শিশির পতনে ক্লান্ত নদীর স্রোত। বোঝা যায় কয়েকদিন আগেও কাশ বন ঠিক মাঝামাঝি ডুবে ছিল। জল আর কাদা সেই দাগটা রেখে গেছে। বিলে শাপলা, সংখ্যাতীত। কলার ভেলায় আমি আর শৈশবের বন্ধরা। শাপলা তুলছি। একটু ঝাঁকি দিতেই টুপটাপ পরে যায় শিশির। একটার পর একটা শাপলা তুলি আমরা। লাল, সাদা। জল আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে প্রতিদিন। বিলের বুকে জমির আলগুলো মাথা তুলতে শুরু করেছে। আর কয়েকদিন পরেই জমিগুলো ভোগানো হবে দেশি মাছ ধরার জন্য। কত উত্তেজনা! বিকেল থেকেই শুরু হয়ে যায় গোবর আর তুষ মেশানোর কাজ। সন্ধ্যা হলেই ডালিতে করে নিয়ে নির্দিষ্ট জমিতে ছিটিয়ে দেয়া। পর পর দু'তিন দিন। নির্দিষ্ট দিন পরে ভোরেই রওনা সেই জমির আলমুখ বন্ধ করতে, যাতে মাছগুলো চলে যেতে না পারে। ভোরে মাছ ধরতে যাওয়ায় মায়ের নিষেধ; কত ভুত-পেত্নীর ভয়! ঘাসের উপর শিশির পড়া আলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ধান গাছ এলোমেলো করে দেয়া। সারা শরীর ভিজে গেল।
খুব শখ করে শিউলীর গাছ লাগানো হয়েছিল বাড়িতে। আমরা ভাই-বোনেরা কেথায় থেকে যেন চারাটা পেয়েছিলাম। গাছটা বেশ বড় হয়েছিল। ভোরে শিউলী কুড়ানোর যে কী আনন্দ! অসাধারণ একটা সুগন্ধ বাতাসে ঝুলে থাকতো। খুব সকালে মা স্নান সেরে কুমড়া ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরতো। নিকানো বারান্দায় মাটির উপরে সদ্য ছেঁড়া কুমড়া ফুল, গাঢ় হলুদ। রেণু লেগে যায় মাটিতে, হাতে। মায়ের সারা শরীর রেণুতে মাখামাখি।
রাতটা ছিল উদাস করা। সেই ছোট বেলা থেকেই উদাস শব্দটার সাথে পরিচিত আমি। বাবা শরৎ কাল এলেই চাঁদের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হয়ে যেত। মা বেশ ভয়ে ভয়ে কথা বলত তার সাথে। আমাদের ফিস ফিসিয়ে মা বলতো, 'তোর বাবা কেমন উদাস হয়ে গেছে, দেখ।' তখন থেকেই মাথায় গেঁথে গেল শরতের চাঁদ উদাস করে। কতদিন পড়া ফেলে দৌড়েছি খোলা প্রান্তরে, তার হিসাব নেই। গ্রামের মানুষ বলতো 'ফড়িং ফট জোসনা'। বৌচিও খেলেছি চাঁদের আলোয়। তাড়া খেয়েছি তার জন্য। মধ্য রাতে নারকেল চুরি করেছি। সবাই মিলে খেয়েছি। রাতের বেলা খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে কাপড়-চোপড় খুলে আক্ষরিক অর্থেই চন্দ্র স্নান করেছি আমরা। একটু গরম, একটু হিম হিম।
শৈশব!!! বার্ধক্যের কথা বলতে পারবো না, যৌবনের জন্য কিছু দীর্ঘশ্বাস জমিয়ে রাখে শুধু।
সারাদিন নাগরিক যন্ত্রণার বোঝা বয়ে, শ্রান্ত-ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে হিচরে যখন বিছানায় ফেলি, শরতের চাঁদ দেখা হয় না আর। জানালা গলে কখন যে বিছানায় আছরে পড়ে একটু গরম, একটু হিম হিম শরতচাঁদের আলো বোঝাই যায় না। পরদিন উঠে আবার দৌড়। পরদিন আবাব, পরদিন...হা হতোস্মি!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

