আমি মেছো বাংগালী। মাছ ছারা পেট ভরে না। ব্রিসবেনে আসবার পরে দোকান-পাট খুজতেই কিছুদিন গেল। আস্তে আস্তে সুপার মার্কেট ও অন্যান্য স্পাইসিসের দোকান খুজে পেলেও মাছের দোকান কোথাও দেখিনা। সুপার মার্কেট গুলোতে কিছু মাছ পাওয়া যায় যেমন স্যামন, প্রন এই যাতীয় তবে খুব এক্সপেনসিভ সিংগাপুরের তুলনায়।
আসবার পরে ২৫/২৬ দিন চলে গেল কোথাও মাছ পাইনা, মনের দুঃখে ফিশ এন্ড চিপস খাই
এখানে সেখানে ভুরি ভুরি ফিশ এন্ড চিপসের দোকান। চারিদিকে এত মাছ আর মাছের দোকান নেই কেন সেই ভেবে আমি মরি
আমাদের বিল্ডিং এর নিচ তলায় এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। নিচে কফি বা সিংগারা খেতে গেলেই মালিক এসে নানান ইনফরমেশন দিয়ে সাহায্য করে। উনিই আমাকে আমাদের এরিয়ার ইন্ডিয়ান স্পাইসিসের দোকান চিনিয়েছেন। আর আমিও সময় পেলেই নিচে গিয়ে সিংগারা খেয়ে আসি দেশের স্বাদ পাওয়ার জন্য।
একদিন উনাকে ফ্রি পেয়ে জিঙ্গেস করলাম "আচ্ছা এখানে মাছের দোকান কোথায়" উনি বললেন "এখানে মাছের দোকান নেই কোল্স আস উডওর্থস সুপার মার্কেট ছারা।" বললাম কিন্তু সেখানে তো মাছের খুবই দাম। এত দাম দিয়ে মানুষ মাছ খায় কি করে। উনি বলল এখানে নাকি মাছ খুবই এক্সপেনসিভ তাই সবাই মাছ ধরেই খায়।
মনটা বরই খারাপ হলো উনার কথা শুনে। বাড়ি ফিরে সেদিন সন্ধ্যায় ক্লিফ কে বললাম। শুনে সেও খুবই অবাক হলো। ক্রিসমাসে ক্লিফ কে একটা ফিশিং গিয়ারও উপহার দিলাম এই ভেবে মাঝে মাঝে ও আমাকে মেছো হয়ে মাছ ধরে খাওয়াবে
তাই বলে আমার মাছের দোকানের জন্য সন্ধান শেষ হয়নি। সন্ধান চালিয়ে যেতে থাকলাম। আমাদের বিল্ডিং এর ম্যনেজার ও আমার নতুন বন্ধু ক্রিস্টিনকে ফোন দিয়ে জিঙ্গেস করতেই ও বললো অবশ্যই মাছের দোকান আছে। চিনিয়ে দিল মরগান ঠিকানা সহ। বলল ওরা ভাল মাছ বিক্রি করে সস্তায়। আমার "যেন প্রান আসলো ধরে" আর ঐ গাধা রেস্টুরন্টের মালিক কে মনে মনে গালি দিলাম.....।
উইকএন্ডে গেলাম মরগানে। আহা কত রকমের মাছ!! সি ফিশ!! আর সি ফিশ আমার খুবই প্রিয়!!!
কিনলাম স্যামন, ট্রাউট, স্ন্াপার। একপাশে দেখি সুতার মতন চিকন চিকন ইঞ্চি খানেক লম্বা সাদা সাদা এক রকমের মাছ বিক্রি করছে আর তা সব চাইতে সস্তা। পার কেজি $৬, নাম হয়াইট ব্যইট, দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের কাচকি মাছের মতন তবে কাচকির চাইতেও চিকন আর সাদা, পোলাওয়ের চালের মতন কিছুটা গন্ধ।
ভাবলাম এত চিকন আর নরম মাছ রান্না করতেই তো গলে যাবে। তবুও বহু বছর কাচকি মাছ খাইনি ভেবে ট্রায় কারার ইচ্ছাটা আটকাতে পারলাম না। দেখিই না কি হয় রানতে গিয়ে। হাফ কেজি কিনলাম আর ভাবলাম টাকা নষ্ট হলে $৩.৫ উপর দিয়েই যাবে নাহয়।
বাড়ি ফিরেই সেদিনের ডিনারের জন্য রাঁধতে বসলাম হয়াইট ব্যইট। মনে ভয় সব ভর্তা না হয়ে যায় রাঁধতে গিয়ে। আমার হয়াইট ব্যইট ডিনার আর রেসিপি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। যারা আস্ট্রেলিয়ায় থাকেন তারা এই মাছ মরগানে পাবেন। যারা বাংলাদেশে আছেন তারা হয়ত কাচকি মাছটা এমন করেই রাঁধেন।
মাছ গুলো যদিও সাগরের পানিতে ধোয়াই ছিল তবু কলের পানিতে ডুবিয়ে বড় জালনী দিয়ে ছেকে পানি ঝরতে দিলাম। আধা কেজি মাছের অর্ধেক নিয়েছি। একানকার বড় লাল পিয়াজর দু'টো (বাংলাদেশের চার টা বড় পেয়াজের সমান), পিয়াজ কলি তিনটে, একটু ধনে পাতা কুচিয়ে নিলাম। তার সাথে তিনটে কাঁচা মরিচ ফালিও
দুটো টমেটো, একটা ছোট শশা, একটা ফানেল (মৌরি গাছের মুল), একটু কাঁচা আম (যদি পাওয়া যায়),একটা গাজর, একটু বাঁধা কপি কুচি, ছোট একটা পিয়াজ, একটা পিয়াজ কলি, একটু ধনে পাতা, দু'টুকরো লেবুর রস, আর লেবুর খোসা গুলো কুচি করে কেটে একটা পাত্রে রাখলাম। ওর সাথে এক চা চামচ সড়ষে বাটা (যেটা এখানে কোল্সে হাফ গ্রাইন্ডেড মাস্টার্ড সিড হিসেবে বয়মে কিনতে পাওয়া যায়), চার টেবিল চামচ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল দিয়ে মাখিয়ে ঢেকে ফ্রিজে রেখে দিলাম সালাদ টা।
এই করতেই দেখি মাছের পানি ঝরে গেল। চুলো অন করে একটা ননস্টিকি প্যানে দু'টেবিল চামচ অলিভ ওয়েল দিলাম। একটা শুকনা মরিচ কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে তেলে দিলাম সাথে আধা চা চামচ মৌরি, আধা চা চামচ জিড়া দিয়ে পিয়াজ গুলো ছেরে দিলাম তেলে। পরিমান মত লবন দিয়ে পিয়াজ নাড়বার ফাঁকে দিলাম আধা চা চামচ জিরা গুরো ও আধা চা চামচ হলুদ গুরো ( কঁাচা হলুদের সন্ধান এখনও পাইনি
নেড়ে পিয়াজ আধা হালকা ব্রাউন হয়ে এলেই ভয়ে ভয়ে মাছ গুলো দিয়ে আমার কাঠের খুন্তি দিয়ে নেড়া ছড়িয়ে দিলাম প্যানের চারপাশে। এক্সপেক্ট করছিলাম মাছ থেকে পানি বের হয়ে এখনই মাছ গুলো গলে ভর্তা হয়ে যাবে
এপাশ ওপাশে উলটিয়ে মাছ গুলো নেড়ে দিতেই সব মাছে আঁচ লাগতেই মাছ গুলো একটু শক্ত হয়ে উঠলো
প্লেটে মাছ দিয়ে পাশে আগেই বানানো ফ্রিজে রাখা সালাদ দিয়ে সাজিয়ে ক্লিফ আর আমি ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে আমাদের ব্যালকনিতে বসলাম সাগরে সূর্যাস্ত দেখবার সাথে ডিনার করবার জন্য। ক্লিফ মুখে দিয়েই আর কোনকথা নেই.....শুধু ইয়াম ইয়াম বলে খেয়েই গেল
আপনারাও ট্রাই করুন!!
এই ডিশটা ভাত ছারা খাবার জন্য।
এই রেসিপিটা আমাদের তিনজন ব্লগার, পারভিন আপু, শ্রাবনসন্ধ্যা ও Fazilatun Nessa Request এ দেয়া।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১১ সকাল ১০:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


