আমাদের ভাষা বাংলা। ভাষা বলতে বোঝায়-কতকগুলো ধ্বনিমূল, ধ্বনির সমন্বয়ে গঠিত শব্দ, শব্দের সমন্বয়ে গঠিত বাক্য এবং বাক্যের মধ্যে অর্থের প্রবাহ। শুধু ব্যক্তি নিয়ে যেমন সমাজ হয় না, তেমনি শুধু ধ্বনিমূল নিয়েও ভাষা হয় না। বাংলা ভাষার-ঐতিহাসিক মাত্রা, আঞ্চলিক মাত্রা, সামাজিক মাত্রা, প্রকৌশল ও রীতিগত মাত্রা আছে। ভাষা হচ্ছে মানুষের বাক সংকেতের সংগঠন। এ সংগঠন জটিল উৎপাদনক্রম ও স্বেচ্ছাধীন এবং এর দ্বারা একই সমাজের মধ্যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সুসম্পন্ন হয়। ভাষা হচ্ছে মানুষের জৈবিক সামর্থ্যের ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত বলে পৃথিবীর সকল ভাষার মধ্যে সার্বজনীনতা (টহরাবৎংধষ) বিদ্যমান অপরদিকে সাংস্কৃতিক সংশ্রয়ের প্রভাবে নানা ভাষার মধ্যে বৈচিত্র্য নিরীক্ষণ করা যায়। ভাষার দুটো পর্যায়-একটি হচ্ছে তার রূপের পর্যায়, অপরটি বিষয়ের পর্যায়। বাঙলা ভাষার দুটো বিশুদ্ধ রূপ আছে বলে বিবেচনা করা হয়: একটির নাম সাধু ভাষা। অপরটির নাম চলিত ভাষা।
বাংলা ভাষায় সীমিত সংখ্যক ধ্বনির মাধ্যমে হাজারো রকমের ব্যসত্দও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করা যায়। এই বিশেষ ক্ষমতাই আমাদের ভাষাকে সীমাহীন শক্তির অধিকারী করছে। জীবনের অভিজ্ঞতাকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বা রূপ দিয়ে আমরা যে জ্ঞানের ভাণ্ডার তৈরি করি তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে দিতে পারি।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। প্রতিদিনের ভাবের আলাপন, সুখ-দুখ, আশা- নৈরাশ্য, আনন্দ- বেদনার প্রকাশ তথা মনোভাব প্রকাশে এই ভাষাই সবচেয়ে উপযোগী। বাংলা ভাষায় কোনো ভাব যত সহজে বুঝা যায়, তা আর কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। দেশকালের সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির যে যোগ রয়েছে তার গভীর মিল বন্ধন রচনা করতে পারে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা। স্বদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা এই ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। বাংলা ভাষার সম্পৃক্ততা এই ভাষাভাষী সকল মানুষকে নিয়েই; তাদের সর্বাঙ্গীনতার ধারক পরিচায়ক এই ভাষা সম্পদ। বাংলা ভাষার মাধ্যমেই আমরা স্বতন্ত্র জাতি হয়ে উঠেছি, একে কেন্দ্র করেই জাতীয় সত্তা রূপ পেয়েছে, গড়ে ওঠেছে। আমাদের এই ভাষা কোনো শ্রেণী তৈরি করেনি, এটি গঠিত হয়েছে শত শত বছর ধরে, হাজার বছর ধরে।
নোয়াম চমেস্কি ভাষার সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের বাংলা ভাষা নিজে নিজেকে বদলাতে পারে, পুনরুৎপাদিত করতে পারে। তাই ইহা সৃজনশীল, রূপান্তরশীল, উৎপাদনশীল-নিঃসন্দেহে। আমাদের যে কারো মনে যেকোনো কিছু অর্থ দেয় সমাজ বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে। আমরা ব্যক্তি থেকে সামাজিক হয়ে ওঠি ভাষার মধ্য দিয়ে মন ও সমাজের সাথে সমন্বয় হয়ে।
বাংলাভাষা সৃজনশীল, তার ধরাবাঁধা চেহারা নেই। যোগাযোগ সক্ষম বাক্যের সৌন্দর্য, সুন্দর, সরল, সৌকর্য থাকতে হয়। এর সার্বজনীন অর্থবোধকতা নেই। একটি বাক্যের কয়েক রকমের অর্থ হতে পারে। ইহা অনিঃশেষ বিবরণ দিতে থাকে, কিন্তু ফুরায় না। সৃষ্টিশীল বলে নিত্য নতুন বাক্য তৈরি করতে পারে।
বাংলাভাষা সামাজিকভাবে বিন্যস্ত হয়। এর অর্থ কোনো ব্যক্তি তৈরি করতে পারে না। সামাজিকভাবে সকলের অংশীদারিত্বের মধ্য দিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটা তৈরি হয়। সীমাহীন অভিজ্ঞতাকে সসীম বর্ণমালার মধ্যে সাজানো যায়। বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে আমরা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে অপরের মধ্যে সঞ্চালিত করি। ইহা কল্পনাশক্তি, ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে বিস্তৃতি করে। মনন বুঝতে ভাষা উপকার করে। আমাদের সংস্কৃতির মননকে ভালভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে বাংলা ভাষার কাঠামো।
আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক স্তর রয়েছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকমের কথাবার্তা প্রচলিত অঞ্চলভেদে ভিন্নতা রয়েছে। উঁচুস্তরের মানুষদের বলার ভঙ্গি এবং উচ্চারণ অন্যান্য স্তরের লোকদের বলার ধরণ বলার ভঙ্গি ও উচ্চারণের ধরণ থেকে স্বতন্ত্র।
সুকুমার সেনের বাংলা ভাষার ব্যাপারে কথা হলো ফরাসি ভাষার আগমনে বাংলা ভাষা একটি চলমান সহিষ্ণু ভাষায় পরিণত হয়েছে। সেন রাজত্বের সময়ে সংস্কৃত ভাষাদের ভাষারূপে সৃজিত হয় এবং প্রশাসনিক কর্মের জন্যে সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ হতো। বাংলায় মুসলমানদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি ভাষা অসাধারণ লালিত্য ও মাধুর্য নিয়ে বাংলা ভাষাকে সুকুমার সক্ষম এবং চলমান ভাষায় পরিণত করলো।
বাংলা ভাষা আজ বিশ্বগামী, সর্বতোগামী। বাংলা ভাষার বিকাশধারার সংগ্রাম বহুযুগের, বহুকালের মানবদ্রোহ ও অস্তিত্বচেতনার সংগ্রাম। এ সংগ্রামের প্রবাহ অবিনাশী ও অবিনশ্বর। এর কোনো মৃতু্য নেই। এর কোনো বিস্মৃতি নেই। ব্যতয় ও বিরতী নেই। ভাষার অস্তিত্বের আবেদন ও অঙ্গীকার আবহমান-চিরায়ত, শাশ্বত। আজ বাংলাভাষা শুধু বাংলা ভাষাভাষীর ভাষা নয়। এ ভাষা আজ বিশ্ববাসীর ভাষায় পরিণত হয়েছে। বাংলাভাষার স্বকৃত-সংস্কৃতির ঐতিহ্যধারা আজ বিশ্বসংস্কৃতির ঐতিহ্যপত্রে সংযোজিত হয়েছে।
বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। সবার প্রিয় ভাষা। ভাষার মতো ইহজাগতিক সত্য কম আছে। মানুষই সৃষ্টি করে মানুষের প্রয়োজনে, ভাষা ঐক্যবদ্ধ করে মানুষকে, সেও মানুষের প্রয়োজনেই। ভাষার দুর্দশা দেশের সামগ্রিক দুর্দশারই মুখচ্ছবি, ভাষার প্রচলন দর্পণের মতো স্বচ্ছ।
আমাদের ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ ও পছন্দের চৌহদ্দি তৈরিতে বাংলা ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


