এখানকার স্হানীয় জনসাধারনের খাদ্যর মধ্যে আছে যেমন কাসাভা এর পাশাপাশি তারা বন থেকে সংগ্রহ করে নানারকম ফল যেমন মান্দারিন (কমলা জাতীয় ফল),আমড়া,পেঁপে,কলা,লিচু,আখ এবং আম। সবথেকে মজার বিষয় হচ্ছে এখানকার আমগাছগুলো । একই আমগাছে দেখা যায় মুকুল ধরেছে এবং ডালে ঝুলছে কচি আম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাইজের আম এমনকি পাঁকা আম পর্যন্ত ।এর কারন কংগোতে সারা বছর গাছে আম ধরে। আমগুলো সাইজে আমাদের দেশের আম থেকে একটু ছোট তবে স্বাদে মিস্টি এবং উপাদেয়।
এদের খাদ্যতালিকায় আছে আর একটি অভিনব মেন্যু আর তা হল বিভিন্ন প্রজাতির কীট পতংগ । এর আগে আমি দেখেছিলাম পার্বত্য চট্রগ্রামে চাকমাদের বড় বড় ঝিঁঝিঁ পোকা ধরে খেতে কিন্ত এদের খাদ্য তালিকায় ঝিঁঝিঁ পোকা থেকে শুরু করে শুয়োপোকা,ঘাস ফরিং এমন কোন পোকা নেই যা তারা খায়না। নিচের ছবিতে দেখতে পাবেন সেই পোকাদের কিছু নমুনা।
এদের গ্রামের বাড়ি গুলো আমাদের দেশের মত মাটির তৈরি হলেও আকৃতি গোলাকার আর উপরে তারা ব্যবহার করে ছনপাতা বা বিভিন্ন ধরনের গাছের পাতা। আবার কখনোবা দেখা যায় সম্পূর্ন ঘরটি তারা পাতা বা নলখাগড়া দিয়ে তৈরী করছে। ছবিতে এরকমই একটি ঘরের মডেল দেখানো হয়েছে।
এখানকার লোকদের বেশীরভাগের ধর্ম খ্রীস্টান ক্যাথলিক কিছু আছে মুসলমান তবে ১০% থেকে ১৫% এর বেশি হবেনা । এই কংগোতে লোকমুখে জানা যায় সর্বপ্রথম সাদা চামড়ার লোক হিসেবে ডিয়াগো কাউ নামে পর্তুগীজ এক ব্যক্তি আনুমানিক ১৪৮২ খ্রীষ্টাব্দে কংগোতে প্রথম অভিযান পরিচালনা করে । তার অভিযানে পর থেকে কংগোতে শুরু হয় খ্রীষ্টান ধর্মের প্রসারণ তবে সেটা বিস্তৃত লাভ করে ব্যাপকভাবে ১৮ শতকের দিকে ভ্যান কুভার নামে এক শ্বেতাংগ বেলজিয়াম মিশনারী আগমন করার পর থেকে ।এবং তার সাথে আগত মিশনারী দল এখানে খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচার করা শুরু করে এবং সেই সময় রাজা ২য় লিওপোল্ডের আমলে ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে কংগো পরিনত হয় প্রথমে রাজা ২য় লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত সম্পদের অংশ হিসেবে পরে ১৯০৮ সালে একটা পুতুল প্রশাসন তৈরী করে মুলত শাসন ক্ষমতা বেলজিয়ামের হাতে রেখে কংগো পরিনত হ্য় কলোনীতে এবং সেসময় হতে ১৯৬০ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কলোনী হিসেবে কংগো শাসিত ও শোষিত হয়ে এসেছে।অবশেষে ১৯৬০ সালে প্যাট্রিক লুবুম্বার নেতৃত্বে কংগো উপনিবেশ শাসন হতে মুক্তি লাভ করে কিন্ত পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে তারই নির্বাচিত সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মুবুতু দ্বারা তিনি উৎখাত ও নিহত হন।
এরপর কংগোর নামকরন করা হয় জায়ার এবং সুদীর্ঘ ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মুবুতু আমেরিকার ছত্রছায়ায় একনায়ক ও স্বৈরচারী শাসনের মাধ্যমে দেশ কে শোষন করেন।অবশেষে ১৯৯৭ সালে লরেন্ট কাবিলা এক অভ্যুথানের মাধ্যমে তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে পুনরায় এর নামকরণ করেন গনপ্রজাতন্ত্রী কংগো নামে। কিন্ত ২০০১ সালে আততায়ীর নিকট এই নেতা নিহত হলে তার ছেলে জোসেফ কাবিলা হন দেশের প্রেসিডেন্ট এবং গৃহযুদ্ধের কারণে পরবর্তীতে আবার ২০০৬ এ জাতিসংঘের তত্বাবধায়নে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন ।
যে কথা বলছিলাম ,এখানে প্রাচীনকালে খ্রীষ্টান ধর্ম আসার আগে এখানকার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে কোন ধর্মের প্রচলন ছিলনা এরা এক একটি গোত্র বিভিন্ন কাল্পনিক ভুত,প্রেত বা অশুভ আত্তার আরাধনা করত। যা AFRICAN BLACK MAGIC বা কালো জাদু নামে পরিচিত ।এমনকি এখনও এই বিদ্যার গোপন অনুসারীরা তাদের এই বিদ্যা দ্বারা মানুষের ক্ষতি করে আসছে। যারা এই বিদ্যার পারাদর্শী তাদের কে বলে ডকি বা ওঝা আর এই বিদ্যাকে তারা আফ্রিকান ভাষায় বলে কিনডকি । ছবিতে দেয়া আছে ডকিদের দ্বারা ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্য আর পরের ছবিতে আছে একজন ডকির বা ওঝার মূর্তি পোশাকসহ ।
অনেকে নিশ্চয় দেখে থাকবেন বিদেশী সিনেমায় একজন দুষ্ট ব্যক্তি একটি পুতুলের গায়ে সুঁচ ফুঁটিয়ে আরেক জায়গায় এক ব্যক্তিকে হত্যা করছে। আমি এরকম বেশ কিছু ঘটনা শুনেছি এখানকার লোকমুখে অবশ্য ঘটনাকতটুকু সত্য তা আমি জানতে পারিনি।
তবে এখানকার স্হানীয়রা যারা এসব বিদ্যায় পারদর্শী তাদেরকে এরা ভয় পায় এবং এড়িয়ে চলে।
আফ্রিকার দেশগুলিতে গোত্রের হিসাব নেই ঠিক তেমনি ভাষার ।তার প্রধান কারন এখানে প্রত্যেকটি গো্ত্রের নিজস্ব ভাষা আছে যেমন লুনটুম্বা,একোন্ডা,লোকুন্ডো এবং কিমংগো। এছাড়া আছে কিছু সাধারন প্রচলিত ভাষা যেমন লিংগালা,সোহেলী আর সরকারী ভাষা হিসাবে প্রচলিত আছে ফ্রেন্চ বা ফরাসী ।
দেশটি আয়তনে আমাদের দেশের তুলনায় প্রায় ১৬ গুন বড় ,প্রায় ভারতের সমান ।এই দেশের জনগোষ্ঠীর আমাদের মত সংখ্যায় বেশী না হলেও এদের ভাষা,সংষ্কৃতি,চালচলন,প্রথার মাঝে অনেক বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়।এমনকি আকারের মাঝেও অদ্ভুত কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেমন আপনেরা নিশ্চয় পিগমী জাতির নাম শুনে থাকবেন।এরা এক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের আকৃতি বামনের ন্যায় । এবং এদের এটা জন্মগত একটি বৈশিষ্ট্য।তবে আকার ব্যাতীত আর সব মানবিক গুনাবলীর ক্ষেত্রে এরা সাধারন মানুষের মতই ।
(চলবে)
নোট:
ছবিতে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত কিছু নিত্য ব্যবহার্য তৈজষপত্র দেখা যাচ্ছে।
ছবিতে প্রাচীনকালে কংগোতে আদিবাসীদের মাঝে প্রচলিত মুদ্রার ছবি
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০০৮ সকাল ৯:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



