মুসলিম বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ
প্রায় এক শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। অবশেষে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে উসমানী খিলাফতের অবসানের পর-এ চিন্তাধারা মুসলিম বিশ্বে বি¯তৃতি লাভে সক্ষম হয়। ১৯২১ সালে মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তুরস্কে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে এটিকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। এক সময় ইসলামী বিশ্ব শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ছিল। কাল পরিক্রমায় মুসলমানদের নৈতিক অবক্ষয়, লোভ-লালসা, অলসতা ও বিলাস বহুলতার কারণে তাহযীব-তামাদ্দুন ও চিন্তাধারায় শূন্যতা দেখা দিতে থাকে। তারা ঝুঁকে পড়ে পাশ্চাত্য জীবন যাত্রা ও কৃষ্টি কালচারের প্রতি। মিশ্রিত হতে থাকে তাদের চিন্তা ধারার সাথে বিজাতীয় আদর্শ। এ অবিমিশ্রণের ফলে মুসলমানরা তাদের স্বকীয়তা যেমন হারিয়ে ফেলে তেমনি তারা তাদের দীনের মূল সৎচিন্তা-চেতনা ও জীবনী-শক্তি থেকে দূরে অবস্থান করতে শুরু করে। এ সুযোগেই নব্য জাহিলীয়াত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মুসলিম দুনিয়ায় তার আগ্রাসী জাল বিস্তার করে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক শ্রেণীর মুসলমান ইসলামকে পাদ্রীদের ধর্মের ন্যায় উন্নতি ও প্রগতির অন্তরায় মনে করে। ইউরোপীয় চিন্তাধারায় যেমন ধর্ম ও রাষ্ট্রনীতির মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়, তদ্রুপ নীতি মুসলমানদের মধ্যেও বি¯তৃত হয়। মুসলিম শাসকগণ পরিবেশ-পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী কেবলমাত্র পরামর্শদাতা ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে আলিম ও দীনদার লোকদের সাহায্য নিয়েছেন এবং যতটুকু তারা চেয়েছেন কবুল করেছেন। এভাবে রাষ্ট্রনীতি ধর্মের খবরদারী ও তত্ত্বাবধান থেকে মুক্ত হয়ে শেকলবিহীন হাতীর ন্যায় লাগামহীন হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে আলিম ও দীনদার শ্রেণীর লোকেরা রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিরোধী হয়ে ওঠে। আবার তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্র ও রাজনীতির মাঠ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন এবং তাৎক্ষণিক বিপর্যয় সম্পর্কে হতাশ হয়ে ব্যক্তি সংশোধন ও প্রশিক্ষণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এভাবে রাষ্ট্রনীতি থেকে ধর্ম বিচ্ছিন্ন হয়। এবং দিন দিন শক্তিহীন, প্রভাবশূন্য ও নি®প্রভ হতে থাকে। অপরদিকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি এমন শক্তিশালী হতে থাকে যে, পরবর্তীতে আলিম দীনদার লোক এবং দুনিয়া ও জাগতিক বিষয় বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা পরিষ্কার দুটো পৃথক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। ফলে মুসলিম বিশ্বে ধর্ম বিমুখতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের অনুপ্রবেশের পথ সুগম হয়। তাছাড়া মুসলিম বিশ্বে যারা জ্ঞান চর্চা করেছেন তাদের অনেকেই ইসলাম স¤পর্কে অনেক অমুসলিম চিন্তানায়কের চেয়েও কম জানেন। তারা অনেক মোটা মোটা বইমুখস্থ করেছেন কুরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করার সুযোগ পাননি-হয়তো বা প্রয়োজনও বোধ করেননি। অপরদিকে মুসলমানদের মধ্যে যারা কুরআন ও হাদীসের গবেষণা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অধ্যয়ন না করার ফলে এবং পার্থিব জীবনকে সর্বদিক দিয়ে ইসলামী দৃষ্টিভংগীতে বিচার করার সুযোগের অভাবে গোটা মুসলিম সমাজকে যোগ্য নেতৃত্ব দান করতে অক্ষম। দীর্ঘকাল অনৈসলামী শাসনের ফলে ইসলামী মন-মগজ ও চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্ব জীবনের সকল দিক থেকেই উৎখাত হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ফলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ অথচ ইসলামী মন মস্তিষ্ক শূন্য মুসলমানদের নেতৃত্বই প্রতিষ্ঠা লাভ করল। এ নেতৃত্বের পক্ষে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা এবং যে কোন পন্থায় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠার পথ মুক্ত করার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হওয়া মোটেই বিস্ময়কর নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাস থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে, জ্ঞান সাধনা, তথ্যানুসন্ধান ও চিন্তা গবেষণার ইঞ্জিনই বিশ্বের এই বিরাট গাড়ী খানাকে টেনে নিয়ে চলছে। চিন্তানায়ক সাধকরাই উক্ত ইঞ্জিনের পরিচালক। তাদের মর্জি অনুযায়ী গোটা গাড়ীর সকল যাত্রীকেই চলতে হয়। যদ্দিন মুসলমান জাতি চিন্তার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছিল তদ্দিন ইসলামী চিন্তাধারাই মানব জাতিকে প্রভাবান্বিত করেছিল। সত্য ও মিথ্যা, সুন্দর ও অসুন্দর ভাল ও মন্দের ইসলামী মাপকাঠিই তখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার আন্দোলনের ফলে বর্তমান ধর্মহীন চিন্তাধারার বন্যার মুখে ইসলামী জ্ঞান বঞ্চিত মুসলিমদের ভেসে যাওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই পাশ্চাত্যের নেতৃত্বে আধুনিক জ্ঞান সাধনার যে ইঞ্জিন দুর্বার গতিতে মানবজাতিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাতে মুসলিম নামধারীদের এমনকি ধার্মিক বলে পরিচিত বহু মুসলমানেরও প্রভান্বিত হওয়া বিস্ময়কর নয়। চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্ণ দাসত্ব মুসলিম নেতৃত্বকে পঙ্গু করে রেখেছে। তারা ইউরোপের উস্তাদদের নিকট নৈতিক ও মানসিক আত্ম বিক্রয়ের মাধ্যমে বিশ্বস্ত শাগরিদের ন্যায় পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসরণ করে চলেছেন। তাদের স্বাধীন মন-মগজ বা চক্ষু আছে বলে মনে হয় না। তারা পাশ্চাত্যের চক্ষু দ্বারা সুন্দর অসুন্দরের সিদ্ধান্ত নেন; ইউরোপের মগজ দিয়ে উন্নতি অবনতির হিসাব করেন এবং উস্তাদদের মন দিয়েই ভালমন্দের বিচার করেন। ইউরোপের এসব মানস সন্তানগণ যদি মানসিক দাসত্ব ত্যাগ না করেন তাহলে একদিন রাজনৈতিক দাসত্বই এর স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে স্বাধীন মুসলিম দেশগুলোর উপর নেমে আসবে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলো আজ এ কারণেই বিভিন্ন জাতির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামে পরিণত হতে চলেছে।
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থা মুসলমানদেরকে গোলামে পরিণত করার কৌশল
ইসলামের সাথে যারা দুশমনি করে তাদের ভয় হলো যতদিন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ কুরআনী শিক্ষা চালু রাখবে ততদিন পর্যন্ত গোটা দুনিয়ায় وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ মুসলমানদের উপর বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহর বাণী,
“কাফিররা বলেঃ তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না এবং তা তেলাওয়াতকালে শোরগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।” (হা-মিম আস্সাজদাহ-২৬)। কুরআন থেকে মুসলমাদের যতো দুরে রাখা যাবে ততোই মুসলমারা মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়বে। তাই তাদের সবসময় চিন্তা মুসলমানদের শক্তির প্রাচীর স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। আর এটা তখনই সম্ভব যখন মুসলমানদের দীনী শিক্ষার প্রবাহিত ঝরনা শুষ্ক করে দেয়া হবে। তাদের দীনী শিক্ষার এই মৌলিক বাধাকে নির্মূল করে দিলেই ইসলামের সর্বশেষ দুর্গ দীন ইসলামকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। তাদের এ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই গোটা বিশ্বে জন্ম লাভ করেছে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। মুসলিম বিশ্বের দীনী শিক্ষা নির্মূল করার জন্য বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠি মুসলিম বিশ্বকে সাহায্য দিতে শর্তারোপ করেছে, যেসব মুসলিম দেশ তাদের শিক্ষা সিলেবাস পবির্তন করে যুগের চাহিদার (সেক্যুলার) সাথে সমন্বয় করবে তাদেরই কেবল সাহায্য দেয়া হবে। বাস্তবেও আমরা তারই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। আজ মুসলিম মিল্লাত যে যুদ্ধের মুখোমুখি, তা হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিভিত্তিক যুদ্ধ। এগুলোর মূলই হচ্ছে শিক্ষা। তাই ইসলামের দুর্গ দখল করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো শিক্ষা। এটি সামরিক লড়াই থেকেও অধিক কার্যকর। এর মাধ্যমে মুসলিম বুদ্ধিজীবিদেরকে সহজেই তাদের স্বার্থের সমর্থক ও রক্ষকে পরিণত করা সম্ভব। ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ‘ব্রাসেলসে’ ইহুদী পন্ডিত ও চিন্তাবিদদের এক সম্মেলনে ১৯টি অধ্যায় সম্বলিত এক দস্তাবেজ প্রণয়ন করা হয়। সেই দস্তাবেজের ১২তম অধ্যায়ে বিশ্বের মিডিয়া ও সংবাদ মাধ্যম দখল করার পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং ১৬তম অধ্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে মগজ ধোলাইয়ের পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে। যদিও সেটা এখন অস্বীকার করা হচ্ছে। আসলে বাস্তব পদক্ষেপকে মুখে অস্বীকার করাটাও তাদের ষড়যন্ত্রেরই কৌশল। তাদের ষড়যন্ত্রের কথা কুরআনুল কারীমে আল্লাহ পাক প্রকাশ করেছেন এভাবে;
وَدُّواْ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ
‘তোমাদের পক্ষে যা ক্ষতিকর, কষ্টদায়ক, তা-ই ওদের কাম্য। চরম শক্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ ওদের মুখ থেকেই প্রকাশিত হয় এবং তাদের অন্তরে যা লুকায়িত আছে, তা আরো বড় ও ভয়ংকর।’ ইমরান-১১৮। যারা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা জাতির উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন আর যারা তাতে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন তারা আসলেই ঐ ষড়যন্ত্রকারীদের স্বার্থ রক্ষায় লিপ্ত রয়েছেন। অথচ তারা এ কাজের মারাত্মক পরিণতির
ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর উন্নতি ও বিকাশ সাধন ই শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের সার্বিক জীবনকে উন্নত করার একটি মাধ্যম। কুরআনের ভাষায় যাকে বলা হয়েছে ইল্ম (জ্ঞান)। মানুষের চিরন্তন ও শাশ্বত নৈতিক মূল্যমানের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দ পার্থক্য নির্ধারণের ক্ষমতা অর্জনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার নামই শিক্ষা। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সু-নাগরিক তৈরী করা। যাতে করে তারা দেশ ও জাতির সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অধিকারী হতে পারে। জ্ঞানই শক্তি বা আলো। সকল জ্ঞানের উৎস হচ্ছেন আল্লাহ। জ্ঞান হচ্ছে আল্লাহর সাথে বান্দার সেতু বন্ধন তৈরীর মাধ্যম। এজন্যেই ইসলাম জ্ঞান অর্জনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। আল্ কুরআনের প্রথম বাণীই হচ্ছে ‘পড়’। পৃথিবীতে আল্লাহ্ পাক যতো নেয়ামত দান করেছেন তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হচ্ছে জ্ঞান। এ জন্যই وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا তাঁর কাছে জ্ঞান অর্জনে প্রার্থনা করতে বলেছেন। মহান আল্লাহ পাক, রাসূল (সঃ) কে
“(হে মুহাম্মাদ) তুমি বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি সাধন করুন!”। (সূরা ত্ব-হা ১১৪)। ধর্মীয় শিক্ষার সকল বিষয়ই স্রষ্টা-কেন্দ্রিক। এখানে মানুষের সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য উৎসর্গীকৃত। এ দুনিয়াই শেষ নয়; পৃথিবীর জীবন শেষ হলে আছে আরেক অনন্ত জীবন। সে জীবনের ভালো-মন্দ সবকিছু নির্ভর করে পৃথিবীতে ব্যক্তির কৃত সকল কাজ-কর্মের ওপর। ফলে সেই অনন্ত জীবনের বিশ্বাস থেকে এর সাফল্যের জন্য ব্যক্তি নিজেকে ভালো কাজে নিয়োজিত রাখে; মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী ব্যক্তি মাত্রই বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ সব জানেন। প্রতিটি ভালো ও মন্দ কাজের তিনি সাক্ষী এবং সকল কাজকর্মের জন্য পরকালীন জীবনে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ বিশ্বাসের কারণেই ব্যক্তি সবচেয়ে গোপন ও নিরাপদ জায়গাতেও শত প্রলোভন সত্ত্বেও অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত হতে পারে না। কিন্তু এ বিশ্বাসের বীজ যার হৃদয়ে বপিত হয়নি তার কাছে নৈতিকতা অর্থহীন মনে হয়। ফলে তাকে শত নৈতিক শিক্ষা দেয়া হলেও তা বিস্মৃত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই এ কথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক কল্যাণের জন্য প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা তথা ধর্মীয় শিক্ষা। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। যে
জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি ততই উন্নত। কিন্তু অধুনিক বিশ্বে শিক্ষিতের হার যত বাড়ছে পৃথিবীতে ততই অমানবিক কাজ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হলো শিক্ষার সাথে মনুষত্যের পরিচয় হয়নি। ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন, তাই বলে যে কোন খাদ্য শরীরের জন্য কল্যাণকর নয়। খাবার বস্তু মান সম্মত না হলে রোগ জীবাণুতো ধরবেই। ফলে নানা রোগের সৃষ্টি হবে, অশান্তি বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি ভাবে শিক্ষা যদি হয় নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত তাহলে সমাজ তথা বিশ্বে অশান্তির আগুণতো জ্বলবেই। যার ফলে পরস্পরের হিংসা-বিদ্বেষ, কলহ-দ্বন্দ্ব, শক্রতা সমাজ,রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি শৃঙ্খলাকে বিনষ্ট করে চলেছে। যারা নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার, যারা চারিত্রিক দোষে দুষ্ট এমন লোকের ভূমিকা সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। চুরি ডাকাতি, রাহাজানি, জুলুম-অত্যাচার অন্যায় অনাচার এক কথায় সর্বপ্রকার পাপাচারে লিপ্ত লোকদের ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রতিনিয়ত পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরা কি শিক্ষিত নয়? তাহলে এর জন্যে দায়ী কে? এর জন্যে দায়ী নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থা। এটা এমন শিক্ষা ব্যাবস্থা যা ধর্মের (কুরআন-সুন্নাহর) সাথে সংশ্লিষ্ট নয় বরং সাংঘর্ষিক। শৈশব
থেকে যাতে ছেলেমেয়েরা ধমীঁয় আদর্শে গড়ে উঠতে না পারে সে জন্য ধমীঁয় শিক্ষাকে বাদ দিয়ে ললিতকলা (গান -বাজনা, নাচ, অভিনয়, নাটক
ইত্যাদি) শিখানো হয়। আল্লাহর বাণী,
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহর পথ হতে (মানুষকে) বিচ্যুত করবার জন্যে অসার বাক্য (গান-বাজনা) ক্রয় করে নেয় এবং আল্লাহ প্রদর্শিত পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে; তাদেরই জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরা লোকমান ৬)। এর ফলে ধর্মহীন আদর্শে গড়ে
উঠবে শিশুরা, যা জাতির জন্য বয়ে আনবে এক চরম আদর্শিক বিপর্যয়। যার ফলে ইহকাল ও পরকাল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাসূল (সঃ)-এর বাণী,
مَن تَعَلََمَ عِلمًا لِغَيرِ الله, و أراد بِه غَيٌر الله, فَليَتبوأ مَقعَدَه مِنَ النََار. (رواه أهل السنن).
“যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করলো যার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক নেই এবং এর দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত শুধু দুনিয়া অর্জনই তার লক্ষ্য, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারন করলো। (রওয়াহু আহলে সুনান)। যাদের আদর্শ থাকেনা তারা অনায়াশেই যে কোন আদর্শের গোলামী করতে কোন সংকোচ করে না। তারা সংকীর্ণ স্বার্থের বিনিময় দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ বিক্রি করে দেয়। নৈতিকতার মূল ভিত্তিই হলো ধর্ম। ধর্মের অর্থই হচ্ছে মানুষে মানুষে বন্ধন প্রতিষ্ঠা। আর ধর্মহীনতাই হচ্ছে মানুষে মানুষে শক্রতা। ধর্মহীন শিক্ষাই দুনীঁতির উৎস। সেকুলার শিক্ষা
ব্যাবস্থায় ধর্মীয় কোন বিধান থাকেনা কৌশলে ধর্মকে বাদ দেয়া হয়। যার ফলে এটা নীতি নৈতিকতা বর্জিত তথা কথিত দুনিয়াবী শিক্ষা যেটা
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُواْ نِعْمَةَ اللّهِ كُفْرًا وَأَحَلُّواْ قَوْمَهُمْ دَارَ الْبَوَارِ বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহর বাণী,
“তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর না যারা আল্লাহর নেয়ামতের (কুরআনের) বদলে কুফরী নীতি প্রকাশ করে তাদের জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়”। (ইবরাহীম-২৮)। যে জাতি নিজের পরিচয় সম্পর্কে যতবেশী সজাগ সে জাতি তত বেশি শক্তি নিয়ে দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে পারে। আর যারা নিজেদের সংস্কৃতি ও শিক্ষা ধরে রাখতে পারে না তারা নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে দুনিয়ায় বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। একটি জাতির সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে ধ্বংস করতে পারলেই সে জাতিকে সহজেই গোলামীর জিঞ্জির পরানো যায়। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থা সে ষড়যন্ত্রেরই
প্রথম কৌশল। রাসূল (সঃ)-এর বাণী,
اِنََ اللََهَ يَرفَعُ بِهذا الكِتَابِ اَقٌوامًا وَ يَضَعُ بِهِ آخَرِينَ.
‘এই কিতাবের (কুরআনের) মাধ্যমে আল্লাহ্ বহু জাতির উত্থান ঘটান। আবার এই কিতাবের (নির্দেশ অমান্য করার কারণে) বহু জাতির পতন ঘটান।’ (মুসলিম)। সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুসলিম হওয়া সত্বেও যারা আজ ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধীতায় ময়দানে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন বড় বড় ডিগ্রী ধারী। যাদের কারণে মুসলিম মিল্লাত আজ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আজ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বাতিল শক্তিবর্গ ইসলামের নাম নিশানা মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। তারা সত্যের পতাকাবাহীদের সমূলে উৎখাত করার প্রকাশ্যে প্রতিজ্ঞা করছে। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামের শক্ররা তাদের বন্ধু তৈরী করতে সহজেই সফল হবে। তারা জানে যে, কুরআন সুন্নাহর আলোকে শিক্ষা ব্যাবস্থায় তৈরী হবে গাজী সালাহউদ্দিন আয়ূবী, খাঁন জাহান আলী, শাহ্ জালাল, টিপু সুলতান, তিতুমীরদের মতো মর্দে মুজাহিদ, যাদের নাম শুনলে আজো ইসলামের শক্রদের হৃৎকম্পন শুরু হয়। এধরনের দেশপ্রেমিক যাতে তৈরী না হয়
সে জন্যই তারা বিশ্বব্যাপী ধর্মহীন শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করতে চায়। কুরআন বিমুখ করার মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে মেরুদন্ড হীন করে গোলামে পরিণত করার এক গভীর ষড়যন্ত্রই হচ্ছে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যাবস্থা। এক্ষেত্রে মুসলমানরা যদি অবহেলা করে, তাহলে বর্তমানে তারা যে কঠিন পরিস্থিতির শিকার, তার চেয়েও কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতির শিকার হবে তাদের আগামী প্রজন্ম। এজন্যই মহান আল্লাহর নির্দেশ হলো,
وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ
‘ তোমরা যথাসাধ্য তাদের (অর্থাৎ শক্রুদে মোকাবেলার) উদ্দেশ্যে শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতি গ্রহণ করো।’(আনফাল-৬০)।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


