অনেকের অনেক রকম মন্তব্য দেখে আমি কে এবং আজকের এই অবস্থায় কিভাবে এলাম বলার ই্চ্ছাটা খুব বেশি হচ্ছে তাই এই লেখা টা দিলাম।
ছোটো বেলায় বৃত্তির টাকায় আমার পড়ার খরচ চলেছে ক্লাস ৮ এর পর থেকে। এরপরে ইন্টারমিডিয়েট থেকে কাজ করতাম। বাবার পয়সা আমার নিতে হয়নি যদিও আমার বাবার যথেষ্ট টাকা আছে। আমিই নিতে চাইনি।
বি এ পাশ করার পর ল কলেজে ভর্তি হয়েও পরীক্ষার ফি দিতে না পারায় পড়া বন্ধ করেছিলাম।
যখন আমি সিংগাপুর আসি বাবার মত ছিল না। তাই ১০০০ ডলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উনি কর্তব্য শেষ করেন। হয়তো ভেবেছিলেন পয়সা ফুরলেই দেশে চলে যাব। আসি খুব একটা কম বেতনের চাকরি নিয়ে এসে দেখলাম যথেষ্ট শিক্ষা না থাকলে এদেশে আমি টিকতে পারব না। তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু পয়সা আসবে কোথা থেকে তখনও জানি না। বাবার দেয়া টাকা আর চাকরির জমা সামান্য ডলারের সবটুকু দিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম। আর আমার এই পড়ার ইচ্ছা দেখে আমার Principal আমাকে তার ডিজাইনের দোকানে কাজ দিলেন আমাকে সাহায্য করার জন্য. তবে তা দিয়ে আমার ঘর ভাড়াই দিতে পারতাম না।
বাবাকে জানালাম। উনি কোনো উত্তর দিলেন না আমার মেইল এর। মা কে জানালাম। মা বললো উনি শুধু মাসের ফিস ছাড়া আর কিছু দিতে পারবেন না কারন তিনি তার হাসব্যান্ডের কাছে চাইতে পারবেন না।
জীবনে প্রথম কারো কাছে টাকা চাওয়া আর এই উত্তর পাওয়া। হন্যে হয়ে পড়ার টাকা খাওয়ার টাকা যোগাড়ের জন্য কাজ করতে লাগলাম। এতই কাজ করতাম যে পড়ার সময়ই পেতাম না।
খাবার টাকা টা আর জোগাড় হয় না পরীক্ষার পড়া করতে গেলে, তার উপর এর আগে কোনো দিন ইংরেজি মিডিয়ামে পরি নাই। মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকতাম। বাবাকে আরেকবার জানালাম। আমার বাবা বেশ টাকা ওলা মানুষ। উনি কিন্তু আমাকে কোনো উত্তর দিলেন না কারন আমি তার বাধ্য মেয়ে ছিলাম না।
আমার ক্লাসের এক শিখ ছেলে আমাকে দেখে একদিন বলল শিখ মন্দিরে গরিবদের জন্য ফ্রি খাওয়া দেয়। আমি চাইলে সে আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে। আহঃ আমি আকাশের চাদ পেলাম যেন হাতের রুটি হয়ে।
পরীক্ষার ফি দিতে যে আমার কি কষ্ট হয়েছে তা আর নাই বললাম। তবে ফাইনাল পরিক্ষার ফি যোগাড় না করতে পেরে বাবাকে আবারও লিখলাম লজ্জার মাথা খেয়ে। কোনো উত্তর পেলাম না যথাযথ। এখানে কাউকে চিনতাম না যে আমাকে ধার দেবে। কি যে কান্না পেলো এই ভেবে যে দুটো বছরের কষ্ট বৃথা যাবে পরীক্ষা দিতে না পারলে।
আমার এমন কোনো সুবিধা ছিলো না স্কলারশিপ পাবার। কিন্তু আমার ক্লাস টেস্টে ডিসটিংসন মার্কস থাকায় কলেজ আমাকে ধার দিলো ফাইনাল পরীক্ষার ফি কিন্তু এটা আর কাউকে কোনদিন করা হয়নি।
পরীক্ষার পর পেপার দেখে,ওয়েব দেখে চাকরি তে এপ্লাই করলাম। অল্প বেতনের কাজ একটা পেলাম, তবে পরীক্ষার ফি এর টাকা ফেরত দেবার পর আর কিছুই হাতে থাকে না। আবারও খাবার কষ্ট থাকার কষ্ট চলতেই থাকে। এরমধ্যে বাবা ১০০০ ডলার পাঠালেন দয়া করে আর বললেন যদি চলতে না পারি তবে দেশে চলে যাই যেন, ফিরে গেলে কোনো আসুবিধা হবে না কারন তিনি আমাকে বাড়ি কিনে দেবেন আহঃ।
গেলাম না ফিরে। চেষ্টা করলাম বেটার চাকরির জন্য। এরমধ্যে বাবা ভাই এলেন একবার দেখতে ও তাদের চিকিৎসা করতে এখানে। বাবা আমাকে আলাদা ডেকে জিগেস করলেন আমার এখন চলে নাকি। বলিনি তখনও খাবার থাকার কষ্ট কিন্তু বললাম খুব ভাল না তবে চলে যায়। কারন বললে তিনি আমাকে দেশে যেতে বলতেন।
যাবার সময় আমার হাতে কোন টাকা সাহায্য বশতও দিতে ভুলে গেলেন।
এরপর নিজের চেষ্টায় বেটার চাকরি পেয়েছি। খিদে আর থাকার কষ্ট আর নেই, কারো কাছে আর টাকা চাইতে হয় না। বাবার দেয়া বাড়িতে থাকতে হয়না এমন কি ঐ বাড়ির ভাড়ার টাকাও নিতে হয় না....আহঃ কি শান্তি!!!
ঐ সব দিন গুলিতে ভাবতাম আহা আমার চার পাশে এতো বড়লোক মানুষ তাদের জন্য আমাকে সাহায্য করাটা কোনো ব্যাপারই না অথচ আমাকে সাহায্য করার কেউ নাই। কেউ যদি তার জীবনে অন্তত একজন মানুষ কে একবার সাহায্য করবে বলে যদি আমাকে সাহায্য করত তাহলে আমি অন্তত একবেলা খিদের জ্বালা থেকে বাচতাম।
আমাদের দেশে এমন অনেক বড়লোকের ছেলে মেয়েরা আছেন যারা বড় ইউনি তে পরেন বাবার টাকায় এবং পাশ করার পর যাদের কাজ না করলেও চলে, তাদের দেশের কথা ভাবার অনেক সময় কারন তাদের নিজের কথা ভাবতে হয় না বাবারা আছেন তা ভাবার জন্য, অন্ততো থাকা খাবার কথা ভাবার।
তারা আমার মতো বাইরে থাকা কষ্টে দাঁড়ান মানুষদের ব্যাপারে অনেক রকমের মন্তব্য করেন। ভাবেন আমরা আজকের অবস্থায় এসেছি কাউকে না কাউকে শোষন করে। আমাদের ১০০ টা ভুল ধরবার জন্য হন্য হয়ে বসে থাকেন, কারন তাদের অনেক সময়। বাংলা কেন টাইপ করা শিখতে এতো দেরি হয় তার মানে তারা বোঝেন এই যে আমারা বিদেশিপনা দেখাতে চাই, আসলে যে আমাদের সময় যায় লেখালেখি না করে দুটো থাকা খাওয়া জোটাতে (যেটা তাদের অনেকেরই করতে হয়না) তা কি তারা কখনও ভেবেছেন? শোষন করে এই অবস্থায় এসেছি এজন্যই তারা এটা মনে করেন।
তারা টাকা পাঠান তাদের যায়া ঐ টাকায় দেশ সেবার নাম করে হেরোইন, গাজা বা সিগারেট সেবা করবেন এবং তারা সাহায্য করছেন দেশ সেবকদের মনে করে টাকা পাঠান আর নিজেরা মন সুখ লাভ করেন এই ভেবে যে তারা দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন।
তারা কি জানেন আমার মতো কতো মানুষ আছে তাদেরই পাশে যারা একবেলা খেতে চায় পড়া মনে রাখবার জন্য...? শুধু একটু চোখ খোলা রাখুন দেখতে পাবেন...আমি কিন্তু দেখতে পাই কারন আমি যে নিজের জীবন দিয়ে দেখেছি....আমারও কিন্তু তাদের মতো বড়লোক বাবা ছিলেন নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত আবাস দেবার জন্য..........।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

