somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজশাহীর শখের হাঁড়ি শিল্পী সুশান্তকুমার পালের চিত্রকর্ম

১৩ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শখের হাঁড়ি আঁকছনে সুশান্ত কুমার পাল

শখের হাঁড়ি

কাগজে আঁকা ছবি-১ সুশান্ত পাল

কাগজে আঁকা ছবি-২ সুশান্ত পাল

কাগজে আঁকা ছবি-৩ সুশান্ত পাল

রুক্ষ আর বন্ধুর বরেন্দ্রভূমিতে একদা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইতিহাসখ্যাত বীতপাল ও ধীমান। তারা ছিলেন মূলত মৃৎশিল্পী। মাটি ছেনে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেন প্রতিমার, ফুটিয়ে তুলতেন পদ্ম-পাপড়ি ডাগর আঁখি। সেসব হাজার বছর আগে পাল যুগের কথা। মনে করা অসঙ্গত হবে না, বীতপাল ও ধীমানের মতো আরো অসংখ্য শিল্পীর শিল্প দক্ষতার উৎকর্ষের সম্বন্ধ সূত্রে এই রুক্ষভূমির সূক্ষ্ণশিল্পীরা হাজার বছর আগে তৈরি করেছিলেন চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের বিখ্যাত এক ঘরানা। সেই ঘরানার ক্ষয়িষ্ণু এক ধারা আজো প্রবহমান বর্তমান রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে-কুমোরদের ঘরে ঘরে।

রাজশাহী অঞ্চলের শখের হাঁড়ির ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। রঙ দিয়ে নকশা আঁকা বিশেষ ধরণের হাঁড়িই হচ্ছে শখের হাঁড়ি। সৌখিন জিনিস হলেও প্রাত্যহিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা ছিল অনস্বীকার্য। রাজশাহী অঞ্চলের শখের হাঁড়ির প্রধান তিনটি ঘরানার কথা জানা যায়। তবে এর দু’টি ঘরানার কাজ বর্তমানে চোখে পড়ে না। শখের হাঁড়ির ‘সিন্ধুকুশমী-হরগ্রাম-বসন্তপুর’ ঘরানা কোনরকমে বেঁচেবর্তে রয়েছে এখনো। এই ঘরানার শিল্পী সুশান্ত কুমার পাল (আনু. ৫০)।

বরেন্দ্রভূমির মুখরিত জনপদ বসন্তপুর। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। আনুমানিক চল্লিশ ঘর পাল সমপ্রদায়ের মানুষ বসবাস করে এই বসন্তপুরে। এখানকারই একটি পাল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুশান্ত পাল আনুমানিক বছর পঞ্চাশেক আগে। ঠাকুরদাদা বন্যেশ্বর পাল ছিলেন নামকরা কুমোর। তিনি পাকিস্তান আমলে প্রাদেশিক সরকারের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন শখের হাঁড়ি তৈরি করে। তাঁর কাজ দেখে দেখে বড় হয়েছেন সুশান্ত। বাবা ভোলানাথ পালও ছিলেন শখের হাঁড়ির শিল্পী। মা সুধারাণী পাল স্বামী-শ্বশুরের কাজে সাহায্য করেছেন সবসময়। কৈশোর কিংবা বলা চলে বাল্যেই কুলবৃত্তি গ্রহণ। আজন্ম মাটির কাছাকাছি থেকে মাটি ছেনেই বেড়ে ওঠেন সুশান্ত।

পারিবারিক ঐতিহ্য আর দীর্ঘদিনের চর্চার কারণে শখের হাঁড়িতে মোটিফ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন সুশান্ত। ঘোড়া, পাখি, ফুল, গাছ ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ব্যবহারে তিনি সিদ্ধহস্ত। লোকায়ত চিত্রকলার শক্তিশালী রেখা ব্যবহার করে সুশান্ত হাঁড়িতে এঁকে ফেলেন দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ্মী পেঁচা, উড়ন্ত পাখী, ধানের ছড়া, ফুটন্ত পদ্ম কিংবা গোলাপ, শুঁড় তুলে হেঁটে যাওয়া হাতি, ধাবমান ঘোড়া, মাছ ইত্যাদি। হাঁড়িতে আঁকা প্রতিটি প্রাণীর মোটিফ পাশ থেকে দেখা এবং সম্মুখে গতিশীল ভঙ্গিতে আঁকা। ফুল, পাতা এবং ধানের ছড়া তেড়ছাভাবে আঁকা। হাঁড়ির গোলাকার গড়ন অনুসারে মোটিফগুলো আঁকা হয় বলে পুরো বিষয়টির মধ্যে একধরণের গতিশীলতা বজায় থাকে। সাদা, হলুদ, কালো, নীল, লাল এবং বেগুনী মুখ্যত এই ষড়বর্ণের সমাহার দেখা যায় তার কাজে। এছাড়া কখনো কখনো সবুজ রঙের ব্যবহারও দেখা যায়। তিনি কাজের ক্ষেত্রে বাজারের কেনা রঙ যেমন ব্যবহার করেন, তেমনি ব্যবহার করেন প্রাকৃতিক রঙ। যে অল্পসংখ্যক মানুষ আজো প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞাত সুশান্ত তাদের মধ্যে অন্যতম।

প্রাকৃতিক রঙ তৈরি এবং তার ব্যবহার সুশান্ত ও তার কাজকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। কাজের ক্ষেত্রে বাজারের কেনা রঙও যে কখনো কখনো ব্যবহার করেন না তা নয়। তবে নিজে বেশি পছন্দ করেন প্রাকৃতিক রঙ। উপকরণ কিনে নিজেই তৈরি করেন সেই রঙ। তারপর ব্যাবহার করেন হাঁড়ি ও ছবি আঁকার কাজে। এবিষয়ে অতিসমপ্রতি তিনি ঢাকাস্থ ‘শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রে’ দুই দিনের একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন।

শখের হাঁড়ির পাশাপাশি বলতে গেলে শখের বশেই ছবি আঁকেন সুশান্ত। আয়োজনের তেমন কোন আতিশয্য নেই। বিভিন্ন কার্যোপোলক্ষে ঢাকায় এলে কিনে নিয়ে যান বাঁশপাতা কাগজ। বন্ধু ও শুভাকাঙ্খিরাও কখনো কখনো কিনে দেন। তুলি বানান নিজের হাতেই-ছাগলের লোম দিয়ে। বাজারের কেনা রঙ কিংবা বাড়িতে তৈরি রঙ ব্যবহার করেন ছবি আঁকার কাজে। কোন ‘ইজমের’ নিবিড় চর্চা নয়, বরং সনাতনী মোটিফ আর পুরাণের গল্প ফুটো ওঠে তার ধূসর কাগজে। বলা যায়, চৌদ্দপুরুষের রেখে যাওয়া বিদ্যা হাঁড়ির বাইরে এনে কাগজের উপর ঢেলে মেলে ধরেন চোখের সামনে।

ছবি আঁকার নিরিখে শিল্পী সুশান্তকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাহি শখের হাঁড়ির শিল্পী হিসেবে তার বিশেষ পরিচয়। অন্যদিকে তাকে চিত্রকরও বলা যায়, কেননা তিনি এখন কাগজের উপরেও নিজের মতো করে ছবি আঁকেন। এই দুই পরিচয়ের এক অদ্ভূত মিশ্রণ চোখে পড়ে তার ছবিতে। শখের হাঁড়ি আঁকার চিরায়ত যে ঢং বা ফর্ম সেইটিকে অক্ষুন্ন রেখে কাগজের উপর ছবি আঁকেন তিনি। একারণে তার ছবির উপরে নিচে পাওয়া যায় মূলবিষবস্তুর পরিপুরক কিছু চিত্র, যেমন-ঘাড় বাঁকিয়ে থাকা কবুতর, পাখী, বাঁকানো ডালে ফুটে থাকা ফুল, গতিশীল মাছ, ঘোড়া, হাতি, ধানের ছড়া ইত্যাদি। মাঝে দুটি স্থুল লাইনের মধ্যে রাজপোষাক পরিহিত মানুষ। রাজপুরুষদের নৌবিহারের চিত্রও পাওয়া যায় তার চিত্রকর্মে। অবশ্য তার কোন কোন ছবি শুরু হয়েছে সরল আলপনা চিত্রের মধ্য দিয়ে।

শখের হাঁড়িতে ঘোড়া, পাখি, ফুল, গাছ ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ব্যবহারে তিনি যেমন সিদ্ধহস্ত, তেমনি ছবি আঁকার ক্ষেত্রে পৌরাণিক মোটিফের ব্যবহার বিষয়ে তিনি আরো বেশি উদার। কৃষ্ণের মত পৌরাণিক দেবতার মোটিফ তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেন তার ছবিতে। লোকশিল্পীর সহজাত ভঙ্গিতে সুশান্ত এঁকে ফেলেন বংশীবাদক রাখাল কৃষ্ণের অবয়ব। বিষয়টি চমকপ্রদ একারণে যে তার ছবিতে কৃষ্ণ একা বিহার করেন, সেখানে রাধা অনুপস্থিত।

বাংলার রূপকথায় তিন সংখ্যাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল, চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী, বাবা-মা-সন্তান ইত্যাদি। হয়তো সচেতনভাবে নয়, কিন্তু তিন সংখ্যাটির বেশ প্রভাব রয়েছে সুশান্ত পালের ছবিতে। তার প্রায় প্রতিটি ছবিতে মানুষের ফিগার দেখা যায় তিনটি করে। তিনটি পাখি, তিনটি মাছ, তিনটি ফুলের ডালসহ ফুল, তিনটি ধানের ছড়া ইত্যাদি রূপকথার তিনের সূত্রকে বহন করে।

কাগজের উপর দৃশ্যকল্পের যুৎসই বুননের জন্য তিনি যে রঙের ব্যবহার করেন তা এক ভিন্ন মাত্রার আবেশ তৈরি করে। সুশান্তর ছবির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার। লাল, সবুজ, নীলসহ প্রায় সব রঙই উজ্জ্বল। শখের হাঁড়ির মতো এক্ষেত্রেও তিনি ব্যবহার করেন মূলত প্রাকৃতিক রঙ। কখনো কখনো বাজারের কেনা রঙও বটে।

সুশান্তকুমার পাল একজন শিল্পী-বাস করেন শহরের কোলাহলের বাইরের নিরব নিভৃত গ্রামে। চর্চা করেন শিল্পের-চৌদ্দপুরুষের রেখে যাওয়া পরম্পরাগত বিদ্যার। সেখানে তিনি নতুন মাত্রা যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন কাগজের উপর সমপ্রতি করা নতুন ধরণের কাজে।

(ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: পলাশ চৌধুরী)

সহায়তা:
1. ২০০৯ এবং ২০১০ সালের (মার্চ) বিভিন্ন সময়ে বসন্তপুর এবং ঢাকায় গ্রহণ করা সুশান্তু পালের সাক্ষাৎকার।
2. শাওন আকন্দ, বাংলাদেশের লোকশিল্পের রূপরেখা (অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি)।
3. নিসার হোসেন, ‘লোকচিত্রকলা’ , বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা, ৮ম খণ্ড, চারু ও কারু কলা, সম্পা: লালা রুখ সেলিম, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ২০০৮।




সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২৩
৮টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×