বহুজাতিক কোম্পানিসমুহ তাদের পণ্য বিক্রি করার জন্যে সচরাচর যে ধরনের প্রচারণার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে, আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী প্রচারণা কৌশল অনেকাংশে তার অনুরুপ ছিল। দলটির ‘দিন বদলের সনদ’ ্লোগানটির সঙ্গে বাংলালিংকের ‘দিন বদলের কথা বলে’ এবং ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার ‘বদলে যাও বদলে দাও’ মার্কা প্রচারণার মিল দেখে কিছুটা তাজ্জব হতে হয় বৈকি। আমজনতার জানার কোনো উপায় নেই যে, তিনটি প্রায় অভিন্ন ্লোগানের নির্মাতা একই ব্যক্ত কিনা। তবে এই তথ্যটি বোধহয় অনেক পাঠকই জানেন যে বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিসমুহের বিজ্ঞাপনের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত দুটি সংস্হা এশিয়াটিক এবং বিটপি’র সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিশেষ সুসম্পর্ক রয়েছে। এশিয়াটিকের অন্যতম স্বত্বাধিকারী এবং প্রখ্যাত নট জনাব আসাদুজ্জামান নুর নীলফামারী-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। বিটপি’র জনাব রেজা আলী ময়মনসিংহ-৭ থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে একই নির্বাচনে বিশাল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে হারিয়েছেন। উল্লিখিত দুটি বিজ্ঞাপনী সংস্হার বাইরে আমার জানা মতে, একমাত্র অ্যাডকম নামক সংস্হাটিকে বাংলাদেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিসমুহ তাদের বিশ্বস্ত হিসেবে বিবেচনা করে। অ্যাডকমের মালিক হলেন ড. ফখরুদ্দীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মিসেস গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। পাঠক হয়তো কিছু বিস্ময়ের সঙ্গেই লক্ষ্য করবেন যে, এইসব ব্যক্তি আবার সুশীল (?) শ্রেণীভুক্ত হিসেবেই সমাজে অধিষ্ঠিত। আর বাংলাদেশে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকাটি যে সুশীল সমাজের মুখপত্র হিসেবেই সমধিক পরিচিত এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগ, সুশীল (?) সমাজ এবং বহুজাতিক কোম্পানিসমুহের সংযোগ এক্ষেত্রে যথেষ্ট দৃশ্যমান।
যাই হোক, আওয়ামী লীগের ম্যানিফেষ্টোর নামকরণ দেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণীভুক্ত ভোটারদের তাদের পক্ষে ভোটদানে কতটা উদ্বুদ্ধ করেছে, সে বিষয়ে আমি খুব একটা নিশ্চিত না হলেও, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন নিঃসন্দেহে দিন বদলের সনদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বহুল আলোচিত ঈযধহমব (পরিবর্তন)-এর মিল দেখে যথেষ্ট পুলক অনুভব করেছেন। শহুরে তরুণ সমাজ ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং দিন বদলের সনদ দ্বারা বেশ প্রভাবিত হয়েছে বলেই আমার ধারণা। সেই তুলনায় নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয়তাবাদী ক্যাম্পের ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ আহ্বান তাদের কাছে একেবারেই সেকেলে মনে হয়েছে। সাম্প্রতিক পিলখানা ট্র্যাজেডির পর দেশ বাঁচানোর মর্মার্থ যদি তারা বুঝতে পেরে থাকে, তাহলেও অন্তত সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবশ্যম্ভাবী লড়াইয়ে আজকের তরুণের অংশগ্রহণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতোই হবে বলে আমরা আশা করতে পারি।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ৭০ দিন চলছে। এই ৭০ দিনের সরকার পরিচালনার ধরন থেকে দিন বদলের কোনো লক্ষণ আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। তার সমর্থকরা দাবি করতে পারেন, মহাজোটের মন্ত্রিসভার আকার এবং প্রকৃতিই দিন বদলের অকাট্য প্রমাণ বহন করছে। মন্ত্রিসভায় তুলনামুলকভাবে অনভিজ্ঞরা এসেছেন, পুরনোরা বাদ পড়েছেন, সাবেক আমলারা উপদেষ্টারুপে ভিড় বাড়িয়েছেন, সবই সত্যি; কিন্তু সরকার পরিচালনার পদ্ধতিতে কোনো রকম দিন বদলের লক্ষণ কি আমরা এই ৭০ দিনে দেখতে পেয়েছি? আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন কেবলমাত্র মন্ত্রিসভায় চমক সৃষ্টি করলেই দিনবদল হয় না। নির্বাচনে অবিশ্বাস্য বিজয় লাভের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, বিরোধী দলকে সংসদে সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না এবং ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকেই নেয়া হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নেয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকৃতপক্ষে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদান করেছিল। যেহেতু জনগণ বিএনপি’র এই প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচক হিসেবে মুল্যায়ন করেছিল, সম্ভবত সেই কারণেই বিপুল বিজয়ে উল্লসিত শেখ হাসিনা কিছুটা আবেগের বশবর্তী হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপি’র প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি করেছিলেন। যথাসময়ে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন এবং সংবিধান সংশোধন করে বিরোধী দলকে একটি অতিরিক্ত ডেপুটি স্পিকারের পদ দেয়ার এক আজগুবি তত্ত্ব উপস্হাপন করেছেন। সরকারি দল এখানেই থেমে থাকে নি।
প্রতিশ্রুতি নিজেরা তো ভঙ্গ করেছেনই তার ওপর এর দায়-দায়িত্ব বিএনপি’র ওপর চাপানোরও চেষ্টাও বাদ যায়নি। আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ সংসদে দাবি করেছেন যে, বিরোধী দল থেকে যথাসময়ে নাম প্রস্তাব না করার কারণেই নাকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিএনপিকে ডেপুটি স্পিকারের পদটি দিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বৈশিষ্ট হলো যে, তারা শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সত্য-মিথ্যার ধার না ধেরে অবলীলাক্রমে পার্টি লাইন আউড়ে যেতে পারেন। সংসদে বিরোধী দলকে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রেও পুরনো আওয়ামী লীগকেই দেশবাসী দেখতে পেয়েছে। অষ্টম জাতীয় সংসদে ৫৯ আসনের আওয়ামী লীগকে ৮টি আসন দেয়া হলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জোর গলায় বলেছেন, তার দলকে নাকি সেই সময় ৬টি আসন দেয়া হয়েছিল। আর শেখ হাসিনা যখন বলেছেন, তখন দিনকে রাত হতে বাধা কোথায়। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান তো সার্টিফিকেট দিয়েই ফেলেছেন যে, তার নেত্রী কখনো ভুল করতে পারেন না। কাজেই বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার না করার প্রতিশ্রুতি বেমালুম চেপে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে যখন ঘোষণা করেন যে, সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে বিএনপি’র সামনের সারিতে প্রাপ্য আসন সংখ্যা আড়াইটি, তখন সকলের কাছে সেটাই বেদবাক্য। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বিদেশি প্রভুদের চাপে সামনের সারিতে ৬টি আসন পেয়ে বিএনপি সংসদে ফিরেছে এবং জাতিও কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
নির্বাচনে জয়লাভ করেই চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী ছাত্রলীগ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখলের সফল অভিযান চালিয়ে বিরোধী পক্ষকে হল ছাড়া করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে তো প্রভোষ্টকে সারা রাত আটকে রেখে রীতিমত প্রাণের ভয় দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। রাতব্যাপী তান্ডব চলাকালে নীল দলের এক ডাকসাঁইটে শিক্ষক নেতা উপস্হিত থেকে দলের ছেলেদের এই বীরত্ব উপভোগ করেছেন। অবশ্য মানতে হবে, এই প্রবীণ শিক্ষক নেতা উপস্হিত থাকাতে বেচারা প্রভোষ্ট অন্তত লাঠি-বৈঠার আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছেন। গত শুক্রবার আওয়ামী লীগের লাঠি-বৈঠার ঐতিহ্য অনুযায়ী পুলিশের চোখের সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাধারণ সম্পাদককে কুপিয়ে হত্যা করেছে সরকারপন্হী ছাত্রলীগের ঠ্যাঙারে বাহিনী। টেলিভিশনের পর্দায় অনেকটা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের মতোই রাস্তায় পড়ে থাকা এক ছাত্রকে লাথি মারার কুৎসিত দৃশ্যও পুণর্বার দেখলাম। অনেক আগে এক ইংরেজ ভদ্রলোক বাঙালিকে [ &ৗ৬৫৫৩৩; ]ংরহমঁষধৎষু পড়ধিৎফ ধহফ পড়ষষবপঃরাবষু পৎঁবষ[ &ৗ৬৫৫৩৩; ] বলে গাল দিয়েছিলেন। মুজিববাদী ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা নিষ্ঠুরতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে, তাতে ইংরেজ ভদ্রলোকের মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এরাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতনের রেকর্ড তৈরি করেছিল, সেই ইতিহাসই বা ভুলে যাই কী করে? স্মরণে পড়ছে যে, প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনে বসেই স্বয়ং শেখ হাসিনাও একটি লাশের বদলে দশটি লাশ দেখার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তার প্রত্যাশা অনুযায়ী যথেষ্ট আগ্রাসী আচরণ করতে না পারার কারণে রাগান্বিত হয়ে তাদের চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকার জন্যে নসিহতও করেছিলেন। বর্তমান সরকারের প্রথম ৭০ দিনের মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে কোনো রকম দিন বদল হয়েছে-এমন দাবি সম্ভবত ঘোর আওয়ামী লীগ সমর্থকের পক্ষেও করা কঠিন।
বিটিভি’র দিন বদলের উদাহরণ তো পিলখানা হত্যাকান্ডের ওপর সংসদে বিতর্কের সময় বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করার মাধ্যমেই দেখলাম। এই অতীব নিন্দনীয় কাজটির সমর্থনে জাতীয় সংসদে সরকারি দলের চিফ হুইপ জনাব আবদুস শহীদ দাবি করেছেন, যেহেতু বিটিভি বর্তমানে চারদলীয় জোট সরকারের প্রণীত নীতিমালার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে, সেই হেতু বিরোধী দলের নেত্রীর ভাষণ সম্প্রচার না করা সঠিক কাজ হয়েছে। চীফ হুইপ সাহেব বোধহয় ভুলে গেছেন যে, চারদলীয় জোট সরকার বিদায় নেয়ার পর মাঝখানের দু’বছর তাদের দলের আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই প্রসঙ্গও না হয় বাদ দেয়া গেল। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে দিন বদলের ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসে তাদের ভাষায় জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিটিভি পরিচালনার নীতিমালাকে শিরোধার্য মনে করে বসে আছেন, তার পেছনে যুক্তি কোথায়? নাকি মহামান্য রাষ্ট্রপতির ঘোষণা অনুযায়ী ‘মহামানব’ শেখ হাসিনা যেহেতু কোনো ভুলই করতে পারেন না সুতরাং তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাত খুন মাফ!
সাম্রাজ্যবাদী এবং আধিপত্যবাদীদের সমর্থনধন্য বর্তমান সরকার সর্বশেষ যে ন্যক্কারজনক কাজটির মাধ্যমে দিন বদলের অঙ্গীকারকে তামাশায় পর্যবসিত করেছে তা হলো, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার ম্যুরাল গভীর রাতে তস্করের মতো অপসারণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অত্যন্ত নাজুক সময়ে যখন স্বাধীনতা রক্ষার্থে দলমত নির্বিশেষে সব নাগরিকের ঐক্য প্রয়োজন সেই অবস্হায় এই চরম হীনমন্যতার পরিচয় দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার আর যাই করুক নিজেদের গৌরবান্বিত করতে পারেনি। এমন একটি দুষ্কর্ম করার পরও বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জনাব জিএম কাদের সাফাই দিয়ে বলেছেন, জিয়াউর রহমানের ম্যুরালটি অন্যান্য ম্যুরালের সঙ্গে সেখানে ম্যাচ করছিল না। বিমানবন্দরের ম্যুরাল সম্পর্কে এমন বোদ্ধাসুলভ মুল্যায়নটি কি তার, নাকি তার প্রধানমন্ত্রীর, তা তিনিই ভালো জানেন। তবে আমার জানামতে, জনাব জিএম কাদের পেশায় একজন প্রকৌশলী। তিনি যে আবার শিল্পকলাতেও একজন বিদগ্ধজন-এই তথ্যটি সম্পর্কে আমি এতদিন অবহিত ছিলাম না। মানুষের সব গুণের কথা আমরা জানবই বা কেমন করে? তবে আওয়ামী লীগের এই জিয়া-বিদ্বেষ নতুন কোনো উপসর্গ নয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার সরকার শহীদ জিয়ার মাজারে যাওয়ার বেইলি ব্রিজটি অপসারণ করে তাদের অতীব নিম্নরুচির পরিচয় দিয়েছিল।
তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সেই সময় দাবি করেছিলেন, কোনো বিদ্বেষপ্রসুত হয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই নাকি সাময়িকভাবে বেইলি ব্রিজটি স্হানান্তর করা হয়েছিল! তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রয়োজন মিটে গেলেই স্হানান্তরিত ব্রিজটি আগের স্হানে পুনঃস্হাপিত করা হবে। বলাই বাহুল্য, তাদের সরকারের পাঁচ বছরে ব্রিজটির অন্যত্র প্রয়োজন শেষ হয়নি এবং তার ফলে শহীদ জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্যে আগত জনসাধারণকে যথেষ্ট ঘুরপথে কষ্ট করে মাজারে যেতে হতো। চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করে বেইলি ব্রিজের পরিবর্তে সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন স্হায়ী ব্রিজ তৈরি করেছে। জানি না কোনো এক রাতের আঁধারে এই ব্রিজটিকেও বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মতো দুর্মতি ক্ষমতাসীনদের হবে কিনা? তেমন কোনো ঘটনা ঘটলে আমি অন্তত আশ্চর্য হবো না। এখানে একটি কাকতালীয় ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো। ১৯৯৬ সালে ব্রিজ সরানোতে মুখ্য ভুমিকা পালন করেছিলেন জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির মহাসচিব জনাব মঞ্জু। এবার শহীদ জিয়ার ম্যুরাল ভাঙার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেই জেনারেল এরশাদেরই কনিষ্ঠ সহোদর জনাব জিএম কাদের। শহীদ জিয়া শুধু সাবেক একজন রাষ্ট্রপতি নন, তিনি স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান। জেনারেল এরশাদ কথায় কথায় এদেশের সেনাবাহিনীর জন্য অশ্রু বিসর্জন করেন। অথচ তার দলভুক্ত ব্যক্তিরাই সুযোগ পেলেই একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে অসম্মান করে যাচ্ছেন এবং তিনি কখনই এসকল দুষ্কর্মের কোনো প্রতিবাদ করার হিম্মত দেখাতে পারেন নি অথবা প্রয়োজন বোধ করেন নি। বিষয়টি বিস্ময়কর নয় কি? প্রকৃতপক্ষে নিজের স্বার্থ ব্যতীত আর সবকিছুই সাবেক সামরিক স্বৈরাচার এই প্রেসিডেন্টের কাছে গৌণ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি তার যখন তখন মমত্ববোধ প্রদর্শন রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা ব্যতীত আর কিছু নয়।
অনেকটা পাদটিকার আদলে দিনবদলের নাটকের সর্বশেষ উদাহরণটি দিয়ে আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন শেষ করব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়কালে দলীয় বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে ধানকন্যা উপাধি পেয়েছিলেন। দেশ-বিদেশ থেকে ডজনখানেক সম্মানসুচক ডক্টরেটও তার জন্য জোগাড় করা হয়েছিল, এমনকি নোবেল পাওয়ার গুজবও যথেষ্ট মুসিয়ানার সঙ্গেই চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। সচেতন পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন পুরস্কারের ঘটা কিন্তু এবারও আরম্ভ হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেনজির ভুট্টোর একটি আত্মজীবনীমুলক গ্রন্হ প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্হটির নাম ছিল Daughter of the East। সম্প্রতি এদেশের প্রধানমন্ত্রীকে Daughter of Peace নামে উপাধি দিয়েছেন যৌথভাবে স্হানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জনাব জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং হুইপ জনাব মির্জা আজম। নিজ মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপাধি গ্রহণ করে সম্ভবত নতুন ধারার দিন বদলের সুচনা করলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিন্দুকেরা অবশ্য সম্পুর্ণ বিষয়টিকে অতি নিম্নরুচির চাটুকারিতার একটি মন্দ উদাহরণ হিসেবেও গণ্য করতে পারেন।
দিন বদলের সনদের ্লোগানে বিভ্রান্ত হয়ে যে সব ভোটার নৌকায় উঠেছিলেন কিংবা যে সকল সামরিক-বেসামরিক আমলাবৃন্দ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার জয়লাভ নিশ্চিত করানোর জন্য অনেক চেষ্টাচরিত্র করেছেন, এরা বর্তমান সরকারের ৭০ দিনের কর্মকান্ডে প্রতারিত বোধ করছেন কিনা সে বিবেচনা তাদের। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির ৩৭ বছরের ইতিহাস নিয়ে যারা খানিকটা পড়াশোনা করেছেন, তাদের মধ্যে সম্ভবত দিন বদলের সনদ কোন আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। আমাদের অতিপরিচিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যার যার স্বভাবসুলভ আচরণ করবেন-এটাই তো প্রত্যাশিত। তারা নিজেদের সংশোধন করতে পারলে তো আর জাতির ঘাড়ে এক-এগারোর ভুত সওয়ার হওয়ার সুযোগ পেত না।
( লেখক-- মাহমুদুর রহমান )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



