টেলিভিশনে দেখছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের সেদিনের (১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে কী ঠিক করা হলো না-হলো সে তথ্য তিনিই নিয়মিতভাবে বলেন সাংবাদিকদের। ওই দিন তাঁর দেওয়া প্রধান খবর ছিল, হাইকোর্টের রায়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বিধায় মন্ত্রিসভা স্থির করেছে, সরকারি সব স্থাপনা থেকে তাঁর নাম সরিয়ে ফেলা হবে এবং এই সিদ্ধান্ত প্রথমেই কার্যকর করা হবে ঢাকাস্থ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম অবিলম্বে পরিবর্তন করে। এখন থেকে এই বিমানবন্দরের নাম হবে হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আরো বলেছিলেন, মন্ত্রিসভা মনে করে একজন 'অবৈধ' শাসকের নাম কোনো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যায় না। সেদিনই বা তার পরদিন বাণিজ্যমন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান কোনো এক অনুষ্ঠান শেষে এ বিষয়ে একই কথা বললেন : কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা একজন অবৈধ শাসকের নামে রাখা যায় কিভাবে, বিশেষ করে হাইকোর্ট যখন তাঁর ক্ষমতা গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এরপর বিমানবন্দরে বেশ ভুতুড়ে ঘটনা ঘটল। সেখানে নিয়ন বাতি দিয়ে বড় করে লেখা ছিল 'জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের এক দিন পর কে বা কারা প্রথমে 'জিয়া' শব্দ থেকে হ্রস্ব ই-কারটা খুলে নিল। ফলে নিয়ন সাইনটা হয়ে গেল 'জয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'। কিন্তু এটা হাস্যকর দেখাচ্ছিল বলে প্রথম শব্দটির বাতি নিভিয়ে রাখা হলো। অতঃপর আলো জ্বলতে লাগল কেবলই 'আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর' শব্দ কয়টিতে। অবশেষে তা-ও নাকি নিভিয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে পরে পত্রপত্রিকাগুলোকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, সরকারের যথাযথ বিভাগ থেকে নির্দেশ এলে নতুন নামে প্রদীপ্ত নামফলক লাগানো হবে। তবে বিমানবন্দরে এই আলো-আঁধারির খেলা আমার আজকের লেখার বিষয় নয়। আমি এর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসতে চাই। তবে তার আগে ছোট করে একটা কৈফিয়ত দিয়ে রাখা দরকার।
আমরা রিপোর্টাররা মাঝেমধ্যে একটু অস্বস্তিতে পড়ি যখন আমাদের এমন বিষয়ে খবর জোগাড় করতে বলা হয়, যেটা সম্পর্কে আমরা তেমন ওয়াকিবহাল নই। আবার কখনো এমন কারো সাক্ষাৎকার নিতে পাঠানো হয়, যাঁর ব্যাপারে আমাদের খুব একটা জানা নেই। ফলে তখন আমরা কাজ শুরু করি অন্ধকারে দেয়াল হাতড়ে পথ বের করার মতো করে। তো আজকে এখানে আমি যে একটা প্রশ্ন তুলতে যাচ্ছি, সেটা অনেকটা সেই পদ্ধতিতেই। আমার ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার প্রশ্নটা হলো, 'মুন সিনেমা' নামে একটি সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ করার সময় সেই বিষয়ে প্রযোজ্য আইনের ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসন, সামরিক আইন প্রশাসকদের ও রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ এবং সামরিক আইনের ফরমান অবৈধ ঘোষণা করেছেন এবং কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হলো এই মর্মে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সেই রায়টির বলে কী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বরাবরই অবৈধ শাসক হিসেবে বর্ণনা করা যায়? আমার মনে হচ্ছে, তা করা যায় না। বরং আমার ধারণা জন্মাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের অন্তত আড়াই বছর কার্যকাল হাইকোর্টের আলোচ্য রায়ের নিরিখেই বৈধ। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত।
একটু ব্যাখ্যা করি : রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত অবস্থায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামল ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে শুরু করে ৩০ মে ১৯৮১ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দুইবার শপথ নিয়েছেন। প্রথমবার তিনি রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ তারিখে। হাইকোর্ট বিভাগের আলোচ্য রায় এই নিয়োগকে 'সংবিধান অনুমোদন করে না এ জন্য তা এখতিয়ার বহির্ভূত ও অবৈধ' ঘোষণা করেছেন (সূত্র : আমাদের সময়, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের সরাসরি ভোটে একবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩ জুন ১৯৭৮ তারিখে। এই নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থিত প্রার্থী, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, জেনারেল এম এ জি ওসমানী। ওই বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও ছিল। এই নির্বাচনে জেনারেল জিয়া জয়ী হন। অতঃপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি শপথ নেন ১২ জুন ১৯৭৮ তারিখে। এখন হাইকোর্টের যে রায়ে 'এসব বিবেচনায় পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হলো' বলা হয়েছে তাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাকের রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ, ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমের রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে বিচারপতি সায়েমের রাষ্ট্রপতি পদে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মনোনয়ন দান ও দায়িত্ব হস্তান্তরকে 'এখতিয়ার বহির্ভূত ও অবৈধ' বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই রায়টিতে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন তারিখে বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং যার ফল অনুযায়ী জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে শপথ নেন, তার বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। এখানে বলে রাখি, হাইকোর্টের পুরো রায় আমি পড়ার জন্য পাইনি। তবে গত ৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের সময় পত্রিকায় 'পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া হাইকোর্টের ২২ দফা নির্দেশনা' শিরোনামে প্রতিবেদনে ওই নির্দেশনাগুলোর যে বিবরণী বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি পুরোটাই পড়েছি। তাতে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন তারিখের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নেই। আমার পরিচিত একজন আইনের অধ্যাপকসহ কয়েকজন যাঁরা রায়টি পড়েছেন তাঁরাও বলেছেন, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করা থেকে এই রায় নীরব রয়েছে। অতএব ধরে নেওয়া যায়, আলোচ্য রায় প্রদানকারী হাইকোর্টের বিজ্ঞ বিচারকরা ওই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অবৈধ বিবেচনা করছেন না। অর্থাৎ, ওই নির্বাচন বৈধ। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৭৮-এর ৩ জুন পর্যন্ত সময়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন পদে থাকা সম্পর্কে যিনি যা-ই বলুন না কেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আহূত ও আয়োজিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১২ জুন থেকে অর্থাৎ যেদিন জেনারেল জিয়া শপথ নিলেন সেদিন থেকে তিনি বৈধ রাষ্ট্রপতি। আলোচ্য রায়ের এক জায়গায় ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯-এর এপ্রিল পর্যন্ত কালটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'এ সময় সংসদের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছিল।' (আমাদের সময়, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। এই মন্তব্যের নিরিখে যুক্তি দেখানো যেতে পারে যে, ১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল নির্বাচিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক চরিত্র ফেরত পায়। জেনারেল জিয়া যেহেতু ওই সময়েও রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং সে হিসেবে নতুন জাতীয় সংসদে ভাষণ দিয়েছিলেন, কাজেই অন্তত এই দাবি করা যেতে পারে যে, জেনারেল জিয়া তখন একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বৈধ শাসকে রূপান্তরিত হয়েছেন। এসবের বিবেচনায় এ কথা বলা অন্যায় হবে না যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবৈধ শাসক হিসেবে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা আংশিকভাবে হলেও ভুল।
আরেকটা বিষয়, মুন সিনেমা-সংক্রান্ত রায়ের পঞ্চম সংশোধনী সম্পর্কে যেসব সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে তার কিছু হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত নয়। কারণ আপিল বিভাগের বিচারকবৃন্দ এই রায়ের কিছু পরিবর্তন (Modification) করবেন এবং কিছু পর্যবেক্ষণ (Observation) দেবেন বলেছিলেন, সেসব এখনো তাঁদের কাছ থেকে আসেনি। সেগুলো না পাওয়া পর্যন্ত এই পঞ্চম সংশোধনী ও সংবিধানসংক্রান্ত অন্য নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ এবং তা করার পথ সম্পর্কে চূড়ান্ত কিছু বলতে পারছেন না কেউই। ফলে এ সম্পর্কে একেকজনের মনে একেক রকমের ধারণা জন্মাচ্ছে। আমার মনেও একটা প্রশ্ন আছে। যেমন_অষ্টম সংশোধনীবলে সংবিধানে ২ক অনুচ্ছেদ সনি্নবেশিত হয়। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।' এদিকে মুন সিনেমা হল-সংক্রান্ত মামলার রায়ের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল অংশে ১৯৭২ সালে সংবিধানের আদি রূপ থেকে যেসব অনুচ্ছেদ বিলোপ করা হয়েছিল, তার বেশ কয়েকটি পুনঃসনি্নবেশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূত্র : আমাদের সময়)। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে অনুচ্ছেদ ৮, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি বলা আছে এবং আরেকটি হলো অনুচ্ছেদ ১২, যাতে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য যা করণীয় তা বলা আছে।
ফলে আমার মনে যে প্রশ্ন উঠছে সেটা হলো, অনুচ্ছেদ ২ক যেমনভাবে আছে তা বহাল রেখে আগের অর্থাৎ ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮ এবং ১২ পুনঃসনি্নবেশ ও কার্যকর করা যাবে কি না? গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত 'পঞ্চম সংশোধনী রায় : বিতর্ক ও বিভ্রান্তি' শীর্ষক নিবন্ধে অধ্যাপক আসিফ নজরুল আরো কয়েকটি অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো আবার হুবহু আগের মতো বসাতে গেলে বর্তমানের অন্য অংশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা অসমঞ্জস হবে। মুশকিল হচ্ছে, আপিল আদালতের লিখিত সিদ্ধান্তগুলো হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্ন ও সমস্যা নিয়ে পরিষ্কার করে আর কিছু চিন্তাভাবনাও করা যাচ্ছে না। আপাতত অপেক্ষার পালা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভাও একটু ধৈর্য ধরতে পারেন।
লেখক--আতাউস সামাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



