somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আসছেন সেই "চাউল" দাদা, আনন্দে "ঘুম হারাম" হয়ে গেছে

২৬ শে জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অবশেষে ঢাকা সফরে আসছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। শুরুতে ‘অবশেষে’ বলার কারণ, আওয়ামী মহাজোটের নেত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধ রাখতে পারেননি তিনি। নেত্রীর বড় শখ ছিল, ‘দাদা’ তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্খিত থেকে ‘আশীর্বাদ’ করবেন। এজন্য ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনের পরদিন, বেসরকারীভাবে ফলাফল ঘোষিত হওয়ারও আগে শেখ হাসিনা টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন­ ‘দাদা’ যেন ‘বৌদিকে’ নিয়ে ঢাকায় আসেন। এটা আমাদের খবর নয়, এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার নামকরা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ ধরনের চিন্তা ও সতর্কতা থেকে নিজে না আসতে পারলেও প্রণব মুখার্জি অবশ্য একেবারে হতাশ করেননি শেখ হাসিনাকে। তার নির্দেশে পরদিনই ‘সুধা সদনে’ গেছেন ভারতের হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। প্রচন্ড ব্যস্ততায় দম ফেলার মতো অবস্খা না থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা দীর্ঘ দু’ ঘন্টা ধরে ‘সৌজন্য’ সাক্ষাৎ দিয়েছেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে।
সেই থেকে শুরু। গোপনে গোপনে যা কিছুই ঘটুক, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত কূটনীতিকে পরিণত হয়েছেন ভারতের এই হাই কমিশনার। সফরের আয়োজনও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসছেন ৮ ফেব্রুয়ারি। ফলে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। সংবর্ধনা জানানোর সার্বিক প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি একযোগে চলছে ভারতের ইচ্ছা পূরণের আয়োজনও। এজন্যই এমন কিছু কিছু বিষয়কে নিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন, যেগুলো অন্তত এই মুহূর্তে প্রাধান্যে আসার মতো বিষয় নয়। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে প্রণব মুখার্জির ব্যাপারে বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু কথার উল্লেখ সেরে নেয়া দরকার। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ‘চালবাজ’ ও ‘চাউল দাদা’ নামে বিশেষ পরিচিতি রয়েছে তার। এখানে তাই বলে ভারত বিরোধী রাজনীতির কোনো উপাদান নেই। সত্যি বলতে কি, উপাধি বা বিশেষণ দুটি প্রণব মুখার্জি নিজেই তার ‘যোগ্যতাবলে’ অর্জন করেছেন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ যখন সিডরের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল, ভারতের এই বাঙালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন ঝটিকার বেগে উড়ে এসেছিলেন। মনে হয়েছিল যেন সবকিছু ভুলে ‘উদার হস্তে’ সাহায্য দেয়াই তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল! কিন্তু পরে দেখা গেলো, তিনিও আসলে ‘খেল’ দেখাতেই এসেছিলেন। কারণ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিজে পাঁচ লাখ টন চাল রফতানির অঙ্গীকার ঘোষণা করলেও দিনের পর দিন তারা এমনভাবেই নতুন নতুন শর্তের বেড়াজালে বাঁধার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের তখন ‘ছেড়ে দে মা (নাকি ‘দাদা’?) কেঁদে বাঁচি’ অবস্খা হয়েছিল। ‘দাদা’র আশ্বাসে উদ্দিন সাহেবরা সে সময় অন্য কোনো দেশ থেকে চাল আমদানির চেষ্টা করেননি। ফলে ‘খেল’-এর ধাক্কায় বাংলাদেশকে মারাত্মক খাদ্য ঘাটতিতে পড়তে হয়েছিল। দেশ আসলে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল।
এটাই অবশ্য প্রণব মুখার্জির সফরের খবরে উল্লসিত না হওয়ার একমাত্র কারণ নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতি ও মনোভাব­ যার মধ্যে বìধুত্বের সামান্য উপাদানও নেই। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থেকে অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, জমিন ও সমুদ্রের সীমানা এবং সীমান্তে হত্যা পর্যন্ত এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ করা সম্ভব নয়, যেখানে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে রীতিমতো শত্রুতাপূর্ণ ব্যবহার না করছে। এটা করেও আসছে আবার স্বাধীনতার পর থেকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দেয়াকে পুঁজি বানিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই ভারত বাংলাদেশকে অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের নমনীয় নীতির সদ্ব্যবহার করে ভারত হাজার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ নিয়ে গেছে। সমগ্র দেশ ছেয়ে গেছে ভারতীয় পণ্যে, চোরাচালান হয়েছে সর্বব্যাপী। বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমেও বাংলাদেশকে ভারতের ইচ্ছাধীন করা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাìধীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়িকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদিকে ভারত চুক্তি লংঘন করেছে। কথা ছিল বেরুবাড়ির বিনিময়ে ভারত তিনবিঘা হস্তান্তর করবে। কিন্তু নিজে বেরুবাড়ির দখল নিলেও আজও পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে তিনবিঘা দেয়নি। প্রতারণার কৌশল হিসেবে ভারত আইনের মারপ্যাঁচ কষেছে। শুধু তা-ই নয়, মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে ভারতের লোকসভাও (পার্লামেন্ট) এখনো অনুমোদন করেনি। এর ফলে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতার অধিবাসীদের মূল ভূখন্ডে যাতায়াত করার জন্য ভারতের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনবিঘার মধ্য দিয়ে করিডোর দিলেও ভারত ঘড়ি ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশীদের যাতায়াত।
বাংলাদেশের জন্য ‘মরণ বাঁধ’ হিসেবে চিহ্নিত ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে গিয়েও ভারত চাতুরির আশ্রয় নিয়েছিল। মুজিব-ইন্দিরা যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সেজন্য ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে। কিন্তু বাস্তবে ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রেখেছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে পূর্ণ ক্ষমতায় গঙ্গার পানি নিয়ে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর পর ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি সম্পাদন করা সত্ত্বেও ভারত যথারীতি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্খাতেই রেখেছে। শুকনো মওসুমে বাংলাদেশ পানি পায়নি, অন্যদিকে বর্ষা মওসুমে ফারাক্কার সকল গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে ডুবিয়ে ছেড়েছে ভারত। একই অবস্খা চলছে এখনো। গত বছরের (২০০৮) এপ্রিলের শেষ ১০ দিনেও বাংলাদেশকে প্রায় পাঁচ হাজার কিউসেক কম পানি দিয়েছে ভারত।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের কোনো ক্ষেত্রেও ভারত বাংলাদেশকে সামান্য ছাড় দিচ্ছে না। ভারতের নীতি-মনোভাবের পরিণতিতে একদিকে বাংলাদেশের রফতানি আয়ে ধস নামছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এখানে একটি বিশেষ তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। ১৯৯৯ সালে ঢাকা-কোলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকা সফরে এসে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ২৫ ক্যাটাগরির বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে ঘোষণার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের সঙ্গেও ভারতের আচরণ একই রকম। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা অনেক উপলক্ষেই অভিযোগ করেছেন, ভারতীয়দের হীন মানসিকতার কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোতে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারতের সদিচ্ছা থাকলে এই অঞ্চলের দেশগুলোও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারতো। ভারতের এই নীতির পরিণতিতে বাংলাদেশ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে তো পারছেই না, কোনো কোনো অর্থ বছরে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ অনেক কমেও যাচ্ছে। কারণ, ভারতীয়রা বাংলাদেশের ভেতরে নিজেদের পণ্য ঠেলে দেয়ার ব্যাপারেই বেশি ব্যস্ত থাকে­ অনেক বেশি পরিমাণ ও ধরনের পণ্য পাঠায় তারা চোরাচালানের অবৈধ পথে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করার ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা চোরাচালানের মাধ্যমেই বেশি আমদানি করে। ফলে প্রতি বছরই ঘাটতির পরিমাণ শুধু বেড়েই চলেছে। গত অর্থ বছরেও (২০০৭-০৮) ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫০০ মিলিয়ন ডলার। কথা আরো আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রানজিটের আড়ালে করিডোর আদায় করে ভারত এমন ব্যবস্খাই নিতে চাচ্ছে যার ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতেও বাংলাদেশের রফতানি অনেক কমে যাবে এবং কয়েক বছরের মধ্যে রফতানির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
তিনদিকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের যে একমাত্র সমুদ্র পথ রয়েছে ভারত তাকেও অবরুদ্ধ করে ফেলার আয়োজন করেছে। সমুদ্রে বাংলাদেশের বিরাট এলাকা দখল করে নিয়েছে দেশটি। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে ভারত। ফলে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা অনেক কমে এসেছে। ভারত বাংলাদেশের সমুদ্র তলদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদও লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশটি আমাদের একান্ত অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা এলাকাসহ সমুদন্স সীমার ভেতরে ঢুকে তেল-গ্যাসের অনুসìধান ও উত্তোলনের কাজেও হাত দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ না করেই ভারত বাংলাদেশের এলাকার ভেতরে তেল-গ্যাস অনুসìধান ও উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সমুদন্স তলদেশের সম্পদ আহরণ করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন এমনকি অসম্ভবও হয়ে পড়তে পারে।
এভাবে যে কোনো পর্যালোচনায় দেখা যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়া কোনো দিক থেকেই বাংলাদেশ লাভবান হতে পারেনি। এই নীতি-মনোভাব ও কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব বাংলাদেশীদের। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি হলেও এ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে আমাদের নেতারা সব সময় ব্যর্থতা দেখিয়ে এসেছেন। বর্তমান মহাজোট সরকারকেও উদ্যোগী হতে তো দেখা যাচ্ছেই না, সরকার বরং ভারতের ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারেই বেশি ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। প্রণব মুখার্জিকে ‘দাদা’ ডেকে ‘বৌদিকে’সহ আমন্ত্রণ জানানোর কারণে শুধু নয়, ট্রানজিটের আড়ালে করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার এবং দক্ষিণ এশীয় টাস্ক ফোর্সের নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েও ভারতের স্বার্থে পদক্ষেপ নেয়ার দিকটি দ্রুত পরিস্কার হচ্ছে।
উল্লেখ্য, অনেক দিন ধরেই ভারত ট্রানজিট আদায়ের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। মুখে ট্রানজিট বললেও ভারতের উদ্দেশ্য আসলে করিডোর আদায় করা। কারণ ট্রানজিটের অর্থ এক দেশের ভেতর দিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে ভারত চাচ্ছে ভারতেরই এক অঞ্চল থেকে অন্য কয়েকটি অঞ্চলে যাতায়াত করার সুযোগ। একে করিডোর বলা হয়। বাস্তবেও সকল উপলক্ষে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নিজের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করার সুযোগ চেয়েছে। এখনো তাই চাচ্ছে। এ সংক্রান্ত চুক্তির খসড়ায় ভারত বলেছে, ভারতের পণ্যবাহী যান ও কনটেইনার কার্গো বেনাপোল স্খল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং তামাবিল হয়ে মেঘালয়, বিবির বাজার হয়ে ত্রিপুরা এবং খাগড়াছড়ি হয়ে মিজোরামে যাবে। ভারতের যাত্রীবাহী যানবাহনও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোতে যাতায়াত করতে পারবে। ভারত একই সঙ্গে রেল ট্রানজিটের জন্যও পৃথকভাবে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। প্রস্তাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান পাঁচটি রেল সংযোগ দিয়ে ট্রানজিট কার্যকর করতে বলা হয়েছে। গেদে-দর্শনা, সিঙ্গাবাদ-রোহনপুর, পেট্রাপোল-বেনাপোল এবং রাধিকাপুর-শাহজাদপুর ছাড়াও আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার আগরতলা পর্যন্ত রেল লাইনের মিসিং লিংক তৈরি করতে বলেছিল ভারত। এ লাইনটি চালু হলে ভারত কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল চলাচলের সুবিধা পাবে। এর ফলে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটারের স্খলে কমে হবে মাত্র সাড়ে তিনশ’ কিলোমিটার। অন্য এক প্রস্তাবে ভারত আশুগঞ্জে পোর্ট অব কল সুবিধা চেয়েছে। এই সুবিধা দেয়া হলে পশ্চিম বঙ্গ থেকে নৌপথে আশুগঞ্জ পর্যন্ত পণ্য এনে ভারত আখাউড়া-আগরতলা রেল লাইনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পাঠাতে এবং ওই সব রাজ্য থেকে মূল ভূখন্ডে পণ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে পারবে।
বাস্তবতা হলো, ভারতকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রেন ও যানবাহন চলাচল করার সুবিধা দেয়া হলে দেশের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘিíত হবে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টারস’ নামে পরিচিত রাজ্যগুলোতে বহু বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। পাঁচ লাখের বেশি ভারতীয় সেনা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিয়োজিত রয়েছে। ট্রানজিটের আড়ালে করিডোর দেয়া হলে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র আনা-নেয়া করবে। এর ফলে বাংলাদেশ অযথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ শুরু করতে পারে। তেমন অবস্খায় বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় তথা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। এক পর্যায়ে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়বে। ফলে বাংলাদেশ ভারতের অধীনস্খ হয়ে পড়বে।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় অসার পর ট্রানজিটের তাগিদ বেড়েছে জোরেশোরে। পাশাপাশি ভারত এমন আয়োজনও করতে চাচ্ছে যাতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ এবং অবস্খান করতে পারে। শেখ হাসিনা হঠাৎ সব কাজ ফেলে দক্ষিণ এশীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন বলে এ সন্দেহই শক্তিশালী হয়েছে যে, মহাজোট সরকারও ভারতের ইচ্ছা পূরণ করতে চাচ্ছে। এমন সন্দেহের প্রথম কারণ হলো, হৈচৈ করা হলেও সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড বলতে যা বোঝায় তার কিছুই যে বাংলাদেশে ঘটে না তার প্রমাণ পাওয়া গেছে সংসদ নির্বাচনের সময়। সন্ত্রাসবাদী এমন কোনো গোষ্ঠীরও হদিস পাওয়া যায়নি, যাদের দমন বা নির্মূল করার জন্য একেবারে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে টাস্ক ফোর্স গঠন করতে হবে! অতীতে বিচ্ছিন্ন যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর পেছনে ছিল সুচিন্তিত পরিকল্পনা­ ছিল বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী ও ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে কুখ্যাতি দিয়ে ফায়দা হাসিল করার উদ্দেশ্য। কিন্তু এত কিছুর পরও বাংলাদেশকে কলংকিত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ বরং সন্ত্রাসহীন শান্তির দেশ হিসেবেই টিকে রয়েছে।
এতেই আসলে শরীরে জ্বালা ধরেছে বাংলাদেশ বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর। ষড়যন্ত্র সফল হয়নি বলে মহাজোট সরকারকে দিয়ে কল্পিত সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী সম্পর্কিত গাল-গল্প প্রচার করানো শুরু হয়েছে। অতীতের কয়েকটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী, ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এতদিন মুসলমান বিরোধী যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামনে থাকতো, এখন রয়েছে এদেশেরই ‘নির্বাচিত’ একটি সরকার! উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার দু-একটি কারণও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারণ হলো, সন্ত্রাসবাদের নিয়মিত শিকার ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলো কিন্তু টাস্ক ফোর্স গঠনের কথা বলেনি। অন্যদিকে টাস্ক ফোর্স গঠনের জন্য ‘ঘুম হারাম’ হয়ে গেছে মহাজোট সরকারের! সরকার একই সঙ্গে বোঝাতে চাচ্ছে যেন বাংলাদেশে সত্যি সত্যি অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী রয়েছে এবং পুলিশ, র‌্যাব ও বিডিআর থেকে সেনাবাহিনী পর্যন্ত বাহিনীগুলো তাদের দমন ও নির্মূল করতে পারছে না বলেই দক্ষিণ এশীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করতে হচ্ছে!
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে যে এ ধরনের কিছু করা হবে সে ব্যাপারে অবশ্য আগেই ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। একজন মার্কিন সেনা অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে লিখিত এক নিবìেধ শেখ হাসিনার ‘অ্যাডভাইজার’ সজীব ওয়াজেদ জয় নতুন সরকারের করণীয় সম্পর্কে আগাম ‘প্রেসক্রিপশন’ও দিয়ে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘হারভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউ’-এর ১৯ নভেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত নিবìেধ জয় বাংলাদেশকে শুধু ‘ইসলামী মৌলবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরেননি, বাংলাদেশ থেকে ‘ইসলামিস্ট’ ও ‘জেহাদীদের’ কিভাবে উৎখাত করতে হবে­ এসব বিষয়েও আওয়ামী লীগকে নির্দেশনা বা ‘প্রেসক্রিপশন’ দিয়েছেন। এখন চলছে সে ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুযায়ী ‘পদক্ষেপ’ নেয়ার পালা। ‘পদক্ষেপ’ নেয়ার বিষয়টিকেও অকারণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। কোন দেশকে ‘সঙ্গে নিয়ে’ কোন দেশ ‘অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ রাষ্ট্র’ বাংলাদেশের ব্যাপারে ‘পদক্ষেপ’ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং সত্যিই ‘পদক্ষেপ’ নিয়েছে, সে কথাও স্মরণ করছেন দেশপ্রেমিকরা। ফলে ‘দক্ষিণ এশীয় টাস্ক ফোর্স’ গঠনের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা যাচ্ছে না। উদ্দেশ্য আসলে ভারতীয় সেনাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়া।
সব মিলিয়েই প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে জনমনে ভীতি ও উদ্বেগ বেড়ে চলেছে। ভারতের উদ্দেশ্যই শুধু নয়, ‘দাদাদের’ খুশি করার ব্যাপারে মহাজোট সরকারের ‘সদিচ্ছা’ ও অতি আগ্রহও এই ভীতি ও উদ্বেগের একটি বড় কারণ। শেখ হাসিনার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে সর্বশেষ অন্য একটি ঘটনাও উল্লেখ করা দরকার, যার মধ্যে সরকারের ইচ্ছা সম্পর্কিত ‘স্যাম্পল’ পাওয়া গেছে। ক’দিন আগে ভারতের হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠক করতে পেরে ধন্য হয়ে যাওয়া পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ সেন বলেছেন, তিস্তা নদী দিয়ে ভারতের বদৌলতে কিছু পরিমাণে হলেও পানি যে পাওয়া যাচ্ছে এতেই আমাদের খুশি থাকা উচিত! স্মরণ করা দরকার, ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে ক্ষমতায় থাকার সময়ও আওয়ামী লীগ সরকারের দিক থেকে একই ধরনের নীতি নেয়া হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে ভারত ফারাক্কার সবগুলো গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে তলিয়ে দেয়ার পরও তখনকার পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘উজান’ দেশের পানিতে ‘ভাটির’ দেশ বাংলাদেশকে ‘ডুবতেই’ হবে!
এমনটা যাদের মনোভাব তাদের দিয়ে আর যা-ই হোক, কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা বা প্রাপ্য আদায় করার কথা কল্পনা করা যায় না। কারণ, তারা আগেই পেট-পিঠ ও ঘাড় এগিয়ে দিয়ে রেখেছেন। ‘দাদা’রা চাইলে পেট ও পিঠে কিল-ঘুষি মারতে পারেন, চাইলে ঘাড়েও উঠতে পারেন। এভাবে মহাজোট সরকার সবকিছুই ‘দাদা’দের ইচ্ছা ও অনুগ্রহের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। এ অবস্খারই সুযোগ নিতে আসছেন প্রণব মুখার্জি­ শেখ হাসিনাদের ‘দাদা’। ঠিক কোন ধরনের আয়োজন তিনি করে যাবেন তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সত্য, তা সত্ত্বেও এখানে সংক্ষেপে বলা দরকার, ‘ডিজিটাল’ নির্বাচনে ‘নির্বাচিত’ কোনো সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ‘উষä’ করার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আন্তরিকতার কোনো উপাদান থাকতে পারে না। এখানে বরং ধমক দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে এবং ‘রিটার্ন’ বা প্রতিদান কিংবা ‘সার্ভিস চার্জ’ আদায় করার নির্লজ্জ উদ্দেশ্যই প্রাধান্যে এসে যায়­ যা বাংলাদেশের প্রতি বìধুত্বের পরিচায়ক হতে পারে না। কথাটা প্রণব মুখার্জির পাশাপাশি তাদেরও অনুধাবন করা দরকার, যারা ‘চালবাজ’ ও ‘চাউল’ দাদার সফর উপলক্ষে দিওয়ানা হয়ে উঠেছেন এবং এই আনন্দে যাদের ‘ঘুম হারাম’ হয়ে গেছে।
১৬টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×