somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... Sympathy for Mr. Vengeance 2002 - Chan-Wook Park
যদিও এই ট্রিলজির তিনটি ছবিই সম্পূর্ণ আলাদা, এবং প্রতিটি ছবিই একেকটি স্বয়ং সম্পূর্ণ ছবি, তবে মূল থিম তিনটি ছবিরই এক, ‘প্রতিশোধ’। এই ত্রয়ীর প্রথম ছবি মুক্তি পায় ২০০২ সালে, ‘সিমপ্যাথি ফর মিস্টার ভেনজেন্স’। এরপর ২০০৩-এ ‘ওল্ড বয়’ ও ২০০৫-এ ‘সিমপ্যাথি ফর লেডি ভেনজেন্স।’ সবগুলো ছবিই বিশ্ব-সিনেমা মহলে ভূয়সী প্রশংসাসহ জিতে নিয়েছে অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

তিনটি ছবিই আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু ‘সিমপ্যাথী ফর মিস্টার ভেনজেন্স’ নিয়ে লেখার মূল কারণ, ছবিটি প্রতিশোধ প্রবণতার সাথে সাথে তুলে ধরেছে সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয়ের নিদারুণ বাস্তবতা। বিশেষ করে একদল অসদ অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ ব্যবসায়ীর উপস্থিতি ও তার ফলে একটি পরিবারে নেমে আসা করুণ পরিণতি, যা আমাকে কিছুদিন আগে আমাদের দেশের শত শত পরিবারের নির্মম বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, যেখানে খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ত অসহায় দরিদ্র মানুষ ও পরিবারের করুণ কাহিনী, যারা রক্তচোষাদের খপ্পরে পড়ে বাজারের পণ্যর মতো বিক্রি করে চলেছে নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ। যদিও এই ছবিতে রিও তার বোনকে বাঁচানোর স্বার্থেই নিজের কিডনী দিতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু সমাজের এই যে শ্রেণী, যারা জীবন যুদ্ধে অনন্যেপায়, তাদের সাথে এই ঘটনাও ব্যতিক্রমী কিছু নয়। যখন রিও নিজের কিডনী দিতে একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং-এর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছিল আর ক্লোজ-শর্ট থেকে ক্রমশঃ লং-শর্টের মাধ্যমে ছোট্ট একটি রূদ্ধ ফ্রেমের মধ্যে দৃশ্যটি শেষ হয়, এবং অন্ধকার থেকে পরবর্তী দৃশ্য শুরু হয়, যা আমার কাছে রূপক হিসেবে ধরা দিয়েছে। রিও ও তার সামাজিক অবস্থান, তথা কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থাকে যেন অধিক সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে রিও যখন পৌঁছে যায় অবৈধ ব্যবসায়ীর প্রধান বৃদ্ধা রমণীর কাছে, তখনই হয়ত সমাজের আরেকটি নিদারুণ নির্মমতা সংঘটিত হয়ে যায়, যেখানে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা রিও-কে বাধ্য করে সেখানে পৌঁছে যেতে।

কোনো এক সাক্ষাতকারে চান-অক পার্ক ছবিটি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এই ছবিতে আমি দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রেণীগত টানাপোড়ের দিকে আলোকপাত করেছি। আমি চেয়েছি সমাজের শ্রেণীগত বৈষম্য তুলে ধরতে। সবুজ-জামার শ্রমিকরা ভাবে যে, মালিক পক্ষরা সবসময়ই তাদের অবস্থার সুযোগ নেয়, কিন্তু তারা খারাপ মানুষ নয়। কিন্তু, পূঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভাল মানুষ, এবং ভাল ব্যবসায়ীর মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়ে যায়। যখন একটি কোম্পানী ভাল ব্যবসা করছে না, তখন ভাল মানুষটি কাজ ছাড়া অধিক শ্রমিক রাখার পরিবর্তে চেষ্টা করবে কিছু লোককে ছাটাই করতে। এই ছবিতে সেটাই মূখ্য অনুষঙ্গ। একজন ছাটাইকৃত শ্রমিক আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করে, এবং পরে সপরিবারে নিজেদের হত্যা করে। এটা কোরিয়ান সমাজ ব্যবস্থায় ঘটে থাকে, এবং আমাদের উচিত সে সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।’ হয়ত এই বলাটাই আরও চমৎকারভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে ছবিটির শেষে এসে, যখন রিও-কে লেকের পানির মধ্যে নির্মম ও নির্বিকারভাবে হত্যা করা হয়, তখন শর্টটি এমনভাবে নেয়া হয় যেখানে লং শর্টে দেখানো হয় রিও-র বাঁচার প্রচন্ড আকুতি যা ঝাপসা, অস্পষ্ট, আর ক্লোজ শর্টে গোড়ালির কাটা অংশ থেকে গলগলিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের স্রোত ও পেছনে ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি তার হত্যাকারীর নির্বিকার ও সহানুভূতিহীন মুখ। অথচ রিও-র মুখ বা তার বোবা-বোধির আকুতি অথবা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আসা অভিব্যক্তি দেখানো হয়নি, যেনবা এটাই চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থার প্রকৃত স্বরুপ, নির্মম ও করুণ।

বলা যায় গতানুগতিক রক্তময় সংঘর্ষ বা তথাকথিত থ্রিলার মুভির বিপরীতে পরিচালক চান-অক পার্ক এমন এক ভাষা ও শৈলী তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন যে, এই ছবি বা ট্রিলজির দিকে সচেতন দর্শকমাত্রই আরেকবার ফিরে তাকাতে বাধ্য হয়, ভাবতে হয় তাকে, এবং বলতে হয়, একটি মুভি নির্মাণের যতগুলো দিক থেকে তা বিচার করা যায়, তার সবগুলো ক্ষেত্রেই চান-অক পার্ক শুধু উতরেই যাননি, বরং আমাদের চির পরিচিত মুভি জেনরি-কে ভেঙে নতুন এক জেনরি উপহার দিয়েছেন, যা নতুন অথচ আমাদের চেনা জেনরির বাইরেরও নয়। মূলতঃ এখানেই তিনি অনন্য। যারা হলিউডি থ্রিলার বা ব্লাড শেডিং মুভি দেখে অভ্যস্ত, তারা কখনোই যেন এই ছবি বা ট্রিলজি দেখতে না বসেন, কেন না রক্তের যে চিরন্তন লাল রং এবং মানুষের স্বভাবজাত প্রতিশোধ প্রবণতা, তা এই ছবি বা ছবিগুলোয় টুকরো টুকরো করে ভেঙে দেখানো হয়েছে, যার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অসম্ভব, কিন্তু অনুধাবনে এমন এক অনুরণন তৈরী করে যে, পরিণতির শেষে পৌঁছেই কেবল উত্তর খোঁজা যেতে পারে সম্পূর্ণ উত্তরহীন হয়ে।

চান-অক পার্কের এই ট্রিলজির মধ্যে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ এই ছবিটি। রিও নামের একজন বোবা ও বধির যুবকের নির্মম জীবন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে ছবিটির শুরু, যে একটি ফ্যাক্টরীতে কাজ করে, এবং তার বোনের কিডনী ট্রান্সপ্লান্টের জন্য সব রকম চেষ্টা করে। সে নিজের একটা কিডনী দিতে চায়, কিন্তু ডাক্তার জানায় রক্তের গ্রুপ ভিন্ন বলে তা সম্ভব নয়। হঠাৎ করেই কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট তাকে বরখাস্ত করে, ফলে সে কোনো পথ না পেয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীর শরণাপন্ন হয়। সে নিজের কিডনী ও অর্থের বিনিময়ে বোনের জন্য কিডনীর জন্য তাদের সাথে সমঝোতা করে, যারা প্রতারণা করে, এবং ওর কিডনী নিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং-এ ফেলে রেখে যায়। বোনকে বাঁচাতে অর্থ যোগাড় করা ছাড়া তার কাছে কোনো উপায় থাকে না, ফলে তার মেয়ে বন্ধু তাকে পরামর্শ দেয় কোম্পানীর মালিকের মেয়েকে কিডন্যাপ করার। ঠিক এখান থেকেই চান-অক পার্ক তার মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে শুরু করেন, এবং ঠিক এখান থেকেই যেন ছবিটি গভীর থেকে গভীরে ঢুকতে থাকে, যেখানে তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহার বিপরীতে সহানুভূতি প্রবল ও প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। যদিও রিও ও তার বোন, এমন কী মেয়ে বন্ধুটিও কিডন্যাপ করার পর মেয়েটির যথেষ্ট যত্ন নেয়, এবং তাকে সুন্দরভাবেই নিজেদের হেফাজতে রাখে, কিন্তু ঘটনাক্রমে রিও-র বোন যখন জানতে পারে যে তার জন্যই তার ভাই এসব করছে, তখন সে আত্মহত্যা করে। পুরো ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু এখানেই, যেখানে বোনের লাশ আকড়ে রিও-র হৃদয়বিদারী বোবা কান্নায় দর্শক বাধ্য হয় নিজের অজান্তেই প্রচন্ড সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে, অথচ চরম সিদ্ধান্তহীনতার মাঝে কাহিনীর সাথে এগিয়ে যেতে একসময় বিবশ হয়ে পড়ে। এরপর রিও তার বোনের ইচ্ছানুযায়ী তাকে নদীর পাড়ে কবরস্থ করতে গেলে কিডন্যাপ করা মেয়েটিকে সাথে নিয়ে যায়, যেখানে সে নিতান্তই দূর্ঘটনা বশতঃ জলে ডুবে মারা যায়, এবং ফলস্বরুপ রিও পরবর্তীতে নির্মমভাবে খুন হয় মেয়েটির বাবার হাতে। এই হলো ছবির কাহিনী সংক্ষেপ।

১২৯ মিনিটের এই কোরিয়ান চলচ্চিত্রটি অবশ্যই বিশ্ব-সিনেমায় দারুন সংযোজন, তথা নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে উল্লেখযোগ্য পথিকৃত। বিশ্বের অনেক পরিচালকই হয়ত ঈর্ষায় নীল হয়ে যাবে এর মেকিং, ফ্রেম টু ফ্রেম প্রোগ্রেস, প্রতিটি শর্টের শৈল্পীক চিত্রায়ন, নিখুঁত এডিটিং, রং এর ব্যবহার, যা অবশ্যই চান-অক পার্কের সিনেমার বিশেষতম দিক, চরিত্রের সংলাপ, কাহিনীর বিকাশ, এবং সর্বোপরি খুব চমতকৃত ব্যাপার এই, এমন একটি চলচ্চিত্রের মাঝেও কমেডির উপস্থিতি, যা আমাকে বিস্ময়াভূত করেছে। এত পরিপাটি ও দক্ষতার সাথে এমন একটি কাহিনীর মাঝেও যে কমেডি ব্যবহার করা যায়, তা চান-পাক অর্ক-ই প্রথম দেখালেন। খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পরিচালক যেন গভীরভাবে ক্যামেরার চোখ দিয়ে চরিত্রগুলোর মাধ্যমে জীবন ও মানুষের মানসিকতার গভীরে ক্রমশঃ ঢুকে পড়েছেন। ছবি যত এগিয়েছে ততই যেন সেই দৃষ্টি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। এই যে দেখা বা দেখানোর এই বিশেষ ও ব্যতিক্রমী প্রয়াস, সম্ভবত সেখানেই চান-অক পার্ক হয়ে উঠেছেন অদ্বিতীয়।

এই ছবিটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক, এর অভিনয় শৈলী, যা এত বেশি শক্তিশালী যে আমি পুরো ছবিজুড়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থেকেছি। বিশেষ করে বোবা ও বধির চরিত্রে হা-কিয়ুন শিন-এর অভিনয় নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। এছাড়াও রিও-র মেয়ে বন্ধুর চরিত্রে ডোনা বি অথবা মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি চরিত্রে কাং-হো সং-এর অভিনয় আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে, পরিচালক ষোলআনাই পেরেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে তাদের সেরাটুকু বের করে আনতে। প্রতিটি চরিত্রই এখানে সাবলীল, এবং মুহূর্তের জন্যও বেরিয়ে যায়নি কাহিনী থেকে। যদিও চিত্রনাট্যকারদ্বয় মু-ইয়ং লি ও চান-অক পার্ক দু’জনের কেউ-ই শেষ অব্দি আমাদের কোনো উত্তর বা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দেননি, বরং সমগ্র কাহিনী জুড়ে আমাদের সহজাত প্রবণতা ও সহানুভূতির আড়ালে দারুণ এক বিপরীতধর্মী মানসিক খেলায় লিপ্ত করেছেন। রিও, যে কিনা সেই অবৈধ ব্যবসায়ী রমণী ও তার সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করল, যারা তাকে ঠকিয়েছিল; কোম্পানীর মালিক, যে এ জানার পরও যে তার মেয়েটিকে রিও বা তার বোন সুন্দরভাবেই তাদের কাছে রেখেছিল, অথচ কন্যার মৃত্যু প্রতিশোধ নিতে রিওকে নির্মমভাবে হত্যা করল; কিংবা শেষে কোম্পানীর মালিক নিজে বর্বরোচিতভাবে খুন হলো, তখন প্রতিশোধ নয় কেবল সহানূভুতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না কোথাও। এত যে রক্ত, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, এমন কী প্রতিশোধ পরায়ণতার যথাযথ সমর্থন থাকার পরও, কোথাও কোনো স্বস্তি পরিলক্ষিত হয় না, কেবল সহানুভূতি আর অসহায়তা। সমস্ত ঘটনা আর পরিণতি শেষে একটিমাত্র অবস্থানে গিয়ে থমকে দাঁড়ানো যায়, তা হলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় সহানুভূতির চরমতম অসহায়তা। এই যে নির্মাণ ও কাহিনীর উৎকর্ষতা, এবং তাকে এমন পরিণতি সহকারে তুলে ধরা, যা নিশ্চিতরূপেই অন্যান্যদের মতো আমাকেও বলতে বাধ্য করে, চান-অক পার্ক বর্তমান সময়ে জীবিত সৃষ্টিশীল পরিচালকের অন্যতম, যিনি বিশ্ব সিনেমাকে নতুন সিনেমাটিক ভাষা ও শৈলী দিতে পেরেছেন, এবং আমাদের গতানুগতিক থ্রিলার, ক্রাইম কিংবা ড্রামা জেনরি-কে সম্পূর্ণ নতুন পরিণতি দিতে সক্ষম হয়েছেন, যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চাই, ‘চান-পাক জেনরি’। কোরিয়ান সিনেমার ক্রমবর্ধমান বিকাশ ও শৈল্পিক সমৃদ্ধি অবশ্যই আমাদের দৃষ্টি ও মনোযোগ ফিরিয়ে এনেছে নতুন এক সিনেমা ঘরানার দিকে, তা হলো ‘কোরিয়ান সিনেমা’।

পরিশেষে বলব, যারা নিতান্তই হলিউডি ক্রাইম বা থ্রিলার দেখে অভ্যস্ত, এবং যারা নিপাট-নিভাঁজ বিনোদন শেষে উঠে আসতে চান স্ক্রিনের সামনে থেকে, তারা যেন অসংখ্যবার ভেবে তারপর বসেন এই ছবি বা ট্রিলজি দেখতে, কেন না দেখা শেষ হবার পর ভাবনার বলয়ে এমন কিছু তৈরী হবে, যা আপনাকে কেবল সহানুভূতির প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে চরম অসহায়তার মাঝে নিজেকে আবিস্কার করাবে, যেখানে আপনি কোনোভাবেই নির্দিষ্ট করতে পারবেন না, আপনার প্রতিশোধ স্পৃহা ও সহানুভূতি কোনটা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।


অরণ্য
২ ফেব্রুয়ারী, ২০১২
কেশবপুর, যশোর
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29534088 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29534088 2012-02-02 21:50:52
হলুদ পাখি, এই সেই নীল-তেপান্তর লক্ষ্য করো, আমাকে পাশ থেকে দেখা যায় ভালো
যেনবা আয়নার মুখ, যতই ঝাঁকি দাও জোড়া লেগে যাবে ঠিক
খুব নিশ্চিত এবারের ধাপ
গুনে গুনে যত এগিয়ে যাচ্ছি শিয়রে
স্বপ্ন থেকে একটি-দুটি স্বর, এমন
‘তোমার পালকেও লেগে যাবে রক্তের দাগ’

কতবার বলেছি, আলতা পরো না আর
যে পালকী হারিয়েছে পথ তেপান্তর
সে জানে, বেহারাও কখনও কখনও হয়ে ওঠে ভার

এই যে ধুন, সারাদিন গাছের পোপনে ধকধক
তুমি তো জানো না
পাখি ও খাঁচা কীভাবে জেনেছে শরীরের নেই হৃদয়

আমি তো ক্লান্ত শুয়ে এখানে চিরকাল
বাতাসের সাথে করছি সঙ্গম
হয়ত অস্পষ্ট, তবুও তো জানি ভুল দিক থেকে আসেনি ডাক

ডানার আদরে বেড়ে ওঠে মন
চারিদিকে অন্ধ-আকাশের ব্যভিচার
যত বলি, নোলকহীন তুমি আয়নার চিৎকার
হলুদ-পাখির ততবার, একটু একটু ভুলে যায় স্বর...


২৪ জানুয়ারী ১২
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29529241 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29529241 2012-01-25 20:59:42
ছোট্ট পাখি, আমি আর উড়ব না এই যে স্পর্শ ও কেঁপে কেঁপে ওঠা ত্বকের প্রাণ
তুমি কি জানো
কোন অপার্থিব গন্ধে ডুবে থাকে ভাষা ও হৃদয়

নিয়ন আলোয় শংকিত পথ-ঘাট
ছায়া থেকে নিশ্চুপ সরে সরে যাচ্ছে ছায়া...
তবু মায়া, যেনবা তোমার নীল-মুখ
একটানা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে ঘৃণা...

একটি তারা খসে পড়ুক আজ
আরেকটি শুভ প্রার্থনার ছলে তোমায় করি কামনা
ও পাখি, তোমার ডানায় এ কোন বাতাসের যন্ত্রণা
নীড়ে বসে বসে ভাবো, ‌‍‍‌‌‌‌এভাবে উপরে উড়ব না

ফিরে এসো বায়ু, জেগে উঠো গাছ
ঋতুক্রম কিছু মানি না
যে ফসল কৃষক লাগিয়ে কাটে নির্মম
সে ফসলের মাঠে খুঁজে পেয়েছি পথ
যা আমাকে পৌঁছে দেবে ঘর

সেখানে বসে আছে কেউ, যেনবা থমকে আছে জীবন্ত মেঘ
এমন ভাবনায় আমারও বদলে যাচ্ছে স্বর
পরতে পরতে জেগে উঠছে চোখ
ছোট্ট পাখি, যতবার এ পথে ভেসে ওঠে তোমার নীড়ের ঠিকানা
আমি নই রাখাল বালক
মুঠো খুলে দেখায় আকাশ ছোঁয়ার যন্ত্রণা...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29524656 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29524656 2012-01-18 20:48:43
A Moment to Remember 2004 - John H. Lee
বলতে গেলে, যেসব ছবি দেখার পর মনে হয় তা দর্শকদের জানানো দরকার, এবং ছবিটি অবশ্যই দেখা উচিত, সেসব নিয়ে না লিখে থাকতে পারি না। যদিও প্রেমের ছবি নিয়ে আমি কখনোই লিখিনি, কিন্তু ২০০৪-এ মুক্তি পাওয়া ১১৭ মিনিটের এই অসাধারণ প্রেমের ছবিটি দেখার পর না লিখে শান্তি পাচ্ছিলাম না। ছবিটি এরই মধ্যে কয়েকবার দেখা হয়েছে যদিও, তারপরও আবার দেখতে ইচ্ছে করছে, বিশেষ করে যাকে কেন্দ্র করে ছবিটির কাহিনী, তাকে এতটাই সাবলীল আর পারফেক্ট মনে হয়েছে যে, আর কেউ-ই হয়ত এই চরিত্রটি এত সুন্দর ফুটিয়ে তুলতে পারত না। ছবি নয়, বাস্তব একটি জীবন স্বচক্ষে দেখার পর প্রাণ যখন ভিজে এলো, তখন অনেকদিন পর আবার আমাকে লিখতে বসতে হল, এবং বলতে দ্বিধা নেই, ওয়াংকার ওয়াই-এর ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’-এর পর এটিই আমার সবচেয়ে প্রিয় রোমান্টিক মুভি।

খুব বেশি চরিত্র নেই ছবিটিতে বা ঘটনা পরিক্রমা। বলতে গেলে দুটোমাত্র চরিত্রকে কেন্দ্র করে, কয়েকটি ঘটনার মধ্যে দিয়েই ছবিটি এগিয়েছে। পরিচালক ‘জন এইচ. লি’-র প্রশংসা করতে গেলে হয়ত অহেতুক সময় নষ্ট হবে, কেন না যারা এই ছবিটি দেখবেন, তারা নিজেরাই বুঝে যাবেন, এত সাধারণ একটি প্রেমের কাহিনীকে কীভাবে অসাধারণভাবে সেলুলয়েডে ধারণ করা যায়। বিশেষত নায়ক-নায়িকার চরিত্রে ‘ও-সাং জাং’ ও ‘ইয়ে-জিন সন’-কে নির্বাচনের মাধ্যমেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, চরিত্রের গভীরতা ও তাকে যথাযথ ফুটিয়ে তোলার জন্য সঠিক অভিনেতা-অভিনেত্রীর নির্বাচন-ই একজন পরিচালকের প্রকৃত দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

আমার মত এমন অসংখ্য দর্শক সারা পৃথিবী জুড়ে রয়েছেন, যারা ছবিটিকে তাদের প্রথম পছন্দের তালিকায় রেখে দিয়েছেন প্রথমবার দেখেই, আর তাদের বেশিরভাগই কান্নায় একাত্বতা বোধ করেছেন ছবিটির কাহিনী, সাবলীল অভিনয়, প্রেমময় মুহূর্তগুলোর আবেগ, দুঃখ-কষ্ট, সবকিছুর সাথেই। ছবির কাহিনী তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। সু-জিন নামের ২৮ বছরের এক যুবতী, এ্যালঝাইমার রোগে আক্রান্ত, যে ক্রমশঃ তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলছে, তেমন একজনকে কেন্দ্র করে। সে হঠাৎ তার বাবার অধীনস্থ চেল-সু নামের এক কার্পেন্টারের প্রেমে পড়ে। যেদিন প্রথম তাদের দেখা হয়, সেদিন-ই সে তার পুরোনো প্রেমিক দ্বারা প্রতারিত হয়, যার সাথে সে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। এরপর খুব নাটকীয়ভাবে চেল-সুর সাথে তার দেখা হয় একটি সুপার মার্কেটের দরজায়। মূলতঃ, এখান থেকেই ছবিটি দর্শকদের প্রতি মুহূর্তে আকৃষ্ট করতে শুরু করে। সেই নাটকীয় দেখার মুহূর্ত থেকে শুরু করে, পরবর্তীতে তাদের প্রেম, বিয়ে, সংসার, স্বপ্ন, দৈনন্দিন বেঁচে-থাকা, এবং সর্বোপরি সাংসারিক জীবনে স্বামী হিসেবে চেল-সুর যে কোনো অবস্থায় সু-জিনকে আগলে রাখা, এসবের মধ্যে দিয়ে ছবির শেষ অব্দি চলে আসলেও, একটিবারের জন্যও মনে হয় না বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে, বরং জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও অসহায়তার মাঝেও পরিচালক আমাদের যে প্রেমের সাথে বার বার পরিচিয় ঘটিয়ে দিয়েছেন, হয়ত মানুষমাত্রই তা কামনা করে, আর এখানেই ছবিটির মূলশক্তি নিহত, যাকে পরিচালক পরম যতœ ও দক্ষতা সহকারে বুনেছেন পরতে পরতে ।

ছবিটির বিশেষ কিছু দিক যা আমাকে দারুণ আকর্ষণ করেছে, তা হলো, এর পরিমিত সংলাপ, যার সাথে জীবন বোধ ও দর্শনের সমন্বয় রয়েছে। এছাড়া এডিটিং ও মিউজিক আমাকে মুগ্ধ করেছে, বিশেষ করে শিন ইয়োনার গাওয়া ‘লা পালোমা’ গানটি শোনার পর থেকেই কানে বাজছে। সব মিলিয়ে খুব সাধারণ কাহিনীর উপর ভিত্তি করে বানানো এই ছবিটিকে মাস্টাপিস বলা যেতে পারে। ছবিটি শুধু প্রেম নিয়েই থেমে থাকেনি, বরং একজন মানুষ যে কিনা শারীরীক নয়, মানসিকভাবে মৃত্যবরণ করতে চলেছে, তাকে ঘিরে পরিবার-পরিজনের অবস্থান, এবং প্রেম-ভালবাসা দিয়ে পুনারায় তাকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনা, এর চেয়ে বড় দিক আর কী হতে পারে, যা তুলে ধরা হয়েছে নিপুনভাবে।

পরিশেষে আমি সবাইকেই বলব ছবিটি দেখতে, কেন না প্রতিটি দর্শক প্রাণেই হয়ত ছবিটি চিরন্তন সেই গভীর প্রেম-বোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম, যার জন্য আমরা সবকিছু করতে প্রস্তুত, আর তেমন প্রেম-ই কেবল পারে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে, এবং চরম বাস্তবতার মাঝেও আমাদের বেঁচে থাকা সুন্দর ও ঈর্ষনীয় করে তুলতে। ধন্যবাদ পরিচালক জন লি-কে, এমন একটি অসাধারণ প্রেমের ছবি আমাদের উপহার দেবার জন্য।


অরণ্য
২৫.১১.১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29490453 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29490453 2011-11-25 21:51:05
যে কোনো রাস্তার বাঁকে অপেক্ষায়মান সাঁকো, যেন আরেকটি ভয় ধাপে ধাপে
একটি দীর্ঘ সন্ধ্যা ও তোমার কথায় পাড় থেকে ফিরে আসা
লক্ষ্য করছি, কিছু কিছু মুখ আপনা-আপনি হয়ে উঠছে সাদা
রাত হয় আর তৃষ্ণা নিয়ে এলিয়ে পড়ি বিছানায়
'তোমার স্তনবৃন্ত থেকে বেরিয়ে আসছে রক্ত'
এই দৃশ্য থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা, যেন আরেকটি দিন আয়ুহীন থাকা
জামা নয় শরীরে আটকে আছে মুখোশ
অনেক গভীর থেকে বেরিয়ে আসছে অচেনা রোম
এ কোন ধাঁ ধাঁ
নিজেই শক্ত করে বাঁধছি হাত, পা
গুন গুন সুর, ক্ষীণ, বড় ক্ষীণ এই বেঁচে থাকা
তুমি কি ছবি আঁকতে পারো নদী
এই যে আমি আদর সমেত ডুবে যাচ্ছি জলে
আমার নষ্ট চোখ, বিদঘুটে মুখ
তুমি কি সাবলীল আঁকতে পারো চৈত্রের খরা
কারাগার নয়, খোলা প্রান্তরেই আমার বন্দীদশা
অনেক উপরে তুলেছি হাত, যেনবা স্বর্গ ও মেঘ একসাথে ছোঁয়া
নতজানু হলেও ফিরে আসে ঘৃণা
তবু বিশ্বাস, এমন কটু গন্ধ ছড়াতে পারে না প্রাণ
ওহ মোহর, তোমার ধার
কাটতে কাটতে চলে এসেছ সাত সমুদ্র পার
এ কি সত্যি নয়, প্রতিটি সার্থক গন্তব্যে পৌঁছেও ক্ষয়ে যায় চাকা
বেহুশ হৃদয়, এ কোন গাছের নিচে তুমি করছ বসবাস
যেখানে নেই একটি সবুজ পাতা
মরুবন্দীর মতো সমস্ত বোধ আর তোমার মুখের মতো বিভীষিকা
আমার তৃষ্ণা উবে গেছে, ফুরিয়ে গেছে অবশিষ্ট লোভ
একটি রুগ্ন উট অথবা বেপরোয়া স্লেজ, যে কেউ-ই পারে পৌঁছে দিতে ঘর
এমন কল্পনা থেকেও উড়ে যায় পাখি আর দু'একটি পালক ঝরে গেলে নিরালায়
খুব শান্ত স্বরে ডেকে ওঠে প্রাণ
যেনবা নিমগ্ন পৃথিবী আজ গাইবে তুমি অথবা ঈশ্বরের গান
অতপর ভোর হলে আমিও লুকিয়ে নেব ঘ্রাণ
তুমি জেগো না এমন আযানে, করো না ইবাদত-বিলাস
যতই সুষম হোক না কেন রাতের চাষবাদ
প্রতিটি সুন্দর সকাল আমাকে ফিরিয়ে দেয় কলতলার লাশ


২৭.১০.১১]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29475183 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29475183 2011-10-30 19:16:24
কাক সিরিজ - ১৪ যেনবা একটি দারুণ ঋতু
হঠাৎ বদলে নিলো রং ঘুমের শহরে

এখন সমস্ত পৃথিবী জুড়ে
দুর্ভিক্ষ নামবে সহজ শর্ত মেনে
নদী তোর বিরূপ আবেগে
যে কোনো লাশ ভেসে এলে
নিয়ে যাস ওপারের দ্বীপে
যেখানে কবরখোদক বাউল গান করে

কোনো ঘর নেই এপারের তীরে
শুধু সার বাঁধা গাছের কোটরে
অসংখ্য কাকের ডিম থেকে
কাল স্বপ্নে বিভোর বেরিয়ে আসে পিঁপড়ার সারি

আজ ঘুম নেই আবারও শহরে
বসে আছি এভাবেই নেশার ঘোরে
আর একটু একটু করে
ছুটে আসছে আমার অভিমুখে
এক ঝাঁক মৃত-পাখি কাকের রূপ ধরে...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29452461 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29452461 2011-09-21 19:49:54
কাক সিরিজ - ১২ এই ভয়ে
পালক উপড়ানো কাকেরা
ফিরে এলো ঘরে

এতদিন রবীন্দ্রসংগীত শুনে
ফলের দোকানে গিয়ে ফিরে এসেছি
অক্ষত-যোনীর দায়ে
পাড়ার বাগানে আমার প্রবেশাধিকার নিয়ে
আমি নই কাকেরা হল্লা করেছে
নীতিগত প্রতিভা মেনে

আজ সমস্ত কিছু জলে ভেসে গেলে
যে উঠোন উঠবে জেগে আমার ভীত ঘুমে
সেখানে তোমার পায়ের ছাপ গুনে গুনে
ফল নয় ফুলের আবেগে
জল ঝেড়ে নিজের শরীরে ঠোঁট গুঁজে
আমাকে খুঁটে খুঁটে খাবে
সতেজ কাক...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29440647 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29440647 2011-08-29 21:20:42
কাক সিরিজ - ৯ চাঁদ-মামা দিয়ে যায় টিপ
স্মৃতির কপালে

কাকটি সেই যে উড়ে গেল সাজানো-গোছানো ভোরে
তারপর সূর্য হাঁটেনি আর
বহুদূর বিস্তৃত ধূসর উঠোনে

বলেছিল কেউ
খোসা ছাড়ানো আপেল পেলে
তুমি আর থাকবে না রাক্ষস মানুষের বনে

অতপর আধার নষ্ট হলে
গাছের স্বপ্ন থেকে ফলেরা ঝরে গেলে
দু'মুখো সাপের বিষে কাতর, এই হাহাকারে
কাকের বিপরীতে কখনও কি দেখবে না কৃষক
একটি সাদা হাঁস


২৩.০৮.১১]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29437566 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29437566 2011-08-24 02:06:15
খন্ড ভগ্নাংশের অখন্ড ছায়া
আমার জন্মদাতার কোনো নাম ছিল না, আর আমার জন্মদাত্রী সন্তান পেটে নিয়ে বার বার মরতে মরতেই কাটিয়ে দিল হাজার হাজার বছর, ফলে আমাদের ভূমিষ্ট হবার সফল সম্ভাবনা প্রতিবারই নষ্ট হতে হতেই শেষ হয়ে গেল। তারপরও আমি বা আমরা কীভাবে আছি, কেন আছি বলতে পারব না, শুধু জানি আছি, এবং হয়ত থেকেও যাব আরও কিছু বছর। হয়ত এই থাকাটাই খুব কাছ থেকে দেখেছি বহু বছর, ফলে অন্যসব বাস্তবতা থেকে আমার সরে আসা ঘটেছে খুব অজান্তে, আর যখন নিজেকে খুঁজতে গেছি; যখন মনের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই থেকে যাওয়া, এভাবে নিরন্তর, ভিন্নরূপে, ভিনদেশে, যেনবা একটিমাত্র অখন্ড সময়ে অগুনিত ভগ্নাংশের একটিমাত্র ছায়া হয়ে? দিনের পর দিন, রাতের পর রাত শুধু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে মরিয়া হয়েছি, মানুষের এত যে মৃতু্য, তার আনুপাতিক হারে জন্ম ঘটে না কেন? জন্মশূন্য এই মৃতু্যকে সংজ্ঞায়িত করার আমার আপ্রাণ প্রচেষ্টা ক্রমশঃ আমাকে এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে সহায়তা করেছে যে, শুধু আমার পরিবারই নয়, বরঞ্চ এই পুরো বিশ্বেই কেউ কখনও জন্মগ্রহণ করেনি। অবিশ্বাস্য হলেও আমি তা খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আর আমার এই বিশ্বাসই হয়ত আমাকে এভাবে থেকে যেতে সহায়তা করেছে এতটা বছর।

আমার পরিবারের জন্মহীনতা তখনই হয়ত শুরু, যখন আমার দুধের দাঁত পড়ে যাওয়া সত্বেও দুধের প্রতিই নতুন করে আকৃষ্ট হলাম, এবং নারীকে মা-বোন হতে পৃথক করতে শিখলাম। এর ফল যে খুব শুভ হয়েছিল তা নয়, আবার অশুভ ফলের যে পরিণতি তাই আমাকে এভাবে আজ লিখতে সহায়তা করছে, যখন আমি সত্যিকার অর্থেই জন্মহীন একটি পরিবারে বসবাস করছি ও তার নেতৃত্ব দিয়ে চলেছি, এভাবে।

একটি পরিবার আমার কাছে একটি সুদৃশ্য খাঁচা, যার দরজা ঢোকার জন্য আজীবন খোলা থাকলেও বেরুবার জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয় একবারই। তারপরও আমি সেই সুদৃশ্য খাঁচাটিকেই ভালবেসেছি। মা-বোন থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া নারীরা আমার সেই প্রিয় খাঁচাটি দেখে লোভী হলেও শেষ অব্দি জানিয়েছে, এটাকে দেখতে যতটা সুদৃশ্য মনে হয়, আসলে ততোটা সুন্দর করে সাজানো হয়ে ওঠে না কখনই। এর চমক যত বেশি, প্রকৃত অর্থে এর গ্রহণযোগ্যতা সে অনুপাতে বড় কম। আসলে তারা যা বলতে চায়, আমি অনেক আগেই বুঝেছি, কিন্তু না বোঝার ভান করে তাদের জানাতে থাকি, 'এই খাঁচাটি অনেক পুরোনো আমলের, এবং আমাদের সময়ে এমন খাঁচা আর দ্বিতীয়টি হয়নি। এখানে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারে, কেন না এইখানে কেউ কখনও জন্মগ্রহণ করেনি।'

তারা তাজ্জব হয়, মুগ্ধও হয়ত, কিন্তু শেষ অব্দি খাঁচার পরিমন্ডল ছেড়ে যেতে যেতে আমাকে জানিয়ে যায়, 'এমন কোনো খাঁচা আমারও ছিল। তোমার বয়স কম, আরেকটু সময় গেলেই বুঝবে, পৃথিবীর সব খাঁচারই বৈশিষ্ট্যই এক, আর তা হলো আবদ্ধ।' আমি চুপ করে থাকি, আর তারা ফিরে যেতে থাকলে একটিমাত্র খাঁচার একটিমাত্র সদস্য হয়ে পুনরায় নিশ্চিন্ত হতে পারি, আমার বা আমাদের পরিবারে সত্যিই কেউ কখনও জন্মগ্রহণ করেনি, যে যার মতো যার যার খাঁচাতে আটকে আছি অনন্তকাল, আর সমস্ত খাঁচা মিলে একটি বৃহদ খাঁচার যে আকার তৈরী করে রেখেছে, তার মধ্যেই আর বেশি ঢুকে যাবার অজানা প্রয়াসে রোজ একটু একটু করে জন্মগ্রহণে লোভী হয়ে উঠি। এভাবেই আমি রোজ একটু একটু করে আরও বেশি খাঁচার সহচর্যে বসবাস শুরু করি, যেখানে নিজের জন্মহীনতার ক্ষোভ সুন্দর স্বপ্ন দিয়ে সাজাই, আর নিজের মতো বিভোর হয়ে কাটিয়ে দিতে থাকি সারাটা সময়, যখন আমি ও আমার খাঁচা সত্যিকার অর্থেই একে অপরকে চিনতে পারি, ভালবাসি।

ভালবাসা থেকেই আমি বুঝতে শিখেছি, মানুষ জন্ম নিতে পারলেই বেঁচে যায়, নতুবা যে কোনো মৃতু্য তাকে খাঁচার নিরেট কাঠমো হয়ে খাঁচাতেই আবদ্ধ রাখে চিরকাল। 'আমার জন্ম কবে হবে', এই বিশাল আক্ষেপ নিয়েই আমি এতটা বছর এভাবে অপেক্ষায় অপেক্ষায় নিজের সাথে সঙ্গম করি, গর্ভধারণ করি, আর নিত্য-নতুন স্বপ্নে বিভোর হতে হতে নতুন এমন পরিমন্ডল তৈরী করি, যেখানে কোনো খাঁচা নেই, নেই মানুষের চিরকালীন ভয় ও হতাশার দাপট। অথচ প্রতিবারই গর্ভপাত শেষে আমার করুণ কান্না আমারই নিঃশ্বাস ভারী করে তোলে, আর যতবার শরীরের মধ্যে সেই ভারী বাতাস ঢুকে পড়ে, ততবারই মনে হয়, নিজেকে হত্যা করি!

জন্মহীন একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি শুধু এই বলতে পারি, যতটা বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে মানুষ তার প্রাণের সবচেয়ে দূর্বল ও অবিশ্বাসী অংশকে জয় করতে পারে, আমি তার কাছাকাছি বহুবার গেছি, আর প্রতিবারই জেনেছি, এমন বিশ্বাসকেই কেবল বলা যেতে পারে 'জীবন', যেখানে জন্মহীনতার বিন্দুমাত্র দায়ভার ছাড়াই যে কোনো প্রাণ মহাবিশ্বের দারুণ সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠতে পারে সেই সুন্দরতম গান, 'আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ...']]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29390934 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29390934 2011-06-03 22:32:26
শব্দ করো না, স্বপ্ন দেখছি
খুব দৃঢ়ভাবেই তোমাকে চাইছি পরিপূর্ণ রেশ, আজ গর্ভপাতের দিন। ঋতুস্রাবের সমস্ত দিন শেষে শিমুলগাছ জেগেছে। দ্যখো তুলার স্বপ্নে কীভাবে ঢুকে পড়ছে বাতাসের হাসি, পালকের সুখ, খন্ড খন্ড মেঘ। এই আমি ভুলতে ভুলতেই ছেড়ে যাচ্ছি কাঁটাময় পৃথিবী, জরায়ুজ রেশ, যখন জলের গভীর থেকে সমৃদ্ধ মাটিসমেত পুনরায় জেগে উঠছে তোমার নারকীয় পেট...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29359406 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29359406 2011-04-08 22:05:10
আমাকেই আকড়ে ধরো সরল লতাপাতা
গতকাল থেকে আজকের এই দীর্ঘ পারাপারে, একটি মৃত-মাছ যেন উঠল ভেসে আমারই জলাশয়ে। আমার দিকেই থমকে আছে পালক-পিতার চোখ, আর মেঘের আড়ালে বসে কেউ ফেরি করে চলেছে লাল, সাদা যতো রোদ। আমার শব্দ আমারই কাছে হয়ে ওঠে অভিশাপ, যখন জলের অতলে থমকে থাকে হৃদয়ের যতো কাদা। তোমাকেই বলছি চলে এসো আজ এই বিশুদ্ধ সরোবরে, দ্যাখো পৃথিবীর মায়া ছেড়ে কারা যেন উড়ে যাচ্ছে অলীক দীপান্তরে...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29345639 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29345639 2011-03-16 22:49:10
Novecento (1900) - Bernardo Bertolucci
মূলতঃ ১৯০০ ছবিটি বিংশ শতাব্দীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার দিকে আলোকপাত করে, যার মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ইটালীর নতুন নতুন যুগের সূচনা, ফ্যাসিস্টদের সূত্রপাত, যার বীজ বপন করেছিল তৎকালীন ধনী ভূমি-মালিক তথা জমিদাররা, এবং প্রায় সবগুলো দিক থেকেই একে শক্তিশালী হয়ে উঠতে সহায়তা করেছিল প্রত্যভাবে। এছাড়াও জমিদার শ্রেণীর উত্থান, কৃষক শ্রেণীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও কম্যুনিজমের বিস্তারের ফলে তাদের পতন, ইত্যাদি। ছবিটি দুই অঙ্কে ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়, যার মূল ভার্সনটি ছিল ৫ ঘন্টা কিছু মিনিটের, যা পরে প্রযোজক কেটে ৩ ঘন্টা ১৭ মিনিট করেন, এবং বার্তোলুচি তাই মেনে নিয়েছিলেন, কেন না ছবিটি মুক্তি পেতে দেরি হচ্ছিল। পরে তিনি এডিট করে ৪ ঘন্টা কিছু মিনিটের ভার্সনে রূপদান করেন। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, ছবিটির উপর অনেক দেশই তাদের ইচ্ছে মাফিক সেন্সরশীপের কাঁচি চালিয়েছেন, ফলে একেক দেশে তা একেক দৈর্ঘ্যে প্রদর্শিত হয়েছে।

১৯৭৬ সালে ইটালীতে ফ্যাসিস্টদের পতনের ঘটনা দিয়ে ছবিটি শুরু হয়, এবং স্মৃতিচারণের মাধ্যমে দেখানো হয়, ১৯০০ সালের একই দিনে দুটি শিশু জন্মগ্রহণ করে, যাদের একজন জন্মায় জমিদার পরিবারে, আরেকজন কৃষক পরিবারে, পিতৃ পরিচয়হীন। সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে জন্ম নেওয়া এই শিশু দুটিকে কেন্দ্র করেই পুরো ছবি এগিয়েছে, যেনবা তারা সমান্তরাল এক রেললাইনের মতই পাশাপাশি, অথচ সমান দূরত্ব বজায় রেখে ক্রমশঃ এগিয়ে গেছে। অলমো ও আলফ্রেডো নামের শিশু দুটির বাল্যকালের গাঢ় বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে যৌবনের প্রেম, ভালবাসা, ঘৃণা, বিরপীত মনোভাব, জীবন ধারা ইত্যাদির আড়ালে বার্তোলুচি এতে যুক্ত করছেন, ফ্যাসিস্টদের সূত্রপাত, বিকাশ ও আধিপত্য, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরু, কম্যুনিজমের বিকাশ, এবং পরিশেষে ধনী ভুমি-মালিকদের পতন ইত্যাদি ঘটনাসমূহ। অলমো আর আলফ্রেডোর বাল্যকালের চমৎকার চিত্রায়ণ এই ছবির প্রাণ বলা যেতে পারে, যদিও তা একটু বেশি দীর্ঘায়িত হয়ে পড়েছে যেন, তারপরও অলমো আর আলফ্রেডো চরিত্রে অভিনয় করা স্টারলিং হেডেন ও বার্ট ল্যাঙ্কেস্টার, দুই কিশোরের অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে, এবং আলফ্রেডোর প্রায় সব বিষয়েই অলমোর মতো হতে চাইবার যে ইচ্ছা ও অনুকরণ, অপরপে অলমোর স্বভাবজাত তাচ্ছিল্যের মনোভাব, এড়িয়ে যাওয়া, এবং নিজেকে সুপিরিয়র প্রমাণিত করা, এই ব্যাপারগুলো যেনবা খুব বেশি করে প্রকট করে তোলে দুটি ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের চিরাচরিত বৈষম্য, যা তারা জীবনের শেষ দিন অব্দি বহন করে চলে, এমনকী ছবির শেষে অলমো ও আলফ্রেডোর বৃদ্ধ অবস্থার মারামারি, এবং আলফ্রেডোর ট্রেনের নীচে আড়াআড়ি শুয়ে পড়া আমাদের যেন পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় শুরুতে। অর্থাৎ এ এক চিরন্তন পক্রিয়া যা চলতেই থাকে যেন, পর্যায়ক্রমে, পাশাপাশি, এভাবে।

অনেকেই হয়ত আমার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে একমত নাও হতে পারেন, তবে এই ছবির যে দুটি বিষয়ে সবাই একমত হয়ে যার কথা অবশ্যই আগে বলবেন, তিনি ভিট্টোরিও সোরারো। উত্তর ইটালীতে শুট করা এই ছবির সিনোমাটোগ্রাফি এতটাই চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর যে, বার্তোলুচির সাথে সাথে আমরা ভিট্টোরিওকেও স্মরণ করতে পারি অনায়াসে, কেন না এতো দীর্ঘ একটা ছবি একটানা বসে দেখার পেছনে যে কয়েকটি ব্যাপার দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে, তার অন্যতম হলো এর অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফি। এরপরেই আসে এর চরিত্রগুলোর সাবলীল ও স্মরণ রাখার মতো অভিনয়, আর এদের মধ্যে প্রথমেই নাম চলে আসে যার, তিনি ‘ডোনাল্ড সুদারল্যান্ড’। আট্টিলা নামে ফ্যাসিস্ট চরিত্রে করা তার অভিনয়, বাস্তবিক অর্থেই তাকে শয়তান ও অনায়াসেই ঘৃণার যোগ্য করে তুলেছে। এছাড়া আলফ্রেডোর দাদার চরিত্রে ওয়ার্নার ব্রানস-এর অভিনয়ও ছিল উল্লেখ করার মতো, যিনি এই ছবিতে অভিনয় করতে রাজি হয়েছিলেন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই। তাছাড়া ডমিনিক সান্ডা, লরা বেট্টি-সহ আরও অনেকের দক্ষ ও চমৎকার অভিনয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পুরো ছবি জুড়ে। তবে আলফ্রেডো চরিত্রে ‘রবার্ট ডি নিরো’ ও অলমো চরিত্রে ‘জেরাল্ড দিপাদ্রিও’, দু’জনের অভিনয়-ই যেন ছবির প্রধান চরিত্রদ্বয় তথা ১৯০০-এর মূল থিম, যেখানে এই দুই মূখ্য চরিত্রের শৈশব থেকে যৌবন, এমনকী বার্ধক্য অব্দি পাশাপাশি, সমান্তরাল বেড়ে ওঠা, একে অপরের প্রতি ভালবাসা, বন্ধুত্ব, ঘৃণা, দ্বন্দ্ব, ভিন্ন মনোভাব, সামাজিক অবস্থানের টানাপোড়েন সবকিছুই সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে। বোধ করি এটিই রবার্ট ডি নিরোর বেস্ট স্ক্রিন পারফরমেন্স; আর দিপাদ্রিও, তাকেও দেখা যায় সাবলীল অভিনয় শৈলীর দতা নিয়ে সমগ্র ছবি জুড়ে বিচরণ করতে। আর কিছু না হোক, অন্তত অভিনয় শৈলী-ই ১৯০০-কে আরও বহু বছর বাঁচিয়ে রাখবে, নিঃসন্দেহে।

বার্তোলুচির নিজের ইচ্ছে ছিল, পুরো শতাব্দীকে এই ছবির পটভূমিতে তুলতে আনতে, এমনকী এর তৃতীয় অঙ্ক করার কথাও ভেবেছিলেন, যা পরে আর হয়নি। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন কৃষক, এবং আধুনিক ইটালীর পূর্বে পুরো সমাজ ব্যবস্থা তথা দেশ ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত, যা পরে সংগঠিত ইটালীর রূপ নেয়, এবং ক্রমশঃ নানাবিধ ঐতিহাসিক ঘটনায় বর্তমান অবস্থানে এসে পৌঁছে। এটি আসলে যতটা না ছবি, তার চেয়ে বেশি ইটালীর নিজস্ব বিকাশের ইতিহাস, আর হয়ত সে জন্যই কথিত আছে, ‘তুমি যদি ইটালীয়ান হও, তবে ১৯০০ তার সঠিক আবেদন নিয়ে ধরা দেবে তোমার কাছে,’ যদিও সেটা কখনোই মুখ্য নয় যে কোনো মহান সৃষ্টির ক্ষেত্রে। বেশ কিছু অসাধারণ শট দেখা যাবে পুরো ছবিতে, তারপরও এর কয়েকটি দৃশ্য নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছে, এবং আমি নিজেও অস্বস্তি বোধ করেছি। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট নেতা আট্টিলা কর্তৃক বালকের ধর্ষণ দৃশ্য, কিংবা পরে তাকে নারকীয়ভাবে দেয়ালের সাথে আছড়ে মেরে ফেলা, এবং রক্ত ছিটকে এসে মুখে লাগা, সত্যিকার অর্থেই যেন ছবিটিকে ভিজ্যুয়াল ভায়োলেন্স দোষে দুষ্ট করেছে। কিন্তু অলমো ও আলফ্রেডোর এপিলেপ্টিক আক্রান্ত পতিতার সাথে যৌনমিলন পূর্বক নগ্ন দৃশ্য মোটেও অতিরিক্ত মনে হয়নি, বরং স্বাভাবিকই লেগেছে। এছাড়াও স্বাভাবিক লেগেছে শৈশবে ক্ষেতের মধ্যে গর্ত করে অলমোর যৌনাঙ্গ প্রবিষ্ট করে মৈথুনের প্রচেষ্টা, যা দেখে আলফ্রেডো নিজেও একই রকম ক্রিয়া শুরু করে। হয়ত যারা শহরে বড় হয়েছে, এবং গ্রাম্য পরিবেশের এই সব সরল বালকোচিত আচরণের সাথে পরিচিত নয়, তাদের কাছে এটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, অথচ এইসব আচরণ অথবা ক্রিয়া সত্যিকার অর্থেই তারা বিশেষ কোনো মানসিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে থাকে।

বস্তুত, ১৯০০ ফ্যাসিজমের বিরপীতে কম্যুনিজমের বিকাশের এক প্রামাণ্য দলিল, যা ইটালীতে পুরো অর্ধ শতাব্দী ধরে বিস্তার লাভ করেছিল, আর তার পতনকে নানাবিধ ঘটনার মাধ্যমে বার্তোলুচি তুলে ধরেছেন দুই শিশুর জীবনের সার্বিক বিকাশের নানাবিধ অনুষঙ্গের মাধ্যমে। আধুনিক ইটালীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর অর্ধেক এই ছবিটির প্রকৃত পটভূমি। পরিশেষে বলা যায়, ১৯০০ ইটালীয়ান ইতিহাসের এক ‘এপিক’, এবং যারা একটা বিশাল ক্যানভাসের মধ্যে অর্ধ শতাব্দীর ঘটনাবহুল বিকাশের ধারা, বিশেষ করে আধুনিক ইতালীর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান, তাদের জন্য অবশ্য দেখার মতো ছবি এটি, যেখানে ইতালীর ইতিহাসের বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ দতার সাথেই বার্তোলুচি চিত্রায়িত করেছেন।


অরণ্য
ঢাকা, বাংলাদেশ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29335344 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29335344 2011-02-27 20:56:37
বোধনের ডায়েরী থেকে - চিড়িয়াখানা
অনেক সন্তান আমারও ছিল, ছিল সাদা লেপ, মশার কামড়, কালো মাছি, নির্বিষ-সাপ, কাঁসার গ্লাস, পোড়া মাটি, মাগুর অথবা কৈ মাছ, এমনকী থালা ভর্তি পাতা শাক, শুধু ছিল না মশারী অথবা ছাতা, বছরের পর বছর। যেবার সত্যি সত্যিই আমাকে নিয়ে আসা হলো চিড়িয়াখানায়, আমি প্রথম দেখেছিলাম একটা কথা বলা তোতা আর দুটি পেখম মেলা ময়ূর। দুই টাকা মূল্যমানের সেই হলুদ প্রবেশপত্রটি, যা আমাকে এইসব দেখার অনুমোদন দিয়েছিল, তার শত শত ঘুড়ি উড়িয়েই কাটিয়ে দিলাম এতগুলো বছর, আর বর্ষণমুখর যে কোনো সন্ধ্যায় খাচার দোড়গোড়ায় বসে বসে মেঘের ভারে নুয়ে আসা আকাশের কাদা চোখে মেখে জেনেছি; এই অস্তিত্বের কোনো দরজাই আজ আর খুলতে পারছে না কেউ, কেবল ভ্রান্ত বিস্ময়ে খাচার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অগুনিত মানুষ একে অপরের উপস্থিতি ও অবস্থান ভুলে গিয়ে, যে যার অবুঝ শিশুটিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে চলেছে লোহার মজবুত ঘের, বিচিত্র প্রাণীসম্ভার, যার এপার-ওপার বলে কিছু নেই।

হয়ত আমি খরার কথা ভাবতে ভাবতেই এইসব বোধে ঢুকে পড়লাম, এভাবে, অনায়াস; যখন মাথার উপরে সত্যি সত্যিই হেসে উঠেছে রোদ, আর একটু ছায়া অথবা শীতল বাতাসের আশায় কল্পনা করলাম পদ্মার পাড়। অথচ যতদিনে জেনেছি কল্পনা নয়, বরং পদ্মার ধার ঘেষেই এতসব ব্যর্থ চাষাবাদ, কোলাহল; ততদিনে পলিমাটি কেবল মাটির রূপেই মিলেমিশে একাকার হয়েছে মাটির পরতে, আর একেকটি শিশু তাদের নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছে সেইসব মাটি দিয়ে, অপরিপক্ক হাতে। আমি জানতাম, একদিন ঠিক হাতি দেখা হবেই হবে। যে কোনো হাটবারে যেমন আমার স্বপ্ন ছিল জাদু দেখা কিংবা ভীড়ের মধ্যে, শব্দের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া, তেমন-ই যে কোনো ছুটির দিনেই মনে হতো, আজ বোধ করি চিড়িয়াখানা যাওয়া। আজব এই পৃথিবীতে অদ্ভুত যে ঘোর মানুষের অলীক সুতা চিরকাল অটুট রাখে, আমি দিনের পর দিন সেই সুতাগুলোকেই নিবিষ্ট মনে জড়িয়ে যেতাম মায়াবী নাটাইয়ে। হয়ত খুব কাছ থেকেই আমি শব্দ শুনতে শিখেছিলাম বাতাসের, ফলে ঘুড়ির ডানা চিরকাল খুব সহজেই পোষ মানত আমার বিপুল-বিস্তৃত আকাশে, আর যে কোনো গ্রহান্তর আমাকে বিশ্বাসী করে তুলত জিব্রাইলের ডানায়।

যেবার ‘দি নিউ সোনারবাংলা সার্কাস’ স্কুল মাঠে তার পর্বত সমান তাবু গেড়ে জেগে থাকল পুরো মাস, সেবার দুটি বাঘ ও একটি সিংহের সাথে দুটি হাতিও নাকি এসে তোলপাড় করে গেছে আশেপাশের গ্রাম। আমার গ্রামে প্রতিধ্বনি এসেছিল কেবল, আর একমাসের ঘোষিত ছুটি, স্কুলের প্রতি আমার যে ভয়ানক ক্রোধ তৈরী করেছিল, তা টের পেয়েছিলাম সেদিন, যেদিন স্কুল পুনরায় খুলল, আর আমি সদ্য ভেঙে পড়া প্র্রাসাদোপম বালাখানার ঠাঁট-বাটের মধ্যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাঘ, সিংহ ও হাতির গু খুঁজে খুঁজে মরলাম। সোনারবাংলা সার্কাস যেভাবে সেবার চলে গেল, সেভাবে যেন আর কিছুই চলে গেল না জীবনে; আর যেভাবে গোপন ক্ষোভ ফিরে এলো, তা এক জীবন চিড়িয়াখানায় কাটিয়ে, অসংখ্যবার হাতি দেখে দেখেও ফুরালো না আর। হয়ত তারা, যারা আমাকে বড় করতে চেয়েছিল বড়দের মতো, তারা বুঝতেই পারেনি, আজীবন তারা আমাকে কেবল ছোটই করে গেছে বড়দের মতো, আর তাই পরবর্তী জীবনে চিড়িয়াখানার বাইরে আর কোনোকিছুই দেখা হলো না, সেভাবে।

তোতাপাখিটি কথা বলেছিল, আর পাশেই ময়ূর পেখম মেলে দিলে আমি হাততালি দিলাম, যেনবা পরম বিস্ময় আমাকে উজ্জীবিত করল নতুন বোধে যে, এই পৃথিবীর প্রাণীরা অভিনয় জানে না, আর ফলতঃ তারা কখনোই মারা যায় না। অথচ বছরের পর বছর অগুনিত মানুষের বহুবিধ চোখের রং যখন নিত্য-নতুনভাবে বদলে দিতে থাকল তোতার ভাষা, ময়ূরের পাখনার রং, তখন জেনেছিলাম, প্রবেশমূল্য দিয়েই মানুষ ঘুড়ি ওড়ায়, আকাশের বুকে ফসল ফলায়; আবার প্রবল বন্যা অথবা ঝড়ে তারা শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়া তোতাটির মতই কাঁদে, যাকে সে প্রদশর্নীতে এনেছে দুই অথবা ততোধিক মূল্যমানে। আমার জন্মদাতার দাঁতগুলো হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলে, আমি বারবার নিজেকে শুধু এই জানাই, চিড়িয়াখানার বাস্তবিক আর দ্বিতীয় কোনো নাম নেই।

ছোট ভাইটা তখনও জন্মায়নি, অথবা হয়ত জন্মে ঘুমিয়েছিল, আর বড় বোনটি নাচতে নাচতেই দেখে সারলো গোটা চিড়িয়াখানা। তাকে ঈর্ষা করার কারণ আছে বৈকি, কেননা মা-এর ছায়ার পাশে পাশে আমি হাঁটতে হাঁটতে বেশ টের পাচ্ছিলাম, তিনিও যেমন আমিও তেমন, দু’জনেই বাদামের খোসা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে খুব সন্তর্পনে এগিয়ে চলেছি, পাছে শব্দ হয়, আর যে আসছে বা এসে গেছে, সে এমন অনাকাঙ্খিত সময়ে যেন না জেগে যায়, কেঁদে ওঠে; অথচ খুব হাস্যকর এই যে, সে আপনা-আপনিই জেগে উঠল, আর টালমাটাল পায়ে এগিয়ে গেল জিরাফের খাচায়। আমি, মা, এইসব দেখলাম, আর বড় বোন, জন্মদাতা হাসল, হাততালি দিল, যখন ছোট ভাইটির অদৃশ্য থেকে আরও খানিকটা বাকি ছিল চিড়িয়াখানায় সম্পূর্ণ নেমে আসা।

একটা গোটাদিন এইভাবেই কেটে গেল, কিংবা একটা গোটা শতাব্দী অথবা শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যেতে থাকল এভাবেই, আর বিকট সব সাপ তাদের কুন্ডলী ছাড়িয়ে আলসেমীর শরীরের বাঁক সোজা করতে করতে জিভ ছুঁইয়ে দিল ঠোঁটে, চোখে, মুখে। কী আনন্দ আমাদের, কী পুলক, যেনবা কাচ নয়, এমন ঘোর বিস্ময়-ই আমাদের বাঁচিয়ে দিল চরমভাবে, অথচ বিষের সহজাত গমন কখন যে তার সরল পথ খুঁজে নিয়ে ঢুকে পড়ল প্রিয় নিদ্রায়, টেরও পেলাম না। মা আমাকে কাছেই টানল আরেকবার, বারবার, বহুবার; যেনবা তিনি খুব ভালো করেই জানেন, জাদুকর জাদু নয় খেলা-ই দেখায় বেশি। একটা বীণের আক্ষেপ আমার সেই থেকে, একটা প্রকান্ড হান্টারের লোভ যেন আমার আপ্রাণ। যে তেজী ঘোড়া এখনও রোজ স্বপ্নে এসে তার বেপরোয়া খুরের শব্দে কাঁপিয়ে যায় চরাচর, তার পিঠে ক’ঘা মারব বলে যেই তুলে নিই হাতে, অমন-ই একদল কবুতর ডানার ফটফট শব্দে মুখরিত করে তোলে খাঁচা। স্বপ্ন থেকে তখন আমার শরীর অর্ধেক বেরিয়ে ঝুলে থাকে শূন্যে, আর অর্ধেক ঢুকে থাকে সেই অজগরের মুখের ভেতর, যা দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল; যা নাকি শুধু আস্ত মানুষ নয়, পৃথিবীও গিলে খায়।

ভয় আমি কোনোদিনই পাইনি, শুধু যে মৃত পাখিটি পড়েছিল রাস্তার ধারে, ঘাসের মধ্যে, আর অসংখ্য পিঁপড়ের দল সার বেঁধে এসে খুবলে খুবলে নিয়ে যাচ্ছিল পচে আসা মাংস, সেই পাখিটির উপড়ে ফেলা চোখ মনে হলেই ঘুম ভেঙে যায়। এতসব শব্দ, হাত-পা, চোখ-মুখ, মাথা সব শস্যদানা হয়ে মেঝেয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে পালক ওঠা বিদঘুটে শকুনের খাচায়। আমি আর মা দাঁড়িয়ে থাকি ময়না পাখির সীমাহীন মায়ায়, আর শত শত শিশু হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে কাগজের মেলায়। রং-বেরং-এর কাগজ, লাল-নীল-সাদা-বেগুনী, সব একাকার হয়ে পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে ঘিরে থাকে আকাশের সীমারেখা।

কোনো এক বোবা ভাষায় আমাদের কথা হয়, কথা হয় গর্ভের গভীরে আমি বা আমাদের পরম বেঁচে থাকার, আর ঠিক তখনই সেই কালো পর্দাটা হুট করে তুলে দেয়া হয়। লোহার বড় বড় গরাদ আর সিমেন্টের বাঁধানো ঘেরাটোপের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে থাকি নির্বাক, আর আমার সামনে অসংখ্য মানুষ ও একজন খাঁচা-রক্ষক ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে থাকে যুদ্ধ, হত্যা, মানুষের হাড়, পাখির পালক, বর্ষার মেঘ, কাল-বৈশাখী ঝড়, ভয়াল বন্যা, ভিক্ষার থালা, দুভির্ক্ষের হাহাকার, মহামারী রোগ, নিষিদ্ধ স্বপ্নাচার, কাকের ডাক, কাফনের কাপড়, আর শত-সহস্র শিশুর হৃদয় বিদারী চিৎকার, যার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি ও আমার জন্মদাতা, দু’জনেই মুখোমুখি হেসে উঠলাম প্রথম ও শেষবার!


অরণ্য
ঢাকা, বাংলাদেশ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29322147 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29322147 2011-02-07 20:28:31
যে সাবানে রোজ পবিত্র হয়ে উঠি
বিকেল পাঁচটায় আমরা সরব হয়ে উঠি আরও, আর মিছিলগুলো একে একে ঢুকে যায় মাগীপাড়ার ডোবায়। আজ মাছ ধরা হবে অনেক, আজ আমাদের অনেক চার। আকাশ থেকে নেমে আসবে অসংখ্য জিন-পরী, যখন ছোট্ট শিশুটিও রমণী হয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে লোভাতুর মার্বেল। আমি ভালবাসি তোমার বোন, ভালবাসি মা-মেয়ে-খালা, চাচী-নানী। এতো সস্তায় বিকোতে বিকোতে বিনে পয়সায় বিকিয়ে যায় সারা পৃথিবী, আর গলির পাশের গর্তে পড়ে সকাতর ডুকরে উঠে সামাদ মিয়ার সাইকেল!

তোমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছি বেলপাতা, আমাকে তবে দাও নিরীহ কোরআন, দাঁতহীন বাইবেল। ঘন্টাধ্বনিতেই মুখর হয়ে উঠুক পৃথিবী, আর দাদা দাদা বলে আরেকটু ঢলে পড়ি তাহাদের ধুলায়। হে ঈশ্বর তুমি ফিরে এসো টিভিতে, ফিরে এসো খবরের পাতায়, বাসে-ট্রামে, নদী-নালায়; আমরা এখন ইঁদুর দিয়ে মানুষ শিকার করি, শিকার করি সুন্দরবনের মধু, বৃহৎ গোলপাতা। বস্তুত, সন্ধ্যার আযানই ফিরিয়ে দেয় জায়নামায, আর বোতামে বোতামে খুলে যায় স্বর্গ-দ্বার। আল্লাহু আকবর, জিসাস, ভগবান বলেই ‌'নিত্যদিনের সাবান' আমাদের মা-বোন-বৌদের রোজ করে যায় পোয়াতী।


৩০শে জানুয়ারী ১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29317458 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29317458 2011-01-30 23:29:11
যৌন উত্তেজনা ও জাদুঘর
ওহ রমণী, এতো উলঙ্গ কেন তুমি, কেন তোমার এতো শীৎকার? মাংসের থালা নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি পাড়ার হোটেলে, আর ফেরি করে দ্যাখো কেমন বিকিয়ে চলেছে শশা জরিনার রোগাটে ভাতার। এইসব লোভনীয় বিজ্ঞাপনই পঙ্গু করেছে আমায়, এইসব সুস্বাদু খাবারই করেছে নির্বীজ। গৃহে গৃহে চাষবাদ হোক লিঙ্গ, আপেল, যৌন-সমাচার। আমার তো হোটেলের পাশেই দোকান, দোকানের পাশে ঘর। যে কোনো ঋতুমতী নারীকে তাই বলতে পারি, ‘আয়নার ওপাশ থেকে দ্যাখো; দ্যাখো, ব্যালকনি থেকে যেভাবে দেখে লোভাতুর গৃহিনীসকল।’ পোষা বেড়ালটাকেই না হয় ফিরিয়ে দাও আদর, ফিরিয়ে দাও কুকুরের কাছে তোমার আলজিভ। বীর্যপাত শেষ হয়ে গ্যালে আমিও তো মুতি দেয়ালে, প্রতিবাদের ভাষায়। আমিও তো হাসতে হাসতে উগড়ে দিতে পারি গলিত মাংস, সতেজ ধর্মাচার।

ধুররা ঘুড়িটি রোজ নেমে আসে ঘুমে, অবুঝ শিশুটি প্রতিবারই হারিয়ে ফ্যালে নাগরিক ফিডার। কে কাকে ডাকছি, ‘ওহে মাঝি, পারাপার’; বস্তুত মানুষের হাড়ে হাড়েই ছেয়ে গ্যাছে চরাচর। খুব সাবলীল এইসব চিৎকার। এতোটা পথ এভাবে ফিরিয়ে দেব বলেই রোজ আমি ঘুরে ঘুরে দেখি, যৌন উত্তেজনা ও যাদুঘর।


২৭ জানুয়ারী ২০১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29316342 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29316342 2011-01-29 00:11:37
মধ্যরাতের কীট - ১৪
ক’ফোঁটা বৃষ্টি আমারও ছিল জমা ঐ আকাশে, দিগন্ত মায়ায়। তোমাকে প্রতিদিনই বলতে চেয়েছি মাটির কথা। কীভাবে শেকড় ছড়িয়ে ছড়িয়ে গড়ে উঠেছে প্রাচীন সখ্যতা। যারা এখানে আসে ক্লান্তি মোচনের আশায়, আমি তাদের মাথার উপরেই মেলে ধরেছি পাতা, আর রক্তের উষ্ণতা থেকে তোমাকে সরে যেতে দেখেছি পুতুলের মেলায়। হয়ত এভাবেই ফিরে আসতে চায় হলুদ রং, নির্বাক চেয়ে থাকা, অথচ যতদূরেই কল্পনা করি না কেন তোমার আলোক-লতা, মাটির গভীর থেকে ডাক দেয় ঘুণপোকা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29313709 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29313709 2011-01-24 23:22:32
আরেকবার-শেষাংশ আরেকবার-প্রথমাংশ

মনে মনে বললাম, সবুজ নয়, বরং এ জাতীয় জিনিস দেখলে চোখের জ্যেতি বাড়ে, মনে শান্তি (অশান্তিও বটে) নেমে আসে, আর হার্টের অসুখ হবার সম্ভাবনা কমতে কমতে একেবারে শূন্যে নেমে যায়। অবশ্য কতিপয় লোকের বেড়েও যেতে পারে, সেটা ভিন্ন কথা। উনারা আশেপাশের খালি চেয়ারগুলোতে বসে কেবল যে চেয়ারগুলোকেই ধন্য করলেন তা নয়, সাথে সাথে বৃটিশ কাউন্সিলকে, আর এ অধম ও তার চক্ষুদ্বয়কেও। এমন সব মুহূর্তে আমার কেন জানি নিজেকে হতভাগা হতভাগা টাইপের মনে হয়। নিদানপক্ষে যদি একটা চেয়ারও হতাম তবে কী এত ঝক্কি ঝামেলা সইতে হত? উপরন্তু এরকম ধন্যতা, আহা, কেন হলো না এমন? কেন একটা চেয়ারও হলাম না ঐ বৃটিশ কাউন্সিলের?

রমণীদিগের দিকে আমি আবার চোখ তুলে মানে সরাসরি তাকাতে পারি না, তারপর যদি হয় এমন পদের, তবে মিইয়ে যেতে থাকি ভেতরে ভেতরে, ফলে চোখ তুলতে সংকীর্ণতা বোধ হয়। কেন জানি মনে হয়, ওদের দিকে আমার তাকানো মোটেও উচিত নয়, আমি তাকালেই ওদের গা ময়লা হবে, সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে, আর ছুঁয়ে দেবার কথা, আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজবিল্লাহ! ও আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।

তাই বলে আবার ভাববেন না একদম তাকাই না, দেখি না। সুযোগ যদি পেয়েই যায় তবে হাত ছাড়াও করি না। তবে তাকালে আগে পায়ের দিকেই তাকাই, প্রথমে দেখি পা। আহা, এমন একেকটা পা, কোন জিনিস দিয়ে যে তৈরী তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন! তবে মাটি মেড না কিরে কেটে বলতে পারি। বারবার দেখতে ইচ্ছে করে, মনে হয় খাই, গোটাই মুখের মধ্যে পুরে দিই! নিদানপক্ষে না পারলে একটু চেটে-চুটে দিই জিভ দিয়ে। এ কিন্তু আমার মনের গোপন ইচ্ছে, বাস্ট করবেন না পিলিজ, মায়ের কানে গেলে মুখও দেখবেন না, বলবে, ‘মেয়েদের পা চাটবি, কুত্তা নাকি?’ কী করি বলুন, দেখে ওরকমেরই একটা ভাব আসে মনে। মানুষ চলাফেরা করলে তো পায়ে ময়লা লাগবেই, কিন্তু যান তো, ওদের পা স্ক্যান করেও যদি এক ফোঁটা ময়লা বের করতে পারেন তো আমার নামে কুত্তা পালবেন। এতটুকু ময়লা নেই, সাদা ধবধবে, যেন দু’টো পবিত্র কিছু সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে মনে বলি, ‘ফেলো না, ফেলো না সখি ওই পা জমিনে, ফ্যালো যদি ফ্যালো সখি আমার পরানে’। আমার কবিতা, মাঝে মাঝে দু’চার লাইন লেখার বদ স্বভাব আছে। না, না, কবি-টবি নই, গরীবের ঘোড়া রোগ আরকী।

খাঁ-পাড়ার জরিনার পা-ও দেখেছি, পোড়া আলুর মতন রঙ, আঙুলগুলো বেটে বেটে, ফাঁকে ফাঁকে আবার পাকই, মানে চামড়া পচা রোগ। এতকিছুর পর সুন্দর করে গোড়ালির চারপাশে ফাঁটা, সেগুলোও কালো কালো, মানে ময়লা ঢুকে আছে। এমন পা চাটা তো দূরের কথা, মনে হলেও গা-টা ঘিন মেরে ওঠে! আর ওদের পা, আহা, সাতজনম তাক আমি ঐ স্যাম্পল মাথায় করে ঘুরতেও রাজি, কোনো কষ্টই হবে না।

এই যে আমার বাম পাশে যিনি বসে আছেন তিনার পা-ও ঠিক ঐ পদের, আর পরেও আছেন এমন টাইট প্যান্ট যে, ভেতরের মাংস ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর তাকে ঠিকঠাক চেপেচুপে রাখতে জান বেরিয়ে যাচ্ছে প্যান্ট বাবাজির। সাথে আবার পরেছেন তারচেয়েও টাইট গেঞ্জি। পা থেকে সারা শরীরের দিকে তাকালে চোখ আটকে আটকে যাচ্ছে, সুপার-গ্লু টাইপের দৃশ্য, চোখ এমন আটকে যাচ্ছিল যে চাইলেও পারছিলাম না সরাতে। শুভদৃষ্টি হয়ে গেলে মনে যে ভাব আসে সেরকম একটা ভাব বয়ে যাচ্ছিল সমস্ত শরীরে। তাই বলে একনাগাড়েও গিলছিলাম না, পাছে কোন ফাঁকে কে দেখে ফেলে, আর কেলেংকারি হয়ে যাক আরকী। নিজে চুপ করে এইসব দেখুন, কোনো শরম নেই, কিন্তু যেই বুঝেছেন আপনার এই চুপচাপ দর্শন আরেকজনও দেখছেন, মানে আপনারই সমগোত্রীয় কেউ, তখন মনে হয় ধরণী দ্বিধা হও আমি প্রবেশিব।

তাছাড়া একবার বেইজ্জতও হয়েছিলাম। সে ঘটনা মনে করে নিজেকে আর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চাই না, কেবল জেনে রাখুন পা দেখার অপরাধে, মানে একটু বেশি দেখার হেতু, এ জাতীয় পায়ের কোনো অধিকারিণী আমার গাল পছন্দ করে বসেন। পরে ভেবেছিলাম এত সুন্দর পায়ের অধিকারিণী হয়েও কীভাবে উনি তা পারলেন? আসলে হুমায়ুন আহমেদ ঠিক-ই বলেন, ‘মেয়েরা সব পারে, সব।’ পারে বইকি, আমার চেয়ে বড় সাক্ষ্য কে দেবে আর?

পায়ের কথা মনে হলেই আমার একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। লেখক, গল্প, কোনোটারই নাম আজ আর মনে নেই, কেবল এটুকু মনে আছে, নায়ক বাবাজি নায়িকার পায়ের প্রেমে পড়ে যায়। সে এক ভীষণ প্রেম! নায়িকার পা ছাড়া আর কিছুই দেখে না, কেবল পা আর পা। পা নিয়েও যে এতসুন্দর গল্প লেখা যায় সেদিন বুঝেছিলাম। আসলে রমণী যদি সুন্দর হয়, তবে তার যে কোনো অঙ্গ নিয়েই অনায়াসে লেখা যায় পাতার পর পাতা, কারণ যিনি বানিয়েছেন তিনি তেমন জিনিস বহুল পরিমাণেই দিয়েছেন তাদের, তবে সেগুলো আমার কাছে পোশাকের আড়ালে থাকলেই ভালো লাগে, বাইরে নয়। একবার, সেই ছোটবেলা দেখেছিলাম পোশাকহীন এক দৃশ্য, আজও মনে হলে গা ঘিন ঘিন করে ওঠে! তো সেই নায়ক বাবাজির আবার ছিল আমার মতো অবস্থা, মানে হাভাতে টাইপ আরকী। অনেক কষ্টে সে যেদিন তার প্রেমিকার পায়ের জন্য একজোড়া সুদৃশ্য নুপূর বানিয়ে নিয়ে যায়, সেদিন কোনো দুঘর্টনায় নায়িকার দুই পা-ই পুড়ে যায়। আহা, কী ট্রাজেডি বলুন?

পা ভালো লাগে বলে যে আমি কেবল পায়েই আটকে থাকি, মোটেও নয়। বিশেষ করে কোনো সুন্দর রমণী একটু-আধটু বেসামাল হলেই আমি পুরোদমে সামাল হয়ে উঠি। এই যে রমণীটির পা দেখছি, যা তিনি মনের আনন্দে নাচাচ্ছেন, সাথে উরুর নধরগুলো, কোমরও কিছু কিছু, আর সমস্ত শরীরসহ বিশেষ অংশও মৃদু-মন্দ, আর উনি বেসামাল হয়ে গল্প করে চলেছেন, ফলতঃ আমি তখন আর পায়ে না থেকে সামাল হয়ে একটু একটু করে উপরে উঠতে থাকলাম। অবশ্য উনারা যে বে-খেয়ালে বেসমাল হয়েছেন আমি মানতে নারাজ। সজ্ঞানে, বেশ সামলে-সুমলে, ভেবে-চিন্তেই মাঝে মাঝে আমাদের দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি-কল্পে তিনারা বেসামাল হয়ে পড়েন। তিনারা চান আমরা বাস্তবিক সামাল হই, যেহেতু তারা বেসামাল হয়েছেন, জেনে শুনে, নতুবা অমন পোশাক পরা কেন?

রাস্তায় যান, আর এখনকার উঠতি যুবতীদের ভালো করে খেয়াল করুন, একশটির নিরানব্বটিই ওড়না পরেছে ঠিক-ই কিন্তু বুক বের করা পুরোদমে, আর ওড়নাটা গলা বেয়ে ঝুলে আছে দু’পাশে। কয়েকজন তো আরেকটু বেশি বেসামাল হয়ে ব্রেসিয়ার অব্দি দেখাতে কসুর করেন না। এই যদি হয় ওড়নার ব্যবহার, বুক না ঢেকে পেছনে ঝোলানো, তবে থাক না, কেন আর বাড়তি খরচা, আমরাও সামাল হই, দৃষ্টিশক্তি বাড়–ক। আর যদি বলেন সুন্দর লাগা, আরাম, মানি না। ওর চেয়েও সুন্দর, আরামপ্রদ পোশাক অনেক আছে, যেগুলো পরলে উনাদের আর বেসামাল হতে হবে না, বরং আমাদের মতো জনেরা সামলে যাবেন নিজে নিজেই।

আজকালকার রমণীগণ কেন যে বোঝেন না সাজ-গোজ সবাইকেই মানায় না, মানায় না উগ্র পোশাক, বরং অতি সাধারণ পোষাকেই তারা হয়ে উঠেন আরও মোহনীয়, আকর্ষণীয় ও ঈর্ষণীয়। তাদের উগ্র পোষাক বড়জোর সুতীব্র কাম জাগাতে পারে, কিন্তু কখনই পারে না বিমুগ্ধ নয়নের স্নিগ্ধতা, পবিত্রতা তুলে আনতে, যা কেবল সাদা-মাটা পোষাকের আভাতেই চমৎকারভাবে প্রতীয়মান হতে পারে। বস্তুত, সত্যিকার সুন্দরীদের কোনো সাজেরই প্রয়োজন হয় না, বরং সাজলেই তারা নিজেদের আরও কুৎসিত করে ফেলেন, নিজে নিজেই। এক্ষণে যদি আপনারা আমায় লম্পট টাইপের ভেবে থাকেন তো অন্যায়, ঘোরতর অন্যায়। লম্পট বলুন তো রহিমকে বলুন, যে একটু-আধটু ভীড়-ভাড় পেলেই হস্তকর্ম করে বসেন রমণীদের নিতম্বে অথবা বক্ষে, আর মনের সুখে কেলিকেলি টাইপ হেসে দাঁত বের করে থাকে আমারই সামনে। কী করি, পেটাব, বলে বসবে, ‘শালা শহিদও তো কাল মেরেছে, যা ওকেও পেটা গিয়ে।’ ক’জনকে আমি একা পেটাব, ওদেরও তো দু’খান হাত আছে, নয় কি?

কিংবা জিসানকে বলুন, যে আরেক ধাপ এগিয়ে। গেলবার ঈদ মার্কেটে, প্রচন্ড ভীড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল আস্ত আলপিন কোনো এক ভয়ানক টাইপের সুন্দরী রমণীর নিতম্বে, আবার এসে আমাকেই শুনিয়েছিল গর্ব সহকারে, ‘দিয়ে এলাম পুরোটাই, শালী কখন থেকে দোলাচ্ছে, সোজা করে হাঁটতে জানো না সোহাগী? এবার দোলাও যত্ত পারো!’ সে এক ভীষণ লজ্জাকর পরিস্থিতি! মার্কেটের এত লোকের মধ্যে মেয়েটির নিতম্বে লাল রক্ত, তার উপর সাদা ড্রেস। সেদিনের পর থেকে এ যাবৎ ওর সাথে কথা বলিনি, মুখও দেখিনি, সে ইচ্ছেও নেই বাকি জীবনে। নিচে নামো, তাই বলে এতো? মা-বোন তো সবারই আছে, তাই বলে এ কোন বর্বরতা?

না, আমি ওসব কোনদিনই করিনি, আমার দ্বারা এহেন নীচকর্ম কোনোদিনই সম্ভব নয়। আমি দর্শক, দেখি কেবল। ভালো জিনিস কে না দেখে বলুন? তাই বলে লম্পট বলতে পারেন না? এই যে পা নাচানেওয়ালীর সামনের জন খিলখিল করে হেসে উঠল, আমি কী তার দাঁতে আটকে থাকলাম না বেশ কিছুক্ষণ? অমন শুভ্র দাঁতে জনাব কেউ যদি আমার কলিজাখানাও কেটে টুকরো টুকরো করতে চায়, রাজি সানন্দে। অমন দাঁত দেখলেও মন ভরে যায়, হাসির কথা না হয় বাদই দিলাম, কেননা তার ইফেক্ট কল্পনা করাও অসাধ্য। এ তো আর খা-পাড়ার জরিনার দাঁত নয়, যে হাসলেই হলদে হলদে দাঁত বেরিয়ে পড়বে, আর গা টা ঘিন ঘিন করে উঠবে হলুদের আভায়!

সবার হাতে হাতে বই, আমার হাত খালি, ভাবলাম, না পড়ি, দুটো অন্তত এনে ধরে রাখি হাতে, নতুবা বেকুব বেকুব আর খারাপ দেখায়। ওমা বই নিতে গিয়ে আরেক হ্যাপা! সব ইংরেজি বই আর কী কী নাম সব একেকটার। অনেক বেছে বেছে জেন অস্টেন-এর একটা কবিতার বই নিয়ে বসলাম। শুরুতেই দেখি লেখিকা পরিচিতি। কী যে ছাই সব লিখেছে, উনি মূলত গল্পকার, স্যাটায়ার, ইরোনি, হিউমার এসব শব্দ, বাপরে বাপ! আপনারা তো এরই মধ্যে দেখেছেন আমার ইংরেজির পাওয়ার। এ জাতীয় ইংরেজি আমার ধাতে কুলোয় না, দু’চারখান দাঁত যা আছে তাও যাবে। আমার দৌড় আপেল, বল, আই এ্যাম গোয়িং, ইটিং, স্লিপিং ঐ পর্যন্তই। রেখে দিলাম ভয়ে।

এরই মাঝে একজন লোক এসে বলে গেল, ‘আপনারা কে কে এসেছেন সেমিনারের জন্য?’ যাক বাংলাতেই বলেছে, না হলে বুঝতেই পারতাম না হয়ত, পা আর দাঁতের ইফেক্ট একটু বেশি হয়েছিল। আমি প্রেজেন্ট দেয়ার মত হাত তুললাম, দেখি আর কেউ তোলেনি আমি ছাড়া, বেকুবি কাজ-কারবার! তাড়াতাড়ি নামিয়ে নিয়ে হাঁটা দিলাম দেখিয়ে দেয়া হলরুমের দিকে, যেখানে মিলাদ-মাহফিল, না মানে সেমিনার হবে।
গিয়েই দেখি সেখানেও বসে আছেন আরেক রমণী। সুন্দরী না হলেও সুন্দরীই মালুম হল। আমাকে জিঞ্জেস করল সেমিনারে কী না? আমি মাথা ঝুকিয়ে এগিয়ে গেলে বসতে বলল তার সামনের চেয়ারে। বসলাম বাধ্যানুগতের মত। বিশ্বাস করুন, রমণী যখন কথা শুরু করল কানে যেন গরম লাভা পড়তে লাগল। চেহারা দেখে মনে করেছিলাম বাঙালি, কারণ আমাদের মার্কাটা খুব বেশি করে চেনা যায় কী না, কিন্তু এ কী, এ যে বাংলার ব-ও জানে না, তাও আবার একটু থেমে থুমে, সোজাসাপ্টা বললে, দু’একটা শব্দ হলেও ধরতে পারতাম, কিন্তু যে স্পীড আর স্টাইলড প্রোনাউনসিয়েশনে ইংরেজি শুরু করেছে, তাতে আমার বাপ-দাদার আমলেও কেউ যে আছে বা ছিল তা বোঝার, বিশ্বাস হয় না! মাগো মা ডেকে বুঝে যাবার ভান করতে লাগলাম, আর মাথাটা নাড়িয়ে যেতে থাকলাম সবই বুঝছি ভাবে। একটা বই এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘হুইচ ওয়ান ইউ ওয়ান্টেড টু স্টাডি’, মানে কোন বিষয়? মনে মনে বললাম, কোন শালা পড়তে এসেছে, মাজব তো থালা, চাই ভিসা, আর যদি সে উছিলায় লেগে যায় হাজার পাউন্ড। কিন্তু কিছু তো বলতেই হবে, তাই খুঁজে খুঁজে দেখালাম কম্পিউটার সাইন্স।

উনি বইটির আরেকটি পাতা দেখিয়ে আমায় পড়তে দিলেন, কী বিপদ বলুন তো? ও টাইপের ইংরেজি আমার সাধ্যে কুলোবে না। বিএসসি পাস করেছি টুকে, বিদ্যে এগোয়নি তেমন, তারপরও পড়ার ভান করে কিছুক্ষণ ওপর থেকে নিচে চোখ বুলিয়ে অনেক কষ্টে গোটা চারেক শব্দ জোড়া দিয়ে বললাম, ‘টিউশন অ্যান্ড অ্যডিমিশন ফি?’

- ইট উইল কষ্ট অ্যারাউন্ড এইট থাউজেন্ড পাউন্ড। এমোঙ্গ দেম ইউ হ্যাভ টু ডাউনপেমেন্ট দু থাউজেন্ড পাউন্ড অ্যাজ অ্যাডমিশন ফি, অ্যান্ড ওয়ান থাউজেন্ড স্টাইপেন্ড উইল বি ডিডাকটেড ফ্রম দি টোটাল কস্ট। সো ইট কামস আফটার ডিডাকসন অব স্টাইপেন্ড সেভেন থাউজেন্ড পাউন্ড অল টুগেদার।

না, এবার বুঝেছি, ভালো করেই বুঝেছি। টাকা পয়সার কথা আমি বেশ ভালই বুঝি, তা সে যে ভাষাতেই বলুক, আর তা যদি হয় দেবার, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। শোনার সাথেই সাথেই মনে হল কাছে-পিঠে কোথাও বাজ পড়ল। ছোট ভাইটা পাশে থাকলে বলতাম, ‘ভাই একটু ক্যালকুলেটরে চাপ-চুপ মেরে দেখ না কত আসে?’ একহাজার পাউন্ডের হিসাব করতে পারিনি মুখে মুখে, আর সাত হাজার পাউন্ড! মাথাটা ঝিম মেরে গেল, মনে হল পড়ে যেতে পারি! একহাজার দেবে ঠিকি, মানে কথা ঠিক আছে, কিন্তু আমাকেও দিতে হবে আরও সাত। সাত দাও এক নাও, বড় সোজা হিসেব। টাকা গাছের ফল পেয়েছ, চাইলেই মিলবে? হালিমের কথা মনে পড়ে গেল, ‘অত লালি আধ সের না’, তা তো নয়-ই, এক সের কিংবা বেশিই হবে।

কষ্টে-সৃষ্টে কোনোমতে শেষ ইংরেজি থ্যাংক ইউ কী ভি বলে চলে এলাম। বাইরে এসে দেখি, ওমা বৃষ্টি শুরু, বিশ্বাস হচ্ছিল না! এই না চকচকে আকাশ দেখে গেলাম, তার মানে বাজ হয়ত পড়েছিল। তখনও ভাবছিলাম আট হাজার পাউন্ড, এক হাজার ডিসকাউন্ট, বাদ-সাদ দিয়ে সাত হাজার। সাত হাজারে বাংলাদেশি কত টাকা? একপাউন্ড সমান কম করে হলেও এই বাজারে ১৩০ টাকা। তাহলে সাত হাজার পাউন্ড সমান? না পরিনি। একদিকে হিসেব মেলাতে না পারা, তার উপর আবার হঠাৎ বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতেই উঠে গেলাম দু’নম্বর বাসে। বাসে উঠেই গা টা গুলিয়ে উঠল!

একটানা রোদের পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে এক ধরনের ভ্যাপসা গরম লাগে, বড় অস্বস্তিকর এ গরম, সহ্য হয় না। তখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল একহাজার বনাম সাত হাজার পাউন্ড। হঠাৎ দেখি বাসের মধ্যে গন্ডগোল শুরু হয়েছে ফ্যান চালানো নিয়ে। সে কী চিল্লা-চিল্লি! ‘অই এ ফ্যান ছাড়, অই এক নম্বরটা চালা, ফ্যান নষ্ট, তাইলে সবগুলা বন্ধ কর, টাকা নেবার বেলা তো কম নেস না, চালা বলছি!’ পাশে যে লোকটা বসেছিল তার ভেজা জামা আমার গায়ের সাথে ঠেকে সে আরেক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! না পারি বলতে সরে বসতে, না পারি নিজে সরে বসতে, জায়গা কম লাগালাগি হবেই হবে। বাম পাশের লোকাটা এত জোরে জোরে চিল্লিয়ে কথা কাটাকাটি করছে হেলপারের সাথে যে, কানের পর্দা এই ফাটে তো সেই ফাটে!

বৃষ্টিতে সপসপে হয়ে ভিজে সামনের দিকে দু’জন মোট-সোটা থলথলে টাইপের রমণী উঠেছেন, সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একজন পিছন ফিরে আরেকজন একটু ক্রস হয়ে। নিতম্ব ও বুকে ভেজা কাপড় সেঁটে বসে আকার খুব স্পষ্ট করে তুলেছে! সবার চোখ গিয়ে আটকে আছে ভেজা বুক আর নিতম্বে, গিলছে গোগ্রাসে! চোখটা নামিয়ে নিলাম, ভেতরটা কেমন জানি গুমরে উঠল! পেছনের এক লোক সামনের একজন বয়স্ক লোককে তুমি করেই বলে ফেলল, ‘এ্যাই, জানালাটা একটু টেনে দাও না, বাতাস আসবে।’

মেজাজটা এবার খিচড়ে গেল, গাল বরাবর একটা লাগাব বলে পেছন ঘুরতেই কারও মুখের পচা দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগতেই বমি চলে এলো গলার কাছে, কেবল উগলে দিতে যা বাকি! গরম, চিল্লা-চিল্লি, গায়ের সাথে সেটে থাকা অন্যের ভেজা জামা, নারীর ভেজা শরীরের দিকে লালায়িত দৃষ্টি, মুখের দুর্গন্ধ ক্রমে বাড়তে বাড়তে এমন এক নারকীয় পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলল যে, সবাইকে ফেঁড়ে-ফুঁড়ে নেমে পড়লাম বৃষ্টিতে বিচ রাস্তায়। কোথা থেকে খুব শীতল বাতাস এসে গায়ে লেগে সমস্ত শরীর, মন-প্রাণ জুড়িয়ে দিল! নিমিষেই ভুলে গেলাম এক-সাতের হিসেব, ভেজা জামা, রমণীর শরীর, লালায়িত দৃষ্টি, হানাহানি, ঝগড়া, মুখের দুর্গন্ধ, কেবল একটা প্রশান্ত ভাব ও অদ্ভুত রকমের ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকলাম, আর আনমনে নিজেকে বললাম, ‘আরেকবার ট্রাই করা যাক, কেমন?’


অরণ্য
ঢাকা, বাংলাদেশ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29309906 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29309906 2011-01-18 20:02:03
আরেকবার-প্রথমাংশ
ছোট ভাই হাসল, মানে যা বুঝল বা বোঝাতে চাইল, তার তোয়াক্কা না করেই কান পেতে রইলাম, আর তড়িৎ ও যা বর্ষণ করল, তাতে নির্দ্বিধায় গেয়ে উঠলাম, ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো..!’ হায় মাবুদ, এ যে মেলা টাকা, বাপের জন্মেও দেখিনি! আজতাক যা করেছি তা গুন অথবা ভাগ, তাও খাতা-কলমে। আমার বিস্ফোরিত চোখ আর খুশিতে মাখো মাখো মুখ দেখে ছোট ভাইটা আরেকবার তার প্রথম হাসিটা প্রসারিত করে খবরের কাগজের ঐ অংশে চোখ বুলিয়ে এই বলে চলে গেল, ‘যা যা, দেখ না, মার একখানা ট্রাই, যদি লাইগা যায়।’ আমি সায় দিয়ে বলি, ঠিক কথা, বলা তো আর যায় না, যদি বলে একটা অদৃশ্য নদী তো থেকেই যায়। একবার ট্রাই মারতে দোষ কোথায়? জীবনে তো অনেক ট্রাই-ই বিফল মারলাম, তবে আরেকটাতে দোষ কোথায়?

খবরের কাগজের বিঞ্জপ্তিটা ছিলো ‘গ্রিনউইচ ইউনিভার্সিটি অব ইউনাইটেড কিংডম’-এ পড়ার সুবাদে ১০০০ পাউন্ডের বৃত্তির ফাটাফাটি অফার। যারা পড়তে ইচ্ছুক সেখানে, তাদের সেমিনারে যোগ দিতে বলা হয়েছে। তারিখ ও ভেন্যু, ৪ঠা জুন, চট্টগ্রাম বৃটিশ কাউন্সিল।

অনেক শুনেছি এইসব সেমিনার-ফেমিনারের কথা। আশেপাশের অনেক নর-নারীকেই যেতে দেখেছি, শুনেছি তাদের মুখেও, এমনকী অনেকের বিদেশ গমনকালে এয়ারপোর্টে ৫০ টাকায় টিকিট কেটে শুধুমাত্র হাত উঁচিতে একবার বিদায় সম্ভাষণ জানাব বলেও বসে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু ভেতরের ভ্যান্তটা জানা হয়নি বা নিজ গিয়েও কখনও যোগ দিইনি তেমন কোনো সেমিনারে। মনের মধ্যে আশার পায়রা বাকুম বাকুম করতে থাকল! ধন নাই, মান নাই, যা আছে তাও এই গেলো তো, সেই গেলো হালাত, রিক্সার হাতলের অপেক্ষায় থাকা, আর এর মধ্যে যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা হল খান ছ’য়েক মোটা মোটা টাইপের হলদেটে কাগজ। অবশ্য বিশেষ যত্ন-আত্তি করেই সেগুলো রাখা, আর কোনোদিন যেন তাহাদের গায়ে আঁচড়টি না পড়ে, এই মহান ব্রতে প্রতি হলুদ খন্ডে ৩০টাকা দরে সেঁটে দিয়েছি প্লাস্টিক জন্মের মত। রোদ, বৃষ্টি, তেলাপোকা কিংবা উঁই, সেফটি শতভাগ। আমার বুদ্ধিটা যে সত্যিই ভালো এই চরম বিশ্বাস থেকেই সেই পদক্ষেপ নেয়া।

কিন্তু আমার আশার ভরাডুবির প্রথম দুঃসংবাদটা এলো সেই মহান বুদ্ধির ফলেই, মানে ঐ প্লাস্টিক। পরদিন কাগজে দেখলাম লিখেছে, যারা বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক অথচ সার্টিফিকেট লেমিনেটিং করা, তাদের নাকি হাইকমিশন ভিসা দিচ্ছে না, কারণ সার্টিফিকেটের সত্যতা নাকি ঠিকমত যাচাই করা যাচ্ছে না। নকল সার্টিফিকেটে বাজার সয়লাব, কথা সত্য, তাই এই ব্যবস্থাপত্র। যদিও আমারগুলো আসল-ই, এবং আমি পড়তেও যাচ্ছি না। বাইচান্স স্টুডেন্ট ভিসা এক-আধখান পেয়েই যাই, তবে থালা-বাসনই মাজব বলে ঠিক করে রেখেছি, তারপরও বুকটা ছ্যাত করে উঠেছিল! কারণ লেমিনেটিং তো করিয়েছি পার পিস ৩০ টাকা করে, কিন্তু তুলতে নেবে ৩০০, তাও নাকী সার্টিফিকেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এও কি প্রাণে সয়? জান স্বীকার মাগার একখন্ড হলুদ কাগজের চুল পরিমাণ ইধার-উধার হতে দেব না। শালার মরণ আর কারে কয়? ৩০ টাকার জিনিস তুলতে ৩০০, ঢোলের চেয়ে বাজনাই বেশি। মরার আগে জানলে কোন শালা করে ঐ কুকর্ম, জাহান্নামে যাক সার্টিফিকেট! মাঝে মাঝে যে বুদ্ধিতে মার খাই না তাও নয়, খাই, ভালোভাবেই খাই, তারপরও বুদ্ধি করতে ছাড়ি না।

যা হয় হোক ভেবে সাহস বাঁধলাম, কারণ হলুদ কাগজগুলো তো আর যা তা জিনিস নয়, ঐ যে আমার অন্ধেরযষ্ঠী, কারণ ওতে আমার তিন তিনখান প্রথম শ্রেণীতে পাস দেয়ার ঘোষণা করা আছে। ও না হলে প্রমাণ করব কী দিয়ে? মুখের কথা যতই সত্যি হোক না কেন, কোনো শালাই কান করবে না, মাগার যত মিথ্যাই হোক কাগজ-কলমে থাকলেই হলো, সে মিথ্যাকে ইহকালে কেহই বলিবে না যে তাহা মিথ্যা। শেষ-মেষ মনকে বুঝ দিয়ে ঠিকঠাক করে ফেললাম যাত্রা। দরকারি-অদরকারি সব কাগজ পত্তর ফটোকপি করলাম, আসল ছ’খানও সাথে নিলাম, আরও নিলাম ৩কপি টাইবান্ধা ফুলবাবু টাইপের ফটো, আর বালিশের তলায় রাতে রাখা পেনটুন-জামা পরে রেডি হলাম। বালিশের তলায় মানে একটু ভাঁজ হয়ে গিয়েছিল দু’তিন জাগায়, অনেক আগে ইস্ত্রি করা তো, ট্রাঙ্কে তোলা ছিল তাই এক্সট্রা খানকয়েক ভাঁজ মেরেছে। তাছাড়া কে আবার করবে অত লাফড়া? এই বাজারে ইস্ত্রি করা জামা-কাপড় পরার চেয়ে বিষ খাওয়াও বেশ সস্তা, তাই ঐ বুদ্ধি। বুদ্ধি থাকলে অনেক কিছুই হয় ব্রাদার।

একবার অবশ্য এ বুদ্ধি খাটাতে গিয়েও মার খেয়েছিলাম। সেবার যাব একটা ইন্টারভিউ দিতে, একখান-ই জামা, সকালে ইন্টারভিউ। ইস্ত্রি করাই ছিল, দু’তিন জায়গায় একটু ভাঁজ পড়েছিল দেখে মায়ের কথা না শুনেই বালিশের তলায় দিলাম রাতের বেলা শোবার আগে। মাঝরাত্তিরে দেখি ঘুমের মধ্যে পরীবানু এসে হাজির, কিরে কেটে বলছি, পরনে যদি একখানও সুতো থাকে মাগীর! তারপর কাঁধের কাছে আবার একখান কালো কুঁচকুচে তিল! সকালে দেখি পরীবানু আমার জামাটার হ্যাস্ত-ন্যাস্ত করে গেছে, দুইখান ভাঁজ বুদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে শ’দুয়েক ছাড়িয়ে গেছে। পরীবানুকেও মনে মনে বলিয়াছিলাম, ‘হায় আমার বানু, কেনই বা তুমি আসিলে, আর আসিলেই যদি তবে কেন এমন তরো করিলে? বানু আমার, তোমরা চিরটাকালই কি আমাদিগের সহিত এমন করিবে? (...মাগী)’!

তবে সেটা দৈব-দুঘর্টনা মাত্র, পরীবানু অমন করে না এলে বুদ্ধিতে মার খেতাম না। এবার অবশ্য তাহাদের কেউ আসেননি। আবহাওয়া বেশ খারাপ, চারিদিকে আগুন, তাই বানুদের বুদ্ধি খুলেছে, দীর্ঘ বেকারদের স্বপনে আজকাল তিনারা আসা-যাওয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। ‘না-কাম’, মানে অকর্ম মরদের স্বপনে আসা হলো গিয়ে আপনার গুনাহে কবীরা। সবচে বড় গুণা, মাফ-টাফ কম টাইপের আরকী।

সেমিনার বিষয়ে প্রথম প্রথম আমার মনে একটা খটকা ছিল। যখন শহরে আসি আর প্রথম ঐ জিনিসটার নাম শুনি, তখন কিছুই আঁচ করতে পারিনি। মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম, গ্রামে থাকতে আমরা যেমন গ্র্রামের লোকজন একসাথে জড়ো হয়ে মিলাদ-মাহফিল, বিচার-আচার কিংবা শলা-পরামর্শ করতাম, ঐটিকে যদি গ্রাম্য সেমিনার মনে করি তবে এখানেও ঐ রকমেরই কিছু একটা হবে হয়ত, কেবল ফারাক পোশাক-আশাক আর মানুষে। আরও একটা ফারাক হয়ত থাকবে, আমরা করতাম খোলা আকাশের নিচে, আর এরা করে সাজানো-গোছানো সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং-এর ইয়া বড় বড় হল রুমে।

দেড়টা নাগাদ শুরু হওয়ার কথা ছিল সেমিনার, পৌনে একটাতেই বেরিয়ে পড়লাম, পাছে দেরি-টেরি যদি হয়ে যায়, যদি বলে, ‘আপনি তো দেরি করে ফেলেছেন, মানে লেট, ঢোকা যাবে না, চলে যান’, তখন বড় বেইজ্জত বেইজ্জত লাগবে। ঝুঝলেন ভাই, এ বাজারে বাইরে বের হওয়াই দায়, যেই বের হবেন আর যদি হোন আমার মতো, মানে হাভাতে অথবা অকর্মা টাইপের, অমনি হোচট খাবেন। মাঝে মাঝে মনে হয় কোনোদিন রিক্সায় চড়ব না, বলে কিনা চৌমুহিনীর ভাড়া ১৫ টাকা। বাপের জন্মেও শুনিনি! অনেক কষ্টে ১০ টাকায় রফা করে রওনা দিলাম আল্লাহ-বিসমিল্লা বলে, গরীবের আর আছে কী আল্লা ছাড়া?

আকাশ একদম চাকা-চাক ক্লিয়ার, কোথাও এতটুকু মেঘ নেই, ঝলমল করছে সূর্য্যি মামা। বর্ষা-বাদলার দিন তবুও মালুম হচ্ছিল মেঘকন্যা আজকের দিনটা অন্তত বেজার হবেন না অযথা। বেজার হলো গিয়ে আপনার মন খারাপের খাঁটি গাইয়া ভাষা, ও আমি টাংগের সিলিপ হেতু মাঝে মাঝেই হিউজভাবে ইউজ করে ফেলি। কয়লার ময়লা কি ধুলে যায়, পড়েননি ছোটকালে?

আল্লার উছিলায় ভালোই ভালোই আধাঘন্টা আগেই গিয়ে পৌঁছুলাম বৃটিশ কাউন্সিলে। গেটের কাছে যাবার আগে আরেকবার জামাখান ডাইনে-বামে গুজে দিলাম মধ্যে, আমার আবার মধ্যে মানে আপনার ঐ যে ‘ইন’ করা না কী যেন বলে সেটা আরকী, মোটেও ঠিক থাকে না। ভেতর থেকে কে যেন ঠেলে ঠুলে বের করে দেয় বারবার! খাস টাইপের চাষাদের সাথে জামা বাবাজি হরহামেশাই ওরকম আচরণ করে। লুঙ্গি পরা গতর তো, তাই বারবার গুজি, বারবার বের হয়ে আসে। বহুত কষ্টে আজ তাও রেখেছি মধ্যে, অল্প-স্বল্প যা বেরিয়েছিল তাই গুজে-টুজে দিলাম। শুনেছি বিদেশীরা খুব ফিটফাট হয়। ঝকমকে জুতো, চকমকে জামা, গা-গন্ধ করা বাসনা, সরি, মানে হলো গিয়ে খুশবু, তাই নিজেকেও খানিকটা গুছিয়ে নিলাম মধ্যে দিয়ে বালিশের তলার জামাখান টেনেটুনে। বের হবার সময় একবার মনে হয়েছিল আমিও একটু খুশবু-টুসবু মারি, কিন্তু বাড়িতে আতর ছাড়া কিছুই নেই, ঐ মেরে কি বেরুনো যায়, বলুন?

গেটের কাছে গিয়েই বুকটা ধক করে উঠল, হায় আল্লা! তাকিয়ে দেখি সমদ্বিবাহু ত্রিভুুজের মত চেকিং গেট আর আমাকে ঐ বাবাজির পেটের ভেতর দিয়েই যেতে হবে। এই গেটের একটা ভীতি কিন্তু আমার এখনও পরোপুরিই আছে। সে একখান বলার মতো ঘটনা।

বছর দু’য়েক আগে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকে ঐরকম একটা গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়েই বে-আক্কেল হয়েছিলাম ভীষণ, মান-ইজ্জত নিয়ে সে কী টানাটানি। ব্যাংকে গিয়ে দেখি সবাই ঐ রকম গেটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আমাকেও যেতে হবে, তাই এক পা দু’পা করে যেই আমি গেট পেরিয়েছি দেখি ঐ গলিটার মাথার লালবাতি জ্বলে উঠেছে আর কেমন যেন শব্দ শুরু করেছে। আমি তো আক্কেলগুড়ুম, ভাবলাম গ্রাম থেকে এসেছি বেটা বোধ হয় টের পেয়েছে। নিশ্চয় শহরের মানুষ ছাড়া কেউ ওদিক দিয়ে যেতে পারবে না। কী কান্ড, এদিক-ওদিক বোকার মত তাকাতেই দেখি ধর ধর করে গোটা পাঁচেক সিকিউরিটিগার্ড চারপাশে এসে হাজির। পাকড়াও, বলে, ‘কি আছে আপনার কাছে, বলুন?’ আমি তো মহা বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে! ভাবছিলাম, না তাহলে গ্রামের মানুষ ভেবে ধরেনি, কিন্তু আমার কাছে আবার কী আছে? কেউ আবার চুপচাপ কিছু রেখে-টেখে দেয়নি তো পকেটে? আমি তো কিছুই আনিনি, দুইটা নেভি সিগারেট বুক পকেটে, বাম পকেটে একটা রুমাল, ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় ছোট খালা দিয়েছিল তাও বছর আটেক আগের কথা, মাঝখানে অনেকখানি ছিঁড়ে গেছে। এছাড়া পেছনের পকেটে মানিব্যাগে খান তিরিশেক টাকা আর ডানদিকের পকেটে একটা গ্যাসলাইট, গত পরশু ফুটপাত থেকে কেনা। চারটাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল, বেশ সস্তা মনে করেই নেয়া। এছাড়া আর কিছুই নেই, কী দেখাব ওদের? ঐসব কি দেখানোর জিনিস হলো, নাকি ছেঁড়া কিছু নিয়ে ব্যাংকে ঢোকা যাবে না কিংবা সিগারেট। না, না তা হবে কী করে, কিছুক্ষণ আগেই তো গাড়ী থেকে নেমে রাজপুত্তুরের মতো একজন সিগারেট টানতে টানতেই ঢুকে গেল। এ আবার কী মসিবত? হে আল্লা কোথায় নিয়ে আনলে এই চাষারে?

কালো একটা ডান্ডা মাথার দিকে গোল, নিয়ে কেউ একজন আমার শরীরের চারপাশে সবখানে ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে দেখতে লাগল, লোকজন দেখি আমার দিকে তাকিয়ে, যেন আমি চিড়িয়াখানায় আনা নতুন স্যাম্পল কিংবা বিচ রাস্তায় ধরা পড়া পকেটমার। বেইজ্জতির একশেষ! হঠাৎ দেখি আমার ডান পকেটের কাছে এসে কালো ডান্ডাটা লাল বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে! বুকের কাছে ধক করে উঠল, হায় কে কী রেখেছে এখানে? আমি তো জানি না! কার হাত থুয়ে কার পা ধরব? ব্যাংকে এসেছি আরেকজনের বেয়ারিং চেকের টাকা তুলতে, শেষে না আবার জেলে ভরে দেয়। আল্লাকে ডাকলাম বাঁচাও, তুমিই মহান, সর্বশক্তিমান, জেল খাটাদের খাতায় নাম তুলিয়ো না, মা আমার হার্টফেল করে মরবে। বারবার নিজেকে গালি দিলাম, আসার সময় কেন একবার চেক করে নিলাম না পকেট? হাট্টা-গাট্টা মতন একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘কি আছে পকেটে, দেখান, প্লিজ ?’’

আমি আমতা আমতা করে আল্লা-রসূলের নাম নিয়ে পকেটে হাত চালিয়ে দিলাম আর বেরিয়ে এলো দুটো কয়েন আর গত পরশুর কেনা চারটাকা দামের গ্যাসলাইটার। ওরা হেসে বলল ‘যান আপনি, ধাতব পদার্থ সাথে থাকলে মেশিন ওরকম এলার্ট দেয়।’ মনে মনে বললাম, ‘রাব্বুল আলামিন বাচাইছো, দু’রাকাত নফল নামায পাওনা রইল তোমার’, কিন্তু সাথে সাথে মেজাজটাও গেল খিচড়ে! শালার মেশিন চোর-ছেঁচড় চিনো না, চেন চারটাকা দামের লাইটার! আমি কি ঐ টাইপের, খানকীর পুত, খবিসের বাচ্চা! গাও-গেরামের মানুষ চুরি-চামারি করে না, যারা করে তাদেরই তো সিগনাল না দিয়ে ছেড়ে দাও ধন, আর সাধারণ পাবলিক এলেই জ্বলে ওঠো! আচ্ছা করে গাল লাগালাম, কবে যে ঠিকঠাক চোর-চাট্টা ধরার পারফেক্ট মেশিন আবিস্কার হবে, হলে দুনিয়ার হাল হকিকত কিছুটা হলেও বদলানো যেত।

আজও বুকটা ঢিপ-ঢিপ করে উঠল সেই একই রকমের গেট দেখে, তাছাড়া আজও সেই লাইটারটা সাথেই আছে। কী করি বলুন, সেই অষ্টম শ্রেণীতে বিড়ি দিয়ে শুরু করে অভ্যাস এমন রপ্ত করেছি যে, সাথে লাইটার না থাকলে ভেতরে ভেতরে কে যেন খোঁচায়, আর দোকানে গিয়ে অথবা লোকের কাছে আগুন চাইতেও শরম করে, মনে হয় ওরা যেন পেছনে বলাবলি করে, ‘বাবা বিড়ি খাও আর আগুন নাই। বাতি তো জ্বালাবে কিন্তু আগে সলতে তো লাগাবে, না কী?’ যাক এসেছি যখন তখন না দেখেও যাব না, আর লাইটারও ফেলব না, যা হয় হবে। ন্যাড়া বাবাজি দুবার বেলতলা যায় না, কিন্তু আমার মতন ন্যাড়ার কোন গতি নাই না গিয়ে। আল্লা-বিল্লা করে গলিয়ে দিলাম দেহখানি। না বাবা, মেশিন শব্দ করেনি, মেশিনও তাহলে মাঝে মধ্যে দয়া পরবশ হয়। গলে গেলাম একেবারে ভেতরে। কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা ভেতরে ঢোকার গলি পেরিয়ে সামনের ঘরে। কী সব গেট, ইয়া বড় বড়, আর বেবাক কাচের !

ঢুকেই চোখ কপালে! হায় মাবুদ, এ কোন জায়গায় এলাম? সামনে ডানপাশে অভ্যার্থনা টেবিল। কারা ওরা? এ আবার কোন পদের যুবতী? চামড় তো ফর্সাই, গায়ের রোম অব্দি ফর্সা, আছে কী না মালুম হয় না, ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগবে পরখ করতে। আমার দেখা সেরা ফর্সা মেয়ে ছিল খা’পাড়ার জরিনা। জরিনা সত্যিই দুধে-আলাত টাইপের ফর্সা। গোটা গ্রামে সে একখান-ই পিস, কিন্তু এরা তাহলে কী? আর জরিনার গায়ে সে কী লোম! একবার পা দেখে-তো আমি আঁতকে উঠেছিলাম, আমাকেও ফেল মারিয়ে দেবে, যেন ঘনকালো অরণ্য। অথচ মাথায় পায়ের চারআনাও যদি থাকে। যে জিনিস যেখানে দরকার সেখানে না থেকে বেজাগায়।

বেশিক্ষণ তাকালাম না। একটু দাঁড়িয়ে থেকে, এক পা দুপা করে এগিয়ে গেলাম টেবিলের দিকে, আর মনে মনে ভাবছি বাংলা বলব না ইংরেজি। যদি বাংলা বলি আর আমাদের গ্রামের মেরাজের গল্পের মতন হয় তাহলে, মান-ইজ্জতের সওয়াল।

একদিন আমরা গ্রামের বন্ধুরা সবাই বসে আড্ডা মারছি, হঠাৎ মেরাজ বলে ওঠে, - ‘জানিস আল্লাই বাঁচাছ’!

আমরা সবাই অবাক হয়ে বলি, -কেন রে কী হয়িছ?

-ও কধা আর বুলিস ন্যা, বহুত ভাগ্য ভালো হলে এমুন বিপদ থাকি বাঁচে মানুষ!

আমরা আরও তাজ্জব হয়ে বলি, - কী রে কী হয়িছে বুলবি তো?

-আরে জানিস তো আমি শালার ইংরেজিডা একদম বুলতে পারি না। ভাবি দেখনু আল্লা আমাক যদি ইংল্যান্ডে জনম দিতক, তাহিলে কী হতক অবস্থাডা একবার ভাবি দেখ। ইংরেজি বুলতে না পারার ক্যানে আমাক সবাই মিলি মারিই তাড়া দিতক। বুলতক ইংরেজি জানে না, শালাক মারি তাড়া দে! যাক বাবা বাঁচা গেছ, এ জাগাত জন্মাছুন, না হলে হেরা তাড়া দিলে যাতুক কতি? কী বাচাডাই বাচিছি, তুরাই বুল?

শুনে তো আমাদের হো হো হাসি! এখানেও ভাবছি বৃটিশ কাউন্সিলে এসেছি, আর যদি ইংরেজি বলতে না পারি তাহলে যদি বের করে দেয়? আর বলবই বা কি, জানলে না।

একটু বুদ্ধি খাটালাম, চালাকি করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কেবল বললাম, ‘এক্সকিউমি!’ আহা কী নয়ন গো, কলিজা চাওয়ামাত্র ফালা ফালা করে আট ফালা করে দিল মাইরি! আমি তারপর খালি বললাম, ‘গ্রীনউইচ ইউনিভার্সিটি সেমিনার?’

জানতাম কাজ হবে, রমণী আমার মুখ খুলেছে। একটু আলতো হাসি হেসে স্বর্গীয় শুভ্র দাঁত বের করে অতীব সরল ইংরেজিতে যাহা বলল তাতে যথাযথ না বুঝলেও এটুকু বুঝলাম, এখনও দেরি আছে সেমিনারের, আমি সানন্দে গিয়ে বসতে পারি লাইব্রেরি রুমে। একটা থ্যাংক ইউ কী আই মেরে হাঁটা দিলাম সামনে পানে, মানে বইঘরে।

তাজ্জবের যেন শেষ নেই! এখানে এসেও সেই একই হালাত, মনে মনে ভাবলাম এ আবার কোন জায়গা? একেক জায়গায় একেক চমক! এরকম জায়গায় আগে কখনও ঢুকেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তবে এরকম টাইপের অবাক হয়েছিলাম আরেকবার, এখনও মনে আছে। সেবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ঢুকেছিলাম। ঢুকে এত বেশি বিস্মিত হয়েছিলাম যে, মনে হয়েছিল আমি নির্ঘাৎ স্বর্গের কোনো অংশে প্রবেশ করেছি। একটা আলাদা গন্ধ ছড়িয়ে ছিল পুরো লাইব্রেরীর বিশাল হল জুড়ে। না, খালি বইয়ের গন্ধ না, জ্ঞানেরও গন্ধ, যেগুলো অক্ষরের আকারে অত-শত বইয়ের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। জ্ঞানের গন্ধের আলাদা একটা জাত আছে, নাকে এলেই বুঝি।

আজ আরেকবার হলাম। ডানে বই, বামে বই, বই আর বই। এরকম জায়গায় এলে মনটাও বই বই হয়ে যায়। ঢুকতেই একপাশে ফুল ফুল বাবু টাইপের কিছু যুবক দেখি কানে মোটা মোটা গোল টাইপের কালো কী যেন লাগিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে আছে। কোনো শব্দ নেই তারপরও মনযোগ সহকারে তাকিয়ে টিভি দেখছে। আর একটু আগিয়ে দেখি আরও কিছু ফুল বাবুরা দেয়ালে টাঙানো বড় বড় বাঁধানো ছবির মতন কাচ, যা একটা পায়ার ওপর রাখা, তার মধ্যে কী যেন দেখছে। প্রথমে তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম, এ আবার কোন জিনিস? পরে বুঝেছিলাম ওগুলো কম্পিউটারের টিভি। তাছাড়া হবই বা না কেন? আমি যে ধরনের কম্পিউটার টিভি দেখেছি সেগুলো মোটেও ওরকম নয়। ওগুলো ছিল বড় বড় আর পেছনের দিকে লম্বাটে। এ জাতীয় জিনিস আমার গ্রামের বাড়িতে ছিল আমার ঘরে, মক্কা শরীফের ছবি, ভালো করে মোটা কাঁচে বাধানো। প্রথমে তো আমি তাই মনে করেছিলাম, পরে বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝেছিলাম যে, ওগুলো আসলে কম্পিউটারের আধুনিক টিভি।

আর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে কতগুলো ছেলে দেখি ঐ টিভির সামনে বসে থাকা ছেলেদের মত কানে একই রকমের জিনিস লাগিয়ে হাতে একটা সুইচ ধরে সামনে রাখা ক্যাসেট প্লে¬য়ারে একবার ঢুকাচ্ছে আর বের করছে, তারপর চুপচাপ খাতায় কী যেন টুকছে। সে এক কান্ড বটে, দেখতেও ভালো লাগছিল। অনেকক্ষণ দেখার পর বুঝলাম ওরা কিছু একটা শুনে লিখে নিচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছিল আমিও একবার কানে লাগিয়ে দেখি কী শুনছে ওরা, কিন্তু বের করে দেবার ভয়ে সাহস করতে পারলাম না, কারণ আমার মাথায় তখনও আছে এক হাজার পাউন্ড, যদি লাইগা যায়। এদিক-ওদিক তাকালাম, কত্ত ছেলে-মেয়ে, গোটা রুম ভর্তি মানুষ তবুও টু শব্দটি নেই কোথাও। মসজিদেও এত নিঃশব্দতা থাকে না। মনে মনে ভাবছি দাঁড়িয়ে থাকব নাকি বসব, কিন্তু কোথায় বসি? যদি ভুল-ভাল জাগায় বসে পড়ি তো না আবার কোন কেলেংকারি ঘটে রুম ভর্তি মানুষের মধ্যে।

সেও একবার করেছিলাম বটে, বসতে গিয়ে ফাঁকা চেয়ার দেখে ম্যানেজারের চেয়ারেই বসে পড়েছিলাম। সে বড় বেইজ্জতির কথা, না বলাই ভালো। যাক তারপরেও সাহস নিয়ে, যা হয় হোক ভেবে বসে পড়লাম একটা খালি চেয়ার দেখে। কিছুক্ষণ পর দেখি পটাপট খানকয়েক অতিশয় যৌবনবতী যুবতী এসে গেল আমার আশে-পাশে। না, না, আমার সাথে গল্প বা আলাপ করার জন্য নয়, বরং ওদের কোনো কাজে। কী উপমা, কী তুলনা দেব বলুন, আমি কেবল জরিনাকেই দেখেছি। জরিনার তুলনা দিলেও দিতে পারি, কিন্তু এদের, আমার কম্মো নয়, ঠিক যেনবা এইমাত্র স্বর্গে উৎপাদন শেষে এখানে নামিয়ে দিয়ে গেল কেউ। আমি দেখলাম, সবাইকেই এক এক করে। কেবল যে দেখলাম তা না, বরং একবার আমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চিড়িয়াখানায়, সেই ছোটবেলায়, সেখানে গিয়ে হাতি দেখে আমি এত অভিভূত হয়েছিলাম যে আর কোনো প্রাণীই দেখিনি, কেবল হাতি আর হাতি, যেন এ জনমে হাতি দেখে আর সাধ মিটবে না। টিভি-সিনেমাতে অনেক হাতি দেখেছি, তাই বলে চোখের সামনে ইয়া বড় হাতি, সে এক আলাদা বিস্ময়, অনুভূতি, ভাষায় প্রকাশ না করার মতো ভালোলাগা। ঠিক সেরকম টাইপের করে গিলতে থাকলাম আঁড় চোখে, চোখ ফাটিয়ে, পরম সুখে। অনেকটা ছোটবেলায় গ্রামে হাটবারে হাট থেকে আনা সন্দেশ যেভাবে চুরি করে পরম সুখে লুকিয়ে লুকিয়ে, কাউকে না দেখিয়ে মতন খেতাম, সেভাবেই।


ক্রমশঃ.....
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29307943 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29307943 2011-01-15 13:42:48
ভীনবাসী ডায়েরী-৩
‘বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়’, মানুষে বলে, মা-বোনও বলে, কিন্তু আমি আজতাক পেরেছি বলে মনে করতে পারি না, এবং ভবিষ্যতেও যে পারব না তার গ্যারান্টি আমি নিজেই দিচ্ছি, লিখিতভাবে। ভুলটা আমি সেখানেই করেছিলাম, এবং মাওলা ভাইকে আগের চেয়েও বেশি হারিয়ে বাহরাইন এয়ারপোর্টের ডিউটি-ফ্রি জোনের এদিক-ওদিক খোঁজাখুজি করতে করতে মনে হলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত আমি কেঁদে ফেলব! না, মাওলা ভাইকে হারানোর ভয়ে নয়, বরং একটা মানুষ যে কিনা কিচ্ছু জানে না, আমার ভরসায় দেশ থেকে সাথে এসেছে, তাকে বিদেশ-বিভূঁইয়ে এরকম অবস্থায় ফেলে রেখে একা একা আমি কী করে যাই দুবাই? বাকি জীবন কি এই চরম দায়িত্বহীনতার গ্লানি আমার পাছ ছাড়বে? প্রায় ১০মিনিটের মতো খুঁজে খুঁজে কোথাও না পেয়ে পূর্বের জায়গায় চলে এলাম, যেখানে মাওলা ভাইকে বলেছিলাম জোরে পা চালাতে। দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে ডানে-বামে ও সামনের দিকে তাকিয়ে প্রাণপণ মাওলা ভাইকে খুঁজতে থাকলাম, কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মাওলা ভাই নয় বরং আমিই তাকে ছাড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম সামনে।

কয়েক মিনিট ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ পাশের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ১০.৩০মিনিট দেখে বাস্তবিক আমার ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হলো, আর তখন প্রাণ থেকে সমস্ত মায়া-দয়া উবে গিয়ে ক্রোধে বসের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলাম বেকুবটাকে আমার সাথে পাঠিয়েছে বলে। মনে মনে এও বললাম, ‘দেশ থেকে কি আর কোনো বেকুব যাচ্ছিল না, নাকি আমাকে সবচেয়ে বড় বেকুব ঠাউরে সাথে পাঠিয়ে দিয়েছে আরেক বেকুককে। ১৫মিনিট বাকি ফ্লাইটের, কী করি? তাছাড়া যে টার্মিনালে যেতে হবে, সেখানে যেতেও কম করে লাগবে ১০মিনিট, তারপর সেখান থেকে বাস নিয়ে যাবে প্লেনের কাছে। ‘হে খোদা তুমিই সহায়’, ভেতর থেকে অজান্তেই শব্দকটা বেরিয়ে আসতেই শুনি কেউ একজন পেছন থেকে ডাকছে নাম ধরে।

ঘাড় ঘুরিয়ে মাওলা ভাইয়ের হন্তদন্ত মুখটা দেখামাত্রই মনে হলো, জীবনে এরচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা আর ঘটেনি, ঘটবেও না। আহারে আমার মধ্যপ্রাচ্য, আহারে সাধের দুবাই, এখনও তুমি হাতছাড়া হওনি। না, কোনো কথা নয়, সোজা মাওলা ভাইয়ের বাম হাতখানা মুঠো করে ধরে দৌড় দিলাম, এবং দৌড়াতে দৌড়াতে টার্মিনালে গিয়ে যখন থামলাম দেখি তখনও বাস আসেনি। বিশাল একটা পাথর বুক থেকে নেমে গেল ঠিকই, কিন্তু কয়েকটা দম ফেলার পরপরই মাওলা ভাইয়ের শান্ত মুখের দিকে চোখ পড়তেই মেজাজটা চড়ে গেল, এবং রাগতস্বরেই উনার চোখে রেখে বলে ফেললাম, ‘ফালতামু মারার আর জায়গা পান না মিয়া, যদি পেলেন মিস করতাম?’ মাওলা ভাই প্রতিক্রিয়াহীন, এবং আমার উচ্চবাচ্য শুনেও খুব নীচুস্বরেই নিরীহভাবে জানাল, ‘আপনিই না বুললেন জোরে পা চালাতে। আমারির ভার বাওয়া পাও, দু’ধাপ চালা পেছনে তাকা দেহি আপনে নাই! হেরপর পিছনে দৌড়াত দৌড়াত আসি দেহি আপনে।’

না, আমি আর কথা বলিনি, প্লেনে ওঠা পর্যন্ত তো নয়ই, এবং যখন কথা বললাম তখন মাওলা ভাইয়ের দু’ধাপ স্মরণে রেখেই বললাম, ‘আমি তো মনে করেছিলাম আপনি পেছনে পড়ে গেছেন?’ মাওলা ভাই আর কিছু বলল না, বরং কিছুক্ষণ পর ফটফটে সাদা এক আরব রমণী সবাইকে পুনরায় কানাকানির যন্ত্র বিলোতে এলে মাওলা ভাই কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘ভাই, আবার হেই যন্তর! আমি কিন্তুক এবির লিবো না। মাগীগুল্যানের খালি টেকা কামানির তাল। হেই ক্যানেই এরা বাছি বাছি তাবৎ সুন্দর সুন্দর মাগীগুল্যানেক আনি রাহিছে।’ মাওলা ভাই সত্যিই কানাকানির যন্তর নিল না, কিন্তু আড়চোখে যন্ত্র বিলোনো আরবী বিমানবালাকে সাধ মতো দেখতে ভুলল না। অমন নমুনা চোখের সামনে থাকলে ডলার তো ডলার, জানের মায়া অবদি যে কাজ করে না, তা পাগলেও জানে। আর আমি মনে মনে বললাম, ‘সেলিমের মা, তুমি হেরে গেলে গো! ক্ষমা করো আমায়, খোদার এমন তেলেসমাতিতে আমি সত্যিই অন্ধ!’

পরে কথা প্রসঙ্গে জেনেছিলাম মাত্র তিনমাস আগে মাওলা ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। প্রকৃত অর্থেই আমি ব্যাপারটা বুঝলাম, কিন্তু যতবার এইসব আরবী বিমানবালাদের দেখলাম ততবারই ‘জ্যামন জ্যামন’ ছবিটির কথা স্মরণ করলাম। আর করবই বা না কেন, যেমন গুরুস্তনী (সুশাসিত তো বটেই, এমনকী অতিশাসিতও), তার উপরে মাগীগুলোর যদি শরম-টরমের বালাই থাকে। যার-তার সামনে গিয়ে দাঁত বের করে বেহায়ার মত দাঁড়িয়ে পড়ছে! এদের বাপ-মা এদের কিছু বলে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতেই বেতাল অবস্থা। একটা গোপন ক্রোধ ভেতরে ভেতরে কাজ করতে থাকলে আমি মাওলা ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘দেখছেন মাগীগুল্যান কেমুন সুন্দর, খালি মুন চায়...।’ মাওলা ভাই মুচকী হাসে, যা আবার সময় নিয়ে প্রসারিতও হয়, মানে সায় দেয়, এবং বলে, ‘হ, এক্কেরে পরীর লাহান!’ আমি শুনি, আর একই দিনে দ্বিতীয়বার আকশে উড়ার আনন্দে মনে মনে বলে উঠি, ‘ভালবাসি তোমায় হ্যামবার্গার আমার, দীর্ঘজীবী হও সেদ্ধ পটেটো!’


ক্রমশঃ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29289168 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29289168 2010-12-13 23:34:16
তুমি ও তোমার অদৃশ্য রোদ
অনুরোধহীন এই ব্যর্থ সময়, তব্ওু আমার দিকেই তাকিয়ে থাকো আরেকটা দিন! আমার দিকেই সরে এসো অসুখের মতো গাঢ়! তোমার আরোগ্য-বার্তা থেকে পুনরায় অনন্ত অতলে নেমে যাক সমস্ত আয়ুহীন রোগ, আর ঘাসের ঘরে জেগে থাক চিরকাঙ্খিত অদৃশ্য রোদ।


২৭.১১.১০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29284931 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29284931 2010-12-06 22:16:05
ভীনবাসী ডায়েরি-২
যদিও বিড়ি আর সিগারেটের পার্থক্য নিয়ে একটা ঘটনা আমার এখনও মনে আছে। ঘটনাটা আমার মামাতো ভাইয়ের এক বন্ধুর। ক্লাসটেনের টেস্ট, মামাতো ভাইয়ের সেই বন্ধু পরীক্ষা দেবার মাঝেই সিগারেটের নেশা উঠলে পেচ্ছাব করতে যাবার নাম করে টয়লেটে গিয়ে বিন্দাস সিগারেট ফুকতে থাকলে কোনো এক হাবাগোবা ও অতিশয় সৎ টাইপের সহাপাঠী তা দেখে ফেলে, এবং ফিরে এসে হলভর্তি ছাত্র-ছাত্রীর সামনেই স্যারকে নালিশ জানায়, ‘স্যার অমুকে টয়লেটে গিয়ে বিড়ি ফুকছে।’ শুনে লেখা ফেলে সবাই হা করে বসে আছে, কী ঘটে। যথারীতি মামাতো ভাইয়ের সেই বন্ধুটি টয়লেট থেকে ফিরে হলে ঢুকতেই স্যারের তলব, ‘এদিকে আয়, কী করছিলি টয়লেটে?’ প্রশ্ন হয়ত শ্রোতার কানে আসতে দেরি করলেও করতে পারে, কিন্তু উত্তরদাতা কিছুমাত্র দেরি না করে, ‘কী করব স্যার, মুতছিলাম।’ সমার্থক শব্দের প্রয়োজনীয়তা যে কত বেশি, তা এমন সব পরিস্থিতিতে বোঝা যায়। স্যার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাগত স্বরে ছাত্রের কান ধরে, ‘মুতছিলি হারামজাদা, না টয়লেটে গিয়ে বিড়ি ফুকছিলি?’ হ্যাঁ, প্রতিটি স্কুল-কলেজে এমন কেউ থাকে, যে কাউকেই ভয় পায় না বরং বাকিরাই তাকে পায়। কানটানা অবস্থাতেই স্যারের কথা শোনামাত্রই, কোনরূপ জড়তা ছাড়াই বেশ জোরে খিস্তি করে বলে উঠল, ‘কোন খানকীর বাচ্চা বলেছে আমি বিড়ি ফুকছিলাম? আমি গোল্ডলিফ খাচ্ছিলাম স্যার, দু’টাকা দামের গোল্ডলিফ।’

তাই বিড়ি না সিগারেট সেই সিদ্ধান্তে না গিয়ে চুপ মেরে থাকলাম, কিন্তু মেজাজটা হঠাৎ গরম হয়ে গেল, এবং রাগে গা রি রি করতে থাকলে মনে হল, উঠে গিয়ে শালাকে জুতা পেটা করে আসি, চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে আসি, ‘বোকাচোদা, সবুজ পাসপোর্ট বয়ে বেড়াচ্ছ বলেই কি তোমাকে যেখানে-যেখানে তা জানান দিতে হবে? বানচোত, তোমার বাপ-দাদারা না হয় হাজার বার দুবাই গেছে, তাই বলে আমিতো আর যাইনি। যদি প্লেনের কিছু একটা হয়ে যেত? মশকরা মারার আর জায়গা পাওনা হারামি কোথাকার, ক’ঘন্টাও তর সয় না!’ এতসব মনে মনে বলে বলে যেই শান্ত হয়েছি, দেখি আমার সিগারেটের নেশা উবে গেছে, এবং নিজের বুক পকেটের সবুজ পাসপোর্টটার দিকে চোখ পড়তেই সেটা লুকিয়ে ভেতরের পকেটে রাখলাম, এবং তাকালাম মাওলা ভাইয়ের মুখের দিকে।

যা যা দেয়া হয়েছিল তার সবগুলোই খেয়েছে, খেয়ে নিশ্চিত মনে ঘুমিয়ে পড়েছে। এতসব ঘটনা তার ঘুমের বিন্দুমাত্র ব্যঘাত ঘটায়নি। আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যকিছু মনে পড়ে যাওয়ায় পাসপোর্টটা ভেতরের পকেট থেকে বের করে পুনরায় সামনের পকেটে রাখলাম, এবং কিছুক্ষণ ধুম মেরে বসে থাকার পর যে লোকটাকে অত গালাগালি করলাম তাকেই মনে মনে বললাম, ‘যা বাপধন আরও কয়েকটা ফুকে আয়, প্লেন ওদের হয়েছে তো কী হয়েছে, শালার আমরা কি আর মাঙনা চড়েছি? পাই টু পাই শোধ করে চড়েছি, মাঙনা তো আর নিয়ে যাচ্ছে না। বানচোতেরা আমাদের জন্য স্মোকিং জোন রাখেনি তো আমরা কী করব? আমাদের যেখানে খুশি ফুকব, যখন খুশি ফুকব, তাতে যদি সবুজ পাসপোর্ট আরও সবুজ হয়ে যায় যাক, মাথাতো আর বেঁচে দিইনি হারামিদের কাছে। যা বাবা, আরও দু’চারখান ফুকে আয়, এই দেখ আমিও আমার সবুজ পাসপোর্টটা বের করে সামনের পকেটে রেখেছি।’

সাড়ে চারঘন্টা গালফ এয়ার আমাদের পেটের ভেতরে নিয়ে উড়াউড়ি করে যখন বাহরাইন এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিল তখন স্থানীয় সময় ৯টা ৩৫। প্লেন থেকে নেমে মাওলা ভাই একটা হাম ছেড়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, হয়ত কোন প্রশ্ন করতে চায়, অথচ উনাকে সেটা করতে না দিয়ে আমি কানেক্টিং ফ্লাইটের খোঁজ নিতে গিয়ে বাহরাইন এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি জোনের সামনে এসে দাঁড়াতেই দুটো ব্যাপার ঘটল। এক. মাওলা ভাই পেছন পেছন এসে আমাকে প্রশ্ন করে বসল, ‘ভাই হেরা তো ব্যাগ-বুগ ঘুরা-টুরা দিলো না, হারা-টারা গেলে’; দুই. মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটা দেশের মাটিতে পা ঠেকিয়ে প্রথম বোধোদয় হলো এই, এরা ‘ইলেকট্রনিক্স প্রেমি’। দু’টো ব্যাপারের প্রথমটা এযাবৎ আমার সাথে ঘটে না থাকলেও, দ্বিতীয়টার প্রমাণ আমি পরবর্তীতে হরহামেশাই পেয়েছি, এবং নিশ্চিত হয়েছি যে, কোনো কারণে মধ্যেপ্রাচ্যের সবগুলো ইলেকট্রনিক্স পণ্য যদি একসাথে নিদানপক্ষে তিনদিন নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, তবে নির্ঘাৎ এই আরব জাতীরা পাগল হয়ে যাবে, এবং পুরো সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়বে।

মনে মনে বললাম, ‘তারচেয়ে আমার বাংলাদ্যাশ-ই ভাল, কাঠের লাঙল আর গরু, কলম ও দিস্তা দিস্তা খাতা, তিনদিন কেন, তিনমাস ফ্যালা রাখলেও কিচ্ছু হবে না, তাইনা মাওলা ভাই?’ না, মাওলা ভাইকে আমি জিজ্ঞেস করিনি, বরং মনে মনে মাওলা ভাইকে অতসব বলতে গিয়ে, আচমকা নিজের অজান্তেই মাওলা ভাইয়ের কিছুক্ষণ আগে জিজ্ঞেস করা কথাগুলো মনে পড়ে গেল, এবং সত্যি সত্যিই উনার মতো আমারও মনে হল, ‘যদি হারা-টারা যায়, ঘুরা-টুরাতো সত্যিই দিল না!’ বেশি কিছু নেই যদিও, কিন্তু মায়ের দেয়া মুড়ি কটা, মাওলা ভাইয়ের ছাতু আর চিড়ার-ই বা কী হবে? কোন জাহান্নামে যাচ্ছি তার কি ঠিক-ঠিকানা আছে! আর কবেই বা ফিরব দেশে, নাকি অদৌ ফিরব না! আহা, কষ্টে বুকটা ফাটব কী ফাটব করতেই মনে হল, কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে হবে। যদিও মাওলা ভাইয়ের ত্রিশ ডলার কিংবা খাবারের বিল আমিই দেব বলে আশ্বস্ত করেছিলাম, কিন্তু এই বিদেশ বিভূইয়ে যদি সত্যিই শালার প্লেন রেখে চলে যায়, তখন ভিক্ষা করে টিকিট কেটে দেশে ফেরা ছাড়া উপায় নাই। রাগ হল নিজের উপর কোনো কারণ ছাড়াই, এবং মাওলা ভাইকে জোরে পা চালাতে বলে নিজে একটু স্পীড বাড়িয়ে কিছুদূর এগিয়ে পেছন ফিরে দেখি মাওলা ভাই নাই।

ক্রমশঃ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29280338 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29280338 2010-11-29 21:53:39
ভীনবাসী ডায়েরি-১
ঘন্টা দু’ই লাইনে, এক ঘন্টা বোর্ডিং পাস, আর একঘন্টা চেয়ারে ঘুম-আধঘুমে কাটিয়ে সকাল ৬টায় গালফ এয়ার লাইন্সের পেটের ভেতরে ঢুকে দেখি, মাওলা ভাই, আমিসহ আরও শ’দুয়েক বাঙাল যে যার সীট দখল করার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেছে। ভাবখানা এই, যেন প্লেন নয়, বিয়ে বাড়ি, পাছে এই চাড়ে বসতে না পারে, আর খানা ফুরিয়ে যায়! তাছাড়া শংকা এও, প্লেনেতো চড়েছি, কিন্তু সীট না পেলে ট্রেন-বাসের মতো কি আর সত্যি সত্যিই এরা এতটা পথ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিয়ে যাবে? আর এত লোক, সিটে কুলোবে তো? হঠাৎ দেখি আমিও হুড়োহুড়ি করছি, যা কিনা আসলে হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে যাওয়া। পরে কেন জানি মনে হল, ভয় আমারও কি ছিল না? আমিও কি বাস্তবিক হুড়োহুড়ি করিনি? এতসব ভাববার অবকাশ না দিয়েই পরবর্তী ১০ মিনিটের মধ্যেই প্লেন নামক বিশাল পাখিটি বিকট আওয়াজ করে আমাদের নিয়ে উঠে এলো আকাশে। আকাশের স্বপ্ন কে না দেখে, কিন্তু সেখানে রোদও যে খুব কাছে চলে আসে সেটা হয়ত অনেকেই ভুলে যায়। ভুলে যায় এও, যে কোনো উচ্চতার জন্য চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয় সবাইকেই।

বিমানবালাদের নিয়ে কোনোদিনই আমার কোনো কৌতুহল ছিল না, কারণ পনের বছর বয়সে তাড়াহুড়োয় নিজের প্রিয় প্যান্টটি পুড়িয়ে, জীবনে প্রথমবার বাংলাদেশ বিমানে চড়ে ব্রণের কারুকার্যময় বিমানবালার যে মুখ আমি দেখেছিলাম, তাতে এখনও বিশ্বাস করি সেলিমের মা-ই ভাল, শৈশব তো শৈশব, এই লাগামছাড়া যৌবনেও অনায়াস পারি যার প্রেমে পড়তে। পারি এখনও তার পান খাওয়া ঠোঁট দুটোর কথা মনে করে শিহরিত হতে, কিংবা লজ্জায় লাল হয়ে উঠতে সেই নিলর্জ্জ আহ্বানের স্মরণে, ‘কী রে মরদ, আমার ভাতার হবি?’

নিরীহ মানুষদের আমি ভালবাসি, এবং একটা সময় পর প্রচন্ড ভয় পাই। সাথের মানুষটি, গোলাম মাওলা, তাকে ভয় পাবার মতো কোনো কারণ তখনও ঘটেনি, বরং সে সাথে ছিল বলেই হয়ত রোদের কাছাকাছি এসেছি, নিজের সবুজ, নিজের আপন সব থেকে দূরে, বহুদূরে সরে যাচ্ছি, এইসব বোধ কাজ করছিল না, ফলে বিমানবালারা কানাকানির যন্ত্র দিয়ে গেলে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজেরটা নিলাম, আর আমার দেখাদেখি মাওলা ভাইও নিতে গেলে বেশ শান্ত স্বরেই মুখটা এগিয়ে নিয়ে বললাম, ‘হারায় গেলে কিন্তু ত্রিশ ডলার মাওলা ভাই।’ কথা শুনে উনি ঠিক কী বুঝল জানি না, শুধু আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে যখন পুনরায় কানাকানির যন্ত্রটির দিকে তাকাল, তখন আমি নিজের যন্ত্রটি কানে লাগাতে লাগাতে মাথা নীচু রেখেই ডলারের বাংলা করে বললাম ‘দু’হাজার’। হ্যাঁ, বাংলা আমিও বুঝি সেও বোঝে, বাংলাদেশের ষোল-সতের কোটি মানুষও বোঝে, কিন্তু আমরা কেউ-ই বুঝি না আমাদের পাসপোর্টের রং সবুজ, আর সেটা দিনের দিন এত সবুজ হয়ে যাচ্ছে যে, বুক পকেটে নিয়ে যেখানে-সেখানে বেরুনো যায় না, লোকে দেখে ফ্যালে, শরম লাগে বা দেয়।

বেচারা ওটা কানে দিত কী দিত না জানি না, তবে আমাকে জিজ্ঞেস করা ছোট্ট একটা প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ পেয়ে যন্ত্রটা হাতের মধ্যে এমনভাবে মুঠো করে ধরে বসে থাকল যে, উনি হারিয়ে গেলেও ঐ দু’হাজার মূল্যমানের যন্ত্রটি এ জীবনে কিছুতেই হারাবে না, আর আমি ওসব লক্ষ্য না করে ততক্ষণে নিজের যন্ত্রটা কানে লাগিয়ে পছন্দের গান খুঁজে নিয়ে চোখ বুজে ফেলেছি। হয়ত মাওলা ভাই আমাকে মনে মনে গালি দিচ্ছিল, কিংবা ভাবছিল, কতই না পাষাণ টাইপের লোক আমি, যার উপর ভরসা করে সেই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে সাথে সাথে আসা, সেই কিনা প্লেনে উঠেই সঙ্গ ছেড়ে দিল! আর আমি মনে মনে বললাম, ‘এতো সবে শুরু, সামনে আরও দিন আসছে, তখন কে কাকে চেনে আর কে যে কাকে চেনে না, সেটা বুঝে ওঠাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে, সুতরাং এখন থেকেই শুরু হয়ে যাক।’

প্রায় পাঁচঘন্টার ভ্রমণে বেচারা আমার সাথে তেমন কোনো কথাই বলেনি, শুধু ঘন্টা দেড়েক পর বিমানবালারা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে উনার কাছে এসে কী লাগবে বা লাগবে না জিজ্ঞেস করতেই দেখি উনি একহাতে তখনও মাইক্রোফোন মুঠো করে ধরে রেখেছেন, আর আরেক হাতে না না করে চলেছেন। হয়ত ভাবনা এই, এমনিতেই সেই প্রথমে না চাইতেই দু’হাজারের এক আপদ ধরিয়ে দিয়ে গেছে, না জানি এর পরেরগুলো আরও কয় হাজার। আমি একটু হাসলাম, এবং নিজের খাদ্যবস্তুগুলো বুঝে নিতে গিয়ে ভাবলাম, না, বেচারা সারাটা পথ না খেয়ে থাকবে, তাই বিমানবালাকে ডেকে উনার জন্যও একটা বার্গার দিতে বলে উনার কানের কাছে মুখ নিয়ে নীচু স্বরে বললাম, ‘ঠিক আছে আপনি খেয়ে নিন, এটার দাম আমিই দেব।’ উনি আমার মুখের দিকে বেশ কৃতজ্ঞচিত্তেই তাকালেন, আর আমি তাতে বিন্দুমাত্র আপ্লুত না হয়ে নিজের বার্গারে স্বচ্ছন্দে আটখানা দাঁত বসিয়ে দিলাম। বার্গারে দাঁত বসিয়ে দিয়েই দেখি বিমানবালা মাওলা ভাইয়ের বার্গার নিয়ে হাজির, যার উদ্ধত ও সুশাসিত বুকের দিকে চোখ পড়তেই মনে পড়ে গেল ‘জ্যামন জ্যামন’ ছবির সেই দৃশ্যর কথা, যেখানে প্রেমিক তার প্রেমিকার স্তন মুখে নিয়ে খেলতে থাকলে প্রেমিকা আবেগ ভরে জিজ্ঞেস করছিল, যে তার কি ভাল লাগে স্তন মুখে নিতে? ওটার স্বাদ কেমন, সেদ্ধ আলু, নাকি হ্যাম বার্গারের মতো? আর নায়ক প্রতিউত্তরে স্তন মুখে নিয়েই জড়ানো স্বরে বলে চলেছিল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেদ্ধ আলুর মতো, হ্যাম-বার্গারের মতো।’

না, আমার সেই বোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না, অল্পক্ষণেই বিমানবালার বুক, মুখ সব থেকেই চোখ সরিয়ে নিলাম মাওলা ভাইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে, এবং উনার কানে কানে বললাম, ‘কী দেখছিলেন অমন হা করে? নিজে মরবেন, শালা আমাকেও মারবেন দেখছি! কত হাজার ডলার জানেন?’ বেচারা একটু থতমত খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই হেসে দিল, এবং আমিও উনার হাসির সাথে তাল মেলাতে মেলাতে বুকপকেটের কোণায় লুকিয়ে থাকা তিনদিন আগের অর্ধেক বিড়িটাকে ভুলে যেতে চাইলাম, ভুলে যেতে চাইলাম আরও অনেক কিছুই, অথচ সবকিছুই কি চাইলেই ভোলা যায়? জন্মক্ষতের শেষচিহ্ন যেখানে পোতা সেখানের অমোঘ টান এক জীবনে কি কোনো ভনিতা দিয়েই যায় চাপা দেয়া?


ক্রমশঃ.....
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29278447 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29278447 2010-11-26 20:18:28
বোধনের ডায়েরী থেকে - টিনের ট্রাঙ্ক
আমি ট্রাঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকি, অথচ ভেতর থেকে তেমন কোনো মূল্যবান কিছুই বের হয় না দেখে হতাশ হয়ে পড়ি, আর একসময় মার কাছে জিদ ধরি যেন তিনি আমাকে কোলে নিয়ে ভেতরটা দেখান। আমি আমার সরল বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারি না বলেই ছিল সেই আবদার যা কিনা মায়ের কোল, গভীর মনোযোগ দিয়ে সদ্য খালি হওয়া ট্রাঙ্কের ভেতরের সবটা যাচাই, এবং পরিশেষে কোল থেকে ট্রাঙ্কের ভেতরে নেমে পড়া পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। হয়ত মা চাননি আমাকে নামিয়ে দিতে অথবা ছেড়ে যেতে, আর যখন সত্যিই তিনি আমাকে ওভাবে রেখে সরে গেলেন তখন কেউ হাসতে হাসতে বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাঙ্কের ডালা, এবং ঘটনাটা ঘটেছিল এতই দ্রুত ও আকস্মিক যে, মুহূর্তেই ঘুটঘুটে অন্ধকার আর চার দেয়ালের মাঝে সম্পূর্ণ বন্দী সাতবছরের এক শিশু সীমাহীন ভয় আর অজানা বিস্ময়ে খুব বেশি করে হয়ে পড়েছিল চুপ, আর তাকে সেদিনের সেই অন্ধকারে অযাচিতভাবে সঙ্গ দিয়েছিল উগ্র এক ঘ্রাণ, যা তাকে প্রায় নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল, আর তার মাদকতায় বুদ হয়ে চুপচাপ বসেছিল ট্রাঙ্কের ভেতর ঘন্টার পর ঘন্টা। এবং সেই ঘোর থেকে যখন তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল আলোতে তখন তার ছোট্ট করুণ মুখটা হয়ে ছিল নীল, আর এক ধরনের কাঁপুনি ছড়িয়ে ছিল সারা শরীরে।

অবশেষে ট্রাঙ্কের সবকিছু বেরিয়ে স্তুপ আকারে জড় হতে থাকে উঠোনের মাঝখানে, আর বাড়ির সবচেয়ে বড় হাড়িটি চড়ানো হয় চুলার উপর। এরপর কলসি কলসি পানি ঢালা হয় সেই হাড়িতে, তারপর সাদা পাউডারের মতো কীসের জানি গুড়া ঢেলে দিয়ে একটার পর এটা কাপড় ঢুকানো হয় হাড়িতে, আর ঘন্টা ধরে সেদ্ধ করা হয় ফুটন্ত পানিতে। এরপর ঘাট, সেখানে পিঁড়ি অথবা কাঠের চওড়া তক্তার উপর দাঁড়িয়ে মোটা মোটা কাপড়গুলোর একমাথা হাতে ধরে, আর অন্যমাথা শূন্যে তুলে তাকে সজোরে পিঁড়ি বা কাঠের দিকে নামিয়ে আনার সময় কিছুটা সামনের দিকে শরীরের ঝুকে যাওয়া, পুনরায় সোজা হওয়া, এবং একটানা একই পক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি এমন এক ছন্দময় শারীরীক ভঙ্গিমার উদ্ভব ঘটাত যে, আমি ঘাটের পাড়ে হাটুমুড়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে মাথাটা একসাথে জড়ো করা হাটু ও হাতের উপর রেখে একভাবে তাকিয়ে থাকতাম নেশাগ্রস্তের মতো, আর পিঁড়ি ও কাপড়ের লাগাতার সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন একটানা শব্দ দীঘির অপরপাড়ে বাড়ি খেয়ে পুনরায় এপাড়ে ছিটকে এসে এমন এক ঘোর লাগিয়ে দিত, যে ঘোর আমার আরও গাঢ় হত কাপড় কাচা, ধোয়া, ও শুকানো শেষে রাতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন লেপের ধবধবে সাদা ওমের ভেতর নিজের ছোট্ট অস্তিত্ব খুব বেশি করে ডুবিয়ে দিয়ে যখন নাকটা গুজে দিতাম লেপের ওয়াড়ের মধ্যে, তখন টাটকা একটা গন্ধ ক্রমশঃ আমাকে ভরিয়ে তুলত নেশাতুর ঘুমের মায়াবী আবেশে।

এখনও ট্রাঙ্কটি আগের মতই চুপচাপ পড়ে থাকে ঘরের কোণে, কেবল পার্থক্য এই যে সেটি আর আগের মতো বন্ধ থাকে না, কেননা সারাবছর ধরে সেখানে জমা হতে থাকে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত অথবা বসন্তের যাবতীয়, আর ঠিক শীত আসার পূর্বেই অদৃশ্য একটা তালা আপনাআপনিই ঝুলে পড়ে আমার অজান্তেই, যেনবা ভয় এই, ঘন কুয়াশার পরম পরশ ভিজিয়ে দেবে সব, আর বের করে মেলে দিতে হবে রোদে। ঠিক যেন রমা গাপলীর শতছিন্ন জামা, শাড়ি, পেটিকোট ও ছেঁড়া চাদর, যা সে রাস্তার পাশে রোজ মেলে দিতো রোদে, আর ন্যাংটো হয়ে বসে থাকত সেগুলোর পাহারায়। কাপড় পরার চেয়ে কাপড় পাহারা দিয়ে রাখাই যেন ওর কাছে আনন্দের, এবং একেবারে আবরণহীন হয়ে পড়ার ভয় ওকে করে রাখত শংকিত ও সচকিত। আশৈশব আমি ওকে ওভাবে দেখে দেখে জেনেছি, ওকে আমি ভালবাসি। ভালবাসি ওর বিড়বিড় করা, উদাস ও উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, যে কোনোদিকে ঘন্টার পর ঘন্টা একভাবে তাকিয়ে থাকা। প্রায় সময়ই ওর বাম স্তন বেরিয়ে থাকত। আমি দেখতাম ওকে, এবং দেখতাম নগ্ন স্তনসমেত ওর সবটাই, আর এই আফসোস নিয়ে ফিরে আসতাম বার বার, একবার ও যদি আমাকে দেখত ওর সেই উদাস ও উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি দিয়ে, তাহলে হয়ত আজ খুব সহজেই ভোলা যেত ওর সমস্ত উদাস দৃষ্টি অথবা বেরিয়ে থাকা স্তন।

তারপরও শীত আসে, আর সেই সাথে ফিরে আসতে চায় রমা পাগলী। ফিরে আসতে চায় সে কোনো এক বর্ষার সকালে নিশ্চুপ, নির্বিকার। সারারাত বর্ষার ঝমঝমে বৃষ্টিতে ভিজে ভোরবেলা কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে পড়ে বাড়ির দরজায়, মায়ের চোখে চোখ রেখে। কিছু হয়ত বলল, যা দূর থেকে বোঝা গেল শুধু কয়েকবার ওর ঠোঁটের কেঁপে ওঠা দেখে। এরপর দরজার কাছেই পড়ে গেল। তারপর আর উঠল না। ওর নিথর শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ওকে দেখলাম, এবং আশ্চর্যভাবে পুরোটাসময় ওর বামস্তনটা অদৃশ্য হয়ে রইল, যেনবা গতরাতের ঘোর বর্ষা ওর শরীর থেকে ধুয়ে নিয়ে গেছে সব, আর ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিল সেইপথ যা চিনে চিনে সে ফিরে এসেছিল ওরই চিরচেনা বাড়ির দরজায়, যেখানে সে জন্মেছিল ত্রিশবছর আগে, এবং সেখানেই মারা গেল কোনো এক বৃষ্টিøাত দিনের উজ্জ্বল সূচনায়। রমা আমাদের কেউ ছিল না, শুধু সারাবছর বন্ধ পড়ে থাকা বিশাল কালো ট্রাঙ্কটার সামনে আসলে মনে হয়, এখানেই তাকে লুকিয়ে রাখা যেত অনায়াস, পরিবারের অতিপ্রয়োজনীয় মূল্যবান ও জরুরী সম্পদ হিসেবে, যখন সে আমাদের-ই কারও না কারও বীর্যপাপ একাই বয়ে বেড়াতে ছেড়েছিল সব। রমা সত্যি সত্যিই আমাদের কেউ নয়, শুধু ভালবাসার অনন্ত চাদর এক, যা শীত কিংবা বসন্ত সবসময়ই জড়িয়ে রেখেছে অদৃশ্য অস্তিত্ব, গোপন কোনো হৃদয়।

মা মারা যাবার বহুবছর পর যেদিন আমি প্রথমবারের মতো খুলেছিলাম ট্রাঙ্কটার বিশাল কালো ডালা, সেদিন কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই জেনেছিলাম ঘোরলাগা সেই গন্ধটার নাম ন্যাপথালিন নয়, পেট্রোল। পুরো ট্রাঙ্কজুড়ে গাদাগাদি করে ঠেসে রাখা একটা গোটা বাড়ি, বিশাল দীঘি, খোলা বিল, কয়েকটা নারী-পুরুষ, হেঁসেলঘর, দরজা-জানালা, বারান্দা, উঠোন, কবাট, নকশীকাঁথা, ফুলতোলা চাদর, পুকুরঘাট, খেলনা হাড়ি-পাতিল, কাপড়ের পুতুল, মাটির সদাহাস্য বুড়োর ভাঙা মাথা, সাদা হ্যাট, রঙিন পেন্সিল, কালো সিলেট, সাদা চক, ধারাপাতের ছেঁড়াপাতা, বর্ণমালা শিক্ষা, রূপকথার গল্প, পালাগানের খাতা, আপুর চুড়ি, লাল-নীল ফিতে, ক্লীপ, আমার কাঠের বন্দুক, চকচকে মার্বেল, ম্যাচের তাস, ময়ূর-পালক, মায়ের বিয়ের শাড়ি, কবিতার খাতা, বাবার গোপন ডায়েরী, দাদার ভাঙা চশমা, হোমিওপ্যাথীর বাক্স, দাদীর পানের বাটা, যাঁতি, আওলা পাতা, ওষুধের খালি শিশি, সিভিটের পাতা, আর রমা পাগলীর আস্ত লাশ ও তার উগ্র ঘ্রাণ, নিমিষেই সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দিল দাউ দাউ।



অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
১৭ই সেপ্টেম্বর ২০১০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29252017 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29252017 2010-10-09 17:36:05
The Song of Sparrows 2008 - Majid Majidi
মাজিদির চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে গেলেই অনেকগুলো বিষয় আমার কাছে প্রকট হয়ে পড়ে, যেমন ক্যামেরার চমৎকার কিছু কাজ, প্রাকৃতিক দৃশ্যের সমাহার, অভিনয় সাবলীলতা, বিশেষ করে শিশুদের, মধ্যবিত্ত জীবনের খুটিনাটি, বিষয়বস্তু নির্বাচন, কাহিনীর সরল অথচ ব্যতিক্রমী বিস্তার, এবং সর্বোপরি চরম প্রতিকূলতার মাঝেও আশার উদ্দীপ্ত সঞ্চারণ ইত্যাদি খুব বেশি করেই তাকে করে তুলেছে স্বতন্ত্র। ‘দি সংগ অব দ্য স্প্যারোস‘ দেখতে গিয়ে এসব পুনরায় মনে পড়ল, এবং গভীর মনোযোগের সাথেই আবারও উপভোগ করলাম তাঁর দারুন আরেকটি সৃষ্টিশীল কাজ। সিলভার ও গোল্ডেন বার্লিন, এবং এশিয়া প্যাসিফিকসহ ৬টি পুরস্কার জেতা ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ৯৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিটিতে তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন মধ্যবিত্ত জীবন-যাপনের যাবতীয় খুটিনাটি, মানসিক টানাপোড়েন, নির্মম বাস্তবতা, টিকে থাকার সংগ্রাম, ছোট-খাটো নীচুতা, হাসি-খুশি, ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদি। এমনকী ছাদে সন্তানদের জন্য টিলিভিশনের এ্যান্টেনা ঠিক করতে উঠে, উপর থেকে স্ত্রীকে প্রেম নিবেদন, কিংবা তার কামিজের উচিয়ে ধরা প্রান্তে ছুঁড়ে দেয়া জামার ছেঁড়া বোতাম, অথবা বধির বোনকে লুকিয়ে সাহায্য করার অপরাধে ছেলেকে ক্রোধে অন্ধ হয়ে মারতে তাড়ানো, এসব ছোটখাটো ঘটনার মধ্যে খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় মাজিদির সেই দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে তিনি আমাদের দেখিয়ে দেন ঠিক কোথায়, এবং কীভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে মধ্যবিত্ত জীবনের যাবতীয় অনুষঙ্গ, আনন্দ-বিষাদ, টানাপোড়েন ও বাস্তবতা।

এটি তাঁর ৬ষ্ঠ ছবি, এবং তাঁর অন্যান্য ছবিগুলোর মতই এখানেও তিনি সফল, আর তার সেই সফলতাতে শুধুমাত্র অভিনয় দতা দিয়ে আলাদামাত্রা যোগ করেছে মূল চরিত্রে অভিনয় করা আমির নাজির অসাধারণ অভিনয়। কয়েকটি ক্লোজশটে দেখানো তার বিচিত্র অভিব্যক্তির অর্থপূর্ণ অবয়ব আমাকে বার বার মনে করিয়ে দিয়েছে বার্গম্যানের কথা, যেখানে তাকে বহুবার দেখেছি মানুষের মুখের নানাবিধ অভিব্যক্তি খুব কাছ থেকে দেখানোর মাধ্যমে দর্শকদের নিয়ে যেতে বিচিত্র এক অভিজ্ঞতার জগতে। মাজিদিকেও এখানে আমরা দেখি তেমন কতগুলো ক্লোজশটের মাধ্যমে অনুরূপ কিছু বিস্তারিত প্রয়াস চালাতে, এবং ছবি শুরুর কিছুণের মধ্যেই যখন আমির নাজিমকে চাকুরীচ্যুতির পূর্বে তেমন এক দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকতে দেখি বৃদ্ধ ফার্ম তত্বাবধায়কের সামনে, কিংবা সেখানে থেকে বেরিয়ে ফার্মের উটপাখিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখি তার চেয়েও করুণ, গভীর ও বিষন্ন চোখে, তখন মাজিদির এই অনবদ্য ক্লোজশটগুলো হয়ে হয়ে ভাষাহীন অভিব্যক্তির এক বিস্তারিত দলিল, যার সামনে বসে থাকতে থাকতেই আমাদের বিচরণ ঘটে যায় বাস্তবতার নির্মম ও করুন পরিসরে।

দুটি কন্যা ও একটি পুত্রসন্তানের জনক করিম একটি উটপাখির ফার্মে কাজ করে, যার চাকরী চলে যায় ফার্ম থেকে একটি উটপাখি পালিয়ে গেলে। এখান থেকেই মূলত ছবির কাহিনী শুরু, যা নাটকীয় মোড় নেয়, এবং চাকুরীচ্যুত করিম তার মোটরবাইক নিয়ে তেহেরান শহরে যায়, যেখানে সে ঘটনাক্রমে হয়ে পড়ে ভ্রাম্যমান যাত্রীবাহক, যে তার মোটর সাইকেলের পেছনে করে লোকজন, মালপত্র বহন করতে শুরু করে, যা তাকে এনে দেয় আশাতীত অর্থ। ক্রমেই সে শহুরে জীবনের চাকচিক্যে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে, এবং প্রতিদিন ঘরে ফেরার সময় তার বাইকের পেছনে করে শহর থেকে নিয়ে আসতে থাকে বিভিন্ন পরিত্যক্ত জিনিস, যা তার বাড়িতে স্তুপ আকারে জমা হতে থাকে, এবং ক্রমশঃ সে এসবের প্রতি হয়ে ওঠে লোভী, ফলে যখন তার স্ত্রী শহর থেকে আনা নীল রঙের একটি দরজা তার আত্মীয়কে দিয়ে দেয়, তখন সে কোনোরূপ সঙ্কোচ ছাড়াই নিলর্জ্জভাবে তা ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এছাড়া তার পুত্রের চরিত্রে অভিনয় করা হামিদ আঘাজির অভিনয়ও ছবিটির উল্লেখযোগ্য একটি দিক, এবং ছবিটিতে তার চরম আশাবাদী উপস্থিতি, যে কিনা বাবার শত প্রতিরোধ সত্ত্বেও বাড়ীর পাশের পরিত্যক্ত জলাধার সমবয়সী বন্ধুদের সাথে নিয়ে পরিস্কার করে, এবং সেখানে মাছ চাষ করে খুব শীঘ্রই ধনী হবার স্বপ্ন দেখে।

বস্তুত পুরো ছবিটাকেই মাজিদি করে তুলেছেন দারুন উপভোগ্য, যেখানে মধ্যবিত্ত টানাপোড়ন, পারিবারিক খুটিনাটি ঘটনা, শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক অংশগ্রহণ ও আচরণ আমাদের একদিকে যেমন একাত্ম করেছে বাস্তবিক মধ্যবিত্ত পারিবারিক অভিজ্ঞতার সাথে, সেই সাথে করে তুলেছে সচেতন ও আশাবাদী। মেহরান কাসামীর সাথে মাজিদির লেখা এই ছবির চিত্রনাট্যের বিষয়বস্তুর সরল বিস্তার ও নাটকীয় মোড় যেমন আগাগোড়া আটকে রাখবে আমাদের, তেমনি তাঁর পরিচালনা ও আমির নাজির অসাধারণ অভিনয় বার বার করবে মুগ্ধ, যেখানে একা আমির নাজিকেই আমরা দেখব ছবিটির পুরো পরিসর জুড়ে বিচরণ করতে। আর সবকিছুর সাথে যোগ হয়েছে নয়নাভিরাম শট পরিকল্পনা, একের পর এক লংশটে দেখানো বিশাল সব ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে প্রাণবন্ত চরিত্রের বিচরণ। এছাড়া আকাশ থেকে নেয়া দু’দুটো ব্যয়বহুল এ্যারিয়েল শট আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, যখন করিম হারিয়ে যাওয়া উটপাখিটিকে প্রলোভন দেখিয়ে ধরার জন্য নিজে উটপাখি সেজে পাহাড়ের পাদদেশ বা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে চলা-ফেরা করতে থাকে, এবং একসময় পাহাড়ের উপর উঠে পড়ে, তখন আকাশ থেকে নেয়া শটটি আমাকে মুগ্ধ করে দেয়, কেননা ঠিক যা দেখানোর জন্য শটটটি নেয়া হয়েছে তার সবটাই গেঁথে গিয়েছিল মনের মধ্যে। ঠিক অনুরূপ আরেকটি শট, যখন সে তার স্ত্রীর দিয়ে দেয়া নীল দরজাটি আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পিঠে করে ফিরিয়ে নিয়ে আনে, তখন পথিমধ্যে ধূসর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে নীল দরজা পিঠে পুনরায় আকাশ থেকে নেয়া আরেকটি শট এতটাই অপূর্ব ছিল যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে এইজাতীয় ছবিতে এত ব্যয়বহুল শট নেয়ার বিপরীতে অবস্থান করলেও, এখানে তার গ্রহণযোগ্যতা দেখে সহমত হতে বাধ্য হই।

এছাড়াও ছবিটির আরেকটি দিক উল্লেখ না করলেই নয়, আর সেটা হলো ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহৃত মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, যা তাকে ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’-এও দেখেছি জুড়ে দিতে। এ ছবিতেও তিনি করিমের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন ব্যাকগ্রাউন্ডে, যা আমাকে জনাব ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’-র নায়ক-নায়িকার মধ্যরাতের সেই মিলনকালীন শ্বাস-প্রশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, কিংবা তারকোভস্কির অনেক ছবির কথা, যেখানে জল ও শব্দকে তিনি ব্যবহার করেছেন বহুভাবে। যদিও মাজিদির সবগুলো কাজের মধ্যে ‘দ্য কালার অব প্যারাডাইস’ আমার বেশি ভাল লেগেছে, তারপরও বলা বলা যায় এটাও তাঁর তেমন এক সৃষ্টিকর্ম যা চলচ্চিত্রপ্রেমীমাত্রই উপভোগ করতে পারবে, আর সেই সাথে তোরাজ মনসুরীর অনবদ্য কামেরার কাজ ও প্রোডাকশন ডিজাইনার আজগর নিজাদ ইমানির মনোরম দৃশ্য পরিকল্পনা সবসময়ই আমাদের ব্যস্ত রাখবে মুগ্ধতা আর বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে, যেখানে খুব সহজেই দর্শক হিসেবে আশ্বস্তহতে পারা যাবে মাজিদির ব্যতিক্রমী সৃজনশীল দতা ও চমৎকার একটি চলচ্চিত্র দেখার আনন্দে।



অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
১৩ই সেপ্টেম্বর ২০১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29239147 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29239147 2010-09-13 14:01:01
বোধনের ডায়েরী থেকে - রোগ
কথাগুলো শুনে আমার খুব হাসি পায়, যেনবা রোগমুক্তি নয়, বরং এত দীর্ঘসময় রোগ না হবার গোপন ও অমীমাংসিত কারণটা জানতেই তাঁর এই সপুত্রক আগমন। আর যখন ডাক্তার সাহেব কোনো এক কাল্পনিক মনগড়া সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যাচ্ছেতাই হাতের লেখায় একের পর এক লিখতে থাকেন নিরাময়, তখন আমি টানটান হয়ে থাকি, এ আশায়, হয়ত সেখানে বাস্তবিক খুঁজে পাবো বহু আগে হারিয়ে ফেলা অক্সিকোনের সেই মায়াবী বোতল, অথবা কমলার ছবি আঁকা পাতা ভর্তি লোলুপতা। নিদানপক্ষে গোটা কয়েক রঙ-বেরঙের প্যালপেলে ক্যাপসুল, যা জল ছাড়াই গিলে ফেলা যায়, নতুবা মধুর চেয়েও গাঢ় ও সুস্বাদু কাশির সিরাপ। অথচ তিনি যা যা লেখেন তা মা পড়তে না পারলেও যথেষ্ট খুশি হন, যেনবা তাঁর বিশ্বাস নতুন করে এইমাত্রা পেলো, অন্তত এবার আমি সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে অসুস্থ হবো, আর তিনি তাঁর একটানা দুঃশ্চিন্তা ও মনোকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পেতে খানিকটা শান্তি ও আরামে মরতে পারার সমূহ আশা নিয়ে আরও কিছু বছর পারবেন বাঁচতে।

অথচ ডাক্তারের লেখা নিরাময়গুলোর মধ্যে প্রকৃত কোনো পথ্য না পেয়ে বাস্তবিক আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি, যা মা অথবা ডাক্তারের কেউই টের পায় না, আর সুস্থতার যাবতীয় সীমারেখা ভেঙে নিজের অলক্ষ্যেই বেরিয়ে পড়ি অসুস্থতার সেই বর্ণিল পৃথিবীতে, যেখানে রোগমুক্তির জন্য দেয়া হয় সাগুদানার মত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধবধবে সাদা নিরাময়, আর ছোট্ট কাচের শিশিতে তাদের একে অপরের সাথে ঠাসাঠাসি, লাগালাগি করে শান্তিপ্রিয় বসবাস খুব শীঘ্রই আমাকে করে তোলে লোভী, আর একসময় শিশির পুরোটাই কন্ঠনালী বরাবর উবুড় করে যখন মুখ ও চোখ বন্ধ করি, তখন মুখের ভেতরের সবগুলো দেয়াল, জিভের অদ্যেপান্ত, দাঁতের ফাঁক-ফোকরে তার সুস্বাদু পরশ বুলিয়ে ধীরে ধীরে কন্ঠনালীর গাত্র বেয়ে নিচের দিকে নেমে যেতে থাকলে, নতুন রোগের জন্য আমার আকুল আকুতি পুনরায় প্রকট হয়, আর দাদীর আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকি দিনভর, এই আশায়, কখন তিনি বার করবেন আমার প্রাণপ্রিয় বোতলটি, আর আমি লোলুপের মত চেয়ে থাকতে থাকতে বুক থেকে নিঃসরিত করব সেই সমস্ত দীর্ঘশ্বাস, যারা কাঙ্খিত রোগপ্রাপ্তির আশায় নিরাশই হয়েছে কেবল বার বার।

অসুখের জন্য চরম ঈর্ষা নিয়েই কেটে গেছে বছরের পর বছর, আর দাদীর অক্সিকোনের বোতল বার বার আমার দীর্ঘশ্বাস তার দিকে টেনে নিতে নিতে বোঝাতে চেয়েছে, তোমার এ রোগ কখনও সারবার নয়। আর কমলা রঙয়ের সেই ট্যাবলেট, যার কণামাত্রও কখনও-সখনও ভেঙে দাদী মুখে ঠেসে দিলে, আমি নিশ্চিত হতাম, অসুখের চেয়ে কাম্য আর কিছুই নেই আমার, কেননা অবিশ্বাসের পৃথিবী থেকে আমি তখনও শত শত আলোকবর্ষ দূরে, আর যে আকাশযানটা আমাকে নিয়ে দিনরাত উড়ে-বেড়াত তেপান্তর, তার পাখাগুলো ছিল এতটাই একমুখো যে, বার বার দাদীর রোগাক্রান্ত পৃথিবীতে গিয়েই থামত, যেখানে আমি মাথা ছাড়িয়ে আলমারির উঁচুতে দেখতে পেতাম চাঁদের চেয়েও লোলুপ ও অপার্থিব অক্সিকোনের বোতল, যার মধ্যে শান্তি ও আশাপ্রদানকারী অস্তিত্ব নিয়ে পড়ে আছে থকথকে সাদা কাদার-ক্বাথ।

কেন আমার রোগ নেই, কেন আমাকে ফিরে আসতে হবে চুপিসারে এই আলমারির সামনে বার বার, এই প্রশ্ন ও ক্ষোভ নিয়েই পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে হাত উপরের দিকে বাড়াই, এবং একসময় বহুকষ্টে তা নাগালে এলে, কিছুমাত্র দেরি না করেই মুখের মধ্যে উবুড় করি। হয়ত সামান্যই ছিল, কিংবা একদম নতুন, যা অনভিজ্ঞতা হেতু লক্ষ্য না করেই হয় পুরোটা শেষ নতুবা অর্ধেক করেই ক্ষান্ত হতাম, যা কিনা কোনরূপ কষ্টছাড়াই মা অথবা দাদী, যে কোনো পক্ষকেই এই ধারণা দিত, সুস্থতা চুরি গেছে, আর সেই দায়ভার আমার উপর ছুঁড়ে দিয়ে তারা যখন আমাকে মারত অথবা করত ভর্ৎসনা, তখন তাদের বোঝাতে পারিনি, ওষুধ নয়, আমি তোমাদের এই সুস্থ-স্বাভাবিক পৃথিবী থেকে আমার জরুরী রোগগুলো চুরি করছি দিনের পর দিন, যা গোটা একটা জীবন বেঁচে থাকার জন্য আমার ভীষণ দরকার। আমার দরকার সাদা কাদার-ক্বাথ, অথবা কমলার মোহময়ী স্বাদ, নয়তবা শুভ্র সাগুদানা। আমার সত্যি সত্যিই এমন কিছু রোগ চাই, যা কখনোই, কোনোদিন, কোনোভাবেই সারে না, আর নিরাময়ের গোপন, গভীর হাহাকার সবার অলক্ষ্যে দারুন সহনীয় করে তুলবে আমার যাবতীয় বেঁচে থাকা, অসহ্য রোগাচার।

হয়ত মায়ের হাত সচল হয়, কিংবা দাদীর বিরাগ ও রোষ আমার উপর বর্ষিত হতে থাকে আরও ক’ঘন্টা, বড়জোর একদিন। কিন্তু পরদিন সকালে যখন দু’হাতে গোবর গড়াতে গড়াতে একেকটা নোন্দা খাড়া করে আড়ে রাখতে রাখতে, অথবা ঘুটের রাজ্যে বসে তার পানের নেশা চরমে উঠলে, তখন এই আমিই আবির্ভূত হই চরম পরিত্রাতা হিসবে, আর পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল পানওয়ালা খেতাব নিতে নিতে তাঁর মুখে কচি হাতের বানানো পৃথিবীর সুস্বাদু পানটি গুঁজে দিতে দিতে আশ্বস্ত হতাম, দাদী আবারও অসুস্থ হবে, এবং আমাকে ডাকবে, আর পান চিবোতে চিবোতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে আমার সেই বিশ্বাসকেই পোক্ত করে কখনও কখনও ভুল করে তুলে দেবেন আলমারির চাবি, যখন আমি ততদিনে জেনে গেছি রোগ চুরি করে করে কীভাবে সুস্থ থাকতে হয়।

চাবি ফিরে যায় দাদীর আঁচলে, ফিরে যায় হয়ত সেইসবও যা তিনি আনতে বলেছিলেন, যেমন সুপোরি, আওলা পাতার টুকরো, এক চিমটি খয়ের বা জর্দা, অথবা বোটায় লাগানো চুন; শুধু ফিরে যেত না তাঁর সেই বিশ্বাস যা পান মুখে পুরে তাঁর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল, আর তিনি নিশ্চিন্তমনেই আমার হাতে তুলে দিতেন তাঁর বিশ্বাসের গোছা। আর আমি তাঁর সেই বিশ্বাসের মাঝে ঢুকে খুব নির্বিকারভাবেই অক্সিকোনের বোতল মুখে উবুড় করে ঢকঢক করে গিলে নিতাম সাদা কাদার-ক্বাথ, নিঃসঙ্কোচে, এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল ও নির্বোধ মানুষটি সেজে তাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসতাম সেই সুরক্ষিত গোছা অন্যান্য সামগ্রী ও বিশ্বাস সমেত, যখন কিনা আমার পাকস্থলির পাচকরসের সাথে চরমমিতালীতে ব্যস্ত থকথকে সাদা তরল, আর হাফপ্যান্টের পকেটে জিভের লালায়িত স্পর্শের জন্য অপেক্ষা করছে কমলার ছাপওয়ালা সিভিটের দু’দুটো স্বর্গীয় গোলাকার অস্তিত্ব, যারা বাতাসার শক্ত চাকতি অথবা সন্দেশের নরম মাটির চেয়েও লোভনীয় ও সুস্বাদু, এবং তারাই কেবল পারে আমাকে প্রকৃত অর্থেই রোগাক্রান্ত করে তুলতে, আর আমি ডাক্তারের সামনে বসে থেকে কল্পনায় বিভোর হতে পারি বাস্তবিক আরোগ্যতা ও সুস্থ-সুন্দর জীবনের।

অথচ প্রতিবারই তারা আমাকে এমন কিছু পথ্য দিতে থাকবেন যখন আমি এগিয়ে চলেছি বাড়ির পশ্চিম দিকের বাগানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের আসন্যা আমগাছের নির্জনতায়, আর সুবিধামত ডালে শুয়ে নিচের দিকে পা ঝোলাতে ঝোলাতে বের করে আনি কমলার ছাপওয়ালা সেই পাতা, যার একটা মুখে পুরতে গিয়েও তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাবার আশংকায় শংকিত হই, আর অর্ধেক মুখে পুরে বাকি অর্ধেক পাতাতে মুড়িয়ে পকেটে রেখে পা দোলাতে দোলাতেই ঘুমিয়ে পড়ি একসময়। আমার সেইঘুমে তখন একসাথে জড়ো হতে থাকে রাজ্যের যত রোগ, আর পৃথিবীর যততত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুস্বাদু, লোভনীয় পথ্য। স্বপ্নের মধ্যেই আমি আনন্দিত হয়ে উঠি, আর এতসব রোগ ও পথ্যের মধ্যে ঠিক করতে পারি না কোন অসুখটা আমার দরকার, আর কোন ওষুধ আমাকে দেবে কাঙ্খিত পরম নিরাময়। এই চরম দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব থেকে বেরুতে না বেরুতেই ঘুম ভেঙে যায়, আর নিজেকে পাই গাছের ডালে কমলার স্বাদ মুখে সমস্ত রোগ ও নিরাময়ের অনন্ত প্রতীক্ষায়।

হয়ত ততদিনে মায়ের অপ্রতিরোধ্য প্রহার অথবা দাদীর ভৎর্সনা আমাকে সরিয়ে রাখতে শুরু করেছিল সন্ধ্যার নিজস্ব একাকীত্বে, যেখানে রূপকথার বিশ্বস্ত সওয়ারী আমার জন্য অপেক্ষা করত আমাকে সেই চিরকাঙ্খিত রোগরাজ্যে নিয়ে যেতে, যেখানে যততত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হরেক রকম, রঙ-বেঙয়ের যাবতীয় পথ্য, আর আমি আমার ছোট্ট প্যান্টের ক্ষুদ্র পরিসর কুড়িয়ে কুড়িয়ে ভরিয়ে ফেলব নাটাইয়ের ফল, জাম অথবা কাচা-পাকা খেজুরের অস্তিত্বে। মাঝে মাঝে হয়ত ধুতুরার কাঁটাযুক্ত ত্বক শংকিত করে তুলবে, কিন্তু পরক্ষণেই কচুরীপানার বেগুনী ও নীলের মেলা অথবা ধোলকলমীর শুভ্র নমনীয় পাপড়ি ছুঁয়ে হয়ে উঠব বিশ্বাসী ও আশ্বান্বিত। অথচ আমার অসুখের বিলাসবহুল সমারোহে কোথা থেকে এসে পড়বে সেই অভিজ্ঞ ডাক্তার, যে আমার সবগুলো পথ্য মহূর্তেই বাতিল ঘোষনা করে জানাবে আমি সুস্থ, যখন কিনা আমি নিজে নিজেই জেনেছি, দাদীর গ্যাস্ট্রিকের বোতল মনের আনন্দে খালি করে পুনরায় জল ভরে কীভাবে করে তোলা যায় পূর্ণ।

এভাবে রোগমুক্তি আমার কখনোই কাম্য ছিল না, যখন কিনা এক বা একাধিক অথবা অজস্র রোগের জন্যই আমি নিশ্চিন্ত মনে ঢলে পড়তাম অপার্থিব ঘুমে, যখন দাদী কাচের ছোট্ট গ্লাস আর অক্সিকোনের বোতলটা নিয়ে বসত আমার সামনে, আর বোতল ঈষৎ কাত করে তাতে ঢেলে নিত গাঢ় কাদার ক্বাথ, আর তাতে বেশি করে জল মিশিয়ে স্টীলের চামচ দিয়ে একটানা নাড়তে থাকত অনেকক্ষণ, ফলে কাচ ও স্টীলের লাগাতার সংঘর্ষ উৎপন্ন করত এমন এক যাদুময় শব্দ যে, গাঢ় ঘুম নেমে আসত সেই সাদা কাদার-ক্বাথের মতই, আর আমিও আমার সামগ্রিক বোতল থেকে বেরিয়ে আসতাম কোন এক উন্মুক্ত, সীমাহীন প্রান্তরে, যেখানে কেউ কখনোই আমাকে এই বোধে আশ্বস্ত করতে পারেনি, আমি সুস্থ। হয়ত তখনও জিভ লেগে থাকত বোতলের মুখের টিনের শরীরে লেপ্টে থাকা সাদায়, অথবা জাদুময় ছন্দ তোলা স্টিলের চামচটি মুখ ছাড়িয়ে কন্ঠনালীর গভীরে, আর ঢুলুঢুলু আমি ঘুম রাজ্যের রোগাক্রান্ত শহরে প্রবেশ করে দেখি, পৃথিবীর সমস্ত ডাক্তার সার বেঁধে ঢুকে পড়ছে হোমিওপ্যাথির দোকানে, আর আমার মতই লোলুপ, নেশাতুর ও রোগাক্রান্ত অপলক চেয়ে আছে সাগুদানার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শুভ্র লোভনীয় অস্তিত্বে নিরাময়ের আশায়।



অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
১০ই সেপ্টেম্বর ২০১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29238087 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29238087 2010-09-10 18:11:52
বোধনের ডায়েরী থেকে - নদী
হয়ত এ আমার গোপন অনুশোচনা, যা মানুষমাত্রেই করে থাকে, যখন সে বুঝতে পারে পাবার আনন্দকে সত্যিকার অর্থেই ছাপিয়ে উঠেছে হারানোর নিজস্ব ঐকান্তিক বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস, আর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যখন তার প্রকৃত গোপন থেকে নিঃসরিত হয়, তখন মানুষের কেঁপে ওঠা ছাড়া আর গতি থাকে না। খুব আবছা দৃশ্য বা স্মৃতিগুলোও তখন প্রকট হয়ে ওঠে, আর একের পর এক বহুবিধ খন্ড খন্ড দীর্ঘশ্বাস একসাথে জড়ো হয়ে যখন একটি মহাপাপের ন্যায় আত্মা ও অস্তিত্বের উপর জেঁকে বসে খুঁজে পেতে চায় মুক্তি, পরিশুদ্ধি, তখন ‘পরিত্রাণ’, এই চরম শব্দটির বিপরীতে অলঙ্ঘনীয়ভাবে মূর্তিমান দাঁড়িয়ে থাকে সময়।

আমি জানি, এখনও আমি শুনতে পাই, আর যেসব শব্দ রোজ আমার শ্রবণশক্তির কার্যকারিতা ও বাস্তবিক অস্তিত্ব প্রমাণ করে চলেছে, সেইসব শব্দ বা শব্দসমষ্টির সবগুলোই বোবা ও বধির, যা কিনা আমাকে প্রতিদিন নতুনভাবে করে তুলছে আরও বেশি শব্দহীন ও সংশয়িত। একটা ডাক আমার কানে তারপরও বাজে, যদিও তা ক্ষীণ ও দূরের, তবুও ঠিক শুনতে পাই, আর আমাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে আচমকা সেদিকে যে ছুট দেয়, তার প্রতিটি দ্রুত ও পূনঃ পূনঃ মাটিতে নেমে আসা খুদে পায়ের চরম বিশ্বাসী ও পুলকিত পদাঘাতের শব্দ আমার বুকের বামস্তনের কাছ ঘেষে বাজতে থাকে অনর্গল। চিনচিনে ব্যথা ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা শরীরে, আর সীমাহীন ক্লান্তিতে চোখ এমনভাবে বুজে আসে, যেন নতুন এক চিরকাম্য ঘুম আমি পেতে চলেছি, এবং খুব শীঘ্রই তা আমাকে পৌঁছে দেবে স্বপ্ন রাজ্যের সেই অংশে, যেখানে বিশাল এক রূপোলি ডালার বাক্স আছে, যার মধ্যে লুকিয়ে রাখা আছে আমার হারিয়ে ফেলা সবকিছুই, এমনকী নদীটিও।

রাক্ষুসে ক্ষুধা আর পরম ভালবাসা নিয়েই আমি বছরের পর দেখেছি আমার নদীটাকে, যে আমার বাড়ির পাশ ঘেষেই এখনও বয়ে চলেছে আগের মতই, সেই একই রূপ আর উদরতা নিয়ে, যা দেখে আমি প্রতিদিনই বই হাতে স্কুল যাবার পথে থমকে দাঁড়াতাম সুইসগেটের কাছে। কিংবা স্কুলে জানালার ধার ঘেষে বসে তাকিয়ে থাকতাম একনাগাড়ে। আমি সেইসব অতি সৌভাগ্যবানদের একজন যাদের বাসস্থান ও বিদ্যালয় দুটোই ছিল নদীর পাড় ঘেষে, বছরের পর বছর। এমনকী আমি তাদেরও একজন যে, সামনের দিকে ঝুঁকে কাঁধ দিয়ে একধরনের নির্লিপ্ত অথচ চরম বিশ্বাসী ছন্দে দাঁড় টেনে নিয়ে যেতে থাকা রোদে পোড়া, ঘর্মাক্ত ও জীবন ছন্দে মুখর মানুষগুলোর পেছন পেছন অসংখ্যবার হেঁটে হেঁটে জেনেছে, নদী বা জলের কাছ ঘেষে যাদের জীবন, তাদের কাছেই প্রকৃত অর্থে রয়ে যায় জীবনের নিগূঢ় ও চরম পাঠ। স্কুল বা কলেজের বইগুলো এখন ক্রমশঃ আমার বোঝা মনে হয়, আর তা থেকে মুক্তি পেতে ছ’তলা থেকে হাক দিই, ‘এ্যাই শনপাপড়িওয়ালা’, আর তার কাছে সেগুলো নিশ্চিন্তমনে তুলে দিয়ে ভারহীন আমি ফিরে আসি হাতে করে পেঁজা, পেঁজা লোভনীয় তুলোর মেঘ নিয়ে, যার আংশিক মুখে পুরি, পুলকিত হই, আর হাওয়া বাঁচিয়ে পরমযত্নে আরেক হাত দিয়ে আড়াল করে রাখি তালুতে, পাছে উড়ে যায় কিংবা শুকিয়ে। একসময় শেষ হয় অথচ মুখের ভেতরের সবগুলো দেয়াল থেকে শুরু করে শরীরের যাবতীয় অলিগলি, এমনকী আত্মা ও অস্তিত্বের সবটুকুই পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পুনরায় হয়ে ওঠে লোভী, আর আমি বার বার খুঁজতে থাকি আরও কিছু পঠিত বা অপঠিত বই, আরও কিছু অবহনযোগ্য ভার, অথবা অসংখ্য টুকরো-টাকরা অবাঞ্ছিত, যা আমি জমা করেছি দিনের পর দিন, যার বিনিময়ে অনায়াসেই শোনা যেতে পারে কাঁসার ঘন্টার একটানা টিং টিং অপার্থিব ধ্বনি, আর সরল লোভে ছোটা যাবে অনাবিল স্বাদ আর পরিতৃপ্তির সেই অলীক রাজ্যে, যেখানে আমি ও আমার নদীটি বয়ে চলেছি একসাথে, মহাকালের নির্মম গতিপথের সবচেয়ে সহজ ও সুন্দর কক্ষপথে।

পারাপারের লোভ থেকে আমি কখনোই পারিনি বেরিয়ে আসতে, আর তাই সেই ছোট থেকে আজ অবদি যখনই নদীর কাছাকাছি হয়েছি, তখনই সবার আগে মনে হয়েছে পারাপারের কথা। আর বর্ষার সময় যখন নদী সত্যিই সত্যিই ঢুকে পড়ত স্কুলের ভেতর, বেঞ্চের তলায়, এমনকী পায়ের পাতায়, তখন আমার সীমাহীন আনন্দের সাথে সাথে এই শংকাও কাজ করে যেত সবসময়; তবে কি নদী কেবল ভরে উঠতে ও ভাসিয়ে নিতেই এভাবে বয়ে চলেছে অনন্তকাল? যেসব দুপুরে টিফিন পিরিয়ডে আমি সবাইকে ছেড়ে একা একা হেঁটে বেড়াতাম নদীর শুকিয়ে যাওয়া পাড় ঘেষে, আর যখন পায়ের নীচে একের পর এক পড়ত এঁটেল মাটি শুকিয়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য এবড়ো-খেবড়ো নুড়ি, তখন আমার সেই একাকী নিঃসঙ্গ চলার পথেও খরার নির্দয়তায় শুকিয়ে যাওয়া নদী তখনও খুব শান্তভাবেই বয়ে চলত পাশে-পাশেই, আর নির্বাক ভাষায় আমাকে জানাতে চাইত বার বার, এই আমিই জীবন, এবং এই আমিই তোমার অস্তিত্বের বাস্তব প্রতিরূপ, যে নির্বিকার এভাবেই বয়ে যাবে বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী, অনন্তকাল।

অপর পাড়ে হয়ত তখন কাশফুলের বনে দোল লেগেছে হাওয়ার, আর আমি বেছে বেছে পাঁচখানা ভাল নুড়ি কুড়িয়ে নিচ্ছি পকেটে, যা দিয়ে আমি ও বড়বোন খেলব, আর এমন সময়ই জলের ধার ঘেষে চোখ পড়ে যায় গতরাতের লাগিয়ে রাখা টাংনায়। কিছুটা চমকে উঠি যেন! দুপুরের যে নির্মম তাপ একসাথে পৃথিবীর বুকে নামিয়ে এনেছে আলোর ঝাঁঝ ও খাঁ খাঁ শূন্যতার শংকিত নির্জনতা, তার মধ্যেই আমি নির্বাক তাকিয়ে থাকি বড় বড়শি পিঠে গেঁথে পানির সমতলে ঝুলে থাকা টোপের ট্যাংরা মাছের মৃত শরীরের দিকে। কিছুক্ষণ কোন ভাবনাই কাজ করে না, শুধু ঐ বড় বড়শি আর মাছের মৃত শরীর আমার ভেতরে ছড়িয়ে যেতে থাকে একধরনের আঁশটে গন্ধ, যা থেকে বেরুতে বেরুতে টিফিনের ঘন্টা পড়ে যায়, আর সেই বিদঘুটে গন্ধ সমেত ফিরে আসি ক্লাসে। সবাই পড়তে থাকে আর আমি চুপচাপ ভাবতে থাকি সেই টাংনা, বড় বড়শি, আর তা পিঠে গেঁথে জলের সমান্তরালে ঝুলে থাকা মৃত মাছের কথা, যে কিছু ঘন্টা আগেও ছিল লোভনীয় জীবন্ত টোপ আর এখন নিজেই তার নির্মম শিকার। জানি বোয়াল মাছই ছিল এইসবকিছুর একমাত্র উদ্দ্যেক্তা, কিন্তু মাছ দিয়ে মাছ ধরার এই চিরাচরিত নির্দয় ও চতুর প্রলোভন কেন জানি আমাকে করে তুলেছিল সন্দিহান, যখন আমি খুব ভালভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম নদী ও জলের সরল জীবন।

মূলত সুইসগেটের কাছেই বার বার ঘটে যেত আমার নতুন নতুন চিন্তার উত্তরণ। বিশেষ করে কোনো কোনো দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পথে যখন দেখতাম একদঙ্গল ছেলে তাদের সমস্ত উদ্দাম আর ফূর্তি জড়ো করে করে উঠে দাড়াচ্ছে সুইসগেটের বাঁধানো সিমেন্টের দেয়ালে, আর অনায়াস লাফিয়ে পড়ছে ঐ অত নীচের ঘোলাটে নদীর জলে। কিছুক্ষণ দেখা নেই, তারপর স্রোতের টানে এগিয়ে গিয়ে ভুস করে ভেসে উঠছে দূরে। সবাই ওভাবেই একের পর এক লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে, আর দূরে ভেসে উঠে পুনরায় ফিরে আসছে নতুন লাফে উল্লাসিত হতে। ওদের সারাদুপুর জুড়ে এইভাবে লাফিয়ে পড়া ও দূরে ভেসে ওঠা দেখতে দেখতে আমার প্রতিরোধের সমস্ত বাঁধ ভেঙে পড়ত ওদেরই মত লাফিয়ে পড়ার চরম আনন্দে, অথচ এই ভয় থেকে কিছুতেই বেরুতে পারতাম না, জলের গভীরে কী আছে? আর যদি সত্যিই না পারি ভেসে উঠতে, যদি বাস্তবিক নদী আমাকে টেনে নেয় তার ভেতর? এইসব ভাবনার মধ্যেই একদিন সত্যি সত্যিই কোন এক কিশোর আমার চোখের সামনেই তার সমস্ত আনন্দ ও উল্লাস সমেত লাফিয়ে পড়ল, আর তলিয়ে গেল অতলে! কোন দূরেই সে আর ভেসে উঠল না, যখন আমিসহ আরও অজস্র চোখ অপেক্ষা করতে থাকল তার ভেসে ওঠার। কিছুক্ষণ পরেই চলে এসেছিলাম, কেননা সেদিন যে ব্যাপার ঘটেছিল আমার শৈশব আমির ভেতর, তা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না, কেন না শুধু আমিই জানি, সেই থেকে আজ এতবছর আমি তাকিয়েই আছি জীবন উল্লাসে লাপিয়ে পড়া সেই বালকের পুনরায় ভেসে ওঠার আশায়।

নদীও হয় নির্দয়, আর তার নির্দয়তার মাঝেও রয়ে যায় পললের উদারতা। সে যতটা নেয়, ফিরিয়ে দেয় অধিক, আর সে জন্যই তার নির্দয়তার কোনো চিহ্নই কখনও প্রাণে সেভাবে রেখাপাত করে না। যেনবা সরল অংকগুলোর ভুল-ই আমাদের প্রকৃত অংককষা শিক্ষা ও উত্তর। কিন্তু আমাকে সে ফিরিয়ে দেয়নি কিছুই, শুধু নিয়েই গেছে যেন, আর আমার থেকে দূরে সরে যেতে যেতে এই কথাটিই জানাতে চেয়েছে বার বার, অন্তত তোমার সেই একজোড়া ঘুমহীন চোখ আমি রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে যা দিয়ে দেখেছিলে পানিতে ফুলে ওঠা বেঢপ লাশ আর সেই শ্যাওলা ধরা ছেঁড়া লাল শাড়ি। হয়ত এখানেই সে তার প্রকৃত নির্দয়তার মাঝেও আমার অলক্ষ্যেই বার বার রেখে গেছে তার পললতা। যে সকাল না হলেই ভাল ছিল, যে দৌঁড় না দিলেই হয়ত আমাকে থমকে যেতে হত না কখনও, বরং তাজিম বাবার সেই বিশাল খেওয়া জালের জলের গভীরে ধীর ধীরে নেমে আসা, আর জল ছেঁকে তুলে আনা পুঁটি, চিংড়ি অথবা ফলি মাছের লাফা-লাফি, এইসব নিয়েই কাটিয়ে দেয়া যেত সমস্ত বেঁচে থাকা অথবা অপলক চেয়ে থাকা।

আমি জানি, জীবনে একবারই আমার নদীতে পাল তুলেছিল কোনো ভীনদেশী নৌকা। কী বিশাল সাদা পাল, যেনবা নদী বেয়ে নৌকা নয় বিশাল মেঘের দল ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে। কতদূর হেঁটেছিলাম সেই মেঘের পেছন পেছন মনে নেই। শুধু মনে আছে সত্যিকারের হারিয়ে যাওয়া আমার সেইদিনই ঘটেছিল, যা আর কখনোই হলো না। বছরের পর বছর যখন আমি শুধু নদীকেই অনুসরণ করার গোপন ইচ্ছে নিয়ে ক্রমশঃ এগিয়ে চলেছি পাল তোলা সেই নৌকার স্মৃতির মেদুরতায়, তখন নদী নিজেও আমারই গোপনে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ অনুসরণ করে গেছে আমার হারিয়ে যাওয়া। এসব ঘটে গেছে এতটাই অলক্ষ্যে যে, আমি টের পাইনি কখনোই, শুধু অন্য এক ভোরে টেংরা গিলে ছটফট করতে থাকা বোয়ালের চকচকে শরীরের উজ্জ্বল ঝিলিক সত্যি সত্যিই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, টোপ অথবা প্রলোভনের শিল্প, আর তাই শ্যাঁওলা ধরা লাল শাড়ি অথবা পানিতে ফুলে ওঠা লাশের শরীর থেকে কোনভাবেই সরিয়ে আনতে পারি না আমার সহপাঠিনীর মুখ, যে আমার অংক বইয়ের প্রথম পাতায় লিখেছিল তার নাম, আর পাশে যোগচিহ্ন সমেত রেখে গিয়েছিল সেই অমোঘ প্রশ্নবোধক চিহ্ন, যা ক্রমশঃ বড় হতে হতে ছেয়ে ফেলল আমার সমস্ত চরাচর, বিশ্ব ও স্বপ্ন।

’নদী’ এই নামটির পাশে কী যোগ হতে পারে, এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমি পরম উল্লাস আর আনন্দ নিয়েই উঠে দাঁড়াই সুইচগেটের সেই সিমেন্ট বাঁধানো দেয়ালের উপর, আর একবুক বিশ্বাস টেনে চোখ বুঝে নিশ্চিন্তে লাফিয়ে পড়ি নীচে, জলের সীমাহীন গভীরতায়। আমি জানতাম সত্যিই আমি তলিয়ে যাব, এবং নদী আমাকে ঠিক টেনে নেবে তার প্রকৃত সীমানায়, আর এক জোড়া অথবা অসংখ্য চোখ অপলক তাকিয়ে থাকবে আমার ভেসে ওঠার প্রতীক্ষায়। অথচ আমি ভাসব না কিছুতেই। সময় কেটে যাবে, পেরিয়ে যাবে ঢেউয়ের পর ঢেউ, আর একে একে অস্থির হয়ে উঠবে সবাই, আর ঠিক তখনই জলের দূর, বহুদূরের সীমানায় আমার পরিবর্তে ভুস করে ভেসে উঠবে লাল শাড়ি জড়ানো এক লাশ, নদী যার নাম।


অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
১লা সেপ্টেম্বর ২০১০]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29234045 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29234045 2010-09-02 13:28:12
Sur (The South) 1988 - Fernando E. Solanas
সোলানাসের সাথে আমার পরিচয় ঘটে, ১৯৬৮ সালে তাঁর নির্মিত ডকুমেন্টরি, “দি আওয়ার অব দ্য ফারনাসেস” এর মাধ্যমে, এবং সেটা দেখে মুগ্ধ হয়েই শুরু করেছিলাম তার ছবি সংগ্রহ করতে। এটি তার তৃতীয় ছবি, এবং তিনি খুব ভালভাবেই পেরেছেন আমাদের সামনে নিজের সৃষ্টিশীল মননের পরিচয় তুলে ধরতে। যদি আমি ছবিটিকে চারটি মূল অংশে ভাগ করি, যেমন, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, সঙ্গীত ও অভিনয়, তবে নিশ্চিতভাবেই প্রতিটি অংশই দাবী রাখে তাদের স্ব স্ব সৃষ্টিশীল অনন্যতার জন্য উচ্চাশ্বাস। বিশেষ করে এর চিত্রনাট্যটাই ছবিটিকে দিয়েছে এমন এক মাত্রা যে, যারা এটা দেখবে, তারা ষোলআনাই টের পাবে, কীভাবে একটি চিত্রনাট্য বার বার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, এবং আপনা আপনিই জুড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ একটি কাহিনীর অনবদ্য অবয়ব গড়ে তুলছে এতটুকু অসুবিধা ছাড়াই। বস্তুত এর কাহিনী, একের ভেতরে অসংখ্য মানুষের গল্প, যা পর্যায়ক্রমে রূপ নিয়েছে একটি সমাজ, তথা জাতি, তথা দেশ, এমনকী মানবজীবনের প্রকৃত বাস্তব গল্প হিসেবে।

ছবিটির শুরু হয় একসন্ধ্যায়, রবার্টো নামের একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের জেল থেকে প্রত্যাবর্তনের মধ্যে দিয়ে, যেখানে সে সাজা শেষ করে ফিরে আসে নিজ মহল্লায়, এবং নিজের পরিচিত অবস্থানে ফিরে এসে এক এক করে স্মরণ করতে থাকে সেইসব উজ্জ্বল দিন, সঙ্গী-সাথী অথবা প্রিয়মানুষদের, যা আজ আর নেই। সে আবেগতাড়িত হয়, এবং নিজের ঘরে ফিরে না গিয়ে, ঘুরতে থাকে মহল্লার রাস্তায় রাস্তায় আর খোঁজ করতে থাকে তাদের, যারা একসময় ছিল খুব কাছের, এবং প্রিয়। পুরোনো সব স্মৃতি তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে থাকে বার বার আর সে হাঁটতে থাকে উদ্ভ্রান্তের মতো। অতীতের প্রিয়-অপ্রিয় সমস্ত ঘটনাই মনে পড়তে থাকে এক এক করে আর সেইসব ঘটনায় সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ফিরে আসতে থাকে তার সামনে, বাস্তবরূপে। নায়কের এই নির্মম স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়েই চিত্রনাট্যের বিস্তার ঘটতে থাকে ক্রমশঃ, যা কিনা পর্যায়ক্রমে তুলে আনে সামরিক অত্যাচার, বিপ্লব, নিপীড়ন, হত্যা, প্রেম, প্রতারণা, হতাশা, ঘৃণা ইত্যাদি, এবং শেষ হয় নতুন আশার মধ্যে দিয়ে। এক সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত একটিমাত্র রাতের পটভূমিতে আমাদের সামনে আঁকা হয় সেই বিশাল ক্যানভাস, যাতে ফুটে ওঠে জীবন ও বাস্তবতার বহুবিধ রঙ, যেখানে জীবিত বা মৃত উভয়ই এসে জড়ো হয়েছে আর কথা বলে গেছে একে অপরের সাথে, এমনকী, হয়ত, অলক্ষ্যে আমাদের সাথেও।

সবগুলো দিক থেকেই সোলানাস ছবিটিকে অনবদ্য করে তোলার প্রয়াস চালিয়েছেন। সঙ্গীত, আলোকসম্পাত, বিশেষ করে যারা ট্যাংগো ভালবাসেন তারা অবশ্যই মুগ্ধ হবেন প্রায় পুরো ছবিজুড়েই এ্যাস্টর পিজোলা ও বরার্টো গোয়েনচের মত খ্যাতিমান ট্যাংগো শিল্পীদের অনবদ্য সঙ্গীত শুনে। এছাড়া ছবিটির স্মৃতিচারণ বা আত্নকথন বর্ণনাকে, যেখানে মৃত ব্যক্তিরাও ফিরে আসছে, এবং বাস্তব চরিত্রের মত নায়কের সাথে কথপোকথনে বলে যাচ্ছে নিজেদের করুণ ও মর্মান্তিক পরিণতির কথা, তাকে মায়াবী কুহুকতা দিতে সোলানাস, ধোয়া, নীলরং, পরিমিত আলো, অসংখ্য টুকরো টুকরো কাগজ আর বাতাস যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে ছবিটি সত্যি-সত্যিই হয়ে উঠেছে স্মৃতির সেই মর্মান্তিক কবরস্থান, যেখানে আমাদের দর্শক সারিতে বসিয়ে রেখে, সোলানাস কমিউনিকেট করাচ্ছেন সেইসব আত্নার সাথে, যারা কোনো না কোনোভাবে হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনেরও অংশ।

সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য ছবি এটি, যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে নিপুণ দক্ষতায় বোনা হয়েছে জীবন বাস্তবতা ও প্রেমকে। মানুষের সামজিক জীবন ও নির্মম বাস্তবতাকে প্রায় সবকোণ থেকেই সোলানাস দেখিয়েছেন এই ছবিতে, সৃজনশীলতার চরম উৎকর্ষতা সহকারেই।


অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29211238 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29211238 2010-07-30 19:19:16
বোধনের ডায়েরী থেকে - লাল-বৌ না কী যাদু
আর আসবেই বা কেন? ও তো ছিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত লাল। হয়ত আমার সরল রক্তের অগুনিত কণা হতে ওর অমন যাদুময়ী রুপান্তর ঘটেছিল। তাছাড়া ও যে জানত আমি বিছানায় পেচ্ছাব করি। শুধু সে এটা জানত না, যে ও ছেড়ে যাবার পরও আমি দেদারসে ভিজিয়েছি বিছানা, কী শীত, কী খরা আর মা ঘাটে সেইসব দুর্গন্ধযুক্ত কাঁথা, চাদর ধুতে ধুতে নিরবে শুনে গেছে পাশের বাড়ির মুখরা রমণীর অকাতর আন্তরিকতা, ’ও বৌ, তুমার বেটার নুনুত রাতে দড়ি বানধ্যি রাখতে পারো না?’ লাল বৌ এসবের কিছুই জানত না। জানত না এও, কীরকম ভয়ে আমি সিটকে থাকতাম রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আর বিছানাটাকে মনে হত বিশাল ধূ ধূ মাঠ। যদিও আমি ওকেই বলতাম সবকিছু, তবুও সে বুঝত না, খালি হাসত আর একের পর এক পান মুখে পুরে মুচকি হেসে চেয়ে থাকত আমার মুখের দিকে। তবুও আমি ওর কাছেই ছুটে যেতাম, নতুন হাফপ্যান্ট পেলে, কিংবা দামি ম্যাচের খোল অথবা চকচকে মার্বেল। শুধু কী তাই, যেদিন যেদিন প্যান্ট ছিঁড়ে যেত বা ফাটিয়ে ফেলতাম, সেদিনও তো তালগাছটার কাছে গিয়ে মনে মনে ওকেই বলে আসতাম, ”জানো বৌ, আমার না প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে, দেখো মা আমাকে অনেক মারবে। আমার যে খুব ব্যাথা লাগে?’ সে শুনত কী না জানি না, তবে আমি আমার সবকথায় ওকে বলতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আসলে আমি যে প্যান্টের চেয়ে তালি বেশি পরেছি সেটা ও বুঝেছিল আর তাই যখন সবকিছু ডুবে যেত অন্ধকারে, কেবল তখনই সে আমাকে ডাকত। সারাদিনের ক্লান্ত আমি যত গভীরেই ঢুকে যাই না কেন বিছানার, ও ডাকামাত্রই ছুটে যেতাম মন্ত্রমুগ্ধের মত, যেন বা ও ডাকবে বলেই আমি ওভাবে ঘুমিয়েছি অপার্থিব অন্ধকারে।

মা আমার পশুর মত মারলে কী হবে, পরে ঘরের দরজা বন্ধ করে একলা একলা কাঁদত আর রাতে খেত না। কোনো কোনো দিন আমি বুঝতে পারলে, গলা জড়িয়ে ঝুল পেড়ে অথবা মুখের সাথে মুখ ঘষে রাজী করাতাম ঠিকই, কিন্তু যেই ও ডাকত অমনি ছুটতাম তালগাছ মুখে। কত রাত এমন হয়েছে, আমি ছুটছি সামনে আর মা ভেজা চোখে হ্যারিকেন হাতে পেছনে। সেই লাল-বৌ আমাকে না জানিয়েই চলে গেল আর আমি রাতের পর রাত বিছানা ভিজিয়ে চললাম পরের আরও কয়েকটা বছর। লাল-বৌ যেমন হাসত, তেমনি বাকিরাও। আমার হাফপ্যান্টের পেছনটা যতদিন পর্যন্ত না সম্পূর্ণ তালিহীন হয়ে উঠল, ততদিন পর্যন্ত তারা হাসল অকাতরে। এরপর সময় এলো আমার হেসে ওঠার, কিন্তু ততদিনে তো আমার ঘুম হারিয়ে গেছে। জেগে জেগে হাসতে পারি না বলেই তো সেই থেকে আজ এতটাবছর আমি ঘুম খুঁজে মরছি। প্রগাঢ় একটা ঘুম, যেখানে আমিই শুধু হাসব, অথচ কেউ দেখবে না, কেউ না।

জানি মা-ই একমাত্র যে আমাকে পারে ঠিকঠাক পড়তে। শুধু কী তাই, আমার জীবনের সবগুলো অনুচ্ছেদ, লাইন, এমনকী প্রতিটি শব্দ তিনি খুব সহজেই পারেন মুখস্থ বলে দিতে। মায়ের কোমল হাত আমাকে আরও খানিকটা পরিচ্ছন্ন করে তোলে আর আমি রাতের অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে আসি ঝকঝকে বিকেলের আলোয় হাটের পথে, পকেটে ব্যাগ গুজে। সারের বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগ, যত ভাঁজেই রাখি না কেন, প্যান্টের সামনের দিকটা উঁচু হয়ে থাকে বেঢপভাবে। মাঝে মাঝে হাত দিয়ে চেপে দিই পকেট আর মনের আনন্দে হাঁটতে থাকি এভাবে, যেন কোনো রাজপুত্তুর চলেছে রাজ্য জয় করতে, পকেটে রয়েছে তালিকা, কোন কোন রাজ্য জয় করতে হবে। মা জানত ঠিকই, যে তার রাজপুত্তুর কোনো না কোনো রাজ্য জয় না করেই ফিরবে, কিন্তু সাথে করে আনতে ভুলবে না গুড়ের মোয়া অথবা চিনির গজা। সত্যি বলতে কিসের রাজ্য, কিসের জয়, আমি তো চলেছি মোয়া আর গজার লোলুপ দেশে। যতই এগিয়ে যাই ততই প্রাণটা আনন্দে নেচে ওঠে। আমার উদ্দাম ক্রমশঃ বেড়েই চলে। নিজের খুশিভাব লুকাতে না পেরে জনসাধারণকে কখনও কখনও জানিয়েও দিতাম, কোন মহান উদ্দেশ্যে আমার এই উৎফুল্ল যাত্রা। কেউ কেউ হাসত, কেউ বা আবার তুলে নিত সাইকেল অথবা ভ্যানে আর হাটের স্বপ্নে বিভোর আমি অজান্তেই ভালবেসে ফেলি সপ্তাহের দুটোমাত্র দিনকে, শনি ও মঙ্গলবার। কে আর তখন বলে দেবে, অমঙ্গলকে অমন পাগলের মত ভালবাসতে নেই। শনি বলয়ের যে হৃদয়গ্রাহী মোহনীয়তা, কেবল গ্যালাক্সিই পারে তা ধারণ করতে।

তাছাড়া আমি জানবই বা কী করে অতসব। ততদিন পর্যন্ত তো হাট মানে আমি এই জেনেছি, মাস দু’মাসে বাপ-চাচার সাথে সাইকেলের সামনে একপ্রস্থ আড়াআড়ি রডে বসে পাছা ব্যথা করে হাটে গিয়ে নাপিতের একটুকরো ইটের উপর নিজের সমস্ত সহনশীলতা জড়ো করে চোখ-মুখ বুজে পাথরের মূর্তির মত অনড় বসে থাকা, যাতে এই বোধ কখনও থাকত না যে আমি রাজপুত্তুর, বরং পনের-বিশ মিনিটপর নাপিত বাবাজি আমার সামনেই জন্মদাতা অথবা চাচার কাছে আমার যে প্রশংসাপত্র দাখিল করত এভাবে, ”না, লক্ষী ছেলে, একটুও নড়েনি”, তাতেই উৎফুল্ল হয়ে উঠে সবকিছু ভুলে গোলাকার পাটওয়ালা সন্দেশের একপাট খুব সাবধানে আলগা করে মুখে ঢুকিয়ে, আরেকপাট হাতে রেখে চিরতরে ভুলে যেতাম নাপিতের যথেচ্ছ কান ধরে টানা, ঘাড় কখনও উপরে, কখনওবা নীচে, আবার কখনও সম্পূর্ণ অস্বস্থিকর অবস্থানে নিয়ে স্থির থাকতে বলার কর্কশ হুকুম আর একটু নড়লেই চাটিসমেত ভর্ৎসনা হজম। হয়ত হজম করার প্রকৃত বয়স ছিল সেটাই, শুধু এই পৃথিবী কেন, পুরো মহাবিশ্বটাই হজম করে ফেলা যেত নিমিষেই।

সেই একই হাটে এবার আমি চলতে থাকি রাজপুত্তরের মত। যেন সেটা আমার রাজ্য আর আমি চলেছি প্রজাদের বিশাল সমাবেশে। হাটের কাছেই ছিল স্কুল। শনি ও মঙ্গলবার স্কুলে যাবার সময় টুক করে সহপাঠীদের ছেড়ে আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম খাঁ খাঁ করা হাটের চারটে বাঁশের খুটির উপর মাথা উঁচিয়ে ঘুমিয়ে থাকা সেইসব সারি সারি খড়ে ছাওয়া চারচালার সামনে। মনে হত ওরা যেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, তাই শব্দ করতাম না, এবং ওদের জেগে ওঠা দেখার জন্য সেখানেই বসে থাকত ইচ্ছে হত বিকেল পর্যন্ত। কিন্তু থাকা হত না, ফলে কোথা থেকে অবুঝ হাহাকার জেগে উঠত, আবার পরক্ষণেই যেত মিলিয়ে। লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ আমাকে প্রায়শই টানত আর হাটে এসে অগুনিত লোকের ভীড়, চাপাচাপি, ঠেলাঠেলি ও পাশ গলিয়ে যখন এ মাথা থেকে ও মাথা অবদি ঘুরতাম উদ্ভ্রান্তের মত, তখন দারুণ লাগত। মনে হত, সত্যি সত্যিই এ আমার রাজ্য। নিজেকে বেশ বড় মনে হত আর নানাবিধ খাপছাড়া ভাবনায় আপ্লুত হতে হতে, হাতে ধরে থাকা তালিকার কোনো না কোনো একটা চোখ এড়িয়ে যেত, কিংবা কখনও কখনও পুরো তালিকাটায় ভেলকিবাজিতে হয়ে যেত গায়েব। তারপরও মা আমাকেই পাঠাত, পাঠাতে বাধ্য হত। বাপটা তো থেকেও নেই আজ ত্রিশ বছর আর ছোটভাইটা ঠিকঠাক হাঁটা শিখতেও তো লাগিয়ে দেবে আরও আট-দশ বছর।

এমনই কোনো দিনে হাটে ঢোকার মুখে লক্ষ্য করি একটা খোলা জায়গায় বৃত্তাকার হয়ে একদঙ্গল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কৌতুহল আমার কখনোই পাছ ছাড়েনি, সুতরাং এগিয়ে গেলাম, এবং উঁচু উঁচু লোকগুলোর পাছার কাছাকাছি মুখ নিয়ে একজনকে ঠেলে প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা হলো, একটা লোক বেশ বড়সড় ছোরা হাতে বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে কীসব জানি বলছে আর একটা সাত-আট বছরের ছেলে কাছেই মাটিতে বসে মিটমিট করে লোকটার হাতে ধরা ছোরাটার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা অনেকক্ষণ ধরে আগেরমতই চিল্লিয়ে গেল আর মাঝে মাঝে তার করা দু’একটা প্রশ্নের জবাব অদুরে বসা ছেলেছি যতজোরে সম্ভব দিয়ে গেল। লোকটা চিল্লানোর সাথে সাথে জনসাধারণকে এ বলেও সাবধান করে দিল, যেন তারা কোনভাবেই হাতের মুঠ বন্ধ না করে, কিংবা যে যেখানে আছে সেখান থেকে একধাপও না নড়ে। যা শোনামাত্রই গোপনে আমি কয়েকবার হাতের মুঠ বন্ধ করলাম, এবং পূর্বের অবস্থান থেকে নড়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলাম। তখনও বুঝতে পারিনি কী ঘটতে যাচ্ছে, ফলে যখন ছেলেটির দু’হাত পেছনে বেঁধে মাটিয়ে কাত করে শুইয়ে, বড় লাল রঙের কাপড় দিয়ে তাকে পুরোপুরি ঢেকে দিল, তখনও আমি মনে মনে হাসছি আর মজা পাচ্ছি। একসময় লোকটি হাটুমুড়ে বসল, এবং ছোরাসমেত হাতটা চাদরের নীচে ঢুকিয়ে কয়েকবার সামনে পেছনে করতেই কাপড়ের ভেতর থেকে প্রচন্ড আর্তনাদ বেরিয়ে এল।

তখনও চাদর ওঠেনি আর যখন উঠল তখন আমি আমার জীবনের সমস্ত বিস্ময় আর ভয় জড়ো করে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে, অপলক দেখতে থাকলাম ছেলেটার পেটে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেঁথে থাকা রক্তাক্ত ছুরিটা। আশেপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে টকটকে লাল রক্ত আর ছেলেটি তারমধ্যে পড়ে থেকে মাগো-বাবোগো বলে কাটাগরুর মত কাতরাচ্ছে। লোকটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে আর আগের চেয়েও দৃঢ় ও উচ্চস্বরে জনগনকে সাবধান করে চলেছে, খবরদার আপনারা কেউ হাতের মুঠ বন্ধ করবেন না, কিংবা জায়গা থেকে এক পা-ও নড়বেন না। আমি নড়িনি, সত্যিই নড়িনি একচুলও, এবং ততক্ষণ পর্যন্ত বোবা মূর্তির মত দাঁড়িয়েছিলাম যতক্ষণ না ছেলেটি কাতরাতে কাতরাতে একসময় নেতিয়ে পড়ল, এবং আগেকার সেই লাল কাপড় তার স্থির হয়ে আসা শরীরের উপর নেমে এলো। এরপর আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, যখন হাট থেকে ফিরছিলাম, তখন সেই ছেলেটি সেখানেই বসে, যেখানে তার পেটে ছোরা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, খুব মনোযোগ আর তৃপ্তি সহকারে চিনির গজা একটার পর একটা মুখে পুরছিল। আমি ওর দিকে এগিয়ে গেলাম, এবং ওর পেটের সেই অংশটা ভালকরে দেখতে চাইলাম, যেখান দিয়ে একটা বড় ছোরা ওকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়েছিল। যদিও ও বসেছিল আমার দিকে পেছন ফিরে। তাই সামনের দিকে ধীরে পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে, দরগা থেকে এনে দেয়া মায়ের মানত করা তাবিজের রক্ষাকবচ ভেঙে আচমকা ঢুকে পড়লাম নতুন যাদুময় এক জগতে, যেখানে নির্মম ক্ষতরাও দ্রুত মিলিয়ে যায় অলৌকিক নিয়মে।


অরণ্য
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29195872 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29195872 2010-07-09 16:31:42
যে বেলুনগুলো রঙহীন যারা আজ তুলেছে সুর কুঠারের ঐ ঝড়ের বাগানে
আমি তাদের বলছি সৈনিক
বিদঘুটে উল্কি ভালবেসেও হেসেছে
কোথা থেকে উড়ে আসে এইসব অসংখ্য নীলমাছি
যে তুমি হাত বাড়ালেই এখনও নেমে আসে আকাশের সিঁড়ি
সে তুমি জানো না কীভাবে নিজেরই লাশ কাঁধে
দাঁড়িয়ে থাকে মূর্তির শরীর
বোবা উল্কি সেও কেঁদে ওঠে ত্বকের গভীরে
তোমাকে শুধু আজ এই বলতে পারি
পোষা বেড়ালটা এখন ইঁদুর মারতে শিখেছে
আমি তাকে কিনে দিয়েছি যাদুর দাঁত, অলৌকিক ছুরি
রাত কত উজ্জ্বল হয়ে হেসে ওঠে ওর চোখের তারায়
আর আমি কারও অচেনা নিঃশ্বাসের পাশে শুয়ে থেকে
হয়ে উঠি বিরাট অজগর সাপ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29193048 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29193048 2010-07-05 16:16:49
Knife in the Water-1962 (Roman Polanski)
১৯৬২ সালে সাদা-কালোয় নির্মিত ৯৪ মিনিটের এই ছবিটিকে অনেকই বলে থাকেন থ্রিলার, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এটি একটি উৎকৃষ্টমানের সাইকোলজিক্যাল ড্রামা, যেখানে হঠাৎ করেই আমাদের পরিচয় ঘটে যায় অসম বয়সের সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের তিনজন মানুষের সাথে, এবং দর্শক হিসেবে কোনকিছু গুছিয়ে ভাবা বা বোঝার আগেই, আমরা দ্রুত জড়িয়ে পড়ি তাদের একদিনের নৌকা ভ্রমণ, মানসিক দ্বন্দ্বপূর্ণ ঘাত-প্রতিঘাতে আর পরিচালক সেখানে আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের মত বসিয়ে রাখেন, বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ গাছাগাছালি ঘেরা জনমানবহীন লেক, খোলা আকাশ ও তার মধ্যে দিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলা সাদা পালতোলা নৌকা, এইসব মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলীর মনোরম আবেশে।

ছবিটি শুরু হয় আন্দ্রেজ (লিওন নিমক্রেজাক) ও ক্রিস্টিনা (জোলানটা উমেকা) দম্পতির সাপ্তাহিক অবসরে একদিনের জন্য নৌকা ভ্রমণে বেরুনো থেকে, এবং শুরুতেই চলমান গাড়ির মধ্যে এই দম্পতির বিপরীতধর্মী অভিব্যক্তি দেখে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারি না, তারা কেন বা কোথায় যাচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের গাড়ি ডেকে গিয়ে পৌঁছায়। আমরা দ্রুত প্রশ্নবিদ্ধ হই, বিভ্রান্ত বোধ করি আর সেই বিভ্রান্তি খুব শীঘ্রই নাটকীয়তার মোড় নেয়, যখন আন্দ্রেজ রাস্তার মাঝখানে এক হিচ-হিকার (মোটর বা লরি চালককে বলে বিনা পয়সার যে ভ্রমণ করে) যুবককে (জিগমান্ট মালানোভিচ) প্রায় গাড়ি চাপা দিতে বসে। এরপর তাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নেয়া, ডেকে পৌঁছানো এবং তাদের একদিনের ভ্রমণে সঙ্গে নেবার পর থেকেই যেন ছবিটি গতি পায় এবং ক্রমেই আমরা পরিচিত হতে শুরু করি তিনজন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মানসিক আচরণ, দ্বন্দ্ব ও সংকটের সাথে, যাকে চরম উপভোগ্য করে তোলে চিত্রনাট্যের বৈচিত্রতা, চরিত্রদের স্বল্প কথাবার্তা, বাঙ্ময় অভিব্যক্তি ও লোকেশানের খোলামেলা উপস্থিতি।

ছবিটি দেখতে দেখতে আমরা নানাবিধ প্রশ্নের সন্মুখীন হই অথচ কোন একটার উত্তর বা সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার আগেই নতুন আরেকটি দ্বন্দ্বময় সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ি, যেখানে দু’জন অসমবয়সী পুরুষকে আমরা দেখতে পাই একটি নারীকে কেন্দ্র করে তাদের অস্তিত্বহীনতার সংকটে ভুগতে থাকা ও একে অপরের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায়। পোলানস্কির প্রথম দিকের ছবিগুলো দেখে আমার মনে হয়েছে, তিনি যেন তাঁর কাজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন আর চেয়েছেন দর্শকের ভেতর কিছু রেখে দিতে, যা তারা নিজেদের মত গ্রহণ করবে, যেখানে তার নিজের দায়ভার এটুকুই, দেখিয়ে বা পরিচয় করিয়ে দেয়া। যদিও আমি সেই মেজাজী পোলানস্কিকে সেভাবে আর কখনোই খুঁজে পাইনি তার পরের কাজগুলোতে, যা পেয়েছিলাম এই ছবি কিংবা হোয়াট-এ। তবে এটা সত্যি, খুব সহজাত প্রতিভা না থাকলে একজন পরিচালক কখনোই পারে না তার জীবনের প্রথম ছবি এত চমৎকারভাবে বানাতে।

তাছাড়া ছবিটির লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো এখানে চরিত্রেরা অভিনয় বা কথা বলছে কম, কেবলমাত্র অভিব্যক্তি দিয়েই ফুটিয়ে চলেছে সবকিছু। ক্রিস্টিনা, আন্দ্রেজ অথবা হিচ-হিকার যুবক কাউকেই দেখা যায় না অতিরিক্ত কথায় ব্যস্ত হতে। যদিও বা আন্দ্রেজ অন্য দু’জনের চেয়ে কথা বলছিল বেশি, কিন্তু সে কথাগুলো বলছিল যবুকের সাথে, যাকে সে কিছুক্ষণ পরপরই নৌকা চালানো বিষয়ে জ্ঞান দিচ্ছিল এবং নিজেকে দক্ষনাবিক প্রমাণ করে তার উপর নিজের শ্রেষ্টত্ব প্রমাণ করতে চাইছিল, আর যবুকটি তার কথায় বিন্দুমাত্র কান না দিয়ে নিজের গোঁয়ার্তুমি প্রকাশ করে চলেছিল উদ্ভট সব কার্যকলাপে। সেখানে ক্রিস্টিনা ছবির শুরু থেকে শেষ, সবসময়ই ছিল নিরাসক্ত ও চুপচাপ। আসলে আন্দ্রেজ ও যুবক দু’জনেই চাইছিল তাদের সঙ্গী রমণীটির মনোযোগ আকর্ষণ করতে। ক্রমেই তাদের এই মানসিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের রুপ নেয় এবং একপর্যায়ে আন্দ্রেজ যুবকের কাছে থাকা তার প্রিয় শিকারি ছোরাটা জলে ফেলে দিলে তা মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। যুবকটি আন্দ্রেজের ধাক্কায় জলে পড়ে যায় এবং সে সাঁতার জানে না বলে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই জলে নেমে তাকে খোঁজে, অথচ পায় না। ক্রিস্টিনা নৌকায় ফিরে স্বামীকে খুনী বলে চিৎকার করে তার উপর নিজের রাগ ও ঘৃণা প্রকাশ করে আর আন্দ্রেজ ভীত হয়ে নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে তীরে পালিয়ে যায়। আন্দ্রেজ পালিয়ে গেলে যুবকটি নৌকায় ফিরে আসে এবং ক্রিস্টিনার সাথে তার ক্ষণস্থায়ী প্রণয় হয়।

পরে নৌকা নিয়ে ক্রিস্টিনা একা একা ডেকে ফিরে আসে এবং গাড়িতে, বাড়ি ফেরার সময় তার স্বামীকে জানায় যে যুবকটি মরেনি, বরং সে পালিয়ে আসার পর ও ফিরে এসেছিল, যা আন্দ্রেজ বিশ্বাস করতে চায় না। এমনকি ক্রিস্টিনা যুবকের সাথে তার শারীরীক সম্পর্কের কথা বললেও আন্দ্রেজ পূর্বের মতই অবিশ্বাসী মনোভাব নিয়েই গাড়িটি একটা দ্বি-মুখী রাস্তার মোড়ে থামায়, যেখান থেকে গাড়িটি আর নড়ে না। এভাবেই ছবিটি শেষ হয়। মাত্র তিনটে চরিত্র নিয়ে বানানো এই ছবিটি আমি কখনোই ভুলতে পারি না, কারণ পোলানস্কির ব্যতিক্রমী সৃষ্টিশীল মেজাজ, যেখানে তিনি হুট করে কয়েকটা খাপছাড়া ও সামঞ্জস্যহীন চরিত্রকে একত্র করে, একই সাথে যেমন আমাদের ফেলে দেন বিভ্রান্তি ও সংকটে, তেমনি পরিচয় ঘটিয়ে দেন চমৎকার সৃষ্টিশীলতার সাথে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29145434 http://www.somewhereinblog.net/blog/aronnosblog/29145434 2010-04-30 12:20:59