ্য-মধ্যবিত্তরা এর কোনোটাই পারে না। উচ্চ- ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যে বিপরীত অর্থে নিজ শ্রেণীর সীমানা ডিঙ্গিয়ে যাবার প্রবণতা থাকলেও মধ্য-মধ্যবিত্তকে বাধ্য হয়েই পড়ে থাকতে হয় নিজের শ্রেণীর যাবতীয় ইতি- ও নেতিবাচকতা নিয়ে।

জীবনযাপন ও জীবনধারণ পদ্ধতি, সুযোগ ও সুবিধা - এসবকিছুতে ব্যাপক পার্থক্য থাকার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীভূক্ত এই উপশ্রেণীগুলো পরস্পরকে অপছন্দ করে - একরকম ঘৃণাই করে বলা যায় (অন্য কোনো শ্রেণী নিজের শ্রেণীর লোকজন সম্বন্ধে এতটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে না)। ফলে কোনো বুদ্ধিজীবী কতৃক কোনো বকাবাজি যখন এদের ওপর বর্ষিত হয় তখন এই শ্রেণীভূক্ত একটি উপশ্রেণী ভাবে - বকাবাজিটা তাকে নয়, অন্য কাউকে - অর্থাৎ অন্য দুই উপশ্রেণীর যে কোনো একজনকে করা হচ্ছে। এরকম ভাবনায় তার সুবিধা হয়, সে নিরাপদে থাকতে পারে, স্বস্তি ও শান্তিতে থাকতে পারে - সমালোচনাগুলো নিজের কাঁধে নিয়ে তাকে খামোখা পীড়িত হতে হয় না।

অবশ্য মধ্যবিত্তরা যে এত সুস্পষ্টভাবে নিজেদের উপশ্রেণীগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে তা নয়, বরং কোন উপশ্রেণীতে তারা বাস করে সেটা নির্ধারণ করা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপারই বটে। সমস্যাটা শুধু তাদেরই নয়, যারা মধ্যবিত্তদের নিয়ে কথা বলেন, এইসব উপশ্রেণীগুলোকে কোনো না কোনোভাবে চিহ্নিত করতে চান - সমস্যা তাদেরও। কী কী শর্ত পূরণ করলে একজন লোককে মধ্যবিত্ত বলা যাবে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলাটা বেশ দুরূহ। তবু তাদেরকে কোনোভাবে কোনো একটি সংজ্ঞায় বাঁধা যায় কী না, পরের পর্বে আমরা সেই চেষ্টাটি করে দেখতে চাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28860691 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28860691 2008-10-27 21:46:46
মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন ০১
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সংস্কৃতিচর্চায় নিবেদিত লোকজনের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি বকাবাজি শুনতে হয় যে শ্রেণীটিকে তার নাম মধ্যবিত্ত। যেভাবে এই শ্রেণীটিকে গালাগালি করা হয় তাতে মনে হতে পারে - এরা একেকজন আপাদমস্তক ভিলেন, তা-ও বীরোচিত ভিলেন নয়, ভীরু-কাপুরুষ ভিলেন। অর্থাৎ ভিলেনদের মতো যাবতীয় কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র, ধান্ধাবাজি, বদমায়েশি এরা করে বেড়ায়, কিন্তু প্রকাশ্যে এগুলো করতে হলে যে সাহসটুকুর প্রয়োজন হয় তা এদের নেই। ফলে কাজগুলো করতে হয় গোপনে গোপনে, ভয়ে ভয়ে - পাছে কেউ দেখে ফেলে!

প্রগতিশীলদের কাছে এত বেশি গালাগাল এমনকি উচ্চবিত্তদেরও শুনতে হয় না, নিম্নবিত্তদের তো নয়ই। নিম্নবিত্তদের অপরাধগুলোও দেখা হয় সহানুভূতির চোখে, অর্থাৎ অপরাধ সে নিজের ইচ্ছেয় করেনি - সমাজ করতে বাধ্য করেছে। অপরাধ কেউ-ই নিজের ইচ্ছেয় করে না, কে-ই বা শখ করে অপরাধী হতে চায়! প্রত্যেকটি অপরাধের পেছনেই - খুঁজে দেখলে পাওয়া যাবে - সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের অপরাধসমূহ বর্ণনার সময় প্রগতিশীলরা এ কথা ভুলে যান - যেন এই শ্রেণীটি স্বয়ম্ভু , যেন এদের ইচ্ছেতেই সবকিছু হয়, যেন এদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই এদেশে বিপ্লব আসি আসি করেও আসছে না!

যে কোনো প্রগতিশীল লেখকের এ সংক্রান্ত লেখা পড়লেই মধ্যবিত্তের 'অপরাধ'গুলোর সন্ধান পাওয়া যাবে। মধ্যবিত্তের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ - এদের কোনো চরিত্র নেই, এরা সুবিধাবাদী - অর্থাৎ যখন যেদিকে হাওয়া দেখে সেদিকেই পাল খাটায়। সুবিধাবাদী বলেই এরা গিরগিটির মতো ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টায়, কোনো রঙকেই দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না। এরকম রঙ-বদলপ্রয়াসী শ্রেণীটিকে স্বাভাববিকভাবেই ভন্ড হতে হয়। এরা যে কখন কী বলে, আর কখন কী করে, কখন এদের কোন জিনিসে বিশ্বাস ও আস্থা জন্মে, কখন সেই বিশ্বাস হারিয়ে গিয়ে তৈরি হয় অনাস্থা - তা তারা নিজেরাই জানে না (এই যদি হয় অবস্থা তাহলে সেই শ্রেণীটিকে কীভাবে বিশ্বাস করা চলে?)। মধ্যবিত্তরা কিছু কিছূ মূল্যবোধ ও সংস্কার দ্বারা জীবনকে পরিচালিত করে এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে সেগুলোর ভিত্তিতেই ব্যাখ্যা করতে চায়। এই মূল্যবোধগুলোর অধিকাংশই প্রগতির চাকাকে পেছনে ঠেলে দিতে চায়, সমাজের কোনো মৌলিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে এবং নিজেকে একটি অনড়, নিঃছিদ্র আবরণের মধ্যে নিরাপদে বন্ধ করে রাখতে চায়। ফলে বাইরের মুক্ত-উদার-প্রগতিশীল চিন্তার আলো-হাওয়া সেখানে আর ঢুকতে পারে না।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই বকাবাজি বা সমালোচনাগুলো মধ্যবিত্তদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। যাদেরকে গালাগালিটা করা হচ্ছে তারা যদি সেটা না-ই বুঝলো (অন্য কারো তো বোঝার প্রশ্নই ওঠে না) তাহলে তা করে লাভ কী? ফলে এসব সমালোচনা তাদের কার্যকারিতা হারায়। বরং যিনি গালাগালিটা করেন, সেটা শেষ পর্যন্ত তার নিজের কাছে ফিরে আসে। ব্যাপারটা পরের পর্বে একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28860194 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28860194 2008-10-26 21:46:31
বাংলাদেশের মানুষের মন
বাঙালি সম্বন্ধে প্রচলিত এবং বহুলভাবে প্রচারিত কিছু গড় ধারণাগুলোর দিকে তাকালে ইতিবাচক কিছু পাবার সম্ভাবনা কম। ধারণাগুলোর কয়েকটি এরকম: বাঙালিরা - অলস ও কর্মবিমুখ, পরশ্রীকাতর, চতুুর ও ধান্ধাবাজ, ঈর্ষাপরায়ন ও হিংসুক - অন্যের ভালো তারা দেখতে পারে না, হুজুগে, ভীরু, স্বার্থপর ইত্যাদি। বোঝাই যাচ্ছে, এদেশের বেশিরভাগ মানুষই নিজ জাতি সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা পোষণ করে না। আমি বলছি না যে, বাঙালি এর কোনোটাই নয়, তবে এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, এগুলোই বাঙালির একমাত্র পরিচয়চিহ্ন নয়। বরং এই ধরনের কথাবার্তার মধ্যে অতি সরলীকরণের প্রবণতা দেখা যায়। যিনি বলেন বাঙালি অলস ও কর্মবিমুখ, তিনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে, যে রাষ্ট্র এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার নূন্যতম চাহিদাটুকু পূরণ করার গরজ দেখায়নি, সেই রাষ্ট্রে তারা কীভাবে বেঁচে আছে? জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত এই দেশে কাজের চেয়ে কাজের লোক বেশি, ফলে প্রতিযোগিতা বেশি, সেই পরিস্থিতিতেও তো মানুষ নিজের কাজটি ঠিকই খুঁজে নিচ্ছে। এদেশে যখন ফসলের বাম্পার ফলন হয়, তখন আমাদের বাকপটু নেতানেত্রীরা এর কৃতিত্ব নেয়ার জন্য মাঠে-ময়দানে, রেডিও-টিভিতে, সংবাদপত্রে বক্তৃতার তুবড়ি ছোটান। এরা অসৎ এবং বদমাশ - কারণ এই বাম্পার ফলনে তাদের আদৌ কোনো কৃতিত্ব নেই, তারা কৃষককে সার দেয়নি, পানি সেচের জন্য যন্ত্রপাতি দেয়নি, চাষের জন্য লাঙল দেয়নি; উল্টো সার চাইতে গেলে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার উদাহরণ আছে, তাহলে এর জন্য তারা কৃতিত্ব দাবি করেন কোন সাহসে? প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে যা আছে তা হলো - আমাদের কৃষকদের অপরিমেয় প্রাণশক্তি। যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে হলেও তারা নিজেদের কাজটা মন দিয়েই করে। এটা দেখেও কেউ কেউ তাদেরকে অলস বলে গাল দেন কেন? তার কারণ দুটো। প্রথমটি হতে পারে এই যে, তারা কৃষকদের এই প্রাণশক্তির খোঁজ রাখেন না। দ্বিতীয়টি হলো বোঝার ভুল। আমাদের মানুষগুলোকে অলস মনে হয় কারণ তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈষয়িক উদাসীনতা আছে, আর সেজন্যই তারা কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশিকিছুর জন্য ব্যাকুল হয় না। অল্পতেই খুশি এই মানুষগুলোর মধ্যে তাই বৈষয়িক কারণে সমগ্র জীবন ব্যয় করে দেবার প্রবণতা নেই। বরং নূন্যতম প্রয়োজন মিটে গেলে বাড়তি আয়ের ধান্ধা করার বদলে আড্ডা দিয়ে বা গান শুনে সময় কাটিয়ে জীবনটাকে তারা আরেকটু বেশি উপভোগ্য করে তুলতে চায়। বৈষয়িক লোকজনের কাছে এটা তো অলসতা হিসেবে বিবেচিত হতেই পারে।

যাহোক, আমরা বরং প্রচলিত ধারণাগুলোর বাইরে গিয়ে বাঙালির আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের খোঁজখবর করতে পারি। আমার নিজের বিবেচনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে - উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা, নিরাসক্তি, রহস্যপ্রিয়তা, ভাববাদী দার্শনিকতা ও আধ্যাতি্নকতা ইত্যাদি। আমার সঙ্গে হয়তো আপনারা অনেকেই একমত হবেন বা হবেন না, অর্থাৎ এসব বিষয় হয়তো আপনারাও ভেবেছেন, তবু আমি আমার এই পর্যবেক্ষণগুলোর ব্যাখ্যা দিতে চাই।

প্রথমেই উদাসীনতা, নিস্পৃহতা ও নিরাসক্তির প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশের মানুষ তার পরিপাশ্বর্ের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে উদাসীন, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে সেরকমই মনে হয়। চারপাশে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে, সে-সব তারা এমন এক গভীর উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা নিয়ে অবলোকন করে যে, মনে হয়, এসব তাদের জীবনে নয় - অন্য কারো জীবনে ঘটছে, এবং সেই অন্য কারো সঙ্গে তাদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। শুধু যে বহমান ঘটনাসমূহের সঙ্গেই তারা সংশ্লিষ্টতাহীন তা নয়, একইসঙ্গে তারা ধারণ করে এক অদ্ভুত বৈষয়িক উদাসীনতা। আমাদের দেশের মানুষ অল্পেই তুষ্ট। মাথা গোঁজার ছোট্ট একটা ঠাঁই আর পেটে সামান্য খাবার থাকলেই তারা রীতিমতো কবি হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে ভীষণ ভাববাদী আর দার্শনিক। বৈষয়িক উদাসীনতার জন্যই এ জাতির কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নেই - তারা কোথাও পৌঁছাতে চায় না, বিশেষ কিছু পেতেও চায় না। কয়েকবছর আগে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীব্যাপি - 'কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী?' - এরকম একটি বিষয়ে তাদের নির্ধারিত প্রশ্নমালার ভিত্তিতে জরিপ চালিয়ে 'বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী' - এই অদ্ভুত ফলাফল প্রকাশ করেছিলো। এই ফলাফল নিঃসন্দেহে অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য, এবং প্রায় ব্যাখ্যার অতীত। যে দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দারিদ্র, ক্ষুধা, হাহাকার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদেশী শাসন ও শোষণে নিস্পেষিত ও পীড়িত সেই দেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী হয় কী করে? যতদূর মনে পড়ে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রশ্নমালা ছিলো মূলত বৈষয়িক তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি নিয়ে। ফলে তাদের গবেষণায় এরকম ফলাফল বেরিয়ে আসাটা খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়, কারণ আমাদের মানুষগুলো যে অল্পেই তৃপ্ত হয়ে আছে!

এই বৈষয়িক উদাসীনতার বিষয়টি আমাদের জন্য একইসঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক। নেতিবাচক এই অর্থে যে, একজন মানুষের যদি কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য না থাকে তাহলে সে কোথাও পৌঁছাতে পারে না। অল্পে তুষ্ট হলে সে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে থাকে উদাসীন। কিন্তু বৈষয়িক উদাসীনতার একটি ইতিবাচক দিকও আছে। অতিমাত্রায় বৈষয়িক মানুষ আসলে একজন যান্ত্রিক মানুষ। বৈষয়িক সাফল্যের সিঁড়ি খুব সরু, খাড়া, আর পতনোন্মুখ। এই সিঁড়ি বেয়ে পাশাপাশি দু-জন উঠে যেতে পারে না, উঠতে হয় একজনকেই, আর তাই তারা হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতিযোগী - সহযোগী নয়। এখানে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই, যেতে হয় একা একা, তা-ও নিষ্ঠুরভাবে। আর এতে করে সমস্ত মানবিক আবেগ অনুভূতিকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হয়। হয়ে উঠতে হয় মানবিক অনুভূতিহীন এক যান্ত্রিক পদার্থ। হয়ে যেতে হয় নিঃসঙ্গ, আত্নকেন্দ্রিক, স্বার্থপর। আজকের দিনে পাশ্চাত্য মানুষের যে সমস্যা, তা আসলে এই-ই। আমাদের দেশের মানুষ যে যান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি, এখনও যে এখানে মানুষ পরস্পরের জন্য ভাবে, কাঁদে, অন্যের দুঃখে নিজেই দুঃখিত হয়ে পড়ে (হয়তো সে-সবের প্রকাশ সহসা করে না) - তার কারণ তারা বৈষয়িক নয়। জীবন তো আসলে শুধু বৈষয়িক সাফল্য পাবার জন্যই নয়, পরস্পরের প্রতি যদি সহমর্মিতাই না থাকলো, যদি ভালোবাসার বোধটাই হারিয়ে গেলো, যদি নিঃসঙ্গতা আর আত্নকেন্দ্রিকতাই জীবনের মোক্ষ হয়ে উঠলো তাহলে সেই জীবনের আর মূল্য রইলো কোথায়?

এসবকিছুর বাইরে এ জাতির মধ্যে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে তা হলো - আধ্যাতি্নকতা ও ভাববাদিতা। এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছেন, তাদের একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, গ্রামের মানুষের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে তাদের দারিদ্র। তারা যে ঠিকমতো খেতে পারছে না, পরতে পারছে না, তাদের থাকার জন্য ভালো একটি ঘর নেই, অসুখ হলে চিকিৎসার সুযোগ নেই - এগুলোই হচ্ছে তাদের জীবনের একমাত্র সমস্যা, বাস্তবতা, সংকট। এসব সংকট অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এগুলো তাদের জীবনের একমাত্র সংকট নয়। গ্রামের অনেক মানুষের মধ্যেই এমন কিছু দার্শনিক সংকট ও প্রশ্ন আছে যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিকের প্রশ্ন ও সংকটের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা জীবন ও পৃথিবী নিয়ে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধারণা নিয়ে, বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তোলে যে, হতবাক হয়ে যেতে হয়। এ বিষয়ে আমি একটি উদাহরণ দিতে চাই।

আমাদের এলাকায় খুব নদী ভাঙে। সব হারিয়ে মানুষ খুব নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তো এমনই একটি নদীভাঙা পরিবার আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। যাঁর কথা আপনাদেরকে বলতে চাই, তাঁকে আমরা ডাকতাম মনসুর কাকা বলে। আমার বাবার বয়সী তিনি, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাকি স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলেনও, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই বেশিদূর এগোয়নি সেই পড়াশোনা। মনসুর কাকা ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। প্রায় সারারাত জেগে থাকতেন তিনি, আর প্রায়ই তাঁকে কাঁদতে দেখতাম। প্রথম প্রথম ধারণা করেছিলাম যে, তিনি বাড়ি ভাঙার শোকে কাঁদছেন। পদ্মার ভাঙনের ফলে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়াও তাঁর স্ত্রী তাঁর আগেই মারা গিয়েছিলেন, তাঁর কোনো ছেলে ছিলো না, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো বেশ দূরে দূরে, ফলে আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন খুব নিঃসঙ্গ মানুষ। আমি ভেবেছিলাম এই বুড়ো বয়সে বাড়ি ভাঙার মত ভয়াবহ বিপর্যয়ের ধাক্কা, আশ্রয়হীন হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া, তাঁর আগেই তাঁর স্ত্রীর বিদায় নেয়া কিংবা এই ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা তিনি একসঙ্গে সামলাতে পারছেন না। এসবই তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যা, নাগরিক কার্টেসি ও ম্যানার অনুসারে তাঁকে এসব নিয়ে তো আর কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না, কিন্তু ঐ প্রত্যন্ত গ্রামে নাগরিক ম্যানারের যন্ত্রণাদায়ক উপস্থিতি না থাকায় তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম - 'আপনি এত কাঁদেন কেন মনসুর কাকা?' তিনি উত্তর দিলেন - 'তুমি বুঝবা না বাবা।' আমার তখন না বোঝার বয়স নয়, কলেজে পড়ি, তাঁর এই ধরনের সমস্যা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো, তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম। এভাবে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বললেন আমি তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না, কিংবা বলা যায় আমি বিষয়টি সত্যি বুঝলাম না।

তিনি বললেন - ক্যান যে জন্মাইছিলাম সেইটা বুঝবার পারি না বইলা কান্দি।

এ কথার মানে কী? আমি ভেবেছিলাম, এই দুঃসহ জীবন নিয়ে খুব বেশি বিতৃষ্ণ হয়েই তিনি কথাটা বলেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলো না। মানে বুঝিয়ে বলতে বললে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর সবসময়ই মনে হয় - আল্লাহ যে তাঁকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, সেটা একেবারে খামোখা নয়। তাঁর নিশ্চয়ই কিছু করার কথা ছিলো, কিন্তু কী যে করার কথা ছিলো সেটা বুঝতেই পারেন নি সারা জীবনে, তাই তিনি কাঁদেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে আমূল চমকে দিয়েছিলো। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে আমি অনর্গল প্রশ্ন করে গেছি, এবং তাঁর ভাবনা-চিন্তায় বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। তাঁর ভাষ্যমতে - জীবনের অন্য কোনো কিছু নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই, আক্ষেপ ঐ একটি বিষয় নিয়েই - তাঁর জানাই হলো না কেন তাঁকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিলো, তাঁর করণীয় কাজটি কী ছিলো (এমনকি বাড়িভাঙা, স্ত্রীর মৃত্যু কিংবা একটি পুত্র সন্তান না হওয়ার মতো বিষয়গুলোও তিনি বিচার করতেন পুরোপুরি ভাববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, মনে করতেন - করণীয় কাজটি করতে পারেন নি বলেই আল্লাহ তাঁকে শাস্তি দেবার জন্য এইসব ঘটনা ঘটিয়েছেন)!

জীবনের সমস্ত বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, হাহাকার, দুঃখ, কষ্ট, অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্ব এসবকিছু ভুলে গিয়ে তিনি যখন কেবল তাঁর জন্মের কার্যকারণ খুঁজে না পাওয়ার দুঃখে কাঁদেন, তখন ওই কান্না কী মহৎ হয়ে ওঠে, ভেবে দেখুন প্রিয় পাঠক। ভেবে দেখুন কী চমৎকার, অসামান্য একটি দর্শন আমাদের গ্রামের একজন 'সাধারণ' মানুষ ধারণ করেন। আমি একটি মাত্র উদাহরণ দিলাম, এমন উদাহরণ আমরা সবাই দু-চারটে করে দিতে পারবো, অন্তত গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা এই বিষয়টিকে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারেন।

এই মানুষগুলোর মন আমরা - সমাজের শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণী, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাগ্য-নিয়ন্তারা - কোনোদিনই বুঝতে চাইনি। বুঝতে পারলে এ দেশের চেহারাটা হয়তো অন্যরকম হতো।

[এই লেখাটি আমার 'বাংলাদেশের মানুষের মন' প্রবন্ধের অতি সংক্ষেপিত রূপ।]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28856096 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28856096 2008-10-17 21:30:04
কংগ্র্যাটস!!
হ্যাটস অফ ইউ! কংগ্র্যাটস!!

সহস্র কণ্ঠে ধ্বনিত 'বাংলাদেশ' শব্দটি কী মধুর শোনাচ্ছে, দেখুন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28852696 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28852696 2008-10-09 16:47:35
'আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার'
এরকম একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে, কবিতা বোঝার আগেই স্পর্শ করে। জীবনানন্দ দাশের ‌'আট বছর আগের একদিন' কবিতাটি সম্বন্ধেও সম্ভবত এ কথা বলা যায়। প্রথম পাঠের সময় যে-কোনো পাঠকের কাছে কবিতাটি তার সম্পূর্ণতা নিয়ে ধরা না-ও দিতে পারে, কিন্তু এই পাঠ যে ঘোরটি তৈরি করবে তার মনে, সেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে তার পক্ষে। ফলে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে কবিতাটির কাছে, আর বারবার পড়ার পর হয়তো তার মনে জীবন সম্বন্ধে একটি অনির্বচনীয় বোধ তৈরি হবে; আর এই বোধ তখন এতটাই তীব্র হয়ে উঠবে যে, কবিতাটির অপূর্ব নির্মাণ-কৌশল তার দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে হয়তো। নির্মাণ কৌশল মানে - এর ভাষা, ছন্দ, শব্দ ব্যবহার; চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদির ব্যবহার। আর 'ভালো' কবিতার এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এর নির্মাণ-কলা এমন এক কৌশলে কবিতার সঙ্গে মোলায়েমভাবে মিশে থাকে, যে, পাঠকের জন্য সেটি কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করে না। পাঠক ভুলেই থাকে যে, এই কবিতাটির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় কবির তীব্র সচেতনতা ছিলো, নির্মাণ কৌশল নিয়ে তাঁকে প্রচুর ভাবতে হয়েছে।

এই কবিতাটি খেয়াল করা যাক : এটি শুরু হয়েছে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে -

শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে; কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ মরিবার হলো তার সাধ।

মনে হচ্ছে কবি এখানে নিজেকে আড়াল করে যে-কোনো একজন ব্যক্তির গল্প বলছেন। গল্পকাররা যেমন করে নিজেকে আড়ালে এবং সর্বজ্ঞ অবস্থানে রেখে চরিত্র সম্বন্ধে কথা বলে যান, অনেকটা সেইরকম। এমনকি চরিত্রগুলোর মনের কথাও তিনি জানেন, কিন্তু যেহেতু তিনি প্রকাশ্য হন না কখনো, তাই পাঠকরা লেখকের উপস্থিতি বুঝতে পারেন না। এমনকি, কখনো মনে এই প্রশ্নও জাগে না যে, এই গল্পটি আসলে কে বলছেন! বা যিনিই বলুন না কেন, তিনি গল্পের পাত্র-পাত্রীর মনের কথা পর্যন্ত কীভাবে জেনে ফেললেন!

এর পরের পংক্তিগুলো খেয়াল করুন, এবার লোকটির পরিচয় দেয়া হচ্ছে :

বধূ শুয়ে ছিলো পাশে - শিশুটিও ছিলো; প্রেম ছিল, আশা ছিলো-

অর্থাৎ লোকটি সংসারী মানুষ। বধূ এবং শিশু আছে। এবং তারা পাশেই আছে। প্রেম আছে, আশাও আছে। ক্রমগুলো খেয়াল করুন - বধূর সঙ্গে প্রেম, শিশুর সঙ্গে আশা। অর্থাৎ বধূর সঙ্গে প্রেমই থাকে, আর শিশুকে ঘিরে থাকে আশা। কিন্তু এর পরের পংক্তিগুলো এই ইঙ্গিত দেয় যে, এই সংসারী মানুষটির জীবনে কোথাও কোনো একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন আছে, - 'তাই হয়নি ঘুম বহুকাল।' এই ঘুম চেয়েছিলো কী না সে নিয়ে সংশয়পূর্ণ ভাষ্যও দেয়া হচ্ছে।

বধূ শুয়ে ছিল পাশে - শিশুটিও ছিলো; প্রেম ছিলো, আশা ছিলো - জোৎস্নায়, - তবু সে দেখিল কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার? অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল - লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার। এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি ! রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার; কোনোদিন জাগিবে না আর।

এরপরে জীবনানন্দ একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ঊর্ধ্ব-কমার ( ' ' ) মধ্যে কতোগুলো কথা বলে, জানালেন, এই কথাগুলো তাকে বলেছিলো 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে' -

'কোনোদিন জাগিবে না আর জানিবার গাঢ় বেদনার অবিরাম - অবিরাম ভার সহিবে না আর - ' এই কথা বলেছিলো তারে চাঁদ ডুবে চলে গেলে - অদ্ভুত আঁধারে যেন তার জানালার ধারে উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।

এরকম একজন 'সুখী' সংসারী মানুষের কাছে যখন 'উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে' এরকম কথা বলে, আর সে সেই কথায় সাড়া দিয়ে চলে যায়- বোঝা যায়, প্রশ্নবোধক চিহ্নটি সত্যিই ছিলো।

এরপর তিনি আরেকটি অভূতপূর্ব কাণ্ড করলেন। আমাদের চারপাশের প্রকৃতির তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণীকূলের জীবন-তৃষ্ণা আঁকলেন এক অসামান্য ভঙ্গিতে, এই পঙক্তিগুলোতে :

তবুও তো প্যাঁচা জাগে; গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে আরেকটি প্রভাতের ইশারায় - অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে। টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা; মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে। রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি; সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কতো দেখিয়াছি। ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন - যেন কোন বিকীর্ণ জীবন অধিকার করে আছে ইহাদের মন; দূরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ মরণের সাথে লড়িয়াছে;


গলিত স্থবির ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িঙ - এসবই যেন বেঁচে থাকবার জন্য এক প্রাণপন লড়াইয়ে নেমেছে। চিত্রকল্পগুলোও অসামান্য। 'দূরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ' পঙক্তিটি পড়ার সাথে সাথেই কি এরকম একটি দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে ওঠে না? কিংবা 'মশারীর ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা' সত্ত্বেও মশারা যে রাতভর সেটি ভেদ করে জীবনের আয়োজন করতে চায়, সেই দৃশ্যও তো আমাদের চোখে ভাসিয়ে তোলে ওই লাইনগুলো। তো, এই যে এতসব জীবনের আয়োজন আমাদের চারপাশে ছড়ানো, এর কোনোকিছুই কি সে দেখেনি? কবি লোকটির সঙ্গে এই সমস্ত ঘটনার সম্পর্কসূত্র নির্মাণ করছেন এভাবে :

চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথের কাছে এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা - একা;

ওই 'তবু' শব্দটিই বলে দেয় - সে দেখেছে বটে, কিন্তু তার জীবনটি যে মানুষের; ব্যাঙ, মশা, মাছি, উড়ন্ত কীট, ফড়িঙের নয়! আর তাই, কবি উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ পঙক্তি :

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা এই জেনে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো : এই পঙক্তিগুলোর আগ পর্যন্ত কবি লোকটির সঙ্গে নিজেকে বিযুক্ত রেখেছেন, আড়ালে রেখেছেন, দূরে থেকে বর্ণনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু এইখানটায় এসে তিনি সরাসরি লোকটিকে সম্বোধন করছেন, এবং আমরা দেখবো, এই সম্বোধন চলতে থাকবে এরপরও।

লোকটি যে গেল দড়ি হাতে, তাতে কেউ কি কোনো প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেনি? তিনি আবারও প্রকৃতির অনুষঙ্গ টেনে এভাবে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করছেন :

অশ্বথের শাখা করেনি কি প্রতিবাদ? জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে করেনি কি মাখামাখি? থুরথুরে অন্ধ প্যাঁচা এসে বলেনি কি : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে? চমৎকার! - ধরা যাক দু -একটা ইঁদুর এবার!' জানায়নি প্যাঁচা এসে এ তুমুল গাঢ় সমাচার?

এবং জানাচ্ছেন, সবই দেখেছে সে, তবু :

জীবনের এই স্বাদ - সুপক্ব যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের - তোমার অসহ্য বোধ হলো; মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো মর্গে - গুমোটে থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

কি হয়েছিলো লোকটির? কেন সে মরতে গেলো? জীবনের কোথায় ফাঁক ছিলো তার? প্রশ্নবোধক চিহ্নটাই বা কি বা কোথায়? তার এই আত্নহত্যার কারণই বা কি? দাম্পত্য সম্পর্ক, অভাব, দারিদ্র, পরাজয়, গ্লানি? এই বিষয়গুলো জানাতেই তিনি এবার কথা বলছেন সরাসরি পাঠকের সঙ্গে :

শোনো তবু এ মৃতের গল্প; - কোনো নারীর প্রণয়ে ব্যার্থ হয় নাই; বিবাহিত জীবনের সাধ কোথাও রাখেনি কোন খাদ, সময়ের উর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ মধু - আর মননের মধু দিয়েছে জানিতে; হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;

অর্থাৎ কোথাও কোনো ব্যর্থতা নেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো তিনি এই ব্যর্থতাহীনতার কথা বলে একই টানে বলে যাচ্ছেন আরেকটি কথাও :

তাই লাশকাটা ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ' পরে।

এর মানে কি? নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়নি, বিবাহিত জীবনের সাধ পূরণ করেছে কোনো খাদ না রেখেই, বধূ মধু ও মনন দুই-ই জানতে দিয়েছে (অর্থাৎ বউ শুধু শরীরের সঙ্গীই হয়নি, মননেরও হয়েছে!), কোনোদিন ক্ষুধার কষ্ট পায়নি - 'তাই' তাকে মরতে হলো! তার মানে কি এই যে, এত এত সাফল্য না থাকলে তাকে মরতে হতো না? তার মানে কি এই যে, জীবনে কিছু কিছু ব্যর্থতা থাকা ভালো?

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তিনি এইভাবে, (এবং এবার আর নিজেকে তিনি আড়াল করছেন না, সরাসরিই নিজের উপলব্ধির কথা জানাচ্ছেন) :

জানি - তবু জানি নারীর হৃদয় - প্রেম - শিশু - গৃহ - নয় সবখানি; অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় - আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে; ক্লান্ত - ক্লান্ত করে; লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই; তাই লাশকাটা ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের 'পরে।

অর্থাৎ, জীবন-বর্ণনার জন্য আমরা সচরাচর যে সব বিষয় নিয়ে কথা বলি; আমাদের ক্লান্তি, আমাদের পরাজয়, আমাদের হতাশা, আমাদের দুঃখ ও বেদনা, আমাদের হাহাকার, আমাদের প্রেম-আশা-সুখ ও সাফল্য ইত্যাদি - এসবকিছুর বাইরে খুব গোপনে-গভীরে এক 'বিপন্ন বিস্ময়' থাকে।

কি সেই বিস্ময়?

কবি সে সম্বন্ধে পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন সেই বিস্ময় খুঁজে দেখার ভার।

হয়তো সেই বিস্ময় আমাদের অস্তিত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নবালী থেকে উদ্ভুত। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, এই পৃথিবীতে আমার ভূমিকা কী, আমার অস্তিত্বের অর্থ কী, আমি না থাকলে কী হতো, আমার অস্তিত্বহীনতায় এই পৃথিবীর আদৌ কিছু যেত-আসতো কী না, আমার অস্তিত্ব এই পৃথিবীকে এমন কী তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে, এই জীবন শেষে আমি কোথায় যাবো, জীবন মানে কি মাত্র এই কয়েকদিনের খেলা যা দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়, মৃত্যুই যদি একমাত্র অনিবার্য সত্য হয় তাহলে এই জীবনের এত এতসব কর্মকাণ্ডের অর্থ কী - এইরকম প্রশ্নের তো শেষ নেই। এবং প্রশ্নগুলোর উত্তরও নেই। প্রশ্নগুলো তাই কোনো সমাধান না দিয়ে বরং এক 'বিপন্ন বিস্ময়' জন্ম দেয় মনে।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো - কবি এখানেই থামেননি। লোকটির আত্নহত্যা, তার সম্ভাব্য কারণগুলো খতিয়ে দেখে এবং 'বিপন্ন বিস্ময়ের' মতো একটা অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যে পাঠককে ছেড়ে দিয়ে তিনি এবার নিজের কথা বলছেন :

তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি, আহা, থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বথের ডালে বসে এসে, চোখ পালটায়ে কয় : 'বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে? চমৎকার ! ধরা যাক দু - একটা ইঁদুর এবার -' হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজও চমৎকার? আমিও তোমার মতো বুড়ো হব - বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব কালীদহে বেনো জলে পার; আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

অর্থাৎ ওই লোকের যা হয়েছে, তা তো হয়েছেই, আমার জীবন তাতে থেমে থাকবে কেন! আমি বরং ' চেয়ে দেখি'...। এবং ওইসব সত্য জানার পর তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, জীবনের 'প্রচুর ভাঁড়ার' শূন্য না করা পর্যন্ত তিনি যাচ্ছেন না। থেকে যাবেন এখানেই, এই 'বিপন্ন বিস্ময়'মাখা জীবন নিয়ে এই আলোছায়াময় পৃথিবীতেই।

আর এইখানটাতে এসে কবিতাটি খুব জীবনবাদী হয়ে ওঠে।

জীবনে অনেক কবিতা পড়েছি - মৃত্যু আর জীবনের এমন অসামান্য মূল্যায়ন আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28848275 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28848275 2008-09-26 22:22:54
নিপীড়ন, আন্দোলন, শিক্ষকদের নৈতিকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
এই কথাটি মনে হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষক কমিউনিউটির নিজস্ব একটি বোঝাপড়া আছে যা বাইরে থেকে খুব একটা বোঝা যায় না, কিন্তু যারা এর ভেতরে থাকেন, তারা সবাই বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত। এই বোঝাপড়ার কারণে কোনো কোনো শিক্ষক অপরাধ করেও অবলীলাক্রমে পার পেয়ে যান, তার সহকর্মীরা বিষয়টিকে বেমালুম চেপে যান, এমনকি কারো কারো বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বিভাগের বাইরেই আসতে দেয়া হয় না, আর বাইরে যদি চলেই আসে তাহলে শিক্ষকরা সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে তাদের সহকর্মীর পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেন।

তেমনই একটা ঘটনার কথা বলা যাক।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র (১৯৮৯ সালে) তখন এই ঘটনাটি ঘটে। আমাদের বিভাগের মাস্টার্সের এক ছাত্র (আনসার আলি) একই বিভাগের একজন অধ্যাপককে তার রুমে গিয়ে শারীরিকভাবে আঘাত করে। আঘাতটি ঠিক কী ধরনের ছিলো সেটি সম্বন্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ না পাওয়া গেলেও ওই শিক্ষকই নিজে এই অভিযোগ করেন, যে, আনসার আলি তাকে চড় মেরেছিল, এবং সেটি এতই তীব্র ছিলো যে, তার চশমা পর্যন্ত ভেঙে যায়। তিনি প্রমাণ হিসেবে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে তার ভাঙা চশমাটি প্রদর্শন করেন। যথারীতি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, ওই শিক্ষক এবং ছাত্রের বক্তব্য গ্রহণ করা হয় এবং আনসার আলি আঘাত করার বিষয়টি স্বীকার করে নেন, কিন্তু এই 'অপরাধের' জন্য ওই শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। কী কারণে সে এই চড়টি মেরেছিল সে ব্যাপারে তার নিজের ভাষ্যটি কারোরই জানার সুযোগ হয় না, কারণ তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়; কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষকের ভাষ্যটি সাড়ম্বরে মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। ফলে জাতি জানতে পারে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক 'মহান' অধ্যাপককে তার অবাধ্য ছাত্র 'মৌখিক পরীক্ষায় যথার্থ নম্বর না দেওয়ার অভিযোগ তুলে' শারীরিকভাবে আঘাত করেছে।

এইরকম 'বখে যাওয়া' ছাত্রের প্রতি কারো কোনো সমর্থন থাকার কথা নয়, আনসার আলির প্রতিও সেটি ছিলো না, ফলে তার বক্তব্য আর জানার সুযোগ হয় না, কেউ সে চেষ্টাও করে না। কিন্তু আমরা, যারা ওই বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম, ধীরে ধীরে আনসার আলির সহপাঠি ও বন্ধুদের কাছ থেকে 'আসল' ঘটনা জানতে পারি। শুনতে পাই-- চড়-খাওয়া অধ্যাপকটির 'চরিত্র' ভালো নয়, তিনি নানাভাবে ছাত্রীদেরকে উত্যক্ত করে থাকেন। একইভাবে আনসার আলির সহপাঠিনী কাম প্রেমিকার সঙ্গে একাধিকবার অশোভন আচরণ করেছেন এবং সে সেটি আনসার আলির কাছে বলেছে, কান্নাকাটিও করেছে। এক পর্যায়ে আনসার আলি অতিষ্ট হয়ে ওই শিক্ষককে চড় মেরেছে। এই ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্যের একটিই (শিক্ষকের বক্তব্যটি) শুধু সারাদেশের মানুষ জানতে পারে, কিন্তু আমরা জানতে পারি দুটোই, যদিও এগুলোর সত্যাসত্য বিচারের সুযোগ আমাদের হয় না।

বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলেও চলতো, কিন্তু শিক্ষকরা তা থাকতে দেবেন কেন? একে তো একজন ছাত্র তার শিক্ষকের গায়ে হাত তুলে ভয়াবহ 'অপরাধ' করেছে, দ্বিতীয়ত 'নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার' আদেশ অমান্য করে সে চরম ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছে। ফলে পুরো বিষয়টি শিক্ষদের ইগোতে গিয়ে লাগে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ দলমত নির্বিশেষে এই অবাধ্য ছাত্রের বিরুদ্ধে 'যথাযথ' ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ধর্মঘট আরম্ভ করেন এবং ক্লাশ বর্জন করতে থাকেন। একটানা ৪৩ দিন (অথবা ৪১ দিন, সঠিক হিসাবটি মনে নেই, তবে সেটি যে চল্লিশের কোঠায়, এটা মনে আছে) ধর্মঘটের পর সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে আনসার আলির ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে তার স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার সার্টিফিকেটও বাতিল করা হয়। শুধু তাইও নয়, একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তও নেয়া হয় যে, আনসার আলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত কোনো কলেজেও আর পড়াশোনা করতে পারবে না। (তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো না, সব কলেজই ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত।) শিক্ষকরা তাদের আন্দোলনের সাফল্যে পরিতৃপ্ত মুখ নিয়ে ক্লাশরুমে ফেরেন। 'শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকরা থাকবেন অতি পুজনীয় আসনে'-- শিক্ষকদের এই 'নৈতিক' অবস্থানটি জয় লাভ করে, কিন্তু কিছু প্রশ্ন কোনোদিনই আর উচ্চারিত না হয়েও চিরকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাথার ওপর ঝুলে থাকে। যেমন :

১. মাস্টার্স পড়ুয়া একজন ছাত্রের যে কোনো ধরনের 'অপরাধের' জন্য তার অনার্সের সার্টিফিকেটও বাতিল করা বা তার উচ্চ শিক্ষার অধিকারকে সর্বার্থে রুদ্ধ করে দেবার ব্যবস্থা করার নৈতিক অধিকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বা এর শিক্ষকদের আছে কী না? যদি থাকেই তাহলে, একজন ছাত্র ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করে বেরিয়ে আসার পরও তো একই ব্যবস্থা গ্রহণ করার অধিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি রাখে। সেক্ষেত্রে একজন মানুষ আমৃতু্য এই হুমকির মধ্যে থাকতে পারে যে, তার যে কোনো 'অপরাধের' জন্য তার কষ্টার্জিত ডিগ্রিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে। যেমন : এই লেখাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এই অভিযোগে আমার ডিগ্রিটিও বাতিল করে দেবার অধিকার তাদের রয়েছে!!!!!!

২.এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ছাত্রকে কথা বলতে না দেয়াটা নৈতিকতার কোন মানদন্ডে নিরুপিত হয়? যে অভিযোগ তুলে তারা সমগ্র জাতির কাছে সহানুভূতি আদায় করেছেন, সেই জাতির কাছে অভিযুক্তরও যে কিছু বলার থাকতে পারে, সেটি কেন তাদের 'নৈতিক' মনে স্থান পায়নি?

প্রশ্ন আরো তোলা যায়, কিন্তু তা না করেও এই কথা বলা যায় -- যে সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জাতিকে অহরহ নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হয়, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিকতার মানদণ্ড যদি এই ধরনের হয় তাহলে তার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করার নেই।

এই ঘটনার পর মার-খাওয়া শিক্ষকটির 'ভাবমূর্তি' এতই বৃদ্ধি পায়, যে, বিশ্ববিদ্যালয়েরর শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে জামাতপন্থী এই শিক্ষক সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু এখনও আমার কাছে এই প্রশ্ন জাগে, যে, তিনি কি তার ভাবমূর্তির কারণেই সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, নাকি তার পক্ষে আন্দোলন-ধর্মঘট-ক্লাস বর্জন করে যে ভুল করেননি এটা প্রমাণ করার জন্যই তাঁকে শিক্ষকরা ভোট দিয়ে সভাপতি বানিয়েছিলেন?

এই উদাহরণটি দিলাম এইজন্য যে, কোনো একটি বিষয়ে যখন শিক্ষকরা একাট্টা হয়ে যান তখন ছাত্রদের আর কিছুই করার থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কেন্দ্রকেও কাঁপিয়ে দিতে পারে, একাধিকবার সেটি তারা প্রমাণও করেছে, কিন্তু শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনোকিছু করার ক্ষমতা ছাত্রদের নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে শিক্ষকদের ক্ষমতা প্রায় ঈশ্বরের ক্ষমতার সমান। বাইরে থেকে বিষয়টি বোঝা যায় না বটে, ভেতরে যারা থাকেন তারা সবাই-ই ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবে টের পান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যায়, যেগুলো বাইরে আসতেই দেয়া হয় না। যে শিক্ষকের কথা আমি এই লেখায় বলেছি, তার চরিত্র সম্বন্ধে আমাদেরও কিছু ধারণা পরবর্তীকালে হয়েছিলো। আমাদের এক সহপাঠিনী তার এই ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ল্যাবে প্র্যাকটিক্যাল করার সময় ওই শিক্ষক আমাদের সহপাঠিনীর গায়ে হাত দিয়ে বলতেন -- 'তোমার জামাটা তো খুব সুন্দর, কোত্থেকে বানিয়েছ?' আমাদের সহপাঠিনী লজ্জায় কুঁকড়ে যেত, আর আমরা অক্ষম আক্রোশে ফুঁসতাম। একদিন সে আমাদের কাছে এসে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো -- 'আমি আর পড়াশোনা করবো না। দিনের পর দিন এইভাবে... আমি আর পারছি না। তোরাও তো কিছু বলছিস না!' আমরা, সহপাঠীরা, সেদিন - 'বিষয়টি নিয়ে কি করা যায়' - বিষয়ক আলোচনায় বসি। প্রায় শতভাগ সহপাঠীই একটি ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছায় যে, কিছু একটা করা দরকার, কিন্তু অধিকাংশই সামনে আসতে অপারগতা প্রকাশ করে। অবশেষে আমরা কয়েকজন মাত্র বিষয়টি আমাদের কোর্স কোঅর্ডিনেটর (বর্তমানে যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন), এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে অভিযোগ আকারে জানাই। দুজনই - 'ব্যাপারটা আমরা দেখছি' - বলে আমাদেরকে আনসার আলির ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন এবং বিষয়টি নিয়ে আমরা যেন বেশিদূর না এগোই, সেই পরামর্শ দেন। আমরা সুবোধ বালকের মতো সেই পরামর্শ মেনে নিই। অবশেষে মেয়েটি এই ঘটনার প্রতিবাদে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু শিক্ষকরা আবারও 'ব্যাপারটা আমরা দেখবো' বলে তাকে পরীক্ষায় বসতে রাজি করায়। সে তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ করার পরও যখন দেখে, শিক্ষদের দেয়া আশ্বাস আদৌ ফলপ্রসু হচ্ছে না, সে তখন মৌখিক পরীক্ষা (ভাইবা) দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অবশেষে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায় - তাকে তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। মেয়েটি মাস্টার্স না করেই চিরদিনের মতো ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। এইরকম কতো কতো করুণ-কান্নার গল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের ইটকাঠের সঙ্গে মিশে আছে, কেউ তার খবর রাখে না।

প্রিয় পাঠক, জানি, এই মুহূর্তে আপনার বিপ্লবী সত্ত্বা জাগ্রত হয়ে আমাদের কাপুরুষোচিত ভূমিকাকে শাপ-শাপান্ত করছে। তা করুক, আপত্তি নেই, কিন্তু একবার নিজেকে আমাদের অবস্থানে ফেলে বিচার করুন, দেখবেন ওই অবস্থায় (আনসার আলির উদাহরণটি যখন জাজ্বল্যমান হয়ে আছে) আমাদের পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব ছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হয়তো দেশের জন্য জীবনও দিতে পারে, কিন্তু বিনা অপরাধে ছাত্রত্ব বাতিলেরমতো অবমাননাকর পরিস্থিতিতে পড়তে চায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থীই যে আন্দোলন-সংগ্রামের 'ঝামেলা'য় জড়াতে চায় না তার কারণ হয়তো এই যে, তারা জানে -- শিক্ষকদের একচ্ছত্র ক্ষমতার কাছে তারা কতোটা অসহায়। জানে এ-ও যে, তারা আক্রান্ত হলে কেউ-ই তাদের সঙ্গে থাকবে না। আনসার আলির এই পরিণতিতেও কাউকেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ তো নয়ই, কোনো গণমাধ্যম, কোনো মানবাধিকার সংস্থা, কেনো আইন-আদালতই সেদিন আনসার আলির প্রতি নূন্যতম আগ্রহ দেখায়নি। আনসার আলি যে-কোনো একজন মানুষের মতো জনস্রোতে হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো, কেউ তার কোনো খোঁজ রাখেনি।

লেখাটি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে, আরেকটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শেষ করি। অনেক করুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ক্যাম্পাস এখন পর্যন্ত আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। ক্যাম্পাসকে আমি বলে থাকি -- মায়ের আঁচলের মতো সবুজ মায়াময়। কোনোরকম আক্রোশ থেকে এই ঘটনাটি লেখা হয়নি। আর তাছাড়া আমার সব শিক্ষকও ওই শিক্ষকের মতো নন। আমার বেশ কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন যাঁরা সন্তের মতো জীবন যাপন করতেন। অধ্যাপক মুহতাশাম হোসেন, অধ্যাপক এ এম হারুন অর রশীদ, অধ্যাপক হীরন্ময় সেনগুপ্ত, অধ্যাপক ললিত মোহন নাথ, অধ্যাপক সুলতান আহমদ, অধ্যাপক আহমেদ শফি, অধ্যাপক খোরশেদ আহমেদ কবীর -- এঁরা ছিলেন সাধুসন্তের মতো মানুষ। হারুন স্যার এবং নাথ স্যারের খানিকটা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেও অন্যদের তা-ও ছিলো না। আমি এই ধরনের শিক্ষক পেয়েছিলাম বলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি। কিন্তু সমস্যা হলো -- এই শিক্ষকরা একেকজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোকিছুর সঙ্গেই যেন তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। পড়াশোনা, গবেষণা, শ্রেণীকক্ষ, ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে তাঁরা রচনা করেছেন আপন ভুবন, সেই ভুবনেই ডুবে থাকেন গভীরভাবে। আমি নিশ্চিত যে, প্রত্যেক বিভাগেই এইরকম বেশকিছু শিক্ষক আছেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক অবক্ষয়-জনিত জটিলতার অবসানে এঁরা রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করা এই সন্ত শিক্ষকরা যদি একত্রিত হয়ে নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও তার কার্যকারিতার ব্যাপারে সক্রিয় হন, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতর থেকেই যদি এরকম একটি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, হয়তো কেবল তখনই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব!

কিন্তু এই জীবনে এই বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে একত্রিত হয়ে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখে যেতে পারবো তো!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28845371 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28845371 2008-09-19 20:11:18
প্রেম সম্বন্ধে শেষ কথা কে-ই বা বলতে পারে!
ফলে ব্লগে আমার সক্রিয়তা সেই প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেল এতদিন পরও। গত কয়েক মাসে আমি যতোটুকু পাঠক হয়ে উঠতে পেরেছি, ততোটুকু 'ব্লগার' হয়ে উঠতে পারিনি। ['ব্লগার' শব্দটি আমার পছন্দ নয় যদিও, কিন্তু বিকল্প কোনো শব্দও খুঁজে পাচ্ছি না। আমার নিজের কাছে 'ব্লগার' মানে শুধুই লেখক নন, শুধুই পাঠকও নন, একই সঙ্গে লেখক ও পাঠক এবং একজন ইন্টারঅ্যাক্টিভ ব্যক্তি।] আর ব্লগের আনন্দদায়ক দিকটাই হলো লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া বা মতবিনিময়। কিন্তু সেই কাজটি খুব একটা করে ওঠা হচ্ছে না আমার। অনেক লেখা পড়ছি, কিন্তু অনুভূতিগুলো জানানো হচ্ছে না। ব্লগে আমার নিজের লেখার পরিমাণও হাতে গোনা। আলস্য কাটিয়ে নিয়মিত হওয়া হচ্ছে না কিছুতেই। একবার ভেবেছিলাম, আমার পড়া প্রিয় গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ, বা প্রিয় চলচ্চিত্র বা মঞ্চনাটক নিয়ে আমার ভালোলাগাটা শেয়ার করবো আপনাদের সঙ্গে। দু-একবার করেছিও, কিন্তু সেটিও কন্টিনিউ করা হয়নি।

আজকেও তেমন ইচ্ছে নিয়ে বসেছিলাম, কিন্তু, এখন আর লিখতে ইচ্ছে করছে না! <img src=" style="border:0;" />

কিন্তু আলস্যকে আজ হটিয়ে দিতেই হবে। আসলে তো, জীবনকে যে যেভাবে দেখে সেভাবেই নির্মাণ করে বেঁচে থাকবার কৌশল। রাহাত খানের 'ভাল মন্দের টাকা' গল্পের রহিমদাদ হয়তো জীবনকে নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর কৌতুক হিসেবে। রাহাত খান আমাদের এখানে কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হননি। যদিও তাঁর 'অমল ধবল চাকরি'র মতো অসাধারণ উপন্যাস আছে; 'চুড়ি' 'ইমান আলীর মৃত্যু' বা 'আমাদের বিষবৃক্ষ'র মতো বিখ্যাত সব গল্প আছে। সেই তুলনায় 'ভাল মন্দের টাকা' গল্পটি তেমন বিখ্যাত নয়। অথচ এটিকে আমার কাছে খুবই শক্তিশালী গল্প মনে হয়। এই গল্পের 'নায়ক' রহিমদাদ হয়তো জীবনকে নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর কৌতুক হিসেবে - সে তো আগেই বলেছি। কোনো বিষয়েই যেন কোনো মোহ নেই, আগ্রহ নেই, উচ্ছ্বাস নেই তার। এক অদ্ভুত নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতা তাকে ঘিরে থাকে, আর এগুলো নিয়ে সে এক বিচিত্র কৌতুকে মেতে ওঠে সে। 'পর্নোগ্রাফি' আর 'থ্রিলার' লিখে জীবনধারণ করে সে, কিন্তু এতেও যেন তার বিশেষ কোনো অংশগ্রহণ নেই। বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই লেখা আর এজন্যই বিচিত্র সব মানুষের সংস্পর্শে আসা। 'হীরু মিয়া', 'আমিনা' কিংবা 'হাজী সাহেবের' মতো লোকজনের সঙ্গে তার মেলামেশা স্রেফ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে - তাদের আচার-আচরণ তার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে না। হীরু মিয়া অবলীলায় তার লেখা পর্নোগ্রাফি 'কিছু হয় নাই' বলে মুখের ওপর ফেরত দিয়ে গেলেও তার তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, সে বরং আমিনার সঙ্গে গল্প জমাতে চেষ্টা করে। হেনাবুর সংসার ভাঙার সংবাদ শুনে সে অবসন্নতা কাটিয়ে 'ঠিক আগের মতো জেগে উঠল'। বন্ধু সাখাওয়াত প্রায় ভিখারি সদৃশ জীবনযাপন করে - রহিমদাদের এতেও কোনো বিকার নেই। রায়হানার পাশে শুয়েও নিজেকে অনুত্তেজিতই দেখতে পায় সে। যেন এক জীবন-মৃত মানুষ সে - অনুভূতিশূন্য, প্রতিক্রিয়াহীন। বন্ধু জামিল মৃতু্যপথযাত্রী, অথচ এ নিয়ে তার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। আছে দুশ্চিন্তা - জামিল মরে গেলে কে তাকে থ্রিলারের রসদ জোগাবে! জামিলের আসন্ন মৃত্যু নিয়েও সে এক বিস্ময়কর কৌতুকে মেতে ওঠে। যেন বন্ধুর মৃত্যুও একটি ঠাট্টার বিষয়।

রহিমদাদের এই আচরণ আমাদের চমকে দিয়ে যায়। এমন নিস্পৃহ, নিরাসক্ত আচরণের ব্যাখ্যা কি? সে কি কোনো কারণে হারিয়ে ফেলেছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, নাকি জীবনকে অতিমাত্রায় ক্যাজুয়ালি নিয়েছে সে? অর্থহীন আর বৈশিষ্ট্যহীন এই জীবনের জন্য এত আয়োজন কি হাস্যকর মনে হয় তার কাছে? জামিলের সঙ্গে কথোপকথনে তার নিস্পৃহ কৌতুকপ্রবণ আচরণটি ফুটে ওঠে -

''জামিল মরে যাওয়ার আগে তার সম্পত্তির কাকে কি দিয়ে যাবে সেই কথা হচ্ছিল। রহিমদাদ বলল, দোস্ত, তুই লেখাপড়া করে এই তিনতলাটা আমাকে দিয়ে যা না।

পাগল নাকি। জামিল বলল। তুই আমার কে যে বাড়িটা দিয়ে যাব?

রহিমদাদ বলে, কেন আমি তো তোর ফ্রেন্ড। দিয়ে যা না বাড়িটা।

জামিল বলে, না। আমি তোকে লেখার টেবিল আর বইগুলো দিয়ে যাব।

আর জামাকাপড়? তোর পার্কার পেনটা? চেনওয়ালা সোয়েটারটা?

জামিল হাসতে হাসতে বলেঃ আর কিছু না। লেখার টেবিল আর বইগুলো, ব্যস।

রহিমদাদ দুঃখিত হয়ে বলেঃ ঠিক আছে তাই দিস। কিন্তু তুই মরে গেলে আমার সিরিজটা মার খেয়ে যাবে।''

চমকে উঠতে হয়, এ কি কোনো মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন? এত নিস্পৃহতা, এমন নিষ্ঠুর কৌতুক কি করে সম্ভব একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে? রহিমদাদ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যে এক বিস্ময়কর চরিত্র। জীবনকে এত ক্যাজুয়ালি, এত ঠাট্টা-মশকরা, কৌতুক-বিদ্রূপের বস্তু হিসেবে দেখাটা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। রহিমদাদ তাই দেখেছিল। এ যেন এক ঐশ্বরিক নিরাসক্তি, মানুষের মধ্যে এর দেখা মেলা ভার!

পাঠককে আবারও চমকাতে হয় জামিলের মৃতু্যসংবাদ শোনার পর রহিমদাদ ও রায়হানার আচরণ দেখে। মৃত্যুসংবাদ শুনে -

''রহিমদাদ : মারা গেছে। দুপুরবেলা? ইস!

রায়হানরা : দুপুর একটা পঁচিশে মারা গেল। খুব শান্তভাবে মরল। একটাও কথা বলেনি। কারো দিকে তাকায়নি।

রহিমদাদ : যাক, জামিল তাহলে মারা গেল। উঃ কদ্দিন থেকে মারা যাওয়ার কথা। জামিল নিজেই টায়ার্ড হয়ে পড়েছিল।''

এখানেই মৃত্যুর আলোচনা শেষ, অতঃপর দুজনেই প্রবেশ করে জীবনের আলোচনায়। যেন জামিলের মৃত্যু বিশেষ কোনো ঘটনা নয় তাদের কাছে, যদিও রায়হানা জামিলের একদা প্রেমিকা, রহিমদাদ বন্ধু। আবারও দেখতে পাই জামিলকে সমাধিস্থ করে এসে -

''বাসায় নামিয়ে দিয়ে রায়হানা বললো, তুমি কবিতা লিখেছিলে?

রহিমদাদ বলেঃ নাহ।

রায়হানা বলেঃ তুমি পারবেও না।

রহিমদাদ বলেঃ তাই। আমি থ্রিলারও লিখতে পারছি না আর।...

রায়হানার গাড়িটা চলে গেলে রহিমদাদ কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। পরে নিজেকে নিজে বলল : হয়তো আমি একটা কবিতা লিখতে চাই। এছাড়া উপায় নেই আমার। আমাকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপায় নেই আমার।''

গল্পের একেবারে শেষ পঙক্তি নতুন করে ভাবিয়ে তোলে পাঠককে - যেন এতক্ষণে রহিমদাদের মধ্যে খানিকটা মানবিক বোধের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে আর থ্রিলার লিখতে পারছে না। একটি কবিতা লিখতে চায় সে, কারণ, 'এছাড়া উপায় নেই' তার। কেন? কে তাকে নষ্ট করেছে? রায়হানা? যে আশ্চর্য নিরাসক্তি নিয়ে সে বরাবর জীবনকে দেখে এসেছে, থ্রিলার লিখেছে, পর্নোগ্রাফি লিখেছে, একটি কবিতা লেখার প্রেরণা বা প্রেম - যা রায়হানা কতৃক প্রদত্ত - কি সেই নিরাসক্তিকে ধ্বসিয়ে দিলো?

প্রেম কি তাহলে ঐশ্বরিক নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতাকেও ধ্বসিয়ে দিয়ে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় মানবিক জীবনের পক্ষে? হয়তো! প্রেম থাকা মানে হয়তো অবসাদ থেকে মুক্তি, ক্লান্তি থেকে মুক্তি, নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতা থেকে মুক্তি। কিংবা হয়তো এর কোনোটাই নয়, প্রেম সম্বন্ধে শেষ কথা কে-ই বা বলতে পারে!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28843292 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28843292 2008-09-15 01:00:15
মৃত্যুপুরাণ
মৃত্যুতেই শেষ নয়, মৃত্যুর পর আছে আরেক জীবন-- এক অনন্তকালীন জীবন; সেই জীবনের সব কিছু নির্ধারিত হবে এই জীবনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে-- এ কথা বলে প্রায় সব ধর্মই তার অনুসারীদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছে, জীবনের সমস্ত কাজকর্মকে পরবর্তী জীবনের পাথেয় হিসেবে বর্ণনা করে এসবের ওপর অর্থ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও এই আশ্বাসবাণীতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। নানাভাবে চলেছে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের চেষ্টা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে-- তেমন কোনো অর্থই খুঁজে পাওয়া যায়নি এসবকিছুর। সবার মনের মতো কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি ওইসব প্রশ্নের। তবু চেষ্টা থেমে থাকেনি, হাজার বছর ধরে মানুষ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছে, এখনও খুঁজছে, ভবিষ্যতেও খুঁজবে।

জীবনানন্দ দাশও হয়তো খুঁজেছিলেন এ প্রশ্নের উত্তর এবং বলেছিলেন 'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়' -- তাঁর মানুষের মৃত্যু হলে কবিতায়। এবং এ কথা বলে মানুষকে তার ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায় থেকে মুক্তি দিয়ে একে একটি মহাজীবনের অংশ করে দিলেন, জীবনের মহত্তর একটি রূপ প্রত্যক্ষ করালেন, অর্থহীন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থও দান করলেন। কথাগুলো হয়তো ঠিক পরিষ্কার হলো না। মহাজীবন! সেটি আবার কি জিনিস? 'ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায়' ব্যাপারটাই বা কি? প্রশ্ন আরও আছে, কবিতাটির পরের দু-তিনটি পংক্তি পড়লেই প্রশ্নগুলো উঠে আসে --

'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে'

এসবের অর্থ কি? যে মানুষের মৃত্যু ঘটে গেছে, সে আবার 'চেতনার পরিমাপ নিতে আসে' কীভাবে? তার মানে কি এই যে, তার শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও সে থেকে যায় এক প্রবহমান সত্ত্বা?

উত্তর মিলছে না।

বরং আরেকটু এগোনো যাক কবিতাটি নিয়ে--

'আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিলো
তা'রা ম'রে গেছে;
প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে
অন্ধকারে হারায়েছে;
তবু তা'রা আজকের আলোর ভিতরে
সঞ্চারিত হ'য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে
যখন প্রেমের কথা বলে
অথবা জ্ঞানের কথা বলে--
অনন্ত যাত্রার কথা মনে হয় সে-সময়
দীপংকর শ্রীজ্ঞানের;
চলেছে-- চলেছে--'

এই পংক্তিগুলোই বলে দেয় যে, মরে যাওয়া মানে তিনি ধ্বংস বোঝান না, অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াও বোঝান না। সেটা হলে সেইসব মরে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা আজকের আলোর ভিতরে সঞ্চারিত হয়ে আজকের মানুষের সুরে প্রেম অথবা জ্ঞানের কথা বলতো না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, যাদের শারীরিক মৃত্যু ঘটে গেছে তারাও বর্তমানে প্রবহমান জীবনেরই অংশ রয়ে গেছে, কিংবা আজকে যারা জীবন যাপন করছে তারা যখন শারীরিক মৃত্যুকে বরণ করবে তখনও তারা প্রবহমান জীবনেরই অংশ রয়ে যাবে। অর্থাৎ জীবনের শেষ নেই, শেষ হয় না, মৃত্যু মানেই জীবনের পরিসমাপ্তি নয়, প্রকৃতপক্ষে এ এক অনন্ত যাত্রা।

হয়তো এ কথাটি ভেবেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন (মামুন হুসাইনের লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি)-- 'ওয়ান মাস্ট হ্যাভ প্রিপারেশন ফর ডেথ, সো দ্যাট ডেথ ইজ অ্যা হ্যাপি ওয়ান' বা 'লাইফ ইজ টু বি লিভড টু ইটস ফুলেস্ট সো দ্যাট ডেথ ইজ জাস্ট অ্যানাদার চ্যাপ্টার। মৃত্যুর মজা আছে হে আলাদা, যখন তুমি মরবে বা ধরো কই মাছ খাওয়ার পরেও পটল তুলতে বাধ্য হলে, দেখবে স্মৃতি উড়ছে বাতাসে, ... এ্যান্ড অল আওয়ার মেমোরিস, অল আওয়ার ওয়ার্কস এ্যান্ড অল আওয়ার ডিডস উইল কনটিনু ইন আদার্স। '-- এভাবে ভেবে নিলে জীবন ব্যাপারটা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের সকল অর্জন, স্মৃতি ও কর্ম যদি অন্যদের মধ্যেও প্রবাহিত হয় এবং বেঁচে থাকে তাহলে নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি নিয়ে আর হাহাকার কিসের?

কিন্তু মুশকিল হলো-- চাইলেই এরকম ভেবে নেয়া যায় না। আর আমাদের অস্তিত্বের সংকটটি আসলে সেখানেই। জীবন তো একটিই, মৃত্যুতেই যার সব শেষ। জীবনকে এভাবে দেখা হয় বলে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের নানামাত্রিক চেষ্টা চলে এবং সবক্ষেত্রেই ফলাফল হয় প্রায় একই-- মৃত্যুই যার শেষ কথা, সে জীবন নিশ্চিতভাবেই অর্থহীন। মানুষের এই চিন্তা খুব ফেলে দেবার মতোও নয়-- রবীন্দ্রনাথের নাম আমরা কোটিবার উচ্চারণ করি, সে তো আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের তাতে কী আসে যায়?

আগেই বলেছি-- পৃথিবীতে প্রচলিত ধর্মসমূহ মৃত্যুর পরও একটি ভিন্নতর জীবনের লোভ দেখিয়েছে, সে জীবন পাপের শাস্তি অথবা পূণ্যের পুরস্কারের জীবন। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় নব্বইভাগ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও, ধর্মকথিত পারিলৌকিক জীবনের প্রতি বিশ্বাস রেখেও ইহলৌকিক জীবন নিয়ে-- বলা ভালো, এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব নিয়ে-- অসুখী বোধ করে কেন, কেন অস্তিত্বের অর্থ অনুসন্ধান করতে চায়? তার কারণ হয়তো এই যে, মানুষ অবচেতনভাবে অনুভব করে-- এই সমস্ত ধ্যান-ধারণা তার ওপর চাপিয়ে দেয়া, এগুলো কিছুই সে নিজে বেছে নেয়নি। এমনকি তার নিজের জীবনটিও তার নিজের বেছে নেয়া নয়। (মিলান কুন্ডেরা যেমন বলেছিলেন-- আমরা আদৌ জন্মাতে চাই কী না সেটা জিজ্ঞেস না করেই আমাদের জন্ম দেয়া হয়েছে, যে শরীরে আমাদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেটা আমরা নিজেরা বেছে নিইনি, এবং আমাদের জন্য অবধারিত করে রাখা হয়েছে মৃত্যু)। প্রতিটি জীবন তাই এই চাপিয়ে দেয়া মূল্যবোধ থেকে মুক্তি চায়, প্রতিটি জীবনই স্বাধীন হতে চায়। অথচ সে আবিষ্কার করে-- জন্ম থেকেই সে শৃঙ্খলিত। ধর্ম-সমাজ-জাতীয়তার পরিচয়চিহ্ন লেপ্টে দিয়ে প্রথমেই তাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলা হয়। অথচ সে শৃঙ্খলিত হতে চায় না, এই বিপুল মহাবিশ্বে সে তার ক্ষুদ্র অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালায়। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কোথায় যাবো-- এইসব প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দেয় না, এমনকি ধর্মবর্ণিত উত্তরও বিশ্বাসীদের কাছে মনপূত হয় না, সে নিজেও কোনোভাবেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। উত্তর না নিয়েই তাকে মরে যেতে হয়। মানুষ তাই শেষ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের দায় থেকে মুক্তি পায় না।

কখনো কখনো আমি মৃত্যুর পক্ষেও দাঁড়াই। মনে হয়, মানুষের জীবন যতো কালারফুল মৃত্যুও ততো কালারফুল। আসলে জীবনকে নিয়ে যে এত এত আয়োজন, সেটা ওই মৃত্যুটাকে কালারফুল করে তোলার জন্যই। আমরা বুঝে হোক, না বুঝে হোক মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। এমন সব কাজকর্ম করতে থাকি, যেন, মৃত্যুর পর একটা আলোড়ন পড়ে। কতো লোকই তো রোজ মরে যাচ্ছে। ধ্যারধ্যারিয়ে মরা যাকে বলে আর কী! সেগুলো কোনো সাড়াই ফেলে না কারো মধ্যে। কিন্তু কারো কারো মৃত্যুর পর সাড়া পড়ে যায়। নিজের পরিবার-পরিজনের বাইরে সেই সাড়া ছড়িয়ে পড়ে সমাজের মানুষের মধ্যে। কখনো কখনো দেশজুড়ে। কখনো বা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। কখনো বা একটি মৃত্যু সারা পৃথিবীকে বিমূঢ় ও স্তব্ধ করে দেয়। সেটা ডায়নার মৃত্যুই হোক আর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুই হোক। কখনো কখনো আমার এমনও মনে হয় যে, মৃত্যু জীবনের অদেখা রঙগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলে। আমাদের চোখে পড়ে, এই লোকটির এই এই গুণ বা দোষ ছিলো। জীবন অর্থহীন জেনেও যে আমরা জীবন যাপন করে যাই, নানারকম কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করি তার কারণ তো আসলে মৃত্যুর প্রতি সম্মান জানানো, যেন সে আমাদের এইসব কাজকে যথাসাধ্য উজ্জ্বল করে সকলের সামনে মূর্ত করে তুলতে পারে।

কিন্তু মৃত্যু নিয়ে যতোই সুন্দর-মনোহর কথাবার্তাই বলি না কেন, আসলে মৃত্যু মানে বর্ণিল জীবন-নাট্যের ওপর কালো যবনিকাপাত। মৃত্যুতেই আমাদের জীবনের সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটে, সমস্ত অর্জন শেষ হয়ে যায়, সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা তাই আমাদের ক্ষুদ্র জীবন নিয়ে বেদনাবোধ করি, মরে যেতে হবে-- এ কথা ভাবলে কষ্টে আমাদের বুক ভরে যায়। মৃত্যুকে নিয়ে এত হাহাকার আমাদের-- কারণ, আমরা জানি, আমাদের সমস্ত কীর্তি ও কর্ম, সমস্ত সাফল্য ও অর্জন, সমস্ত ব্যর্থতা ও দায়ভার, সকল সুখ ও দুঃখ, সকল আনন্দ ও বেদনা রেখে যেতে হয় মৃত্যু নামক কালো যবনিকার এপারে, আর ওপারে কী আছে সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28838029 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28838029 2008-09-03 00:09:16
'আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়'
একজন কবি বা শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনাটির নাম কি? এ প্রশ্নের উত্তর অন্য কোনো দেশে যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উত্তরটি হবে-- 'ইমেজ।' অর্থাৎ একজন কবি/লেখক/শিল্পীর যদি একবার কোনোরকমে একটা ইমেজ দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সেখান থেকে তিনি আর বেরুতেই পারেন না! (অবশ্য 'দুর্বলদের ইমেজপ্রীতিও আছে। একটা ইমেজ দাঁড় করাতে পারলে যে জীবন পার করে দেয়া যায়-- থাকবে না কেন, বলুন!) বাংলাদেশে (শুধু বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিম বাংলায়ও বটে), তাই একেকজনের নামের সঙ্গে একেকটি বিশেষণ ঝুলতে দেখা যায়।

উদাহরণ হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলা যেতে পারে। 'বিদ্রোহী' ইমেজের আড়ালে তাঁর অন্যান্য কাজ তো প্রায় ঢাকাই পড়ে গেছে। অথচ তাঁর বহুমাত্রিকতা, বিশেষ করে গানে, তো রীতিমতো ঈর্ষণীয়। এমনকি তাঁর তুমুল রোমান্টিকতাও যেন তাঁর 'বিদ্রোহী' ইমেজকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এমন উদাহরণ আরো বহু দেয়া যাবে। তবে, আজকে আমি এখানে শুধু সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা বলবো।

সুকান্তর ইমেজও বিদ্রোহী-বিপ্লবী ধরনের। তাঁর বহু কবিতার পঙক্তি আন্দোলন-সংগ্রামে, বিদ্রোহ-বিপ্লবে শ্লোগান হয়ে মুখে মুখে ফেরে। মাত্র ২১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া এই কবির কি আর কোনো পরিচয় নেই? আছে, বলাইবাহুল্য। তবে সেই পরিচয় তাঁর কবিতার খুব একটা পাওয়া যায় না। পাওয়া যায়, প্রধানত তাঁর বন্ধু (কবি অরুণাচল বসু) ও বৌদির কাছে লেখা চিঠিপত্রতে। এইসব চিঠিতে তিনি একাধারে কৌতুকপ্রিয়, রোমান্টিক, বেদনাক্লিষ্ট ও মৃত্যুচিন্তায় কাতর।

অরুণাচলকে লেখা চিঠিপত্রের সম্বোধন থেকেই সুকান্তর কৌতুকপ্রিয়তার পরিচয় পাওয়া যায়। দু-একটি উদাহরণ দেয়া যাক। অনেকদিন সুকান্তর চিঠি না পেয়ে অরুণাচল ক্ষুব্ধ হয়ে একটি চিঠি লিখলে তার উত্তরে সুকান্তর সম্বোধন ছিলো-- 'শ্রীরুদ্রশরনম-পরমহাস্যাস্পদ অরুণ!' আবার দীর্ঘদিন চিঠির উত্তর না পেয়ে তিনি লেখেন-'সবুরে মেওয়াফল-দাতাসু অরুণ'। কিংবা অনেকদিন পর একটি আনন্দময় চিঠি পেয়ে সম্বোধন করেন 'প্রভূত আনন্দদায়কেসু অরুণ' বা 'আশানুরুপেসু অরুণ' ইত্যাদি নামে!

অরুণের সন্যাসগ্রহণের সংবাদ পেয়ে সুকান্ত একটি মজার চিঠি লিখেছিলেন--

'সৎসঙ্গসরনম

শ্রী শ্রী ১০৮ অর্ণব স্বামী গুরুজী মহারাজ সমীপেষু,

শত শত সেলামপূবক নিবেদন

পরমরাধ্য বাবাজী, আপনার আকস্মি অধঃপতনে আমি বড়ইা মর্মাহত হইলাম।

ইতি

দাসানুদাস সেবক- শ্রীসুকান্ত।'

যাহোক, এই অরুনের কাছে লেখা একাধিক চিঠিতে তিনি তাঁর প্রেমের কথা লিখেছিলেন। অন্তত দুটো মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি, সেকথা ওইসব চিঠি থেকেই জানা যায়। যে কোনো তরুণের মতোই এই চিঠিগুলোতে প্রেমের যন্ত্রণায় কাতর সুকান্তকে দেখে বিশ্বাসই হতে চায় না, এই 'বিপ্লবী'র মধ্যে এত তুমুল রোমান্টিকতা থাকতে পারে। ওই যে, ইমেজের আড়ালে প্রকৃত মানুষটির ঢাকা পড়ে যাওয়ার বাস্তবতা!

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ওই একইসময়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুচিন্তাও তাঁকে গ্রাস করে। একাধিক চিঠিতে তিনি প্রায় ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো নিজের মৃত্যু-সম্ভাবনার বিবরণ দেন। তবে, তাঁর কবিতায় এসব চিন্তার চিহ্ন খুব কমই পাওয়া যায়! মৃত্যু নিয়ে অবশ্য তাঁর একটি অসাধারণ কবিতা আছে--

'দ্বারে মৃত্যু,
বনে বনে লেগেছে জোয়ার,
পিছনে কি পথ নেই আর?
আমাদের এই পলায়ন
জেনেছে মরণ,
অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে,
প্রস্থানের চেষ্টা হলো মিছে।'

(দুরাশার মৃত্যু/ সুকান্ত ভট্টাচার্য।)

দ্বারে যখন মৃত্যু উপস্থিত, তখন পালাতে চাইলেও কি পারা যায়? যায় না। মৃত্যুও ধূর্তর মতো অনুগামী হয় পিছে পিছে।

যাহোক, এত কথা বললাম সুকান্তর তুলনামূলকভাবে কম পঠিত ও কম আলোচিত একটি কবিতা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য। এই কবিতায় আমাদের পরিচিত সুকান্তর দেখা মেলে না। বরং খানিকটা বিষণ্ন, রহস্যময়, রোমান্টিক এক কবির সঙ্গে পরিচিত হই আমরা। আসুন, কবিতাটি পড়া যাক--

'আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়
তবুও পড়িবে মনে
চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে কভু হৃদয়ের আঙিনায়
রজনীগন্ধা বনে,
হয়তো পড়িবে মনে।

বলাকার পাখা আজও যদি ওড়ে সুদূর দিগঞ্চলে
বন্যার মহাবেগে,
তবুও আমার স্তব্ধ বুকের ক্রন্দন যাবে মেলে
মুক্তির ঢেউ লেগে
বন্যার মহাবেগে।

বাসরঘরের প্রভাতের মতো স্বপ্ন মিলায় যদি
বিনিদ্র কলরবে
তবুও পথের শেষ সীমাটুকু চিরকাল নিরবধি
পার হয়ে যেতে হবে
বিনিদ্র কলরবে।

মদিরাপাত্র শুষ্ক যখন উৎসবহীন রাতে
বিষণ্ন অবসাদে
বুঝি বা তখন সুপ্তির তৃষা ক্ষুব্ধ নয়নপাতে
অস্থির হয়ে কাঁদে
বিষণ্ন অবসাদে।

নির্জন পথে হঠাৎ হাওয়ার আসক্তিহীন মায়া
ধূলিরে উড়ায় দূরে
আমার বিবাগী মনের কোণেতে কিসের গোপন ছায়া
নিঃশ্বাস ফেলে সুরে;
ধূলিরে উড়ায় দূরে।

কাহার চকিত-চাহনি-অধীর পিছনের পানে চেয়ে
কাঁদিয়া কাটায় রাতি,
আলেয়ার বুকে জোৎস্নার ছবি সহসা দেখিতে পেয়ে
জ্বালে নাই তার বাতি
কাঁদিয়া কাটায় রাতি।

বিরহিনী তারা আঁধারের বুকে সূর্যেরে কভু হায়
দেখেনিকো কোনো ক্ষণে।
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়
হয়তো পড়িবে মনে
রজনীগন্ধা বনে।'

(স্মারক/ সুকান্ত ভট্টাচার্য।)

যদিও বা এই রাত উৎসবহীন, যদিও বা মদিরাপাত্র শূন্য-শুষ্ক, যদিও বা 'বাসরঘরের প্রভাতের মতো স্বপ্ন মিলিয়ে যায়' যদিও বা 'আজ রাতে শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ' ফিরে যায়-- তবু আশা ওটুকুই-- 'হয়তো' মনে পড়বে! আমাকে তার, অথবা তাকে আমার!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28829198 http://www.somewhereinblog.net/blog/amkamal/28829198 2008-08-10 00:34:57