আমার আঙিনা জুড়ে আজ ঝিনুকের মেলা, আমার আঙিনায় এখন সাগরের ঢেউ লুটোপাটি করে খেলা করে। ঘুম ভাঙে সাগরের শব্দে, চোখ মেলে প্রথম দেখি সাগর।
সন্ধা হয় সাগরে সুর্যাস্ত দেখে,
ঘুমাতে যাই সাগরের গান শুনতে শুনতে। এই আমার এখনকার দিন রাত্রি।
তবে এপর্যন্ত আসতে অনেক ঝড় বৃষ্টি গেছে। মনে পড়ে শেষ দিন সিংগাপুরে নিপাকে বিদায় জানাতে গিয়ে দুজনের জনসমুদ্রে দাড়িয়ে কান্নায় হাউমাউ করে ভেঙে পড়া। জলিকে বিদায় দেয়া এয়ারপোর্টের চেক ইন গেটে। সব মিলিয়ে মনটা ভার হয়ে ছিল। মনে ভয় নতুন দেশের নতুন মানুষরা কেমন করে আপন হবে, কেমন বন্ধু হবে। এত গুলো বছর সিংগাপুরে থাকতে গিয়ে এটাকে নিজের দেশের চাইতেও আপন মনে হয়েছে, নিজের মনে হয়েছে।
বুকে ধুকপুক করা ভয় আর কষ্ট নিয়ে আট ঘন্টা ফ্লাই করে লোকাল টাইম রাত ৮।৩০ শে ল্যান্ড করলাম ঝিরি ঝিরি বৃস্টি আর গা হীম করা ঠান্ডা বাতাসের ভেতরে। ক্লিফের বন্ধু/কলিগ গ্রায়াম আমাদের পিক করে হোটেলে পৌছে দিল। অন দ্যা ওয়ে টু হোটেল কিছুই তেমন চোখে পরেনি একটা শান্ত শিষ্ট শহর ছারা। প্লান হলে আমাদের বাড়িতে ওঠার আগে দুদিন শহরে হোটেলে কাটান শহরটাকে দেখবার জন্য।
পরদিন সকালে সেই বৃষ্টি আর হিম করা ঠান্ডা। গত ৮ বছরে শীতের মুখ দেখিনি। আমাদের তেমন কোন শীতের কাপড়ও নেই হালকা কার্ডিগেন ও জ্যাকেট ছারা
ব্রিসবেন শহরের মাঝখান দিয়ে ব্রিসবেন নদী সাপ হয়ে এঁকেবেঁকে গেছে। শহরের অর্ধেকটা সাপের এপাশে আর অর্ধেকটা সাপের ওপাশে।
নদীতে রিভার ট্যাক্সি চলে এঘাট থেকে ওঘাটে, এপার থেকে ওপাড়ে ঠিক বাসের মতন বিভিন্ন রুটে। মজা পেলাম ব্যপারটাতে।
ক্লিফ রিভার ট্যাক্সিতে বসে
শহর টা কিছুটা নতুন পরোনো মিলিয়ে ব্রিটিশ ধাঁচের বিলডিংএ সাজানো। কুইন স্ট্রিটে গিয়ে দুজন হেটে বেড়ালাম জনসমুদ্রের ভেতর। কোথায় কেউ পথের পাশে দাড়িয়ে গান করছে তো কেউ বসে বসে এ্যাবারজনিয়ান মিউজিক বাজাচ্ছে। ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ারের আগমনে সবাই জেন উৎসবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটা অানন্দের আমেজ আকাশে বাতাসে যদিও নন ষ্টপ ঘিনঘিনে বৃষ্টি আর ঠান্ডা।
আমার মনে যেন কোথও কোন সুর খুজে পাইনা এত সব আনন্দের মাঝেও। কোন কিছুই যেন আপন মনে হয়না। ঘরবাড়ি হীন অনাথের মত বুকের ভেতর কষ্ট দানা বাধে। সিংগাপুরের ক্রিসমাস মিস করছি আমার ঘরকে মিস করছিলাম
ক্লিফ বোঝায় "আমাদের বাড়িতে যখন যাব দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল লাগবে তখন।" চোখ মুছে আশায় থাকি কখন বাসায় যাব তারপর ভাল লাগবে। আমরা বাসা নিয়েছি উডি পয়েন্টে।
শহর থেকে ৩০মিনিট ড্রাইভ। ঠিক সাগরের উপর বললেই ঠিক বলা হয়।
উডি পয়েন্টটা মরটন বে এর শেষ পয়েন্টে। যার এক দিকে মরটন বে অন্যদিকে খোলা সাগর। ঘর থেকে নিচে নেমে রাস্তা পেরলেই বিচ।
অসাধারন একটা জায়গা!! যেখানে গাংচিলেরা উড়ে বেড়ায় সারাক্ষন
আর পেলিকেন গুলো ল্যাম্প পোস্টের উপর বসে রোদ পোহায়।
ক্রেইন গুলো রাস্তা ঘাটে হেটে বেরায় যেমন করে বানরের দল ঘুরে বেড়ায় জায়পুরে।
টিয়ে গুলো সারাক্ষন কিচির মিচির করে ঝগড়া করেই যাচ্ছে ম্যগপাই গুলোর সাথে আর তার সাথে তাল মিলিয়া সাগরের ঢেউ গান করেই যাচ্ছে...কারোই তেমন থামবার মাথাব্যাথা নেই।
আমার ব্যালকনিতে দাড়ালে আর যেন কোন কিছু করতে মন চাইবে না শুধু অনিমেষ তাকিয়ে প্রকৃতির এই রূপ দেখা ছাড়া।
বাড়িতে আমরা পৌছালাম কিন্তু আমাদের ফার্নিচার পৌছাতে এখনো দেড়মাস বাকি। সারা বাড়ি ঠনঠনে ফঁাকা সাগরের বাতাসে উথাল পাথাল করা। এত সুন্দরের মাঝও আমার মন বসেনা। থেকে থেকেই চোখ ভরে পানি চলে আসে।
এখানে সকাল হয় ভোর চারটা বাজে। অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে প্রথম সকালে ঘুম ভাঙলো সকাল চার'টেতে। চারিদিকে আলোয় ভড়া
আমার করার কিছু নেই তেমন সারাদিন
সাগরের চলমান ঢেউ দেখে মনে হয় জেন জাহাজে চেপে কোথাও চলেছি। আমাদের বাসাটার পেছনে বিচের উপর একটা ছোট্ট পার্ক আছে পাথুড়ে বাধ দিয়ে বানানো। ওখানে গিয়ে পাথরের উপর বসে সাগরের শব্দ মাথায় নিয়ে মেডিটেশন করি। মনটা হালকা হয় কিছুক্ষনের জন্য তারপর আবারও ভার হয়ে আসে সিংগাপুরকে, নিপাকে, জলিকে, আমার বাড়িকে মিস করি। নাই ইন্টারনেট নাই টিভি শুধু এস এম এস ই ভড়সা। তবু ভাল যে আমার নতুন মোবাইল থেকে ফেসবুকে ঢুকতে পারছিলাম
এর ভেতর ওয়েদার ভাল হবার কোন নাম গন্ধ নেই। রোজ বৃষ্টি। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ঝড়।
সমুদ্রে ঝড় এত কাছ থেকে আগে কখনও দেখা হয়নি। ঝড়ে যেন আমাদের বাসাটও উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়।
সাগর যেন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পাড়ে এসে আছড়ে পরছে। কার উপর এত রাগ সে-ই জানে। তবু অপরুপ সে ঝড়ের দৃশ্য!!
দেখতে দেখতে ক্রিসমাস এসে গেল!! আমাদের বড় ক্রিসমাস ট্রি টা এখনও পৌছেনি অন্য সব ফার্নিচারের সাথে। তাই ছোট্ট একটা ট্রি এনে সাজালাম
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১১ সকাল ১১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



