somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রত্যাবর্তন

০৩ রা অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"আমার চশমাটা কই?"
মা সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত। ভোরে ফজরের নামাজ শেষে অনেকক্ষণ মোনাজাতে বসে ছিলেন তারপর দীর্ঘ সময় ধরে তজবিহ জপলেন।
"কি হলো, আমার চশমাটা কোথায় রাখলাম! কোথায় গেলে তুমি?" বাবা, পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে বলছেন।
" এই যে তোমার চশমা! শোনো, টাকা দাও, চিনি আনতে হবে" মা বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন।
" কাল না সব আনলাম" বাবার উত্তর।
" চিনি আনতে ভুলে গেছো! টাকা দাও, রাহুল নিয়ে আসবে! একটু পায়েস করতে চেয়েছিলাম" মা নরম করে বললেন।

বাবা তার প্রিয় বই জাহানারা ইমামের " একাত্তরের দিনগুলি" র ভেতর থেকে ছোট একটা কাগজের টুকরো বের করলেন।

"মমতা ভিলা"
মিস্টার সাদিক চৌধুরী
রোড ৫৫, হাউস ২০
বারিধারা ডিও এইচ এস
ঢাকা।

"রাহুলের মা, রাহুলকে একটু ডেকে পাঠাবে। সাদিক সাহেবকে একটু ফোন করা দরকার, না না ঠিক আছে, আমি বরং বের হয়ে কোথাও থেকে করে নিবো!" বাবার কথা শুনে মা আমাকে ডাকলেন। বাবা অনিতাকে একাই আনতে চাচ্ছেন। আমাকে যেতে হচ্ছে না।


" আস্লামুওলাইকুম! সাদিক সাহেব বলছেন?"
"জ্বি"
" আমি অনিতার বাবা, হাবিবুর রহমান বলছি"
" হ্যা, হাবিব সাহেব, আপনি চলে আসুন, অনিতা আপনার জন্য বসে আছে!"
" জ্বি, আমি আধাঘন্টার মধ্যেই চলে আসবো"
" আচ্ছা রাখি"
" আস্লামুওলাইকুম"
"ওলাইকুম"

পকেট থেকে কুচকুচে কালো, নোংরা একটা দুইটাকার নোট দোকানদারকে দিয়ে বাবা রিক্সা ডাকলেন।
" এই রিক্সা যাবি?"
" কই যাইবেন?"
" এই বাসস্ট্যান্ড, কতো যাবি?"
" ১২ টাকা"
" ৭ টাকায় যাবি?"

বাবা অনেকক্ষণ মোড়টাতে দাড়িঁয়ে থাকলেন রিক্সার জন্য। কেও ১০/১২ টাকার নিচে যেতে চাচ্ছেনা আজ। পরে, ওই ভাড়াতেই উঠে পড়লেন একটা রিক্সায়। আজ ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি না করলেও চলবে! আচ্ছা, দুই কেজি চমচম নিয়ে নিলে ক্যামন হয়?, বাবা যেতে যেতে ভাবলেন।

বাস থেকে নেমে আবার রিক্সা। ঠিক ১১টার দিকে "মমতা ভিলা" -এর সামনে এসে নামলেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে চিরুনী বের করে চুলটা ঠিক করে নিলেন। বিশাল সুরম্য ভবন এ মমতা ভিলা। এতো বাড়ি, বাড়ির সামনে বাগান, গাড়ি। অনিতা এ বাড়িতে আছে, ভাবতেই বাবার ভালো লাগছে।
" আজ কতো বছর পর মেয়ের সাথে দেখা হবে। প্রথমে ভাবতেই পারিনি অনিতাকে এভাবে ফিরে পাবো। আজ ওর মা কতো খুশি, পুরো বাড়ি যেন আনন্দে থৈ থৈ করছে...!"
"আপনি কারে চান?"
গেটম্যানের কথায় বাবা সম্বিত ফিরে পেলেন। " আমি অনিতার বাবা। সাদিক সাহেবের কাছে এসেছি।" বাবা বললেন।
সাদিক সাহেবের সাথে খুব বেশি কথা হলোনা বাবার। সাদিক সাহেব বললেন,
" আমাদের দেশের হাজার হাজার মেয়ে দুবাইতে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে আবার পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্যান্য দেশে। আমি দুবাইয়ের এক পত্রিকায় অনিতাকে নিয়ে পড়েছি। যোগাযোগ করেছি। ও যে বাসায় কাজ নিয়েছিলো, সে বাসার মালিকের সাথে কথা বলেছি। আমার পরিচয় জানার পর লোকটি অনিতাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।"
বাবা উন্মুখ হয়ে সাদিক সাহেবের কথা শুনছিলেন।
" হাবিব সাহেব, আমি একজন বাবা। আমার মেয়েটা দুবাইতেই রোড এক্সসিডেন্টে মারা গিয়েছে! অনিতাকে তার বাবা-মা- পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমার ভালোই লাগছে!"
বাবার চোখ ছলছল করছিলো। মানুষ এতো উদার হতে পারবে!


সি এন জিতে পাশাপাশি বসে যাচ্ছেন বাবা। অনিতার চোখে মুখে চাপা উচ্ছ্বাস। বাবা অনিতার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, " মা, কিছু খাবি?"
"না বাবা!" অনিতা অনাগ্রহ নিয়ে বললো। "তোমার বুকের ব্যথার কি অবস্থা এখন? ডাক্তার দেখিয়েছিলে?"
বাবা নিশ্চুপ, কিছুক্ষণ পরে বললেন " এখন ভালো!"
" আর তোমার পেনশনের টাকাগুলো পেয়েছো?"
" না" বাবা বললেন।
" ভাইয়া এখন কি করছে?" অনিতার পরবর্তী প্রশ্ন।
" কিছু করছে না?"
" আপুর কি অবস্থা! মনি বোধহয় অনেক বড়ো হয়েছে তাইনা?"
বাবা নিশ্চুপ। " কি হলো বাবা, কিছু বলছো না যে!"
" এতোদিন পর বাড়ি ফিরছিস, তোর কথা বল। তোর কি খুব কষ্ট হয়েছে? এতোটা বছর ক্যামন ছিলি?"
" ভালো" অনিতা চট করে বলল।
" সাদিক সাহেব খুব ভালো একজন লোক। খুব মহান একজন লোক। সাদিক সাহেব উদ্যোগটা না নিলে, তোকে বোধহয় আর কোনোদিন ফিরে পেতাম না!"
অনিতা বাবার পাশে চুপচাপ বসে থাকে। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। বাবা হকারকে ডেকে একটা পত্রিকা কিনলেন। পত্রিকার হেড লাইন দেখে বাবার কি উচ্ছ্বাস। " দেশের পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব- কমনওয়েলথ সচিবের আশ্বাস"। বাবার মনে হলো সারাদেশে যেন উত্সবের মতো একটা আবহ বয়ে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে ফিন্নি,পায়েস রান্না হবে। দেশের টাকা দেশে ফিরে আসছে। কি আনন্দ কি আনন্দ!!


মা অনিতাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। দীর্ঘ চার বছর পর মেয়েকে পেয়ে যেন অমূল্য রতন পেলেন। আমি তখন ঘরে ছিলাম না। মুক্তারের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। দোকানের লোকজনেরা অনিতাকে নিয়ে কথা বলছিলো!
" হাবিব সাহেবের মেয়েটা নাকি ফিরে এসেছে"
" পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েকে ফিরে পেয়ে কি লাভ, আরো ভোগান্তি"
" প্রতিবেশীর তো আরো ছেলে মেয়ে আছে, তাই না!"
" শুনলাম, পাচারের পর মেয়েদের বেশ্যাবৃত্বিতে ঢোকানো হয়। যতো সব খারাপ রোগ বালাই শরীরে এরা নিয়ে আসে!"
" এইযে সিলেটের কথাই ধরেন, সেখানে এইডস দিয়া ভরা, বিলাত ফেরত মানুষেরা দেশটারে রোগ বালাই দিয়া ভইরা ফেলতেছে!"... ইত্যাদি ইত্যাদি

আমি আর বেশিক্ষণ সেখানে বসে থাকতে পারলাম না। উঠে অন্যত্র হাঁটা ধরলাম।


মা অনেক যত্ন করে অনিতার জামাকাপড়, বিছানা গুছিয়েন। কবিতার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ও এখানে একাই ঘুমাতো। কিন্তু এখন কবিতা আর তার মেয়ে মনিও এখানে থাকে। মাস ছয়েক হয়েছে কবিতার ডিভোর্স হয়েছে।
"রাত অনেক হয়েছে মা, ঘুমতে যা। তুই বোধহয় অনেক ক্লান্ত।"
মা, অনিতাকে বিছানায় যেতে বললেন।
" মা, বশির মামা, ফুপুরা কেউ এলোনা যে?"
মা কোনো কথা বললেন না। অনিতা দেখতে পেল এতোদিন পরে মেয়েকে ফিরে পাওয়া মায়ের চাপা প্রশান্তিটুকু ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অনিতা আর কথা বাড়ালো না। চলে গেলো শোবার ঘরে।


"তুমি আর ফিরে যাচ্ছো না তাহলে?" কবিতাকে অনিতার প্রশ্ন।
" না" কবিতার উত্তর।
" মনি যেতে চায় না বাবার কাছে?"
" ও বাবা ওকে চায়না"
অনিতার বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো।"আমার জন্য তোমার সব ওলট পালট হয়ে গেল, তাই না আপু?"
কবিতা চুপ করে শোনে।
" এতো বছর পর কিছুই এগোয়নি। বাবার বুকের ব্যথা, ভাইয়ার চাকরি, তোমার সংসার,মার অসুখ। ...আত্বীয়স্বজনেরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফিরে কি ভুল করলাম আপু?"

অনিতার টলমলে চোখটার দিকে তাকিয়ে কপালে আলতো করে হাত রাখে কবিতা। " তুই এখন একটু ঘুমা!"
অনিতা কপাল থেকে কবিতার হাতটা সরিয়ে দেয়। " আপু,মনে হচ্ছে আমার ফিরে যাওয়াই উচিত"!

আলমিরাটার পেছনে ইদুঁরটা অনেকক্ষণ খুট খুট করছে! অনিতার চোখে ভর করে রাত ভেঙ্গে ভোরের আলো ফিরে আসার বিনিদ্র প্রতীক্ষা!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:৩১
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×