somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের যে কাজগুলো মিডিয়া আপনাকে কখনোই জানাবে না!!

০৮ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ১২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি পেশায় একজন ডাক্তার।
ইদানিং কালের কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনা আর মিডিয়ায় তার প্রচারনা এবং সাধারন মানুষের প্রতিক্রিয়া মনে বেশ দাগ কাটল।
তাই কিছু লিখতে বসলাম।

আমরা যখন মেডিকেলে ভর্তি হই, প্রথম ক্লাশে স্যার জিগ্গেষ করেছিলেন কেন আমরা মেডিকেলে এসেছি?
প্রায় সবাই বলেছিলাম...মহৎ পেশা, মানুষের সেবা করতে এসেছি।
স্যার এরপর বললেন নিজ ইচ্ছায় কয়জন মেডিকেলে এসেছ?
মাত্র ৪০/৪৫ টা হাত উঠল...১৪৫ জনের মধ্যে!!!

আমরা অনেকেই অনেক কিছু হতে চেয়েছিলাম, হতে দেয়া হয়নি বা সুযোগ পাইনি বলে এখানে এসেছি।
মেডিকেলের কঠিন কঠিন সব পড়াকে জোর করে ভালবেসেছি।
নির্ঘুম রাত আর অমানুষিক পরিশ্রম করে এক একটা আইটেম-কার্ড-টাম-প্রফ পাশ করেছি...অবশেষে ডাক্তার হয়েছি।

ইতিমধ্যে ভালবেসেছি নিজের প্রফেশনকে...অনেকেই আমরা নিয়তিকে মেনে নিয়েছি...মানুষকে ভালবাসতে শিখেছি...ভালবেসেছি...হাতে গোনা ২/১ জন হয়ত তা পারেনি!!

যখন ইন্টার্নশীপ করতে গেলাম...
প্রথম দিন থেকে মানুষের জন্য ছুটেছি...সকাল ৮টায় এসেছি...দুপুর ৩টায় রুমে গিয়েছি...সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি আবার হাসপাতালে রোগী দেখে পার করেছি।

যেদিন অ্যাডমিশন থাকত, সকাল ৮ টায় এসেছি...দুপুরে যাবার সময়টুকুও মেলেনি অনেকদিন...রাতে ডিউটি করে পরদিন সকালে কাজ শেষ করে রুমে ফিরেছি দুপুরে...কখনো বিকেলে...সন্ধ্যায় আবার এসেছি...রাত ১১টার আগে যাওয়া হয়নি কোনদিন....

এই কথাগুলো কোন পত্রিকায় দেখবেন না...দেখবেন সরকারী হাসপাতালে ডাক্তার পাওয়া যায় না!!!

একবার আমার বন্ধু টানা ৪৮ ঘন্টা অর্থোপেডিক্স এ ডিউটি করেছে...ঘুমিয়েছে মাত্র ৫ ঘন্টা দুদিনে...রাত ১টায় ডাল আর ভাত খেতে বসেছিল...১০ টা মিনিট তর সয়নি রোগীর...লোকজন ডেকে জড়ো করে ফেলেছে...আধ খাওয়া ভাত ফেলে রোগী দেখতে এসেছে ছেলেটা...রোগীটা মার খেয়েছে ৫ ঘন্টা আগে...বিয়ানীবাজার পুলিশ স্টেশনে ভাঙ্গা পা নিয়ে পুলিশের বড় স্যারের(!) জন্য অপেক্ষা করেছে ৩ ঘন্টার ওপরে...আর হাসপাতালে এসে ১০ টা মিনিট সহ্য হয়না!!!!

পত্রিকায় খবরে হাসপাতালে দেরীর অংশটুকুই এসেছে শুধু...আমার বন্ধুর অমানুষিক পরিশ্রমের ছিটেফোটাও আসে নি!!!

এর নাম মানুষ!!!
এর নাম মিডিয়া!!!

মারামারি করে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে হাসপাতালে এসেছে রাত ১টায়...পালস্-ব্লাড প্রেশার কিছুই নাই!!!৩/৪ টা হাড় ভাঙ্গা!!
সে রোগীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে ৪৫ মিনিটের প্রানান্তকর চেষ্টায় কথা বলিয়ে বের করার কথাটা একবারও পত্রিকায় আসে নি!!!
বরং এই মরনাপন্ন রোগীটা মরলে আমাদের উল্টা দোষ হত!!!
রোগী বের করে আনার পর রোগীর লোকের কথাগুলো এখনো মাঝে মাঝে কানে বাজে...আল্লাহ বাঁচাইছে দেখে বাঁচছে...
আসলেই সত্য কথা।
আল্লাহ বাঁচান বলে বাঁচে...আমরা তো কিছুই করি নাই...
অথচ রোগী মারা গেলে আল্লাহর কোন দোষ নাই...সব দোষ হয় আমাদের...এমনকি যে ঘাতকের কারনে মানুষটার এ অবস্থা হয়েছে, তার চেয়েও যেন আমরা বেশী দোষী...এমন অভিগ্গতাও আমার হয়েছে।

কতজন ডাক্তার অহরহ রোগীর জীবন বাচাতে রক্তদান করছে, সে হিসেব দেখেছেন কোন খবরে??
রক্তবমি করতে থাকা রোগীর জীবন বাঁচাতে ইমার্জেন্সী এন্ডোসকপিক চিকিৎসার প্রয়োজন...রোগী আর ঘন্টাখানেক বাঁচে কিনা সন্দেহ...প্রসিডিওরের ফি ১০০০০ টাকা...সরকারী ফি তাও...অনেক কষ্টে অ্যাপ্লিকেশন লিখে ৩০০০ টাকা কমালাম...রোগীর লোক দিতে পেরেছে মাত্র ২০০০...বাকি ৫০০০ টাকার অভাবে যখন আমি রোগীর চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না...৫০০০ টাকা নিজে দেব এ মর্মে বন্ড সই দিয়ে অবশেষে প্রসিডিওরটা করালাম...আমাদের রোগীটা বেঁচেছে...

টাকাটা সব ডাক্তাররা মিলে শেয়ার করে পরিশোধ করেছিলাম।

কোন পত্রিকায় এই খবরটা আসেনি...আমরা আশাও করি না...

আমার রোগী বেঁচে আছে এটাই আমার বড় তৃপ্তি...শেষ ডিউটির দিন দেখা রোগীর হাস্যোজ্জল মুখ সারা জীবন আমার চোখে ভাসবে। রোগীর বাবার কৃতগ্গতার কথাগুলো লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল...সব রোগী একরকম নয়...কিছু কিছু মানুষ হয়ত অকৃতগ্গ হতে পারে...বাকিরা ভালো বলে বিশ্বাস করে এখনো চিকিৎসা দেবার চেষ্টা করে চলেছি।

অনেকেই বলবেন...নিজের ঢোল নিজে পেটাচ্ছি...কাজ করে আবার তা ফলাও করে লিখছি...

বলতেই পারেন....

এমনটা যারা ভাবছেন, তাদের জন্য বলছি....
আপনারা শুধু আমাদের ভুলগুলোই চোখে দেখেন...১টা রোগী মরলে লাফালাফি শুরু করেন...আর যে হাজারটা রোগী ভাল হয়ে বাড়ি যাচ্ছে তাদের আপনারা দেখেননা!!

এজন্যেই বাধ্য হয়ে লিখছি...যাতে আমার অসহায় রোগীটা আমার ওপর আস্থা হারিয়ে না ফেলে।বিনা চিকিৎসায় রোগীটা মারা গেলে পত্রিকায় দুই লাইন লিখে আপনি টু পাইস কামাবেন আর বসের বাহবা কুড়াবেন ঠিকই...আমার হয়ত কিছুটা খারাপ লাগবে...কিন্তু তার পরিবারটা পথে বসে যাবে!!!

৪৬টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×