ছবি : অশ্রু
ফটোগ্রাফার : ওয়াহেদ রনি
অশ্রু এবং তার এক চাচাতো বোনের একই দিনে বিয়ে হয়।... (গত পর্বের পর)
অশ্রুর স্বামী আবুল হোসেন মোঃ মুসা সম্পর্কে কিছু বলা যাক।...মোঃ মুসা শৈশবেই মাতৃহারা হন। বলা যায় অশ্রুর বাবার কাছেই তিনি মানুষ। ছোটবেলায় কালা জ্বরে আক্রান্ত হলে অশ্রুর পিতা তাকে কলকাতায় নিয়ে যান। সুস্থ হয়ে চাচার কাছেই তিনি অতিবাহিত করেন অনেক সময়। অশ্রুর বাবার সাথে থেকেই তিনি কলকাতার মর্ডান স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং রিপন কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করেন। পরে তিনি কলকাতায় ফুড অফিসে চাকরি করতেন।
বিয়ের পরে অশ্রুর স্বামী কলকাতায় তার কর্মস্থলে চলে যান। দেশবিভাগের পরে তিনি চলে আসেন দেশে; তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। ১৯৪৮ সালে তিনি সিরাজগঞ্জ কোর্টে ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালে বদলি হয়ে আসেন কুষ্টিয়া কোর্টে। অশ্রু তখনো চাঁদট গ্রামেই থাকতেন।
১৯৪৮ সালে অশ্রুর বয়স যখন চৌদ্দ, তখন তার প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
১৯৫২ সালে অশ্রুর প্রথম ছেলের বয়স যখন চার বছর তখন তিনি প্রথম কুষ্টিয়া শহরে আসেন। প্রকৃতপক্ষে কুষ্টিয়া পর্বেই শুরু হয় অশ্রুর আসল সংসার জীবন। অচেনা কুষ্টিয়া শহরে ভাড়াবাড়িতে তিনি স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাটান। এখানে তার দ্বিতী সন্তান জন্মগ্রহণ করে (কন্যা)। এরপর দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার এখানে সেখানে ভাড়া বাড়িতে থাকেন তারা। ভাড়া বাড়িতে থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করেন নিজের একটা বাড়ি দরকার। সংসার বড় হচ্ছে। এই সময় তাদের সাংসারিক আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল। এরপর ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকে অশ্রু নিজের প্রচেষ্টায় কুষ্টিয়া শহরে জমি কেনেন। তার স্বামী ছিলেন মোটামুটি সংসারের প্রতি উদাসীন। ১৯৬৯ সালে বাড়ির কাজ শেষ হলে নিজেদের বাড়িতে ওঠেন অশ্রু ও তার পরিবার। তখন থেকেই নিজের বাড়িতেই থাকেন তিনি।
অশ্রু জানালেন, নিজেদের বাড়িতে ওঠার আঠারো মাস পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। শহরে মিলিটারীর আক্রমণ শুরু হবার পর অল্প কিছু কাপড় আর চাল নিয়ে কুষ্টিয়ার চৌরহাসে তার ধর্ম ভাইয়ের বাড়িতে চলে যান অশ্রু। চৌরহাসে থাকাকালীন সময়ে নিজের বাড়ি লুঠ ও আগুনে পুড়িয়ে দেবার কথা জানতে পারেন তিনি। এই প্রথম সাজানো সংসার এলোমেলো হয়ে যাবার জন্য একটা ধাক্কা খান তিনি। যুদ্ধের বছর প্রচণ্ড বন্যা হয়েছিল। গ্রামের বাড়িতে অনেক মানুষ নিয়ে বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন তিনি। বাড়িতে সে সময় অনেক মেয়ে ছিল। তাছাড়া গ্রামের অন্যান্য বাড়ি থেকেও সুন্দরী মেয়েদের তাদের বাড়িতে এনে রাখা হত। সবাই জানতো, এই পরিবারের বড় ধরণের সংকট না হলে তাদের মেয়েরা নিরাপদেই থাকবে সেখানে। বন্যার কারণে বাড়িতে একটা নৌকা কেনা হয় দূর থেকে পানিয় জল আনার জন্য। গ্রামে মিলিটারী আসছে শুনলেই অশ্রু মেয়েদের নিয়ে নৌকায় উঠে বাড়ির পাশের বিলে চলে যেতেন নিরাপত্তার জন্য।
মুক্তিযোদ্ধারা মাঝে মাঝে চাঁদট গ্রামে এলে অশ্রুদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করতো। স্মৃতি হাতরে তিনি জানালেন, তাদের গ্রামে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তরু, মন্টু, দুলালের নাম মনে করতে পারেন তিনি। দিনের বেলা গ্রামের ছেলেদের কিছু ট্রেনিং দেয়া হত। আর রাতের বেলা মেয়েরা বিশেষ আগ্রহে শিখতো কেমন করে গুলি ছুঁড়তে হয়, বন্দুক চালাতে হয় এইসব। অশ্রু মেয়েদের এই ট্রেনিংয়ে নিয়ে যেতেন। তার নিজের মেয়ে, বোনের মেয়েরা এবং এক সৎবোন এই ট্রেনিংএ অংশ নিয়েছিল। একবার ভুলক্রমে কারো হাত ফসকে গুলি বেরিয়ে গেলে মহা হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে যাত্রা বড়ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। অশ্রুর চাচাতো ভঅই কাশেম ছিলেন গ্রাম্য ডাক্তার। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অষুধ দিতেন, আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন।
যুদ্ধ শেষ হলে, প্রায় এগারো মাস পরে অশ্রুর স্বামী আবার তার কর্মস্থলে যাওয়া শুরু করলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি কুষ্টিয়ায় চলে আসেন। কুষ্টিয়ায় ফিরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে তারা কিছুদিন কাটালেন। এই সময় যুদ্ধে পুড়ে যাওয়া নিজেদের বাড়ি মেরামত করা হয়। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় অশ্রুর বয়স খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তিনি মনে করতে পারেন, আর যাই হোক তাদের পরিবারে খাদ্যের অভাব ছিল না। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তি স্বাধীন দেশে তারা প্রথম আবিষ্কার করেন ভাত-কাপড়ের অভাব কাকে বলে। এই সময় তার স্বামী বেতন পেতেন ১৫০ টাকা। এই টাকা থেকে চালের জন্য বরাদ্দ ছিল তিন টাকা, দুই টাকা বরাদ্দ ছিল অন্যান্য বাজারের জন্য। এই দুই টাকায় মাছ, মাংস, তেলসহ সবই কিনতে হতো।... (ক্রমশ)
অশ্রু : পৃথিবীর পথে চাঁদট গ্রামের মেয়ে-৩(পুন-রিপোস্ট)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।