somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কষ্টদায়ক বর্ণনা : কুদ্দুস যদি সত্যি হয়, তাহলে!

২৪ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডেপুটি জেলার হিসেবে যোগদানের ১১ মাস পরই ১৯৬৪ সালে একটি ফাঁসি কার্যকরের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। এর আগে ফাঁসি দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। আমি তখন বরিশাল জেলা কারাগারে চাকরি করি। ফাঁসি কার্যকরের মতো একটি দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার খারাপ লাগছিল। এরপরও চাকরি করি, তাই এই দায়িত্ব আমাকে পালন করতেই হবে। জেনেশুনেই এ চাকরিতে যোগ দিয়েছি। এরপরও তো আমি একজন মানুষ। আমার সামনে ফাঁসির রশিতে ঝুলে একজন তরতাজা মানুষ জীবন হারাবে_ভাবতেই কেমন জানি লাগছিল।
স্মৃতিতে যতদূর মনে পড়ে, যার ফাঁসি কার্যকর করেছিলাম তার নাম কুদ্দুস। বাড়ি বরিশালের উজিরপুর এলাকায়। পেশায় কৃষিজীবী হলেও সে ছিল খুব সুদর্শন যুবক। বাবাকে জবাই করার দায়ে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল।
তারিখ মনে নেই। তবে ঘটনাটা মনে আছে। সিনিয়র অফিসারের নির্দেশে আমি ফাঁসি কার্যকরের দিন বিকেলে কুদ্দুসের সেলে যাই। গিয়ে দেখি কুদ্দুস মনমরা হয়ে বসে আছে। তখনো সে জানে না আজ রাতেই তার ফাঁসি হবে। আমি গিয়ে জানালাম। ভেবেছিলাম শুনেই সে আঁৎকে উঠবে। কিন্তু দেখলাম তার মাঝে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। মনে হলো সে প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছে। শুধু বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো_ স্যার, ফাঁসি-টাসি কেয়ার করি না। তবে কি, পিতাকে হত্যা না করেও হত্যার অভিযোগ নিয়ে দুনিয়া ছেড়ে যেতে হচ্ছে এটাই দুঃখ। তার কথা শুনে চমকে উঠলাম এই কারণে যে, তার কথা অনুযায়ী অপরাধ না করেও তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হচ্ছে! আগ্রহ জন্মাল ঘটনাটি জানার। কুদ্দুস আমাকে জানাল_ তার বাবা দুই বিয়ে করেছে। প্রথম স্ত্রীর ছেলে সে। মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে। ওই ঘরে দুই মেয়ের জন্ম হয়। প্রত্যেকেই বড় হয় বিয়ে-শাদি করে। কুদ্দুসেরও এক ছেলে হয়। তার বাবার বিষয়-সম্পত্তি দখলের জন্য সৎ বোনের জামাই হন্যে হয়ে ওঠে। তার বোন, বোনজামাই ও সৎ মা মিলে পরিকল্পনা করে তার বাবাকে হত্যার। সেই হত্যার দায় চাপানোর জন্য তাকে আসামি করার পরিকল্পনাও করে। এক রাতে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে কুদ্দুস তার বাবার বিছানায় শুয়ে থাকে। বাবা চলে গিয়েছিল অন্য ঘরে। ওই রাতে তার বোনজামাাই বাবাকে হত্যার জন্য যায়। গিয়ে কাঁথা সরিয়ে দেখতে পায় কুদ্দুসকে। তাকে দেখে দ্রুত চলে যায়। সেদিন কুদ্দুস বুঝতে পেরেছিল তার বাবাকে হত্যার জন্যই চেষ্টা করছে তারা। এর ক'দিন পর এক রাতে তার বোন ও বোনজামাই তার বাবাকে জবাই করে। বিষয়টি কুদ্দুস আঁচ করতে পেরেও কিছুই করতে পারেনি। বরং তার মা বাদী হয়ে কুদ্দুসকেই প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করে।
মা, বোন ও বোনজামাই প্রত্যেকেই কুদ্দুস হত্যা করেছে বলে আদালতে সাক্ষ্য দেয়। মায়ের সাক্ষ্যকে আদালত গ্রহণ করে। সেই সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কুদ্দুসের ফাঁসির রায় হয় বলে সে আমাকে জানায়। এসব কথা বলার সময় কুদ্দুস অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। সেই কান্না দেখাও ছিল বেশ কষ্টকর। কুদ্দুসের ইচ্ছে কি জানতে চাওয়া হলে সে একটি চিঠি লেখার আগ্রহ প্রকাশ করে। তাকে চিঠি লেখার জন্য কাগজ-কলম দিয়ে সেল থেকে বিদায় হই।
এদিকে কুদ্দুসকে ফাঁসি দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হলো। রাত ১০টার দিকে কুদ্দুসের সেলে যাই আমি। কুদ্দুস তার লেখা চিঠিটি দেয় আমার হাতে। অনুরোধ করে বলে_স্যার আমি আপনার পায়ে ধরি। চিঠিটি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন। আমি তাকে কথা দিলাম তার চিঠি অবশ্যই আমি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করব। চিঠিটি নিয়ে পড়ার আগ্রহ বোধ করলাম। দেখলাম সে লিখেছে_'মা তুমি তোমার জামাই মিলে বাবারে হত্যা করলা আর আমারে দিলা ফাঁসি। কোর্টে সাক্ষী দিলা যে আমিই মারছি। ঠিক আছে আমিতো চলে যাচ্ছি তোমার সঙ্গে দেখা হবে ওপারে। রোজ হাশরের মাঠে। তোমার সঙ্গে ওইখানে মোকাবিলা হবে। আর একটা কথা আমার বউ যদি অন্য কোথাও বিয়ে করতে চায় তুমি বাধা দিও না। তুমি যতদিন বাইচা থাকবা ততদিন আমার ছেলেকে দেখবা। তুমি আমার ছেলেকে পড়াবা। আমি যখন একা কবরে যাচ্ছি, তোমাকেও একা করবে যেতে হবে। সে সময় তোমার মেয়ের জামাই ও মেয়ে কিন্তু সঙ্গে যাবে না। দুনিয়ায় তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে এতোবড় অপরাধ করলা। কিন্তু তাদের কাউকে তুমি পাবা না। তোমার সঙ্গে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ হবে হাশরের ময়দানে।'
এই কথাগুলো কুদ্দুস কয়েকবার লিখেছে। চিঠির কাগজটি ভেঁজা ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল লেখার সময় তার চোখ বেয়ে পানি ঝরছিল খুব। যে কারণেই চোখের পানিতে কালি লেপ্টে যায়। চিঠিটি নিয়ে সিনিয়র অফিসারকে দিলাম। তার কাছে জানতে চাইলাম চিঠিটি কিভাবে পাঠাবো। তিনি পরামর্শ দিলেন রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠানোর জন্য। নিজের টাকা খরচ করে সেই চিঠিটি আমি পাঠিয়েছিলাম।
রাত আড়াইটার দিকে ফাঁসি দেয়ার সময় নির্ধারণ করা হলো। নিয়ম অনুযায়ী একঘণ্টা আগে গিয়ে কুদ্দুসকে গোসল করানো হলো। এরপর সে নামাজ আদায় করে। মসজিদের ইমাম গিয়ে তাকে তওবা পড়ান। ফাঁসির কিছুক্ষণ আগে কুদ্দুসের কাছে জানেত চাই, সে শেষবারের মতো কিছু খেতে চায় কি না। সে বললো, একটু দুধ খাবে। আমরা দ্রুত দুধের ব্যবস্থা করলাম। দুধটুকু খাওয়ার পর কুদ্দুসই বললো_ স্যার চলেন।
নিয়মানুযায়ী তার দু'হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলাম। সেল থেকে ৫০ গজের মতো দূরে ফাঁসির মঞ্চে আমরা তাকে নিয়ে যাই। কারণ ফাঁসির আসামি যদি মঞ্চে না গিয়ে দৌড় দেয় বা অন্য কিছু করে বসে সে কারণে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে নিতে হয়। সেখানে গিয়ে কুদ্দুস কোনো ঝামেলা না করেই ফাঁসির রশি গলায় ঝুলায়। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেট ডি জি সেনগুপ্ত, সিভিল সার্জন আবদুল লতিফ, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কারাগারের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সকালে লাশ নেয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের ডাকা হয়। লাশ গ্রহণ করতে তার মা আসেনি। এসেছিল তার বড় বোন ও তার স্বামী। কয়েক ঘণ্টা আগেই আমি কুদ্দুসের মুখ থেকে শুনেছিলাম তার সৎ বোন ও স্বামী তার বাবাকে জবাই করেছে। এ কারণে নিজের আগ্রহ থেকে তাদের দু'জনকে জানালাম যে, কুদ্দুস মৃত্যুর আগে বলে গেছে আপনারা হত্যা করে সেই দায় কুদ্দুসের ওপর চাপিয়েছেন। এ সময় তারা দু'জনই থতমত খেয়ে গেলেও পুরো ঘটনাটি অস্বীকার করে।
দীর্ঘদিন কারাগারে চাকরি করেছি। অনেক মানুষের ফাঁসি কার্যকরের সময় উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু কুদ্দুসের ফাঁসিটি এখনো আমার মনে পড়ে। কুদ্দুস স্বপ্নে এখনো আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। নতুন করে বলে, তার মৃত্যুর কাহিনী।

লেখক : 'ফাঁসি হওয়া কুদ্দুস এখনো আমার সামনে এসে দাঁড়ায়"- মো. আমিনুর রহমান সাবেক ডিআইজি (প্রিজন্স), সূত্র : কালের কন্ঠ ২৩ জানুয়ায়ী ২০১০
১৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×