আরমান

সরকারের ১০০ দিন : প্রতিশোধের রাজনীতি

২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:৩৫

শেয়ারঃ
0 0 0

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দর্শন পেয়েছেন। তারা তাকে বাংলা নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আগের সপ্তাহেও ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রতিনিধি শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কেউ বলছেন, হাসিনা তাদের দর্শন দেননি; অন্যরা দাবি করেছেন যে, তারা হাসিনাকে (দূর থেকে?) সালাম দিতে পেরেছেন। ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী এক ঘন্টার ‘অনশন’ করেছেন। তারা দাবি করেছেন ছাত্রলীগের সভানেত্রী পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ইস্তফা দিয়েছেন, সেটা তাকে প্রত্যাহার করতে হবে। এর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠক করে অনুরূপ দাবি জানিয়েছেন। পয়লা বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ছাত্রলীগ তাদের দুষ্কৃতিগুলো বìধ না করলে সংশ্লিষ্টদের পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের দু’জন নেতাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেত্রী যে পদত্যাগ করেছেন এবং সে পদত্যাগ প্রত্যাহারে বিলম্ব করছেন, তারও কারণ আছে। প্রথমত, হাসিনা ‘চমক’ দেখাতে ভালোবাসেন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণে তাকে দেশের মানুষকে জানাতে হবে যে, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ছাত্রলীগ যা করেছে এবং করছে, সেটাকে পুরোদস্তুর অরাজকতা বলতে হবে। সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কিছু করছেন না অথবা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, দেশে সে ধারণা গেড়ে বসলে তার রাজনৈতিক পুঁজির লোকসান হবে।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দিন থেকেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অশান্তি সৃষ্টি করছিল। তারা ভিসি আর অধ্যক্ষদের অপসারণের দাবি জানায়। কী আশ্চর্য! সরকার একেদুয়ে তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে, ভাইস চ্যান্সেলর ও অধ্যক্ষদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ সেটা আগে থেকেই জানত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, আবাসিক হলগুলোর দখলদারি, এমনকি শিক্ষানীতিও ছাত্রলীগের মারফত আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটা শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ।
শেখ হাসিনা সম্ভবত তার এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবেন। সাম্প্রতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী নামেমাত্র হলেও ছাত্রলীগকে স্বাধীন সত্তা দানের ঘোষণার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতির যে ক’টি ‘পেশিশক্তি ব্যাংক’ আছে, ছাত্রলীগ তার মধ্যে প্রধান। এ সংগঠনটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগ ভাবতেই পারে না।
এবারের সরকারের মেয়াদের মধ্যেই হাসিনা তার গদি দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সুরক্ষিত করতে চান। ছাত্রাবাসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন হাতের মুঠোয় আনা সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপর দিকে হলগুলোর ওপর দখলের সুবিধা ও লাভজনক দিকগুলোর ব্যাপারে ছাত্রলীগের নেতারা ভালোভাবেই জানেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টেনডার, কন্ট্রাক্ট ইত্যাদির বখরা বড়ো একটা আয়ের উৎস। হলগুলোর ওপর দখলের সুযোগে সিট বরাদ্দ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ইত্যাদি বাবদ মোটা অর্থ ছাত্রলীগ নেতাদের পকেটে যায়। ওয়াসার টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগের দুই অংশের মধ্যে মারামারি তো মাত্র গত সপ্তাহে হলো।
শুনেছি, কলেজে ভর্তি বাবদ ছাত্রলীগের নেতারা বিশ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন। তাদের সুপারিশ অগ্রাহ্য করা হলে প্রিন্সিপালদের নাকি বদলির হুমকিও দেয়া হয়েছে। এ সরকারের প্রথম তিন মাসেই ছাত্রলীগ নেতারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একটি সূত্র আমাকে বলেছে। একমাত্র ঢাকা কলেজেই ছাত্রলীগের ‘সুপারিশের’ জোরে ৪০০ ছাত্রকে ভর্তি করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ
অর্থাৎ গোড়ার দিকে ছাত্রলীগ যা করছিল সেটা তাদের এবং সরকারের জন্য সুবিধাজনক ছিল। শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রীরা লোক দেখানো হুমকি-ধমকি দিলেও আসলে ছাত্রলীগ নেতারা সে সবকে গায়ে মাখেননি। ছাত্রলীগের নৈরাজ্য বìধ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কোনো চেষ্টাই করেননি। হাসিনা ও তার মন্ত্রীরা বিপদ টের পেতে শুরু করেন যখন ছাত্রলীগের ভেতরে ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু হয়ে যায় এবং বিভিন্ন হল ও কলেজে প্রভাবের লড়াইয়ে দু’জন ছাত্রনেতা নিহত ও শতাধিক আহত হয়। এসব কোন্দলের কারণে এ পর্যন্ত ৩৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বìধ করে দিতে হয়েছে। সর্বশেষ শিকার হয়েছে বরিশালের শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ।
ছাত্রলীগের এই কোন্দলের কারণও বোধগম্য। নেতারা বুঝে গেছেন, বর্তমান সরকার অদূরভবিষ্যতে গদি ছাড়ার কথা ভাবছেন না। সুতরাং বর্তমান সময়েই আধিপত্য পাকা করতে পারলে তারাও দীর্ঘকাল ছাত্রলীগের অত্যন্ত অর্থকরী নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকতে পারবেন। সমস্যা হচ্ছে, ছাত্রলীগ নেতাদের এসব নৈরাজ্য আর খুনখারাবি দেশে এবং আরো বেশি বিদেশে নিন্দিত হচ্ছে। ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ বলে শেখ হাসিনার দাবিতে ইতোমধ্যেই কয়েক পোঁচ কালিমা লেপিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রধান ব্যর্থতা নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে সামলে রাখার ব্যাপারে।
একটা ইলেকট্রনিক সংবাদ সূত্র অনুযায়ী কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের ‘একমাত্র গ্লানি’ হচ্ছে ‘ক্যাম্পাসের অশান্তি’। শুধু ‘অশান্তি’ প্রকৃত পরিস্খিতির সঠিক বর্ণনা নয়, তবু মন্ত্রীরা যে স্বীকার করেছেন ছাত্রলীগ নিয়ে সরকারের একটা সমস্যা আছে, সে জন্য তাদের প্রশংসা করতে হয়। তবে মন্ত্রীরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলে দেখতেন, গ্লানি আরো অনেক আছে। যুবলীগের ভেতরেও অন্তর্ঘাতী হানাহানি চলছে, রাজউক ভবনে ও সদরঘাট লঞ্চঘাটে শ্রমিকলীগের মধ্যে মারামারিতে কয়েক ডজন লোক আহত হয়েছে। এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও মারামারি হয়েছে সিলেটে ও বগুড়ায়।
কারণগুলো মোটামুটি ছাত্রলীগের গৃহযুদ্ধের কারণের মতোই। সাধারণ নির্বাচনের পরপরই জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি’র প্রভাব দূর করার ‘যুদ্ধে’ আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা মোটামুটি জয়ী হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক ডজন বিএনপি নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। বিএনপি নেতৃত্ব নির্বাচনী পরাজয়ের পরপরই এসব হিংস্র আক্রমণের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তারা এখনো হাত গুটিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছেন বলে মনে হয়। সে সুযোগে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করছে। এ সময় যেসব নেতা নেতৃত্ব দখল করতে পারবেন তারাই দীর্ঘমেয়াদি টেন্ডারের কমিশন, ঘাট ইজারা, সেতুর টোলের বখরা এবং সাধারণভাবেই চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেলের ‘বরাদ্দ’ পেয়ে যাবেন। সে জন্যই এসব নেতা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশও তারা গায়ে মাখছেন না।
অভিশপ্ত হানিমুন
এ দিকে দেখতে দেখতে শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদ ১০০ দিন পেরিয়ে গেল। ভোটদাতারা সব সময় গোড়ার কিছু দিন তাদের নির্বাচিত সরকারের প্রতি প্রশ্রয়ী হন। থিতু হয়ে কাজকর্ম শুরু করার সুযোগ সে সরকারকে দিতে চান। সে জন্যই পশ্চিমে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে বলা হয় ‘হানিমুন পিরিয়ড’। তার পর থেকে সরকারের সমালোচনার অবাধ অধিকার ব্যক্তির ও মিডিয়ার আছে বলে মনে করা হয়।
বিনয়ের সাথে ক্যাম্পাসের ‘অশান্তির’ কথা মন্ত্রীরাই স্বীকার করেছেন। যুবলীগে, শ্রমিকলীগে ও আওয়ামী লীগের ভেতরেও সংঘাতের কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্খিতির যে অবনতি হচ্ছে, সেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই আমাদের একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অঙ্গগুলোর অন্যতম, বিডিআরে একটা বিদ্রোহ ঘটে গেল, সেনাবাহিনীর ওপরের পর্যায়ের ৬৪ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হলো। একাধিক সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী তার কোনো আগাম ইঙ্গিতই দিতে পারেনি। এসবের কার্যকারণ খুঁজে বের করা এবং তার প্রতিবিধান করা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এত দিন কেটে যাওয়ার পরেও সে দু’টি বাহিনীর শক্তি সংহত করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সাধারণ নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের জন্য বিলম্ব না করেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আগাম জানান না দিয়ে উড়ে এলেন। রীতিনীতি ও প্রোটকলের মাথায় লাথি মেরে তিনি প্রধানমন্ত্রী সেনাপ্রধানের সাথে পৃথক পৃথক একান্ত বৈঠক করে চলে গেলেন। মাঝখানে সরকার একটা ‘নতুন প্রতিরক্ষা নীতি’র হুমকি দিয়েই চুপ করে গেল। ব্যাপারগুলো সাধারণ মানুষকে ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর রহস্যে ফেলে দিচ্ছে।
এ দিকে বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ কখনো আবিষ্কার হবে কি না, প্রকৃত দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে কি না, এসব সম্বìেধ সাধারণ মানুষের সন্দেহ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সরকার প্রথমেই যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সেটা দু’দিনের মধ্যেই ভেঙে দেয়া হয়। তার পর আরো তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের রিপোর্ট প্রকাশের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী যেভাবে ‘চোর চোর’ বলে এদিক-ওদিক-সেদিক সবদিকে আঙুল তুলছেন, নিজেদের দল এবং সরকারকে বাদ দিয়ে অন্য সবাইকে দোষী বলে ঘোষণা করছেন, তাতে সন্দেহ হয়, সরকার চায় না যে প্রকৃত সত্য আবিষ্কৃত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক। তার ওপর, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দু’জন জুনিয়ার মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ ৯-১০ জন আওয়ামী লীগ নেতার সংশ্লিষ্ট থাকার গুজব কিছুতেই দূর হচ্ছে না।
পিছু হঠার, প্রতারণার চেষ্টা
অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতেছিলেন। দেশের যা যা সমস্যা, যা কিছু চাহিদা, সব কিছু তিনি পূরণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ‘দশ টাকা কেজি’র চাল এখনো তিনি কাউকে খাওয়াতে পারেননি। কিন্তু চাল-ডালের দাম মোটামুটি স্খিতিশীল রয়েছে। সেটা এ পর্যন্ত সরকারের প্রধান সাফল্য। এ অবস্খা বজায় থাকলেও মানুষের ভাগ্য ভালো বলতে হবে। কিন্তু অন্য প্রধান অঙ্গীকারগুলো পালনের পরিবর্তে সরকার পিঠ টান দিতে চাইছে বলেই মনে হয়। এ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৭ হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি একটা প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু ইতোমধ্যেই একাধিক মন্ত্রী, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী, প্রকারান্তরে বলে দিয়েছেন, সে প্রতিশ্রুটি তারা পূরণ করতে পারবেন না।
শুধু তাই নয়। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনসাধারণকে প্রতারিত করার চেষ্টা সুস্পষ্ট। ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে রাশিয়ার সাথে আলোচনা হচ্ছে’, এ কথা বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে যে, শিগগিরই পারমাণবিক বিদ্যুৎ দিয়ে দেশকে উদ্ভাসিত করে দেয়া হবে। প্রকৃত সত্যটা সরকার রাজনৈতিক কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেও ১০ থেকে ১৫ বছর সময়ের প্রয়োজন। কাজটা যদি এতই সহজ হতো তাহলে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফন্সান্সের মতো দেশ বিদ্যুৎ সঙ্কটে ভুগত না।
তা ছাড়া বাংলাদেশ বর্ষা-বন্যার দেশ। বন্যার পানির স্তর ক্রমেই ওপর থেকে আরো ওপরে উঠছে। সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরো ওপরে উঠবে। বন্যাস্তরের ওপরে ছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ রীতিমতো বিপজ্জনক। তা ছাড়া পারমাণবিক ভস্ম শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর পর্যন্ত বিষাক্ত থাকে। সেসব ভস্ম তত দিন পর্যন্ত নিরাপদে মজুদ রাখার স্খান বাংলাদেশে কোথায়?
উন্নত দেশগুলোও এখন পারমাণবিক পদ্ধতির পরিবর্তে প্রকৃতির শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ ধরেছে। বায়ুর শক্তি এবং সূর্যের উত্তাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে ইউরোপ-অ্যামেরিকার দেশগুলো। উভয় ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি এখন সহজপ্রাপ্য। বাংলাদেশে জনশক্তির কোনো অভাব নেই। রোদ কিংবা বাতাসও দুষ্প্রাপ্য নয়। সরকারের উচিত ছিল জনসাধারণকে প্রতারিত না করে গোড়া থেকেই সেসব নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা।
নির্বাচনী ইশতেহারের আরেকটা প্রতিশ্রুতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াও সরকার শুরু করেছে। কিন্তু অহেতুক তাড়াহুড়ার কারণে বিচার প্রক্রিয়ায় খুঁত থেকে গেলে সুনামের বদলে দুর্নামই বেশি হবে সরকারের। সাম্প্রতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অজস্র অবৈধ কাজের জবাবদিহিতা বিধানে ব্যর্থতা হাসিনা সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা। যেভাবে তড়িঘড়ি সে সরকারের বিভিন্ন কর্ম ও অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, তাতে সন্দেহ হতে পারে যে, এ সরকার ওই সরকারের কাজকর্মগুলো নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে চায়।
সাধারণ নির্বাচনের পরপর ভাষ্যকারদের অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বিরাট জয় থেকে স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরতন্ত্রী হবার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, সে আশঙ্কা সত্যি হতে চলেছে বলেই মনে হয়। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীর মনোভাবদৃষ্টে মনে হয়, সংসদীয় গরিষ্ঠতাকে তারা বুলডোজার কিংবা স্টিমরোলারের মতো ব্যবহার করতে চান। নতুন উপজেলা পরিষদ আইনটি তার একটা নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এ আইন স্খানীয় ও তৃণমূল গণতন্ত্রকে অস্বীকার করার শামিল।
গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়াটাই যথেষ্ট নয়। গণতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতার হাতবদলের পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে। প্রশাসনকে শান্তিপূর্ণ করাও গণতন্ত্রের একটা লক্ষ্য। তার অর্থ হচ্ছে আলোচনা, সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকর্ম নির্বাহ করা হবে। দুর্ভাগ্যবশত শেখ হাসিনার সরকার সে পথে যাচ্ছে না, বরং সংঘর্ষ ও সঙ্ঘাতের পথকেই বেছে নিচ্ছে।
প্রতিশোধের রাজনীতি
বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা কয়েক মাস আমেরিকায় ছিলেন। বারাক হোসেন ওবামার নির্বাচনী প্রচারণা তখন তুঙ্গে (মার্কিন নির্বাচন হয়েছে নভেম্বরে)। ওবামার নির্বাচনী þেöাগান ছিল পরিবর্তন সাধন। বুশ সরকারের সর্বনাশা আগ্রাসী নীতি, ব্যর্থ অর্থনীতি, ‘ইসলামি’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সামাজিক অবিচার ও বৈষম্য ইত্যাদি বর্জন করে নতুন পথে দেশকে পরিচালিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারাক ওবামা বিরাট বিজয় অর্জন করেছেন।
দেশে ফিরে হাসিনা ওবামার অনুকরণে ‘দিন বদলের’ ধ্বনি তোলেন। সে কারণেই হোক অথবা তার রাজনৈতিক বিরোধীদের অভিযোগ অনুযায়ী দেশজোড়া একটা দুর্নীতির ‘মাস্টারপ্ল্যানের জোরে’ই হোক, শেখ হাসিনা বিরাট একটা জয় পেয়েছেন। বারাক ওবামার অভিষেক হয়েছে শেখ হাসিনার পরে। ইতোমধ্যেই তিনি গুয়ানতানামোর ‘জাহান্নাম’টি বìধ করে দেয়ার ব্যবস্খা নিয়েছেন। অর্থনীতির, বিদেশ নীতির এবং আরো বহু নীতির ক্ষেত্রে বিরাট বিরাট পরিবর্তন সাধন করেছেন। তার ফলে শুধু মার্কিন রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রশান্ত ভাব ফিরে এসেছে, সুযুক্তির মুক্ত বাতাস বইতে শুরু করেছে।
শেখ হাসিনা সরকার গঠনের সময় তার পিতার এবং তার নিজের পূর্ববর্তী সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীকে বাদ দিয়েছেন, যাদের কারো কারো বিরুদ্ধে অতীতে বহু দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগ ছিল। অভিজ্ঞতার জ্ঞাত অভাব সত্ত্বেও নতুন কিছু ব্যক্তিকে তিনি এবার মন্ত্রিসভায় স্খান দিয়েছেন। আশা করা হয়েছিল, তিনি সত্যি পুরনো নীতি আর পুরনো মনোভাব পরিত্যাগ করে দিন বদলের অন্তত সূচনা করবেন। কিন্তু সে আশা কুহকিনী প্রমাণিত হয়েছে।
ক্ষমতা লাভের প্রথম দিন থেকে তিনি এ ধারণা সৃষ্টি করেছেন যে, তিনি বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে প্রধান বিরোধীদল বিএনপিকে ধ্বংস করে তার পিতার মতো একদলীয় সরকার প্রবর্তনের উদ্দেশ্য পোষণ করেন। সংসদে আসন বরাদ্দের ব্যাপারে শিশুসুলভ খুনসুটি করে তিনি সব শুভবুদ্ধির মানুষের অনুভূতিকে আহত করেছেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে যে পন্থায় শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে, তা মনে করিয়ে দেয় ইসরাইলি দখলদার শক্তির কথা। এখন আবার শোনা যাচ্ছে, বিএনপিকেও তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনটি থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এ ঘটনার কথা আগেও সংক্ষেপে লিখেছিলাম। আওয়ামী লীগের নেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ব্রিটেন সফরে শেখ হাসিনার জন্য বিবিসিতে একটা
চা-চক্র দিয়েছিলাম। তারপরে স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারে তিনি আমার সহকর্মী জন রেনারকে বলেন, তিনি রাজনীতি ঘৃণা করেন, তবে তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী পদ নিয়েছেন। আমি রেকর্ডিং থামিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, বাংলাদেশের সব মানুষের তো পিতৃহত্যা হয়নি, তবে তারা কেন শুধু প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই হাসিনাকে ভোট দেবে?
আরো পরে শুনেছিলাম, হাসিনা নাকি বলেছেন বাংলাদেশের মানুষ তার পিতাকে হত্যা করেছে, তার পিতার হত্যায় দেশের মানুষ কাঁদেনি, সে জন্য তিনি তাদের ক্ষমা করতে পারেন না। শেখ হাসিনা কি তার সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে চান?
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট সিরাজুর রহমান

 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:৫৬
আশরাফ রহমান বলেছেন: শেখ হাসিনার কেবল দিন বদল হয়েছে, জনগণের ভাগ্যের কোন বদল হয় নাই।
২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৭:৩৩

লেখক বলেছেন: আওয়ামী লীগের নেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ব্রিটেন সফরে শেখ হাসিনার জন্য বিবিসিতে একটা
চা-চক্র দিয়েছিলাম। তারপরে স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারে তিনি আমার সহকর্মী জন রেনারকে বলেন, তিনি রাজনীতি ঘৃণা করেন, তবে তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী পদ নিয়েছেন। আমি রেকর্ডিং থামিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, বাংলাদেশের সব মানুষের তো পিতৃহত্যা হয়নি, তবে তারা কেন শুধু প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই হাসিনাকে ভোট দেবে?
আরো পরে শুনেছিলাম, হাসিনা নাকি বলেছেন বাংলাদেশের মানুষ তার পিতাকে হত্যা করেছে, তার পিতার হত্যায় দেশের মানুষ কাঁদেনি, সে জন্য তিনি তাদের ক্ষমা করতে পারেন না। শেখ হাসিনা কি তার সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে চান?

২. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৬:৫০
রাজনীতি বলেছেন: খুব ভাল লাগল পোষ্ট টা। শেখ হাসিনা মুখে যা বলে বাস্তবে তা করেনা। আর যা করে তা বলেনা। আর যেটা না করে সেটা আরো বেশী করে। পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন বলতে তো শুধু দাদাদের কাছ থেকে আমদানী নীতি। দেশের ১২ টা বাজাতে তাদের হৃদয় কম্পন ধরেনা। এটাই হল দিন বদল। শুধু আমদানী আর ধার করে খাওয়াও।
২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৭:৩২

লেখক বলেছেন: আওয়ামী লীগের নেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ব্রিটেন সফরে শেখ হাসিনার জন্য বিবিসিতে একটা
চা-চক্র দিয়েছিলাম। তারপরে স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারে তিনি আমার সহকর্মী জন রেনারকে বলেন, তিনি রাজনীতি ঘৃণা করেন, তবে তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী পদ নিয়েছেন। আমি রেকর্ডিং থামিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, বাংলাদেশের সব মানুষের তো পিতৃহত্যা হয়নি, তবে তারা কেন শুধু প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই হাসিনাকে ভোট দেবে?
আরো পরে শুনেছিলাম, হাসিনা নাকি বলেছেন বাংলাদেশের মানুষ তার পিতাকে হত্যা করেছে, তার পিতার হত্যায় দেশের মানুষ কাঁদেনি, সে জন্য তিনি তাদের ক্ষমা করতে পারেন না। শেখ হাসিনা কি তার সহিংস রাজনীতির সংস্কৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে চান?

৩. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৯:৫৩
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলেছেন: +। যে হাসিনা ক্ষমতার লোভে ২০০০ সালে তার পিতার হত্যার মূল অপরাধী হেনরী কিসিঞ্জার কে বাংলাদেশে ডেকে এনে তার হাত থেকে হাসি মুখে পুরস্কার নিতে পারে, সে কোন নৈতিক অধিকারে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে গোস্বা করবে?
৪. ২১ শে এপ্রিল, ২০০৯ বিকাল ৩:৩২
পরিবর্তনবাংলা বলেছেন: ১০০ দিনেই এই অবস্থা আর এরপর বাকী দিনগুলো যে কিভাবে পার করি

 

মোট সময় লেগেছে ১.০১০৬ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই