somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিবাহ...বিয়ে...ঢাকা টু খুলনা।

০৩ রা এপ্রিল, ২০১১ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০১ সালের ঘটনা।বর্ষাকাল, ঢাকা শহর বৃষ্টির মাঝে ভিজে চুপশে একাকার হয়ে আছে।এর মাঝে সকালের পর পর ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার সড়কের আগে পথচারীরা/দোকানদার-রা সব অবাক হয়ে দেখছে,এত বৃষ্টির মাঝেও একটা রিকশার হুড খোলা।এর মাঝে স্কুল ইউনিফর্ম পরা,দুই বেনী করা একটা মেয়ে দুই হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখছে,হাসছে...আর তার ঠিক পাশে আরেকটি মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে না চেয়ে রিকশাওয়ালার দেয়া পলিথিনটা দিয়ে নিজেকে মুড়ে বসে আছে।পাশের মেয়েটি তার বান্ধুবীর গায়ের পলিথিন নিয়ে টানাটানি করছে আর তার বান্ধুবীটি প্রবল বেগে মাথা নাড়ছে।সে কিছুতেই এই বৃষ্টিতে ভিজতে রাজিনা।বলা বাহুল্য...পাশের বান্ধুবীটি ছিলাম আমি আর বৃষ্টিপাগল মেয়েটা ছিল আমার বান্ধুবী অহনা।

আমার মটুসটু এই সুন্দর বান্ধুবীকে অনেকেই চশমিশ নামে ডাকত।প্রচন্ড সেন্টি টাইপের মেয়ে ছিল।কোন কিছুতে কষ্ট পেলেই তার বড় বড় গোল গোল চোখে পানি জমে সমুদ্র হয়ে যেত।চোখের মধ্যে ঢেউয়ের মত লোনা জল টলমল করত। আমরা অনেক পাগলামী করতাম।আমাদের কাছে ভালবাসা বা বন্ধুত্ব মানেই ছিল পাগলামী করা...লিমিটলেস ফুর্তি...অনেক অনেক দস্যিপনা।আমরা দেখতে একরকম ছিলাম না এবং আমাদের অনেক ব্যাপারে মতের মিলও ছিলনা,কিন্তু তবুও কোথায় যেন ছিল অন্যরকম মিল।একবার আমার দেশের বাইরে যাবার কথা উঠেছিল,কোন কিছু ঠিক হবার আগেই এক সন্ধ্যায় অহনা আমাকে ফোন করল,সে ফোস ফোস করে কাঁদছে।কারণ আমি নাকি দেশের বাইরে চলে যাবই,সে সিওর।তাই এখন থেকেই কান্নাকাটি।যাই হোক আমার কোথাও যাওয়া হয়নি,এবং অহনার কান্নাকাটি কিছুদিনের জন্যে থেমেছিল।আমার এই বান্ধুবীটি আমাকে সামনে পেলেই সব সময় অনেক অনেক অভিযোগের ডালা খুলে বসত।আমি অসহায় হয়ে এদিক ওদিক তাকাতাম।আমি কখনোই ওকে বোঝাতে পারিনি যে আমি ছিলাম অনেক বেশি এলোমেলো একটা মানুষ।এমনকি আমার সাথে ওর বন্ধুত্ব মনে হয় প্রায় ১৫/১৬ বছরের...সঠিক সংখ্যাটা আমার মনেও নেই।(ও শুনলেই ঠিক কয় বছরের বন্ধুত্ব তা বলে দিবে ও চোখ পাকিয়ে তাকাবে) আমার অনেক সময় মনে হয় কিছু কিছু ব্যাপারের হিসেব নিতে হয়না,এইটাও ঠিক তেমন একটা ব্যাপার।

যাই হোক,কিছুদিন আগেই শুনলাম অহনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।তার ভালবাসার রাজপুত্র সূদুর লন্ডন থেকে চলে এসেছে।আমি তখন গালে হাত দিয়ে ভাবছিলাম...আরিব্বাস!!জীবনটা এত্ত ছোট কেন?এইতো সেদিন আমরা একসাথে কানামাছি খেলেছি আর আজ শুনি ওর বিয়ে!!আমার একে একে মনে পরতে লাগল-“আমরা দুইজন একসাথে শীর্ষেন্দুর লেখা বই “পার্থিব” এর নায়ক হেমাঙ্কর প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলাম,হাত খরচের টাকা জমিয়ে লেইস চিপস খেতাম,ঝুম বৃষ্টির মাঝে চটপটি খেতাম,ঘন্টা হিসেবে করে রিক্সা ঠিক করে সারা ঢাকা টো টো করে ঘুরতাম,টোকাই ছেলে-মেয়েদের সাথে রাস্তায় বসে আইস-ক্রীম খেতাম,হলুদ-সাদা ফুল পেলে মাথা ঠিক রাখতে পারতাম না.....আরও কত্ত কি!!!” ক্লাস নাইনে থাকতে অহনা বোরখা পরতে শুরু করল দেখে ওর নাম হয়ে গেলো-লাদেন খালা।অনেক ক্ষেপাতাম তখন ওকে।ওদের পুরোনো বাড়ির ৬ তালার ছাদে বসে বসে আকাশে মেঘ গুনতাম আর লাল চা খেতাম।অদ্ভুত সুন্দর ছিল সেই সময়টা। Hans Christian Andersen বলেছেন-“Just living is not enough. One must have sunshine, freedom, and a little flower” আমরা শুধু একসাথে বেঁচে ছিলাম না...আসলে আমরা বাঁচার মত করে বেঁচে ছিলাম।আর তাই জ়িবনটা ছিল ফাটাফাটি রকমের আনন্দময়।

অহনার হলুদের অনুষ্ঠানে গিয়ে টাসকি খেলাম,লাল-হলুদ শাড়িতে আমাদের পাগলাটে/অভিমানী/মহা মহা ইমোশনাল বান্ধুবীটি কে ডানাকাটা পরীর মত লাগছে। নস্টালজিক ভাইয়ের ভাষায় বলতে হয়-“পরী,তুমি ভাসবে মেঘের ভাঁজে.....” ওর সামনে যেতেই ও মুখ হাসি হাসি রেখে আমাকে ফিস ফিস করে বলল-“ঝট করে পাশে বসে পর কয়েকটা ছবি তুলেনে পরে আর টাইম পাবিনা”। আমি অনেক কষ্টে নিজের হাসি চাপলাম।হলুদ শেষে দেখা গেল একগাদা ছেলে মেয়ের মাঝে একখান হলুদিয়া পাখি পাঞ্জাবীদের মত করে দুই হাত তুলে বালে বাল্লে টাইপের ভাংড়া নাচ মারছে।সে আর কেউ নয় অহনা।সেদিন রাতে আমরা অনেকগুলো বান্ধুবী মিলে ওর বাসায় ছিলাম।একেকজন পার্লার থেকে খোঁপা,বেনী,মেক-আপ নিয়ে হেব্বি মাঞ্জা মেরে ছিলাম।রাতে দেখা গেল এই সব খোঁপা খোলা মোটেও সহজ না।আমাদের একেকজনের মাথায় জটা ধরে গেছে।মেক-আপ তুলতে গিয়ে জগা-খিচুড়ি অবস্থা।এরমাঝে তাসমি নামের অতিশয় বুদ্ধিমতি বান্ধুবীটি আমাদের সেই চেহারার ফটুক তুলে রাখলো।দেখতে পুরাই ভেজালহীন ডাইনীর মত লাগছিল আমাদের।নিজেদের ফটুক দেখে আমার নিজেরাই ভয় খেয়েছি।অন্যদের কি অবস্থা হবে ভেবে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হচ্ছে।ঠিক করে রেখেছি আমাদের মধ্যে যাদের বিবাহ হয় নাই তারা পাত্রপক্ষ কে প্রথমে এই ছবি দেখাবো,তারপর যদি তাহার স্বুস্থ হয়ে বেঁচে থাকে তো পরেরটা চিন্তা করে দেখা যাবে।

বিয়ের দিন অনেক অদ্ভুত লাগছিল আমার,বার বার মনে হচ্ছিল যেন এইটা একটা স্বপ্ন,অহনা আর ওর টল,ডার্ক,হ্যান্ডসাম বর(যেমনটা ও সব সময় কল্পনা করতো) হাসি হাসি মুখে বসে আছে।আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা...আমরা সবাই এত্ত বড় হয়ে গেছি!বাপরে!!
বিয়ের অনুষ্ঠানের পর পরই অহনা তার বরের সাথে খুলনা চলে গেল।আমার হুট করে মনে পরলো-সেই স্কুল থেকে সব ড্রিঙ্কস এর শেষ ঢোকটুকু কৎ করে গিলে ও বলত-“জানিস!শেষেরটুক খেলে দূরে বিয়ে হয়।তোদের কে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব,তখন চাইলেও যখন তখন দেখা করতে পারবিনা। উচিৎ শিক্ষা হবে তোদের” অহনার বিদায়ের সময় ঝরঝর করে কাঁদছে।আমি আরেকবার অনুভব করলাম-আমি সত্যি জানিনা কিভাবে কাউকে বিদায় দিতে হয়।বিদায় ব্যাপারটা আমার বড্ড বেশি অপছন্দের।সব ধরনের বিদায়ই আমার কাছে নিষ্ঠুরতা মনে হয়।অহনার বিয়ের সাদা গাড়িটা চলে যাচ্ছে...আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আর বুঝতে পারলাম আমার চোখ ভিজে গেছে।কেন জানি বার বার চোখে ভেসে উঠছে-“ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে...মিরপুর রোড বৃষ্টিতে ঝাপশা হয়ে আছে...রিকশার হুড খোলা...এর মাঝে স্কুল ইউনিফর্ম পরা,দুই বেনী করা অহনা দুই হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখছে,হাসছে...আমার গায়ের পলিথিন নিয়ে টানাটানি করছে,আমি প্রবল বেগে মাথা নাড়ছি।কিছুতেই এই বৃষ্টিতে ভিজতে রাজি হচ্ছিনা...কিছুতেই না”

কেন জানি ওর গাড়িটা চলে যাবার সময় আমার খুব ইচ্ছে করছিল এক পশলা বৃষ্টি দিয়ে সেই দিনের দুপুরের মত পুরো ঢাকা শহর কে চুপশে ভিজিয়ে দিতে............
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০১১ সকাল ১০:৫৪
৫৫টি মন্তব্য ৫৫টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×