অনার্স পরীক্ষা দেবার পর হুট করেই চাকরীটা হয়ে গেল। লোভনীয় অফার। চাকরীর শুরুতেই ছয় মাসের ট্রেনিং এ চীন ভ্রমণ। এক দিনের নোটিসে পাসপোর্ট করে নিলাম। আজ যাই কাল যাই করে যাওয়া আর হয় না। এদিকে আত্মীয় আর বন্ধুমহলে কয়েক পর্বে খাওয়া দাওয়া শেষ। কিন্তু যাওয়া আর হয় না। আসলে তখন অলিম্পিক গেমসের জন্য ভিসা নিয়ে চায়না এম্বেসি মারাত্মক কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এই কাগজ সেই কাগজ করে কত কাগজ যে জমা দিলাম। প্রতিদিন সকালে আমরা ১৪ জন হতভাগা গিয়ে এম্বেসির সামনে লিকার চা খাই আর দেখি মানুষজন বিরক্ত হয়ে এম্বেসি থেকে বের হচ্ছে আর চীনের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে। যারা ভিসা পায় তারাও এই উদ্ধার কর্মে যোগ দিতে ভুলছে না। কিন্তু আমাদের টা আর হয় না।
এভাবে বহুদিন চা খেয়ে তবেই পাওয়া গেল স্বপ্নের ভিসা। কিন্তু ভিসা দিল এক মাসের যা পরে আরো এক মাস বাড়ানো হয়েছিল। এবার যাবার পালা। নভেম্বর এর ১৪ তারিখ ফ্লাইট। সেদিন আর আমরা কেউ চীনের ১৪ গুষ্টি উদ্ধার করি নাই। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা আগেই সেরে রেখেছিলাম। সাথে সনি এরিকসন মোবাইলের ২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরাও ছিল।
জীবনের প্রথম বিমান ভ্রমণ। আনন্দে আর উত্তেজনায় আমরা সবাই মশগুল। বিমানবন্দরে আরেকদফা ঝামেলা। কথায় বলে, অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়। আমাদের মাঝে কেউ কেউ ডলার এনডোর্স করেনি। এই নিয়ে কাস্টম পুলিশ এর ঝামেলা। যাই হোক অনেক কষ্টে তাদের বুঝানো গেল যে আমাদের যাবতীয় খরচ আমাদের নিয়োগকর্তা দিচ্ছেন তাই ডলার নিয়ে যাওয়াটা আমাদের কাছে অত্যাবশ্যক না।
আমাদের বিমানের রুট ছিল ঢাকা থেকে কুংমিং হয়ে গোয়াংডং। বাংলাদেশের সাথে চীনের সময় পার্থক্য ছিল তখন ২ ঘন্টা। ছিল বলছি এজন্য যে তখনো ডিজিটাল টাইম বলে কোন শব্দ বাংলাদেশে আসেনি। আমাদের ফ্লাইট দুপুর ১ টায় ছেড়ে দুই ঘন্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধা ৫ টার দিকে কুংমিং এ পৌঁছল। কুংমিং এর কাস্টম পুলিশ এর ব্যবহার দেখেই মনে পড়ল আহারে বাংলাদেশেও তো পুলিশ আছে! অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই তারা আমাদের সাহায্য করল। যদিও একটা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এর একজন অফিসারকে যতটা ইংরেজি জানতে হয় তার ধারেকাছেও তারা নেই। তবে কেউ কেউ চমংকার ইংরেজি বলে। তবে সেটাও চায়নিজ ইংলিশ। চায়নিজ ইংলিশ জিনিস টা কি সেটা পরে বলছি।
কুংমিং এ প্রচুর বাংলাদেশী। এবং আশ্চর্যের বিষয় বিমানেও চায়নিজের চেয়ে বাংলাদেশীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। শুনেছি এটা অনেক লাভজনক একটা রুট। কারণ গোয়াংডং থেকে ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানী করে ওরা। আমার পাশের সিটের যাত্রীও বাংলাদেশী। তিনি থাকেন সৌদিআরবে। যাচ্ছেন একই কাজে। তবে তার কেনা পন্য তিনি সৌদি আরবে নিয়ে যাবেন।
কুংমিং হলো ইউনান প্রদেশের রাজধানী। আর এই ইউনান প্রদেশ হলো ইউনানী ওষুধের জন্য বিখ্যাত। সেখানে তখন অনেক শীত। এতই শীত যে লাগেজ থেকে শীতের কাপড় বের করতে হলো সবাইকেই। আমরা যে রেস্টহাউজে উঠবো তার মালিকও বাংলাদেশী। আসলে মালিক বলাটা ঠিক হবে না। অনেক বাংলাদেশী আছেন যারা ফ্ল্যাট ভাড়া করে এ ধরনের ব্যবসা করেন। তারা আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে যাবে, খাবাররে ব্যবস্থা করবে, কোথাও ঘুরে বেড়াতে চাইলে তার ব্যবস্থাও করবে। চমৎকার আতিথেয়তা তাদের।
আমরা রেস্টহাউজে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম শহর দেখতে। দারুণ গোছানো শহর। রাস্তায় কোন যানযট বা জনজট নেই। আমাদের দেশের মতোই সেখানেও রাস্তার পাশে বসে খাবারের দোকান। ফুটপাতে বসে হরেক রকমের পণ্যের সমাহার। তবে এসব ফুটপাতের পণ্যগুলো সত্যিই তথাকথিত 'চায়নিজ'।
কুংমিং এর মানুষ বাংলাদেশী দেখে অভ্যস্ত। তাদের অনেককে দেখলাম বেশ মজার বাংলা বলে। যার প্রায় সবগুলোই গালাগালি।
কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে আমরা ফিরে আসলাম। তবে ফিরে আসার পথে আমরা দেখলাম রাস্তার পাশে ছোট ছোট কমলা। দামে খুবই সস্তা। সবাই মিলে কমলা কিনে খেতে খেতে ফিরে আসলাম। পরের দিন খুব সকালে আবার ফ্লাইট ধরতে হবে। তাই একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



