গত মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দুই দিন বাংলাদেশ থেকে কিছু উদ্বেগজনক খবর আসছিল। লন্ডন ও লন্ডনের বাইরে অবস্খিত ক’জন চিন্তাজীবী বুর সাথে আমার আলোচনাও হয় এ বিষয়ে। খবরগুলো এ রকম ছিল : দেশের সব এলাকায় চার দলের, বিশেষ করে বিএনপি’র মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় হচ্ছে। এমন অভিযোগও শোনা যায় যে, একটি নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা বিএনপি’র সমর্থকদের হুমকি দেয় এবং ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করে। স্তূপাকৃতি ব্যালট পেপারে ছাপ মারার সময় দু’জন পোলিং অফিসারের গ্রেফতারের খবরও এসেছিল।
নির্বাচনের দিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর দুপুরের আগেই খবর আসতে থাকে যে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা চারদলীয় জোটের এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম পরিস্খিতিতে অবিশ্বাস্য রকম ৮৭ শতাংশ ভোট পড়া নিয়ে তখনই দেশে এবং প্রবাসীদের মধ্যে বলা-কওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে দেশের জনগণের মনোভাবের সঠিক প্রতিফলন ঘটেছে বলে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো বিশ্বাস করতে রাজি নয়। বিএনপি’র নেতারা তখনো প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তাদের অঙ্গুলি তাড়নে পরিচালিত নির্বাচন কমিশন সেসব অভিযোগে কান দেয়নি, দেবে বলে আশাও করা যায়নি। এটা স্পষ্ট ছিল, বিএনপি’র জয় সে সরকারের কাম্য ছিল না। বিএনপি জয়ী হলে তাদের অবৈধ কাজকর্ম এবং বিতর্কিত অধ্যাদেশগুলো বৈধতা পাবে বলে সেনাসমর্থিত সরকার আশা করেনি।
অন্য দিকে তাদের সব কাজকর্মকে বৈধতা দেয়া হবে বলে শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ আমেরিকা যাওয়ার প্রাক্কালে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগাম প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন। হাসিনা স্বয়ং এবং তার দলের অন্যান্য নেতা পরে সে প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা সুযোগ পেলেই বলেছেন যে, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর দেশ অচল করে দিয়ে তারা ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিলেন।
সে যা হোক, বিএনপি নেতাদের অভিযোগগুলো যে ভিত্তিহীন ছিল না সেটা ক্রমে ক্রমে, বলতে গেলে ঘটনাচক্রে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্খা অধিকার সম্প্রতি তাদের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সে রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের আগে আগে ৫২ হাজারেও বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ধরে নিতে অসুবিধা নেই যে তারা মূলত বিএনপি’র মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী, ভোট সংগ্রহের ব্যাপারে বিএনপি সাধারণত যাদের ওপর নির্ভর করে। এসব ধরপাকড় না হলে নির্বাচনী ফলাফল যে অন্যরকম হতে পারত না কে বলতে পারে?
এটাকে ভাগ্যের পরিহাস বলতেই হবে, পরোক্ষ হলেও বিএনপি’র অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণ করেছেন এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও তার সহকর্মীরা। গত ২২ জানুয়ারি সারাদেশে উপজেলা নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনে অন্যায়, অনিয়ম, কারচুপি ইত্যাদি এত ব্যাপক ছিল যে ভোট গ্রহণ ব হতে না হতে সিইসি শামসুল হুদা বলেছেন, ‘সরকারি দলের প্রভাব বিস্তারে নির্বাচন কাáিক্ষত মানানুযায়ী হয়নি।’ কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যা করেছে সেটা না করলেও পারত।’
দুর্নীতির মানচিত্র
সিইসি শামসুল হুদা তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যেসব অনিয়মের কথা বলেছেন সেগুলো হচ্ছে, ‘উপজেলা নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই হয়েছে। অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য চিঠি দেয়ার পরও কেউ কেউ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বসে থেকেছেন। একজন এমপি রিটার্নিং অফিসারকে মারধর পর্যন্ত করেছেন। সব মিলিয়ে এ নির্বাচন নিয়ে কমিশন সন্তুষ্ট নয়।’
সিইসি শামসুল হুদা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের যেসব অবৈধ কর্মের তালিকা দিয়েছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সেগুলো জানা কথা। জনসমর্থনের ঘাটতি থাকলেও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য এগুলো আওয়ামী লীগের বহু ব্যবহৃত, বহু পরীক্ষিত, বলতে গেলে ‘প্যাটেন্ট’ করা কৌশল।
এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সংসদ নির্বাচনের কথা বিশেষ করে মনে পড়ছে। বঙ্গবু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তখন নজিরবিহীন। তার বিপরীতে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জাসদ, ভাসানী ন্যাপ প্রভৃতি ছোটখাটো দল চিন্তাভাবনা করছে। এমনকি ন্যাপ আওয়ামী লীগের সাথে মিশে যাওয়ার কথাও বিবেচনা করছিল। সংসদের আয়ু আরো প্রায় তিন বছর বাকি এবং সে সংসদে কোনো বিরোধী দল ছিল না। এমতাবস্খায় হঠাৎ করে নির্বাচন ডাকার কোনো কার্যকারণ অনেকেই খুঁজে পাননি।
সে নির্বাচনের খবরাদি সংগ্রহের জন্য বিবিসি লন্ডন থেকে গিয়েছিলাম মার্ক টালি বর্তমানে স্যার মার্ক টালি ও আমি। বিশেষ করে চারটি নির্বাচনী এলাকার মারধর, পোলিং ও রিটার্নিং অফিসারদের হুমকি, ভুয়া ভোট, ব্যালট ছিনতাই ইত্যাদি ঘটনার পর আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ‘জয়ী’ হলেও সেসব এলাকার মানুষ ফলাফল ন্যায্য বলে মেনে নিতে পারেনি।
মার্ক টালি তার প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক দলও নেই দেশে। এমতাবস্খায় চারটি আসনে অন্য দলগুলো জয়ী হলে আওয়ামী লীগের কি লোকসান হতো?
‘সব কিছু খাবো’
লোকসান অবশ্যই কিছু হতো না। কিন্তু আওয়ামী লীগের বরাবরের মনোভাব কার্যত স্বৈরতন্ত্রী। তারা সব কিছু পেতে চায়, সব আসন পেতে চায়, বিরোধিতা এ দলের একশ্রেণীর নেতাদের সহ্য হয় না। এ শ্রেণীর নেতাদের চাপেই শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি চালু করেছিলেন। এই নেতারা শেখ মুজিবকে আজীবন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব প্রথমত সাত বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগের ‘ঐতিহ্য’ নির্বাচনী অসাধুতার মধ্যেই সীমিত নয়। নির্বাচনে জয়ী হলে তারা আগেকার বাস্তব কিংবা কাল্পনিক ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুরনো ভোটারদের অবশ্যই মনে পড়বে ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার কিভাবে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পত্রপত্রিকায় এমন শত শত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল যে ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগের অনুমতি ছাড়া থানার কর্মকর্তারা এজাহার নিতে অস্বীকার করেছেন।
ঢাকার ক’জন এমপি ড. ইকবাল, হাজী সেলিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের, ফেনীর জয়নাল হাজারী প্রমুখ গডফাদার যে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিলেন, ১৯-২০ বছরের বেশি বয়স্ক বাংলাদেশীদের সেসব কথা মনে থাকা উচিত। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করাই তাদের চেষ্টা ছিল। গডফাদার ও ক্যাডাররা সাহস পেয়েছিল অবশ্যই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মনে থাকার কথা, সংবাদ সম্মেলনে জয়নাল হাজারীর সৃষ্ট ত্রাসের সমালোচনা ওঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের তিরস্কার করেছিলেন। হাসিনা তিরস্কার করেছিলেন চট্টগ্রামে তার দলীয় কর্মীদের; বলেছিলেন, ‘আপনারা কি শাড়ি পরেন?... একটার বদলে ১০টা লাশ ফেলতে পারেন না?’
গত মাসের সাধারণ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও কর্মীদের ধারণা হয়েছে হাসিনা যখন আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তখন ১৯৯৬-২০০১ সালের পুরনো খেলাগুলো আবার চালু হবে। হাসিনা নির্বাচনী বিজয়ের পর একাধিকবার ‘প্রতিশোধ না নেয়ার’ নির্দেশ দিয়েছেন তার দলের কর্মীদের, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অশান্তি ও বিশৃঙ্খল সৃষ্টি না করতে ছাত্রদের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রতিহিংসার তাণ্ডব
কিন্তু এসব নির্দেশে কোনো কাজ হয়নি। আওয়ামী লীগের ঠ্যাঙারেরা নিশ্চয়ই মনে করেছে হাসিনার নির্দেশগুলো আন্তরিক নয়। সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কর্মীরা বিএনপি’র অন্তত ২০ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে, গুরুতর আহত হয়েছে শতাধিক। বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্পত্তি দখল ও নষ্ট করা চলছে অহরহ।
রাষ্ট্রদূতদের যে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে ভূমিকা রেখেছিল দেশজোড়া উপরোল্লিখিত ত্রাসের রাজত্বের ব্যাপারে তারা প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছে প্রতিবাদ করেছেন কি না জানি না। তবে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ প্রতিনিধি রেনাটা লক ডেসালিয়েন।
উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে হত্যা-নির্যাতনের নতুন পর্ব শুরু হয়েছে। এক ডজনেরও বেশি লোক এ পর্যায়ে মারা গেছে, জখম হয়েছে কয়েক ডজন। উপজেলা নির্বাচনে ভোটার ছিল না। ‘কেরামতির’ নির্বাচনে ফলাফল ভোটের ওপর নির্ভর করে না, ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোটাররা সেটা আবার ভালোভাবে বুঝে ফেলেছেন। সে জন্যই উপজেলা নির্বাচনে ভোট দিয়ে তারা সময় নষ্ট করতে চাননি, তারা ভোট কেন্দ্রের ধারে-কাছে যাননি।
তবু ‘সব খাবোর’ দল আওয়ামী লীগ যেসব জালিয়াতি করেছে তার বর্ণনা স্বয়ং সিইসি শামসুল হুদাই দিয়েছেন। ইসি বলেছে, কতগুলো উপজেলার নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্খগিত হয়েছে মাত্র। এখন চলবে বিচার বিভাগীয় তদন্ত। কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট? এই কমিশনের ব্যর্থতার ফসল ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনও নতুন করে অনুষ্ঠান না করলে ড. শামসুল হুদার কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাবে না এবং বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের ওপর আস্খা হারিয়ে ফেলবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



